Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বন্ধুর বাড়ি কোথায়?

সায়ন্তন দত্ত

 

এ লেখা যখন লিখছি, আমেরিকা এবং ইজরায়েল মিলে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এক সভ্যতাকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার জোরকদম চেষ্টা করছে। এ লেখা যখন লিখছি, তখন গুগল-সহ ইন্টারনেটের সমস্ত সার্চ ইঞ্জিনে ‘ইরান’, ‘যুদ্ধ’, ‘এফ-৩৫’, ‘তেহরান’ শব্দগুলো ট্রেন্ডিং, কারণ এই শব্দগুলোর পারমুটেশন কম্বিনেশন করে সারা পৃথিবীর লক্ষ কোটি নিউজ পোর্টাল তাদের রিপোর্টিং সাজাচ্ছে। এ লেখা যখন লিখছি, তখন সকাল, দুপুর বা রাতের খাবার খেতে খেতে, আমাদের নাগরিক কবিয়ালের কথা অনুযায়ী পৃথিবীর নানান প্রান্তে মানুষ উপসাগরীয় যুদ্ধের লাইভ সম্প্রচার দেখছেন। ভিডিও গেমের মতো সেই লাইভ সম্প্রচারে খেলনা ফ্লাইট জেটে খেলনা বোমা মারা হচ্ছে যেন। এ লেখা যখন লিখছি, তখন একটা গোটা শহর, একটা গোটা দেশ, একটা গোটা স্কুলের সমস্ত শিশুরা বোমার আঘাতে মারা যাচ্ছে। সেই শিশুরা আর খেলনা পাবে না, কারণ নিজেরাই তারা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ঘাতকের অস্ত্রে খেলনা হয়ে গেছে।

এ লেখা যখন লিখছি, তখন এই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে, অনেক অনেক দূরে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্র্যাড ছাত্রদের আয়োজনে প্রায় নব্বই বছর ধরে চলতে থাকা ফিল্ম সোসাইটি আব্বাস কিয়ারস্তামির হোয়ার ইজ দ্য ফ্রেন্ড’স হাউস ছবিটি ফিরে দেখাচ্ছে। তথ্য হিসেবে, খবর হিসেবে, হেডলাইন হয়ে ওঠার জোরের হিসেবে এই ঘটনাটি নিঃসন্দেহে নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর। কিন্তু যে দেশ এই যুদ্ধের জন্য দায়ী, সেই দেশের মাটিতেই বসে তার তথাকথিত শত্রুদেশের এই ছবি দেখার অভিজ্ঞতাকে, আমি, এই ঘোরতর বিদেশি, লিপিবদ্ধ করে যেতে চাইছি। তাই এই লেখা যখন দেখছি, তার এক ঘণ্টা আগেই আমি দেখে এসেছি, ককারের ওই আঁকাবাঁকা পথ ধরে আহমাদ নামের ওই ছোট্ট শিশুর বড়দের বকাঝকা অগ্রাহ্য করে বেপরোয়া নাছোড়বান্দা হয়ে বন্ধুর বাড়ি খুঁজে বের করার ওই জেদ-কে। এ লেখা যেদিন লিখছি, সেদিনই খবর পেয়েছি, আব্বাস কিয়ারস্তামির বাড়ির এক অংশ বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়ে গেছে। এ লেখা যেদিন লিখছি, সেদিনই আব্বাসের হাতে তৈরি ছবির আহমাদ, বেপরোয়া আহমাদ তাঁর বন্ধুর বাড়ি খুঁজে চলেছে।

 

