Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

যে বই পড়া হয়নি

অনুরাধা কুন্ডা

 


ভীষণ ইচ্ছে করে এমিলির চিঠি পড়তে, যে চিঠি পুড়ে গেছে, পুড়িয়ে দিয়েছেন এক নিঃসঙ্গ কবি, এক লাজুক প্রেমিক, বিয়াত্রিচে যাঁর মনের গভীরে, “time to turn back and descend the stair”...

 

 

যে-কবিকে নিয়ে কলেজকাল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত একরকম একনিষ্ঠ একাগ্রতা এবং আগ্রহ আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, তিনি টিএস এলিয়ট। একটা আদ্যন্ত ধর্মনিষ্ঠ পরিবার, যাঁদের বলা হত বোস্টন ব্রাহমিনস, সেখানে জন্ম, আট ভাইবোনের অষ্টম, পড়ুয়া স্বভাব, স্বভাবলাজুক, অন্তর্মুখী, আট বছর বয়সে যাঁর পড়া হয়ে গিয়েছিল ডক্টর ফস্টাস, সেই মানুষটি কবি সম্পর্কে আমার ধারণা বদলে দিয়েছিলেন। আমাদের কৈশোর, যৌবনে বাংলা কবিতায় সুনীল-শক্তির দাপিয়ে বেড়ানো, তাঁদের অনুকরণে বোহেমিয়ান হতে চাওয়ার চেষ্টায় ব্যর্থ কবিদের প্রাবল্য… ঘোলা চোখ, ঢিলে জিন্স, রংচটা পাঞ্জাবি আর চটির ফটফট যখন ‘কবি’ সম্পর্কে মনে ধন্দ জাগাচ্ছে, সেই জীবনানন্দ দাশে আটকে আছি, তখন টিএস এলিয়টের সঙ্গে পরিচয়। একটা আপাদমস্তক ফিটফাট লোক, মাথার চুল সযত্নে আঁচড়ানো ব্যাকব্রাশ করে, স্যুটেড, নিখুঁত চোখমুখে শান্ত অভিব্যক্তি, ওয়েল-শেভড ব্যাঙ্কচাকুরে, বিশ্বযুদ্ধের সময় যে মানুষটি দশটা থেকে ছটা ব্যাঙ্কে কলম পিষতেন… তাঁর ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের প্রথম ভল্যুমটা যেদিন কলেজ স্ট্রিটের স্টলে প্রথম হাতে পেয়েছিলাম, সেদিন হাতে যেন চাঁদ পেয়েছিলাম।

 

