এরিক তুসাঁ
যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে এবং সমগ্র পশ্চিম গোলার্ধে সংঘটিত যুদ্ধগুলির ঐতিহাসিক পর্যালোচনা একটি মৌলিক ধারাবাহিকতাকে স্পষ্ট করে। সহিংসতা আমেরিকার ইতিহাসে কোনও ব্যতিক্রম নয়; বরং সেটিই তার ভিত্তিগত কাঠামো। এই ধারাবাহিকতাকে চিহ্নিত করা কোনও মতাদর্শগত অনুশীলন নয়— বরং একটি রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা। এতে আমরা বুঝতে পারব যে আজ যে আগ্রাসনগুলো হচ্ছে, সেগুলো অতীতের ব্যতিক্রম নয়, বরং এক সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা। যতদিন এই ইতিহাস চাপা থাকবে বা একে লঘু করে দেখানো হবে, ততদিন যুক্তরাষ্ট্র যে হিংস্রতা দেখিয়ে যাচ্ছে সেগুলোকে প্রয়োজনীয় বা সঙ্গত বলে হাজির করা হতে থাকবে
দেশীয় আমেরিকান আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে নির্মম দমনপীড়ন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রচলিত বর্ণনাটি সাধারণত এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে, এটি নাকি স্বাধীনতার সংগ্রাম থেকে জন্ম নেওয়া একটি জাতির ইতিহাস, যা ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি বিস্তৃত করেছে। কিন্তু এই বর্ণনা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস মূলত ইউরোপীয় উপনিবেশবাদীদের সশস্ত্র বিজয়ের ইতিহাস— যার সূচনা ১৭৭৬ সালের অনেক আগেই, এবং যার মূল্য চোকাতে হয়েছে আমেরিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে।
সপ্তদশ শতাব্দী থেকে, যে ভূখণ্ড পরে যুক্তরাষ্ট্রে পরিণত হবে সেখানে, ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনকারীরা স্থানীয় আদিবাসী আমেরিকান জাতিগোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী এক ঔপনিবেশিক যুদ্ধ চালায়। এই যুদ্ধ কোনওভাবেই সামান্য বা আত্মরক্ষামূলক ছিল না— এর লক্ষ্য ছিল জমি দখল করা, আদিবাসী সমাজগুলিকে ধ্বংস করা এবং বর্ণগত স্তরবিন্যাসের উপর ভিত্তি করে একটি ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া। গণহত্যা, গ্রাম ধ্বংস, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, দাসত্বে বাধ্য করা এবং বলপ্রয়োগে চাপিয়ে দেওয়া চুক্তি— এই সবই ছিল এই দখলদারির নিত্যদিনের হাতিয়ার।
১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার পর যুক্তরাষ্ট্র এই ধারাবাহিকতায় ছেদ টানেনি, বরং তাকে একটা নতুন রূপ দিয়েছে। ঔপনিবেশিক হিংস্রতা তখন থেকে প্রজাতন্ত্রের নামে পরিচালিত রাষ্ট্রনীতিতে পরিণত হয়। উনিশ শতকে ইন্ডিয়ান রিমুভাল[1]-এর অংশ হিসেবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চালানো যুদ্ধ, তাদেরকে সংরক্ষণের মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলার নীতি এবং সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীকেই নির্মূলীকরণ— এ-সবই পূর্ববর্তী ঔপনিবেশিক বর্বরতাগুলির আরও দীর্ঘায়িত ও তীব্রতর রূপ।
যুক্তরাষ্ট্রের যে সব অঞ্চলে বিভিন্ন দেশীয় আমেরিকান ভাষা বলা হত তার মানচিত্র। মানচিত্র: উইলিয়াম সি স্টুর্টভান্ট, স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউট, ১৯৬৭। সূত্র: উইকিমিডিয়া কমনস
দেশের অভ্যন্তরীণ দখলদারি প্রক্রিয়া মোটামুটি সম্পন্ন হয়ে গেলে, উনিশ শতকে এই দৃষ্টিভঙ্গি দেশের সীমানার বাইরেও বিস্তৃত করা হয়। উত্তরদিকে গ্রিনল্যান্ড ও কানাডা থেকে দক্ষিণে চিলি ও আর্জেন্টিনা পর্যন্ত বিস্তৃত পশ্চিম গোলার্ধ তখন সম্প্রসারণ, হস্তক্ষেপ ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক নতুন ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস যুদ্ধ, দখলদারি, সামরিক অভ্যুত্থান, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।
এই সম্প্রসারণের উৎস নিহিত রয়েছে পুঁজিবাদের অন্তর্নিহিত সেই প্রবণতায়, যার মাধ্যমে সে বাজার বিস্তার করে, শোষণের লক্ষ্য জনগোষ্ঠীর উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় এবং যেসব সম্পদ আহরণ করতে চায় সেগুলোর ওপর দখল প্রতিষ্ঠা করে নিজেকে বিকশিত করে। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে— যে-সময় বৃহৎ, একচেটিয়া পুঁজিবাদী কোম্পানিগুলির উত্থান ঘটে এবং তাদের আন্তর্জাতিক ও বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ক্রমশ বাড়তে থাকে— এই প্রবণতা প্রকাশ পায় তৎকালীন স্বাধীন দেশগুলিতে ঘন ঘন হস্তক্ষেপের মাধ্যমে। একই সঙ্গে শুরু হয় উপনিবেশ স্থাপনের এক নতুন পর্ব— যেমন, ১৮৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলনে ইউরোপীয় শক্তিগুলির মধ্যে আফ্রিকা মহাদেশকে ভাগ করে নেওয়া।
এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না পুঁজিবাদী ব্যবস্থা— তার উৎপত্তি থেকে প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত— যে শুধু আদিবাসী আমেরিকান সম্প্রদায়গুলিকে উৎখাত করেছে, আফ্রিকান জনগোষ্ঠীকে দাসত্বে আবদ্ধ করেছে এবং সাম্রাজ্যবাদী হস্তক্ষেপ চালিয়ে গেছে তা-ই নয়; যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিকশ্রেণিকেও শোষণ করেছে। আমরা এখানে বিষয়টি কেবল উল্লেখ করে রাখছি, কিন্তু সেই দিকটি নিয়ে এই প্রবন্ধে আমরা বিশদভাবে আলোচনা করব না।
উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে মার্কিন আগ্রাসনের ক্রনোলজি। সূত্র: CADTM
আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত মানুষের দাসত্ব এবং বর্ণবৈষম্যমূলক পৃথকীকরণের নীতি
