স্বাতী ভট্টাচার্য
অরুন্ধতী রায় কীভাবে নিজের ভাষা খুঁজে পেলেন, তা লিখেছেন আত্মজীবনীতে। হিন্দি, ইংরেজি বা মালয়লম ভাষা নয়—
যে ভাষা আমি ব্যবহার করি, ভাষা আমাকে ব্যবহার করে না। যে ভাষা দিয়ে আমার বহুভাষিক বিশ্বকে আমি নিজের কাছে বর্ণনা করতে পারব। আমি জানতাম, তা আপনা-আপনি আমার কাছে আসবে না। শিকার ধরার মতো করে তাকে পেড়ে ফেলতে হবে। তার পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বার করে তাকে খেয়ে ফেলতে হবে। আর জানতাম, যখন তা করত পারব, তখন ভাষা আমার নাড়ির ভিতর দিয়ে রক্তের স্রোতকে সহজ করে আনবে। এই জ্যান্ত ভাষা-পশু রয়েছে বাইরে কোথাও, তার ছিটছিট গা, ঘাসে মুখ, শিকারি-আমির জন্য সে অপেক্ষমান। এই হল আমার জঙ্গলের আইন। এ স্বপ্ন অহিংস, নিরামিশাষী নয়।
ভাষাকে সাধারণত আমরা ভাবি নির্মাণের বস্তু— যা কিছু বাইরে থেকে পাওয়া, আর যা কিছু অন্তর থেকে উঠে আসা, সে-সব মিলিয়ে যা তৈরি হয়, কিছুটা জ্ঞাতসারে, স্বপ্রবৃত্ত চেষ্টায়, আর কিছুটা মনেরও অগোচরে। ভেসে-আসা সুর যেমন মনে থেকে যায়, পরে একদিন মিশে যায় নিজের গানে। অরুন্ধতী বলছেন, ভাষা আপনি আসার জিনিস নয়। তার টুঁটি কামড়ে ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে, তার পুষ্টিকে রক্তধারায় মিশিয়ে তবে নিজের জগতের অর্থ নিজের কাছে নির্মাণ করার উপকরণ খুঁজে পাওয়া যায়। এই ব্যতিক্রমী কল্পনার একটি প্রেক্ষিত রয়েছে বইতে— মধ্যভারতের অরণ্যে একটি ছবির শুটিং করতে গিয়ে অরুন্ধতী দেখে এসেছেন, কীভাবে বন্য কুকুরের দল ঘিরে ফেলেছে কাদায় পড়ে-যাওয়া একটা মোষকে। মোষের আর্তচিৎকার শুনে তাঁর মনে পড়েছে মায়ের কাছে শোনা কিপলিং-এর কবিতা— “দিস ইজ় দ্য আওয়ার অব প্রাইড অ্যান্ড পাওয়ার/ট্যালন অ্যান্ড টুশ অ্যান্ড ক্ল/ও হিয়ার দ্য কল! গুড হান্টিং অল/দ্যাট কিপ দ্য জাঙ্গল ল!” ভাষা পোষ মানে না, ধরা দেয় না, তাকে আয়ত্তের কোনও বেদনাহীন, শান্তশিষ্ট উপায় নেই। এই অনুচ্ছেদকে কেন্দ্রে রেখেও অরুন্ধতী রায়ের মাদার মেরি কামস টু মি বইটি পাঠ সম্ভব।
যদিও পাঠকের চিত্ত জুড়ে বসতে চায় লেখকের জীবনের আখ্যান। অরুন্ধতী রায়ের লেখালেখি, রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে তাঁর সংঘাত, নানা আন্দোলনে তাঁর যোগদান, এগুলি সকলের সামনে থাকলেও, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে তিনি আড়ালেই রেখেছিলেন। এ বই নিয়ে তাই পাঠকমহলে কৌতূহল ছিলই। বইটি অতিশয় সুখপাঠ্য— ঘটনাবহুল, বহু বাঁক-নেওয়া