শুভ্র মৈত্র ও গৌতম পাল
সুজাপুর কালিয়াচক হয়ে মোথাবাড়ি চারমাথার মোড় পর্যন্ত প্রায় সমস্ত বুথেই একই চিত্র। বাতিল বা ডিলিটেড এই বিপুল সংখ্যক ভোটাররা গ্রামে বসে বসে ভাবছেন, এরপর কী? আর যাঁরা ভাগ্যবান, অর্থাৎ ভোট দিতে পেরেছেন, যেমন উত্তর লক্ষ্মীপুরের সামিউল আহমেদ, ভুগছেন অপরাধবোধে। “আমার, আমার ছেলের নাম আছে, কিন্তু আমার ভাইয়ের মেয়ের নেই। যেমন নেই গ্রামের বহু প্রতিবেশীর। কী করে ওদের মুখোমুখি হব বলতে পারেন?”
নতুন পটলডাঙা প্রাইমারি স্কুল বুথ। বুথ নম্বর ১৪১। সুজাপুর বিধানসভা। এই বুথটিই সুজাপুর বিধানসভার শেষ সীমানা, এরপরেই মোথাবাড়ি বিধানসভার শুরু। মনে পড়ছে, সেই মোথাবাড়ি! যেখানে কয়েকদিন আগেই সেই ‘ভয়ঙ্কর ঘটনা’ ঘটেছিল। সে ঘটনায় নাহয় পড়ে আসছি, আপাতত বুথের ভেতরে যাই চলুন।
বুথের সামনে রাস্তার উপর তিন-চারজন সিএপিএফ জওয়ান স্বয়ংক্রিয় রাইফেল কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, যেন পাহারা দিচ্ছেন একটা কেল্লা। ভেতরে ঢুকতেই এক-দুজন ভোটার ভোট দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। তখন প্রায় বেলা সাড়ে এগারোটা।
ভোট দিয়ে বেরিয়ে এলেন ৭৮ বছর বয়সি মোঃ হাসেন আলী। ভোট-উৎসবে অংশ নেওয়ার জন্য তার মধ্যে কোনও আনন্দ নেই, রয়েছে একগাদা উদ্বেগ। কারণ বাড়িতে আটটা ভোটের মধ্যে দুই ছেলের নাম ‘ডিলিটেড’ হয়ে গেছে ভোটার তালিকা থেকে। হাসেন আলীর ছোট ছেলে আজমল হক বললেন, “ড্রাইভিং লাইসেন্স, আধার কার্ড, প্যান কার্ড, জন্ম সার্টিফিকেট, জমির দলিল, এমনকি আমার বাপ-ঠাকুরদার ২০০২ সালের এসআইআর লিস্টে নাম থাকা সত্ত্বেও মেজদা ও সেজদার নাম কেন বাতিল হল আমরা বুঝতে পারছি না। বাকি সকলেরই নাম উঠেছে তালিকায়।” আজমলের কথায়, হাসেন আলীর বাবা সাবিরুদ্দিন সেখ ১১০ বছর বয়সে মারা গেছেন। তাঁদের দুজনেরই নাম ২০০২-এর ভোটার তালিকায় ছিল। শুধু তাই নয়, তাদের চার প্রজন্মের জমিজমার কাগজপত্রও রয়েছে। এতকিছু প্রমাণ দেওয়া সত্ত্বেও কেন এই দুই দাদার নাম বাতিল হল কেউ বলতে পারবেন?
বাষট্টি বছরের দিলীপ শেখ আবার বুঝতে পারছেন না, আফশোস করবেন কিনা। কারণ দুই ছেলের নাম উঠেছে লিস্টে, তারা ভোট দিতেও গেছে, কিন্তু তাঁর নিজেরই নাম নেই, “বাবা না থাকলে ছেলে এল কীভাবে বলতে পারেন?”
