তিনটি প্রেমের গল্প

কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়

 

শেষ বসন্তের দুপুর। রোদে স্বচ্ছ চাঁদোয়ার নিচে পেডেস্ট্যাল ফ্যান এবং কুলারের হাওয়ার গতিপথে যথোপযুক্ত, অর্থাৎ সাদা এবং সাদার বিভিন্ন শেডের শাড়ি কুর্তা পাঞ্জাবি পরে, যথোপযুক্ত, অর্থাৎ শোকসন্তপ্ত মুখচোখ করে বসে আছেন কিছু নারীপুরুষ।

তাকিয়ে আছেন ধবধবে গদিমোড়া সুদৃশ্য চৌকিতে, তাকিয়া ঠেস দেওয়া একটি সাদাকালো ফোটোগ্রাফের দিকে। শুভ্র ফুলমালার পাহাড় লুটিয়ে পড়েছে সে ফোটোগ্রাফের কালো ফ্রেমের পায়ের কাছে, যে ফ্রেম এতই আভরণহীন যে মহার্ঘতা লুকোতে পারে না। ফ্রেমবদ্ধ দুটি দীপ্ত, প্রোজ্জ্বল মুখমণ্ডল, যাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন শোকের জায়গায় মুগ্ধতা চলে আসে।

বিনীত পরিবেশকের ট্রে থেকে তুলে নেওয়া ঠান্ডা পানীয়ে চুমুক দিয়ে মুচকি হাসি ফুটে উঠল অতিথিদের কারও কারও মুখে।

মনে আছে?

হাসিটা মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। মনে আছে অনেকেরই। সাক্ষী না থাকলেও গল্প হিসেবে মুখে মুখে ছড়িয়েছে।

 

১.

বহু বছর আগের এমনই এক বসন্তের রবিবার। বারবেলা। সাপ্তাহিক নিয়ম মেনে বাড়িতে টেলিফোন বেজে উঠত।

–হ্যালো? আমি লাবণ্য বলছি। একটু শোভনকে ডেকে দেবেন?

ফোন কানে ধরে ঘাড় বাড়িয়ে বাইরে উঁকি মারত ফেন্সিং-এর তরবারির মতো হিলহিলে এবং নমনীয় চেহারার ছেলেটি, যার হাইট ছ ফুট ছাড়ালেও ওজন আটকে আছে পঁয়ষট্টি কেজির নিচে। উল্টোদিকের ফোনহীন বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ফর্সা বুক ঘসঘস চুলকোতে চুলকোতে ভাতঘুম থেকে উঠে সশব্দে হাই তুলত শোভন সেনগুপ্ত, যে বিশ্বাস করে বাড়িতে থাকলে পুরুষমানুষদের জামা না পরলেও চলে। পাজামার ওপর ফতুয়া চড়ানো ছেলেটি রিসিভারের মুখ ফিরিয়ে মৃদু গলায় বলত, “ধরুন, ডেকে দিচ্ছি।”

গায়ে জামা চড়াতে চড়াতে শোভন, যার সাইকেল নিয়মিত পাড়ার মেয়েদের জটলায় জটলায় শোভা পেত, এসে ‘হ্যালো, হ্যাঁ বলো’ বলে কথোপকথন চালাত। কাপ্তেনি হাসি হাসত মাথা পেছন দিকে হেলিয়ে। তার পর শিস দিতে দিতে বেরিয়ে যেতে যেতে বন্ধুত্বপূর্ণ ঘনিষ্ঠতায় আমাদের ছেলেটিকে গর্বিত ও মুচকি হেসে জানাত, এইসব মহিলাদের জ্বালাতনে তার পড়াশুনো মাথায় উঠেছে।

