Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

সিনেমা যখন প্রচারযন্ত্র

সত্যব্রত ঘোষ

 

সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত দুটি হিন্দি সিনেমা নিয়ে চারপাশে অনেক ধরনের কথা শোনা যাচ্ছে। “দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার” এবং “উরি”। প্রথমটি অত্যন্ত সাধারণ মানের এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দ্বিতীয় ছবিটি শিল্পগুণান্বিত হলেও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে দর্শক সাধারণের প্রত্যাশা মেটাতে পারেনি। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিদুটি নিয়ে ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর পাঠকদের জন্য একটি আলোচনা।

গণমাধ্যম হিসেবে সিনেমা কতটা কার্যকরী, তা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বহু আলোচনা হয়েছে। সিনেমার মনোরঞ্জনের মোড়কটির প্রতি কর্তৃপক্ষের সন্দিহান দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব এবং প্রকাশ বিষয়ে বিতর্ক এখনও থামেনি। তবে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ইদানিং একটি প্রবণতা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। এর আগে কংগ্রেসকে পরাস্ত করে ভিপি সিং প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়টিতে অমিতাভ বচ্চন এবং রাজেশ খান্নার হাস্যকর দ্বৈরথ দেখা গিয়েছিল ১৯৮৪ সালে। ‘ইনকিলাব’ এবং ‘আজ কা এমএলএ’ ছবিদুটি নিয়ে। যার বিষয় নায়কের রাজনীতির আঙিনায় প্রবেশ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের বিনাশ। এর পর ১৯৯৬ সালে অটল বিহারী বাজপেয়ি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আমরা দেখেছি শহীদ ভগৎ সিং-এর জীবনী অবলম্বনে ছবি করবার হিড়িক, (সেই সময়ে ভগৎ সিং-এর জীবনী অবলম্বনে অন্তত ছয়টি ছবি মুক্তি পেয়েছিল একের পর এক। তবে ১৯৬৫ সালে বানানো মনোজ কুমারের “শহিদ” এবং ২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রাজকুমার সন্তোষী-র “দ্য লেজেণ্ড অফ ভগৎ সিং” বাদে কোনও ছবিই মনে রাখেনি কেউ) যার মূল উদ্দেশ্য স্বাধীনতা সংগ্রামে কংগ্রেসের ভূমিকাকে চ্যালেঞ্জ করে সমান্তরাল এক ইতিহাস রচনা।

উক্ত সিনেমাগুলি বাণিজ্যিক হিন্দি সিনেমার ছক মেনেই বানানো হয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিবিদরা সৌজন্য মেনে নেপথ্যে এবং পরোক্ষে থাকাটাকেই শ্রেয় মনে করেছেন। কিন্তু ইদানিং আমরা লক্ষ্য করছি সিনেমাকে নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করবার জন্য রাজনীতিবিদেরা এখন এই মাধ্যমটির সঙ্গে নিজেদের প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে নিতে বিন্দুমাত্র ইতস্তত করছেন না। সম্মিলিত এই প্রয়াসগুলি কৌতুহলোদ্দীপক এই কারণে যে, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং জনসমর্থনের ক্রমিক ক্ষীয়মাণতা অনুভব করবার পর ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখবার জন্য কী ভাবছেন, তার প্রতিফলন ঘটছে সিনেমার পর্দায়।