হাসেন আলীর প্রতিবেশী সিলু সেখের স্ত্রী ৬৫ বছর বয়সি জোনাকি বিবি পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। জোনাকির বাড়িতে মোট দশটা ভোটের মধ্যে তিনটে ভোট তালিকায় রয়েছে, বাকি ৭ জনই ‘বাতিল’ বা ‘ডিলিটেড’। সিলু ও জোনাকির নাম ২০০২-এর তালিকাতে থাকা সত্ত্বেও বাকি সাতজন ছেলেমেয়ে কেন বাতিল হল? প্রশ্ন জোনাকির। হতাশায় রাস্তা পার হয়ে উল্টোদিকের নতুন পটলডাঙা প্রাইমারি স্কুল বুথেই যাননি। এরা সবাই বছর বছর ভোট দিয়ে এলেও এ বছরই বাদ পড়ে গেলেন নির্বাচন কমিশনের তুঘলকি এসআইআর নিয়মের জালে আটকা পড়ে।
সিলামপুর প্রাইমারি স্কুলের ৫ নম্বর বুথে মোট ১০০৫টা ভোটের মধ্যে ৫৭৭টাই বাতিল। ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন হাফিজুদ্দিন শেখ। তাঁর বাড়ির ১৫টা ভোটের মধ্যে ১০টাই বাতিল। মঞ্জুর শেখের বাড়িতে একটা বাতিল। জোরেইফা বিবি লাইনে দাঁড়িয়েছেন ভোট দিতে। কিন্তু তাঁর স্বামী হাজিকুল আলমের নাম ২০০২-এর তালিকাতে থাকলেও এবারের এসআইআর লিস্টে ডিলিটেড। মৈনুদ্দিন ইসলাম বললেন এই বুথের সমস্ত নাগরিকের ভোট ২০২৫-এর তালিকাতে যেমন ছিল, তেমনই ২০২৬-এর ড্রাফট এসআইআর লিস্টেও ছিল। কিন্তু তারপর ৩১০ জন ভোটারকে কেন যে বাদ দেওয়া হল তার উত্তর আমাদের কাছে নেই। কমিশন বাদ দেওয়ার কোনও কারণও জানায়নি। সিলামপুর অঞ্চলের সরদারপাড়া, মোমিনপাড়ার সমস্ত মহিলা এবং পুরুষ ভোটাররা কার্যত গৃহবন্দি হয়ে রয়েছেন আজ। কারণ তাঁরা ‘ডিলিটেড’ ভোটার হওয়ার জন্য ভোটকেন্দ্রের আশেপাশে যাওয়ার অধিকারও হারিয়েছেন। এমনকি রাজ্য সড়কের ওপরেও তাঁরা উঠতে কার্যত ভয় পাচ্ছেন। সংবাদমাধ্যমের লোক জানার পরেও তাঁরা বিভিন্ন অনুনয়-বিনয় নিয়ে আসছেন, আমাদের নামটা তালিকায় উঠবে তো? নাজমা খাতুন নামে এক গৃহবধূর নাম লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির গেড়োয় আটকে গেছে। নামের বানানে ‘z’ ও ‘j’-র তফাৎ হওয়ায় নাজমা ডিলিটেড ভোটার লিস্ট থেকে। এরকম শয়ে শয়ে মহিলা ভোটাররা এদিন ছিলেন গৃহবন্দি, ভোটের পার্সেন্টেজে অংশ নিতে পারেননি। রিঙ্কি, রুবিয়া, রুমেলি, জাকেয়া, আম্বিয়া, জিলো, রৈফা, সারজেনা, মিঠু, মারিয়া, বেবি— সরদারপাড়ার এইসব মেয়েরা বিড়ি বাঁধা ফেলে রেখে ছুটে ছুটে এসে পৌঁছেছেন এই প্রতিবেদকদের কাছে, যদি নামটা ভোটার তালিকায় তোলার বন্দোবস্ত করা যায়!
