অপর্ণা ঘোষ
সংকীর্ণ ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি গণতন্ত্রের দৈন্য, নাগরিকের ভোটারে সংকোচন। ধর্ম, জাতপাত ও জাতিপরিচয়ের চশমায় দেখা নাগরিক যেমন গণতন্ত্রের দীনতা, তেমনি এর মাধ্যমে শ্রেণি-রাজনীতির দুর্বলতাও প্রকট হতে থাকে। প্রতীকি প্রতিনিধিত্বকে প্রকৃত ক্ষমতায়ন হিসেবে দেখার বিপজ্জনক প্রবণতা গোষ্ঠীর ‘ক্রিমি লেয়ার’-এর হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটায়। সবই চেনা কথা, তবুও এরই মধ্যে চক্কর কেটে বেড়ানোটাও জরুরি
প্রাক-কথন
সমকালীন ভারতবর্ষে ‘ভোটব্যাঙ্কে’র ধারণা নির্বাচনী ব্যবস্থা ও রাজনীতির কেন্দ্রমূলে ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে। মোটামুটিভাবে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির বাড়বাড়ন্তের জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করে থাকে নিয়মিত এবং প্রতিটি দলই নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও উন্নয়নের প্রকৃত ধ্বজাধারী হিসেবে চিত্রিত করতে প্রবল উদ্যোগ নিয়ে থাকে।
যদিও ‘ভোটব্যাঙ্ক’ শব্দটিকে সংজ্ঞায়িত করা খুব সহজ নয়। বর্তমান সংসদীয় রাজনীতিতে সামগ্রিকভাবে জনসাধারণ ভোটব্যাঙ্ক হিসেবেই বিবেচিত হন। অন্যদিকে শুধু রাজনৈতিক পলেমিকের অস্ত্র হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলি সংরক্ষণের নীতিগুলিকেও প্রায়শই নির্বাচনী তোষণের কাঠগড়ায় তুলে দেয়। সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি পিছনে পড়ে যায়। অতএব প্রতর্কটি নিজেই এক ধরনের তীব্র মেরুকরণ সৃষ্টি করে চলেছে ক্রমাগত, অস্বচ্ছ হয়ে পড়েছে এর গভীরতর ঐতিহাসিক এবং কাঠামোভিত্তিক বৈশিষ্ট্যগুলি। ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতিকে শুধুমাত্র নির্বাচনী তোষণের দাঁড়িপাল্লায় না মেপে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে কী ধরনের ঐতিহাসিক শর্তাবলি ও বস্তুগত পরিস্থিতি পরিচিতি-ভিত্তিক রাজনীতির একটা দৃঢ় সংহতি তৈরি করতে পারে— রাজনৈতিকভাবে জাত-পাত, লিঙ্গ, ধর্মীয় পরিচিতি অথবা জাতি-পরিচয় কেমন করে অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। পুঁজিচালিত একটা রাষ্ট্রব্যবস্থা সামাজিক দ্বন্দ্বগুলিকে যে সংবিধানিক এবং নির্বাচনী বন্দোবস্তের মধ্যে দিয়ে নিরসনের চেষ্টা করে তারই ফলিত প্রকরণ হিসেবে ‘সংরক্ষণ’ ও ‘ভোটব্যাঙ্ক’ একই সারিতে ব্যবহৃত হতে থাকে।