সেটি ছিল বছরের বসন্তের প্রথম ছুটির দিন। বাতাসে গিরিমল্লিকার কুঁড়ির গন্ধ পেয়ে কোকিলটা ডাকতে শুরু করেছিল। একবার রিং হতেই দুপুরভর প্রিয় কবির নতুন বইয়ে বুঁদ ছেলেটি ফোন তুলে অভ্যাসবশত তাকিয়েছিল উল্টোদিকের বারান্দার দিকে। শোভন সেনগুপ্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে শরীরে লেগে থাকা ভাতঘুমের শেষটুকু আড়মোড়া ভেঙে তাড়াতে তাড়াতে বিকট ব্যাদানে হাই তুলেছিল, যার অশ্লীল আর্তনাদ কোকিলের কুহুস্বর ছাপিয়ে এসে পৌঁছেছিল ছেলেটির কানে।

–হ্যালো, আমি লাবণ্য বলছি। একটু…
–আমি অমিত বলছি, বলে ফেলেছিল আমাদের ছেলেটি।

কোকিল সিটি দিয়ে উঠেছিল।

তারপর তিনমাস ধরে রবিবারের ফোন বাজল, যদিও শোভনকে একবারও রাস্তা পার হতে হল না। তিনমাস পর একদিন লাবণ্য অমিতের দেখা হল ভিক্টোরিয়ায় নাকি ময়দানে নাকি, না নন্দনে নয়, কারণ একদিন ফোনে কবিতা ভালোবাসে কি না-র উত্তরে লাবণ্য জানিয়েছিল যে পাঞ্জাবি পরা ঝোলা কাঁধে কবি-সাহিত্যিকদের দেখলে ওর পিত্তি জ্বলে যায়।

যেখানেই দেখা হোক, দেখা হওয়ার পর অমিতের দীর্ঘ আঙুল ও আঁখিপল্লব লাবণ্যর শ্বাস রুদ্ধ করেছিল। পাশাপাশি বসে গল্প করার সময় চোরা দৃষ্টিপাতে, গলা জড়িয়ে নামা কুচকুচে বিনুনির ওপারে লাবণ্যর অল্প ভোঁতা নাকের ডগায় একবিন্দু ঘাম আর হেসে ওঠা গালের টোল দেখে অমিত নিশ্চিত হয়েছিল এর জন্য কবিতাকে হেসেখেলে ত্যাগ দেওয়া যায়।

পরের ছ মাস শহর জুড়ে প্রেম করেছিল অমিত আর লাবণ্য। মাঝে মাঝে অমিত মুখ ফসকে কবিতার দু লাইন বলে উঠলে লাবণ্য রুমাল দিয়ে হাই মুছে নিত, আর লাবণ্যের গানের স্কুলের রসিকতায় অমিতকে জোর করে হাসতে হত, কিন্তু ওটুকুই। বিয়ে হয়ে গেল। জামাইয়ের চাকরির স্থায়িত্ব এবং উন্নতির অবকাশ নিয়ে শ্বশুরের যাবতীয় দুশ্চিন্তাকে কাঁচকলা দেখিয়ে অমিত হাউইপ্রতিম উন্নতি করল। যথাসময়ে ছেলে হল, বাড়ি হল, বাড়ির ছাদে লাবণ্যর বাগান হল, গানের ক্লাস হল, গাড়ি হল, ইউরোপ ট্যুর হল, ছেলে বড় হয়ে এনআরআই হল, অমিতের রিটায়ারমেন্ট হল।

তারপর একদিন বাসন্তিক দ্বিপ্রহরের অবসরে, শহরের পশতম পাড়ায় বাংলোবাড়ির দোতলার গোলবারান্দায় বসে পাঁচিলের পরিধি জুড়ে কৃষ্ণচূড়া রাধাচূড়ায় লাল হলুদ মাখামাখির দিকে তাকিয়ে চা খেতে খেতে, বড় জোর পনেরো মিনিটের এপারে ওপারে দুজনের হৃদগতি স্তব্ধ হল। পাশাপাশি চেয়ারে এলিয়ে পড়ে থাকা নিথর দেহ দুটি আবিষ্কার করে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় তুলল কাজের মেয়ে শান্তা। সিকিউরিটির দীনদয়াল চোখ কপালে তুলে বলল, আভি আভি তো পেপার দে কে আয়া, তব তো সব কুছ ঠিক থা!

