Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

তারান্তিনো — ষোলো

প্রিয়ক মিত্র

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

জেমসন ইন্দ্রকমলকে জমিয়ে রেখেছিল নানান গল্পে। বাংলাদেশে গোয়েন্দাগিরির সুবাদে নানান স্তরের মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়। তাদের নিয়ে নানান রকম অভিজ্ঞতা জমে।

ইন্দ্রকমলের মুন্সেফ এসে গেলাসে পানীয় ঢেলে দিয়ে গেছে সকলের। এমনকি মোহনেরও।

মোহন ঠায় তাকিয়ে আছে পানীয়টার দিকে।

এইজাতীয় গেলাস, এরকম পানীয় মোহন জীবনেও দেখেনি। ঘরের চারপাশটা একবার ভালো করে লক্ষ করল মোহন। অচিরেই একটা দীর্ঘশ্বাস এসে পড়ে তার বুকের হাপরে। সেখানেই সেটাকে জমিয়ে রাখল সে।

মোহন মঙ্গলগঞ্জের এক সাধারণ চাষি। বোবা বলে লোকজন তাকে করুণা করত, ঠকাত। বাংলার আর দশজন চাষির মতন সেও আজন্মের শোষিতের দলে ছিল। নিজের মতন। শান্ত। সে আর পাঁচী সংসার করত নির্বিঘ্নে। তাদের একটা স্বপ্ন ছিল, যে স্বপ্নের কোনও ভাষা ছিল না! কিন্তু স্বপ্নটা ছিল।

অভিশাপের মতন এল নীলকর সাহেবরা। চাষবাস তো চুকেবুকে গেলই, জান বাঁচাতে, ইজ্জত বাঁচাতে ভিটেমাটিছাড়া হতে হল মোহন ও পাঁচীকে। স্থির করেছিল ওরা কলকাতায় এসে হত্যে দিয়ে পড়বে ওদের জমিদারের পায়ে। ওদের জমিদার রমাকান্ত রায়। একটা চিঠি ওরা লিখিয়ে নিয়েছিল গুরুমশাইকে দিয়ে।

গ্রামে সকলেই হাসাহাসি করেছিল ওদের কলকাতা আসা নিয়ে।

“হেলে ধরতে পারে না, কেউটে ধরতে যায়!”

মদন রাগতভাবে বলেছিল, “কার লগে দেখা কইরতে যাচ্ছিস? মদ আর মেয়েমানুষ ছাড়া কোনদিকে হুঁশ আছে তার? প্রজাদের লগে কী করছে সে শুনি!”

ভাগ্যের কী পরিহাস!

যাকে রক্ষক ভেবে আসা, সেইই ভক্ষক হয়ে এতবড় সর্বনাশটা করল মোহনের!

ইন্দ্রকমল জেমসনের চেহারা জরিপ করে এতক্ষণে বুঝে গেছেন যে এতটা বাচালতা করার লোক জেমসন নন। জেমসন গেলাসের পর গেলাস পান করে চলেছেন এবং বিবিধ অবান্তর কাহিনি শুনিয়ে হোহো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছেন নিজেই। কোনও বিশেষ উদ্দেশ্য আছে কি লোকটির?

আজ তার শিকারের রাত। তাছাড়াও, এ কুঠিতে লুকনো এক গোপন সত্য রয়েছে, যা ইন্দ্রকমলের পক্ষে বিশেষ স্বস্তিদায়ক নয়। কিন্তু সেই গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য বহু লোকজন বহাল থাকে। তাই সেই নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন না ইন্দ্রকমল। কিন্তু এই সাহেবটিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘুম পাড়াতে হবে।

তারপর জরিপ করতে হবে কালো সাহেবটিকে।

আসা ইস্তক সে একটিও কথা বলেনি। ঐ চোখদুটো বড্ড চেনা ইন্দ্রকমলের। চোখ চিনতে তার ভুল হয় না।

কোথায় দেখেছেন একে?

আজ সকালে জোড়াদীঘির মাঠে কি?

তাহলে কি…

জেমসন নিরলস বলেই চলেছেন বিবিধ আজগুবি গল্প, “একবার দুই বাঙালি খ্রিশ্চান যুবক এক ব্রাহ্মণ পুরোহিতের ইয়াং ডটারকে ফুসলাইয়া পালাইতে উদ্যত হইয়াছিল। আমি সেখানে উপস্থিত হইয়া ওই দুই বাস্টার্ডকে…”

জেমসনের কথার মধ্যে ছেদ পড়ল। ইন্দ্রকমলের পাথুরে চোখে চোখ রেখে কথা বলার বুকের পাটা কারুরই বিশেষ নেই‌। জেমসনেরও আবার সাহসের অভাব নেই কোনওকালেই। তাই ইন্দ্রকমলের সামনে বসে সহাস্যে কথা বলতে তার বাধছিল না! কিন্তু গোল দেখা দিল অন্যত্র। হঠাৎ করেই ফ্যাকাশে হয়ে গেল ইন্দ্রকমলের মুখ! ভয়ে সাদা হয়ে গেল তার মুখের যাবতীয় জেল্লা, দাপট।

জেমসন একটু হতচকিত হলেন। কী হল হঠাৎ?

ইন্দ্রকমল ভেবে চলেছেন, এমন অনর্থ কীভাবে ঘটতে পারে?

ইন্দ্রকমলের দৃষ্টি জেমসনের পেছনদিকে। মোহনও সেদিকে ফিরল। ফিরেই একটা আঁতকে ওঠার আওয়াজ বেরোল তার কণ্ঠ দিয়ে।

জেমসন পিছু ফিরলেন।

জেমসনের মাথা বাঁই করে ঘুরে গেল। এমন ভয়ঙ্কর কোনও দৃশ্য তিনি কস্মিনকালেও দেখেছেন কি না মনে করতে পারলেন না।

দরজার বাইরে থেকে একটা নীল আভা এসে ঢুকছে ঘরে। সেই অল্প আলোয় দাঁড়িয়ে এক নারীমূর্তি।

অতিদীর্ঘ চুল প্রায় পায়ের কাছ অবধি নেমে এসেছে। পরনে টুকটুকে লালপাড় শাড়ি। চোখদুটো জ্বলছে ভাটার মতন‌। আর দু হাতে ডজনখানেক ধূপ ধরা।

ঘরে পা রাখল নারীমূর্তিটা।

জেমসন, মোহন হতভম্ব। ইন্দ্রকমল স্থানু। পাথরের মতন।

সোজা ইন্দ্রকমলের দিকে এগিয়ে এল নারীমূর্তিটা।

“শয়তান! আবার তুই নতুন পাখি পুষেছিষ খাঁচায়। শেষ রাতে আবার তো পুঁতে দিবি তার লাশ। তোর একটা চোখ গেলে দিয়েও তোকে শুধরোনো যায়নি। আরও চোখ গেলতে হবে।”

এই গলা কখনওই মানুষের নয়। এ কণ্ঠস্বর পিশাচিনীর।

হিংস্র হয়ে উঠে একহাতের জড়ো করা সব ধূপ ইন্দ্রকমলের চোখে গুঁজে দিতে উদ্যত হল সেই নারীমূর্তিটি।

জেমসন পরিস্থিতি সামাল দিতে তার কোমরের পিস্তলটায় হাত দিয়েছিলেন সবে। এমনসময় অনেকগুলো পায়ের শব্দ এল ঘরের বাইরে থেকে।

সেই নারীমূর্তিটি থমকে গেল। চোখে ভাটার আগুনের বদলে দেখা দিল প্রাণহরা ভয়।

ঘরে কয়েকজন পুরুষনারী প্রবেশ করল। ফতুয়া আর খেটো ধুতি পরা দুই লেঠেল হাত চেপে ধরল নারীমূর্তিটির। আর বাদবাকি মহিলারা দুই পা ধরে পাঁজকোলা করল তাকে।

সঙ্গে সঙ্গে ঝড় বয়ে গেল ঘরে। মহিলাটি চিৎকার করে চারপাশে ছুঁড়ে দিল তার হাতের জ্বলন্ত ধূপগুলো। কিছুক্ষণ সময় লাগল গোটা পরিস্থিতিটা সামলাতে।

সেই ভয়াবহ আধিভৌতিক চিৎকারে কেঁপে উঠল ইন্দ্রকমলের কুঠিবাড়ি।

ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে যাচ্ছিল। সবার পেছন পেছন একজন মহিলা, বোঝাই যায় যে অন্তঃপুরবাসিনী।

ইন্দ্রকমলের জলদগম্ভীর কণ্ঠস্বর আটকে দিল সেই মহিলাকে।

“বিন্দু!”

ঘুরে দাঁড়ালেন সেই মহিলা‌। চোখে আশঙ্কার মেঘ।

ইন্দ্রকমল এগিয়ে গেলেন তার দিকে। ইন্দ্রকমলের দুই হাত প্রায় সাঁড়াশির মতন বিন্দুর গলাটা চেপে ধরে প্রায় শূন্যে তুলে ধরল তার দেহটা। একটা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এল তার কণ্ঠস্বর থেকে।

“কীভাবে বেরোল অন্দরমহল থেকে? বল!!”