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসকে যে কাঠামোগত সহিংসতা গভীরভাবে চিহ্নিত করেছে, তার পূর্ণ চিত্র তুলে ধরতে গেলে আফ্রিকানদের এবং তাঁদের বংশধরদের দাসত্বের বিষয়টিও অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে— যার সূচনা হয় ঔপনিবেশিক যুগে এবং স্বাধীনতার পর যা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
সপ্তদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে, বিশেষত অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে, ট্রান্সআটলান্টিক দাসব্যবসার অংশ হিসেবে লক্ষ লক্ষ আফ্রিকানকে জোর করে উত্তর আমেরিকায় নিয়ে আসা হয়েছিল।
দাস হিসেবে তাঁদেরকে চলমান সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হত— তাঁদের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার এবং মানুষ হিসেবে কোনও আইনি স্বীকৃতিই ছিল না। তাঁদের জোরপূর্বক প্রদত্ত শ্রম ছিল উপনিবেশগুলির এবং পরবর্তীতে নবগঠিত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের তামাক, তুলা, ধান ও আখের বাগানগুলিতে। তাঁদের ওপর হওয়া শোষণগুলি— দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর শ্রমদিবস, হিংস্র শারীরিক অত্যাচার, পরিবারকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া, এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোনও আইনি সুরক্ষার সম্পূর্ণ অভাব— ভয়াবহ। দাসপ্রথা একটি স্তরবিন্যস্ত বর্ণবাদী ব্যবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল, যেখানে গায়ের রংকে সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত করা হত এবং ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় তত্ত্বের মাধ্যমে দমন-পীড়নকে ন্যায্যতা দেওয়া হত।
১৭৬৯ সালে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার চার্লসটনে একটি দাস-নিলাম বিজ্ঞাপনের পুনর্লিপি। সূত্র: উইকিমিডিয়া কমনস
অবশ্যই, দাসপ্রথার বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য আন্দোলনও ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে মধ্যপন্থী ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রবণতা থেকে শুরু করে সবচেয়ে র্যাডিক্যাল ও বিদ্রোহী ধারাও বিদ্যমান ছিল। এই র্যাডিক্যাল ধারার প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন জন ব্রাউনের মতো ব্যক্তিত্বরা। দাসদের নিজেদের প্রতিরোধের সঙ্গে মিলিত হয়ে এই দাসপ্রথা-বিরোধী আন্দোলনগুলি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে দাসপ্রথার প্রশ্নটিকে ক্রমাগত একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছিল যাকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
১৮৬১-১৮৬৫ সালের আমেরিকার গৃহযুদ্ধ মূলত দক্ষিণের দাস-মালিকানাধীন অঙ্গরাজ্যগুলির সঙ্গে উত্তরের অঙ্গরাজ্যগুলির সংঘর্ষ। এর ফলস্বরূপ ১৮৬৫ সালে সংবিধানে ত্রয়োদশতম সংশোধন গৃহীত হয়, যা আনুষ্ঠানিকভাবে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করে। তবে এই বিলোপ বৈষম্য ও সহিংসতার অবসান ঘটায়নি। পুনর্গঠন পর্ব নামে পরিচিত সময়কালে (১৮৬৫-৭৭) কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনি অগ্রগতি হয়, বিশেষত সংবিধানের চতুর্দশতম এবং পঞ্চদশতম সংশোধনে, যেগুলির মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষরা নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার অর্জন করে। একইভাবে, ফেডারেল সৈন্যদের দ্বারা প্রাক্তন দাস-মালিকানাধীন দক্ষিণাঞ্চল অধিকৃত হওয়ায় মুক্ত দাসদের মহাজন ও প্রাক্তন প্রভুদের নির্যাতন থেকে রক্ষা করার জন্য নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাঁদের ভোটাধিকার রক্ষা করা হয়, কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হন এবং সদ্য-মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। আফ্রিকান-আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ডব্লিউইবি ডু বয়েস-এর ক্লাসিক গ্রন্থ Black Reconstruction in America থেকে এই সময়ের ইতিহাস জানা যায়। কিন্তু এইসব সাফল্য খুব বেশিদিন ছিল না। উত্তরের পুঁজিপতি শ্রেণি এই র্যাডিক্যাল নীতিগুলি পরিত্যাগ করে এবং দক্ষিণে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী গোষ্ঠীগুলির উত্থানের সঙ্গে সমঝোতা করে। এর ফলে দক্ষিণে প্রাক্তন শ্বেতাঙ্গ শাসকশ্রেণির ক্ষমতা আবার সুদৃঢ় হয় এবং উনিশ শতকের শেষভাগে তথাকথিত জিম ক্রো আইন প্রণয়ন করা হয়, যা বর্ণভিত্তিক পৃথকীকরণ ও বৈষম্যকে আইনি রূপ দেয়।
এই বর্ণবৈষম্যমূলক আইনগুলি স্কুল, গণপরিবহন, জনসমাগমস্থল এবং আবাসনের ক্ষেত্রে কঠোর বর্ণভিত্তিক পৃথকীকরণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৮৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট “separate but equal” রায়ের মাধ্যমে এই ব্যবস্থাকে বৈধতা দেয়। বাস্তবে অবশ্য আফ্রিকান-আমেরিকানদের জন্য পরিষেবা ও অবকাঠামো সবই পরিকল্পিতভাবে নিম্নমানের রাখা হত। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল সাক্ষরতা পরীক্ষা ও ভোট কর-এর মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজনৈতিক অধিকার থেকে তাঁদের বঞ্চিত করা, এবং লিঞ্চিং ও বর্ণবাদী সহিংসতায় চিহ্নিত এক সন্ত্রাসময় পরিবেশ।
“Sale of Slaves,” The Savannah Republican, February 8, 1859.