দুটি মানুষের এই অপ্রত্যাশিত মৃত্যু নিয়ে তো হইচই হলই, তার থেকেও বেশি হল এই নিয়ে যে মৃত্যুর সময় দুই চেয়ার থেকে এগিয়ে আসা দুটি হাতের দুটি আঙুল, আলগোছে ছুঁয়ে ছিল একে অপরকে।

আজকালকার যুগে যে এমন রূপকথার মতো প্রেম দেখা যায় না, একমত হয়েছিল সবাই।

 

২.

লাবণ্যের সঙ্গে আলাপ ও বিয়ে হওয়ার পর প্রথম কবে কবিতার খাতাটার কথা মনে পড়েছিল স্পষ্ট মনে করতে পারত অমিত। মনে করতে পারার কারণটা এটা নয় যে সেদিন প্রথম ভাড়াবাড়ি ছেড়ে নিজের ফ্ল্যাটে উঠে যাচ্ছিল তারা। লাবণ্য প্রবল উৎসাহে মুভার্স অ্যান্ড প্যাকার্সের লোকজনের তত্ত্বাবধান করে বেড়াচ্ছিল। মনে ছিল কারণ সকাল থেকে কোকিলটা কানের মাথা খেয়ে চেঁচাচ্ছিল। সেই কানফাটানো কুহুধ্বনি শুনতে শুনতে চারদিক ছড়িয়ে থাকা আসবাবপত্র, বাসনকোসন, জামাকাপড় এবং আরও যাবতীয় হুড়ুমদুড়ুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হারানো কবিতার খাতাটার জন্য আচমকা বুক হু হু করে উঠেছিল অমিতের। মনে হয়েছিল এই সব কিছুতে লাথি মেরে শুধু ওই খাতাটা নিয়ে ও বেরিয়ে যেতে পারে।

তারপর থেকে খাতাটার কথা মনে পড়ত। ভাতের থালার ওপর লাবণ্যর উদ্যত ডালের হাতার মুখে, ভরা কনফারেন্সে প্রেজেন্টেশন দিতে দিতে, শনিবারের আড্ডায় তুমুল হেসে উঠতে উঠতে কথা নেই বার্তা নেই, পিসেমশাইয়ের কারখানার লোগো ছাপা চামড়াবাঁধাই কুৎসিত ডায়রিটা চোখের সামনে এসে দাঁড়াত। উল্টেপালটে একেকটা পাতা থেকে বার করে আনত দুয়েকটা কবিতার পংক্তি যাদের আঙুল ধরে একসময় অমিত ঘুরে বেড়াত সারাদিন, ভাবত কেউ কি কখনও আসবে যাকে এই লাইনগুলো সে শোনাতে পারে?

এমন সময় কোম্পানির জনসংযোগ নীতির অংশ হিসেবে সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার অঙ্গ হিসেবে অমিতকে যেতে হল ‘কৃষ্টি ও কর্পোরেট’ নামের এক আলোচনাসভায়। বক্তব্যের রাখার শেষে গুচ্ছের ফুলমালা, বোকেটোকে দুই হাতে জড়ো করে অমিতকে গাড়ি অবধি পৌঁছে দিতে এল বছর তেইশের কেতকী বাগচি। অমিত ভদ্রতাসূচক প্রস্তাব দিল বাড়ির পথে খানিকটা এগিয়ে দেওয়ার। অনেক দিন পর অমিত বলল কম, শুনল বেশি। কেতকী বলল ওর জীবনজোড়া নাটক, গান আর কবিতার কথা। দুজনের প্রিয় কবির নাম মিলে গেল। অমিত অবাক হয়ে দেখল সেই কবির কবিতার দু-একটা লাইন এখনও ছাইচাপা আগুনের মতো জিভের ডগায় জ্বলছে। পংক্তিগুলো আবৃত্তি করতে শুরু করল অমিত, কণ্ঠ মেলাল কেতকী। কবিতার অন্তে দুজনে সিগন্যালে দাঁড়াল। একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল, শহরের নিয়ন আলোয় কেতকীর চোখের তারা ঝিকিয়ে উঠল, আর অমিত টের পেল যুগযুগান্ত পর কবিতা তাকে আবার ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

