Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

স্মৃতি স্বপ্ন আর অন্তর্গত সময়ের চিত্রকর তারকোভস্কি

শৈলেন সরকার

 


তারকোভস্কির সিনেমায় প্রতি দৃশ্যে আমরা ফ্রেমে আবদ্ধ কিছু ছবি দেখি, কিছু শব্দ শুনি কিন্তু একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে দেখা সেই ছবি ও শব্দের সমাহার আমাদের দেশকালের বেড়া ভেঙে অনেক অনেক দূর যেন বা অনন্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়

 

 

আশির দশকের শেষ কিংবা নব্বইয়ের শুরুর দিক হবে, দূরদর্শনে রাত দশটা নাগাদ, সপ্তাহে একদিন ‘লেট নাইট মুভিজ’ বলে এক অনুষ্ঠান হত। তাতে কুরোসাওয়া, ফেলেনি বা জন ফোর্ডের মতো পরিচালকদের সিনেমাও দেখানো হত। সেই অনুষ্ঠানে নাম না-জানা এক পরিচালকের এক সিনেমা দেখতে শুরু করেই একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। বলা যেতে পারে শুরুর দৃশ্যটাই আমাকে কোন সুদূর শৈশবে হারিয়ে যাওয়া এক স্বপ্নের জগতে নিয়ে গেল। যেন খুব চেনা, কোথায় দেখেছি, যেন ছুঁতে গিয়েও পারছি না। যেন এক কুয়াশার মেঘ আমাকে ডুবিয়ে দিচ্ছে।

আমার ঘরে তখনও টিভি নেই। অন্য এক বন্ধুর বাড়িতে বসে সিনেমাটা দেখে রাত বারোটার পর যখন ফাঁকা রাস্তায় ঘরে ফিরছি, আজ এতগুলি বছর পরেও আমার তখনকার আচ্ছন্ন অবস্থা মনে করতে পারছি। এর অনেক বছর পার করেও সেই সিনেমার একটি দৃশ্য বারবার অনেকটা স্বপ্নের মতোই এসে হাজির হত। ঠিক করে বললে, সেই প্রথম দৃশ্যটি। পাহাড়িয়া জমি থেকে নেমে যাওয়া ঢালুপথ। দিন নয়, রাতই। আকাশে না-দেখতে পাওয়া চাঁদ। আকাশ থেকে ছড়িয়ে পড়া আলোয় দূরে দুপাশে জঙ্গলের ফাঁক দিয়ে দেখতে পাওয়া নদী একটি। নদীর ওপারে ফের জঙ্গল, জঙ্গল ছাড়িয়ে আকাশ। আর এপারে পাহাড়ে জমি থেকে নেমে যাওয়া ঢালের প্রান্তে জঙ্গলের একদিক থেকে আরেক দিকে ভেসে যেতে থাকা কুয়াশার নিচে বাঁদিকে জঙ্গলের গা ঘেঁষে দাঁড়ানো একটি একাকী সাদা ঘোড়া। বা ঠিক করে বললে কুয়াশায় আচ্ছন্ন একাকী এক সাদা ঘোড়া। এবার খুব অস্পষ্ট হয়ে জেগে উঠছে করুণ বিলাপের মতো এক সঙ্গীত। আর সেই বিলাপের ক্রমে স্পষ্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই পাহাড়ে জমি থেকে ঢালের সেই ভেসে যেতে থাকা কুয়াশায় আচ্ছন্ন ঘোড়াটির দিকে আমাদের দিকে পেছন ফিরে নেমে যেতে থাকে তিন মহিলা, এক শিশু আর একটি কুকুর। এবার যেন স্পষ্ট ক্রন্দনধ্বনি। আর তার মধ্যেই বাখ-এর গভীর ও গম্ভীর এক সাঙ্গীতিক মূর্ছনা জেগে ওঠে আর সেই তিন মহিলার দুজন আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়ান, শিশুটি আমাদের দিকে শেষ পর্যন্ত পেছন ফিরে দাঁড়ানো এক মহিলার আড়ালে চলে যায়, কুকুরটিও আমাদের দিকে পিছু ফিরেই বসে থাকে। এই দৃশ্যাবলি ও সাঙ্গীতিক মুর্ছনার মধ্যেই সিনেমার টাইটেল গড়িয়ে যায়। যেতে থাকে। হ্যাঁ, এই প্রথম দৃশ্যটি আমাকে দীর্ঘদিন স্বপ্নের মধ্যে তাড়া করেছে। বছরের পর বছর। এরপর এল প্রযুক্তি বিপ্লব, এল কম্পিউটার, এল ইন্টারনেট। এল টোরেন্ট (Torrent)। এই টোরেন্টের কল্যাণে সিনেমা নামাতে গিয়ে সাইট অ্যান্ড সাউন্ডের লিস্টে নাম পেলাম এক পরিচালকের, আন্দ্রেই তারকোভস্কি। পেলাম আমার সেই বহুদিন ধরে লালিত স্বপ্নদৃশ্যটি। সিনেমা নস্টালজিয়া

নস্টালজিয়া, ১৯৮৩

 

এখন এই নস্টালজিয়া সিনেমাটি ১৯৮৩ সালের। সাধারণ দর্শকদের কাছে তারকোভস্কির আবির্ভাব ঘটে গিয়েছে কিন্তু সেই ১৯৬২ সালে, ইভান’স চাইল্ডহুড সিনেমার মাধ্যমে। তারপর ১৯৬৬ সালে আন্দ্রেই রুবলেভ, সোলারিস ১৯৭২ সালে, এরপর ১৯৭৫ সালে মিরর এবং ১৯৭৯ সালে স্টকার। তারকোভস্কির শেষ সিনেমা দ্য স্যাক্রিফাইস ১৯৮৬ সালে। এখন এই স্টকার-এর জন্য অনেক গল্প আছে, তার আগে তারকোভস্কির শুরুর আগের শুরুর কথা জানা যাক।

