Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বিকল্প ধারার সাহিত্যের খোঁজে

তুষ্টি ভট্টাচার্য

 

বিকল্প ধারার আকর্ষণ সহজাত প্রবণতা। যা কিছু স্বাভাবিক, যা কিছু নিয়মিত, নির্ধারিত বা আবশ্যক, তার মধ্যে একটানা আবদ্ধ থাকার নিয়মের বিরুদ্ধে মানুষ বারবার গর্জে উঠেছে। একঘেয়েমি কাটাতে বিকল্প বা অন্য ধারার কিছু অবলম্বন করতে চেয়েছে। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় হয়নি। আনুমানিক খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীতে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনার সূত্রপাত হয়। খ্রিষ্টীয় দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত বৌদ্ধ দোঁহা-সংকলন চর্যাপদ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য ছিল কাব্যপ্রধান। হিন্দুধর্ম, ইসলাম ও বাংলার লৌকিক ধর্মবিশ্বাসগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল সেই সময়কার বাংলা সাহিত্য। মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী, শাক্ত পদাবলী, বৈষ্ণব সন্তজীবনী, রামায়ণ, মহাভারত ও ভাগবতের বঙ্গানুবাদ, পীরসাহিত্য, নাথসাহিত্য, বাউল পদাবলী এবং ইসলামি ধর্মসাহিত্য ছিল এই সাহিত্যের মূল বিষয়। বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার সূত্রপাত হয় খ্রিষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীতে। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নবজাগরণের যুগে কলকাতা শহরকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। এই সময় থেকে ধর্মীয় বিষয়বস্তুর বদলে মানুষ, মানবতাবাদ ও মানব-মনস্তত্ত্ব বাংলা সাহিত্যের প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। একেও বাংলা সাহিত্যের এক বিকল্পের অনুসন্ধানে যাত্রা শুরু বলে উল্লেখ করা যেতে পারে।

রবীন্দ্র-প্রভাবের যুগেই ‘কল্লোল’ সাময়িকপত্রের মাধ্যমে একদল তরুণ কবি-সাহিত্যিকের হাতে পাশ্চাত্য আধুনিকতার পত্তন হয়। অন্যান্য সাময়িক ও সাহিত্য পত্রেও এই আধুনিকতার অগ্নিস্পর্শ লাগে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালে ১৯৩০-এর দশক কল্লোল যুগের সমার্থক। কবি বুদ্ধদেব বসু এই নবযুগের অন্যতম কাণ্ডারী। যে সময়ে কল্লোলের আবির্ভাব, তখন বাংলা সাহিত্যের দিগন্ত সর্বকোণে কবি রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে প্রোজ্জ্বল। কল্লোল যুগের নাবিকদের মূল লক্ষ্য ছিল রবীন্দ্রবৃত্তের বাইরে সাহিত্যের একটি মৃত্তিকাসংলগ্ন জগৎ সৃষ্টি করা। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে প্রবর্তিত কল্লোল পত্রিকার কর্ণধার ছিলেন দীনেশরঞ্জন দাশ ও গোকুলচন্দ্র নাগ। কবিতার ক্ষেত্রে যাঁদের নাম কল্লোল যুগের শ্রেষ্ঠ নায়ক বিবেচনায় প্রচারিত, তাঁরা হলেন কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে। তবে কাজী নজরুল ইসলাম, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, সঞ্জয় ভট্টাচার্য প্রমুখ অনেকেরই ভূমিকাকে কোনও অংশে খাটো করে দেখবার উপায় নেই। অচ্যিন্তকুমার সেন রচিত ‘কল্লোল যুগ’ এ বিষয়ে একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। কল্লোল পত্রিকার আবহে দ্রুত অনুপ্রাণিত হয় প্রগতি, উত্তরা, কালিকলম, পূর্বাশা ইত্যাদি পত্রপত্রিকা। অন্যদিকে আধুনিকতার নামে যথেচ্ছাচারিতা ও অশ্লীলতার প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে এই রকম অভিযোগ এনে শনিবারের চিঠি পত্রিকাটি ভিন্ন বলয় গড়ে তোলে মোহিতলাল মজুমদার, সজনীকান্ত দাস, নীরদ চৌধুরী প্রমুখের সক্রিয় ভূমিকায়।

