Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

প্রাক্-নির্বাচনী নাগরিক আন্দোলনের ধারা

শতাব্দী দাশ

 

বিগত সপ্তাহ বা বলা ভালো  নির্বাচন-পূর্ববর্তী বিগত কয়েক মাস ধরে দেশ জুড়ে দানা বাঁধছে সিভিল সোসাইটি আন্দোলন। এই যেমন, যখন এই লেখাটি লিখতে বসলাম, তখনই ইনবক্সে মিছিলনগরীর আর এক মিছিলের ডাক এসে পৌঁছল৷ মৌলালি থেকে রবীন্দ্রসদন… ফ্যাসিবাদ, সন্ত্রাস, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে পথে নামার আহ্বান। একটি বিবৃতি। বিবৃতির শেষে নামের তালিকা৷ সেখানে নবনীতা দেবসেন, মধুময় পাল সহ নানা বিশিষ্টজন অবস্থান করছেন। কেউ সাহিত্যিক, কেউ সমাজসেবী, কেউ বা স্রেফ সচেতন সুধী নাগরিক। নিজের নাম তালিকার শেষে জুড়ে দিয়ে নিজের ফেসবুক দেওয়ালে বিবৃতিটি সেঁটে দিতে হবে৷ অথবা হোয়াটস্যাপে গণ-ফরোয়ার্ডিং৷ এভাবেই ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাবে নামের সংখ্যা৷ ‘স্নো-বলিং’ চলবে। ছোট বরফের একটি গোলা ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে আপনার দিকে। আপনি, তিনি, তাঁরা যতই নিজের নাম জুড়বেন, ততই বরফগোলা আকারে বাড়বে৷ সেইসঙ্গে বিবৃতির কেন্দ্রীয় বার্তাটিরও ভার বাড়বে।

বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজেপি-বিরোধী নাগরিক আন্দোলন গড়ে উঠেছে এর আগেও৷ যেমন আখলাখের হত্যার পর বা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গোভক্ষণকে কেন্দ্র করে মানুষকে পিটিয়ে মারার পরও নাগরিক সমাজ পথে নেমেছিলেন। দিল্লি-মথুরাগামী ট্রেনের সেই কিশোর জুনাইদ খান, যে ইদের বাজার করে বাড়ি ফেরার পথে অকারণেই গণপ্রহারের শিকার হল, তার মৃত্যুর পর নাগরিক সমাজের আর্তি ছিল, ‘নট ইন মাই নেম’৷ ‘আমার নামে মেরো না’। এই অস্বাভাবিক সংখ্যালঘু-ঘৃণা আর ধর্মান্ধতা দেখে নাগরিক সমাজ শিউরে উঠেছিল৷ জন্মসূত্রে সংখ্যাগুরু যাঁরা, তাঁরা কাতর অনুরোধ করেছিলেন যেন, ‘আমার সংস্কৃতির নামে ওদের বলি দিও না।’

তারপর ধরা যাক, দেশজুড়ে বিদ্বজ্জনদের খুন করা হয়েছে— গৌরী লঙ্কেশ, তারও অনেক আগে এম এম কালবুর্গি, গোভিন্দ পানসারে। নাগরিক সমাজ তখনও পথে নেমেছেন৷ যে ছাব্বিশজন বুদ্ধিজীবী ছিলেন হিন্দুত্ববাদীদের হিট-লিস্টে, তাদের মধ্যে বাকিরাও যেন একইভাবে শেষ না হয়ে যান, সে-জন্য তখনও পথে নেমেছেন নাগরিক সমাজ৷ তাঁরা পথে নেমেছেন কাশ্মিরের মন্দিরে যাযাবর মুসলিম নাবালিকা আসিফার ধর্ষণের পর। ভীমা কোরেগাঁও-এর জেরে দেশজুড়ে বুদ্ধিজীবী গ্রেপ্তারের পরও৷