১৯৩২ সালের ৪ এপ্রিল বর্তমান রাশিয়ার আইভানাভো অবলাস্ট ফেডারেল জেলায় ঝাভরাঝিয়ে গ্রাম্য এলাকায় তাঁর জন্ম। বাবা ছিলেন কবি ও অনুবাদক আর্সেনি আলেক্সান্দ্রোভিচ তারকোভস্কি। বাবা ছিলেন কিন্তু ইউক্রেনীয়। মা রাশিয়ান। জন্ম মস্কোয়। মারিয়া ইভানোভা ভিশনিয়াকোভা। মস্কোর ‘ম্যাক্সিম গোর্কি লিটারেচার ইন্সটিটিউট’-এর গ্রাজুয়েট। পরে প্রুফ দেখার কাজ করতেন এখানে। প্রসঙ্গত তারকোভস্কির মিরর সিনেমায় প্রধান চরিত্র আন্দ্রে-র মা এসেছেন একেবারে প্রুফরিডারের ভূমিকাতেই।

পাঁচ বছর বয়সে তারকোভস্কি মস্কোর ৫৫৪ নম্বর স্কুলে ভর্তি হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য গোটা পরিবার চলে যায় ইয়রেভেটস-এ তারকোভস্কির মামাবাড়ি। ১৯৪৩ সালে পরিবারশুদ্ধ ফের চলে আসেন মস্কোয়, এসে তাঁর পুরনো স্কুলেই পড়া শুরু করেন। এখানে পরবর্তীকালে বিখ্যাত কবি আন্দ্রেই ভজনেসেন্সকি তাঁর সহপাঠী ছিলেন। মস্কোয় এক সঙ্গীত-স্কুলে তিনি পিয়ানোর পাঠ নেন, শিল্পকলার পাঠ নেন এক আর্ট স্কুলে। ১৯৪৭ সালের শেষদিকে তাঁর টিবি ধরা পরে ও এই ১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালের বসন্তকাল পর্যন্ত তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। স্কুল বা কলেজে তিনি কিন্তু শান্তশিষ্ট মেধাবী ছাত্র ছিলেন না মোটেই। তাও কোনও মতে গ্রাজুয়েট হয়েছিলন। ১৯৫১-৫২ সালে মস্কোর ওরিয়েন্টল ইন্সটিটিউটে তিনি আরবি ভাষাশিক্ষার জন্য ভর্তি হয়ে মাঝপথেই কলেজ ছেড়ে দেন। এবং চাকরি নেন অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স ইন্সটিটিউটে। তুরখানস্কের কুরেকা নদীতে এক বছরের জন্য বিশেষ ধাতুর খনির অন্বেষণে অভিযনধর্মী গবেষণায় অংশ নেন এবং এই সময়েই তিনি যে সিনেমা নিয়ে কাজ করবেন তা ঠিক করেন।

প্রশ্ন উঠতে পারে তাঁর জীবন নিয়ে এত কথার দরকারটা কী? দরকার তো তার সিনেমার কথার। হ্যাঁ, দরকার আছে। বিশেষ করে তারকোভস্কির বেলায়। কেননা তাঁর জীবনের সেরা দুটি সিনেমাই ভয়ঙ্করভাবে আত্মজীবনীমূলক। নস্টালজিয়ামিরর। এবং আমি বলব, এক অর্থে স্টকার-ও। যেমন ধরা যাক তাঁর মিরর সিনেমাটি। যেখানে তাঁর নিজের অসুস্থতার ‘গল্প’টি বাদ দিলে প্রতিটি শটই বলতে গেলে তাঁর নিজের জীবনের এক-একটি মুহূর্তের স্থিরচিত্র, আর সিনেমায় নায়কের ওই অসুস্থতার গল্প প্রসঙ্গে তারকোভস্কি তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই Sculpting in Time-এ লিখেছেন,

…the only invented episode turns out to be a necessary prerequisite for other, completely true recollections.

যাক, মিরর বা নস্টালজিয়া-র কথা পরে আসছে, দেখা যাক তাঁর সিনেমাজীবনের শুরুর দিকটা কেমন।

১৯৫৪ সালে তিনি সোভিয়েতের স্টেট ইন্সটিটিউট অব সিনেমাটোগ্রাফি-তে (VGIK) ভর্তি হন। এখানে তিনি সহপাঠী হিসেবে পান ইরমা রশ বা ইরিনাকে, তারকোভস্কি পরবর্তিকালে যার সঙ্গে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং ইরিনা তাঁর প্রতিটি সিনেমায় কোনও-না-কোনওভাবে যুক্ত থাকেন। VGIK-তে ছাত্রাবস্থায় ১৯৫৯ সালে তিনি তৈরি করেন তাঁর প্রথম সিনেমা আর্নেস্ট হেমিংওয়ের গল্প অবলম্বনে দ্য কিলার। ১৯৬০ সালে গ্রাজুয়েশান প্রজেক্টের জন্য তৈরি করেন দ্য স্টিমরোলার অ্যান্ড দ্য ভায়োলিন, সিনেমাটি শুধু ইন্সটিটিউটেই সেরা পুরস্কার পায় তা নয়, ১৯৬১ সালে নিউ ইয়র্কে ছাত্র সিনেমা-নির্মাতাদের দ্বারা তৈরি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সিনেমা হিসেবেও পুরস্কৃত হয়।

দ্য স্টিমরোলার অ্যান্ড দ্য ভায়োলিন, ১৯৬০

 

১৯৬২ সালে তাঁর বয়স যখন মাত্র ত্রিশ, তাঁর প্রথম ফিচার ফিল্ম ইভান’স চাইল্ডহুড ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল-এ গোল্ডেন লায়ন পুরস্কারে ভূষিত হয়। না, ইভান’স চাইল্ডহুড তারকোভস্কির সেরা সিনেমা নয়, আমার মতে তো নয়ই। আমি চিত্রসমালোচক নই, কথাগুলি বলছি সাধারণ এক লেখক ও দর্শক হিসেবে। প্রসঙ্গত আমাদের বাংলার ঋত্বিক ঘটক কিন্তু তারকোভস্কির এই ইভান’স চাইল্ডহুড দেখেই তাঁর পরিচিতজনেদের কাছে তারকোভস্কির কথা জানিয়েছিলেন।