ইন্দ্রকমলের গলা বিকৃত।

ততক্ষণে রাধামোহন সদলবলে ছুটে এসেছে। এই দৃশ্য দেখে তারা থমকে দাঁড়াল।

“আমি একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ঠাকুরঘরের দরজা খোলা রেখে। ভুল হয়ে গেছে দাদা! আর হবে না!”

ইন্দ্রকমল নামালেন বিন্দুকে।

“আর কক্ষনও এই ঘটনা ঘটলে আমি তোর মরামুখ দেখব। মাথায় রাখিস। যা!”

বিন্দু চলে গেল। যাওয়ার আগে একবার চোখ বুলিয়ে নিল জেমসন আর মোহনের ওপর। তার দুই চোখে বিষ।

ইন্দ্রকমল দ্রুতবেগে ফিরলেন জেমসনদের কাছে।

“আপনারা এমন কিছু দেখলেন সাহেব যা দুনিয়ার কেউ জানে না। রাজা ইন্দ্রকমল সিংহ কাউকে যা জানাতে চায় না, কাকপক্ষীও তা জানবে না। একথার নড়চড় হয় না।”

জেমসন কিছু বলতে উদ্যত হচ্ছিলেন। কিন্তু ইন্দ্রকমলের মণিমুক্তাখচিত ছড়ি আচমকা শূন্যে উঠে সজোরে নেমে এল জেমসনের মাথায়।

জেমসন মাটিতে চিৎ হয়ে পড়লেন।

রাধামোহনের দিকে তাকালেন ইন্দ্রকমল।

“এই সাহেবকে জ্যান্ত কবর দে!”

রাধামোহন শাগরেদদের সঙ্গে নিয়ে ঢুকলেন ঘরে। জেমসনকে তুলে নিয়ে যাবেন বলে।

ইন্দ্রকমল এবার এগিয়ে গেলেন মোহনের দিকে।

“আপনার নামটা তো জানা হয়নি সাহেব!”

ঘটনার আকস্মিকতায় মোহন বিভ্রান্ত হয়ে ছিল। ইন্দ্রকমলের প্রশ্ন শুনে সে আর দ্বিরুক্তি করল না। ইন্দ্রকমলকে সজোরে এক ধাক্কা মেরে সে ছুটে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। পাঁচীকে খুঁজে বের করতেই হবে।

কিন্তু ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ইন্দ্রকমলের লেঠেলও প্রস্তুত ছিল।

লাঠির এক ঘায়ে অচেতন হয়ে পড়ল সে।

ইন্দ্রকমল, রাধামোহন ও বাকিরা এগিয়ে এল তার দিকে।

জেমসন ছদ্মবেশ ধরতে জানতেন। জেলেপাড়ার এক সং-এর থেকে শিখেছিলেন ওই বিদ্যে‌। কিন্তু মোহনের ছদ্মবেশটা তেমন জুতসই হয়নি।

ইন্দ্রকমলের ধারালো চোখে ফুটে উঠল হাসি‌। এই সেই যুবক, যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বংশীধরের ওপর আজ সকালে।

অর্থাৎ, তার আজ রাতের শিকারের সঙ্গী।

নিষ্ঠুর একটা অট্টহাসিতে কুঠিবাড়ির অলিন্দ ভরিয়ে তুললেন ইন্দ্রকমল।

ইন্দ্রকমল খুব ছোটবেলায় একবার তার জন্মদিনের দিন কাঁসার বাটিতে পায়েস খাচ্ছিলেন। একটি পুরুষ্টু হুলো বেড়াল তার পায়ের কাছে বসে ছিল এবং ক্রমাগত ল্যাজ নাড়াচ্ছিল। খানিক মায়া থেকেই বেড়ালটিকে পায়েস খাওয়াতে যান ইন্দ্রকমল। বেড়ালটি তার হাতে কামড় বসায়।

পরের দিন সকালে দেখা যায় হেঁশেল থেকে একটি হামানদিস্তা উধাও। সে হামানদিস্তা খুঁজতে গিয়ে বাড়ির চাপরাশি ধলেশ্বরী রান্নাঘরের বাইরে পা রাখতে যায়। সঙ্গে সঙ্গেই তার পায়ে নরম কিছু ঠেকে। নিচের দিকে তাকিয়ে যে দৃশ্য দেখে ধলেশ্বরী তার ধাক্কা সে সামলাতে পারে না‌। সেখানেই ধলেশ্বরী জ্ঞান হারায়।

তার পায়ের কাছে পড়েছিল হুলো বেড়ালটির থ্যাঁতলানো মৃতদেহ।

সেই থেকেই ইন্দ্রকমলের স্বভাব কেমন হবে তা জেনে গিয়েছিল তার বাড়ির লোক। বাবা দেবকমল সিংহ ছিলেন ধূর্ত ও দাপুটে। কিন্তু প্রতিহিংসা এবং হিংস্রতা এই দুই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তার ছিলই না।

ইন্দ্রকমলের বোন বিন্দু ছিল চপলা এব‌ং খানিক কুচক্রী। একবার ইন্দ্রকমলের এক বন্ধুর সঙ্গে তাকে জড়িয়ে কেচ্ছা হল। কিন্তু বিন্দুর কৌশলের জেরে সে বেঁচে গেল। সেই বেচারা বন্ধুটির কপালেই জুটল অপবাদ।

দুদিন পর গঙ্গার জলে ভাসতে দেখা গেল ইন্দ্রকমলের সেই বন্ধুটির লাশ। কিন্তু বিন্দুর ভাগ্যও সুপ্রসন্ন হল না। ছাদের কার্নিশের কাছে তাকে পাওয়া গেল অচেতন অবস্থায়। ভয়ে সে কাউকে কিছুই বলল না। কিন্তু এক চাকরের চোখে পড়েছিল, দুটি পুরুষ ছায়ামূর্তি সন্ধের অন্ধকারে ছাদ থেকে ঝুলিয়ে ধরে রেখেছিল বিন্দুকে। সে আতঙ্কিত হয়েছে দেখে সেই দুটি পুরুষ ছায়ামূর্তিই আবার টেনে তাকে তোলে। ততক্ষণে বিন্দু অচেতন।

ছায়ামূর্তির একটি ইন্দ্রকমল, এ কথা চাকরটি অবশ্যই বলেনি।

এহেন ইন্দ্রকমলের বিয়ে হল বেলপুকুরিয়ার রাজা অমরেন্দ্র মল্লিকের মেয়ের সঙ্গে। বিয়ের পিঁড়িতেই বোঝা গেল কনে ঠিক সুস্থ নয়। তার চোখের দিকে তাকালে মনে হয় সবাইকে ভস্ম করে দেবে। কিছু একটা গোলমালের আভাস পেল সকলেই।

ফুলশয্যার রাতে কনেকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বাড়িসুদ্ধ হইহই। ইন্দ্রকমল তার আহত পৌরুষ নিয়ে রাগে জ্বলছিলেন, এবং পায়চারি ক‍রছিলেন তার ঘরে। হঠাৎ ঘরের দরজায় চোখ পড়তে তার হাড় হিম হয়ে গেল।

দুহাতে অজস্র জ্বলন্ত ধূপ হাতে দাঁড়িয়ে একটা নারীমূর্তি। তার চোখ আধিভৌতিক। তার স্ত্রী?

প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে উঠে ইন্দ্রকমল বুঝল তাকে ঠকানো হয়েছে। চোখে ফুটে উঠল ক্রোধ। সে নারীমূর্তিটির সামনে গিয়ে বলল, “পথ ছাড়ো!”

“আমায় চোখ রাঙাচ্ছিস, শয়তান!”