দেশ ছেড়ে বাইরে এলে দেশের চিহ্নকগুলি আরও বেশি করে নিজেদের আশেপাশে ফুটে ওঠে। পড়াশোনার সূত্রে প্রবাসজীবন আমার দুই বছর শেষ হতে চলল— তাই সেইটুকু অভিজ্ঞতা সম্বল করে বলতে পারি, কলকাতার রাস্তায় হাঁটার সময় যে নিজেকে কখনও আলাদা করে ভারতীয় বলে ভাবিনি, শিকাগোর রাস্তায় হাঁটার সময় না চাইতেও দেশের স্ট্যাম্প গায়ের উপরে এসে পড়বেই। মুখের ভাষা, গায়ের রং, কথা বলার ঢং— আন্তর্জাতিক বিশ্বে এই সবকিছুরই নির্দিষ্ট স্টিরিওটাইপ হয়ে যায়। তাই দেশ ছেড়ে বাইরে এলেই দেশ সম্পর্কে কিছু গ্যাদগ্যাদে চিহ্নক দিয়ে আশপাশের মানুষ সেই দেশকে নির্মাণ করতে চায়। তো, সেখান থেকেই সম্ভবত সচেতন হয়ে গিয়ে দেশের কথাটা না ভেবে পারছি না— কারণ এই সমস্ত ঘটনাতেই আমি কার্যত বিদেশি, নিছক দর্শক মাত্র। আমেরিকা-ইজরায়েল ইরান-লেবাননে বোমা ফেলছে, তাতে করে আমেরিকায় বসবাসকারী ভারতীয় হিসেবে আমার দৈনন্দিনে বিশেষ কিছু এসে যাচ্ছে বলে তো মনে হচ্ছে না। কিন্তু, ‘আমেরিকা’, ‘লেবানন’, ‘ইরান’ ইত্যাদি শব্দগুলির চেয়েও, ‘সিনেমা’ এবং ‘আব্বাস কিয়ারস্তামি’— এই শব্দগুলি আমার ইহজীবনে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ— এদের সামনে সারাজীবন নতজানু হয়ে থাকার চেষ্টাতেই দিন কেটে যায়। তাই এ শব্দগুলোর সঙ্গে যে দেশ, যে দেশের ভাষা, জল, হাওয়া, রং, এবং কল্পনা করে নেওয়া গন্ধ এতদিন ইরানের ফিল্ম দেখতে দেখতে ভেবে এসেছি, সেই দেশটা যখন ধ্বংস হয়ে যায়, তখন সেই ছবিগুলো ফিরে দেখতে কেমন লাগে? ফাঁকা আশাবাদ বা কল্পিত প্রতিরোধের আখ্যান না, বরং এই দেখার অভিজ্ঞতাটাকে ধরে রাখার জন্যই এই লেখা। পাঠকরা একে ডায়রির পাতা বলে ভাবতে পারেন।

জন্ম থেকেই ‘স্পেস’ (বাংলায় পরিসর কিংবা স্থান বলা যেতে পারে, তবে তা খুব ভালো অনুবাদ নয়) বিষয়টি সিনেমার জন্য খুব গুরত্বপূর্ণ। ক্যামেরা যেহেতু একটি যন্ত্র, তাই ক্যামেরার দেখা সবসময়ই বিষয়-অতিরিক্ত। আপনি হয়তো আপনার বাড়ির বাগানে বসে ছোট বাচ্চাকে খাবার খাওয়ানোর ছবি তুলতে গেলেন, কিন্তু ক্যামেরা সেইটুকু ছাড়াও আকাশের ঘোলাটে রং, পিছনের গাছ, গাছের পাখির বাসা, হাওয়ায় নড়ে ওঠা পাতা— এই সবকিছু দেখবে। ক্যামেরা দিয়ে যদি বাস্তব পৃথিবীকে আপনি দেখতে চান, চাইলেও আপনি এই জিনিসগুলোকে এড়াতে পারবেন না। ফিল্ম শ্যুট করার সময়, শত সতর্কতা সত্ত্বেও এই ‘স্পেস’ তাই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে যাবেই। লুমিয়ের ব্রাদার্স প্রথম যখন এক মিনিটের ছোট ছোট ছবি তুলেছিলেন, তাঁদের এই বাড়ির বাগানে বসে বাচ্চাকে খাওয়ানোর ছবি দেখার সময় মানুষজন বেশি মুগ্ধ হয়েছিল পিছনের গাছের পাতা দেখে। হাওয়ায় গাছের পাতা নড়ছে— এই সামান্য জিনিস খালি চোখে আগে দেখলেও যন্ত্র যে এভাবে তাকে চোখের সামনে নিয়ে আসতে পারে, সেটা সিনেমা আসার আগে কেউ ভেবে দেখেনি। বিখ্যাত জার্মান তাত্ত্বিক সিগফ্রিড ক্র্যাকোয়ার সিনেমা নিয়ে লেখার সময় যে কারণে তাঁর নিজের ছবি দেখার অভিজ্ঞতার কথা লেখেন— ছোটবেলায় দেখা কোনও ছবির গল্প নয়, কোনও মারপিটের দৃশ্য নয়, বরং বিশাল বড় পর্দায় রাস্তার ধারে গর্তে জমা জল এবং তাতে আশপাশের বাড়ি আর আকাশের প্রতিবিম্ব দেখতে পেয়ে তিনি মুগ্ধ হয়ে গেছিলেন। হিচককের ছবি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জঁ-লুক গোদার একবার বলেছিলেন, হিচককের ছবির চরিত্র, তাদের মোটিভ, স্টার পার্সোনা— এই সব কিছুই আমরা ভুলে যেতে পারি। কিন্তু কিছুতেই ভুলতে পারি না এক জোড়া ওয়াইন গ্লাস, ওই আশ্চর্য গথিক কাঠামোর বেট’স মোটেল, নেমে আসা চাপ চাপ অন্ধকার আর ওই মোটেলের করিডোরগুলোকে। ক্যামেরা সবসময় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত দেখে— আর তাতেই লুকিয়ে আছে সিনেমার প্রাথমিক ম্যাজিক।