ঘন নীল হার্ডবাউন্ড। এই মোটা বই। ফেবার অ্যান্ড ফেবারের। যে ফেবার ছাড়া তাঁর বই প্রকাশিত হত না। লেটার্স অব টিএস এলিয়ট, ভল্যুম ওয়ান। ১৮৯৮ থেকে ১৯২৮-এর চিঠি, যার অনেকগুলো তাঁর মাকে লেখা। এরপর দ্বিতীয়, তৃতীয়… মোট দশটি ভল্যুমে আছে তাঁর চিঠি। আমি তাঁর চিঠির সেই ভল্যুমটি পড়তে চাই, যে-বই এখনও পড়া হয়ে ওঠেনি, এমিলি হেলকে লেখা তাঁর হাজারের ওপর লেখা চিঠি। কোথাও পাইনি। কলকাতার ন্যাশনাল বা ব্রিটিশ কাউন্সিলে না, কলেজস্ট্রিটের ধুলো ঘেঁটে না, কোথাও না। সে-সময় গবেষণার কাজ করছি এলিয়টের কবিতা, নাটক নিয়ে। অরূপবাবু মানে অরূপ রুদ্র পাঠাতেন ন্যাশনালের অ্যানেক্সে, ডিজারটেশন অ্যাবস্ট্র্যাক্ট দেখতে। এলিয়টের ওপর বই হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াতাম, পিটার অ্যাক্রয়েড, এলিজাবেথ ড্রিউ, হিউ কেনার, ম্যাথুজের গ্রেট টম, গোটা গোটা বই কেনার সাধ্য নেই। সারাদিন কলেজ স্ট্রিটে বসে গোটা বই ফোটোকপি করাই। হাতে পেলাম লিন্ডাল গর্ডনের লেখা ফেবারের আর একটি বই। দি ইমপারফেক্ট লাইফ অব টিএস এলিয়ট‘। গর্ডন লিখেছেন এমিলি হেলের সঙ্গে এলিয়টের প্রণয়কাহিনি, যে সম্পর্কের রোম্যান্টিজম দুনিয়াকে নতুন করে ভাবাতে পারে রোম্যান্টিক কাকে বলে, আর যে-সম্পর্কের যোগাযোগের ফলে চিঠিপত্র প্রথম, দ্বিতীয় ইত্যাদি ভল্যুমে নেই, আছে সেই অদেখা ভল্যুমে… যে বই আমার পড়া হয়নি। পড়ার স্বপ্ন আছে। গর্ডনের বইটি ফেবারের ছাপা কিনে ফেলি। এত বিশ্বস্ত জীবনী খুব কম লেখা হয়। আর কার জীবনী? স্বীকারোক্তিতে যিনি নিজেকে সাহিত্যে ক্লাসিসিস্ট বলেন, রাজনীতিতে রয়ালিস্ট আর ধর্মে অ্যাংলো ক্যাথলিক, ইউরোপীয় সভ্যতায় যিনি ক্লান্ত, সতেরো বছর বয়সে যিনি সংস্কৃত পাঠ করেছেন, একবার প্রায় বৌদ্ধ হব হব করেও হননি, যিনি শান্তি খুঁজেছেন বৃহদারণ্যক উপনিষদে, যিনি বলেছেন তাঁর প্রথম যৌনচেতনা আসে আট বছর বয়সে এবং ওই বয়সেই তিনি ঈশ্বর সম্পর্কে আলোচনা শুরু করেন নার্স অ্যানি ডুনির সঙ্গে। মেধা এবং আবেগকে একত্রিত করে চালনা করার কঠিনতম কাজটি তিনি করেছিলেন, এলিয়ট সাহেব, যিনি কবিতাকে নৈর্ব্যক্তিকতার দিকে নিয়ে গেছিলেন, রোম্যান্টিক সাবজেক্টিভিটি থেকে মুক্ত করে।

 

ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা, পেশাগত চিন্তা, মননশীল দ্বন্দ্ব যে মানুষটির জীবনকে আচ্ছাদিত করে রাখত, তাঁর চিঠি। এমিলি হেলকে লেখা তাঁর চিঠির ডিজিটাল এডিশন পাওয়া যায়। কিন্তু আমার বই চাই। আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব তাঁর। ইন্টিগ্রিটি চেহারায় প্রতিভাত। পাক্কা সাহেব। দুই বিশ্বযুদ্ধ মধ্যবর্তী তাঁর মানসিক যন্ত্রণা, ইউরোপীয় সভ্যতার ধ্বংস দর্শনে তাঁর জীবনবোধ… এই মানুষটি, যিনি তাঁর সাহিত্যচর্চায় রোম্যান্টিসিজমকে তেড়েফুঁড়ে আক্রমণ করেছেন, কেমন ছিল তাঁর প্রণয়িণীর প্রতি সম্ভাষণ? তিনিই তো রচনা করেছিলেন ওই শ্রেষ্ঠ রোম্যান্টিক লাইনসমূহ…

You gave me hyacinths first a year ago;
“They called me the hyacinth girl.”
—Yet when we came back, late, from the Hyacinth garden,
Your arms full, and your hair wet, I could not
Speak, and my eyes failed, I was neither
Living nor dead, and I knew nothing,
Looking into the heart of light, the silence.

তাঁর হ্যায়াসিন্থ কন্যা… যাঁকে দেখে প্রেমিক বাক্যরহিত, না জীবিত, না মৃত… দৃষ্টি ব্যর্থ! ইলিনর হিঙ্কলির বাড়িতে উনিশশো বারো সালে থমাসের সঙ্গে এমিলির পরিচয়। আমেরিকান স্পিচ ও নাটকের শিক্ষক এমিলি হেল। এলিয়ট তাঁকে লিখেছিলেন একহাজার একশো একত্রিশটি চিঠি। উনিশশো চোদ্দ সাল। এলিয়ট প্রণয়ের কথা জানান তাঁকে। এমিলি সে প্রণয় গ্রহণ করেননি। এলিয়ট তবু চিঠি লিখে যান এমিলিকে। লিখেই যান। তাঁর মঞ্চাভিনয়ের পরে তাঁকে পাঠাতেন পুষ্পস্তবক। এরপর উনিশশো পনেরোতে এলিয়টের বিবাহ ভিভিয়েনের সঙ্গে এবং এক অসুখী দাম্পত্যের জন্ম। ভিভিয়েন নিউরোটিক ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত, বার্ট্রান্ড রাসেলের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা… অন্তর্মুখী এলিয়ট আরও একলা হচ্ছেন। ধর্মবিশ্বাসের জন্যে বিচ্ছেদ নিতে পারছেন না ভিভিয়েনের থেকে। আবার অসহনীয় দাম্পত্যে ক্লিষ্ট হচ্ছেন।

Speak to me. Why do you never speak? Speak.
What are you thinking of? What thinking? What?
I never know what you are thinking. Think.