আবার ইউপিএ-র আমলে, আন্না হাজারের দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলন বা জন লোকপাল বিলের আন্দোলন— আসলে তা-ও তো সিভিল সোসাইটি আন্দোলনই ছিল প্রাথমিকভাবে৷ পরবর্তীকালে আপ দিল্লিতে প্রবল ভোটে জেতার পর সেই আন্দোলন একটা স্পষ্ট রাজনৈতিক মাত্রা পেল৷ নির্ভয়াকাণ্ডের পর ধর্ষণ আইনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল এই নাগরিক আন্দোলন। ২০০৫ সালের ডমেস্টিক ভায়োলেন্স আইনের খসড়া প্রস্তুতিতে সাহায্য করেছিলেন বিভিন্ন সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনের প্রতিনিধিরাই। সিভিল সোসাইটি মুভমেন্টের গুরুত্ব, সুতরাং, কম নয় ভারতীয় গণতন্ত্রে৷

সিভিল সোসাইটি কারা? সর্বশক্তিমান রাষ্ট্র ও শক্তিহীন ব্যক্তি নাগরিকের মাঝে অবস্থান করে নাগরিক সমাজ নামক এই সামাজিক সংগঠন৷ তাদের অস্তিত্ব কার্যকলাপের সঙ্গে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির গভীর যোগ, তবুও নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন না বলে সামাজিক সংগঠন বলে দাবি করেন তাঁরা, হয়ত দলীয় রাজনীতির সীমাবদ্ধতার দায় এড়াতে চান বলেই।

এই মুহূর্তে, কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধি নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন বিজেপিবিরোধী নাগরিক আন্দোলনগুলোর সঙ্গে৷ দিল্লিতে, গোয়াতে বৈঠক করেছেন কখনও পরিবেশ রক্ষা সংগঠন, কখনও জঙ্গল বাঁচাও সংগঠনগুলির সঙ্গে৷ অন্যদিকে বিজেপি এদের এড়িয়ে গেলেও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘকে (যেটিও খাতায় কলমে একটি সামাজিক সংগঠন) কাজে লাগিয়ে পৌঁছতে চাইছে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের কাছে। আর বিভিন্ন কমিউনিস্ট পার্টি তো সক্রিয়ভাবে চিরকালই মানবাধিকার সংগঠন, সমাজসেবী সংগঠনের সঙ্গে যোগ রেখেই থাকে। ফলে রাজনৈতিক দল ও তথাকথিত রাজনৈতিক পতাকাবিহীন সামাজিক সংগঠনগুলি একে অন্যের পরিপূরক নয়, এমন দাবি করা যায় না, বিশেষত ২০১১ সালের আন্না হাজারের আন্দোলনের পর।

কলকাতাও রিজাওয়ানুরের মৃত্যু-পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে সুজেট জর্ডনের ধর্ষণ পেরিয়ে একবিংশ শতকীয় নানা নাগরিক আন্দোলন দেখল৷ বর্তমানে, লোকসভা নির্বাচনের প্রাক-মুহূর্তে স্বাভাবিক কারণেই এই শহরে ও দেশে বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলনের মূল সুর হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজেপিবিরোধিতা, ফ্যাসিবাদ, ঘৃণা, ধর্মান্ধতার রাজনীতির বিরোধিতা৷

লোকাল ট্রেন’-এর মুখ্য উপজীব্য যেহেতু সাম্প্রতিকতম ঘটনাগুলি, তাই সাম্প্রতিক অতীতের নাগরিক আন্দোলনগুলো দ্রুত মনে করে নেওয়া যাক৷ পুলওয়ামা পরবর্তী সময়ে যখন কাশ্মিরিদের উপর উগ্র-হিন্দুত্ববাদীদের অত্যাচার বাড়ছিল দেশ জুড়ে, তখন নাগরিক সমাজ কাশ্মিরি শালওয়ালা থেকে কাশ্মিরি ডাক্তার— সকলকে বাঁচাতে সরব হলেন৷ কিন্তু সরকারের ক্যাম্পেনিং আরও জোরদার৷ পুলওয়ামাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের দেশপ্রেম প্রমাণে সরকার পক্ষও তৎপর। স্বয়ং গুগল বলছে, তাদের কোম্পানি বিজেপির নির্বাচনী প্রচার থেকে প্রচুর লাভ করেছে। হোয়াটস্যাপ-ফেসবুকে ছড়িয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান/মুসলিম/ধর্মীয় অপর-কে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নিজে সাধু সাজার রাজনীতি। সুতরাং আবারও দেশের শিল্পী, সাহিত্যিক, সমাজকর্মী, আইনজীবী ও অন্যান্য সুধী নাগরিক আবেদন জানাতে লাগলেন জনগণের কাছে, দেশপ্রেমের ভাঁওতায় না ভুলে, কাকে ভোট দেবেন, তা যেন জনগণ বিচক্ষণভাবে স্থির করেন৷ এই আবেদনের পদ্ধতি মোটামুটি দ্বিবিধ। কখনও পথে নেমে স্লোগান-পোস্টারের মাধ্যমে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা। কখনও অনলাইন আপিল ও সোশাল মিডিয়া ব্যবহার করে সই/নাম সংগ্রহ।