একদল প্রতিভাবান তরুণ, যাদের কেন্দ্রে ছিলেন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বাংলা সাহিত্যের জগতে একটা ঝড় নিয়ে এলেন ‘কৃত্তিবাস’এর হাত ধরে। কৃত্তিবাস প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালে। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকা তখনও চলছে। তবু এই পত্রিকাকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যের একটি আন্দোলন তৈরি হয়েছিল এবং কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর কবি বলে একদল নতুন প্রতিভা সামনের সারিতে চলে এসেছিল। সেই সময়ে জীবনানন্দ দাস, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বিষ্ণু দে, অমিয় চক্রবর্তীর মত আধুনিক ও প্রথম সারির কবিরা বর্তমান। এক দুঃসহ স্পর্ধায় এঁদের থেকে কবিতা না নিয়ে নিতান্ত তরুণদের কবিতা নিয়ে প্রকাশ হতে থাকল কৃত্তিবাস। কবি শঙ্খ ঘোষের খাতা কৃত্তিবাসের জন্য জোর করে নিয়ে এসেছিলেন সুনীল। কৃত্তিবাসের প্রথম সংখ্যায় সিগনেট প্রেস থেকে প্রকাশিত জীবনানন্দর ‘বনলতা সেন’-এর একটিই বিজ্ঞাপন ছিল, এবং তার জন্য টাকার বদলে পেয়েছিল দু রিম কাগজ!

দেড় দশক ধরে চলা এই পত্রিকাটি নিজেই একটি বিস্ফোরক প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। পনেরো বছর পরে কৃত্তিবাসের পঁচিশতম সংখ্যা প্রকাশ পায়। ১-২৫ সংখ্যাই কৃত্তিবাসের প্রথম পর্ব বলে ধরা হয়। ষাটের দশকের শুরুতে অ্যালেন গিনসবার্গ এলেন কলকাতায়। কৃত্তিবাসের কবিরা বীটনিক কাব্যের অনুরক্ত হয়ে পড়লেন এবং তাঁদের কবিতা হয়ে উঠল তীব্র, উদাসীন, উন্মত্ত, ক্রুদ্ধ, ভয়ংকর চতুর এবং অতৃপ্ত। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টপাধ্যায়, শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়, উৎপল কুমার বসু, তারাপদ রায় প্রমুখরা এই নতুন কবিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হলেন। ১৯৬৯ সালের পর কৃত্তিবাস দীর্ঘদিন বন্ধ থাকে। এরপর আবার চালু হয় মাসিক পত্রিকা হিসেবে। তখন থেকে কৃত্তিবাস আর শুধু কবিতার পত্রিকা থাকে না, গদ্যও সমান তালে ছাপা হতে থাকে। বর্তমানেও সুনীলের প্রয়াণের পরে কয়েক বছর কৃত্তিবাস পত্রিকা চলার পর একদম পাকাপাকি ভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার গুজব ছড়িয়েছে। কিন্তু এতদিনে কৃত্তিবাস তার সেই দুরন্ত ছেলের তকমা হারিয়েছে। প্রথম পর্বের কৃত্তিবাস নিয়েও অশ্লীলতার অভিযোগ ওঠে। অতি চিৎকারের অভিযোগ ওঠে। সেই বোহেমিয়ানার ঘোর কেটে গিয়ে কৃত্তিবাস তার গৌরব হারায়।