তার একহাতের যাবতীয় জ্বলন্ত ধূপ সে গুঁজে দিল ইন্দ্রকমলের এক চোখে।

চোখ নষ্ট হয়ে গেল। পাথর হয়ে গেল তার ওই একটি চোখ‌।

জানা গেল কনের প্রতি রাতে ভর হয়। বাকি সময়টা সে কারুর সঙ্গেই কথা বলে না।

মল্লিকবাড়ির সঙ্গে বিস্তর ঝামেলা হল। কিন্তু অমরেন্দ্র জানতেন তার কৌশল সফল। মেয়েকে বাপের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব তিনি কানেও তুললেন না।

এই বউয়ের কথা চাউর হতে দেওয়া হল না। বলা হল কলেরায় পড়ে অকালেই মারা গেছে ইন্দ্রকমলের স্ত্রী।

ইন্দ্রকমল এতবড় প্রবঞ্চনার শিকার কোনওদিন হননি। কিছুদিন ঘরবন্দি রইলেন তিনি। সকলে ভাবল তিনি বোধহয় সন্ন্যাসী হবেন।

সন্ন্যাসী তো হলেনই না, বরং ধর্মকর্ম থেকে মন উঠে গেল তার। ইন্দ্রকমল হয়ে উঠলেন পাগলের মতন নিষ্ঠুর। প্রতি রাতে ফুলশয্যার আয়োজন হত তার ঘরে, অপহৃত মেয়েদের নিয়ে। তারপর শেষ রাতে জ্যান্ত কবর দেওয়া হত সেই মেয়েকে।

এই ছিল ইন্দ্রকমলের প্রতি রাতের নিয়ম।

আজও সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হবে না। পাঁচীকে সাজানো হয়েছে। সকালে জোড়াদীঘির মাঠে পাঁচীর ভয়াবহ জেদ আর মোহনের প্রতিরোধ যেন ইন্দ্রকমলের পাশবিক সত্তাকে বুঝিয়েছিল যে আজ একেই শিকার করবেন তিনি। নিশ্চিতভাবে।

মোহনকে বহন করে নিয়ে চলল তার লোকজন একটি বিশেষ ঘরের দিকে।

 

কালীনাথের হুঁশ ফিরল দীঘির শীতল জলে। এ দীঘির নাম তালদীঘি। দীঘির ওপারে সার দিয়ে তালগাছ।

মঙ্গলগঞ্জের শীতলতা, শান্তি যেন ফিরে এসেছে। একঝটকায় মনে হল কালীনাথের।

সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ল আগের রাতের বিভীষিকা।

প্যাটনের চাবুকের এক একটি ঘা সে সহ্য করে নিত, কিন্তু সেই একই সময়ে শম্ভুর বউকে ধর্ষণ করছিল চার্লি। পাশের ঘরে। আর শম্ভুর বউয়ের প্রতিটি আর্তনাদ এসে শলাকার মতন বিঁধছিল তার কানে। অক্ষমতার যন্ত্রণা এভাবে কখনও পায়নি কালীনাথ। এর আগে।

কালীনাথের সারা শরীরের দগদগে ক্ষত যেন জেগে উঠল। দীঘির ঠান্ডা জল আরও বাড়িয়ে দিল সেই ক্ষতর যন্ত্রণা।

তাকে মেরে ফেলে রাখা যাওয়া হয়েছে এই দীঘির ধারে।

অপমানে, অক্ষম ক্রোধে কালীনাথ ছটফটিয়ে উঠল। কিন্তু তার হাত পা যেন এখনও বেঁধে রাখা। বাঁধনের গ্লানি তার দেহ থেকে যায়নি এখনও।

আচ্ছা, শম্ভুর বউয়ের নামটা কী? সে তো কখনও জানতেও চায়নি।

“কত্তাবাবু!”

শূন্য দৃষ্টি ফিরিয়ে কালীনাথ দেখতে পেল আলি দাঁড়িয়ে। আলি তার এক দাপুটে প্রজা ও কৃষক। নীলকরদের অত্যাচার শুরু হওয়ার পর সে গ্রাম ছেড়েছিল। ফিরে এসেছে আলি?

কালীনাথ প্রায় অথর্বের মতন করে উঠে বসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল‌। আলি এগিয়ে এল। সঙ্গে মদনও আছে। ধরে বসাল তাকে।

“এ কী দশা কইরেছে আপনার! কত্তাবাবু!”

আলি বলল।

কালীনাথ আলির হাতটা চেপে ধরল। ধরা গলায় বলল, “আলি! শম্ভুর বউকে ওরা…”

কালীনাথ ভেঙে পড়ল কান্নায়।

আলির চোখ ধক করে জ্বলে উঠল।

“নরাধমের দল! ব্রিটিশ কুত্তাগুলান ছাড়ান পাবে না কত্তা! গেরামের সব লোক একজোট হইছে। আর বড়কত্তাকেও খবর পাঠানো হইছে। তিনি কলকেতা থেকে রওনা দিলেন বলে।”

মদন চুপ ছিল। সে এবার বলল, “চিন্তা করবেন না কত্তাবাবু! উয়াদের বন্দোবস্ত গেরামের লোকেরাই করবে! উচিত শিক্ষা দিবে! আপনেরাই আমাদের প্রভু হবেন আবার! শুধু আমাগো দিকটা একটু দ্যাখবেন এরপর!”

“আহ্! মদন!”

আলি ধমকাল।

কালীনাথ শুধু দেখল একবার মদনকে। মদনের চোখে কোনও সহানুভূতি নেই কালীনাথের প্রতি। শুধু প্রয়োজনীয় রাগটুকু আছে।

“আপনারে কে ধরে নিয়ে গিয়েছিল কত্তাবাবু?”

কালীনাথ কোনওমতে বলল, “দেবীলাল!”

“দেবীলাল! কুত্তার বাচ্চা! বেইমান!”

দাঁতে দাঁত ঘষে বলল আলি।

তারপর দুজনে মিলে শলাপরামর্শ করল কালীনাথের সঙ্গে। আলি আজ রাতেই গোপনে ফিরেছিল গ্রামে। ফিরে এই পরিস্থিতির কথা শুনে তার সর্বাঙ্গ রাগে জ্বলে ওঠে। গ্রামের লোকের সঙ্গে মিলিত হয়ে সে সিদ্ধান্ত নেয়, আজ রাতে এসপার নয় ওসপার। আজ রাতে নীলকুঠি দখল হবে। হবেই। আলি এসে পড়ায় গ্রামের লোকও বল পেয়েছে বুকে।

সবশেষে কালীনাথ কথা বলল, “আমাদের লেঠেলরা ছড়িয়েছিটিয়ে আছে। তাদের জড়ো করতে হবে। মশাল তৈরি রাখো। আমরা ঘিরে ফেলব নীলকুঠি, রাতের মধ্যেই। তারপর ভেতর থেকে টেনে বের করে আনা হবে চার্লি, প্যাটন আর দেবীলালকে।”

আলি আর মদন বুঝল গোটা বিষয়টা। কালীনাথ জানাল সে অপেক্ষা করবে কাছের জঙ্গলে। ওরা ছুটে ফেরত গেল গ্রামের দিকে।

 

জেমসনের চৈতন্য যখন ফিরল, তখন সে খানিকক্ষণ বুঝতে পারেনি কোন দেশে আছে। এত রোমান স্থাপত্য এল কোত্থেকে?

শিগগির সে বুঝল এটা ইন্দ্রকমলের বাড়ির ছাদ। গোপনে বলা হয়, এই রোমান ‘পুতুল’ গুলোর ভেতর ভূত পোষে ইন্দ্রকমল। আসলে ইন্দ্রকমলের বহু লাশ জমা হয় এই ছাদের তলায়। আর সেই লাশ চাপা দিয়ে তার ওপর গেঁথে দেওয়া হয় এই রোমান মূর্তিগুলো।

শাবলের শব্দ পেল জেমসন। পাশেই।

তাকিয়ে দেখল সে জোর প্রস্ততি চলছে। তাকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার।

তার হাতের বাঁধনটা টের পেল সে। তার কোমরে গোঁজা ছোট ছুরিটা উঠে এল তার হাতে। মুহূর্তের মধ্যে সেই বাঁধনের দড়ি কেটে ফেলল সে।

তার পিস্তল নিয়ে নিয়েছে এরা। কিন্তু কোমর ছাড়াও অন্যত্র পিস্তল রাখে জেমসন। সে খবর এরা জানত না।

তার গামবুটের ভেতর থেকে পিস্তলটা বার করল জেমসন। ইন্দ্রকমলের লোকজন জেমসনের কবর প্রস্তুত করছিল। তারা খেয়াল করেনি জেমসন কখন এসে দাঁড়িয়েছে তাদের পেছনে।

একজনের মাথায় জেমসনের পিস্তলের বাঁট সজোরে আঘাত করল।

সে মুহূর্তের মধ্যে অচেতন হয়ে পড়ে গেল।

আরেকজন শাবল তুলে আঘাত করতে গেল জেমসনকে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে জেমসনের পিস্তল থেকে গুলি ছুটল।

সে গুলি আঘাত করল শাবলে। শাবল ছিটকে পড়ল।

আর কেউ এগিয়ে আসতে সাহস দেখাল না।

জেমসন পিস্তল বাগিয়ে ধরে বলল, “বলো, কোন ঘরে আছে তোমাদের বাবু?”

গুলির শব্দটা শোনা ইস্তক রাধামোহনের ছটফটানি বেড়ে গিয়েছিল। সে দাঁড়িয়েছিল ইন্দ্রকমলের ঘরের ঠিক বাইরে।

ঘরের ভেতর হাতপামুখ বাঁধা অবস্থায় পড়ে রয়েছে মোহন।

তার চোখের সামনে নববধূর সাজে পাঁচী ও বরের সাজে ইন্দ্রকমল‌।

ইন্দ্রকমল একটি ক্রূর হাসি হাসল মোহনের দিকে তাকিয়ে।

তারপর সে পাঁচীর পাশে গিয়ে বসল বিছানায়।

মোহন আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় ছটফট করে উঠল।

কিন্তু তার হাত পা বাঁধা।

আরেকবার হো হো করে হেসে উঠল ইন্দ্রকমল।

মোহন একবার তাকাল পাঁচীর দিকে। দুজনেরই চোখে জল।

এ কী শোচনীয় অবস্থায় পড়তে হল তাদের?