আগের মাসে ‘আর্টিস্টস ইউনাইট’ ব্যানারের তলায় জড়ো হয়েছিলেন প্রায় সাড়ে চারশ সই-করিয়ে৷ তাঁরা কথা বলেছিলেন ‘গণতন্ত্রের পক্ষে, হিংসার বিপক্ষে’৷ সেখানে ছিলেন আনন্দ পটবর্ধন, সুধীর পটবর্ধন, মল্লিকা সারাভাই, নাসিরুদ্দিন শাহ, রত্না পাঠক, সৈয়দ আখতার মির্জা, নন্দিতা দাস প্রমুখরা৷ বিবৃতিতে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল ভারতের ‘বৈচিত্র‍্যের মধ্যে ঐক্য’-র ঐতিহ্যর কথা৷ বলা হয়েছিল ‘Democracy is not a majoritarian project to identify enemies and enforce uniformity of language, behaviour and culture. Democracy is the celebration of a collective will for peace, of living together with dignity and equality.’ গণতন্ত্র হল বহুত্বের উৎসব, বহু সংস্কৃতির উপস্থিতি সত্ত্বেও সেখানে শান্তিতে, সাম্যে, সমমর্যাদায় সহাবস্থানের ইচ্ছাটি সমষ্টিগত৷ সেই সঙ্গে বলা হল কৃষি-সঙ্কট, জঙ্গল-সঙ্কট, দারিদ্র, বেকারত্বের কথা৷ বলা হল, শিল্পীরা স্বভাবগুণেই ভালোবাসা দিয়ে ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়বেন৷ সঙ্গীত, নৃত্য, নাটক, ভাষা, শারীরিক শৈলী— যাঁর যেটুকু মূলধন, তা নিয়ে তাঁরা লড়বেন একমাত্রিক সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। কারণ, তাঁরা মনে করেন:

In India’s recent history the politics of hate, division and exclusion has never been so dominant as we find it today, with a poisonous ideology which informs it deeply entrenched into the state and in governance. Never before has hate been directed with such calculated intent against Muslims, Christians, Adivasis, Dalits, women, trans people, people in conflict areas and even children.

সেই সুর তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়তেই দেশ জুড়ে নানা শহরে শিল্পী সাহিত্যিকরা সভা করলেন। কলকাতাতে নিরঞ্জন সদন বা যোগেশ মাইমেও তেমন সমাবেশ অনুষ্ঠিত হল।

তারপর মার্চের শেষ দিকে একশ জনেরও বেশি ‘ফিল্মমেকার’ (এর মধ্যে পরিচালক, সহ পরিচালক বা সম্পাদক, চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য অনেকেই ছিলেন) আবার আপিল করলেন জনতার কাছে৷ একেবারে নাম উল্লেখ করেই বললেন, ‘বিজেপি’-কে ভোট না দিতে। এই দলে ছিলেন বিনা পাল, গুরবিন্দর সিং, এস কে শশিধরণ, ছিলেন আবারও আনন্দ পটবর্ধন। মূল ধারার বলিউড যখন ‘উরি’ বা নরেন্দ্র মোদির বায়ো-পিক বানাতে ব্যস্ত, তখন এ’হেন পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী৷ তাঁদের বিবৃতির বক্তব্যও মোটামুটি এক৷ বৈচিত্র‍্যের মধ্যে ঐক্য নিয়ে গর্ব করার দিন শেষ হয়েছে। বিজেপির হাত ধরে এক করাল সময় এসেছে, যখন রোলার চালিয়ে সংখ্যাগুরুর সংস্কৃতিতে সবাইকে জোর করে মানিয়ে নিতেই হবে, নাহলে সে বা তারা ঘোষিত হবে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে৷ ‘দেশপ্রেম’ ও ‘দেশদ্রোহ’-এর বিজেপি-প্রসূত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে বিবৃতিটি। জনগণকে সতর্ক করে, এই সরকার আবার ক্ষমতায় এলে সাংবিধানিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতা খর্ব হবে।