যাঁরা বাইরে মজুর খাটতে গেছেন তাঁরাও এবার ফিরে এসেছেন ভোট দেওয়ার জন্য। শুধু ভোটটা দেওয়ার জন্য নয়, দেখে নিতে চেয়েছিলেন তাঁদের নামটা নাগরিক অধিকারের তালিকায় সুরক্ষিত আছে কিনা। ভেবেছিলেন ট্রাইবুনালে হয়তো নিষ্পত্তি হয়ে যাবে তাঁদের বিচারাধীন অবস্থার। জুগনু শেখ হায়দ্রাবাদ থেকে এবং জিয়েম শেখ বোম্বে থেকে দু-দুবার খরচ করে ঘরে ফিরেছিলেন শুনানিতে অংশ নেওয়ার জন্য। যথেষ্ট প্রমাণপত্রও দিয়েছেন তাঁদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে। এরপরেও তাঁদের নাম নথিভূক্ত করতে হয়েছে ট্রাইবুনালে বিচারের জন্য। ভেবেছিলেন ২১ তারিখের সাপ্লিমেন্টারি লিস্টে নাম উঠে যাবে। আশায় আশায় ছুটে এসেছিলেন ভোট দিতে, কার্যত হতাশ হয়েছেন। ভোট তো দিতে পারলেনই না, নতুন আশঙ্কা মাথায় ঢুকল, “জানেন তো এমনিতেই প্রতি মুহূর্তে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে এক বছর ধরে, এখন যদি ভোট না দিয়ে যাই, তাহলে তো বাংলাদেশি বলা অনেক সহজ হবে!” প্রবীণ ইস্তার শেখ, মাথা নাড়েন, “যতদিন না নাম উঠছে, ওরা আর গ্রাম ছেড়ে যাবে না।”
এরকম দিন-আনা-দিন-খাওয়া মানুষের সংখ্যা অগুন্তি। নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত, সমস্ত ডকুমেন্টের অধিকারী মতিউর রহমানের অভিমান, “আমার কাছে কী ডকুমেন্ট নেই— পাসপোর্ট, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, ইউনিভার্সিটির সার্টিফিকেট-সহ যা যা চাইবেন সবই আছে। তা সত্ত্বেও আমার নাম কেন বাদ হল তালিকা থেকে? এর কোনও উত্তর আছে? আমার বাড়িতে আমার ভাবি-সহ আলিনগর সামীর ঘরামিটোলার ২১১ জন নাগরিকের নাম এইভাবেই বাদ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন কোনও সদুত্তর দেয়নি।”
সিলামপুর ছেড়ে পটলডাঙা হয়ে আমরা যতই এগিয়েছি মোথাবাড়ির দিকে, সব জায়গাতেই একই ছবি। রাস্তাঘাট শুনশান, ভোট দিতে না পারা মানুষজন হয় গৃহবন্দি নতুবা সিএপিএফ-এর ভয়ে গ্রামের মধ্যেই একরাশ হতাশা নিয়ে বসে রয়েছেন। ভোট দিতে না পারার যন্ত্রণা চোখেমুখে পরিষ্কার। বুথগুলিতে ভোটারের লাইন এমন কিছু নয় যে সন্ধ্যা-রাত অব্দি টেনে নিয়ে যেতে হবে প্রিসাইডিং অফিসারকে। তাড়াতাড়ি ভোট শেষ করতে পারবেন বলে অনেক পোলিং পারসোনালই খুশি। ভোটার তালিকায় যে কয়জনের নাম উঠেছে তাঁরাও ছাড়তে চাইছেন না এইবারের ভোট দেওয়ার অধিকারকে। পরবের সময় যত লোক বাইরে থেকে ঘরে ফিরে আসেন তার চেয়ে অনেক বেশি এবার ফিরে এসেছেন ভোট দিতে। তালিকাভুক্ত প্রায় সকলেই তাঁদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগ করছেন। এই বিশ্লেষণ মোথাবাড়ি সিলামপুরের মানুষের মুখে মুখে। মাহালদারপাড়ার মোঃ রাজিউল মাহালদার তাঁর ক্ষোভ উগরে দিলেন। বললেন, “এই