বর্ষা, একটি চব্বিশ রিলের সিনেমা

সৌগত ভট্টাচার্য

 

বিরাট কোলাপসিব্‌ল গেটটা খুলতে গিয়ে রোজ একটু করে মরচে-চটা রং উঠে এসে হাতে লাগে। গেটের হাতলটার জায়গায় জায়গায় লেগে থাকা কালো রং সামনের বর্ষার মধ্যেই উঠে যাবে। হাতে মরচে লাগলে অস্বস্তি হয় বিজুর, হাতটা কোথায় মুছবে বুঝতে পারে না। কোমরে লাগানো কালো ঘুনসির সঙ্গে চাবি দিয়ে বিরাট লোহার গেটটার তালা খোলে। সাইকেলটা সকাল থেকে ভিজেই যাচ্ছে। সাইকেল চালালে ছাতায় বৃষ্টি মানে না, পুরো গা সপসপে ভেজা। তালা খুলে ছাদের পাইপের নীচে হাত নিয়ে বৃষ্টির জলে মরচে গুঁড়ো ধুয়ে নেয়। আগে সাইকেলের রড ধরে উঁচু করে বারান্দায় তুলতে হত, এখন মাটির সঙ্গে মোজাইক করা বারান্দার মেঝে এক লেভেলে এসে গেছে। মুষলধারে বৃষ্টি হলে জল হলের বারান্দায় দিকে চলে আসে। পরের দিন সকালে জমে থাকা পলি, পলিথিন, সাপ, ব্যাং পরিষ্কার করতে হয়। সাইকেলটাকে বারান্দার ভেতরের টিকিট কাউন্টারের গায়ে হেলান দিয়ে হাত পা থেকে জল ঝাড়তে ঝাড়তে বরফি মোজাইক সিঁড়ি দিয়ে তিনতলার ওপরে চলে গেলে জলের ফোঁটাগুলো বিজুর যাওয়ার পথ অনুসরণ করে।

বর্ষা এলে রাজমহল হলটার গন্ধ পাল্টে যায়। পর্দা থেকে একটা প্রবল স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ নাকে আসে। হাতের থেকে আঠার বালতি নামিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে গামছা পরে নেয় বিজু। মেশিনরুমটা দোতলায়, তিনটে উঁচু সিঁড়ি দিয়ে নেমে পাশের বারান্দায় ওর রান্নার জায়গা। একটা পাম্প স্টোভে ডাল বসিয়ে মেশিনরুমের জানলা খুলে বড় রাস্তার বজরংবলীর মন্দিরের দিকে তাকিয়ে একবার প্রণাম ঠুকে নেয় সে। মন্দিরে আসা মেয়েগুলো অনেকে কমলা রঙের সিঁদুর পরে পুজো দিতে আসে, ওদের দেখলে বিজুর দ্বারভাঙার কথা মনে পড়ে। কিন্তু কী যে মনে পড়ে! বৃষ্টিতে দূরে দেখা আবছামতো কিছু কথা মনে এসেও হারিয়ে যায়!