পয়লা এপ্রিল। বার্তা এল দুশোরও বেশি লেখকদের পক্ষ থেকে৷ অরুন্ধতী রায়, অমিতাভ ঘোষ থেকে প্রবীণা নয়নতারা সহগাল কে না ছিলেন সে দলে! সেখানেও অসহিষ্ণুতা, ঘৃণা, মানুষকে পিটিয়ে মারার রাজনীতির কথা বলা হল৷

But in the last few years, we have seen citizens being lynched or assaulted or discriminated against because of their community, caste, gender, or the region they come from.

বলা হল লেখক, যুক্তিবাদী সমাজসেবকদের উপর নিয়ন্ত্রণ-নিষ্পেষণের খাঁড়া নেমে আসার কথা। “We don’t want rationalists, writers and activists to be hounded or assassinated.” বলা হল শিশু ও নারীর অধিকারের কথা। দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘুর নিরাপত্তার কথা। শিক্ষা, গবেষণা, চাকরি, স্বাস্থ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে উদ্যোগের অপ্রতুলতার কথা৷

এপ্রিলের তিন তারিখ। প্রায় দেড়শ জন বিজ্ঞানী এবার আবেদন করলেন:

Reject those who lynch or assault people.

বললেন ভোট পড়ুক “inequality, intimidation, discrimination and unreason”-এর বিরুদ্ধে। এঁরা IISER, ISI, IIT, NCBS বা অশোকা ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা বা গবেষণায় যুক্ত৷ এঁরা বললেন, দেশের সংবিধানের মূল সুরটি যুক্তিবাদী ও বৈজ্ঞানিক, তা যেন আমরা ভুলে না যাই। ভোট যেন তাদের কখনওই না দিই, যারা যুক্তিবাদ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে নস্যাৎ করতে ও যুক্তিবাদীদের জেলে পাঠাতে, খুন করতে সদা তৎপর।

পড়ুন — ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০১৯

এপ্রিলের চার। প্রায় সাতশ জন থিয়েটার কর্মীর নাম সম্বলিত আরেক বিবৃতি পাওয়া গেল৷ আবার artistsuniteindia.com-এ৷ গিরীশ কর্নাড, নাসিরুদ্দিন শাহ, অমল পালেকর, মহেশ দত্তানি, কীর্তি জৈন, এম কে রায়না, মলয়শ্রী হাসমি প্রভৃতিদের তরফ থেকে পাওয়া এই বিবৃতিতে সই করেছেন ইংলিশ, বাংলা হিন্দি, কোঙ্কনি, মারাঠি, মালায়লম, কন্নড়, আসামী, তেলুগু, পাঞ্জাবি, উর্দু ভাষায় নাট্যচর্চায় রত নাট্যকার, নাট্যপরিচালক ও নাট্যভিনেতা, নাট্যকর্মীরা৷ এখানে বলা হয়েছে, নাচ, গান, হাস্যরস— যা কিছু তাঁরা পরিবেশন করেন, তার সাবলীল প্রকাশে আজ বাধা৷ তর্ক-প্রতিতর্ক-প্রতিবাদ-প্রতিরোধ তাঁদের শিল্পমাধ্যমের অঙ্গাঙ্গী অংশ৷ অথচ এই ধরনের যেকোনও প্রচেষ্টাকে আজ সহজেই ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ দাগিয়ে দেওয়া হয়৷ নাটক তথা সমস্ত শিল্পেরই কণ্ঠরোধ করছে যে সরকার, তা যেন আর ক্ষমতায় না ফেরে। আবেদন শেষ হয় এভাবে:

Vote for a secular democratic, inclusive India. Vote for the freedom to dream.

