Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আদিবাসীদের নিয়ে রাজনীতিও শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠছে

মনীষা বন্দ্যোপাধ্যায়

 


পশ্চিমবঙ্গে আদিবাসী জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৭.৫ শতাংশ হলে তার মধ্যে ৬০ শতাংশ সাঁওতাল জনগোষ্ঠী। এই মুহূর্তে এই জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একটি প্রধান বিচার্য বিষয় ছিল তাদের ধর্মীয় স্বীকৃতি। বিষয়টি নিয়ে বৃহত্তর জনসমাজে ধারণা বা চর্চা কিছুই তেমন নেই। সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর দাবি ছিল এটাই যে, তাদের ধর্মমতকে মান্যতা দিতে হবে, জনগণনায় সারনা ধর্মের কোড রাখতে হবে

 

সরকারে পালাবদল ঘটলেই ধরে নেওয়া হয় যে দীর্ঘকালীন অনুন্নয়ন এবং পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির কারণেই জনগণের রায় ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে গেছে। কিন্তু আদিবাসীদের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে গোটা দেশেই তথাকথিত উন্নয়ন বা সর্বভারতীয় ভাষায় ‘ভিকাস’ এক ভয়াবহ বিনাশ নিয়ে এসেছে। ভারতের যে সমস্ত অঞ্চলে প্রকৃতির সঙ্গে সুসংহত হয়ে জনজাতিগোষ্ঠীর বাস, সেখানেই বিপুল খনিজ সম্পদ পাওয়া যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গেই সরকার এবং কর্পোরেটের সাঁড়াশি আক্রমণে সেখানকার মানুষের উচ্ছেদ শুরু। বহু জায়গায় মানুষ আন্দোলন করছেন। একটা সময় পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি এবং দরকষাকষি করেই এই উচ্ছেদপ্রক্রিয়া চলত, কিন্তু এখন সেই নীতির বিরুদ্ধে মানুষ সরব। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে অবশ্য বিষয়টি অন্যরকম।

বীরভূম জেলায় আদিবাসী-প্রধান পাঁচামি অঞ্চলে বিশাল কয়লা পাওয়া এবং তাই নিয়ে অতি বৃহৎ প্রকল্পের সম্ভাবনায় উচ্ছেদ এবং পুনর্বাসন দুই-ই ছোটখাটো আন্দোলনের পর হয়ে গেছে।‌ যা হয়নি তা কোনওদিনই হয়নি— অর্থাৎ, জনজাতি গোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন। কিছু মানুষ নেতা হয়েছেন, সাধারণের সঙ্গে তাঁদের দূরত্ব বেড়েছে, ক্ষোভ জমা হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকরি কোনও ক্ষেত্রেই অভূতপূর্ব কিছু ঘটেছে এমনটা নয়।‌ অতএব না-পাওয়ার বিষয়টা একই থেকে গেছে। রাজা যে জামা গায়েই আসুক, দিন বদলায়নি।

কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিচিতি বা আইডেন্টিটি রাজনীতি যা এখন গোটা ভারতে শিকড় গেড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে আদিবাসী জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৭.৫ শতাংশ হলে তার মধ্যে ৬০ শতাংশ সাঁওতাল জনগোষ্ঠী। এই মুহূর্তে এই জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে একটি প্রধান বিচার্য বিষয় ছিল তাদের ধর্মীয় স্বীকৃতি। বিষয়টি নিয়ে বৃহত্তর জনসমাজে ধারণা বা চর্চা কিছুই তেমন নেই। সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর দাবি ছিল এটাই যে, তাদের ধর্মমতকে মান্যতা দিতে হবে, জনগণনায় সারনা ধর্মের কোড রাখতে হবে।

নেতৃবৃন্দের মতে পশ্চিমবঙ্গে ৩০ লাখেরও বেশি মানুষ এই ধর্ম অনুসরণ করে। এগুলি বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বীরভূম, বর্ধমান, হুগলি, মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। এই ধর্ম হিন্দু ধর্ম থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আদিবাসী ধর্মগুলোকে হিন্দুত্বের ব্যাপক ব্যানারের অধীনে আনার ব্যাপারে বিজেপির জেদ আদিবাসীদের অনুভূতিতে আঘাত করেছে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা এবং আসামে সারনা ধর্মের স্বীকৃতির দাবিতে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই চলছে।

২০২৩ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভায় একটি প্রস্তাব পাশ করে ‘সারিধর্ম’ ও ‘সারনা ধর্ম’-কে স্বীকৃতি দেন এবং হিন্দু ধর্ম থেকে এদের স্বতন্ত্রতাকে স্বীকার করে নেন। তাঁর দল কেন্দ্রকেও একই কাজ করার জন্য চিঠি লিখেছিল। এই পদক্ষেপটি নির্বাচনী সুফল বয়ে আনে: ২০১৯ সালে যে আদিবাসী ভোট তৃণমূল থেকে বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়েছিল, তা ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দৃঢ়ভাবে মমতার দলের সঙ্গেই থেকে যায়।