মেশিনরুমের পাশের করিডোরের জানলার ঘষা কাচগুলো লাল-নীল রঙের। এই মফস্বল শহরে মোজাইক আর লাল-নীল কাচ এই হলের আগে কেউ দেখেনি। বৃষ্টির ছাঁটে বারান্দাটা জলে পিছল হয়ে যায়। করিডোর থেকে একটা কাঠের কাজ করা বড় দরজা ব্যালকনিতে যাওয়ার পথ। ব্যালকনির দরজার ভেতর দিকে এগজিট লেখা লাল আলোর গা বেয়ে ওঠা বটগাছে নতুন কচি পাতা ধরেছে। সারাদিন চুঁইয়ে পড়া বৃষ্টির জল পায় গাছটা। আজ ডাল ভাত আলুভাজা আর স্কোয়াশের তরকারি, ব্যস, রাতে শুধু রুটি করে নিলেই হবে। রান্না সেরে সাড়ে বারোটার আগেই কাউন্টারে বসতে হবে, একটা থেকে শো। কাউন্টারের ফ্যানটা অনেকদিন হল খারাপ হয়ে গেছে। কাউন্টারে বসার আগে বিজু গামছা ছেড়ে প্যান্ট-জামা চড়িয়ে নেয়। ওই তো ডেইলি যা হয়— দু-চারটে ছেলে মেয়েগুলোকে নিয়ে আসবে, বই দেখতে তো আর আসে না এরা! সকলেই শহরের বাইরে থেকে আসা দর্শক। সাড়ে বারোটায় গেট খুলে কাউন্টারে বসলেও শো শুরুর পাঁচ-দশ মিনিট আগে হলে ঢোকে। মেয়েগুলোর মুখ ওড়নায় প্যাঁচানো। একসময় ভদ্রলোকেরা হলে আসত, টিকিট ব্ল্যাক হত। তখন নাওয়া-খাওয়ার সময় থাকত না হলের কর্মচারীদের। ছায়া দিদিমণি টর্চ দিয়ে টিকিটনম্বর মিলিয়ে সিট দেখিয়ে দিত। সুরেন, বাপি, বিমল— কত লোক এই হলে কাজ করত। বিজু প্রথম থেকেই যদিও প্রজেক্টার চালায়। সেও তা প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা। এখন বিজুর বয়েস ছাপ্পান্ন। সারোগিরা একে-একে সবাইকে হলের কাজ থেকে ছড়িয়ে দিয়েছে। হলের ব্যবসায় লাভ নেই আর। নতুন নতুন হল হয়েছে— অনেক স্ক্রিন, কম সিট। শহরের লোকেরা এখন ওখানেই সিনেমা দেখতে যায়। শুধু নুন শো হয় এখন এই হলে। শহরের আশপাশের গ্রাম থেকে কয়েকজোড়া ছেলেমেয়ে আসে, আর কয়েকজন বয়স্ক লোক আসে নির্জনে সময় কাটাতে। যে কটা টিকিট বিক্রি হয় সেটুকু সেরেই টর্চ নিয়ে হলের ভেতরে ঢুকে বিজু সিট দেখায়। যদিও একটু পরেই যে যার নিজের মতো অন্ধকার হলে আরও বেশি অন্ধকার খুঁজে নেবে। কোনও সদ্য রিলিজ করা সিনেমা এখন আর লাগায় না মালিক। নতুন ফিল্ম এখন অন্যান্য হলগুলোতে আসে। সিট দেখিয়ে বিজু মেশিনরুমে গিয়ে রিল চালিয়ে দিয়ে, সারাদিনে এই প্রথম মোবাইল হাতে নেয়। মালিকের ছেলে ললিত ওর পুরনো একটা ফোন দিয়েছে বিজুকাকাকে। ইউটিউবে গান শোনা, মুভি দেখা— সব ও-ই শিখিয়ে দিয়েছে। বিজু সিনেমাহলের মেশিনরুমের ভেতরে বসে পকেটের মোবাইল খুলে গোটা আরেকটা সিনেমাহল বের করে।

ফোনটা একটা প্ল্যাস্টিকের ক্যারিব্যাগে মোড়া ছিল। সকালবেলায় সাইকেলের হ্যান্ডেলে আঠার বালতি ঝুলিয়ে পোস্টার সাঁটাতে গেছিল ও, আর তখনই বৃষ্টি নামল, তাই ফোনটাকে প্ল্যাস্টিকের ক্যারিব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছিল বুদ্ধি করে। আগে পোস্টার মারার আলাদা লোক ছিল, বিজু শুধুই প্রজেক্টার মেশিন চালাত। এখন কাউন্টারে বসা থেকে পোস্টার লাগানো, গেট খোলা, টর্চ দিয়ে সিট দেখানো, বিকেলে তালা দেওয়া— সবই বিজুর কাজ। সুরেন চা খেতে এসেছিল সকালে থানার মোড়ের একটা দোকানে, বিজু তখন সেখানে পোস্টার লাগাচ্ছিল। সুরেন আগে এই হলে পোস্টার লাগানোর চাকরি করত। ওকে দেখে তাড়াতাড়ি করে পোস্টার না-লাগিয়েই সাইকেল নিয়ে কেটে পড়তে চাইছিল বিজু। সুরেনই বিজুকে ডাকে। মেশিন চালানোর লোক থেকে পোস্টার সাঁটার লোক হয়ে যাওয়ার জন্যই কি না কে জানে— বিজু একটু লজ্জা পেয়ে নিজের মুখ লুকোতে চায় পোস্টারের পেছনে। বিজুর বয়েসও অনেকটা যেন বেড়ে গেছে এই ক বছরে। সেই বন্যার বছর দ্বারভাঙা থেকে এসেছিল চাচার হাত ধরে। এখন আর ভাল মনে পড়ে না। বাপি, ভোম্বল, সুরেনের চেয়ে সিনেমাহলের কর্মচারীমহলে অনেক উঁচু পোস্ট ছিল ওর, বেতনও ছিল সবার চেয়ে বেশি। সুরেনের সঙ্গে এ-কথা সে-কথা বলতে-বলতেই বৃষ্টি নেমে গেল। এই মফস্বল শহরের বর্ষার গন্ধ বিজুর খুব চেনা লাগে।