এই আইনি বর্ণপৃথকীকরণের ব্যবস্থা ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত চালু ছিল। বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নাগরিক অধিকার আন্দোলনের ফলে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধিত হয়: ১৯৫৪ সালে স্কুলে বর্ণভিত্তিক পৃথকীকরণকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়; এর পরে গৃহীত হয় Civil Rights Act of 1964 এবং Voting Rights Act of 1965, যেগুলি বর্ণভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধ করে এবং ভোটাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
তবে এই আইনি অগ্রগতির পরেও দাসপ্রথা ও বর্ণপৃথকীকরণ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বৈষম্য অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ভৌগোলিক স্তরে আজও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে চলেছে।
এইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস কেবল আদিবাসী আমেরিকান জনগোষ্ঠীর ভূমি কেড়ে নেওয়া এবং তাঁদের হিংস্র উৎপীড়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আফ্রিকান-আমেরিকানদের দাসত্ব ও বর্ণপৃথকীকরণও— দুটি ভিন্ন ধরনের নিপীড়নব্যবস্থা, যেগুলি উভয়েই এই দেশের বিকাশের উপর গভীর ও গঠনমূলক প্রভাব ফেলেছে।
মনরো ডকট্রিন
১৮২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার মনরো ডকট্রিন গ্রহণ করে, যার নামকরণ করা হয় রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর নামে। এই নীতিতে “আমেরিকা মহাদেশ”-এর বিষয়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলির যে-কোনও হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এই নীতির বলে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ভূখণ্ড সম্প্রসারণ চালিয়ে যায়, যার বিষময় ফল সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয়েছিল সদ্য-স্বাধীন লাতিন আমেরিকার রাষ্ট্রগুলিকে। এই সম্প্রসারণের সূচনা হয় ১৮৪০-এর দশকে টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো, আরিজোনা, ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, নেভাদা এবং উটা-সহ মেক্সিকোর বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রে সংযুক্ত করার মধ্যে দিয়ে। ১৮৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন সেনাবাহিনী মেক্সিকো সিটি দখল করে এবং একই বছরে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ভেরাক্রুজ-ও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।
সিটিং বুল (১৮৩১-১৮৯০) ছিলেন লাকোতা সিওক্স (হাঙ্কপাপা) জনজাতির প্রবাদপ্রতিম আধ্যাত্মিক এবং রাজনৈতিক নেতা। তাঁদের ভূমি যুক্তরাষ্ট্রের ছিনিয়ে নেওয়ার প্রতিরোধ করতে তিনি দেশীয় আমেরিকান জনজাতিগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রতিরোধের প্রতীক; ১৮৭৬ সালে বিখ্যাত লিটল বিগহর্নের যুদ্ধে তিনি জয়লাভ করেছিলেন। ছবি: ডিএফ বেরি (১৮৮৫)। সূত্র: উইকিপিডিয়া
মেক্সিকোর বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখলের পর, সেই সংযুক্ত ভূখণ্ডে বসবাসকারী মেক্সিকান জনগণ এবং তাদের বংশধরেরা যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এমন এক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হন, যাঁরা বিভিন্ন ধরনের উচ্ছেদ, বঞ্চনা ও অধিকারহীনতার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন— যেমনটা যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অনেক জনগোষ্ঠীকেও সহ্য করতে হয়েছে।
১৮৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং বিভিন্ন উপায়ে তার চারটি উপনিবেশ দখল করে নেয়— কিউবা, পুয়ের্তো রিকো, ফিলিপাইনস এবং গুয়াম।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ১৯০২ সালে যখন ভেনেজুয়েলাকে তার ঋণ পরিশোধে বাধ্য করার জন্য জার্মানি, ব্রিটেন, ইতালি এবং নেদারল্যান্ডস সেখানে সশস্ত্র আগ্রাসন চালায় তখন কিন্তু মনরো নীতির ঘোষিত নীতিমালা থেকে সরে এসে ওয়াশিংটন ভেনেজুয়েলাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেনি। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র কূটনৈতিকভাবে হস্তক্ষেপ করে যাতে কারাকাস আবার ঋণ পরিশোধ করা শুরু করে। ওয়াশিংটনের এই অবস্থান লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন সরকারের মধ্যে তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুইস এম ড্রাগো এ-নিয়ে বলেন—
আমি যে নীতিটিকে স্বীকৃতি পেতে দেখতে চাই তা হল— সরকারি ঋণ কোনও সশস্ত্র হস্তক্ষেপের কারণ হতে পারে না; ইউরোপীয় কোনও শক্তির দ্বারা আমেরিকার রাষ্ট্রগুলির ভূখণ্ড দখলের কথা তো ছেড়েই দিন।
এটি পরবর্তীতে ড্রাগো ডকট্রিন নামে পরিচিত হয়। বিভিন্ন সরকারের মধ্যে এই বিতর্কের ফলে দ্য হেগ-এ একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এর ফলস্বরূপ ১৯০৭ সালে ড্রাগো-পোর্টার কনভেনশন গৃহীত হয়— যার নামকরণ করা হয় ড্রাগো এবং মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও কূটনীতিক হোরেস পোর্টারের নাম অনুসারে। এই কনভেনশনে বলা হয় যে, বিরোধ মীমাংসার প্রথম উপায় হিসেবে সালিশি প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ, কনভেনশনের অন্তর্ভুক্ত কোনও রাষ্ট্রকে বিরোধের ক্ষেত্রে সালিশি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে এবং তা সৎভাবে মেনে চলতে সম্মত থাকতে হবে। অন্যথায়, যে রাষ্ট্র তার ঋণ আদায়ের দাবি করছে, সে তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য সশস্ত্র শক্তি প্রয়োগের অধিকার পাবে।