ভারতে ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির ইতিহাস নিশ্চিতভাবেই ঔপনিবেশিক সময়কালের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের নকশায় নিহিত প্রক্রিয়া থেকেই জন্ম নিয়েছে এবং তা জন্ম নিতে পেরেছে ভারতে বিদ্যমান দীর্ঘকালীন বিচিত্র জাত-পাত ব্যবস্থার কারণে। যে ব্যবস্থাকে ঔপনিবেশিক শাসক তার শাসন-সুবিধার্থে একটা শক্ত কাঠামো দান করেছিল। ১৯৪৭-পরবর্তী সময়ে পুঁজিচালিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক প্রশাসনের ‘সোনার পাথরবাটি’কে একটা রূপ দিতে গিয়ে ‘সদর্থক পদক্ষেপ’ (affirmative action) হিসেবে ঐতিহাসিক অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ‘সংরক্ষণ ব্যবস্থা’ ছিল একটি ‘গণতান্ত্রিক প্রত্যুত্তর’। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলির কাছেও নির্বাচনী অস্ত্র হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই তা ক্রমশ ধারালো হয়ে ওঠে। ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি সাময়িকভাবে প্রান্তিকায়িত সম্প্রদায়গুলিকে প্রতিনিধিত্বের স্বাদ দিতে পারে, কিন্তু লম্বা দৌড়ে তা প্রায়শই গণতান্ত্রিক নাগরিকত্বের মূল শর্তগুলিকে লঘু করতে থাকে। সম্প্রদায়ের পরিচিতি তাদের নাগরিক পরিচয়কে নির্বাচনের বাজারে ক্রমাগত খর্ব ও অপমানিত করতে থাকে। অস্তিত্বের খণ্ডীকরণ ও কাঠামোভিত্তিক অর্থনৈতিক বৈষম্যগুলো ‘ভোট-আলোচনার’ আড়ালে চলে যায়। সদর্থক রাজনীতির সূচক হিসাবে সামাজিক ন্যায়বিচার বা সম্পদের পুনর্বণ্টনের ধারণা থেকে সমকালীন ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির যোজন দূরত্ব।
ভোটব্যাঙ্ক আসলে কী
সাধারণভাবে— পিছিয়ে পড়া, বৈষম্য-পীড়িত সামাজিক কোনও সম্প্রদায়, ধরে নেওয়া হয়, যারা কোনও একটি রাজনৈতিক দলকে সামগ্রিকভাবে ভোট দেবেন— সম্প্রদায়গত সুরক্ষা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বা প্রতীকী স্বীকৃতি অথবা কিছু বাস্তবিক ফায়দা পাওয়ার শর্তে। অবশ্য নব্য-উদারবাদী জমানার লোকরঞ্জন প্রকল্পগুলি ভোটব্যাঙ্কের ধারণাকে আরও বিস্তৃত এবং একইসঙ্গে খণ্ডীকৃত করেছে। যাইহোক, দেখা যাচ্ছে ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির নিহিতার্থই হচ্ছে সীমায়িত লেনদেন এবং তা সম্পন্ন হচ্ছে নির্বাচনী স্বার্থে— রাজনৈতিক এলিট এবং সঙ্ঘবদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে। মনে রাখতে হবে প্রকৃত ক্ষমতায়নের প্রশ্ন এখানে শুধু অবহেলিত নয়, অনুপস্থিত। উদারনৈতিক রাজনীতির তত্ত্বগুলো মোটামুটিভাবে একমত, যে গণতন্ত্র কার্যকরী হয়ে ওঠে যুক্তিবোধসম্পন্ন নাগরিকের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক নীতিগুলির মধ্যে থেকে বেছে নেওয়ার ক্ষমতার মধ্যে দিয়ে। একই সঙ্গে এর সীমাবদ্ধতা হল এই ব্যবস্থায় জনসাধারণের কোনও প্রকৃত ‘স্বাধীন পছন্দে’র সুযোগ থাকে না। নাগরিক কোনও বিমূর্ত বিষয় নয়। সে তার শ্রেণি, জাতি, সম্প্রদায় এবং সামাজিক গোষ্ঠীর অংশ হিসাবেই নির্বাচনী ব্যবস্থায় অংশ নিয়ে থাকে। ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির বাস্তব উপস্থিতি তাই শুধুমাত্র ‘ম্যানিপুলেশনে’র ক্ষেত্র নয়। সামাজিক অসাম্যের চালচিত্রে সম্প্রদায়গত রাজনৈতিক স্বার্থের ফুটে ওঠা। প্রশ্নটা এখানেই যে এই স্বার্থ আদৌ গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়ন ঘটায় নাকি কাঠামোয় নিহিত আধিপত্যেরই পুনর্জন্ম দিতে থাকে।