ইভান’স চাইল্ডহুড-এর শুরুর একেবারে নাম দেখানোর মুহূর্ত থেকে কুউউ-কুউউ, কুউউ-কুউউ করে পাখি ডাকছে একটা। এক গ্রাম্য সাধারণ বাঁশির সুর একেবারে নিচু থেকে ধীরে জেগে উঠছে। এবার সাদা-কালোয় আমাদের ইউক্যালিপটাস-জাতীয় গাছের ডালপালার (গাছের নামে আমার ভুলও হতে পারে) গায়ে বেশ বড়সড় মাকড়সার জাল, আর সেই জালের গায়ে মুখ রেখে দাঁড়ানো বছর নয়-দশের একেবারে আমাদের অপুর মতো দেখতে একটি ছেলে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে মাকড়সার জাল দেখতে এসে ওর না-দেখা কোনও জায়গা থেকে ডেকে ওঠা পাখির এই ডাক তাকে অবাক করেছে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে পাখিটিকে সে খোঁজার চেষ্টা করছে। শুধুমাত্র একটি আমরা যাকে বলি হাফ-প্যান্ট ও খালি গায়ের ছেলেটি এবার গাছের গা থেকে সরে গেলে বুঝি এটি একটি পাহাড়ি অঞ্চল, ছেলেটি এবার পাহাড়ের গা বেয়ে নামছে নিচের দিকে। আমরা ছেলেটিকে এবার দূর থেকে পাহাড়ি পথে ঘুরে ঘুরে নামতে দেখি। নিচে অস্পষ্ট সমভূমি। বাঁশির সুর এখন অনেক স্পষ্ট। পাহাড়-জঙ্গল হয়ে সমভূমিতে ভেসে যাচ্ছে। দূরে এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া নদী দেখা যাচ্ছে একটি। একটি ছাগলের তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকা মুখ দেখে যেন মজা পেল ছেলেটি। এবার একটু জোর বাড়াল তাঁর দৌড়ে। সেই পাখিটিকে সে খুঁজছে। এক প্রজাপতি উড়ছে তার গায়ে গায়ে, তার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে দু-পাশের ঝোপ-জঙ্গল বা নুয়ে থাকা গাছের ডালপালা। তার মজা লাগছে খুব। সে হেসেই যাচ্ছে। এই হাসি কেন সে জানে না। এবার আমরা তার হাসিমুখকে পেছনের উদার আকাশের প্রেক্ষাপটে দেখছি, সে হাসছে আর হাসছে। অনেকটা নিচে এসে পড়েছে সে। নিচের রাস্তায় চোখ পড়ল, মা, জলের বালতি হাতে যাচ্ছে, অস্পষ্ট। সে নামছে, ছুটছে। হঠাৎ আবার সেই পাখির ডাক। থামল সে। জঙ্গলের পাতার ঝোপ-ঝাড়ের ফাঁক দিয়ে আকাশ থেকে নেমে আসা আলোর জাল, যেন জমাট বাঁধা আলো। সে হেসেই যাচ্ছে। ঘাড় ফিরিয়ে সে এবার স্পষ্ট মাকে দেখতে পাচ্ছে। একছুটে মায়ের কাছে গিয়ে মায়ের হাতের বালতিতে মুখ দিয়ে জলপান করতে শুরু করল। এবার মাথা তুলে দেখল মাকে। মা হাসছে সন্তানের দিকে তাকিয়ে। ছেলেটি বলে উঠল, ‘Mama, there’s a cuckoo.’ মায়ের মুখে আচমকা ত্রাস, আর ছেলেটি মুহূর্তেই নিজেকে এক সামরিক ক্যাম্পে আবিষ্কার করে। স্বপ্ন ভাঙে। এই যে পাখির ডাক, মা এবং স্বপ্ন— তারকোভস্কির সিনেমায় বারবার এসেছে। এসেছে পাখির ডাকও। তঁর প্রায় প্রতি সিনেমার প্রথম দৃশ্য সবসময় এক আলাদা গুরুত্ব নিয়ে এসেছে। যেন সিনেমা শুরুর আগে প্রোলোগ। ইভান’স চাইল্ডহুড-এর স্বপ্নদৃশ্য যেমন, তেমনি স্টকার সিনেমা বা নস্টালজিয়া এমনকী আন্দ্রেই রুভলেভ বা সোলারিস-এও।

ইভান’স চাইল্ডহুড, ১৯৬২

 

সোলারিস-এর প্রথম দৃশ্যে আমরা দেখি গড়িয়ে যাচ্ছে স্বচ্ছ জল, আমরা দেখি জলের নিচে ডুবে থাকা কম্পনশীল সবুজ শ্যাওলা, জলের মাথায় ভেসে যাচ্ছে মৃত পাতা একটা-দুটো, দাঁড়িয়ে থাকা কিছু ঘাস, এরপর জলের নিচে মাটি। এরপর আমরা গল্পের নায়ক ক্রিসকে ক্রমে আমাদের দিকে বলতে গেলে শূন্য দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। এরপর আবার জলের নিচে দুলতে থাকা ঘাস, কিন্তু এবার তাদের অভিমুখ বিপরীত দিকে। এরপর আমরা মাটির ওপর থাকা কিছু ঝোপঝাড় দেখি আর আমাদের গল্পের নায়ক সেই সব ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে কোথাও হেঁটে যাচ্ছে। দূরে কুয়াশা। এবার সেই কুয়াশায় সে কিছু দূরত্ব রেখে গাছপালা ভরা রাস্তায় হেঁটে এক পুকুরের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। পুকুর যেন পরিত্যক্ত, জলে ভাসমান পচা পাতা। জলের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া কুয়াশা। দূরে একটি দোতলা বাড়ি দেখা গেল। এবার একটি বাদামি রঙের ঘোড়া তাঁর সামনে দিয়ে এসে ফের ফিরে চলে গেলে, ক্রিস সেই পুকুরের জলের নোংরা আস্তরণ সরিয়ে জল নিয়ে নিজের হাতমুখ ধোয়। শুরু থেকে সাত মিনিটের মাথায় এই প্রথম শব্দ শোনা গেল কিছুর। তার জলে হাত ধোওয়ার। এখানে একটি কথা, এই প্রথম যে শব্দ শোনা গেল তা ক্রিসের জল দিয়ে হাত-মুখ ধোওয়ার, তাই বলে কি এতক্ষণ কোনও শব্দ ছিল না। ছিল। ছিল প্রকৃতির এক অনুচ্চারিত সঙ্গীত। গড়িয়ে যাওয়া জলের, জলের নিচে কাঁপতে থাকা ঘাসের, ভেসে যেতে থাকা পাতার। এই অনুচ্চারিত সঙ্গীত প্রসঙ্গে তারকোভস্কির বেশিরভাগ সিনেমার সঙ্গীত পরিচালক এডুয়ার্ড আর্তিমিয়েভ তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন,