কিন্তু বাস্তবে ওয়াশিংটন বারবার এই কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে।
১৯০৩ সালে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট পানামার কলম্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন হওয়াকে সমর্থন করেন ও উৎসাহ দেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল পানামা খাল নির্মাণ করা এবং সেটির পরিচালনা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাখা।
১৯০৪ সালে সেই একই প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন যে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে আমেরিকা মহাদেশের “পুলিশ” হিসেবে বিবেচনা করে। তিনি যে নীতিটি ঘোষণা করেন, তা রুজভেল্ট করোলারি নামে মনরো ডকট্রিনে অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনি বলেন—
দীর্ঘস্থায়ী অন্যায় আচরণ, অথবা এমন অক্ষমতা যা সভ্য সমাজের বন্ধনকে ব্যাপকভাবে শিথিল করে দেয়, আমেরিকায়— যেমন পৃথিবীর অন্যত্রও— অবশেষে কোনও না কোনও সভ্য জাতির হস্তক্ষেপকে প্রয়োজনীয় করে তুলতে পারে। আর পশ্চিম গোলার্ধে মনরো নীতির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আনুগত্য এমন পরিস্থিতিতে— যত অনিচ্ছাই থাকুক না কেন— স্পষ্ট অন্যায় বা অক্ষমতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক পুলিশি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে বাধ্য করতে পারে।[2]
১৯১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ঋণ পুনরুদ্ধারের অজুহাতে হাইতি আক্রমণ করে এবং ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত দেশটি দখল করে রাখে। উরুগুয়ের লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানো লিখেছেন—
যুক্তরাষ্ট্র বিশ বছর ধরে হাইতি দখল করে রেখেছিল। এই কৃষ্ণাঙ্গ দেশটি, যা প্রথম সফল দাসবিদ্রোহের ভূমি, সেখানে তারা বর্ণভিত্তিক পৃথকীকরণ ও জোরপূর্বক শ্রম প্রবর্তন করে। তাদের এক দমনমূলক অভিযানে ১,৫০০ শ্রমিককে হত্যা করা হয় (১৯২২ সালের মার্কিন সেনেটের এক তদন্ত অনুযায়ী)। আর যখন স্থানীয় সরকার ন্যাশনাল ব্যাঙ্ককে নিউ ইয়র্কের ন্যাশনাল সিটি ব্যাঙ্কের একটি শাখায় পরিণত করতে অস্বীকার করে, তখন রাষ্ট্রপতি ও তাঁর মন্ত্রীদের যে ভাতা সাধারণত দেওয়া হত, তা বন্ধ করে দিয়ে তাঁদের সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়।[3]
একই সময়কালে যুক্তরাষ্ট্রের আরও বহু সামরিক হস্তক্ষেপ ঘটেছিল। যেমন— ১৯০৯ সালে এবং পরে ১৯১২ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত নিকারাগুয়াতে দখলদার বাহিনী পাঠানো; বিপ্লবের সময় ১৯১৪ সালে মেক্সিকোর ভেরাক্রুজ বন্দর দখল; ১৯১৬ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত ডোমিনিকান রিপাবলিক দখল করে রাখা; এবং উত্তর মেক্সিকোতে বিপ্লবের বিরুদ্ধে— বিশেষত পাঞ্চো ভিলা-র বাহিনীর বিরুদ্ধে— সামরিক অভিযান চালানো।
এই তালিকা অবশ্য সম্পূর্ণ নয়।
মনে রাখা দরকার যে, বহু ক্ষেত্রেই মার্কিন হস্তক্ষেপ দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তাক্ত একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছে— মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলি কায়েম হয়েছে। যেমন ডোমিনিকান রিপাবলিক এবং নিকারাগুয়াতে— সোমোজা এবং ট্রুজিলো-র একনায়কতন্ত্র এমন ব্যক্তিদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল, যারা মার্কিন দখলদারির সময় গঠিত ও প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনীতে অফিসার হিসেবে উঠে এসেছিল।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ঋণের প্রশ্ন
ঊনবিংশ এবং বিংশ শতকের শুরুর দিকে আমেরিকা মহাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ও নীতির এই সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা আমাদের বুঝতে সাহায্য করে ১৮৯৮ সালে কিউবার কাছ থেকে[4] এবং ১৯২০-র দশকে কোস্টারিকার কাছ থেকে[5] ঋণ পরিশোধের দাবি প্রত্যাখ্যান করার পেছনে ওয়াশিংটনের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল। ১৮৯৮ সালের জুন মাসে সান্তিয়াগো দে কিউবার উপকূলে স্পেনের সাম্রাজ্যবাদী নৌবাহিনীকে পরাজিত করার পর যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে যে স্প্যানিশ উপনিবেশের ঋণদাতারা যে ঋণ কিউবার উপর চাপিয়ে দিতে চাইছে, তা তারা গ্রহণ করবে না। ওয়াশিংটন এই ঋণকে “odious debt”[6] বা নৈতিকভাবে অবৈধ ঋণ হিসেবে বাতিল ঘোষণা করে, যুক্তি দেয় যে এই ঋণ কিউবার জনগণের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক শাসন বজায় রাখতে ব্যবহৃত হয়েছিল। বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র এই যুক্তিটি অত্যন্ত সুযোগসন্ধানীভাবে ব্যবহার করেছিল। কারণ তারা দ্বীপটির উপর কার্যত আধিপত্য কায়েম করতে চেয়েছিল, কিন্তু সেই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের দায় নিতে চায়নি। একই ধরনের যুক্তি তারা ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পরও ব্যবহার করেছিল।[7]
