একটি প্রয়াণলেখ; শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়

সৈয়দ কওসর জামাল

 



কবি, প্রাবন্ধিক

 

 

 

‘যদি থাকে প্রেম’ নামের কবিতায় শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন—

‘আমি কিছু রেখে যাচ্ছি’ একথা বলব না, কত লোকে পুরনো আসবাব, ভাঙা বাড়ি, নানা আবর্জনা রেখে যায় উত্তরাধিকার, অকাতর মিথ্যায় সাজানো। কিছু নেই তোমাকে দেবার— কোনো নীল জামা, কাঁসার বাসন, আখরোট কাঠের বাটি— উত্তর প্রজন্ম— শুধু ছাপার অক্ষরে কয়েকটি কবিতা রইল।

একজন কবির মৃত্যু হলে কবিতা ছাড়া আর কীই বা থাকে? আমাদের জন্য এমন অনেক কবিতা রেখে সম্প্রতি চলে গেছেন শরৎকুমার। আবার শুধু কবিতাই নয়, তাঁর সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেল এক বিশেষ জীবনযাপনের কাহিনি, পঞ্চাশের কবিদের বোহেমিয়ানিজম-এর ইতিহাস। ‘রাত বারোটার পর কলকাতা শাসন করে চারজন যুবক’— এই পংক্তিটি বহু ব্যবহারে ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে গেলেও তাঁদের সেই জীবনের ভাঙচুর, নেশাগ্রস্ততা— সব কবিতার মতোই ভাঙতে চেয়েছে সামাজিক ও সাহিত্যের প্রথা। প্রকৃত ‘কৃত্তিবাসী’র মতো শরৎকুমারও এই প্রথাভাঙা জীবনের কথা শোনাতে চেয়েছেন, সত্তরের দশকের গোড়াতে সমাজকে আহত করেছে তাঁর উপন্যাস ‘সহবাস’, যে বন্ধুদের মধ্যে স্ত্রী-বদলের ঘটনা ঘটে। প্রথাকে আঘাত করার এই চেতনা ছিল ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকাকে ঘিরে গড়ে ওঠা কবিদের দলের প্রত্যেকের চালিকাশক্তি। চল্লিশের কবিতার থেকে তাঁরা আলাদা হয়েছিলেন এই চেতনায় এবং নিজেদের এই জীবনের কথা আত্ম-স্বীকারোক্তি হয়ে প্রকাশ পেয়েছে কবিতায়। আর তা বিশিষ্টতা দিয়েছে তাঁদের কবিসত্তাকে।

একদিকে এই বোহেমিয়ানা, অন্যদিকে সাহেব কোম্পানিতে সাহেব হয়ে নিজের কর্তব্যপালন— এই বৈপরীত্যও শরৎকুমারের জীবনে লক্ষণীয়। তিনি ছিলেন চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট, কাজ করতেন আমেরিকান তেল কোম্পানি ‘এসো’তে। কোম্পানির অনুশাসন ছিল তীব্র, তবু অফিসের পর বন্ধুদের কাছে হাজির হয়েছেন যে কবি শরৎকুমার, তিনি ভিন্ন। এই নিয়ে অনেক মজার গল্প ব্যক্তিগতভাবে শুনিয়েছিলেন তিনি।

তাঁর জন্ম হয়েছিল ওডিশার পুরীতে, ১৯৩১ সালে। তবে বেড়ে উঠেছিলেন কলকাতা শহরেই। কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন ‘নমিতা মুখোপাধ্যায়’ এই ছদ্মনামে। এমনকি ‘কৃত্তিবাস’-এও এই নামে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর কবিতা। একসময় তিনি নিজেই ‘কৃত্তিবাস’ সম্পাদক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতে গিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন। এই দিনের কথাও হেসে শুনিয়েছিলেন নিজেই। সেসব শুনে হেসেছি আমরাও।

১৯৫৭-য় প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সোনার হরিণ’ পরিচিতি দিয়েছিল শরৎকুমারকে। আর পিছন ফিরে তাঁকে তাকাতে হয়নি। একে একে বেরিয়েছে ‘আহত ভ্রূবিলাস’, ‘অন্ধকার লেবুবন’, ‘আছি সংযত প্রস্তুত’, ‘সোনার পিত্তলমূর্তি ওই’ ইত্যাদি। ‘ঘুমের বড়ির মতো চাঁদ’ তাঁকে এনে দিয়েছে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, ২০০৯ সালে।

সহধর্মিণী কবি বিজয়া মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর খুব একাকী হয়ে গেছিলেন কবি। স্মৃতিভ্রংশও হয়ে পড়েছিল শেষদিকে। নব্বই বছরের জীবন হয়ত কম নয়, কিন্তু কবি শারীরিকভাবে আমাদের মধ্যে আছেন, এই স্বস্তি আমাদের মধ্যে ছিল। পঞ্চাশের কবিরা আর থাকলেন না কেউই। ব্যক্তিগতভাবে আমি স্নেহ পেয়েছি তাঁর কাছে। আচরণে কখনও কোনও কপটতা ছিল না। তিনি ছিলেন স্পষ্টভাষী। লিখতেনও স্পষ্ট ভাষায়। এমনও হয়েছে তাঁর লেখা কাউকে আহত করেছে, কিন্তু তিনি ভ্রূক্ষেপ করেননি।

মৃত্যু সম্পর্কেও তাঁর ধারণা ছিল স্পষ্ট। ‘দূরত্ব’ কবিতায় লিখেছিলেন—

চোখ থেকে চশমার দূরত্ব যতখানি
জীবন থেকে মৃত্যুর দূরত্বও ততটাই।

কী গভীর দেখার চোখ থাকলে এমন করে উচ্চারণ করা যায়!

কম লেখেননি শরৎকুমার। কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি উপন্যাস ও ছোটগল্পের সংখ্যা অনেক। কিন্তু কবিতার অনুবাদক হিসেবেও তাঁকে আমাদের মনে রাখতে হবে। ফরাসি কবিতার প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ টান। তাই সুযোগ পেলেই অনুবাদ করেছেন ফরাসি কবিতা। স্যা-জন পের্স-এর জটিল কাব্যগ্রন্থ ‘আনাবাজ’ ফরাসি-জানা অসীমকুমার রায়ের সহায়তায় যেভাবে অনুবাদ করেছেন, তা অসামান্য। মূল ফরাসি কাব্য পাশে রেখে পড়েছি তাঁর অনুবাদ— কোথাও বিচ্যুতি দেখিনি।

আপনার কবিতা ও আপনার অনেক স্মৃতি এখন আমাদের সম্বল হয়ে থাকল, শরৎদা।

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4007 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...