Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

স্মরণ : প্রদীপ ভট্টাচার্য

প্রদীপ

সৈয়দ কওসর জামাল

 

চাকরি করতেন শিপিং কোম্পানিতে। সম্পাদনা করতেন ‘রক্তকরবী’ নামের সুমুদ্রিত অন্যধারার কাগজ। একসময় চাকরি থেকে স্বেচ্ছা-অবসর নিলেন পত্রিকার সঙ্গে গ্রন্থ প্রকাশনার কাজ করবেন বলে। প্রকাশনা সংস্থার নামও রক্তকরবী। পত্রিকার রেজিস্ট্রেশানের সময় ‘রক্তকরবী’ হয়েছে ‘একালের রক্তকরবী’। রক্তকরবী প্রকাশনার ঠিকানা ছিল ১০/২বি রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট কলকাতা-৯। পত্রিকা প্রকাশ ও গ্রন্থ-প্রকাশনা দুটি ক্ষেত্রেই প্রদীপের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটত। ব্যতিক্রমী ধারার লেখক ও নতুনদের প্রতি ছিল তাঁর অশেষ দুর্বলতা। গ্রন্থের বিষয়ই ছিল তাঁর কাছে মুখ্য। জনপ্রিয় শস্তা বইয়ের দিকে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। আর্থিক অসুবিধে ছিল, তবু সে পথে পা বাড়াননি। তিনি যে তাঁর উদ্দেশ্য থেকে সরে আসবেন না, তার প্রমাণ আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করেও কাজ করে যাওয়া। একসময় অবশ্য আর পারেননি। কলেজ স্ট্রিট এলাকার রক্তকরবী প্রকাশনা বিক্রি করে দিতে হয়েছে তাঁকে। এন্টালির কনভেন্ট লেন-এ সরে গিয়ে খুলেছেন নতুন প্রকাশনা ‘উর্বী’। পত্রিকা সম্পাদনাতেও কোনও ক্ষান্তি ছিল না।

নতুন লেখকদের প্রতি প্রদীপের দুর্বলতা ছিল বলেই তার পত্রিকায় সম্ভাবনাময় নতুন লেখকদের লেখা ছাপা হয়েছে বেশি। রক্তকরবী থেকে ছেপেছেন সদ্যতরুণ রবিশংকর বলের প্রথম উপন্যাস ‘স্বপ্নযুগ’। ভিন্নধারার লেখক অরূপরতন বসুর অন্তরীপ, ইয়োকাস্তার দিকে, হলোগ্রাম, আর্কিমিডিসের লাঠি বেরিয়েছে রক্তকরবী ও উর্বী থেকে। আমাদের বন্ধু ও স্বতন্ত্রধারার গদ্যকার সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের প্রবন্ধগ্রন্থ ‘অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন’ বেরিয়েছিল রক্তকরবী থেকে। প্রিয় কবিবন্ধু তুষার চৌধুরীর কাব্যগ্রন্থ ‘পত্রমর্মরের দেশে’ বের করেছিলেন প্রদীপ। প্রকাশনার ক্ষেত্রে প্রদীপের একটি বড় কাজ ভাস্কর চক্রবর্তীর রচনাসংগ্রহ প্রকাশ। ভাস্করের চিঠিপত্র, ডায়রি ইত্যাদি সম্পাদনা করেছেন কবিপত্নী বাসবী চক্রবর্তীর সঙ্গে। প্রতিবছর ভাস্কর চক্রবর্তী স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করে আসছিলেন প্রদীপ।

আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু প্রদীপ। রবিবারের দেশপ্রিয় পার্কের সুতৃপ্তিতে নিয়মিত আড্ডা হত তাঁর সঙ্গে। তখন আসতেন সন্দীপনদা, পবিত্রদা, তুষার, সঞ্জয়, রবিশংকর ও আরও অনেকে। আড্ডা হত কলেজ স্ট্রিটের কফিহাউসে। বস্তুত, আমার সঙ্গে প্রদীপের শেষ দেখা মাসদুয়েক আগে কফিহাউসে। ইস্টার্ন বাইপাসের কাছাকাছি অঞ্চলে আমরা থাকি বলে প্রদীপ কফিহাউস থেকে আমার সঙ্গেই ফিরতেন। কলেজ স্ট্রিট থেকে রুবি– এই পথটুকু ছিল আমাদের একান্ত কথা বলার সময়। কত যে পরিকল্পনার কথা শোনাতেন তাঁর পত্রিকা ও প্রকাশনা ঘিরে! ওইদিন ফেরার পথে পত্রিকার পঞ্চাশতম সংখ্যার প্রকাশ নিয়ে আলোচনা করতে করতে বাড়ি ফিরেছি। আমার প্রবন্ধটি যেন তাড়াতাড়ি মেইল করি। না, একালের রক্তকরবীর জন্য প্রতিশ্রুত লেখাটি আমি এখনও শেষ করে উঠতে পারিনি। এবারের কলকাতা বইমেলায় উর্বীর ৪৮২ নম্বর স্টলেও আমার যাওয়া হয়ে ওঠেনি। শুনলাম পত্রিকার ৫০তম সংখ্যার প্রুফ দেখার কাজ চলছিল। কাজটি সম্পূর্ণ করে যেতে পারলেন না প্রদীপ। বইমেলা-অন্তপ্রাণ প্রদীপ বইমেলাতেই সব ছেড়ে চলে গেলেন নিরুদ্দেশে।