এক জীবন, বিচিত্র সব চরিত্রের সমাগম, গতিময় আখ্যান, কৌতুক-উজ্জ্বল ভাষা। সম্ভবত দ্য গড অব স্মল থিংস-এর পরে লেখকের এই বইটিই সর্বাধিক ভালোবাসা কুড়িয়েছে পাঠকের। তাই তা নিয়ে আলোচনা ছাপা হয়েই চলেছে দেশ-বিদেশের পত্র-পত্রিকায়। সে-সব সমালোচনাকে একত্র করে দেখলে সাহিত্যের কোনও ছাত্রী হয়তো একালের পুস্তক-সমালোচনার উপর একটা গবেষণাপত্র লিখতে পারেন।
অধিকাংশ সমালোচনাতেই কেন্দ্রে এসেছে মা-মেয়ের সম্পর্কটি। ছেলেবেলায় সবার কাছেই নিজের বাবা-মা অতিকায় মানুষ, অপরিসীম তাঁদের শক্তি। লীলা মজুমদার যেমন তাঁর জীবনকথা আর কোনোখানে শুরু করেছিলেন এই বাক্যটি দিয়ে, “পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে নিরাপদ স্থান ছিল আমার মায়ের বাড়িটি।” যে-কোনও ভয় থেকে যিনি রক্ষা করতে পারেন, তিনিই আবার শিশুর কাছে সর্বাধিক ভীতিপ্রদ। মায়ের প্রহার থেকে— তা হাতেরই হোক বা বাক্যের— নিজেকে বাঁচানোর কোনও উপায় খুঁজে পায় না শিশুটি। যত বড় হয় সে, যত সম্পর্ক গড়ে ওঠে বাইরের জগতের সঙ্গে, বাবা-মাকে আর পাঁচজনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার শক্তি যত তৈরি হয়, তত বাবা-মায়ের বিশালত্ব, অ-সাধারণত্বের বোধ কমে আসে। সন্তান প্রশ্ন করতে শুরু করে বাবা-মাকে, শুরু হয় ইচ্ছার প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এই সংঘাত কঠিন হয় যখন শিশু দেখে, তার মা কিংবা বাবা সমাজেও অতিকায়। তাঁর প্রাণশক্তি, কর্মশক্তি, ইচ্ছাশক্তি তাঁর আশেপাশের মানুষকে দাবিয়ে রেখেছে। তেমনই মানুষ অরুন্ধতীর মা মেরি রায়। বিবাহ-বিচ্ছিন্না, বাপের বাড়ি-পরিত্যক্ত মেরি কেরলের একটি ছোট শহরে কেবল নিজের জেদ আর পরিশ্রমের জোরে একটা স্কুল গড়ে তোলেন। অসম্মানের মুখ থেকে ছিনিয়ে আনেন সম্মান। কেবল নিজের জন্য নয়। যে-সময়ে ধর্ষণের, বদনামের, স্বামী-পরিত্যাগের ভয় দেখিয়ে সমাজ নিয়ন্ত্রণ করত মেয়েদের, সে-সময় কোট্টায়ামে মেরির স্কুল বালিকা-কিশোরীদের অভয়ের, আত্মপ্রত্যয়ের আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। মেরির আর একটি অবিস্মরণীয় পদক্ষেপ, সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে ‘ত্রাভাঙ্কোর ক্রিশ্চান সাকসেশন অ্যাক্ট’ খারিজ করা, যা ক্রিশ্চান মেয়েদের পৈতৃক সম্পত্তিতে অধিকার প্রতিষ্ঠান করে। এ-কাজ স্বার্থশূন্য ছিল না— একদিন যে পৈতৃক বাড়ি থেকে তাঁকে উৎখাত করা হয়েছিল, আদালতে জিতে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সেখান থেকে মেরি উৎখাত করেন নিজের ভাই ও তার পরিবারকে।