সিনেমা নির্মাণের শৈল্পিক ও কারিগরি দিকগুলির মধ্যে যে জটিলতা আছে, তা নিয়ে গাঙ্গেয় রাজনীতিবিদরা সাম্প্রতিক কাল অবধি একেবারেই মাথা ঘামাননি। ছবি বানানোর পর জনসমক্ষে আসবার আগে তাঁরা বিচলিত হতেন শুধু এই ভেবে যে, ছবিটি তাঁদের দলীয় অথবা ব্যক্তি ইমেজকে ‘কালিমালিপ্ত’ করছে কি না। তেমন কোনও ইঙ্গিত পেলে প্রশাসনকে ব্যবহার করে ছবি প্রদর্শনে বারবার ব্যাঘাত ঘটানো হত। মনোরঞ্জন-পিপাসু দর্শকদের ‘অসাড়’ মনে সচেতনতা বৃদ্ধি যে সিনেমার মাধ্যমে ঘটবে না, সেই বিষয়ে তাঁরা প্রায় নিশ্চিত ছিলেন। অথচ গত ষাট বছরের বেশি সময় ধরে দক্ষিণ ভারতে, বিশেষত তামিলনাডুতে রাজনীতি ও সিনেমার মেলবন্ধনে ক্ষমতার যে সমীকরণ ঘটেছে, তাতে আঞ্চলিক রাজনীতির চেহারাটাই সম্পূর্ণ পাল্টেছে। এটি উপলব্ধি করবার পরেও হয়তো ল্যুটিয়েন দিল্লির অধিবাসীরা সিনেমাকে মাধ্যম হিসেবে তাচ্ছিল্য করতেন। কারণ, দেশের উপর পারিবারিক স্বত্ব বজায় রাখার জন্য সাধারণ মানুষকে আধুনিক ভারতের প্রচলিত ইতিহাসের স্বাধীনতা সংগ্রামের অধ্যায়টি মনে করিয়ে দেওয়াটাকেই তাঁরা যথেষ্ট মনে করতেন। এতে যে আধিপত্যের বিস্তার, তার বিরুদ্ধে ওঠা কণ্ঠস্বরগুলিকে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনযন্ত্র ব্যবহার করে হয় স্তব্ধ করেছেন, নয়তো নিজেদের অনুকূলে এনেছেন তাঁরা।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্তত চার দশক ধরে তাঁদের কার্যকরী হাতিয়ার ছিল ‘লাইসেন্স রাজ’। নব্বুইয়ের দোরগোড়ায় আন্তর্জাতিক অর্থ বিনিয়োগ সংস্থাগুলির বিশাল ঋণের ভারে জর্জরিত অবস্থায় যখন প্রায় বাধ্য হয়ে বিশ্বায়নে আস্থা জ্ঞাপন করলেন তাঁরা, পরিস্থিতি তখন জটিল থেকে জটিলতর হল। আমন্ত্রিত বহুজাতিক কোম্পানিগুলির শর্তাবলী, আগ্রাসী নীতিসমূহ, বাজার থেকে লভ্যাংশ আদায়ের বিপণন কৌশল এবং বিজ্ঞাপন জগতের দাপটের কারণে ল্যুটিয়েন দিল্লির অধিবাসীরা আধিপত্য বিস্তারের উপায়গুলিকে নতুনভাবে বিন্যাস করবার প্রক্রিয়া শুরু করলেন বটে। তবে উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাবে সেগুলি কার্যকর তো হলই না, বরং বাণিজ্যজগতের সঙ্গে বরাবর ঘনিষ্ঠ দক্ষিণপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি ঘটতে থাকল। বঞ্চনা এবং দারিদ্রে চিরকাল পীড়িত দেশবাসীকে ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িক করে তোলবার যে সুপ্ত প্রক্রিয়াটি কার্যশীল ছিল, তা বামপন্থী সমাজবাদীদের আপত্তি ও বিরোধিতাকে প্রায় নস্যাৎ করে প্রবলভাবে মূলস্রোতে চলে এল এর পর।