সিনেমার ইতিহাসে কিছু ফিল্মমেকার আছেন, যাঁরা সিনেমার এই ম্যাজিক সম্পর্কে অচেতন। কিন্তু ক্যামেরায় ‘দেখা’ বিষয়টা আদতে যেহেতু যন্ত্রের দেখা, তাই অচেতন ফিল্মমেকারদের ছবি থেকেও ভুরি ভুরি এরকম ম্যাজিকের উদাহরণ পাওয়া যাবে। কিন্তু, আব্বাস কিয়ারস্তামি এমন এক শিল্পী, যিনি সিনেমামাধ্যম নিয়ে বোধহয় বেশি উৎসাহী ছিলেন এই ম্যাজিকের উপস্থিতির কারণেই। আব্বাসের ছবি তাই সচেতনভাবে, সক্রিয়ভাবে এমন একটি পরিসর তৈরির চেষ্টা করে, যেখানে মানুষের উপস্থিতি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যায়। তাঁর ছবিতে গল্প আছে, ঘটনা আছে, ঘটনার নিষ্পত্তি কখনও আছে বা নেই— কিন্তু ছবির পর ছবি জুড়ে আছে এই গল্প, ঘটনা-অতিরিক্ত উপস্থিতি। উইন্ড উইল ক্যারি আস ছবিতে শহর থেকে গাড়ি করে গ্রামে আসা চরিত্রদের কথা শুনতে পেলেও অনেকক্ষণ তাঁদের আমরা চোখে দেখতে পাই না— বদলে দেখি শুধু আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, হলুদ ধূসর জমি আর আদিগন্ত প্রকৃতি। টেস্ট অফ চেরি ছবির শেষে, প্রায় নাটকীয় মুহূর্তে এক চরিত্র বলে গাড়ি ঘুরিয়ে অন্য রাস্তায় চলুন, ওই রাস্তাটা বেশি সুন্দর। মুহূর্তে আব্বাসের ক্যামেরা লং শটে চলে যায়, চরিত্র গল্প সংলাপ এসবের থেকে সরে গিয়ে আব্বাসের আমাদের দেখান কিছু গাছ, তাদের গায়ে অপূর্ব শরতের রং আর তাতে হাওয়ার আন্দোলন। থ্রু দ্য অলিভ ট্রিজ ছবির শেষ মুহূর্তে, একইভাবে, এতক্ষণ প্রেমে পড়ে ঘ্যানঘ্যান করতে থাকা ছেলেটি তার প্রেমাস্পদর থেকে কী উত্তর পায়, আমরা জানি না। বদলে আমরা দেখি শুধু আদিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠ, গাছের সারি এবং নীল আকাশ। আব্বাস নানা জায়গায় বলেছিলেন, ওই তিন মিনিটের দৃশ্যটি উনি এক সপ্তাহ ধরে, সন্ধে নামার সময় নির্দিষ্ট একটা আলোর জন্য অপেক্ষা করে তবে শ্যুট করতেন— কারণ ওই আলো তাঁর আছে সিনেমার ম্যাজিকের সমতুল্য। আমরা সিনেমার কাছে নতজানু হয়ে থাকব শুধুমাত্র হত্যারহস্য সমাধান করার জন্য নয়— বরং সিনেমার কাঁচামাল স্পেসকে দেখার মাধ্যমে, শোনার মাধ্যমে যে ম্যাজিক নির্মাণ করা যায়, তা অনুভব করার জন্য।