মেরির আত্মপ্রত্যয়, সাহস, ধৈর্য, ভালবাসা, আর তারই পাশাপাশি ক্রোধ, প্রতিহিংসা, নিষ্ঠুরতা (রাস্তার কুকুরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার অপরাধে অরুন্ধতীর পোষা কুকুরটিকে গুলি করে মেরে ফেলেন মেরি)— সব কিছুই সাধারণের সীমাকে বহুগুণে অতিক্রম করে যায়। মেরি এক ‘অতিশয়ী’ চরিত্র, যেমন দেখা যায় ক্লাসিক সাহিত্যে। তাঁর ইচ্ছা আর অনুভূতির প্রবলতার মোকাবিলা করে বড় হতে হয়েছে অরুন্ধতী আর তাঁর দাদাকে। যে-কোনও মুহূর্তে বাড়ি ভেঙে পড়তে পারে, এই চিন্তা মাথায় নিয়ে বেঁচে থাকার মতোই বালিকা অরুন্ধতী এক অস্থির, ভয়দীর্ণ শৈশব কাটিয়েছেন মায়ের সঙ্গে। উন্মত্ত ঝড়কে বয়ে যেতে দেওয়া ছাড়া উপায় নেই, এই বোধ থেকে রপ্ত করেছেন ভাবলেশহীনতা (এক জায়গায় লিখছেন, ‘নো রিয়্যাকশন’ বিষয়ে তিনি ডবল ডক্টরেট)। ছাত্রীদের কাছে মেরি পরিত্রাতা হয়ে এসেছিলেন, কিন্তু কারণে-অকারণে মায়ের তুমুল তিরস্কার থেকে পরিত্রাণ ছিল না বালিকা অরুন্ধতীর— “আমার পালানোর পথ সব সময়েই ঘুরে ফিরে এসেছে সেখানে, যেখান থেকে আমি পালাতে চাইছি।” পালাবার এই তাগিদ কেবল যে ষোলো বছর বয়সে অরুন্ধতীকে প্রায় কপর্দকহীন অবস্থায় বাড়ি ছাড়ায় বাধ্য করেছিল, তা-ই নয়। তাঁর জীবনের গতিপথ এমনভাবে নির্ধারিত করেছিল যাতে বারবার তিনি ‘নিরাপদ’ বলে বেছে নিয়েছেন এমন পরিস্থিতিকে যা সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ। “Once again, the safest place would become the most dangerous. Because I would make it so. Because I am my mother’s daughter. Because I could not do otherwise.” (আরও একবার সবচাইতে নিরাপদ জায়গা হয়ে উঠবে সবচাইতে বিপজ্জনক। কারণ আমিই তা করে তুলব। কারণ আমি আমার মায়ের মেয়ে। কারণ আর কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না।)
এ-বই পড়তে পড়তে পাঠকের মুখে ফুটে উঠতে পারে একটু মুচকি হাসি। মেরি ব্যতিক্রমী তাঁর দৃঢ়তায়, সংস্কারের প্রত্যয়ে, অরুন্ধতীও ব্যতিক্রমী তাঁর সাহিত্য-প্রতিভায়, ঝুঁকি নেওয়ার সাহসে, নিজের বিশ্বাসের প্রতি নিষ্ঠায়। তবু এই দুজনের জীবনের গল্প শেষ অবধি বড় পরিচিত, গড়পড়তা এক কাহিনি— মায়ের মতো হতে না-চেয়ে মেয়ের জীবনযাত্রা শুরু, আর জীবনের শেষে এসে নিজের মধ্যে মায়ের ছায়া খুঁজে পাওয়া, নতুন করে মায়ের সঙ্গে একাত্মতার বোধ। কারও আগে হয়, কারও হয় পরে, কিন্তু কারই বা না