ইন্দ্রকমল গাল টিপে ধরল পাঁচীর। তারপর আঁকড়ে ধরল তার চুলের মুঠি। তার চোখে পাশবিক উল্লাস।

আচমকা পাঁচীর গালে এক থাপ্পড় মারল ইন্দ্রকমল। হতচকিত হয়ে গেল পাঁচী, তার চোখ থেকে অঝোরে ঝরতে লাগল জল। আর মোহন রাগে শোকে অস্থির হয়ে উঠল।

এই সময় রাধামোহন অনুভব করল তার ঘাড়ে কেউ ধাতব শীতল কিছু ঠেকিয়েছে।

রাধামোহনের হাড় হিম হয়ে গেল।

সে সঙ্গে সঙ্গে পেছন ফিরে দেখল দাঁড়িয়ে আছে জেমসন। তার এক হাতে পিস্তল, আর এক হাতে শাবল।

সে ভূত দেখছে কি না স্থির করে উঠতে পারল না রাধামোহন। তার আগেই জেমসন কথা বলল।

“দরজা খুলে দাও। নইলে আমিই খুলে ফেলব এই শাবল দিয়ে।”

রাধামোহন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

“কথা কানে যাচ্ছে না?”

রাধামোহন তাকাচ্ছে জেমসনের পেছনের দিকে।

জেমসন চকিতে ফিরলেন।

বিন্দু।

সঙ্গে সঙ্গে এক ছটাক লঙ্কাগুঁড়ো ছিটকে এল তার চোখে। দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন জেমসন। সঙ্গে সঙ্গে রাধামোহন তাকে জাপটে ধরল পেছন থেকে। জেমসন চোখ খুলতে পারছেন না। কিন্তু রাধামোহনের আলিঙ্গনে বন্দী অবস্থাতেই শাবলটা ঘুরিয়ে সামনে নিক্ষেপ করলেন জেমসন। সেটি কারুর মাথায় আঘাত করল মুহূর্তেই। একটি মহিলা কন্ঠের আচমকা আর্তনাদ।

বোঝা গেল বিন্দুর মাথায় লেগেছে শাবলটা। জ্ঞান হারিয়েছে সে।

জেমসন সর্বশক্তি দিয়ে পেছনদিকে ঠেলা মারলেন রাধামোহনকে।

রাধামোহন খানিকটা পিছিয়ে গেল।

ঘুরে দাঁড়িয়ে জেমসন নীচের দিকে এলোপাথাড়ি দুটো গুলি চালালেন পরপর। চোখ বন্ধ অবস্থাতেই।

রাধামোহনের আর্তনাদ।

পায়ে গুলি লেগেছে তার।

ততক্ষণে বিছানায় পাঁচীকে ঠেলে ফেলে দিয়েছেন ইন্দ্রকমল। এমন সময় এই গুলির শব্দে ইন্দ্রকমল সচকিত হলেন‍।

জেমসন অন্ধের মতন হাতড়ে এগোতে গেলেন দরজার দিকে। এমন সময় দরজা খোলার শব্দ।

হাতে গাদাবন্দুক নিয়ে বেরিয়ে এসেছেন ইন্দ্রকমল।

জেমসন তাকে দেখতে পেলেন না।

ইন্দ্রকমল বলে উঠলেন, “এই দুই চালচুলোহীনের জন্য আপনার এত দরদ কেন সাহেব?”

জেমসন এই কণ্ঠস্বর চিনতে পেরে পিস্তল তুলে গুলি চালাতে উদ্যত হলেন।

কিন্তু গুলি চালানোর আগেই তাকে ধাক্কা মেরে সামনে এগিয়ে গেল কোনও ঝড়। ইন্দ্রকমল হতচকিত হয়ে দেখলেন একটি লালপাড় সাদাশাড়ি পরা ঝোড়ো হাওয়া যেন তার সামনে এসে হাজির হয়েছে। তার হাতে ঠাকুরঘরের মা কালীর খাঁড়া।

“শয়তান! আবার বরের সাজে সাজা হয়েছে!”

সেই খাঁড়া মুহূর্তেই নেমে এল ইন্দ্রকমলের গলায়।

আর্তনাদ করে উঠল রাধামোহন এ দৃশ্য দেখে।

ইন্দ্রকমলের হাত থেকে গাদাবন্দুক পড়ে গেল মাটিতে।

তার গলার রক্তে ভেসে গেল তার বাসরঘরের চৌকাঠ‍।

রাজা ইন্দ্রকমল সিংহ, যার নামে ত্রাস সঞ্চার হত কলকাতা শহরের এই এলাকায়, তার নিথর দীর্ঘ দেহ শব্দ করে পড়ল মাটিতে।

পতন।

খাঁড়াটাও ঠং শব্দ করে পড়ল মাটিতে। কেমন ঘোরের মধ্যেই সেই ভয়াবহ নারীমূর্তিটি হেঁটে চলে গেল অলিন্দ দিয়ে।

জেমসন কোনওক্রমে চোখ খুলে দেখলেন এই দৃশ্য। হতভম্ব হয়ে গেলেন তিনি।

রাধামোহন তারস্বরে কেঁদে চলেছে‌। তার হাঁটুতে জেমসনের বুলেট। সেই হাঁটু থেকেও অঝোরে ঝরছে রক্ত!

এবার মোহন আর পাঁচীকে মুক্ত করতে হবে।

ঘরের ভেতরে ঢুকতে গেলেন জেমসন।

এসময় অলিন্দের ওপাশ থেকে একরাশ পায়ের শব্দ। কয়েকজন লেঠেল। কার লেঠেল এরা? ইন্দ্রকমলের?

উত্তর পাওয়ার আগেই বিন্দু আর রাধামোহনকে টপকে ঘরে ঢুকে পড়ল তারা। ইন্দ্রকমলের মৃতদেহ দেখে আঁতকে উঠল তারা। কিন্তু বিস্ময় ঝেড়ে ফেলে মোহন আর পাঁচীকে মুক্ত করল তারা। জেমসনকে প্রায় কাঁধে তুলে মহলের বাইরের দিকে নিয়ে গেল।

জেমসন দৃষ্টি কোনওমতে উন্মোচিত করে দেখলেন সামনে পড়ে আছে দারোয়ান নবর অচেতন দেহ।

আরও কিছু পাইক বরকন্দাজ অচেতন অবস্থায় এদিকসেদিক পড়ে। এই লেঠেলদের সঙ্গে এদের একটা লড়াই চলেছে বোঝা যায়।

এরা কারা কিছুতেই বুঝলেন না জেমসন।

জেমসন, মোহন ও পাঁচীকে তোলা হচ্ছে একটি জুড়ি গাড়িতে।

জেমসনকে ধরে লেঠেলরা তুলছিল।

জুড়ি গাড়ির পর্দা ফাঁক করে হাত বাড়াল কেউ।

জেমসন চোখ তুললেন।

“আসুন, হুজুর!”

নন্দলাল।

 

গ্রামবাসীরা প্রস্তুত হল লাঠি, বল্লম, বঁড়শি নিয়ে। গ্রামের মেয়েরা প্রস্তুত হয়েছে খুন্তি সাঁড়াশি জাতীয় গেরস্থালির জিনিস নিয়ে। জমিদার বাড়ির লেঠেলরাও একজোট। জমিদার বাড়ির দালানে কালীনাথ জড়ো করল সবাইকে। সবাইকে উদ্দেশ্য করে কালীনাথ বলল, “আজকের রাত শেষ হলেই আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ সুযোগ। কালকের ভোর হবে আমাদের। কাল হয় মারব, নয় মরব। তোমাদের কারুর কিছু বলার আছে?”

মদন উঠে দাঁড়াল‌।

কালীনাথ শান্ত চোখে তাকাল মদনের দিকে। কী বলতে চায় মদন?

মদন সবাইকে উদ্দেশ্য করে শুধু দুটো কথা বলল, “আমাগো জন্য মাইর খাইতে দ্বিধা করেননি আমাগো জমিদার! উনিই আমাদের আসল প্রভু! আমরা যেন ওর মর্যাদা রাখতে পারি!”

গ্রামবাসীরা সবাই বলে উঠল, “কত্তাবাবুর জয় হোক!”

 

নন্দলাল সব শুনে আঁতকে উঠে বলল, “বলেন কী হুজুর!”