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর একটি বড় ব্রিটিশ ব্যাঙ্কের কাছে কোস্টারিকার ঋণ বাতিলের প্রশ্নেও যুক্তরাষ্ট্র একইরকম সুযোগসন্ধানীর ভূমিকা নিয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম গোলার্ধে তখনকার প্রধান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ব্রিটেনের প্রভাব দুর্বল করা। এইভাবে মনরো ডকট্রিনের আওতায় কোস্টারিকার রক্ষক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা যুক্তরাষ্ট্রের নিজের স্বার্থের সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ ছিল।
মেজর জেনারেল স্মেডলি ডি বাটলারের সাক্ষ্য
১৯৩৫ সালে মেজর জেনারেল স্মেডলি ডি বাটলার— যিনি আমেরিকা মহাদেশে বহু মার্কিন সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন— অবসরজীবনে লিখতে গিয়ে ওয়াশিংটনের নীতিকে এভাবে বর্ণনা করেন:
আমি ৩৩ বছর ৪ মাস সক্রিয় সামরিক জীবনে কাটিয়েছি, এবং সেই সময়ের বেশিরভাগ সময় আমি ছিলাম বড় ব্যবসা, ওয়াল স্ট্রিট এবং ব্যাঙ্কারদের জন্য এক উচ্চমানের মাসলম্যান। সংক্ষেপে, আমি ছিলাম পুঁজিবাদের জন্য এক র্যাকেটিয়ার, এক গ্যাংস্টার। ১৯১৪ সালে আমি মেক্সিকোকে— বিশেষত ট্যাম্পিকোকে— আমেরিকান তেলস্বার্থের জন্য নিরাপদ করতে সাহায্য করেছি। আমি হাইতি এবং কিউবাকে ন্যাশনাল সিটি ব্যাঙ্কের লোকদের রাজস্ব আদায়ের জন্য মনোরম জায়গা করে তুলতে সাহায্য করেছি। আমি মধ্য আমেরিকার আধডজন প্রজাতন্ত্রকে ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থে লুটপাট করতে সাহায্য করেছি। ১৯০২–১৯১২ সালে আমি নিকারাগুয়াকে ব্রাউন ব্রাদার্স নামক আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কিং প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিষ্কার করতে সাহায্য করেছি। ১৯১৬ সালে আমেরিকান চিনি-স্বার্থের জন্য আমি ডোমিনিকান রিপাবলিককে আলোয় নিয়ে এসেছি। ১৯০৩ সালে আমি হন্ডুরাসকে আমেরিকান ফল কোম্পানিগুলোর জন্য ঠিকঠাক করে তুলতে সাহায্য করেছি।[8]
তবে মনে রাখা উচিত যে, এই কথাগুলি লেখার সময়ে তিনি সেই মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ ও নীতিগুলিরই এক প্রবল সমালোচকে পরিণত হয়েছিলেন যেগুলিতে তিনি নিজেই আগে অংশ নিয়েছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ২০২৬ পর্যন্ত পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ
১৯৪৫ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে একাধিক সামরিক হস্তক্ষেপ চালিয়েছে। এসব হস্তক্ষেপ কখনও গোপন অভিযান, কখনও প্রক্সি যুদ্ধ এবং কখনও সরাসরি সামরিক আক্রমণের আকারে ঘটেছে। এখানে আমি কেবল সবচেয়ে পরিচিত প্রত্যক্ষ সশস্ত্র হস্তক্ষেপগুলির কথাই উল্লেখ করব।
যুদ্ধ-পরবর্তী প্রথম বড় অভিযানটি সংঘটিত হয় গুয়াতেমালায়, ১৯৫৪ সালে। আইসেনহাওয়ার প্রশাসন CIA-র মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জ্যাকোবো আরবেনজ-কে উৎখাতের পরিকল্পনা করে, যে অভিযানের নাম দেওয়া হয় অপারেশন PBSUCCESS। এই অভিযানে বড় সংখ্যায় সেনা পাঠাতে হয়নি। CIA-প্রশিক্ষিত ও সশস্ত্র কয়েকশো যোদ্ধার হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সাংবিধানিক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে জেনারেলদের দিয়ে সফল অভ্যুত্থান ঘটানো হয়, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ এবং বিভিন্ন ধরনের লজিস্টিক সহায়তা। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ভূমিসংস্কার বন্ধ করা এবং কৃষি-শিল্প খাতে মার্কিন কোম্পানিগুলিকে জাতীয়করণের প্রক্রিয়া ঠেকানো।
১৯৬১ সালে দৃষ্টি ঘুরে যায় কিউবা-র দিকে। বিপ্লবী সরকারকে উৎখাত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত ‘বে অফ পিগস’ অভিযানে প্রায় ১,৪০০ কিউবান নির্বাসিতকে Brigade 2506 নামে সংগঠিত করা হয়েছিল, যাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রসজ্জা দিয়েছিল ওয়াশিংটন। সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও সমর্থনে অভিযানটি হলেও, কোনও নিয়মিত মার্কিন সেনাদল আনুষ্ঠানিকভাবে মাটিতে নেমে যুদ্ধ করেনি। ফলাফল ছিল দ্রুত ব্যর্থতা, এবং রাজনৈতিক দিক থেকেও বড় মূল্য দিতে হয়েছিল। বিপ্লবী প্রক্রিয়াকে রক্ষা করার জন্য কিউবার জনগণ ব্যাপকভাবে সংগঠিত হয়ে ওঠেন।
গুণগতভাবে বড় পরিবর্তন ঘটে ১৯৬৫ সালে ডোমিনিকান রিপাবলিকে। স্বৈরশাসক ট্রুজিলোর পতনের পর সেখানে গণতান্ত্রিকভাবে প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী জুয়ান বশ। কিন্তু শপথগ্রহণের মাত্র সাত মাস পরই তাঁকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এই অভ্যুত্থানকে সমর্থন করেছিল রক্ষণশীল অভিজাত শ্রেণি, যারা তাঁকে “অতিরিক্ত বামপন্থী” বা কমিউনিজমপন্থী বলে অভিযোগ করেছিল। এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠার মুখে ওয়াশিংটন অপারেশন পাওয়ার প্যাক শুরু করে। প্রায় ২২,০০০ মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হয় (অভিযানের পুরো সময়ে দ্বীপটিতে ৪০,০০০-এরও বেশি সৈন্য কাজ করেছিল)। মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি ছিল কয়েক ডজন। অন্যদিকে ডোমিনিকান পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির সাধারণভাবে স্বীকৃত হিসাব অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ২,০০০ থেকে ৪,০০০— যাদের মধ্যে বেসামরিক মানুষ ও যোদ্ধা উভয়ই অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সূত্র: ন্যাশনাল আর্কাইভস অ্যান্ড রেকর্ডস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, পাবলিক ডোমেইন