আজ যে ভারতবর্ষে আমরা বাস করি, মেরুকরণ সেখানে ঘোর বাস্তব। দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবোধের সঙ্গে এখানে এখন অনায়াসে ধর্ম এবং সম্প্রদায়ের অনুষঙ্গ এসে যায়। অথচ, ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের সময়ে নরেন্দ্র মোদিকে বহুবার বলতে শুনেছিলাম ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’। ল্যুটিয়েন দিল্লির থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুটি সরে যাওয়ার ফলে ইনক্লুসিভ পলিটিক্স-এর সম্ভাবনা বিষয়ে দেশবাসী কিছুটা আশান্বিত হয়েছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু শাসনভার গ্রহণের পর গুণগতভাবে কোনও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাতে পারেননি মোদি সরকার। একদিকে ল্যুটিয়েন দিল্লির স্থিতাবস্থা বজায় রাখবার মানসিকতা আর অন্যদিকে নাগপুরের উগ্র হিন্দুত্ববাদের প্রচারসর্বস্বতার মাঝখানে অবস্থান করবার ফলে দেশবাসীকে সাক্ষী হতে হয় গোমাতা সুরক্ষায় হিংস্র মানুষদের নিষ্ঠুর হত্যালীলার; শিল্পপতির ছদ্মবেশধারী ঋণখেলাপী বিজয় মালিয়া, নীরব মোদি এবং মেহুল চোকসির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণে আইনব্যবস্থার শিথিলতার; আদানি এবং আম্বানির ক্রমিক সমৃদ্ধির; বিভিন্ন রাজ্যে কৃষকদের প্রতি বঞ্চনার মাত্রা সহ্যাতীত হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নির্বিকারত্বের; নোটবন্দির কুনাট্যের; অত্যাবশকীয় দ্রব্যাদির নিরন্তর মূল্যবৃদ্ধির, জাতীয় নাগরিক পঞ্জীকরণের অজুহাতে সংখ্যালঘু উৎখাতের প্রয়াসের এবং সুপ্রিম কোর্টের রায় উলঙ্ঘনের ঘটনাবলীর।

বস্তুত, “আচ্ছে দিন”-এর স্বপ্ন দেখিয়ে ৫৬ ইঞ্চি ছাতির পুরুষটিকে সুকৌশলে ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদির শরীরে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে বটে। কিন্তু তাঁর নেতৃত্বে থাকা সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষ যে আস্থা হারাচ্ছে, তা স্পষ্ট হয়েছে গত এক বছরে। অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদের প্রাবল্যের কারণে ভারতের স্বরাষ্ট্রনীতি এবং বিদেশনীতিতে যে অনমনীয়তা তৈরি হয়েছে, তাতে এমন ভাবা ভুল হবে না যে ঘরে বাইরে আমরা এখন শত্রুবেষ্টিত। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস সহ বিরোধী দলগুলির জোট যেভাবে অনবরত গড়ছে আর ভাঙছে তাতে অদুর ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সংঘাতের তীব্রতা বাড়বে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ আরও বিঘ্নিত হবে।

আর একবার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে শাসক দল যে নবতম পদ্ধতি গ্রহণ করেছে, তা শুধু নির্বুদ্ধিতাই নয়, আত্মনাশীও বটে। নির্বুদ্ধিতা এই কারণে যে টেলিভিশন ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলির উপর আধিপত্য বিস্তারের লাগাতার চেষ্টার পাশাপাশি তাঁরা চলচ্চিত্রকেও প্রচারের হাতিয়ারে যুক্ত করতে সমমনোভাবাপন্ন মানুষদের ব্যবহার করছেন। দক্ষিণ ভারতের রাজনীতিতে দ্রাবিড় সত্তাকে মূলস্রোতে আনবার নেপথ্যে চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। গাঙ্গেয় রাজনীতিতে এখন হিন্দুসমাজকে জাগ্রত করবার আকাঙ্খা নিয়ে চলচ্চিত্রকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে হয় ক্ষমতাসীন দলের প্রচারযন্ত্র হিসেবে সিনেমাকে সীমিত করবার চেষ্টা হবে, নয়তো বিরোধীদের হেয় করবার কাজে ব্যবহৃত হবে। এক্ষেত্রে যা লক্ষণীয় তা হল, বিশ্বস্ত কিন্তু নিম্নমেধার মানুষজনের প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্ব এবং মেধাবী চলচ্চিত্রকারের শৈল্পিক ভাবনায় হস্তক্ষেপ। এই প্রবণতা বৃদ্ধি পেলে শুধু শাসক দলেরই নয়, সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্রকারদের বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে বই বাড়বে না। সেই দিক থেকে দেখলে চলচ্চিত্রকে নিছক প্রচারযন্ত্র করে তোলাটা আত্মনাশী এক প্রবণতা ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, টিকিট কিনে প্রেক্ষাগৃহে বসে কোনও ব্যক্তি অথবা দলের প্রচারে শরিক হওয়ার অভ্যাস গাঙ্গেয় ভূমির অধিকাংশ সাধারণ ভারতীয়দের মধ্যে এখনও তৈরি হয়নি।