হয়েছে? মেরির চরিত্রে যদি থাকে আতিশয্য, তবে তা আছে অরুন্ধতীর মধ্যেও, প্রচলিত প্রত্যাশা নস্যাৎ করার জেদে, স্পর্ধায়। কলেজ-ছাত্রীবেলায় সামান্য-আলাপের পুরুষের সঙ্গে ঝুপড়িবাস (সে ছেলেটিই লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছে), ছাড়াছাড়ির পর একা দিল্লি ফিরে এসে ছোটখাটো কাজ করে অস্তিত্বরক্ষার লড়াই, বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে প্রেম, গর্ভপাত, বিয়ের পরেও বিচ্ছেদ, সর্বোপরি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রায় যুদ্ধঘোষণা— প্রতিটি পদক্ষেপ ‘ভদ্র সভ্য জীবন’-এর প্রচলিত ধারণা থেকে শতহস্ত দূরে।
বাইরে থেকে মনে হতে পারে, কী দরকার ছিল এত কিছুর? সহজ পথ কি ছিল না? বইয়ে ঢুকলে বোঝা যায়, এ ছাড়া উপায় ছিল না— “আই কুড নট ডু আদারওয়াইজ়।” সুখী সংসারী রমণীর যে খোপ তৈরি করে রেখেছে ভারতীয় সমাজ, অরুন্ধতীর কাছে তা হাস্যকর শুধু নয়, অসহনীয়। বুকার পুরস্কার জেতার পর যখন বিপুল খ্যাতি, প্রচুর টাকা আসে অরুন্ধতীর হাতে, তখন ফের ছটফট করেন তীব্র আত্মসংশয়ে— তা হলে কি এবার সাফল্যের সোনার খাঁচায় বন্দি হতে হল? এর পরেই তাঁর জীবনের মোড় ঘোরে আন্দোলনের দিকে। পাঠকের বোধ হয়, যেন নিজের মায়ের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভ্যাস মেয়েকে ঠেলে দিচ্ছে আরও বড় এক আশ্রয়দাত্রী, অভয়দায়িনীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে প্রবৃত্ত হতে। দেশও তো মা। তার সঙ্গেও আমাদের নিত্য বিরোধ, নিত্য প্রেম।
দেশের ও বিদেশের নানা কাগজে সমালোচকদের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে বইয়ের এমন কয়েকটি দিক। এক, মেরির মতো নারীবাদী মহিলাদের চরিত্রে এই দ্বৈততা প্রায়ই দেখা যায়, জীবনে এবং সাহিত্যে— বাইরে তাঁরা পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেন, কিন্তু সংসারের ভিতরে প্রশ্নহীন আনুগত্য দাবি করেন। তাঁদের সন্তানদের মধ্যেও প্রায়ই কাজ করে দ্বন্দ্ব— মায়ের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ, শ্রদ্ধাসিক্ত ভালোবাসা, আবার সহানুভূতিহীন, নিপীড়ক মায়ের দাগিয়ে দেওয়া ক্ষত নীরবে বহন করার বেদনা। অরুন্ধতী তাঁর পরিণত বয়সেও মায়ের বিরূপ ব্যবহারে বেসামাল হয়েছেন। অথচ, মায়ের প্রতি কর্তব্য না করতে পারার অপরাধবোধও ভুগেছেন। দুই, মায়ের সঙ্গে সংঘাত এক বৃহত্তর সংঘাতের (সমাজের সঙ্গে, রাষ্ট্রের সঙ্গে) প্রস্তুতির জমি তৈরি করে সন্তানের