১৯৮০-র দশকে নিকারাগুয়াতে আরও পরোক্ষ এক কৌশল প্রয়োগ করা হয়। রেগান প্রশাসন সরাসরি সামরিক আক্রমণ চালায়নি; বরং কন্ট্রাস-দের সমর্থন, অর্থায়ন ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সান্দিনিস্তা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামায়। এই অভিযান ছিল এক ধরনের প্রক্সি যুদ্ধ— যেখানে মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হয়নি, কিন্তু সামরিক উপদেষ্টা, গোপন তত্ত্বাবধান এবং সুসংগঠিত লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করা হয়েছিল। এছাড়া ১৯৮৩ সালের শেষ থেকে ১৯৮৪ সালের শুরু পর্যন্ত নিকারাগুয়ার প্রধান বন্দরগুলির— করিন্টো, পুয়ের্তো সান্দিনো এবং এল ব্লাফ— জলের নিচে মাইন পেতে দেওয়া হয়। সরাসরি এই অপারেশনের তত্ত্বাবধান করেছিল CIA।
নিকারাগুয়া সে নিয়ে অভিযোগ দায়ের করার পর International Court of Justice (ICJ) একটি বহুল আলোচিত রায়[9] দেয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে অবৈধভাবে শক্তি প্রয়োগের জন্য কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়। আদালত রায় দেয় যে বন্দরগুলোতে মাইন পেতে দেওয়া এবং তেল-স্থাপনায় আক্রমণ চালানো অন্য একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ না করার নীতির লঙ্ঘন। মামলার প্রক্রিয়া চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্র ICJ-র বাধ্যতামূলক এক্তিয়ার স্বীকার করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর ওয়াশিংটন রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই রায় কার্যকর হওয়া আটকায়। রায়ে কয়েক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ছিল। যাই হোক, আন্তর্জাতিক আইনে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধকরণ ও অ-হস্তক্ষেপের নীতির ক্ষেত্রে এই ICJ রায়টি আজও একটি মৌলিক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই সময়ে এল সালভাদর, গুয়াতেমালা এবং হন্ডুরাসে CIA এবং মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞরা নিয়মিতভাবে কমিউনিজমবিরোধী দমনমূলক শাসনব্যবস্থাগুলিকে সমর্থন দেওয়ার জন্য হস্তক্ষেপ চালিয়ে গেছে।
১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র অপারেশন আর্জেন্ট ফিউরি চালিয়ে গ্রেনাডা আক্রমণ করে। প্রায় ৭,০০০ মার্কিন সৈন্য অবতরণ করে একটি দুর্বল হয়ে পড়া বামপন্থী সরকারকে উৎখাত করার জন্য। এই সংকটের সূত্রপাত হয়েছিল যখন সরকারের একাংশ মরিস বিশপ এবং নিউ জুয়েল মুভমেন্ট-এর অন্যান্য নেতাদের ক্ষমতাচ্যুত করে হত্যা করে। এই আন্দোলন গ্রেনাডায় সমাজতান্ত্রিক নীতির প্রচার করত। গ্রেনাডা সরকারের হাতে তখন প্রায় ১,০০০ যোদ্ধার একটি ছোট্ট সেনাবাহিনী ছিল। অভিযানটি ছিল স্বল্পস্থায়ী, কিন্তু এটি সরাসরি ও প্রকাশ্য সামরিক হস্তক্ষেপ প্রত্যাবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
১৯৮৯ সালের ডিসেম্বর মাসে পানামায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ছিল ডোমিনিকান রিপাবলিকে হওয়া অভিযানের পর সবচেয়ে বড় সামরিক অভিযান। অপারেশন জাস্ট কজ-এ প্রায় ২৭,০০০ মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল জেনারেল ম্যানুয়েল নরিয়েগা-কে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং সর্বোপরি পানামা খালের উপর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা। মার্কিন বাহিনীর নিহতের সংখ্যা ছিল কয়েক ডজন। অন্যদিকে পানামার ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে: বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৫০০ থেকে ৩,০০০-এর মধ্যে, যাদের মধ্যে সামরিক সদস্য ও বেসামরিক মানুষ উভয়ই ছিল। লড়াই প্রধানত পানামা সিটির শহুরে এলাকাগুলিতে কেন্দ্রীভূত ছিল, বিশেষ করে এল কোরিলো অঞ্চলে।
অপারেশন জাস্ট কজ; পানামা; ১৯৮৯। সূত্র: কম্বাইনড মিলিটারি সার্ভিস ডিজিটাল ফটোগ্রাফিক ফাইলস, পাবলিক ডোমেইন
১৯৯৪ সালে ওয়াশিংটন হাইতিতে হস্তক্ষেপ করে। অপারেশন আপহেল্ড ডেমোক্র্যাসি নামক সেই অভিযানে প্রায় ২৫,০০০ মার্কিন সৈন্য মোতায়েন করা হয়।