সেই চার এপ্রিলই আবার পথে নেমেছিল নারী ও রূপান্তরকামীদের মিছিল। ‘উইমেন্স মার্চ ফর চেঞ্জ’। দিল্লির মার্চে বলা হল, মহিলা ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে ভোট দিতে হবে হিংসা আর ঘৃণার বিরুদ্ধে৷ মুম্বাই, আমেদাবাদ, ব্যাঙ্গালোর, আজমেইর, কলকাতা চেন্নাই-এও একই বক্তব্য নিয়ে পথে নেমেছিল মিছিল। শহর থেকে শহরে হয়ত খানিক বদলেছে স্লোগান বা প্ল্যাকার্ডের ধরন৷ কোথাও সুধা ভরদ্বাজ, সোমা সেন-দের মুক্তির দাবি, কোথাও মেয়েদের বেকারত্বের কথা। কোথাও কৃষক-শ্রমিক মেয়েদের দাবি।

কোনও অঞ্চলে উঠে এসেছে মেয়েদের নিরাপত্তার প্রশ্নও। শহুরে যুবতী রাতে বেরোনোর ভয়ের কথা বলেছেন৷ গ্রামের দলিত মেয়ে বলেছেন উচ্চবর্ণের থাবাকে নিরন্তর ভয় পাওয়ার কথা৷ এসেছে গার্হস্থ্য অত্যাচারের কথাও, ‘বেটি বচাও’ বা ‘উজ্জ্বলা যোজনা’-র ব্যর্থতার কথাও৷ শুধু পিতৃতন্ত্র নয়, বর্ণাশ্রম বা স্বৈরাচারও নিপাত যাক-এই স্লোগানে মুখর হয়েছে মিছিলগুলো। পোস্টারে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে হঠানোর আর্জিও দেখা গেছে৷

দিল্লিতে ফারাহ নাকভি বলেন, দলিত, সংখ্যালঘুর উপর আক্রমণের ফলে এই সম্প্রদায়ের মেয়েদের উপরেও বাড়ছে শারীরিক বা যৌন নির্যাতন। কৃষিসঙ্কটে ভুগছেন কৃষি-সহায়িকা মেয়েটি বা চাষি মেয়েটি৷ গুজরাটের সীমা শাহ বললেন, জনশিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যে ব্যয়সঙ্কোচে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মেয়েরাই৷ প্রায় ১০০টি অঞ্চলে, কুড়িটি রাজ্যে সংঘটিত হয়েছিল এই মিছিল। কলকাতায় এই মিছিল হেঁটেছে মৌলালির রামলীলা ময়দান থেকে শ্যামবাজারের শ্যাম পার্ক।

৬ই এপ্রিল দিল্লির তালকটোরা স্টেডিয়ামে জড়ো হওয়ার কথা ২০০টিরও বেশি এনজিওর, যাঁরা ২১টিরও বেশি সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশন জালিকা-র অন্তর্ভুক্ত৷ কেউ নারী অধিকার নিয়ে, কেউ দলিত অধিকার নিয়ে, কেউ জঙ্গলের অধিকার নিয়ে, কেউ আধার বিরোধিতা নিয়ে কাজ করেন সারা বছর, আলাদা আলাদাভাবে৷ কিন্তু এখন তাঁরা একত্রিত হয়েছেন এক ছাতার তলায় একটাই উদ্দেশ্যে। নির্বাচনের আগে বিজেপি-বিরোধিতা৷ শোনা যাচ্ছে, তাঁরা সঙ্গে পাবেন ইউপিএ প্রধান সনিয়া গান্ধিকে। তাঁদের সমর্থন জানাবেন সিপিআইএম-এর সীতারাম ইয়েচুরি। আরজেডি, সিপিআই, জেডিইউ-এর সমর্থনও তাঁরা পাবেন৷ অর্থাৎ সংসদীয় রাজনৈতিক দলগুলি কিন্তু সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনকে হাতে রাখতে চাইছেন। শোনা যাচ্ছে এই সমাবেশের পর মিছিল এবং আরও নানা কর্মসূচির ডাক দেবেন এঁরাও।