দিনটা আমাদের জন্য একটা কালো দিন। দিনটার ইতিহাস কোনওদিনই ভোলা যাবে না। আমরা একই বাড়িতে— এক ভাই বৈধ ভোটার, বাকি দুইজন ডিলিটেড। কী কারণে, উত্তর দিন নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। আমাদের দুঃখ মাহালদারপাড়ার ৩ নম্বর বুথে ৫২৭ জন ডিলিটেড। ছেলের ভোট আছে, অথচ বাবার ভোট নেই। এটা কী করে হয়? আমাদের জোর করে বাদ দেওয়ার এই চক্রান্ত কোনওদিনই মেনে নেব না।”
কিছু শুকনো তথ্যের দিকে তাকানো যাক, বুথ নং ১৩৭, প্রতাপপুর মেহেরবিশ্বাসটোলা প্রাথমিক বিদ্যালয়। মোট বাতিল ভোটার ৪০১ জন। বুথ নং ১৩৯, কেশরপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়। মোট বাতিল ভোটার ৫৭৯ জন। বুথ নং ১৪০, পটলডাঙা হোসনাবাদ এমএসকে। মোট বাতিল ভোটার ৫৪৮ জন।
সুজাপুর কালিয়াচক হয়ে মোথাবাড়ি চারমাথার মোড় পর্যন্ত প্রায় সমস্ত বুথেই একই চিত্র। বাতিল বা ডিলিটেড এই বিপুল সংখ্যক ভোটাররা গ্রামে বসে বসে ভাবছেন, এরপর কী? আর যাঁরা ভাগ্যবান, অর্থাৎ ভোট দিতে পেরেছেন, যেমন উত্তর লক্ষ্মীপুরের সামিউল আহমেদ, ভুগছেন অপরাধবোধে। “আমার, আমার ছেলের নাম আছে, কিন্তু আমার ভাইয়ের মেয়ের নেই। যেমন নেই গ্রামের বহু প্রতিবেশীর। কী করে ওদের মুখোমুখি হব বলতে পারেন?”
ওহো, বলাই হয়নি, সেই ‘বিভীষিকা’র মোথাবড়িতে চলে এসেছি অনেক আগেই। সেই রাতে (১ এপ্রিল) ব্লক অফিসে নয়জন বিচারককে, যাদের মধ্যে কয়েকজন মহিলা, আটকে রেখে কার্যত পণবন্দি করেছিলেন গ্রামের মানুষ। জানতে চেয়েছিলেন কোন বিচারে তাঁরা ডিলিটেড। ওঁরা জানতেন না বিচারকরা জনগণের সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারেন না, কিন্তু কে জানাবে এতদিন ধরে ভোট দেওয়ার পরেও এবার তালিকা থেকে বাদ পড়ার কারণ, জানতেন না সেটাও। কিন্তু তা বলে এমন হিংস্র হয়ে উঠবেন বিচারকদের ওপরে? গাড়ি ভাঙচুর হবে?
সেদিনের কথা তুলতেই হইহই করে উঠলেন মুজিবর, রাজিউল, সেতাবুদ্দিন, আমির-রা— “কোথায় ভাঙচুর হয়েছে, একটা গাড়ি দেখান তো! যে গাড়ির ভাঙা কাচ দেখাচ্ছে, ওটা কার গাড়ি খোঁজ নেন তো! শুধু আটকে রাখা হয়েছিল সেটা ঠিক, কিন্তু তাঁদের কোনও অসুবিধা হয়েছে? আটকে রাখাটা অন্যায় মানছি, কিন্তু মানুষ বিচার চাইতে কোথায় যাবে?” তাহলে সেই আবেগ থরথর গলায় শুনলাম, “অন্ধকার রাত, কয়েকশো মানুষ, মুহুর্মুহু গাড়ির বনেটের ওপর রড…, গাড়ির ভেতরে অসহায় একজন বিচারক, এক অসহায় মা…!” ওঁদের কথায় শুধু রাত্রিটা ছাড়া সবটাই ভুল। আর বলছেন— “এতদিন তো মোথাবাড়ির ‘হিংসা’, ‘সন্ত্রাস’ দেখালেন, এবারে তার কারণটাও দেখান!”
একদিকে ভোটের রেকর্ড শতাংশ যখন হিসেবে বসিয়েছে সব পক্ষকে, তখন বাতিলদের দীর্ঘশ্বাসে আরও ভারি হচ্ছে মালদার বাতাস।
*মতামত ব্যক্তিগত