ষাটের দশকে বাংলা সাহিত্যিক আন্দোলনের একটা জোয়ার এসেছিল। বিভিন্ন আন্দোলনে বিভিন্নভাবে প্রচলিত সাহিত্যাদর্শকে আঘাত ও অস্বীকার করাই ছিল এই আন্দোলনগুলির মূল লক্ষ্য। বাংলা সাহিত্যে স্হিতাবস্হা ভাঙার আওআজ তুলে, ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে, শিল্প ও সাহিত্যের প্রথম যে আন্দোলন হয়েছে, তার নাম হাংরি আন্দোলন, যাকে অনেকে বলেন হাংরিয়ালিস্ট, ক্ষুধিত, ক্ষুৎকাতর, ক্ষুধার্ত আন্দোলন। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে পাটনা শহর থেকে একটি ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং হারাধন ধাড়া ওরফে দেবী রায়। কবিতা সম্পর্কিত ইশতেহারটি ছিল ইংরেজিতে, কেন না পাটনায় মলয় রায়চৌধুরী বাংলা প্রেস পাননি। ‘To transmit dynamically the message of the restless existence and the sense of disgust in a razor sharp language.’ –হাংরির ম্যানিফেস্টোতে এই কথাই লিখিত ছিল। ১৯৬২-৬৩ সালে হাংরি আন্দোলনে যোগদান করেন বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায়, আলো মিত্র, অনিল করঞ্জাই, রবীন্দ্র গুহ, সুভাষ ঘোষ, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরুপরতন বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সতীন্দ্র ভৌমিক, শৈলেশ্বর ঘোষ, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, আজিতকুমার ভৌমিক, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অমৃততনয় গুপ্ত, ভানু চট্টোপাধ্যায়, শংকর সেন, যোগেশ পাণ্ডা, মনোহর দাশ, তপন দাশ, শম্ভু রক্ষিত, মিহির পাল, রবীন্দ্র গুহ, সুকুমার মিত্র, দেবাশিষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। অনিল করঞ্জাই এবং করুণনিধান মুখোপাধ্যায় ছিলেন চিত্রকর। সত্তর দশকের শেষে যাঁরা পুনরায় আন্দোলনটিকে জিইয়ে তোলার চেষ্টা করেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন অরুণেশ ঘোষ, অরণি বসু, অরুণ বণিক, অলোক গোস্বামী, আপ্পা বন্দ্যোপাধ্যায়, নিত্য মালাকার, কিশোর সাহা, জামালউদ্দিন, জীবতোষ দাশ, দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নির্মল হালদার, দেবজ্যোতি রায়, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, প্রীতম মুখোপাধ্যায়, বিজন রায়, রবিউল, সমীরণ ঘোষ, রতন নন্দী, রাজা সরকার, সত্যেন চক্রবর্তী, সৈকত রক্ষিত, সুব্রত রায়, সুব্রত চক্রবর্তী, রসরাজ নাথ, সেলিম মোস্তফা, শঙ্খপল্লব আদিত্য, সুভাষ কুন্ডু, স্বপন মুখোপাধ্যায় প্রমুখ ।

হাংরি আন্দোলনকারিরা প্রধানত একপৃষ্ঠার বুলেটিন প্রকাশ করতেন। যেগুলো পাটনা থেকে প্রকাশিত, সেগুলো ইংরেজিতে লেখা হয়েছিল। কখনও বা পোস্টকার্ড, পোস্টার এবং এক ফর্মার পুস্তিকা প্রকাশ করতেন। এক পাতার বুলেটিনে তঁরা কবিতা, রাজনীতি, ধর্ম, অশ্লীলতা, জীবন, ছোটগল্প, নাটক, উদ্দেশ্য, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে ইশতাহার লেখা ছাড়াও, কবিতা, গদ্য, অনুগল্প, স্কেচ ইত্যাদি প্রকাশ করেছিলেন। বুলেটিনগুলো হ্যান্ডবিলের মতন কলকাতার কলেজ স্টিট কফি হাউস, পত্রিকা দপ্তর, কলেজগুলোর বাংলা বিভাগ ও লাইব্রেরি ইত্যাদিতে তাঁরা বিতরন করতেন। হাংরি আন্দোলনের কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার এইটি-ই প্রধান কারণ বলে মনে করেন গবেষকরা। কিন্তু হ্যান্ডবিলের মতন প্রকাশ করায় তাঁরা  ঐতিহাসিক ক্ষতি করেছেন নিজেদের, কেন না অধিকাংশ বুলেটিন সংরক্ষণ করা সংগ্রাহকদের পক্ষেও সম্ভব হয়নি।