ভাসল অমিত। কেতকীর হাত ধরে শহরের রাজপথের ছ ইঞ্চি ওপর দিয়ে উড়ে বেড়াল। নাটক দেখল, গান শুনল, কবিতা পড়ল ও পড়াল। টাই কাঁধের ওপর দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে ঝুঁকে পড়ে খুল্লমখুল্লা ফুচকা খেল, এবং কেতকীকে চুমু। খুল্লমখুল্লা নয় অবশ্য, কেতকীই খোঁজ দিল নিরাপদ ছায়ার। কবিতায় মোড়া, কবিতায় ঘেরা সে ঘরে নিয়মিত মিলিত হত অমিত ও কেতকী।

দোটানাটা অবশেষে কেটে গেল। অমিত উপলব্ধি করল কবিতার ঘরটি বুকের ভেতর শিকড় গেড়েছে, আর আলগা হয়ে গেছে ডাল ভাত ইএমআই সংসারের টান।

কিছু কিছু টান চলে গেলেও দায় রেখে যায়। সে দায়মুক্তির জন্য অমিত প্রস্তুত হল। শক্ত কাজ সকালে সেরে ফেলা অমিতের অনেকদিনের অভ্যেস। সে এসে বারান্দায় বসল। বাংলোর পাঁচিলঘেঁষা রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়ার সারি, লালহলুদে ছয়লাপ। একটা কোকিল সম্ভবত লুকিয়ে আছে ওই লাল হলুদের বনে, লুকিয়ে লুকিয়ে ডাকছে।

দীনদয়াল এসে খবরের কাগজ দিয়ে গেল। লাবণ্যর অপেক্ষা করতে বুকের মধ্যে হালকা কাঁপুনি হচ্ছিল অমিতের। খবরের কাগজ পড়ার মতো সুস্থির চিত্ত ছিল না তার তখন, তবু অস্বস্তিটা চাপা দিতে কাগজটা তুলে চোখের সামনে ধরেছিল। মূল কাগজ পার হয়ে সাপ্লিমেন্টে পৌঁছেছিল।

আর তক্ষুনি ব্যথার ছুরিটা গেঁথে গিয়েছিল বুকের বাঁদিকে। খসে পড়েছিল খবরের কাগজ, শরীর দুমড়েমুচড়ে উঠেছিল। বাঁ হাতটা সর্বশক্তিতে অমিত চেপে ধরেছিল বুকের সঙ্গে, যন্ত্রণায় বন্ধ হয়ে আসা নিঃশ্বাসের শেষটুকু দিয়ে ডান হাতে হাওয়া খামচে ধরতে ধরতে ‘লাবণ্য’! ডেকে উঠতে চেয়েছিল অমিত, তার আগে শরীর নিথর হয়ে গেল।

 

–কী গো, ডাল নেবে?

অন্তত তিনবার জিজ্ঞাসা করতে হল লাবণ্যকে। আজকাল রোজই হয়। বুবুনের বিয়ে ভাঙোভাঙো হওয়ার খবরটা দেওয়ার সময়ও লাবণ্য দেখেছিল অমিতের ফ্যালফেলে দৃষ্টি। খবরের আকস্মিকতায় নয়, লাবণ্য জানে। অমিতের মনটা আসলে পড়ে আছে অন্য কোথাও।

বুবুনের বিয়েটা ভেঙে গেল। ও বিয়ে দেওয়াতে অমিতলাবণ্যের হাত ছিল না, বিদেশে পিএইচডি করতে গিয়ে আলাপ হয়েছিল, সব সিদ্ধান্ত সেরে বাবামাকে জানিয়েছিল বুবুন। ভাঙনেও ওরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করল। খালি ডিভোর্স হয়ে যাওয়ার খবরটা দিয়ে যখন বুবুন বলল, হয়ে গেল মা, তোমার ছেলের বউ পালাল, বাক্যের শেষে বুবুনের গলায় লেগে থাকা হাসিটুকু শুনে লাবণ্যের ইচ্ছে হল ফোনের ভেতর দিয়ে ছেলের মাথাটা একবার বুকে চেপে ধরতে।