He didn’t want any music in the scene, only sounds of birds, dogs barking, indistinct voices, all kinds of things that we generally hear around us and also and especially the sound of bells— very quiet in the background. I also included the far-off singing of a Russian folk-choir, just one line— vaguely registering in our consciousness, nothing concrete, it came and disappeared. And the sudden cry of a bird.

আর্তিমিয়েভ তাঁর সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তারকোভস্কি তাকে বলেছিলেন,

…my dream is to make a film without music.

সোলারিস, ১৯৭২

 

ইভান’স চাইল্ডহুড বা সোলারিস-এর মতো এমনি প্রোলোগ-জাতীয় প্রথম দৃশ্য আছে মিরর, স্টকার কিংবা নস্টালজিয়া-তেও। সে-দৃশ্য যেন দর্শককে গোটা সিনেমার এক পূর্বাভাসও দেয়। যেমন স্টকার-এর সেই প্রথম দৃশ্যের পানশালা। কাঠের মেঝে, দেওয়াল, ছাদও। সিপিয়ায় কেমন অদ্ভুত এক প্রাচীনতা। তার মধ্যে মেঝে বা দেওয়ালে আলো কোথাও পড়েছে আবার কোথাও পড়েনি। আর্তিমিয়েভ-এর সঙ্গীতে প্রথম মুহূর্ত থেকেই এক দীর্ঘ কিন্তু অজানা যাত্রার ক্লান্তির ছাপ। কেমন রহস্যময়তা। শুরুতে শুধুই পানশালার মালিক। সে আলো জ্বালায় কিন্তু সেই আলো অন্ধকার না কাটিয়ে যেন পানশালাটিকে আরও রহস্যময় করে তোলে। প্রথমে আসে প্রোফেসর। একা থাকাকালীন প্রোফেসরের মনে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত এক বিজ্ঞানীর কথা মনে পড়ে। তার মতে এটা এক উল্কাপিণ্ড অথবা ভিনগ্রহীদের কাণ্ড। সে যাই হোক সেই বিজ্ঞানীর মতে আমাদের ছোট্ট দেশে বেশ এক আশ্চর্যজনক ঘটনাই ঘটেছে। জায়গাটার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জোন’, সেখানে দেশের কিছু সৈন্যকে পাঠানো হয়েছিল, তারা আর ফেরেনি। এবার জায়গাটিকে পুলিশ দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে, তার মতে এটা ঠিক কাজই হয়েছে। এখনও কিন্তু স্টকার আসেনি। এবার প্রথম আমরা স্টকারকে দেখি। বিছানায় তার প্রতিবন্ধী মেয়ে মাঙ্কি ও স্ত্রীর পাশে শুয়ে, এবং এখানে টানা এক দ্রুতগামী ট্রেনের শব্দ হতে থাকে। ক্যামেরা স্টকারের মুখ থেকে ওর মেয়ে ও ঘুমন্ত স্ত্রীর ওপর সরে যেতে থাকলে ট্রেনের গতি যেন আরও বাড়ে। স্টকার চুপিসারে তার মেয়ে ও স্ত্রীকে না-বুঝতে দিয়ে বিছনা ছেড়ে উঠছে। সে যতই বুঝতে না দেওয়ার চেষ্টা করুক, স্ত্রী কিন্তু চোখ মেলেছে। স্টকারে স্ত্রী স্টকারকে ধরে রান্নাঘরে। এত কথা বলার কারণ, স্ত্রী স্টকারকে প্রথম যে প্রশ্নটি করে তা হল, ‘Why did you take my watch?’ তুমি কোথায় যাচ্ছ, উত্তর দাও। তুমি কথা দিয়েছিলে আমি বিশ্বাস করেছিলাম, ঠিক আছে আমার কথা ভাবলে না, মেয়ের কথা তো ভাববে। সে তোমাকে মাত্র পেতে শুরু করেছে, আর এর মধ্যেই তুমি আবার শুরু করলে? তুমি আমাকে বুড়ি করে দিলে, আমার জীবন ধ্বংস করে দিলে তুমি। আমি তোমার জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করতে পারব না, মরে যাব। ‘my watch’ বলতে এখানে আমার সময়— আমার জীবন থেকে সময় ছিনিয়ে নিয়েছ তুমি। স্ত্রী বলে, তুমি কথা দিয়েছিলে স্বাভাবিক জীবন শুরু করবে। উত্তরে স্টকার জানায়, আমি শিগ্রি ফিরে আসছি। এবার স্ত্রী বলে, তুমি ফিরবে, তবে ফিরবে জেলে। এবার তুমি পাঁচ নয়, দশ বছরের জেল খাটবে। এই দশ বছরে না তুমি ‘জোন’ পাবে না তুমি অন্য কিছু—। আর এর মধ্যে আমি মরে যাব। উত্তরে স্টকার জানায়, ‘Oh God, for me, it’s prison everywhere.’ প্রসঙ্গত স্টকারই পিতৃভূমি রাশিয়াতে তারকোভস্কির শেষ সিনেমা। তারকোভস্কি তাঁর Sculpting in Time-এ লিখেছেন ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ সালের মধ্যে তিনি প্রায়ই জেলের স্বপ্ন দেখতেন। স্বপ্ন দেখতেন, তিনি জেলে ঢুকছেন, বেরিয়ে আসছেন, ফের ঢুকতে চাইতেন। ১৯৮৪ সালে লেখা তাঁর Sculpting in Time-এ তিনি লিখেছেন,

At last, to my joy, I saw the entrance to the prison, which I recognized by the bas-relief emblem of the USSR. I was worried about how I was going to be received, but that was as nothing compared with the horror of being out of prison.