মধ্যে। তিন, প্রাণ দিয়ে ভালোবাসা আর তিলমাত্র সহ্য করতে না-পারা, এই দুই একই সঙ্গে চলতে থাকে সারা জীবন, একটা অপরটাকে বাতিল করে না। এ আমরা অনেকেই অনুভব করেছি। মা-বাবার চাপিয়ে-দেওয়া জীবনলক্ষ্যকে অগ্রাহ্য করে নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার তৃপ্তির পাশাপাশি চিন চিন করে মা-বাবার প্রত্যাশা পূরণ না-করার অপরাধবোধ। অরুন্ধতী যে এই বৈপরীত্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা প্রশংসারই যোগ্য।
অনেকে প্রশংসা করেছেন নিজের জীবনের ‘গোপন’ কথা তুলে ধরতে পারার সাহসকে। বাঙালি পাঠকের কাছে অবশ্য এটা তেমন ব্যতিক্রমী বলে মনে না হওয়ারই কথা। তসলিমা নাসরিনের আমার মেয়েবেলা হয়তো নিজের পরিবার, নিজের অন্তরের নিবিড়তর আখ্যান। অরুন্ধতীর বইটি পড়ার পর ফের তসলিমার বইটি পড়তে গিয়ে মনে হল, তসলিমা কোনওভাবে নিজেকে রেয়াত করেননি। বিশেষ করে শ্রেণি-শোষণের এক তীব্র বোধ তাঁর মধ্যে পাওয়া যায়। দরিদ্র, নিরাশ্রয় মেয়েদের শ্রমশক্তি শোষণ করছে নির্দয় মধ্যবিত্ত পরিবার, বাড়ির বড় মেয়ে তসলিমাও তার শরিক— এ কথা বারবার নিজেও অনুভব করেছেন, পাঠককেও ভুলতে দেননি। যৌনতার বোধের উন্মেষে অরুন্ধতী আনেন যিশু খ্রিস্টের মতো সুদর্শন এক পুরুষকে। এমন ছেলের প্রেমে পড়ে মায়ের বকুনি কোন মেয়ে না খেয়েছে? পাঠকের সহানুভূতি মুহূর্তে আকৃষ্ট হয় অরুন্ধতীর দিকে। তসলিমা সেখানে যৌনতার প্রথম লগ্নে নিয়ে আসেন বয়ঃসন্ধির সমকামিতা— রাত্রে সবাইকে লুকিয়ে নিজের বিছানা ছেড়ে বাড়ির বড় মেয়ে এসে শোয় বাড়ির কাজের মেয়েটির ছেঁড়া মাদুরে, খেলা করে তার শরীর নিয়ে। পাঠক অনুভব করতে বাধ্য শ্রেণিবৈষম্যের দ্যোতনাও— কাজের মেয়েটির অসম্মতি প্রকাশের উপায় নেই, সে কিন্তু খেলতে পারে না মালিকের মেয়ের শরীর নিয়ে। তসলিমা পাঠকের কাছে তারিফ চাননি, সত্যের মুখ দেখাতে চেয়েছেন।
আমরা লক্ষ করি, অরুন্ধতী নানা বিপজ্জনক, বিরূপ পরিস্থিতিতে বহু বছর কাটিয়েও কখনও নিজেকে বেসামাল অবস্থায় দেখাননি, কখনও নির্যাতনের লক্ষ্য বা ‘ভিকটিম’ তিনি নন। একটি মাত্র ঘটনার কথা লিখেছেন, যেখানে রাতে ট্রেন থেকে নেমে বাস ধরে শুটিং স্পটে ফেরার সময়ে কিছু দুর্বৃত্ত এবং জনাকয়েক পুলিশ তাঁকে হয়রান করে। শেষ অবধি বাসগুমটি এবং বাসচালক ও যাত্রীদের সহায়তায় তিনি অক্ষতভাবে গন্তব্যে পৌঁছন, যদিও মানসিকভাবে ধ্বস্ত হয়েছিলেন। হতে পারে তাঁর জীবনে বেসামাল, অসহায় পরিস্থিতি তৈরি হয়নি (তার সম্ভাবনা কতটুকু?)