ভোটব্যাঙ্ক: ইতিহাসের শিকড়
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন খুব নিয়ম-নিষ্ঠ আকারে জনগণনা, আইন-কোড এবং প্রতিনিধিত্বমূলক প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে দিয়ে উপমহাদেশের সমাজকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিভাজিত করেছিল। উপনিবেশ-পূর্ব সমাজের বিচিত্র জনসমুদায়, তাদের সামাজিক সম্পর্কগুলি ছিল জটিল, স্তরান্বিত, পরস্পর-অন্বিত, কখনও পরস্পর-আবৃত (overlapping)। এই সমাজকে কতগুলি নির্দিষ্ট, অনড় প্রশাসনিক গোষ্ঠী বা খণ্ডে বেঁধে ফেলা হয়। যেমন, ‘সেপারেট ইলেকটরেট’ তৈরির মধ্যে দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ধারণাকে ধর্মীয় ও জাতপাতভিত্তিক নির্বাচনক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। যেখানে ‘demographic strength’ হিসাবে নির্বাচনী রাজনীতি শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে। ‘সর্বজনীন নাগরিকত্বে’র ধারণা ঔপনিবেশিক কাঠামোয় আশাও করা যায় না। ঔপনিবেশিক শোষণের তা পরিপন্থী। ৪৭-এ ক্ষমতা হস্তান্তরের বহু আগেই রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও স্বীকৃতি পাওয়ার প্রতিযোগিতা ভারতীয় সমাজে চারিয়ে গেছে, ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির শিকড়ও।
সংবিধান: অন্তর্নিহিত ছন্দপাত
নিঃসন্দেহে ভারতীয় সংবিধানে ‘প্রাপ্তবয়স্কের সর্বজনীন ভোটাধিকার’ একটা বৈপ্লবিক উদবর্তন, সর্বজনীন রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিকত্বের স্বীকৃতি। একই সঙ্গে সংবিধানে স্থান পেয়েছিল দীর্ঘকালীন ঐতিহাসিক অসাম্য ও নিপীড়ন-বৈষম্যের বিরুদ্ধে সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা— সংরক্ষণ-ব্যবস্থা যার প্রতিফলন। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সদর্থক পদক্ষেপ (affirmative action) ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সুরক্ষা ছিল সংরক্ষণের উদ্দেশ্য ও গভীর তাৎপর্য। বাস্তবে কী ঘটেছে তা অবশ্য আমরা জানি। সহস্রাব্দ-লালিত সামাজিক লাঞ্ছনা-বঞ্চনা থেকে নিয়মতান্ত্রিক সাংবিধানিক পদক্ষেপ দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়া যায়নি। প্রকৃত ক্ষমতায়নের বদলে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখলের উদ্দেশ্যে সামাজিক গোষ্ঠীগুলিকে ব্যবহার করবার প্রবণতা বেড়েছে। বেড়েছে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা। নির্বাচনের বাজারে সংরক্ষণকে ব্যবহার করে ভোট-সমাবেশ ঘটাতে রাজনৈতিক দলগুলো শিখে নিয়েছে। এখানে খুব জরুরি দুটি প্রশ্ন স্মৃতিতে অবশ্যধার্য।