ভেনেজুয়েলায় গত ৩ জানুয়ারি যে সামরিক আগ্রাসন চালানো হল তাতে প্রায় ১৫০টি বিমান অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল পুয়ের্তো রিকোর রুজভেল্ট রোডস নৌঘাঁটি থেকে আনা F‑35A স্টেলথ যুদ্ধবিমান, যেগুলির লক্ষ্য ছিল ভেনেজুয়েলার S‑300 বিমানবিধ্বংসী ব্যাটারি ও রাডার ধ্বংস করা। এর সঙ্গে ছিল 160th Special Operations Aviation Regiment-এর এক ডজন পরিবহনক্ষম ও আক্রমণক্ষম হেলিকপ্টার। মূল হামলাটি পরিচালনা করে অভিজাত ডেল্টা ফোর্স বাহিনী, যাদের হেলিকপ্টারে করে সরাসরি মিরাফ্লোরস প্যালেস এবং ফোর্ট টিউনা-য় নামানো হয়। ধারণা করা হয় কয়েক শত কমান্ডো সরাসরি আক্রমণে অংশ নেয়, আর নৌবাহিনীর কয়েক হাজার সদস্য সমুদ্রের জাহাজগুলিতে প্রস্তুত অবস্থায় ছিল। প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদের পাশাপাশি গবেষণাকেন্দ্র, লা গুয়াইরার চিকিৎসা সরঞ্জামের গুদাম এবং যোগাযোগ অ্যান্টেনাগুলিও ধ্বংস করা হয়, যাতে ভেনেজুয়েলার সামরিক কমান্ড ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। সমুদ্রে USS Iwo Jima (LHD‑7)-কে কেন্দ্র করে একটি উভচর আক্রমণকারী নৌবহর এই অভিযানের লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এটিকে সহায়তা করছিল ডেস্ট্রয়ার জাহাজের একটি বহর এবং বিমানবাহী রণতরী USS Gerald R. Ford। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস-কে তাঁদের বাসভবন থেকে আটক করা হয়। সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন বাহিনী তাঁদের গুয়ান্তানামোর সামরিক ঘাঁটি হয়ে নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসে। আপাতত তাঁদের ব্রুকলিন জেলে রাখা হয়েছে, ২০২৭ সালে তাঁদের বিচার শুরু হওয়ার কথা। এই অভিযানের সময় প্রেসিডেন্টকে রক্ষা করতে গিয়ে ভেনেজুয়েলীয় ও কিউবান যোদ্ধাদের ৮০ জনেরও বেশি নিহত হয়েছেন।
এই তালিকাও সম্পূর্ণ নয়। এখানে আমি কেবল সেই ঘটনাগুলিই অন্তর্ভুক্ত করেছি যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মার্কিন সামরিক বাহিনী অথবা তাদের দ্বারা প্রশিক্ষিত ও পরিচালিত ভাড়াটে বাহিনী সরাসরি ব্যবহৃত হয়েছে। এর সঙ্গে পশ্চিম গোলার্ধে সংঘটিত বহু সামরিক ক্যু-দে-তার কথাও যোগ করা উচিত যেগুলি যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে এবং/অথবা তার সমর্থনে সংঘটিত হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়—
- কলম্বিয়া (১৯৫৩): গুস্তাভো রোজাস পিনিল্লা-র ক্যু-দে-তা।
- ব্রাজিল (১৯৬৪): অপারেশন ব্রাদার স্যাম-এর লজিস্টিক সহায়তার জোয়াও গুলার্টের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান।
- বলিভিয়া (১৯৬৪): জেনারেল রেনে ব্যারিয়েনটোস-এর ভিক্টর পাজ এস্তেনসোরো-কে ক্ষমতাচ্যুত করা।
- বলিভিয়া (১৯৭১): জুয়ান জোস টোরেস-এর বিরুদ্ধে জেনারেল হুগো ব্যানজার-এর ক্যু-দে-তা।
- চিলি (১৯৭৩): CIA-এর সমর্থন ও অর্থনৈতিক চাপে জেনারেল অগাস্তো পিনোচেত সালভাদর আলেন্দে-কে উৎখাত করে হত্যা করেন।
- উরুগুয়ে (১৯৭৩): তথাকথিত “নাগরিক-সামরিক ক্যু-দে-তা”।
- আর্জেন্টিনা (১৯৭৬): জর্জ রাফায়েল ভিদেলা-র নেতৃত্বে সামরিক জান্তা ইসাবেল পেরন-কে উৎখাত করে।
- ভেনেজুয়েলা (২০০২): হুগো শাভেজ-এর বিরুদ্ধে ব্যর্থ অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়। যুক্তরাষ্ট্র সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছিল, কিন্তু অভ্যুত্থান দুই দিনেরও কম সময়ে ব্যর্থ হয়।
- হাইতি (২০০৪): প্রেসিডেন্ট জঁ-বার্ট্রান্ড অ্যারিস্টাইড-কে জোর করে দেশছাড়া করা হয়। অভিযোগ ছিল যে বিদ্রোহের সময় মার্কিন বাহিনী তাঁকে অপহরণ করে সরিয়ে দেয়।
- হন্ডুরাস (২০০৯): প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল জেলায়া-কে উৎখাত। অন্তর্বর্তী সরকারকে বিতর্কিত কূটনৈতিক স্বীকৃতি।
- বলিভিয়া (২০১৯): প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস-কে পদত্যাগে বাধ্য করা।
- ভেনেজুয়েলা (২০১৯): ওয়াশিংটন জুয়ান গুয়াইদো-কে রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো-কে ক্ষমতাচ্যুত করতে আহ্বান জানান।
এবং এই তালিকাও সম্পূর্ণ নয়।
২০ এবং ২১ শতকে পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন হস্তক্ষেপের ক্রোনোলজি। এআই-এর সহায়তায় CADTM কর্তৃক নির্মিত
১৯৪৫ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে গোপন অভিযান থেকে শুরু করে প্রক্সি যুদ্ধ এবং প্রচলিত সামরিক আক্রমণ পর্যন্ত নানা ধরনের হস্তক্ষেপ চালিয়ে গেছে। এসবে সেনা মোতায়েনের পরিমাণও ছিল ভিন্ন ভিন্ন— গুয়াতেমালায় কয়েকশো থেকে শুরু করে পানামায় ২৭,০০০-এরও বেশি সেনা পর্যন্ত। এই হস্তক্ষেপগুলির মানবিক পরিণতি সংশ্লিষ্ট দেশগুলির জন্য ছিল গভীর ও সুদূরপ্রসারী— বিশেষ করে ডোমিনিকান রিপাবলিক এবং পানামার ক্ষেত্রে।
উপসংহার: ভূমি দখল থেকে গোলার্ধের আধিপত্য— সাম্রাজ্যবাদী ধারাবাহিকতা
যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে এবং সমগ্র পশ্চিম গোলার্ধে সংঘটিত যুদ্ধগুলির ঐতিহাসিক পর্যালোচনা একটি মৌলিক ধারাবাহিকতাকে স্পষ্ট করে। সহিংসতা আমেরিকার ইতিহাসে কোনও ব্যতিক্রম নয়; বরং সেটিই তার ভিত্তিগত কাঠামো। দেশীয় আমেরিকান জনজাতিদের ধ্বংস থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে অব্যাহত হস্তক্ষেপ পর্যন্ত— একই ধরনের যুক্তি ও কৌশল শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পুনরাবৃত্ত হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতার প্রথম শিকার আদিবাসী জনজাতির মানুষরা— তাঁদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, যুদ্ধের মাধ্যমে বিপুলভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, আদি বাসিন্দা থেকে সংরক্ষিত বানিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁদের সার্বভৌমত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। “অগ্রগতি” ও “সভ্যতা”-র নামে পরিচালিত এই অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ পরবর্তী হস্তক্ষেপগুলির জন্য আদর্শিক ও সামরিক কাঠামো তৈরি করে দেয়। “ফ্রন্টিয়ার”-এর সমাপ্তি সম্প্রসারণ থামায়নি; বরং সেটিকে কেবল অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে গেছে।