জেমসনের চোখ তখন খানিক ধাতস্থ হয়েছে। সে ভিজে ন্যাকড়া চোখে ঠেকাতে ঠেকাতে বলল,

“হ্যাঁ! যদিও ওই ডেঞ্জারাস লেডি যে কে…”

নন্দলাল বিড়বিড় করে স্বগতোক্তি করল, “পাগল বউটা বোধহয়…”

জেমসন তাকাল তার দিকে।

নন্দলাল গলা খাঁকরে বলল, “আসলে রাজাবাবুর একটা বিয়ে হয়। মেয়েটি পাগল ছিল বলে ওকে মেরে ফেলে সিংহবাড়ির লোকজন। খবর ছড়ায় নাকি কলেরায় মরেছে‌। শুনে তো মনে হচ্ছে তার ভূত এখনও…”

“ছাড়ো এসব!” জেমসন বলল, “কিন্তু এটা কী ব্যাপার? তুমি এখানে?”

“আর বলবেন না! রমাকান্ত এমন চামার!”

এই কথা বলেই থামে নন্দলাল।

সামনে বসে থাকা লেঠেলদের একজন চোখ পাকাল নন্দলালের দিকে তাকিয়ে।

“ওরম তাকিও না বাপু! সে তোমার বাবু যে চামার সে কথা তুমিও জানো।”

জেমসন হেসে বলল, “নন্দলাল, পেট চালানোর জন্য আমিও একসময় চামার ছিলাম। ওটা তো একটা প্রফেসন! ছাড়ো, রমাকান্তর কী বিষয়?”

নন্দলাল একটু ইতস্তত করে বলল, “এজ্ঞে, আপনাকে বলেছিলুম না যে রমাকান্তর নায়েব আমায় ওবাড়ির ওপর নজর রাখতে বলেছিল?”

জেমসনের বুকটা ধক করে উঠল এক অজানা আশঙ্কায়।

“এজ্ঞে, রমাকান্তর মতলব ছিল রাতদুপুরে ওবাড়ি থেকে ওই মেয়েছেলেকে উদ্ধার করার। তারপর আবার ও নিজের হারেমেই তাকে রাখবে। এভাবে ইন্দ্র সিঙ্গির সঙ্গে টক্কর নিতে চেয়েছিল রমাকান্ত। কিন্তু ইন্দ্র সিঙ্গি তো… সে যাক পেত্থমে আপনারা ঢুকলেন, তারপর গুলির শব্দ শুনেই আমি বুঝলাম…”

“নন্দলাল!” প্রায় গর্জন করে উঠলেন জেমসন। “তুমি একাজ করতে পারো না!”

“এজ্ঞে আমি কী করেছি বলুন তো হুজুর। আমার তো ছিল শুধুই নজর রাখার কাজ!”

কথা বলতে বলতে জুড়ি গাড়ি থামল। জেমসন নেমে দাঁড়ালেন জুড়ি গাড়ি থেকে। নন্দলালও নামল। আর লেঠেলরা ধরে নামাল মোহন আর পাঁচীকে।

মোহন আর পাঁচী গোটা রাস্তাটাই শুধু একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে। এত ধকল, এত অনাসৃষ্টির পর কেঁদেকেটে ক্লান্ত হয়ে ছিল দুজনেই। কিন্তু জুড়ি গাড়ি থেকে নেমে যেই দুজনে দেখল আবার রমাকান্তর বাড়ির সামনে এসে হাজির হয়েছে, তখন রাগে আক্রোশে অধীর হয়ে জেমসনের দিকে তাকাল মোহন। তার ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে গেল মোহন। লেঠেলরা আটকাল।

মোহন অস্ফুট স্বরে অভিসম্পাত দিতে লাগল জেমসনকে। জেমসন করুণ স্বরে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করল গোটা বিষয়টা। পারল না।

এমন সময় রমাকান্ত আর বিশ্বনাথকে দেখা গেল আলুথালু বেশে ছুটে বেরোতে। কালীনাথ গ্রেফতার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মঙ্গলগঞ্জ থেকে লোক ছুটে এসেছে খবর দিতে। খবর শুনে অস্থির হয়ে গেছেন রমাকান্ত‌।

নন্দলাল এগিয়ে গেল রমাকান্তর দিকে।

“এজ্ঞে কাম সারা। আর ইন্দ্র সিঙ্গির সে ভয়ানক ব্যাপার!”

রমাকান্ত যেন শুনলেনই না সে কথা। তিনি জেমসনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইনি কে?”

নন্দলাল আগ বাড়িয়েই বলল, “ইনি পুলিশের বড়কত্তা ছিলেন। খুব ভালো সাহেব!”

রমাকান্ত ছুটে এসে হাত চেপে ধরলেন জেমসনের। মদের নেশায় দাঁড়িয়েও থাকতে পারছেন না তিনি।

“সাহেব, আমার ছেলেকে উদ্ধার করো সাহেব! তোমায় নিয়ে যাচ্ছি আমাদের গাঁয়ে। সেখানে নীলকররা আমার ছেলেকে আটকে রেখেছে সাহেব!”

এত অবধি বলে হাউহাউ করে কেঁদে উঠলেন রমাকান্ত।

মোহন আর পাঁচী হাঁ করে দেখল সেই দৃশ্য।

তাদের জমিদার, তাদের রক্ষাকর্তার এই পরিণতি?

জেমসন অবস্থা বুঝল। বুঝে বলল, “আমি রাজি সাহায্য করতে। শুধু একটাই শর্ত!”

কাঁদতে কাঁদতেই চাইল রমাকান্ত।

“এই দুজনকে ছেড়ে দিতে হবে।”

“হবে! তাই হবে! এই তোমাদের বাড়ি কোথায়?”

বিশ্বনাথ বলল, “তোমরা মঙ্গলগঞ্জের লোক?”

মোহন মাথা নাড়ল। তারপর সেই গুরুমশাইকে দিয়ে লেখানো চিঠিখানা বার করে দিল রমাকান্তকে।

চিঠিটা পড়ে দিল রমাকান্তরই এক শিক্ষিত অনুচর। মঙ্গলগঞ্জের দুঃখদুর্দশা আর নীলকরদের অত্যাচারের বর্ণণা। শুনে রমাকান্ত মাথা চাপড়ে বলল, “ছি ছি! কী নরাধম আমি! আমারই প্রজাকে আমি…”

“বিলম্ব করা বোধহয় উচিত হচ্ছে না কত্তামশায়!”

বিশ্বনাথ বলল।

রমাকান্ত চোখ মুছে প্রস্তুত হল রওনা দেওয়ার জন্য। জুড়িগাড়িতে ওঠার আগে হঠাৎই জেমসনের দিকে ফিরল সে।

“ভাববেন না ইনাম দিচ্ছি। আমার ব্যাটার জন্য আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি। ওর প্রাণভিক্ষা করছি ধরে নিন আপনার কাছে।”

নিজের আঙুল থেকে খুলে জেমসনের হাতে রমাকান্ত পড়িয়ে দিল ইন্দ্রকমলের পারিবারিক অভিজ্ঞান।

বুকটা ছাঁৎ করে উঠল জেমসনের।

এই আকাশি রঙের আংটি আঙুল থেকে খুলে দেওয়াই কি কাল হল ইন্দ্রকমলের?

 

“কত্তাবাবু!”

হাঁপাতে হাঁপাতে এসে হাজির হয়েছে আলি। ভোরের আলো ফুটে গেছে তখন।

“এই তো আলি! বাবামশায় কোথায়?”

“শুনলাম তারা মঙ্গলগঞ্জের কাছাকাছিই আছেন।”

“তারা এসে পড়লেই সব শুরু করা যায়!”

ততক্ষণে মঙ্গলগঞ্জের সীমানার কাছে পৌঁছে গেছে রমাকান্তদের জুড়িগাড়ি। ভোর হয়ে গেছে। বাইরে পাখি ডাকছে তখন। কলকাতায় তখন নিশ্চিন্ত ঘুমের পালা। আর কলকাতার অদূরেই বারাসাতের কাছে মঙ্গলগঞ্জে চলছে যুদ্ধের প্রস্তুতি।

রমাকান্ত চোখ বুজে আধশোয়া হয়েছিল। কাল কালীনাথের গ্রেফতারির খবর শুনে সে বুঝেছিল তার ক্ষমতার দম্ভ অর্থহীন। এতদিনের জমিদারির গুমর বোধহয় তাদের ফুরোতে চলল। ব্যবসা করতে এসে রাজা হয়ে বসেছিল ইংরেজরা। সেদিনও এদেশের কিছু লোক ছিল তাদের অনুচর। আজও তাই‌। একশো বছরেরও বেশি সময় চলে গেল। দেশে মিউটিনি হয়ে গেল। এখনও বুক ফুলিয়ে টিকে ছিল এই একটাই জাত, জমিদার। জমিদারি যদিও নামেই। দশশালা বন্দোবস্তের পর থেকে গ্রামে তো আর কেউ থাকলই না। কিন্তু তাও, এই অহংটুকু অবশিষ্ট ছিল। তাও আর রইল না।

ভাবতে লাগল রমাকান্ত, পাপের ভাঁড়ারে সে ডুবে আছে। গলা অবধি পাপ। এত বেপরোয়া জীবন কাটিয়ে, নির্লজ্জ বেহায়ার মতন জীবন কাটিয়ে সে কী অর্জন করল?