সিভিল সোসাইটির ধারণা ও বিন্যাস বহুমাত্রিক। তাত্ত্বিকভাবে এর মধ্যে ফুটবল ফ্যান ক্লাব থেকে শুরু করে স্টাডি সার্কল বা ফিল্ম ক্লাব সব কিছুই পড়তে পারে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, মানবাধিকার সংগঠন, সমাজসেবী সংগঠন, সাংস্কৃতিক জগতের ব্যক্তিত্বরাই এখানে মুখ্য ভূমিকা নিয়ে থাকেন। ভারতের কুখ্যাত এমার্জেন্সি পিরিয়ডে যেহেতু নাগরিক অধিকার খর্ব হয়েছিল বহুলাংশে, তাই স্বাধীন ভারতে নাগরিক স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনের সূত্রপাতও সেই সময়েই হয়। তার আগে সম্ভবত গান্ধিবাদী দেশোন্নয়ন, খাদি ইত্যাদিতেই নিয়োজিত ছিল এসব উদ্যোগ৷

পরের দশকগুলিতে মানবাধিকার সংঠনগুলো সংবিধানের মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত অধ্যায়ের প্রহরী হয়ে উঠেছে৷ প্রহরী হয়ে উঠেছে মানে, বোঝাই যাচ্ছে, মানুষের মৌলিক অধিকার প্রায়শই ছাঁটার চেষ্টা হয়েছে এবং অন্য কাউকে তার পাহারায় নিযুক্ত হতে হয়েছে৷ দুর্নীতিগ্রস্ত এই দেশে যে স্বার্থান্বেষী নন-গভর্মেন্টাল অর্গানাইজেশনগুলিও কখনও বিদেশি ফান্ড তোলার দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েনি, তা নয়৷ কিন্তু নিষ্ঠ সংগঠনগুলি নিরলসভাবে দেশের নৈতিক চেতনাকে জাগ্রত রেখেছে৷ জনসাধারণকে মনে করিয়ে দিয়েছে, সহনাগরিকের বঞ্চনা, অত্যাচার বা তার মৃত্যুর প্রতি উদাসীনতা একদিন বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতে পারে যে কোনও নাগরিকের জীবনে।

গণতন্ত্রে নাগরিক সমাজের গুরুত্ব ঠিক এখানেই।

যেহেতু নাগরিক সমাজ বলতে কোনও সমসত্ত্ব দল বোঝায় না, তাই কোনও একটি সাধারণ উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন এক ছাতার তলায় এলেও এই ক্যামরেডারি সাময়িক। মার্ক্স ও তাঁর আগে হেগেল নাগরিক সমাজের ভূমিকার আভাস দিতে ভোলেননি৷ কিন্তু রাষ্ট্রের নির্যাতনের জবাব বা রাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে তাঁরা এই সমাজকে দেখেননি৷ তাঁদের কাজটি, যেমন বলা হয়েছে, প্রথমত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পাহারাদারির এবং দ্বিতীয়ত জনসাধারণ ও সরকারের মধ্যে মধ্যস্থতার৷ সরকার-পক্ষের হাতে আছে ক্ষমতা, যা ‘প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র’-জাত৷ অন্যদিকে নাগরিক সমাজের চোখে আপাতভাবে আছে ‘অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র’-র স্বপ্ন। এই দুই-এর মাঝে আছে বঞ্চিত, লাঞ্ছিত সাধারণ মানুষ।

কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে নাগরিক সমাজের ভূমিকা? এই মুহূর্তে জনসাধারণের মনে কতটা অভিঘাত সৃষ্টি করতে পারবে এই সব মুহুর্মুহু বিজেপি-বিরোধী আবেদন? তা সময়ই বলবে। কিন্তু কিছু সীমাবদ্ধতা অবশ্যই আছে এইসব উদ্যোগের। প্রথমত, বেশিরভাগ সময়েই এই আপিল পৌঁছয় শুধুমাত্র শিক্ষিত, শহুরে এমনকি অভিজাত, সাংস্কৃতিক মানুষের কাছে, তার বাইরে থেকে যায় ইন্টারনেটবিহীন, শিক্ষাবিহীন, শহুরে সংস্কৃতির স্পর্শ না পাওয়া অন্ধকার ভারতবর্ষ৷