। অথবা, হতে পারে অরুন্ধতী নিজেকে ‘ভিকটিম’ বলে দেখতে চাননি, দেখাতে চাননি। কেমন যেন আন্দাজ হয়, অরুন্ধতী নিজের জীবনে, মননে, পাঠকের প্রবেশকে নিয়ন্ত্রিত করেছেন। তাঁর জীবনের আখ্যান তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তের আখ্যান। সিদ্ধান্তমাত্রই সক্ষমতার প্রকাশ। অরুন্ধতীর জীবনকাহিনিতে তীব্র অনিশ্চয়তার অনেক মুহূর্ত রয়েছে (যখন প্রথম প্রেমিককে ছেড়ে একা গোয়া থেকে ফিরছেন দিল্লি, যখন চার বছর ধরে প্রথম উপন্যাস লিখে টের পাচ্ছেন, সঞ্চিত অর্থের কিছুই আর অবশিষ্ট নেই), কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার গ্লানি, নিজেকে নিয়ে লজ্জিত, কুণ্ঠিত হওয়ার কোনও মুহূর্তের কথা তুলে ধরেননি। তাঁর দ্বিতীয় নভেল, দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস-এর তিলোত্তমা চরিত্রটিও (মাদার মেরি… পড়লে বোঝা যায় সে চরিত্রটি অনেকখানিই অরুন্ধতীর জীবনের কাছাকাছি) এমনই। তাকে ‘অসাধারণ’ করে দেখানোর সব চেষ্টাই লেখক করেছেন— ‘তিলো’-র মাথা কামানো, সে সিগারেট খায়, সৌন্দর্যের গতানুগতিক সংজ্ঞায় পড়ে না তার চেহারা, যদিও অন্তত তিনটি পুরুষ তার প্রতি আসক্ত। অথচ গোটা গল্পে তার মনের নাগাল পাওয়া যায় না— কী সে ভাবছে, তা থেকে যায় অস্বচ্ছ। অনেক সমালোচক লিখেছেন, নিরুত্তর থাকার মধ্যেই রয়েছে তিলোত্তমার স্বাতন্ত্র্য, স্বাধিকার। উপন্যাসের কাহিনি-নির্মাণে, চরিত্র-নির্মাণে এমন একটা কৌশল কোনও লেখক নিতেই পারেন। তবু প্রশ্ন থাকে, বস্তুত জীবনের কতটুকু থাকে আমাদের নিয়ন্ত্রণে, বিশেষত মেয়েদের? প্রতিটি সক্ষমতা অর্জনের পিছনে থাকে অপরের কাছে, নিজের কাছে হেরে যাওয়ার অগণিত ঘটনা। অরুন্ধতীর ধারাবাহিক ‘ডিফায়েন্স’-এর মধ্যে এক ধরনের ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’ রয়েই যায়— নিজের দেহের উপর, জীবনের উপর মেয়েদেরই সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের যে আদর্শে বিশ্বাস করে নারীবাদ, তার চৌখুপ্পির মধ্যেই থাকে অরুন্ধতীর বিদ্রোহ। অরুন্ধতী সচেতনভাবেই অনেক কিছু করেছেন যা সমাজের চোখে ভুল, সন্দেহজনক। কিন্তু তিনি নিজে কি নিজের কোনও কাজকে ভুল বলে মনে করছেন? আফশোস করছেন? তার উত্তর মেলে না। ভাষার উপর তাঁর অসাধারণ দখল, শব্দের প্রয়োগে অভিনবত্ব, লেখার কুশলতা এমনই যে পাঠক সহজেই হয়ে ওঠেন লেখকের ‘গাইডেড ট্যুর’-এর মুগ্ধ পর্যটক। যেটা লেখকের দেখান না, সেটা দেখার মতো বলে মনেই হয় না।