জীবনের শেষ ভাবনা রমাকান্তর শেষ নিশ্বাসের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে গেল। তার হৃৎপিণ্ড শেষবারের মতন কেঁপে উঠল।

মৃত্যু এল আচমকাই। মঙ্গলগঞ্জের যুদ্ধপরিস্থিতিতে মঙ্গলগঞ্জের অনুপস্থিত জমিদার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

বিশ্বনাথ এবং বাকিরা কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘটে গেল ঘটনাটা‌।

মঙ্গলগঞ্জের সীমানায় পৌঁছতেই খোলা মাঠের পাশে রাস্তায় দেখা গেল জনাদশেক লেঠেল দাঁড়িয়ে।

বিশ্বনাথ মনে করল নিশ্চিত ওদের লেঠেল। জুড়িগাড়ি থামাতে বলল।

রমাকান্তর দিকে তাকিয়ে দেখল বিশ্বনাথ। অঘোরে ঘুমোচ্ছেন রমাকান্ত।

বিশ্বনাথ নামল।

“কই হে, কালীনাথ কই?”

লেঠেলদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল বিশ্বনাথ।

সঙ্গে সঙ্গেই একটা খল হাসির শব্দে চমকে উঠল সে।

ফিরে তাকাল।

দেবীলাল দাঁড়িয়ে।

বিশ্বনাথের মাথায় আগুন জ্বলে উঠল।

তাদেরই কর্মচারী দেবীলাল এখন শয়তান নীলকরদের দালাল।

“পেন্নাম হই নায়েবমশাই! কী বলি বলুন তো! আপনাদের ব্যাটার ওপর অকথ্য অত্যাচার করেছে গোরা পল্টনরা। এখন বেঁচে থাকলেও চলেফিরে বেড়াতে পারবেন বলি তো মনে হচ্ছে না।”

“এতবড় সাহস তোর দেবীলাল! নেমকহারামি! আমাদের সঙ্গে!”

গর্জে উঠল বিশ্বনাথ।

“নেমক খাইয়ে ধন্য করেননি নায়েবমশাই!” কণ্ঠস্বর কঠিন হল দেবীলালের, “আর শুনুন, নীলকরদের অমান্যি করে কোনও জমিদারও পার পাচ্ছে না, আমি তো সামান্য দেওয়ান। তাছাড়া তাদের হয়ে কাজ করলে ক্ষেতি কই? এই কাজই তো এদ্দিন আপনাদের হয়ে করে এয়েছি। আজ আপনাদের বিবেক জেগেছে যে বড়!”

“কালীনাথ তোর প্রভু। তাকে তুই…”

“এজ্ঞে না! কালীনাথ আমার প্রভু নয়! সে আপনাদের বংশের চাঁদ হতে পারে। এখন প্রভু নীলকররাই। তাদের গায়ে কেউ হাত তুলতে পারবে না। আমার গায়েও কেউ হাত তুলতে পারবে না।”

“যত বড় মুখ নয়, তত বড় কথা!” দাঁতে দাঁত ঘষে বলল বিশ্বনাথ। এবার লেঠেলদের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোমরা দাঁড়িয়ে দেখছ কী! একে বন্দি করো।”

আবার হো হো করে হেসে উঠল দেবীলাল।

“ভুল করছেন নায়েবমশাই। ওরা এখন আমার কথা শুনবে। আমি বলছি, এদের বন্দি করো।”

লেঠেলরা অগ্রসর হল বিশ্বনাথের দিকে।

“খবরদার!”

বিশ্বনাথ চিৎকার করে বলে উঠল।

লেঠেলরা বিনা দ্বিধায় এগিয়ে যাচ্ছিল। এমন সময় একটি গগনবিদারী শব্দে পিছু হঠল তারা।

দেবীলাল চমকে তাকাল।

গুলির শব্দ। জেমসনের পিস্তলের।

বিশ্বনাথও পিছু ফিরল।

দেবীলাল দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, “এসব কী মশকরা! গোরা সঙ্গে নিয়ে এসে পার পাবেন ভেবেছেন নায়েবমশায়!”

“উনি পুলিশের লোক!” বিশ্বনাথ বলল।

দেবীলাল একটু থমকাল। তারপর গম্ভীরভাবে বলল, “পুলিশের লোক সঙ্গে এনে লাভ নেই। এখানকার দারোগারা আমাদের সঙ্গেই।”

“না, আমি এখন আর পুলিশের লোক নই।” জেমসন মুখ খুলল, “আগে ছিলাম!”

দেবীলাল বিশ্রীভাবে হেসে উঠল।

“তাহলে তুমি এসেছ কী করতে? সং সাজতে?”

“বাজে কথা বললে এই পিস্তলের সবকটা বুলেট তোমার খুলিতে ঢুকবে!”

জেমসনের কণ্ঠস্বর কড়া।

“এত বড় কথা!” দেবীলাল খানিক ভয়ে খানিক ক্রোধে কাঁপতে লাগল। “কে আপনি?”

“আমি একজন ভাড়া করা বন্দুকবাজ। কলকাতাতে বহু বদমাইশ আছে যাদের পুলিশ বিভাগ ধরতে পারে না। পুলিশের নির্দেশে তাদের আমি খতম করি। বজ্জাত লোককে মারতে আমার ট্রিগার আটকায় না! ভেবে দেখো।”

বিশ্বনাথ হাঁ করে দেখছিল জেমসনকে। মোহনও পর্দার আড়াল দিয়ে সব শুনল। বিস্মিত হল সে। এমন লোকও আছে?

“তা এখানে তোমায় কে ভাড়া করে এনেছে? রমাকান্ত রায়?”

দেবীলাল বেপরোয়া।

এবার বিশ্বনাথের মনে হল রমাকান্তকে জাগানো প্রয়োজন। সে গাড়িতে উঠে ডাকতে গেল রমাকান্তকে, সঙ্গে সঙ্গে তার হাড় হিম হয়ে গেল।

রমাকান্তর শরীর বরফের মতন ঠান্ডা।

তার নাকের কাছে দুআঙুল ঠেকাল বিশ্বনাথ। তারপর ডুকরে কেঁদে উঠল।

জেমসন ভ্রু কুঞ্চিত করে তাকাল বিশ্বনাথের দিকে। গাড়ি থেকে নেমে এসে সে বলল, “কত্তাবাবু আর নেই!”

দেবীলাল খানিক দমে গিয়েছিল। এবার সে উল্লাসে চিৎকার করে উঠল।

“কী! তার মানে মঙ্গলগঞ্জের এখন কোনও জমিদার নেই! হাহাহা! মদ আর মাগি নিয়েই মলো জমিদার আমাদের। আবার গোরা স‌ং নিয়ে এসে তামাশা হচ্ছে। এই পাকড়াও করো এদের!”

জেমসন পিস্তল তুলল আবার। কিন্তু লাঠির এক ঘা পেছন থেকে এসে পড়ল তার মাথায়।

বিশ্বনাথ এবার বিনা প্রতিরোধেই বন্দী হলেন।

মোহন আর পাঁচীকেও লাঠির ঘায়ে বেঁহুশ করতে হল। দুজনেই পলায়নোদ্যত ছিল।

কালীনাথ পেছনে। সামনে আলি আর মদন। আর কালীনাথের পেছনে শখানেক কৃষক, লেঠেল। যেকজন লেঠেল অবশিষ্ট ছিল। রমাকান্তের খবর এখনও পায়নি কালীনাথরা। কিন্তু তারা আর দেরি করতে চায় না। তারা এগিয়ে যাচ্ছে নীলকুঠির দিকে। সশস্ত্র অবস্থায়। আজ প্রতিরোধ নয়তো মৃত্যু।

জেমসনের হুঁশ ফিরতেই সে দেখল সামনে রমাকান্তর লাশের ওপর আছাড়িপিছাড়ি হয়ে কাঁদছে বিশ্বনাথ। মোহন আর পাঁচী অচেতন অবস্থায় পড়ে। একটি ঘুপচি প্রায়ান্ধকার ঘরে তারা বন্দি‌।

জেমসন উঠে বসার চেষ্টা করতেই তার চোখে পড়ল তার হাতে আকাশি রঙের আংটিটির দিকে।

নন্দলাল বলেছিল পাঁচীর পরিবর্তে এই আংটি দিয়েছিল ইন্দ্রকমল রমাকান্তকে।

সেই অভিশপ্ত আংটি, যা না কি ইন্দ্রকমলের পারিবারিক অভিজ্ঞান, গোটা কলকাতার নজর যে আংটির দিকে তা এখন তার হাতে।

রমাকান্তর মৃতদেহের দিকে তাকাল জেমসন। রমাকান্ত আংটি এবং পাঁচী দুইই দখল করতে চেয়েছিল। এই পাপের ধাক্কাতেই কি সে…

গটগট করে পায়ের শব্দ।

এসে দাঁড়াল প্যাটন, চার্লি আর দেবীলাল।

প্যাটন সোজা এসে দাঁড়াল জেমসনের সামনে।

জেমসন অনুভব করল তার পিস্তলটা বেহাত হয়ে গেছে।

প্যাটন জেমসনকে বলল, “হাউ ডেয়ার ইউ টু থ্রেটেন মাই সাবঅর্ডিনেট ইন মাই প্রেমাইসেস? এনিওয়ে, ইউ ডোন্ট বি ইনভলভড ইন দিস ব্রল! ইউ আর জেন্টলমেন। উই উইল সেন্ড ইউ ব্যাক টু ক্যালকাটা!”