এক, সংবিধান পরিষদ জনগণ দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত পরিষদ ছিল না। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের শুরুয়াৎ যে সভার মাধ্যমে হচ্ছে, সেখানে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মানুষের উপস্থিতির অনুপাত কেমন ছিল তা আগ্রহী পাঠক দেখে নিতে পারেন।
দুই, বঞ্চিত ও বৈষম্যপীড়িত মুসলমান সমাজ (সাচার কমিটি রিপোর্ট দ্রষ্টব্য) কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ ভারত-রাষ্ট্রে ধর্মীয় পরিচিতির ভিত্তিতে কোনও সংরক্ষণ পাওয়ার অধিকারী নন (দেখতে পারেন ওবিসি-এ ক্যাটাগরি নিয়ে বিতর্ক)।
সংরক্ষণ: সামাজিক ন্যায়বিচার বনাম নির্বাচনী প্রকৌশল
সংরক্ষণ নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ঐতিহাসিকভাবে সুবিধাভোগী সামাজিক অংশের সংখ্যাগুরু অংশ সংরক্ষণকে সামাজিক অসাম্য হিসেবে বর্ণনা করতে চায়, কারণ নিঃসন্দেহে সংরক্ষণ ব্যবস্থা তাদের আধিপত্যকে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জের সামনে ফেলে দেয়। বাস্তব পরিসংখ্যান অবশ্য উল্টো চিত্রই দেয়। একইসঙ্গে এ-কথা অনস্বীকার্য ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী সংরক্ষণ যেমন একটি অনিবার্য দাবি, তেমনই তা প্রকৃত ক্ষমতায়নের পথে একটি সীমিত পদক্ষেপ। প্রান্তিকায়িত জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্র অংশের প্রতিনিধিত্বের বা ‘আপওয়ার্ড মবিলিটি’র আভাস প্রস্তুত করে মাত্র। কিন্তু সম্পদ পুনর্বণ্টন ও উৎপাদন কাঠামোয় তাদের অবস্থানের পুনর্বিন্যাসকে নিশ্চিত করে না, বা সম্প্রদায়ের সামূহিক অধিকার অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে না। কাঠামোভিত্তিক বৃহত্তর শোষণের পটভূমিতে একটি ক্ষুদ্র শিক্ষিত প্রভাবশালী অংশ তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক দলগুলো এই দ্বন্দ্বটাকে ব্যবহার করে। যেমন কোটার সম্প্রসারণ, সংরক্ষণ-সঞ্জাত সুযোগ-সুবিধা আদায় ইত্যাদি নির্বাচনী ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। সংরক্ষণ ব্যবস্থার মধ্যে ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ এবং ‘ভোট-সমাবেশ’ দুয়েরই সম্ভাবনা নিহিত থাকে। কাজেই সংরক্ষণ মানেই ‘ভোটব্যাঙ্ক’ অথবা সংরক্ষণ হল সামাজিক বৈষম্য দূর করার অমোঘ শস্ত্র— এই দুটি আপাতসরল কোনও বিরোধী অবস্থান নয় বরং সংশ্লিষ্ট ও সম্পৃক্ত।
১৯৪৭-পরবর্তী পর্যায়
ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তিনটি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ভোটব্যাঙ্ক সংহত হওয়ার একটা প্রাথমিক পর্যায় লক্ষ করা গেছে।
এক, ধর্মীয় ও জাতপাতগত প্রতিনিধিত্ব, জাতগণনা, সম্প্রদায়ভিত্তিক নির্বাচনী সংহতি;
দুই, স্বাধীনতার পর প্রথম দশকে কংগ্রেসের ‘সবাইকে কব্জা’ করার নির্বাচনী কৌশল;