প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া অ্যাডভাইসার সঞ্জয় বারুর স্মৃতিচারণ ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হওয়ার পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয় “দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার” নিছক গল্পকথা ছাড়া আর কিছুই নয়। সেই বিতর্কিত বইটি অবলম্বন করে বিজয় রত্নাকর গুপ্তে যে নিকৃষ্ট ছবিটি বানালেন, তা ভুলতে দর্শকদের বিশেষ সময় লাগবে না। তবুও যে ছবিটি আলোচনার বৃত্তে আসছে, তার অন্যতম কারণ হল, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে এখানে মস্করার পাত্র বানানো হয়েছে সম্পূর্ণভাবেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে। যে স্পর্ধা নিয়ে অভিনেতারা ছবিটিতে বাস্তব এবং জীবিত মানুষদের হাবভাব এবং কথা বলবার ভঙ্গি নকল করেছেন, তা ন্যক্কারজনক বললে কম বলা হয়। যে সেন্সর (সার্টিফিকেশন) বোর্ড ছবিতে দর্শিত ব্যক্তির দ্বারা রক্তমাংসের মানুষের চরিত্রহনন বিষয়ে এযাবৎ অতিরিক্ত সংবেদনশীল ছিল (এবং থাকবে), প্রসূন যোশির সভাপতিত্বে তা কীভাবে এতটা উদার হল, তা আন্দাজ করলে শিহরিত হতে হয়। (আগামী ২৫শে জানুয়ারি শিবসেনা প্রমুখ বালাসাহেব থাকরে-র জীবনী অবলম্বনে নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকি অভিনীত এবং অভিজিৎ পানসে নির্দেশিত “থাকরে” ছবিটি মুক্তির পর সম্ভবত আবার আমরা চমকে উঠব।) “দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার” ছবিটির বিশেষত্ব বলে যদি কিছু আদৌ থাকে, তা হল এর একমাত্রিক উপস্থাপন, যা সাধারণ দর্শকদের বিরক্তি উদ্রেক করবেই। অথচ, ছবিটিতে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এমন এক শিক্ষিত এবং নিষ্ঠাবান মানুষের দ্বিধাদ্বন্দ্বের গল্প ছিল, যে পারিপার্শ্বিক কারণে অসহায়তার শিকার হচ্ছে। সক্ষম কোনও চিত্রনির্মাতা এমন একটি গল্প নিয়ে কাজ করলে তা চরিত্র এবং ঘটনার নানা স্তর উন্মোচন করে হয়তো একটি উৎকৃষ্ট ছবি দর্শকদের উপহার দিতে পারতেন।

আদিত্য ধরের “উরি” ছবিটি দেখবার পর এই আপসোস আরও বেশি হয়। কারণ, এখানে প্রকৃত অর্থেই জাতীয়তাবাদের অনাবশ্যক সোচ্চার হয়ে ওঠাটা উৎকৃষ্ট হয়ে ওঠবার পথে এক অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োগগত দিক থেকে দেখলে মীতেশ মিরচন্দানির সাহসী চিত্রগ্রহণের সাবলীলতায় আন্তর্জাতিক মানের রসদ থাকা সত্ত্বেও এই ছবিটির অন্যতম দুর্বলতা এর কাহিনী। পরিচালকের ইচ্ছা ছিল “জিরো ডার্ক থার্টি”র মতো যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একটি মনস্তাত্ত্বিক ছবি বানাবেন, যার কেন্দ্রে থাকবে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত। কিন্তু দেশপ্রেমের জিগির তোলার বাধ্যবাধকতার কারণে ছবিটিকে জেপি দত্তের “বর্ডার”-এর সমগোত্রীয় বলে মনে হচ্ছে। কাহিনীগত দিক থেকে “উরি” ছবিটি না হতে পেরেছে একটি সার্থক ওয়ার ফিল্ম, না দেশপ্রেমের উচ্চকিত এক কণ্ঠস্বর।