স্টকার সিনেমাটিকে সেই সময়ের এক ফ্যান্টাসি বলাই যায়।

স্টকার, ১৯৭৯

 

তাহলে আগে একটু স্টকার সিনেমার ‘জোন’-এর কথা বলে নেওয়া যাক। ‘জোন’-এ কারা যেতে পারত? যারা একমাত্র একটি বলতে গেলে ‘never-ending’ টানেল পার হতে পারত, তারাই। কী ছিল সেই টানেলে? ছিল এক অদৃশ্য ‘grinder’ বা চূর্ণনকারী যন্ত্র (এখানে তখনকার সোভিয়েত রাশিয়ার কঠোর ব্যুরোক্রাটিক শাসনের প্রতি ইঙ্গিত একেবারে স্পষ্ট)। ওখানে ঢুকতে পারলে যার যার ‘innermost desire’ পূর্ণ হবে। মজার কথা হল, তারকোভস্কি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘that the Zone (supposedly) did not exist and was merely the Stalker’s invention.’ কিন্তু সেই প্রোফেসর বা রাইটার বা আমাদের স্টকার নিজেও জানে না তাঁর বা তাদের প্রত্যেকের ‘deepest desire’ কী?

সেই ‘জোন’-এর একেবারে কাছে পৌঁছেও তারা তিনজন কোনও বিষয়েই একমত হতে পারে না। স্টকারের মতে এটা ‘the quietest place in the world’, আবার প্রোফেসরের মতে ‘smells like a bog’। সেখানে পৌঁছে প্রোফেসরের মনে হল, এখানে আসার কোনও মানেই ছিল না। একবার ভাবল বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু স্টকারের কথায় কেউ কেউ হয়তো এখানে কিছু আছে ভেবে আসতে চাইতে পারে। আর ওই ভাঙাচোড়া নোংরা আবর্জনায় পূর্ণ ভয়াবহ নির্জনতায় হঠাৎ করেই কোথাও ‘ক্রি-রি-রিং, ক্রি-রি-রিং’ শব্দে ল্যান্ডফোন ফোন বেজে ওঠে কোথাও, বেজে যেতে থাকে। এই নির্জনতায় হঠাৎ করে খুবই তাৎপর্যপূর্ণভাবে এক বিষ্ময়কর ফোন বেজে ওঠা আছে মিরর সিনেমাতেও, এবং একাধিকবার। যেখানে প্রধান চরিত্র লেখক আঁন্দ্রে তার শৈশবে একদিন এক ভোরে স্বপ্নে এক পাখির ডাক শুনে মনে করে ওর বাবা এসেছে। সে তখন একেবারে শিশু। আর বিছানা ছেড়ে নেমে জানালা দিয়ে দেখে বাতাসে বাগানের গাছগুলি আন্দোলিত হচ্ছে খুব, আর পাশের ঘরে শব্দ যেন কীসের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখে তার মায়ের চুল ধুইয়ে দিচ্ছে তার বাবা। এখানে সেই ঘরের ছাদ থেকে শুরু করে ঘরের দেওয়াল সব খসে খসে পড়ছে। জল ঝরছে ছাদ বেয়ে। সঙ্গে আগুনের শিখা নিচে কোথাও। তার মা হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে এক আয়নার সামনে দাঁড়ায় আর আবিষ্কার করে সে বুড়ি হয়ে গেছে। তার অপরূপ সুন্দরী মায়ের মুখের চামড়া কুঁচকে গিয়েছে, মাথার চুল প্রায় নেই, যা আছে সাদা। স্বপ্নের এই সিপিয়া রঙিন দৃশ্যে শব্দ বলতে শুধুই ফোঁটায় ফোঁটায় জলের পতন আর একটা-দুটো অজ্ঞাত কোনও পাখির শিস। এর পরপরই রং— এবার লাল-নীল-সবুজে স্বাভাবিক প্রকৃতি। ঠিক এমনি সময় গভীর নির্জনতায় রি-রিং, রি-রিং- শব্দে এক টেলিফোন বেজে ওঠে। লেখকের বৃদ্ধা মা। জিজ্ঞেস করেন,

—Alexi?
—Hello, ma!
—What’s wrong with your voice?
—Nothing serious. I guess it’s just a sore throat.
—I have not spoke to anyone for three days. I even liked it. I think it’s good to keep silent for a while. Word can’t express everything a person feels. Words are flaccid. I just dreamt you in sleep as though I was still a child.

মিরর, ১৯৭৫

 