উইন্ড উইল ক্যারি আস

 

টেস্ট অফ চেরি ছবির সেই রাস্তা

 

থ্রু দ্য অলিভ ট্রিজ

 

তাহলে যে মাধ্যম তার শরীরেই ‘স্পেস’-এর এই আশ্চর্য ম্যাজিক ধারণ করে রাখতে পারে, সেই মাধ্যমে দেখা স্পেস যখন বোমার আঘাতে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, তখন সিনেমার দর্শক হিসেবে সেই অভিজ্ঞতা কি নিউজ চ্যানেলের হেডলাইনের চেয়ে তীব্র নয়? নানান সময়ে শিল্পী/তাত্ত্বিকরা সিনেমার ইমেজকে ভূতের সঙ্গে তুলনা করেছেন— মৃত্যুর পরেও যে ইমেজ বারবার সিনেমা চালালেই ফিরে ফিরে আসে। আন্দ্রে বাঁজার এক বিখ্যাত লেখার শিরোনাম ডেথ এভরি আফটারনুন, যেখানে উনি এই মৃত্যুর ইমেজ বারবার ফিরে ফিরে চালানোর অশ্লীলতার কথা উল্লেখ করেছিলেন। যুদ্ধের আঘাতে ইরান ধ্বংস হয়ে যাওয়ার সময় তাই যে ছবি ইরানের জল, মাটি, বাতাস ধারণ করে জন্ম নিয়েছে, তাকে ফিরে দেখা কতকটা যেন mourning-এর আচার অনুষ্ঠানের মতো। মৃত্যুর ইমেজের উল্টোদিকে জীবনের ইমেজ, মানুষের দাঁতে দাঁত চিপে বেঁচে থাকার ইমেজ যে শিল্পীরা ধরে রেখেছেন, তাঁদের ফিরে ফিরে দেখাই বোধহয় এই যুদ্ধের সময় সিনেপ্রেমীদের একমাত্র কর্তব্য হতে পারে। যে পৃথিবীতে প্রতিরোধের বাস্তব সম্ভাবনা ক্রমশ শূন্যের দিকে এগোচ্ছে, যে পৃথিবীতে প্রতিরোধের রাজনীতির দরজা আটকে বসে আছে চূড়ান্ত দুর্নীতিগ্রস্ত মাথারা, সেই পৃথিবীতে ধ্বংস হয়ে যাওয়া দেশের ছবি ফিরে ফিরে দেখাকে তাই আর প্রতিরোধ বলতে ইচ্ছে করে না। বরং তা যেন ধ্বংস আর যুদ্ধের সামনে দাঁড়িয়ে অন্তত কান্নাটুকুকে রেখে যাওয়া।

যুদ্ধে কেউ কখনও জেতে না, শুধু মানুষ হারিয়ে যায় কেবল। তাদের বাড়ি খুঁজে পাওয়া গেলেও তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। যুদ্ধে কেউ কখনও জেতে না, শুধু প্রকৃতি আর গোটা দেশ খাঁ খাঁ শ্মশান হয়ে যায়। এ লেখা তাই হারিয়ে যাওয়া মানুষ, প্রকৃতি আর সেই দেশের সিনেমার জন্য, অনেক দূর থেকে এক বিদেশির, শুধুমাত্র কান্না নিয়ে বেঁচে থাকার আখ্যান। অনাগত ভবিষ্যতের কাছে যাতে এইটুকু বলে যেতে পারি, যুদ্ধক্ষেত্রে শল্যপর্বের পর স্ত্রীপর্ব বারবার ফিরে আসে।