পালানো তাহলে যায়? রাতে শোওয়ার আগে, ক্ষইতে শুরু হয়েও এখনও কোমর ছোঁয়া চুল বিনুনিতে জড়াতে জড়াতে ভাবল লাবণ্য। পর পর সাতদিন ভাবল এবং স্থির করল পালানো ব্যাপারটার একটা গোড়ার গলদ আছে। সেটা হচ্ছে পালানোর শুধু একটা উৎস থাকলেই হয় না, একটা গন্তব্যও লাগে।

সোজা কথায়, লাবণ্য যদি শেষমেশ পালাতেও পারে, পালিয়ে যাবেটা কোথায়?

বুকের ভেতর একটা বহুদিনের ঝুল পড়া পর্দা নড়ে উঠল। রাতে ওপাশ ফিরে ফোন স্ক্রোল করতে থাকা অমিতের পাশে শুয়ে এপাশ ফিরে  লাবণ্য সোশ্যাল মিডিয়ার সার্চ খোপে টাইপ করল, শোভন। ইংরিজিতে, বাংলায়। একটি বিখ্যাত উপন্যাসের চরিত্র হওয়ার জন্যই সম্ভবত, সাজেশনে পঞ্চাশের ওপর শোভন বেরোল, যাদের সবার বয়স একটা নির্দিষ্ট বয়সের ওপর। কারণ বাংলা বই পড়া বাঙালি বন্ধ করেছে অনেকদিন, বাংলা বইয়ের চরিত্রের নামে ছেলেমেয়ের নাম রাখাও।

শেষবারের মতো চেষ্টা করতে গিয়ে আঙুলের অসাবধানতায় শোভন লিখতে গিয়ে দুবার এস টাইপ হয়ে গেল, আর সাজেশনের লিস্টে প্রথম যে প্রোফাইলটি ভেসে উঠল, তাকে দেখে লাবণ্যর রক্ত ছলাৎ করল। প্রায় পঁচিশ কেজি চর্বি এবং পাঁচশো কেজি আত্মবিশ্বাস যোগ হওয়া সত্ত্বেও অব্যর্থ চিনল।

নিজের নামের আগে একটি বাড়তি এস বসিয়ে নিউমেরোলজিস্টের প্রতিশ্রুতি সত্যি করে বাংলা সিরিয়ালের পরিচালকদের রেসে দ্রুত ফার্স্ট বয় হয়ে উঠেছেন তিনি। লাবণ্য সিরিয়াল দেখে না, গান গায় আর বাগান করে, তাই সে খবর রাখেনি, কিন্তু শোভন সেনগুপ্ত একজন রীতিমত সেলিব্রিটি।

সেদিন এবং তারপরের মাসখানেকের সারাদিন সারারাত ধরে শোভনের প্রোফাইল ঘাঁটল লাবণ্য, তারকাদের সঙ্গে ছবি দেখল, ইন্টারভিউ শুনল, সংবর্ধনার ক্লিপিংস দেখল, নাম কা ওয়াস্তে সংসারের আভাস পেল। কিন্তু প্রথম কবে মেসেঞ্জারে টোকা পাঠাল? সম্ভবত যেদিন নন্দনের পাশ দিয়ে গাড়ি করে ফিরতে ফিরতে একটি মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে ঘোর অফিসটাইমে হাসতে হাসতে অমিতকে ফুচকা খেতে দেখল লাবণ্য।

শোভন সাড়া দিল। লাবণ্যরা ডাকলে শোভনদের সাড়া দিতেই হয়। দেখা হল। শোভন বলল, একটুও বদলাসনি। লাবণ্য বিশ্বাস করল। তারপর নিয়মিত দেখা হল, কথা হল, অনর্গল কথা। যার মধ্যে শোভন একদিন স্বীকার করল, এই যে এত হুলাবিলা, কোলাহল, ক্যামেরার ফ্ল্যাশের আলোর আড়ালে নিজেকে চাপা দিয়ে রাখা, এর অন্যতম কারণ হল ঘরের ছায়াটা ছবি হয়ে গেছে অসুখী দাম্পত্যের মহামারিতে। লাবণ্য স্বীকার করল, সে অসুখ তাকেও ছুঁয়েছে। রেস্টোর‍্যান্টের টেবিলের ওপাশ থেকে হাত বাড়িয়ে লাবণ্যের হাত ধরল শোভন। আবার কি সব শুরু থেকে শুরু করা যায় না?