বৃষ্টি কিছুটা কমলেও পুরোপুরি থামছে না। তিনতলার ওপর মেশিনঘরের মাঝখানে একটাই বড়-মতো জানলা বড়রাস্তার দিকে। এই জানলা থেকে অনেক দূর অবধি আকাশ দেখা যেত একসময়। সেই আকাশের শেষেই হয়তো দ্বারভাঙা। এখন সমানে শুধু বড়-বড় বিল্ডিং, হোর্ডিং আর ফোনের টাওয়ার। হোর্ডিংয়ে কখনও ফরসাপানা মেয়েদের ছবি। একটা উঁচু কাঠের চেয়ার নিয়ে বগলটা জানলার চৌকাঠে দিয়ে ঝুলিয়ে রিল চালিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে বিজু। মেশিনের ঠিক পাশেই একটা সিঙ্গল খাট, তার ওপর একটা তেলচিটে চাদর, দুটো বালিশ। জামাকাপড় সব লোহার ট্রাঙ্কের ভেতরে, দড়িতে রোজকার জামা মেলা থাকে। রিল চালিয়ে বিজু কাঠের চেয়ারে বসে মোবাইলটা হাতে নেয়। সারা শহরে ঝাপসা হয়ে বৃষ্টি পড়েই যাচ্ছে….

সারোগিরা হল দেখিয়ে ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে অন্য ব্যবসায় টাকা লাগায়, হলের ব্যবসায় আর লাভ নেই তেমন। কিন্তু লোন নেওয়ার বন্ধকির জন্য এই প্রোপার্টি বিক্রিও করে না তারা। হল চালানোর ইলেকট্রিকের খরচও অনেক মাসে ওঠে না। গতবছর ছটের সময় হলের মাথায় ফোনের টাওয়ার বসিয়েছে মালিক। এখন হলের ভেতর খুব ভালো মোবাইলের সিগনাল পাওয়া যায়। টাওয়ার থেকে নাকি ভাড়া বাবদ মোটা টাকা আসে। এখন মোট চারটি টাওয়ার সিনেমা হলের মাথায়। টাওয়ারের সাইলেন্ট জেনারেটরে তেল দিয়ে ছাদ থেকে নেমে আসে বিজু। ছাদ ভর্তি ছোট-ছোট বটগাছের বাগান যেন! শুধু ছাদ কেন, হলের ব্যালকনির প্লাস্টার চটে গিয়ে সেখানেও চারিদিকে গাছ আর শ্যাওলা। গাছগুলো অনেকবার কেটেছে, আবার বর্ষার জল পেলেই সবুজ হয়ে বেরিয়ে আসে। ফার্স্ট ক্লাসের সিটগুলো সোঁদা হয়ে ছাতা পড়ে গেছে, সিলিংয়ের ওপর থেকে জল পড়ে। সেকেন্ড-থার্ড ক্লাসের দিকে অনেকদিন যায়ই না বিজু। মালিককে বারবার বলেও কোনও লাভ হয়নি। মালিক এই রাজমহল হলের পেছনে আর টাকা ঢালবে না।