তিন, নিয়মতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক সাম্য প্রতিষ্ঠার পরও শ্রেণি, জাতপাত, ধর্ম, লিঙ্গ ইত্যাদির ভিত্তিতে অসাম্যের উচ্ছেদ না হওয়া।
১৯৪৭ থেকে ১৯৬৭— এই পর্যায়কে ভারতে জাতীয় কংগ্রেসের আধিপত্যের যুগ বলা যায়। রজনী কোঠারি ‘কংগ্রেস সিস্টেম’ বলতে যা বুঝিয়েছিলেন তা হল দলিত, উচ্চবর্ণ, মুসলমান, ভূমিসম্পন্ন কৃষক, আঞ্চলিক অভিজাত এবং বাণিজ্যিক স্বার্থগোষ্ঠী— এই সব ধরনের গোষ্ঠীর সঙ্গে কংগ্রেসের জোট গঠন। সম্পদ-সম্পর্কে কোনওরকম মৌলিক পরিবর্তন না ঘটিয়ে বিভিন্ন কৌশলে কংগ্রেস একটি বৃহৎ শাসন-জোট গড়ে তুলেছিল, ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক স্বার্থকে এর মধ্যে জায়গা করে দিয়ে। আংশিক অসমাপ্ত ভূমিসংস্কার, থাকবন্দি জাত-পাত কাঠামোর অচলায়তন, অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ— এই ছিল কংগ্রেস জমানার ভিত্তি। সেদিক থেকে বলা যায় যে সম্প্রদায়-ভিত্তিক নির্বাচনী দরকষাকষির দরজাটা কংগ্রেসই খুলে দিয়েছিল।
১৯৬০ এর দশক থেকে হিন্দুত্ববাদীরা বিশেষত, কংগ্রেসের ‘মুসলমান তোষণ’ নিয়ে সোচ্চার হতে থাকে। সংখ্যালঘুদের বিদ্যায়তনে সুরক্ষা, ‘মুসলিম পার্সোনাল ল’ সংস্কার করতে কংগ্রেসের অনুৎসাহ, কংগ্রেস নেতৃত্বের মুসলমান সমাজের ধর্মীয় গুরুদের সঙ্গে প্রতীকী যোগাযোগ— এসবই হিন্দুত্ববাদীরা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরতে থাকে। বাস্তবে দেশভাগের পর থেকে রাজনৈতিকভাবে, অর্থনৈতিকভাবে মুসলমানরা সাংঘাতিকভাবে স্বল্প-প্রতিনিধিত্বসম্পন্ন (underrepresented)। সুতরাং ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষার’ নীতিগুলি এমনি এমনি ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়নি।
১৯৬০-পরবর্তী সময়ে বড়সড় পরিবর্তন ঘটে যায়। আঞ্চলিক দলগুলোর উত্থান এবং সোশালিস্ট আন্দোলন ওবিসি, দলিত এবং পিছিয়ে পড়া কৃষক জাতগুলিকে সংহত করে। রাম মনোহর লোহিয়া দাবি করেছিলেন যে রাজনৈতিক শক্তির প্রবাহ উচ্চবর্ণের আধিপত্য থেকে নিম্নবর্ণের দিকে ধাবিত হওয়ার সামাজিক প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য। ১৯৯০-এর দশকে মন্ডল কমিশন এই প্রক্রিয়াটিকে জোরদার করে।
অন্যদিকে ১৯৮০-র দশক থেকে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সংহতিকরণ শুরু হয়। বিজেপি ছিল তার রাজনৈতিক মুখ। তাদের কৌশল ছিল ছোট গোষ্ঠী-সংহতির পরিবর্তে অখণ্ড হিন্দু-পরিচিতির বলয় রচনা। এক নতুন রাজনৈতিক পরিচিতি, গরিষ্ঠতাবাদী ধর্মীয় ব্লক। প্রচলিত ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির বদলে এর সমর্থকরা উড়িয়ে দিল উগ্র ‘সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদে’র ধ্বজা। এইভাবে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাত ধরে, বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীকে হাতিয়ার করে বিকশিত