দ্বিতীয়ত, আগেই বলা হল, একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে সাময়িকভাবে এই একত্রিত হওয়া৷ ফলে আন্তঃসাংগঠনিক স্বার্থসংঘাত ঘটলেই যেকোনও মুহূর্তে উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার ভয় থাকে। যেমন ধরা যাক, সিস জেন্ডার নারী ও ট্রান্স-মানব/মানবী উভয়েই নিজেদের পিতৃতন্ত্রের শিকার বলে ঘোষণা করলেও, তাদের দাবি-দাওয়ায় চিরকালই আছে নানা তফাত, এমনকি আছে সংঘাতও৷ একসঙ্গে এক উদ্দেশ্যে তাদের রাস্তায় নামা আশা জোগায়, কিন্তু বিজেপি-বিরোধিতার কারণেও কোনও একটি দলের অন্য দলের ছায়ার ঢাকা পড়ে যাওয়াটা কাম্য নয়৷

তৃতীয়ত, এ আভাসও আগেই দেওয়া হয়েছে যে নাগরিক সমাজ সরকারের বিকল্প নয়৷ তাহলে বিকল্প কে? সঠিক বিকল্পের সন্ধান কি দিতে পারে নাগরিক সমাজ? এই রাজ্যে বিজেপি-বিরোধী নাগরিক মঞ্চ কাকে বেছে নিতে বলবে? অরাজক তৃণমূলকে? সর্বদেশীয় ক্ষেত্রে কাকে চাওয়া হবে বিজেপির বিকল্প হিসেবে? কংগ্রেস বা ইউপিএ-কে? কিন্তু ইউপিএ ২-এর সময়ে তাদের বিরুদ্ধেও তো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হয়েছিল নাগরিক সমাজকেই৷

মহামতি মার্ক্স বলেছিলেন, উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশই বিপ্লবের জন্য আদর্শ৷ প্রশ্ন হল, তাহলে জারের রাশিয়ার সামন্ততান্ত্রিক (সামরিক সাম্রাজ্যবাদীও বটে) পরিকাঠামোয় কেন বিপ্লব হল শেষমেশ? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ইতালীয় মার্ক্সিস্ট আন্তোনিও গ্রামশি, যাঁকে আরেক স্বৈরাচারী মুসোলিনি বন্দি করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন, রাষ্ট্রের শোষণযন্ত্র ও শাসনযন্ত্র যেখানে সবচেয়ে নগ্ন ও নির্মম, বিপ্লব সেখানেই সম্ভব৷ যেখানে নাগরিক-সমাজ বা বুদ্ধিজীবী-সমাজ ছোট ছোট প্রতিরোধ ইতোমধ্যে চালু রেখেছেন, অর্থাৎ স্বেচ্ছাচারিতাও আছে, আবার যোগ্য প্রতিরোধও আছে, সেখানে সাবলীলভাবে বিপ্লব দানা বাঁধা মুশকিল, যদি না নির্দিষ্ট রাজনীতিতে দীক্ষিত মানুষেরা বিপ্লবের উপযোগিতা সম্পর্কে নিরন্তর মানুষকে বুঝিয়ে তাদের উদ্বুদ্ধ না করে।

সিভিল সোসাইটিগুলিরও মনে হয় এই কথা মনে রেখেই নিজেদের কার্যক্রম সাজানো উচিত৷ সেফটি ভালভ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া নয়, সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে সঠিক পথে চালিত করাই যেন তাদের লক্ষ্য হয়৷ তার জন্য বাড়ানো দরকার জনসংযোগ। অন্যদিকে সিভিল সোসাইটিগুলিকে বারংবার দাঁত-খিঁচোনো রাষ্ট্রও গ্রামশির কথাগুলো মাথায় রাখলে ভালো করবে মনে হয়। চরম স্বৈরাচারী রাষ্ট্র, নাগরিক প্রতিরোধের অধিকার কাড়ার হুমকি দিতে ব্যস্ত রাষ্ট্র শুধুমাত্র নিজেরই কবর খোঁড়ে। দ্রুতগতিতে।