মেজর বিহান সিং শেরগিলের নেতৃত্বে পাকিস্থান অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সার্জিকাল স্ট্রাইক নিয়ে এই ছবি। আইএসআই এবং জঙ্গিরা সম্মিলিতভাবে ২০১৬ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর উরি বেস আক্রমণ করে। সেই আকস্মিক হামলায় সেখানে কর্তব্যরত সেনাবাহিনীর যারা মারা যায়, তার মধ্যে একজন মেজর করণ কাশ্যপ। সম্পর্কে সে বিহানের ভগ্নীপতি। অসুস্থ মায়ের শুশ্রূষার জন্য মেজর বিহান সক্রিয় প্যারামিলিটারি কম্যান্ডো পদ থেকে অবসর নিয়েছে। একঘেয়ে ডেস্কজব করাকালীন তার বোনের অকালবৈধব্যের ঘটনায় সে বিমর্ষ। তার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণ করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। “দেশ ভি তো তুমহারে মা হ্যাঁয়”-র মতো আবেগসর্বস্ব কথা বলে তাঁকে প্রতিশোধপরায়ণতায় প্ররোচিত করেন। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান হিসেবে পরেশ রাওয়াল অভিনীত চরিত্রটি যখন ছবিতে বলেন, “ইয়ে নয়া ভারত হ্যাঁয়। য়হাকে লোগ মরনা ভি জানতা হ্যাঁয়, মারনা ভি”, তখন চিন্তা হয়। প্রথমত, ভারতীয় বাণিজ্যিক ঘরানার ছবিতে নায়কের প্রতিশোধ চরিতার্থ করা কোনও নতুন বিষয় নয়। কিন্তু ইদানিং তাতে নতুনত্ব দেওয়ার জন্য উগ্র জাতীয়তাবাদের আমদানি করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধানের এই সংলাপটিকে ছবির প্রসঙ্গ ছাড়িয়ে ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করা হলে বলতে হয় বিশেষ সম্প্রদায় বা দেশের প্রতি হিংস্র আচরণে রাষ্ট্রের অন্তত পরোক্ষ সমর্থন আছে। সেক্ষেত্রে দেশ কতটা নিরাপদ থাকবে তা জানা না থাকলেও, দেশের সাধারণ মানুষ যে বারবার বিপদগ্রস্ত হবে, তা নিশ্চিত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকান সৈন্যবাহিনী হলিউডকে প্রোপাগান্ডা ফিল্ম বানাবার নির্দেশ দেয়। তা মেনে জন ফোর্ড, উইলিয়াম ওয়াইলার, ফ্র্যাঙ্ক কাপরা সহ আমেরিকার বহু প্রথম শ্রেণির চিত্রনির্মাতা আমেরিকা তথা মিত্রশক্তিকে গৌরবান্বিত করতে বেশ কিছু ছবি বানিয়েছিলেন। সুতরাং, সেদিক থেকে বিচার করলে প্রোপাগান্ডা ফিল্মকে নিন্দা করা যায় না। কিন্তু ছবি এবং তার কাহিনীগুলিতে অন্তত এমন একটি গুণমান থাকা প্রয়োজন, যাতে দর্শকদের তা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল, আলোচ্য এই ছবিদুটির মধ্যে দিয়ে একটি নতুন প্রবণতা জন্ম নিচ্ছে। বর্তমানে যে সামাজিক রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে আমরা নিজেদের আবিষ্কার করছি, সেখানে শত্রুর প্রতি ক্ষমা প্রদর্শনকে দুর্বলতার লক্ষণ বলে চিহ্নিত করাটাই দস্তুর। পঞ্চশীলে বিশ্বাসী ভারতের যে ভাবমূর্তিকে উন্নত দেশগুলি সম্মান দিয়ে এসেছে, ‘নয়া ভারত’-এর হিংস্র মনোভাব তাতে রেখাপাত করবে সন্দেহ নেই। অন্যদিকে, ক্ষমতার দর্পে রাজনৈতিক নেতারা যেভাবে শিল্প সংস্কৃতি ইতিহাসকে নতুনভাবে রচনা করতে চাইছেন, এবং সিনেমার মতো বাণিজ্যনির্ভর একটি শ্রমনিবিড় শিল্পে নির্বোধের মতো হস্তক্ষেপ করে চলেছেন, তা আগামী দিনে চিত্রনির্মাতাদের স্বাধীন উদ্যোগে কিছুটা বিঘ্ন ঘটাবেই।