হল। ভারতে পুঁজির বিকাশ ঘটল এই সমস্ত বিচিত্র জাতপাতের আধিপত্য, ধর্মীয় বৈষম্য ও বিভাজন এবং অর্থনৈতিক অসাম্যের মধ্যে দিয়ে, এগুলিকে ব্যবহার করে। শ্রেণিস্বার্থের নানা বৈশিষ্ট্যচিহ্ন প্রতিসৃত হয়ে গেল সামাজিক পরিচিতির প্রশ্নে। এবং তাকে ঘিরে আবর্তিত হল নির্বাচনী রাজনীতির প্রতিযোগিতা। বিভিন্ন শাসকবর্গ ও অভিলাষী অভিজাতের ক্ষমতা-প্রত্যাশা এই ‘বিভাজিত পরিচিতির’ সমাজ থেকে ফায়দা লুটতে লাগল।
ভোটব্যাঙ্ক ও তার বর্তমান পরিপ্রেক্ষিত
সমকালীন ভারতে সিডিউল কাস্ট, ওবিসি ছাড়াও ভাষিক, আঞ্চলিক, লিঙ্গ, এথনিক পরিচিতির নির্বাচনী সমাবেশ ঘটে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের দ্বারা। লোকরঞ্জন প্রকল্পগুলিরও উদ্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্ক থাকে যার প্রথম সারিতে আছেন মহিলারা, কখনও যুবারা। সেটা নির্ভর করে সেই সময়ে ভোটারসংখ্যায় সেই গোষ্ঠীর অনুপাতের ওপর, নির্ভর করে ভোট বিধানসভার নাকি লোকসভার, বিধানসভা হলে কোন অঞ্চল… ইত্যাদি নানা মাপকাঠি। অধুনা ভোটকুশলীরা একে একেবারে নান্দনিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন যা প্রকৃতপক্ষে ছেঁড়াখোঁড়া গণতন্ত্রকে সমাধির রাস্তায় টেনে নিয়ে যেতে পারে। নব্য-উদারবাদী জমানায় লোকরঞ্জন প্রকল্পের অনিবার্যতা মেনে নিয়েও বলতেই হবে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ থেকে ভোটারের চোখ সরিয়ে নিতে এর জুড়ি নেই।
মুসলমান ভোটব্যাঙ্কের কথা আলাদা করে বলতেই হবে, কারণ তাঁরা অত্যন্ত সংহত একটি ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে চিত্রিত হন যেন-বা তাঁরা গণতন্ত্রের ধারণাবিহীন মননবিহীন একটি ভোটারসমষ্টি মাত্র। অথচ বিভিন্ন সার্ভে ও পরিসংখ্যান বলে তাঁদের ভোটিং নকশায় যথেষ্ট বৈচিত্র্য রয়েছে এবং থাকে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক বিধানসভা ভোটকে উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। উল্টোদিকে গরিষ্ঠতাবাদী বিজেপির কাছে তাঁরা একটি ‘নেগেটিভ’ ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে বিবেচিত হন, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর তালিকায় মূলত মেহনতি মানুষেরা এবং মহিলারা বাদ পড়লেও গোষ্ঠী হিসাবে মুসলমানদের বাদ পড়বার একটি স্পষ্ট প্যাটার্ন লক্ষ করা গেছে।
সামাজিক ন্যায়বিচার, সম্পদের পুনর্বন্টন, সর্বজনীন অধিকার, সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের উপর ভিত্তি করে নির্বাচনী রাজনীতির পরিসর তৈরি না হলে ভারতবর্ষে গণতন্ত্রের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। বিশেষত এই মুহূর্তে তা অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে।
ভোটব্যাঙ্কের গেরুয়াকরণ