বর্ষাস্নাত শহরের জ্যামজট ঠেলে আধঘণ্টার রাস্তা পৌনে দু ঘণ্টায় পেরিয়ে বাড়ির দরজায় এসে গাড়ি দাঁড়ানোর অনেক আগেই উত্তরটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল লাবণ্যের কাছে। এবং এটাও যে এ পৃথিবীতে একজন আছে, মাত্র একজন, শোভনেরও আগে যাকে উত্তরটা জানানো দরকার।

পরদিন সকালে সেই উত্তরটা দেবে বলে বারান্দায় চায়ের আয়োজনের দিকে এগিয়েছিল লাবণ্য। জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে পাজামা পাঞ্জাবি পরা অমিতের অবয়ব দেখতে পাচ্ছিল। চায়ের সরঞ্জামের ওপর ছিরকুটে পড়ে থাকা বিনোদনের পাতাটা তুলতে তুলতে লাবণ্যের চোখে পড়েছিল রংচঙে ছবির নিচে ক্যাপশনটা। গোপনে বিয়ে করলেন শোভন ও কেতকী। বাংলা সিরিয়ালের মুকুটহীন ফার্স্ট বয় ও তাঁর পরবর্তী মেগার নবাগতা নায়িকা।

শোভনের টুকটুকে লাল পাঞ্জাবির বুকে সেঁটে থাকা বধূসাজে কিটিকে দেখল লাবণ্য, শোভনের চওড়া হাসি দেখল আর টের পেল একটা প্রচণ্ড চাপ তার বুক ফাটিয়ে বেরোতে চাইছে। একটা কিছু আঁকড়ে ধরার আশায় হাত বাড়াল লাবণ্য এবং পেলও। চেয়ারের হাতল থেকে অমিতের এগিয়ে আসা শীতল দীর্ঘ আঙুলগুলো প্রাণপণে জড়াল লাবণ্য। বুজে আসা গলায় বারংবার ডাকল ‘অমিত! অমিত!’; মুখ অল্প হাঁ করে চেয়ারের পিঠে মাথা হেলিয়ে শুয়ে রইল অমিত। একবারও সাড়া দিল না, একবারও তাকাল না লাবণ্যর দিকে, একবারও জড়িয়ে ধরল না লাবণ্যর আঙুল। ঝাপসা দৃষ্টির আড়াল থেকে লাবণ্য দেখল অমিতের যন্ত্রণা ছাওয়া মুখ, চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলের ধারা, চিনতে পারল ঠোঁটের ওপর জমে থাকা ‘লাবণ্য!’ আকুতি। আর দেখল সিলিঙের দিকে তাকিয়ে থাকা খোলা চোখের ওপর এখনও, এখনও দীর্ঘ আঁখিপল্লব।

লাবণ্যর শ্বাস রুদ্ধ হল।

স্মৃতিসভা শুরু হল। সাদা ও সাদার বিভিন্ন শেডের পোশাক করা ম্রিয়মাণ মুখেরা একে একে এসে লাবণ্য ও অমিতের গল্প বললেন। একেকজনের জবানিতে উদযাপিত হল দুটো মানুষের বেঁচে থাকা, ভালোলাগা, ভালোবাসা, সাফল্যের নানাবিধ দিক।

যেটা সবাই উল্লেখ করলেন, অমিতলাবণ্যের নিখুঁত নিটোল দাম্পত্যের কথা, যা এই গল্পগুচ্ছের প্রথম গল্পের উপজীব্য। প্রত্যেকেই একবাক্যে স্বীকার করলেন, আজকের যুগে এমন প্রেম পৃথিবীতে কমই আসে।

কোকিলটা চিৎকার করে উঠল। কান্নায় না অট্টহাসিতে, কে জানে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...