বা নস্টালজিয়া-তেও। এখানে রাশিয়া থেকে ইতালিতে আসা কবি আন্দ্রেই রাশিয়া থেকে সেই সপ্তদশ শতকে ইতালিতে চলে এসে আর দেশে ফিরতে পারেনি এমনি এক সঙ্গীতজ্ঞ সসনোভস্কির জীবন নিয়ে অনুসন্ধান করতে এসে ডমিনিকো নামের এক খ্যাপাটে ব্যক্তির খোঁজ পায়। সসনোভস্কি নামের সেই সঙ্গীতজ্ঞ এক রুশ ক্রীতদাসীকে ভালোবেসে দেশে ফিরে তার জন্যই আত্মহত্যা করেন। সসনোভস্কি-র দেশে ফেরার প্রবল ইচ্ছে আর না-ফেরার ইচ্ছে দুইই ছিল সমান। একেবারে তারকোভস্কির মতোই, এই নস্টালজিয়া সিনেমাটি তিনি তৈরি করেন ইতালিতে। স্টকার-ই ছিল রাশিয়াতে তৈরি করা তাঁর শেষ সিনেমা। এই নস্টালজিয়া সিনেমা তৈরির সময় তিনি বলেন, ‘I can no longer live in Russia, but I can’t live anywhere either.’ আন্দ্রেই তার ইতালিয়ান সহায়ক ও ইন্টারপ্রেটারের কাছ থেকে শোনে এই ডমিনিকো নিজের পরিবারের সবার ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথা ভেবে সবাইকে সাত বছর নিজের ঘরে বন্দি অবস্থায় আটকে রেখেছিল। অপূর্ব সুন্দরী তার সঙ্গী ইতালিয়ান অনুবাদক ইউজেনিয়া আন্দ্রেইকে ভালোবাসে, তার শারীরিক সঙ্গ চায়। কিন্তু আন্দ্রেই দেশে তার স্ত্রী ও সন্তান রেখে এসেছে, এছাড়া আমাদের এই ইতালিয়ান দোভাষী তার শারীরিক সম্পর্ক চাইলে আন্দ্রেইয়ের নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে। তার শৈশবের সেই বাড়ি, কুয়াশা, আচ্ছন্ন ঘোড়া, কুকুর। সে স্বপ্ন দেখে তার মা গর্ভাবস্থায় আর তাকে ‘আন্দ্রেই’ বলে ডাকছে। স্বপ্নের ঘোর কাটলে সে কামনায় আকুল ইউজেনিয়াকে বলে, ‘You are prettier in this light,’ মেয়েটি বলে, ‘You think so.’ আন্দ্রেই এবার বলে, ‘I am beginning to understand…’, মেয়েটি খুবই আগ্রহ নিয়ে জানতে চায়, ‘What?’ আন্দ্রেই এবার বলে, ‘Why do you think he (Dominiko) locked up his family for seven years.’ মেয়েটির মুখে আর কথা নেই কোনও। হোটেলের ফাঁকা করিডরে দুজনই নির্বাক। সময় যেন থেমে থাকে এখানে আর ঠিক তক্ষুনি অসীম সেই নির্জনতা ভেঙে কোথাও এক ল্যান্ডফোনের অবিরাম ‘ক্রি-ই-ইং, ক্রি-ই-ইং’।

আসলে তারকোভস্কির কোনও সিনেমাতেই একরৈখিক গল্প নেই কোনও। ছাড়া-ছাড়া যেন আলাদা আলাদা বিভিন্ন কাহিনি। এখানে বেশ উল্লেখ করার মতো একটি কথা। স্টকার-এ আমাদের প্রোফেসর আর রাইটারের সঙ্গে সেই শুঁড়িখানায় কথা চলছে যখন, তখন হঠাৎ করেই পাখি ডেকে উঠে একটা আর আমাদের স্টকার বলে ওঠে, ওই যে আমাদের ট্রেন এসে গেছে। অথচ ওদের গোটা যাত্রাপথে ট্রেনের কোনও চিহ্নও ছিল না। ভাঙা জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত জল ও জঙ্গলে আকীর্ণ পথে এক পুরনো জিপ আর ট্রলিতে প্রাণ হাতে নিয়ে যাত্রা। কিন্তু সিপিয়া রং-এর ব্যবহার আর আর্তিনিয়েভের সঙ্গীতে বীভৎস নোংরা ও কর্দমাক্ত পথের আবহ এক অদ্ভুত জগতের কথা বলে যেতে থাকে। অবশ্যই আর্তিমিয়েভ যেন এই স্টকার-এই জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ করে গিয়েছেন।

এডুয়ার্ড আর্তিমিয়েভ

 

এই ফাঁকে আর একবার সোলারিস সিনেমাটির কথা বলতে হয়। মহাকাশে একটি আশ্চর্য প্লাজমার সাগর পাওয়া গিয়েছে। এই ব্যাপারে গবেষণার জন্য মহাকাশ স্টেশন সোলারিসকে পাঠানো হয়েছে। যেখানে পঁচাশিজনের জায়গা ছিল সেখানে আছে মাত্র তিনজন। ওখানে খুবই আশ্চর্য ঘটনা ঘটছে। ক্রিস এক মহাকাশবিষয়ক মনস্তত্ত্ববিদ। তাকে গিয়ে সোলারিসের অভিযান থাকবে, না বন্ধ হবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এর আগে সোলারিস থেকে ফিরে আসা মহাকাশচারী বার্টন জানায়, ওই প্লাজমাসাগরের চিন্তা করার ক্ষমতা আছে, আর ওটার ওপর তীব্র তেজস্ক্রিয় বিকিরণের আঘাতের ফলে ওরা প্রতিশোধ নিচ্ছে। ওরা সোলারিসের অভিযাত্রীদের ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে ঢুকে পড়ছে আর সেই স্বপ্ন থেকে দ্বীপের মতো খুঁজে পাওয়া কাউকে নিয়ে গিয়ে ফের সোলারিসে ফেরত পাঠাচ্ছে। সোলারিসে গিয়ে ক্রিস তার দশ বছর আগে মৃত স্ত্রী হ্যারিকে পেয়ে যায়। তার স্বপ্ন থেকে তুলে নিয়ে সেই চিন্তাশীল প্লাজমাসাগর সোলারিসে একেবারে সত্যিকারের হ্যারি হিসেবে পাঠায়। সোলারিস স্টেশনে উপস্থিত আরও তিন বিজ্ঞানীর সাবধানবাণী শুনে প্রথমবার ক্রিস হ্যারিকে মিথ্যে বুঝিয়ে এক রকেটে তুলে মহাকাশে পাঠিয়ে দিলেও হ্যারি ফের সেই একই রূপে এসে হাজির হয়। ক্রিসের কাছে মৃত হ্যারির ছবি দেখে জিজ্ঞেস করে, কে ও? শেষ পর্যন্ত এটি হ্যারির মিথ্যে শরীর জেনেও ক্রিস হ্যারিকে ভালোবেসে ফেলে, ভাবে ওকে ছেড়ে সে আর কোনওদিন পৃথিবীতে ফিরে যাবে না। শেষ পর্যন্ত অন্য বিজ্ঞানীরা হ্যারিকে অ্যানিহিলেটর দিয়ে ধ্বংস করে দেয়। এবার হ্যারি ক্রিসের স্বপ্ন থেকেই বিদায় নেয়। এবার আসে ক্রিসের মা। ক্রিস জানায়, তোমাকে আমি এতদিন ভুলেছিলাম কী করে মা? ক্রিসের মায়ের সঙ্গে বনিবনা না হওয়াতেই দশ বছর আগে আত্মহত্যা করেছিল হ্যারি। এই গল্পে যে প্রশ্ন তুমুলভাবে আসে তা হল, ভালোবাসা তাহলে কী? হ্যারির বাস্তবতা মিথ্যা জেনেও ক্রিস তাকে পাগলের মতো ভালোবাসে কীভাবে? এখানে এই যে হ্যারির বারবার ক্রিসের কাছে ফিরে আসা আর বারবার ক্রিসের প্রেমে পড়া নিয়ে আরও একটি বিষয়ও আসে। তা হল, সুরকার আর্তিমিয়েভের কথায়, তারকোভস্কির ভাবনায়—

…that the life we have lived, if we had another chance we would live it under different circumstances but in a similar way, in short, it’s karma. Kris was given another chance but he did the same thing subconsciously. He meets his wife again in space. It was his Karma.