ভারতবর্ষের চিরাচরিত ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক পাল্টা ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির আগ্রাসী উদাহরণ তৈরি করেছে বিজেপি (নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগের কথায় যাচ্ছি না, এই রচনায় অপ্রাসঙ্গিক, যদিও এই মুহূর্তে সর্বাধিক প্রাসঙ্গিক ভারতীয় গণতন্ত্রের নিরিখে)।
বিজেপি ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতির রূপান্তর ঘটিয়েছে গরিষ্ঠতাবাদী প্রকল্পে, যার ভিত্তি হিন্দু-পরিচিতি। বিদ্যমান বর্ণবাদের বিন্দুমাত্র নড়চড় না ঘটিয়ে বৃহত্তর ধর্মীয়-রাজনৈতিক অখণ্ড হিন্দুত্বের কল্পনাকে বিজেপি ভোটের বাক্সে রূপ দিচ্ছে। এই মতাদর্শের সমর্থকরা একে দেখছেন জাতি-নির্মাণ ও গণতন্ত্রের সংহতিকরণ প্রকল্প হিসেবে। আসলে তা ক্ষইয়ে দিচ্ছে প্রান্তিকায়িত সংখ্যালঘুর পরিচিতি এবং সেই সঙ্গে শ্রেণীভিত্তিক লড়াইগুলির ধার। গরিষ্ঠতাবাদী এই প্রকল্পের সার্থক রূপায়ণ ঘটাতে সে ব্যবহার করছে সর্বজনীন লোকরঞ্জন প্রকল্প, অন্যদিকে ক্রমাগত মুসলমান-বিদ্বেষী ন্যারেটিভ। তুলে আনছে বাংলাদেশি মুসলমানের অস্তিত্ব এবং তাঁদের দ্বারা জাতীয় সুরক্ষা বিঘ্নিত হওয়ার কল্পিত সম্ভাবনা। একদিকে উন্নয়নের চোখধাঁধানো গল্প আসলে যার ভিত্তি নিহিত বৃহৎ/কর্পোরেট পুঁজির আগ্রাসী বিস্তারে। একদিকে দলিতের, ওবিসির প্রতীকি অন্তর্ভুক্তি, আম্বেদকর ভজনা— অন্যদিকে দলিত নিধন। কেনা মিডিয়ার গোলামবৃত্তির কারণে দ্বিতীয় ধারার গল্পগুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। বিকাশ, দেশপ্রেম, জাতীয় সুরক্ষা ও মুসলমানের অপরায়ন– এই সব স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে তার বিপুল হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক। ভারতীয় সমাজ পরিসরে এমন ভয়ঙ্কর, এমন বিধ্বংসী ভোটব্যাঙ্ক নির্মাণ আগে কখনও ঘটেনি।
শেষ কথা
সংকীর্ণ ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি গণতন্ত্রের দৈন্য, নাগরিকের ভোটারে সংকোচন। ধর্ম, জাতপাত ও জাতিপরিচয়ের চশমায় দেখা নাগরিক যেমন গণতন্ত্রের দীনতা, তেমনি এর মাধ্যমে শ্রেণি-রাজনীতির দুর্বলতাও প্রকট হতে থাকে। প্রতীকি প্রতিনিধিত্বকে প্রকৃত ক্ষমতায়ন হিসেবে দেখার বিপজ্জনক প্রবণতা গোষ্ঠীর ‘ক্রিমি লেয়ার’-এর হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটায়। সবই চেনা কথা, তবুও এরই মধ্যে চক্কর কেটে বেড়ানোটাও জরুরি।
সেই চেনা ছকেই শ্রেণি ও জাতপাতের আন্তঃসম্পর্ক ও মহাবিতর্ককে স্মরণে রেখে আম্বেদকরের সতর্কীকরণ আরও একবার ঝালিয়ে নিচ্ছি— রাজনৈতিক গণতন্ত্র কখনওই সামাজিক গণতন্ত্র ছাড়া অর্জিত হতে পারে না; আর সেই সঙ্গে মার্কসবাদী যুক্তিও— শ্রেণিশোষণ ক্রমাগত সামাজিক বিভাজনের জন্ম দিতে থাকে। ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি শুধুমাত্র নির্বাচনী কৌশল নয়, ভারতীয় সমাজে নিরসন না হওয়া সামাজিক দ্বন্দ্বগুলোর উৎক্ষেপ।