 

উনিশশো পঁয়ত্রিশ থেকে উনিনশশো ঊনত্রিশ। এমিলি হেল আর থমাস স্টার্নস এলিয়ট একত্রবাস করেছিলেন ক্যাম্পডেন, গ্লসেস্টার্সশায়ারে। উনিশশো পঁয়ত্রিশে গেছিলেন বার্নট নর্টন। এমিলি হেল লেখেন, থমাস বলেছিলেন বার্নট নর্টন ছিল এলিয়টের প্রেমপত্র, এমিলিকে। এলিয়টের চিঠিও তাই বলে। ভিভিয়েনের মৃত্যু, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ক্রমশ কমে আসা দেখা হওয়া। হঠাৎ পাল্টে গেল সবকিছু। দীর্ঘ সেলিবেসির পর এলিয়টের দ্বিতীয় বিবাহ ভ্যালেরিকে। স্তম্ভিত এমিলি হেল, আহত। এলিয়টের জীবনের সেই স্বর্গীয়, নীরব নারী যাঁর লেখা সমস্ত চিঠি, দ্বিতীয় বিবাহের পরে পুড়িয়ে ফেলেছিলেন এলিয়ট। উনিনশশো সাতান্নতে এমিলি তাঁর শেষ চিঠি লেখেন থমাসকে। শোনা যায়, নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছিল এমিলির।

ওই চিঠি, যা এলিয়ট লিখেছিলেন এমিলিকে, যা প্রকাশিত হয়েছে সবেমাত্র দু-হাজার কুড়ি সালে। সেই চিঠিগুলি পড়তে চাই। পঞ্চাশ বছরের এমবার্গোর পরে প্রকাশ করেছে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়। দু-হাজার কুড়ি পর্যন্ত সে-সব চিঠি ছিল সিলবন্ধ।

গভীর, তীব্র, প্রেম। বিবাহে ইচ্ছুক। বিবাহে অস্বীকার। এলিয়ট বলেছেন এমিলিকে বিবাহ করলে সে বিবাহ হত প্রথম বিবাহ-অধিক বড় ভুল। এমিলিকে বিবাহ করলে তাঁর প্রেমিকসত্তা মরে যাবে, এমনটাই বলেন তিনি। একত্রবাস করেছেন, শারীরিক সম্পর্কে যাননি, কখনওই নয়। কেন বন্ধনে রাখতে চাননি প্রেমিকাকে? দান্তে যাঁর আরাধ্য, তিনি কি বিয়াত্রিচের মতো এক সুদূর তারা করেই রাখতে চেয়েছেন এমিলি হেলকে?

উনিশশো ষাট। এলিয়টের স্বীকারোক্তি। এমিলির স্মৃতির সঙ্গে প্রেম তাঁর।

What might have been.

যা হতে পারত। যা হয়ে উঠতে পারত। অথচ হয়নি। কোন দুটি চোখ তাঁকে বিস্ময়াবিষ্ট করে রেখেছিল?

ভীষণ ইচ্ছে করে এমিলির চিঠি পড়তে, যে চিঠি পুড়ে গেছে, পুড়িয়ে দিয়েছেন এক নিঃসঙ্গ কবি, এক লাজুক প্রেমিক, বিয়াত্রিচে যাঁর মনের গভীরে, “time to turn back and descend the stair”…। যে সিঁড়ির উপরপ্রান্তে সেই দুটি চোখ। বিয়াত্রিচে না এমিলি হেল?

কী লিখেছেন পোড়োজমি-র কবি তাঁকে? কোন আবেগ উৎসারিত হয়েছে?

এই চিঠির বই আমি পড়তে চাই…। যা পড়া হয়নি এখনও… what might have been হয়ে আছে। ইচ্ছে হয়ে আছে মনের মাঝারে।