তসলিমা কিন্তু নিজের অক্ষমতাকে রেয়াত করেননি, নিতান্ত বালিকাসত্তার প্রতিও তাঁর আত্মমমতা দেখা যায় না। বালিকাও অন্যায় বোঝে, অন্যায় হতে দেখে নীরব থাকে, নিজেও অন্যায় করে। তসলিমার চরিত্রগুলিতে রাগ, জেদ, লোভের আতিশয্য আছে, কিন্তু কোনও চরিত্র সাধারণের মাত্রা ছাড়িয়ে ‘অতিশয়ী’ হয়ে ওঠেনি। যে মা তাঁর পরম আশ্রয়, তসলিমা আড়াল করেননি তাঁর চরম অপদস্থ হওয়ার দৃশ্যকেও। অপর নারীর প্রতি স্বামীর আসক্তির প্রতিবাদ করে বেদম মার খাচ্ছে মা, বাবার পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হচ্ছে— এমন দৃশ্যের অসহায় দর্শক যে বালিকা, সে-ই বাবাকে কথা দিতে বাধ্য হয় যে বাবার অপূর্ণ স্বপ্ন (সন্তান ডাক্তার হবে) সে পূরণ করবে। বাবার কথা অগ্রাহ্য করার শক্তি তার নেই। স্বামী-প্রত্যাখ্যাত মা সান্ত্বনা খোঁজেন ধর্মে, এক পীরের প্রতি অতিরিক্ত ভক্তিপ্রবণ হয়ে ওঠেন। তসলিমার বিদ্রোহী মন তার বিপরীতে আশ্রয় নেয় বিজ্ঞানের, যুক্তির, সত্যের। এখানেও মায়ের সঙ্গে দ্বন্দ্ব আরও বড় এক দ্বন্দ্বের প্রস্তুতি— যুক্তিহীন, পরধর্ম-বিদ্বেষী, মৌলবাদের সঙ্গে আজীবন লড়াই। এখানেও মুক্তি পাওয়ার ইচ্ছা আর ভালোবাসায় বাঁধা থাকার ইচ্ছে, দুইয়ের দ্বন্দ্বমূলক সহাবস্থান। আমার মেয়েবেলা তসলিমা উৎসর্গ করেছেন, “আমার মা বেগম ঈদুল ওয়ারাকে”।
আমরা দেখি, নিপীড়ক বাবার বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে বালিকা তসলিমা ভাষার শক্তি আবিষ্কার করছেন, তাকে ব্যবহার করতে শিখছেন। বাবার চাপে নতুন ইস্কুলে ভর্তির পরীক্ষায় বসে হয় তসলিমাকে। কোনও প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বিদ্রোহী বালিকা খাতাজুড়ে লিখে আসে একটি রচনা, যেন তাকে ভর্তি না করে নতুন স্কুল। “…লিখতে লিখতে লক্ষ করি ইংরেজি ভাষাটি কড়া কথা বলার জন্য, রাগ করার জন্য, গাল দেবার জন্য বেশ চমৎকার। ঝড়ের মত আবেগ নামে বাংলায়, মায়ামমতা বুকের দরজা খুলে হুড়মুড় বেরিয়ে আসে বাংলায়, তাই ভাষাটিকে অন্তত সেদিনের জন্য এড়িয়ে চলি।” সে-দিনের বালিকা ক্রমে মাতৃভাষা-আন্দোলিত আবেগের প্রাবল্যকে কবলে এনে তৈরি করেছিল শাণিত গদ্যের ভাষা। প্রস্তর যুগে যেমন পাথর ঘষে তীক্ষ্ণ করে যুদ্ধের অস্ত্র তৈরি করত মানুষ, তেমনই চারপাশে ছড়িয়ে থাকা শব্দরাশি থেকে লেখককে তৈরি করতে হয় নিজের উপযুক্ত যুদ্ধাস্ত্র। যা অপরকে বিদ্ধ করে, আবার নিজের অন্তরকেও ভেদ করে, পাঠককে আহ্বান করে নাড়ির রক্তধারায় হাত রাখতে। কত গভীরে বিঁধতে পারে ভাষা, শেষ অবধি তা-ই হল সাহিত্যের পরীক্ষা।