এই সোলারিস সিনেমার শেষ দৃশ্যে আমরা দেখি সব হারিয়ে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে ক্রিস। সেই পরিত্যক্ত বাড়ি, পুকুর নষ্ট, জলের রং পুরো কালো, চারপাশের পুকুরে ঝুঁকে পড়া গাছগুলি সব পত্রহীন, মৃত। অনেক বছর পর ঘরে ফিরে পায় সেই কুকুরটিকে অবিকল আগের অবস্থায়, ঘরের মধ্যে বাবাও অবিকল এক, ঘরে অঝোর বৃষ্টি পড়ছে। বাবা তাকায় জানালার দিকে, সেখানে শূন্যদৃষ্টির ক্রিস। এটা কি মৃত্যু না কি স্বপ্ন। স্বপ্নই। কেননা ক্রমে সেই ঘর চারপাশের পরিত্যক্ত বাগান বা পুকুর নিয়ে দূরে আরও দূরে সরে যেতে থাকে, ক্রমে মহাশূন্যের অংশ হয়ে সেই প্লাজমার চিন্তাশীল সমুদ্রের অংশ হয়ে যায়। Sculpting in Time-এ তারকোভস্কি লিখেছেন, তিনি উৎসাহী ছিলেন, ‘the inner moral qualities essentially inherent in time itself.’ তিনি চেয়েছিলেন দর্শকরাও অন্তর্গত সময়টাকে অনুভব করুক।

সোলারিস, ১৯৭২

 

সোলারিস-এর শেষ দৃশ্যের মতো প্রায় একই দৃশ্য আমরা পাই নস্টালজিয়াতে। যেখানে মৃত লেখক সিনেমার প্রথম দৃশ্যে দেখানো তার সেই শৈশবের গ্রামে চলে যায়। সেই কুয়াশার ভেসে যাওয়া, সেই আচ্ছন্ন ঘোর, কুকুর নিয়ে সেই গ্রাম এবার এক ইতালিয়ান ক্যাথিড্রালের অন্তর্গত হয়ে যায়।

তাঁর প্রধান সিনেমাগুলি বা মিরর, নস্টালজিয়া, স্টকার বা সোলারিস— এদের সবার মধ্যে এক সাধারণ মিল আছে, তা হল গল্পের প্রধান চরিত্রের স্ত্রী হয় তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে বা থাকলেও নায়ক স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও তার প্রতি কিছুমাত্র দায়িত্ব পালন করছে না। আর একটি হল সে কার প্রতি অনুরক্ত— তার মা না স্ত্রী? এই ব্যাপারটি ভয়ঙ্করভাবে এসেছে তাঁর শ্রেষ্ঠ সিনেমা মিরর-এ। এই সিনেমায় আছে অসংখ্য স্বপ্নদৃশ্য। একটি দৃশ্যে ক্যান্সার-আক্রান্ত লেখক আঁন্দ্রের স্ত্রী স্বপ্ন দেখছে যেন তার স্বামী তার সন্তানদুটির কথা জিজ্ঞেস করছে, অমনি আমরা দেখি দুটি শিশু ভাই-বোন দীর্ঘকায় গাছ আর নানা ঝোপঝাড়ে আবৃত এক স্থানে ঝগড়া করছে, হঠাৎ শোনে ওদের বাবা ছোট বোনটিকে দূর থেকে ডাকছে ‘মারিনা—।’ দুই ভাইবোন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে পৌঁছোয় বাবার কাছে, ঘিরে জড়িয়ে ধরে বাবাকে, কিন্তু হায়, স্বপ্ন তো সত্যি হয় না।

এই সিনেমায় আমরা তিন জেনারেশনকে পাই। লেখকের শৈশব সঙ্গে লেখকের পিতা, প্রাপ্তবয়স্ক ক্যান্সার-আক্রান্ত লেখক ও তার সন্তান ইগনাট। আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময় ও বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়। সিনেমা এগিয়েছে স্বপ্ন বা স্বপ্ন নয় দিয়ে। সময়ের এগোনো-পিছোনো নিয়ে।

আর এক স্বপ্নে লেখকের শৈশব। সে সেই শিশু হয়ে তার শৈশবের পুরনো বাড়িতে গিয়ে খুঁজছে মাকে। ঝোপঝাড়ে আকীর্ণ বাড়ি, জঙ্গল, নষ্ট হয়ে যাওয়া কুয়ো। পরিত্যক্ত বাগানে সেই কবেকার ভাঙা টেবিল, কাপ, টেবিলক্লথ। শিশুটি তার শৈশবের রান্নাঘরে গিয়ে টোকা দিয়ে ফিসফিস করে ডাকে ‘mommy’ আর রান্নাঘরের দরজা টেনে খুলতে চায়, ওর সঙ্গে আর একটি হাতও যেন টানে বাইরে থেকে দরজাটিকে। সে খুলতে পারে না দরজাটি, শুধু গভীর নির্জনতায় একটি পুরনো জানলার কাচ শব্দ করে ভেঙে যায় আর সেই জানলা দিয়ে এক মুরগি বেরিয়ে আসে। আর তুমুল বাতাস ওঠে। ছেলেটি এবার তাদের রান্নাঘরে ছুটে যায়, দরজা খোলার চেষ্টা করে পারে না, এবার হতাশ হয়ে যখন সে চলে যাচ্ছে আমরা দেখি, হ্যাঁ শুধু আমরাই দেখি, বন্ধ দরজা ছেড়ে চলে যেতে থাকা শিশুটির পেছনে তখন হঠাৎ করেই খুলে যায় দরজা, সেই শিশুর অর্থাৎ লেখকের শৈশবের মা, সেই কমবয়সি মা আলু কাটছে বসে, পাশে বসে থাকা কুকুরটি বেরিয়ে আসে রান্নাঘর থেকে। কয়েকটি পাখি ডাকছে চ্রিপ্‌-চ্রিপ্‌ করে। মা এবার চলে যাওয়া তার শিশুসন্তানটির, অর্থাৎ শৈশবের আন্দ্রেই-এর দিকে তাকিয়ে দেখছে কিন্তু ডাকতে পারছে না।