হঠাৎ বিশ্বনাথের কান্নার রোল দ্বিগুণ হল। প্যাটন বিরক্ত হয়ে বলল, “শাট আপ ইউ ন্যাস্টি ফেলো! চুপ না করিলে তুমার মালিকের হাল তুমারও হবে।

আবার সে জেমসনের দিকে ফিরল।

“বাট অ্যাজ ইউ হ্যারাসড মাই ম্যান, হি উইল পাঞ্চ ইউ ইন ইওর ফেস ফর ওয়ান্স! অ্যান্ড উই উইল নট রিটার্ন ইওর ব্লাডি গান!”

লোকটার বেয়াদবি দেখে জেমসন হাসবে না কাঁদবে বুঝল না।

জেমসন উত্তর দিল, “অ্যান্ড হোয়াট উইল হ্যাপেন টু রেস্ট অফ দেম?”

“ইউ ন্যাস্টি বাউন্টি হান্টার! তুমার তাতে কী?”

“ডোন্ট ওরি জেন্টলম্যান!” চার্লি পাঁচীর মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল, “উই উইল টেক কেয়ার অফ হার!”

প্যাটন চার্লি দুজনেই হেসে উঠল। দেবীলাল কিছু না বুঝেও হো হো করে হাসল তালে তাল মিলিয়ে।

রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন জেমসন।

“ইউ বাস্টার্ড!”

এগিয়ে গিয়ে চার্লির বুকে সজোরে পদাঘাত করলেন জেমসন।

“দেবীলাল!”

প্যাটনের হুঙ্কারের আগেই দেবীলাল জাপটে ধরেছে জেমসনকে।

“অত গায়ের জোর ভালো নয় সাহেব!”

জেমসন রাগে ঘৃণায় হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করলেন। পারলেন না।

চার্লি উঠে দাঁড়িয়ে ঘৃণিত স্বরে বলল, “হোয়াট হ্যাপেনড টু ইউ? ইউ ওয়্যান্ট দ্যাট ওম্যান?”

আবার চার্লির সেই বিশ্রী হাসি।

জেমসনের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল।

দেবীলাল জেমসনের কনুইয়ের গুঁতো খেয়ে খানিকটা পিছিয়ে গেল। তারপর বিস্ফারিত নেত্রে তাকাল জেমসনের দিকে।

“তুমি আমার ফেসে পাঞ্চ করবে? ইডিয়ট!”

আংটিসুদ্ধ হাতটা জেমসন সজোরে চালিয়ে দিলেন দেবীলালের মুখে।

দেবীলাল আর্তনাদ করে বসে পড়ল। তার নাক দিয়ে অঝোরে গড়াচ্ছে রক্ত।

চার্লির দিকে ফিরল জেমসন।

“সেট দেম ফ্রি!”

“ডোন্ট অর্ডার আস!”

প্যাটন গর্জে উঠল।

জেমসন এবার দেখতে পেল চার্লির হাতে তারই পিস্তল উঠে এসেছে।

লহমায় জেমসনের পা চলল সামনে। পিস্তল এসে পড়ল তার হাতে।

এবং গুলি ছোটার আগেই তার পিঠে গেঁথে গেল একটা ছুরি।

দেবীলাল।

জেমসনের সামনে অন্ধকার হয়ে এল পৃথিবীটা। তার স্ক্যান্ডিনেভিয়ার গ্রাম, তার শৈশব, তার এতদিনের পুলিশি জীবন।

জেমসন হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।

এতক্ষণে মোহন আর পাঁচীর জ্ঞান ফিরে এসেছে। তারা এই দৃশ্য দেখে বিহ্বল হয়ে পড়ল। দুজনেই জড়োসড়ো হয়ে বসল।

ওদিকে বিশ্বনাথ অর্ধোন্মাদ।

“শাবাশ দেবীলাল!”

প্যাটনের হুঙ্কার!

“আমার গায়ে হাত তোলা!”

দেবীলালের স্বগতোক্তি।

জেমসনের ঝাপসা দৃষ্টির সামনেই পাঁচীকে টেনে নিল চার্লি।

পাঁচী মোহন দুজনেই আর্তনাদ করে উঠল প্রায় অস্ফুটে।

“ডাম্ব না কি?”

চার্লির ব্যাঙ্গোক্তি!

জেমসনের হাত স্থির থাকতে পারছে না। তবে সে হাত থেকেও গুলি ছুটে গেল।

গুলি লাগল গিয়ে চার্লির ধর্ষক পৌরুষকে ছুঁয়ে তার উরুর উপরিভাগে।

একটা আকাশ ফাটানো আর্তনাদ করে উঠল চার্লি।

আর সেই আর্তনাদকে ছাপিয়ে উঠল একটা সম্মিলিত কলরোল।

ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল দেবীলাল আর প্যাটন। ওদের হুঁশ ফিরল।

কীসের আওয়াজ?

“বাবু!”

চিৎকার করে ছুটে এল এক লেঠেল।

“গেরামের লোক নীলকুঠি ঘিরে ফেলেছে। হাতে মশাল, লাঠি, সড়কি। বলছে নীলকুঠি জ্বালিয়ে দেবে।”

দেবীলাল আর প্যাটন উদভ্রান্তের মতন ছুটল সেই লেঠেলের সঙ্গে। চার্লির আর্তনাদ বেড়েই চলল।

জেমসন অতিকষ্টে মোহনের দিকে এগোল হাঁটু ঘষে।

“আমায় কবর দিও এখানেই, এই গ্রামেই!”

গ্রামেরই তো ছেলে তিনি।

এরপর জেমসন হাতের আঙুল থেকে খুলে মোহনের আঙুলে পড়িয়ে দিলেন আকাশি রঙের হীরের আংটিটা, যা আফ্রিকার সাপের পেট থেকে উদ্ধার হয়ে ওমান নামক একটি কাফ্রি কিশোরের সঙ্গে এসেছিল এই দেশে। যে ওমান পলাতক হয়ে গিয়েছিল কলকাতা থেকে। যাকে এক সহৃদয় ব্যক্তি উদ্ধার করে বাংলা শিখিয়েছিল। বাংলা নাম দিয়েছিল তার। অমল নামে সে পরিচিত হয়েছিল তার গ্রামে, মঙ্গলগঞ্জে। যে বিয়ে করেছিল এই গ্রামেরই এক মেয়েকে। তারই এক বংশধরের হাতে এতদিন বাদে ফিরে এল তার হাতছাড়া হয়ে যাওয়া হীরের আংটি। ভাগ্যের কী পরিহাস!

দেবীলাল মুখোমুখি দাঁড়াল কালীনাথের।

“তুমি দেখছি রক্তবীজের ঝাড়! ওই বাপের এত টেরিয়া ছেলে কী করে হয় কে জানে! যাক গে, শোনো! বাড়াবাড়ি কোরো না কালীনাথ! এর ফল ভয়াবহ হবে।”

কালীনাথ চোখে চোখ রাখল দেবীলালের‌।

“দেখা যাক!”

সে ফিরল গ্রামবাসীদের দিকে।

“যাও নীলকুঠি দখল করো।”

শুধু এই নির্দেশটুকুরই অপেক্ষা। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ল নীলকুঠির ওপর।

দেবীলাল হুঙ্কার ছেড়ে এগোতে যাচ্ছিল।

বাঘের মতন কালীনাথের হাত চেপে ধরল দেবীলালের কাঁধ।

“সব হিসেব মেলাবার সময় হয়ে গেছে দেবীলাল! সব পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে তোমায়!”

দেবীলাল কাঁধ ঝাঁকিয়ে “ছাড়ো” বলে এগিয়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু সে পারল না।

তার রাস্তা আটকে দাঁড়াল আলি ও মদন।

“রাস্তা ছাড় শয়তান!”

“অত সোজা নয় দেবীলাল! পরাণডা বাঁচাইতে পারো কি না সে কথা ভাবো!”

আলির গলা শান্ত।

“তবে রে!”