রিল চালিয়ে জানলার ধারে বসে অনেকক্ষণ ধরে ইউটিউবে একটা হিন্দি ফিল্ম দেখছিল বিজু। এই জানলার ধারে বসলে নিজেকে বিজুর বেশ রাজা-মহারাজা বলে মনে হয়। কোনও একটা ফিল্মে বিজু দেখেছিল, নায়ক ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে নিজের জমিদারি আর শহরটাকে দেখত। জানলার নীচে একসময় মুনিয়াকে দেখত বিজু। মুনিয়া এই হলে হাফটাইমে বাদাম বেচত। এখন আর আসে না, শুধু পার্কে বাদাম বেচে। ওপরের জানলা থেকে বিজু যখন সুরেন, বাপি, মুনিয়া আর সাইকেল স্ট্যান্ডের সুনীলকে দেখত, নিজেকে সেই নায়ক জমিদারের মতোই লাগত তার। যেদিন ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শোয়ের ভিড় দেখত তিনতলার জানলা থেকে, নিজেকে এই রাজমহল হলের মালিক বলে মনে হত বিজুর…

হঠাৎ একটা চেনা চিৎকার কানে আসায় বিজু ফোন থেকে মুখ তোলে। কারেন্ট চলে গেছে। হলের ভেতরে লোকে হল্লা শুরু করেছে। জেনারেটর চালিয়ে ফিরে এসে আবার ফোনের দিকে তাকায় সে। যতক্ষণ রিল চলে, বিজুও ইউটিউবে সিনেমা দেখে। মোবাইলে হিন্দি সিনেমা দেখলে তাও মনে হয় এই বিরাট হলে বিজুর সঙ্গে কেউ কথা বলছে। না হলে তো সারাদিন একজন লোকের সঙ্গেও বিজুর কথা হয় না। কথা না-বলতে-বলতে মুখটা যেন আঠার মতো আটকে গেছে। মাঝেমাঝে মনে হয়, ও কি কথা বলা ভুলে যাবে? বড় মালিক বা ললিত দিনে একবার করে ফোন করে হলের খবর নেয়। ব্যস, ওইটুকুই কথা সারাদিনে। বড় মালিক যদিও বাংলা বলত না। ললিত আবার বাংলা ছাড়া কিচ্ছু বলে না। আগে নতুন ছবি লাগলে মেশিনঘরে বসে ছবি দেখত, এখন আর নতুন হিন্দি ছবিও লাগায় না মালিক। দ্বারভাঙার আকাশটার মতো নিজের ভাষাও যেন বিজুকে ছেড়ে চলে গেছে। নতুন রিলিজ হিন্দি সিনেমা খানিক দূরের নতুন হলে লাগায়। ললিত বিজুকাকাকে বলেছিল ফোনে গান শুনতে, সেই থেকে গানের সঙ্গে পুরনো সিনেমাগুলোও বিজু দেখে ফিল্ম চালিয়ে দিয়ে। শহরের অনেক জায়গায় নাকি ফোনের টাওয়ারের সমস্যা। হলের ছাদের উপর টাওয়ার, তাই বিজুর নেটওয়ার্কের সমস্যা নেই। বিজু খেয়াল করে দেখেছে— হলে সিনেমা দেখতে এসেও অনেকে এখন মোবাইল দেখে।

সিনেমা শেষ হলে বিজু রাস্তায় সন্তুর দোকানে গিয়ে এককাপ চা খেয়ে হলের বাইরের গেটে তালা দেয়। নাইট শো তো অনেকদিন হল বন্ধ, লোক হয় না বলে। এখনও বৃষ্টি পড়েই চলেছে। কোলাপসিব্‌ল গেট টেনে সে হলের ভেতর ঢুকে পড়ে। বিরাট তিনতলা হলের চারিদিকে কেউ কোথাও নেই, সারদিন প্রায় কারও সঙ্গে কথা নেই। থাকার মধ্যে শুধু মোবাইলের নেটওয়ার্ক। সন্ধ্যা নামলে সে সিট দেখানোর চার ব্যাটারির টর্চ নিয়ে করিডোর দিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর নিজের মনেই কথা বলতে থাকে। একসময় নিজের মনে বলা কথা শুনে নিজেই হাসে, গম্ভীর হয়ে যায়, করিডোরের দেয়ালের গায়ে আলতো করে হাত বোলায়। খুব পাতলা একটা জলে-ভেজা শ্যাওলার আস্তরণ টের পায় হাতে। বারবার টর্চ ফেলে দেওয়ালের এদিক ওদিক পায়চারি করে, আর সিনেমার হিন্দি ডায়লগ বলে মাঝে-মাঝে। খুব ইচ্ছা হয় দ্বারভাঙার লোককে ডেকে দেখাতে, তাদের ব্রিজেশ্বর প্রাসাদ শাহু আজ গোটা একটা প্রাসাদে একা থাকে! কিন্তু কাকে দেখাবে, সেটা সে জানে না!