মিরর, ১৯৭৫

 

তাঁর ১৯৮৪ সালের বই Sculpting in Time-এ তারকোভস্কি লিখেছেন,

Art reminds us who we are and promises nothing less than a transcendence of morality— at least for lost voyagers.

আমরা যদি আমাদের ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা সিনেমাটির কথা মনে করতে চাই, আমাদের প্রথমেই মনে পড়বে সুপ্রিয়ার সেই আকুতি, ‘দাদা আমি বাঁচতে চাই।’ (হ্যাঁ, এই মেঘে ঢাকা তারা সিনেমাটিও Sight and Sound পত্রিকার সর্বকালের সেরা ২৫০টি সিনেমার একটি হিসেবে নির্বাচিত) তেমনি এই মিরর সিনেমার শেষ দৃশ্য। লেখকের মৃত্যু হচ্ছে আর তার আত্মা যেন একটি পাখি হয়ে মুক্তি পেল, মুক্তি পাওয়া সেই পাখি উড়তে উড়তে তার সেই ছোটবেলার বাড়ির দিকেই ফিরে যায়, যেখানে তার বাবা ও মা পরস্পরকে ভালোবাসারত অবস্থায় বাগানে শুয়ে। আমাদের লেখক তার মায়ের কাছে চিরদিন শিশুই থাকতে চেয়েছে। তার মা বাস্তবিক অর্থে তখন খুবই বৃদ্ধ, কিন্তু এখানে ভালোবাসারত আঁন্দ্রেইয়ের বাবাকে ছেড়ে উঠে বসল যে মা, সেই মা কিন্তু অপূর্ব সুন্দরী যুবতী। আঁন্দ্রেইয়ের বাবা আঁন্দ্রেইয়ের মাকে জিজ্ঞেস করছে, ‘Would you rather have a boy or a girl?’ মায়ের ঠোঁট কাঁপতে থাকে, তিনি পেছন ফিরে যেন ভবিষ্যতের দিকে তাকান, আর হঠাৎ করেই এক ক্রন্দনশীল কোরাস ভেসে আছে আর বাখ-এর মূর্ছনা। যেখানে সেই অপূর্ব সুন্দরী যুবতী মা এখন লোলচর্মা বৃদ্ধা, চুল নষ্ট হয়ে সব পেকে গিয়েছে। তার হাতে এক গামলায় কিছু কাচা কাপড়-জামা, তারা তাদের সেই কোনকালের পরিত্যক্ত বাগানে দাঁড়ায়, ভাঙা ঘরবাড়ি বা টেবিলের পচা কাঠ, পরিত্যক্ত কুয়োয় নষ্ট জলে ভাসমান কোনকালের দুটি ভাঙা পাত্র। হঠাৎ করেই সেই বৃদ্ধা শিশুকন্যাটিকে নিয়ে ঝোপজঙ্গলের মধ্য দিয়ে হাঁটতে শুরু করে আর শিশুপুত্রটি বৃদ্ধা মা আর বোনের পেছনে ছুটতে শুরু করে। আমরা ফের মৃত আঁন্দ্রেই-এর যুবতী মা আর যুবক বাবাকে দেখি। সেই কোরাসের মূর্ছনা তখন চরাচর একাকার। যুবতী মা ভবিষ্যত থেকে মুখ সরিয়ে আনে। তার ঠোঁট কাঁপছে, যেন কোনও কান্না চাপতে চাইছে সে। ফের পেছন দিকে তাকায়। সেই ভবিষ্যৎ, যেখানে এক বৃদ্ধা মা তার দুই শিশুপুত্র ও কন্যাকে নিয়ে ঝোপ-জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পথ তৈরি করে যাচ্ছে। ঝোপ-জঙ্গল ছাড়িয়ে উঁচুনিচু জমি। সরষেক্ষেত, নালা, গড়িয়ে যাওয়া জলস্রোত। হঠাৎ সেই শিশুপুত্রটি ধু ধু প্রান্তরে তার বৃদ্ধা মায়ের থেকে একটু পিছিয়ে পড়ে আর একটু দাঁড়িয়ে নিজের খেয়ালে যেন সেই প্রান্তর আর আকাশকে কিছু বলার জন্যই ‘হো-হো-হো-হো’ করে ডাক ছাড়ে। তার বৃদ্ধা মা তখন তার ছোট্ট মেয়ে অর্থাৎ আঁন্দ্রেইয়ের দিদিকে হাতে নিয়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। শিশুপুত্রটি বা আঁন্দ্রেই এবার তার বৃদ্ধা মাকে ধরার জন্য সেই প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে ছুটতে থাকে। এই দৃশ্যটি আমার ধারণায় পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা পবিত্র দৃশ্য। যে-কোনও বয়সেই যে-কোনও পথ অতিক্রম করার জন্য আমরা একেবারে শিশুর মতো মায়ের হাতটাই তো ধরতে চাই। যে-কোনও বয়সেই একেবারে শিশু হয়ে মায়ের আশ্রয় পেতে চাই। তারকোভস্কির মিরর সিনেমাটি আমাদের সেখানেই পৌঁছে দেয়। তারকোভস্কির সিনেমায় প্রতি দৃশ্যে আমরা ফ্রেমে আবদ্ধ কিছু ছবি দেখি, কিছু শব্দ শুনি কিন্তু একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে দেখা সেই ছবি ও শব্দের সমাহার আমাদের দেশকালের বেড়া ভেঙে অনেক অনেক দূর যেন বা অনন্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়।