দেবীলাল হাতের ছুরি তুলে এগোতে গেল আলির দিকে।

মদন দাঁড়াল সামনে এসে।

তার বুকে আমূল গেঁথে গেল ছুরি।

আলি দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে চিৎকার করে তার সড়কিটা গেঁথে দিল দেবীলালের কোমরে।

দেবীলাল যন্ত্রণায় ককিয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।

“ভুল করলে। বড় ভুল!”

সড়কিটা খুলে নিয়ে আরও তিন চারবার দেবীলালের শরীরে গেঁথে দিল আলি।

“ছাড় আমাকে! ছাড়! মারিস না!”

দেবীলালের আর্তচিৎকার তলিয়ে গেল।

প্যাটন তার গাদাবন্দুক নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। কিন্তু তার বন্দুকসমেত হাত উঠল না। উন্মত্ত গ্রামবাসীরা মশাল, সড়কি, লাঠি নিয়ে এগিয়ে আসছে। কজনকে মারবে সে?

তবু সে বন্দুক তুলল।

আর সঙ্গে সঙ্গে সপাং করে একটা চাবুকের ঘা এসে লাগল তার পিঠে। তার ভারী পল্টনের পোশাক ভেদ করে তা লাগল।

পিছু ফিরল প্যাটন।

কালীনাথ দাঁড়িয়ে।

তার দিকে বন্দুক ফেরাতে গেল। কিন্তু হাতে একটা চাবুকের ঘা খেয়ে বন্দুকটা ফসকে গেল তার হাত থেকে।

দু চারজন ছুটে এসে ঘিরে দাঁড়াল প্যাটনকে।

“ওর পোশাকটা খোল!”

“ব্লাডি বাস্টার্ডস! লিভ মি!”

চেপে ধরে তার পোশাক খুলে তাকে হাঁটু গেড়ে বসাল। বেঁধে ফেলল তার হাত!

এবং তারপর কালীনাথের হাত চলল বাধাহীন। আর্তনাদ করতে লাগল প্যাটন।

“মারো ওকে! মারো! কত্তাবাবুর দেহ সৎকার করতে দেয়নি ওরা!”

ছুটে এল বিশ্বনাথ।

কালীনাথ থমকাল!

“দেহ!”

বিশ্বনাথ মঙ্গলগঞ্জে দেবীলাল কর্তৃক তাদের জুড়ি গাড়ি আটকানো থেকে সবটাই বলল হাহাকারের ভঙ্গিমায়।

প্যাটনের পিঠ বিশ্রাম পেয়েছিল। এবার দ্বিগুণ বেগে চাবুক চলতে শুরু করল। কালীনাথকে এত হিংস্র আগে কেউ দেখেনি।

সে রাতে মঙ্গলগঞ্জের নীলকুঠি থেকে উদ্ধার হল শম্ভুর বউসহ বাকিরা।

রমাকান্ত আর জেমসনের মরদেহ নিয়ে আসা হল বাইরে। জেমসনকে কবর দিল মোহন। মদন আর রমাকান্ত, চাষি আর জমিদারের চিতা জ্বলল পাশাপাশি।

অর্ধমৃত চার্লি আর প্যাটনকে বেঁধে রাখা হল বাইরে। দেবীলালের লাশ ফেলে আসা হল জঙ্গলে।

নীলকুঠি মশালের আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেল। সব অত্যাচার আর লাঞ্ছনার সাক্ষ্য মুছে গেল।

চার্লি আর প্যাটনের বিচার হল। দারোগা বাধ্য হল ওদের হেফাজতে নিতে। নইলে জনরোষের কবল থেকে মুক্তি ছিল না ওদের।

মঙ্গলগঞ্জের নীলচাষের কালো অধ্যায় শেষ হল। কালীনাথ হল নতুন জমিদার। চাষিরা যে তিমিরে সেই তিমিরেই রইল। তবে নীলকরদের আতঙ্ক ঘুচে গেল আজীবনের মতন‌।

মদনকে আর কেউ বিশেষ মনে রাখেনি।

অমন একটা আংটি মোহনের হাতে কী করে গেল জানতে চাইল অনেকেই। বিশ্বনাথ ততক্ষণে কালীনাথকে সবটাই বলেছে।

কালীনাথ কিছু বলল না।

সময় চলে গেল অনেকটা। মোহন পাঁচীর সন্তান বড় হল। মুখে কথা ফুটল অনেক। তার নাম ছিল লোকেশ।

আংটিটা এখন তার হাতে শোভা পায়।

লোকেশকে একদিন ডাকল কালীনাথ।

“এই আংটি আসলে আমাদের পরিবারের সম্পত্তি ছিল সেটা জানো?”

নরম গলায় বলল কালীনাথ।

লোকেশ হাত থেকে খুলে দিচ্ছিল আংটিটা। কালীনাথ বাধা দিয়ে বলল, “থাকুক এটা। তুমি আজ থেকে হবে আমার খাস কর্মচারী।”

ওই পাপের আংটি চাই না কালীনাথের। বরং বিশ্বস্ত লোক চাই।

এই কাহিনি আগাগোড়া বিশ্বনাথ বলেছিল তার ছেলেকে। সে সবকিছুর সাক্ষী ছিল। এমনকি জেমসনের আঙুল থেকে আংটি খুলে মোহনকে দেওয়ার। বিশ্বনাথের ছেলে বলেছিল রমাকান্তরই পরিবারের একজনকে।

আদিনাথের ছোটঠাকুরদা। আর সত্যেন মোহন-লোকেশের বংশধর।

আদিনাথ এটা শোনা ইস্তক ভেবেছিল সত্যেনকে বলে দেবে আসল সত্যিটা, বলে দেবে তার পরিবারের মিথ্যাচারের কাহিনি।

কিন্তু সত্যেনের পরিবার আজন্ম জেনে এসেছে এই আংটি তাদের সৌভাগ্য, আর সেই সৌভাগ্যের জেরেই তারা বাঁধা আদিনাথদের পরিবারের কাছে। আদিনাথ বিপ্লবী হয়েও তার জমিদার পরিবারের এই মিথ্যে শোষণের ইতিহাস মুছে দিতে পারেনি। সেও বহন করেছে এই মিথ্যে।

সত্যেনরা জানতেও পারেনি যে ওমান কে‌। আরেক মহাদেশের জঙ্গলে এক অজগরের পেটে লুকিয়ে থাকা সেই হীরে ওমানের থেকে কেড়ে নিয়েছিল অষ্টাদশ শতকের কয়েকজন শ্বেতাঙ্গ ডাকাত, তারপর তা ইন্দ্রকমলদের আংটিতে বসেছিল। আসলে ওমানেরই ন্যায্য অধিকার সেই হীরেতে।

তারা জানেনি, উল্টে এই ক্রীতদাসত্ব তারা বহন করল।

কালীনাথ শেষ অবধি থাকতেন গ্রামেই। তার পরিবারের উত্তরসূরিরা সকলেই চলে এসেছিল কলকাতায়। তারপর চল্লিশের দশকে এল সর্বনাশা আকাল। গোটা গ্রাম উজাড় হয়ে গেল সেই দুর্ভিক্ষে। কালীনাথদের পরিবারের কেউ তখন ফিরেও তাকায়নি তাদের প্রজাদের দিকে। প্রজারাও চলে এল কলকাতায়। তারপরে এল স্বাধীনতা, সঙ্গে কালান্তক দেশভাগ। আলিকে বাঁচাতে একদিন প্রাণ দিয়েছিল মদন। সেই আলি আর মদনের বংশধররা দাঙ্গায় একে অপরকে হত্যা করল। সে সময়েও মদনের মতন একগুঁয়ে এক চাষি চেষ্টা করেছিল সবাইকে জড়ো করার। দেশজুড়ে চাষিরা লড়াই শুরু করেছে। সেই লড়াই-এর নাম তেভাগা‌। তাতে তো হিন্দু মুসলমান সবাইকে একজোট হয়ে লড়তে হবে।

কে শোনে কার কথা!

যাক গে, আংটিপর্বের সমাধা এখানেই হতে পারত‌। জেলে সত্যেনের মারা যাওয়া আর আদিনাথের নিখোঁজ হয়ে যাওয়াতে শেষ হয়ে যেতে পারত এই গল্প। কিন্তু তা হওয়ার নয়। এ গল্প আরও অনেক বাকি‌। আদিনাথ আর সত্যেনের পরিবারকে ছাপিয়েও সেই গল্পের বীজ ছড়িয়ে উনিশ বিশ একুশ তিনটি শতক জুড়ে। সে গল্প সময়মতন বলা যাবে।

আপাতত ‘তারান্তিনো’-র এই মেগা কিস্তি দিয়ে শেষ হল ‘জ্যাঙ্গো আনচেনড’। সিজন ওয়ান বা প্রথম পর্বের পরিসমাপ্তি এখানেই। দ্বিতীয় পর্ব বা সিজন টু আসবে শিগগির। ততদিনে মুক্তি পেয়ে যাবে তারান্তিনোর নবতম সিনেমা।