কিন্তু পরবর্তীতে পরিস্থিতি বদলেছে।‌ এই সমস্যা গভীরে এবং এটি রাষ্ট্রীয় সমস্যা। আদিবাসী কি হিন্দু— এই পুরাতন এবং জটিল প্রশ্নটি আবার বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ তাদের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পরে পরেই আদিবাসী সমাজের ভিতরে কাজ শুরু করে দেয়। আদিবাসী শব্দের পরিবর্তে তাদের শব্দ বনবাসী এবং এই নামে তৈরি করা আশ্রম সর্বত্র। বনবাসী রামের বন্ধু। তারাও রাম-রাবণের যুদ্ধে রামের পক্ষে লড়েছেন এমন আভাসও দেওয়া আছে। ইদানিং একটি নতুন চর্চা হল সনাতন এবং সারনার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। দুটোই এক এবং আদিকাল থেকে চলে আসছে। অতএব সবাই হিন্দু।‌‍ বৃহত্তর ক্ষেত্রে প্রধান শত্রু যেমন মুসলমান, এখানে সেটি হল খ্রিস্টান।

 

এ-কথা অনস্বীকার্য যে জনজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে খ্রিস্টান মিশনারিদের আগমন তাদের শিক্ষা এবং ক্ষমতায়নের পথে অনেক দূর নিয়ে গেছে। এদের একটা বড় অংশ খ্রিস্টান হয়েছে। এখন দ্বন্দ্ব খ্রিস্টান বনাম হিন্দুর। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি সাম্প্রদায়িক। ওড়িশার সেই ঘটনাটি হয়তো স্মরণে আছে যে ধর্মান্তরের অভিযোগে গ্রাহাম স্টেইনস ও তার দুই নাবালক পুত্রকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।‌ সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর বহুকাল কেটে গেছে। কিন্তু আবার সেই প্রসঙ্গ সামনে এসেছে।‌ ইতিমধ্যে ধর্মান্তর-বিরোধী আইনকানুন হয়েছে, কিন্তু আবারও সেই সংরক্ষণের প্রসঙ্গটাই সামনে আসছে। যারা খ্রিস্টান আদিবাসী তারা সংরক্ষণের সুবিধা পাবে না, এটাই বড় দাবি।

অল ইন্ডিয়া বনবাসী কল্যাণ আশ্রম আরএসএস-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। যদিও এর ঘোষিত উদ্দেশ্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের উন্নয়ন, দুটি বিষয় স্পষ্ট:

আদিবাসী ঐতিহ্য, পূজার রীতি ও বিশ্বাসকে হিন্দুধর্মের সঙ্গে সমন্বিত করার একটি প্রচেষ্টা; এবং খ্রিস্টধর্ম ও ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী আদিবাসীদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার প্রচেষ্টা।

এখানে স্মরণ রাখা উচিত ভারতীয় সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। তফসিলি জনজাতির জন্য সংরক্ষণ জাতি-পরিচয়ের ভিত্তিতে করা হয়, ধর্মের ভিত্তিতে নয়।

সুতরাং, কোনও আদিবাসী ব্যক্তি খ্রিস্টধর্ম বা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও তার আদিবাসী পরিচয়ের কোনও পরিবর্তন হয় না। এমন পরিস্থিতিতে, শুধুমাত্র ধর্ম পরিবর্তনের ভিত্তিতে সংরক্ষণ ব্যবস্থা বন্ধ করার প্রচেষ্টা সংবিধানের নীতির পরিপন্থী। ইদানিং বিরসা মুন্ডাকে নিয়ে বহু কর্মকাণ্ড চলছে, কিন্তু যেটা খেয়াল করা হয় না যে ভগবান বিরসা মুন্ডা খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার পর তাঁর নিজস্ব বিরসাই ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, কিন্তু হিন্দুধর্মে প্রবেশ করেননি।

কিন্তু খ্রিস্টানদের শত্রু চিহ্নিত করে দেওয়ার প্রক্রিয়া আবারও এক সাম্প্রদায়িক সমস্যার সৃষ্টি করছে। তার সঙ্গে সংরক্ষণের ভাগিদারীর প্রশ্ন গোটা বিষয়টি অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে।

 

জঙ্গলমহলে একটি বড় জনগোষ্ঠী কুড়মিরা। তাদের সমস্যা অন্যরকম। তাঁরা বহুকাল ধরে তফসিলি জনজাতি গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি চাইছেন অর্থাৎ এসটি স্ট্যাটাস চাইছেন। এ ব্যাপারে রাজ্য সরকারের যে সুপারিশ প্রয়োজন তা ঠিকমতো করা হয়নি বলেই তাঁরা মনে করেন। সে-কারণে কুড়মি জনগোষ্ঠী সরাসরি তৃণমূলের বদলে বিজেপিকে ভোট দেওয়ার আহ্বান দিয়েছেন। এই গোষ্ঠীর একাংশের মতে এসটি সংরক্ষণের বেশিরভাগ লাভটাই পায় সাঁওতাল গোষ্ঠী। এই নিয়ে সাঁওতাল এবং কুড়মিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রবল। ওদিকে কুড়মিদের নেতা রাজেশ মাহাতোকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর হামলার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়, যে ঘটনা সম্পূর্ণভাবে কুড়মি সমাজকে বিমুখ করেছে। পুরুলিয়া জেলায় (যেখানে কুড়মি জনসংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ) প্রভাবশালী আদিবাসী কুড়মি সমাজের রাজ্য কমিটির আহ্বায়ক দীপেন্দু মাহাতো সংবাদমাধ্যমকে বলেন: “রাজ্য সরকার আমাদের পরিচয় অস্বীকার করছে। আমাদের তফসিলি জনজাতি (ST) মর্যাদা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যা কেন্দ্রে পাঠানোর কথা, ২০১৭ সাল থেকে সেই সব ফাইলে চাপা পড়ে আছে। আমাদের দীর্ঘ আন্দোলনের পরেও আমরা সেই ফাইলটি এগোতে পারিনি।”