বিংশ ও একবিংশ শতাব্দী জুড়ে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন অজুহাতে এই একই যুক্তিকে সমগ্র পশ্চিম গোলার্ধ জুড়ে প্রয়োগ করেছে— কখনও কমিউনিজমের বিরুদ্ধে লড়াই, কখনও গণতন্ত্র রক্ষার নামে, আবার কখনও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অজুহাতে। পদ্ধতি সময়ের সঙ্গে বদলেছে, কিন্তু লক্ষ্য একই থেকেছে: বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ভূখণ্ড, সম্পদ এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
এই ধারাবাহিকতাকে চিহ্নিত করা কোনও মতাদর্শগত অনুশীলন নয়— বরং একটি রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা। এতে আমরা বুঝতে পারব যে আজ যে আগ্রাসনগুলো হচ্ছে, সেগুলো অতীতের ব্যতিক্রম নয়, বরং এক সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা। যতদিন এই ইতিহাস চাপা থাকবে বা একে লঘু করে দেখানো হবে, ততদিন যুক্তরাষ্ট্র যে হিংস্রতা দেখিয়ে যাচ্ছে সেগুলোকে প্রয়োজনীয় বা সঙ্গত বলে হাজির করা হতে থাকবে।
এই নিবন্ধ, বরং, ঘটনাগুলিকে তাদের প্রকৃত নামে চিহ্নিত করতে চায়, শাসিত ও নিপীড়িত জনগণের কণ্ঠস্বরকে আবার সামনে নিয়ে আসতে চায়, এবং এমন একটি স্পষ্ট সত্যকে স্মরণ করিয়ে দিতে চায় যা প্রায়ই আড়াল করে রাখা হয়—
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা গড়ে উঠেছে এবং আজও টিকে রয়েছে যুদ্ধ এবং অন্যান্য নানা ধরনের হিংস্রতার মাধ্যমেই।
স্বীকৃতি: নিবন্ধটি রিভিউ-এর জন্য রাফায়েল বার্নাবে, সুশোভন ধর এবং ম্যাক্সিম পেরিয়ট-এর কাছে লেখক কৃতজ্ঞ।
[1] ঊনবিংশ শতকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নেওয়া দেশীয় আমেরিকান জনগোষ্ঠীকে বলপূর্বক উচ্ছেদের নীতিই ‘ইন্ডিয়ান রিমুভাল’ নামে পরিচিত। সরকারিভাবে এই নীতি প্রয়োগের ভিত্তি ছিল ১৮৩০ সালে প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের নেওয়া ইন্ডিয়ান রিমুভাল অ্যাক্ট। মিসিসিপির পূর্ব পারে দেশীয় আমেরিকান জাতিগোষ্ঠীর যে বসতি এবং জমি ছিল, এই আইনের বলে সেগুলি হস্তান্তর করে তাঁদের আরও পশ্চিমদিকে— বর্তমান ওকলাহোমায়— পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য দরকষাকষির ক্ষমতা দেওয়া হয় ফেডারেল সরকারকে। বলাই বাহুল্য, এই দরকষাকষি প্রায়শই ছিল বলপ্রয়োগের নামান্তর। বাস্তবিকই, এই আইন প্রয়োগের ফল হয় ব্যাপক এবং হিংস্র উচ্ছেদ, হাজারে হাজারে আদিবাসী মানুষ নিহত হন, বিশেষ করে “ট্রেইল অফ টিয়ারস”-এর সময়ে, যার ফল সবচেয়ে বেশি ভুগেছিলেন চেরোকি সম্প্রসায়ের মানুষ। ‘উনিশ শতকে ইন্ডিয়ান রিমুভাল-এর অংশ হিসেবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চালানো যুদ্ধ…’ বাক্যাংশ দিয়ে এই সমস্ত বর্বরতা, রাজনৈতিক চাপ এবং সবলে উচ্ছেদকে বোঝানো হয়েছে, যেগুলির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আদিবাসী জনগণের জীবনের বিনিময়ে নিজেদের সীমানা পশ্চিমদিকে বিস্তৃত করে।
[2] Roosevelt Corollary. Wikipedia.
[3] Galeano, Eduardo. Open Veins of Latin America: Five Centuries of the Pillage of a Continent. London: Serpent’s Tail. 2009.
[4] Toussaint, Eric. The USA’s repudiation of the debt demanded by Spain from Cuba in 1898: What about Greece, Cyprus, Portugal, etc.? CADTM. Sep 8, 2016.
[5] Toussaint, Eric. What other countries can learn from Costa Rica’s debt repudiation. CADTM. Nov 1, 2016.
[6] Toussaint, Eric. The Doctrine of Odious Debt: from Alexander Sack to the CADTM. CADTM. Nov 24, 2016.
[7] Toussaint, Eric. The Odious Iraqi Debt. CADTM. Dec 12, 2017.
[8] ১৯৩৫-এর নভেম্বরে কমন সেন্স পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৩৬ সালে নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত লিও হুবারম্যান-এর ম্যান’স ওয়ার্ল্ডলি গুডস। দ্য স্টোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড অফ নেশনস দেখুন। উপরোক্ত উদ্ধৃতিটির অনুবাদ [ইংরেজি] নেওয়া হয়েছে এদুয়ার্দো গালেয়ানোর পূর্বোল্লিখিত বইটি থেকে। এটা বলে রাখা ভালো, ওকিনাওয়ার একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটির নামকরণ করা হয়েছে সামরিক নেতা স্মেডলি ডি বাটলারের নামে। তাঁর এই সাক্ষ্য অনিবার্যভাবেই সান ফ্রান্সিসকো থেকে ২০০৪ সালে বেরেট-কোয়েলার পাবলিশার্স প্রকাশিত জন পার্কিন্স-এর কনফেশনস অফ অ্যান ইকোনমিক হিটম্যান এবং আদার আনমাস্কিংস অফ গ্লোবাল পাওয়ার বই দুটির কথা মনে পড়ায়।
[9] Nicaragua v. United States. Wikipedia.
*নিবন্ধটি CADTM-এ গত ৪ মার্চ ইংরেজিতে প্রকাশিত।