কিছু পুরনো রিল পড়েই আছে বহুদিন হলমালিকের ঘরে। সেগুলোর মধ্যে থেকে সে মাঝে মাঝে দেবদাস দেখে। মেশিনঘর থেকে দেবদাস চালিয়ে এসে ব্যালকনিতে নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে। রাজমহলের ব্যালকনির ছাদের ফুটো দিয়ে জল পড়ে টপটপ করে। বিজু সেভেন্টির বোতল থেকে একটু-একটু করে মাল ঢালে, আদা আর ছোলার চাট মুখে দেয়। মুখটা আহ্‌ করেও মাধুরীর মুজরার দিকে তাকায়। বিজু আজ যেন মুজরা নাচের আসর বসিয়েছে রাজমহলে। মাথার ওপর ফ্যান চললেও বিন্দু বিন্দু ঘাম কপালে জমে ওর। এই সিটগুলো থেকে নুন শোয় দেখতে আসা মেয়েগুলোর শরীরের গন্ধ পায় বিজু। সিনেমা হলের দেওয়াল জুড়ে বর্ষার গন্ধ আর মেয়ে-শরীরের গন্ধ। বিজু দেখে, হলের দেওয়াল থেকে সব শ্যাওলাগুলো স্ক্রিনের ওপর চলে আসছে আস্তে আস্তে। পুরনো স্ক্রিনটায় সবুজ আভা ফুটে উঠতে থাকে।

এমন সময় বিজুর খুব পেচ্ছাপ পায়। টর্চ জ্বালিয়ে ব্যালকনির অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে টলমল করে নেমে হলের বাথরুমের দিকে যায় সে। গামছা উঠিয়ে পেচ্ছাপ করতে গিয়ে দুবার টাল খায়। পেচ্ছাপ করার পর আবার কমলা সিঁদুর পরে পুজো দিতে আসা বউগুলোর কথা, গ্রাম থেকে সিনেমা দেখতে আসা মেয়ে মাধুরীর কথা মনে পড়ে ছাপ্পান্ন বছরের বিজুর। সে দেখে, অন্ধকার বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসা একটা বটের চারা তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। সে প্রচণ্ড হেসে ওঠে গাছটার দিকে তাকিয়ে। গাছটার গায়ে বিন্দু বিন্দু জল… বাইরে শুধু বৃষ্টি আর হলের ভেতর শরীর-শরীর গন্ধ।

টলতে টলতে মেশিন বন্ধ করে তেলচিটে চাদরের ওপর শুয়ে পড়ে বিজু। মাথার ঢাকনি ছাড়া দুটো ময়লা বালিশের একটাকে নিজের বালিশের পাশে রাখে। মাথার ওপর পুরনো ফ্যানটা ঘটাং ঘটাং করে চলে। সিঙ্গল খাটে নিজের বালিশের পাশের অন্য বালিশটাতে একটা নরম শরীর অনুভব করে বিজু। নেশার ঘোরে চিনতে পারে না শরীরটা। এটা কি নুন শোয়ে সিনেমা দেখতে আসা মুখে ওড়না জড়ানো মেয়েটা, নাকি সকালে মন্দিরে আসা বউগুলো, নাকি মাধুরীর নরম শরীর?

বকুলতলা মোড়ে একটা ঢ্যাঙা লাইটপোস্টের মাথায় কতগুলো জোরালো সাদা আলো জ্বলে আছে। বৃষ্টি আরও জোরে পড়া শুরু হল। কেউ যেন বারবার ল্যাম্পপোস্ট থেকে সাদা লাইট সরলরেখা বৃষ্টির চাদর ফুটো করে অন্ধকার মেশিনঘরে ফেলছে বিজুর পাশে শুয়ে থাকা বৃষ্টির মতো আবছা অথচ নরম শরীরটার ওপর। ঠিক যেমন রোজ একটি তীব্র সাদা আলোর স্রোত প্রজেক্টার থেকে শ্যাওলাপড়া স্ক্রিনের ওপর ফেলে ব্রিজেশ্বর প্রাসাদ শাহু।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...