বিজেপিও পাল্টা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, তারা সংবিধানের অষ্টম তফসিলে কুড়মালি [কুডমিদের ভাষা] এবং রাজবংশী সম্প্রদায়ের ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করবে।

 

নির্বাচনের ফলাফলের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল অবশ্যই এসআইআর। যদিও ২০১১ সালের আদমশুমারিতে প্রায় ৫২ লক্ষ তফসিলি জনজাতি বা এসটি গণনা করা হয়েছিল, সর্বশেষ প্রশাসনিক পরিসংখ্যানে এই সংখ্যা দেখানো হয়েছে প্রায় ৮০ লক্ষ, যার ফলে প্রায় ২৭ লক্ষের একটি গরমিল তৈরি হয়েছে। প্রচার হয়েছে যে এই পরিস্থিতি জাল সার্টিফিকেট দেওয়ার জন্য হয়েছে।‌ এর ফলে বিশেষ করে বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের তরুণদের মধ্যে শংসাপত্র যাচাইয়ের জোরালো দাবি উঠেছে‌। এসআইআর জাল এসটি-দের ধরে দেবে এই ভাবনা প্রচার হওয়ায় বাইরে কর্মরত সমস্ত আদিবাসী মানুষ ভোট দিতে আসেন। যার ফলস্বরূপ ৯২.৪৭ শতাংশের এক উল্লেখযোগ্য ভোটদানের হার পরিলক্ষিত হয়।

এর পাশাপাশি, শিক্ষাগত সুযোগ-সুবিধার অবনতি আরেকটি বড় কারণ। জানা যায়, আদিবাসী ছাত্রাবাসের সংখ্যা ১,০০০ থেকে কমে ৩০০-তে নেমে আসে, যা দূরবর্তী অঞ্চলের নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলে যাওয়ার সুযোগ সীমিত করে দেয়। উপরন্তু, উৎসশ্রী প্রকল্প শিক্ষকদের শহরে স্থানান্তরের সুবিধা দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলে, যার ফলে তথাকথিত “শিক্ষকহীন গ্রাম”গুলো পেছনে থেকে যায়। এর ফলে একটি প্রজন্মগত বিদ্রোহের জন্ম হয়: আদিবাসী যুবকেরা, বিশেষ করে যারা মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কলেজে যোগ দিতে আগ্রহী ছিল, তারা একটি রাজনৈতিক সংগঠক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। উত্তরবঙ্গের ৩০টি বিধানসভা আসনে প্রভাবশালী রাজবংশী সম্প্রদায় তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যেকার রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল যেখানে প্রতিটি দলই এই সম্প্রদায়কে নিজেদের পক্ষে টানার চেষ্টা করছে। রাজবংশীদের একাংশ বৃহত্তর কোচবিহার আন্দোলন এবং কামতাপুরী আন্দোলনে জড়িত ছিলেন।‌

২০২৩ সালে বিজেপি গ্রেটার কোচবিহার ডেমোক্রেসি পার্টির বিতর্কিত কিন্তু প্রভাবশালী নেতা অনন্ত রায়কে (ওরফে অনন্ত মহারাজ) রাজ্যসভায় মনোনীত করে। যদিও অনন্ত তখন থেকে গ্রেটার কোচবিহারের দাবি নিয়ে নীরব রয়েছেন। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ৩০টি রাজবংশী-অধ্যুষিত আসনের মধ্যে ২১টিতে জয়লাভ করে এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও ২১টি বিধানসভা কেন্দ্রে পুনরায় এগিয়ে থাকতে সক্ষম হয়। এখানে তৃণমূলের প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা কমই ছিল।‌

 

পরিচিতির রাজনীতি আজ সর্বব্যাপী। দেশের শীর্ষ পদে রয়েছেন মাননীয়া দ্রৌপদী মুর্মু যা সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর কাছে বিশেষ গৌরবের। কিন্তু সেই অবস্থানের ফলে আদিবাসী সমাজের সার্বিক কল্যাণ হয়েছে এমনটা বলা যায় না।‌ ধর্মীয় পরিচিতির স্বীকৃতি, সংরক্ষণের সুবিধা পাওয়া এবং পাশাপাশি দুর্নীতি ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চনাই হয়তো আদিবাসী গোষ্ঠীকে অন্যভাবে ভাবিয়েছে।

 

 

Exit mobile version