সুবিমল বসাক, দেবী রায় ও মলয় রায়চৌধুরীর কিছু-কিছু কার্যকলাপের কারণে ১৯৬৩ সালের শেষার্ধে হাংরি আন্দোলন বাঙালির সংস্কৃতিতে প্রথম প্রতিষ্ঠানবিরোধী গোষ্ঠী হিসাবে পরিচিত হয়। বহু আলোচক হাংরি আন্দোলনকারীদের সে সময়ের কার্যকলাপে ডাডাবাদের প্রভাব লক্ষ করেছেন। এই কারণে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধায়, সতীন্দ্র ভৌমিক প্রমুখ হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করেন। শ্মশান, গোরস্তান, ভাটিখানা, হাওড়া ও শেয়ালদা স্টেশনে তাঁরা কবিতা পাঠের আয়োজন করতেন; ’মুখোশ খুলে ফেলুন’ লেখা জীব-জন্তু, দেবতা, দানবের মুখোশ পাঠাতেন মন্ত্রী, সমালোচক, প্রশাসকদের; কবিদের সমালোচনা করতেন বিবাহের কার্ডে; তৎকালীন মানদণ্ডে অশ্লীল স্কেচ ও পোস্টার আঁকতেন ও বিলি করতেন; একটি গ্রন্হের দাম রাখতেন লক্ষ টাকা বা কয়েকটি টি.বি. সিল। বাণিজ্যিক পত্রিকায় গ্রন্থ রিভিউ করার জন্য জুতোর বাক্স পাঠাতেন কিংবা শাদা কাগজ পাঠাতেন ছোটগল্প নামে। তাঁদের রচনায় প্রশাসন ও মিডিয়াকে আক্রমণ করতেন। বেনারস এবং কাঠমান্ডু গিয়ে সাহিত্য সম্পর্কহীন হিপিনীদের সঙ্গে মাদকসেবন এবং যৌন যথেচ্ছাচারে লিপ্ত হয়ে সেখানকার সংবাদপত্রে শিরোনাম হতেন। পেইন্টিং প্রদর্শনী করে শেষ দিন প্রতিটি ছবিতে আগুন ধরিয়ে দিতেন। এই সমস্ত অসাহিত্যিক কার্যকলাপের মাধ্যমে তাঁরা দাবী করতেন যে অচলায়তনকে ভাঙা যাবে। অবশ্য তাঁদের অনুকরণে পরবর্তীকালে বহু প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখক এসেছেন বাংলা সাহিত্যে, যদিও সাহিত্যের বাইরে তাঁরা অন্য কাজ করেননি। কিন্তু হাংরি আন্দোলনকারীদের কার্যকলাপে প্রশাসন অচিরে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হল।

১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইন্ডিয়ান পিনাল কোডের ১২০বি, ২৯২ এবং ২৯৪ ধারায় ১১ জন হাংরি আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল। তাঁরা হলেন সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, দেবী রায়, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, উৎপলকুমার বসু, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবো আচার্য এবং সুবিমল বসাক। এঁদের মধ্যে প্রথম ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয় এবং কলকাতার ব্যাংকশাল কোর্টে তোলা হয়। মলয় রায়চৌধুরীকে হাতে হাতকড়া এবং কোমরে দড়ি বঁধে রাস্তায় হঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় চোর-ডাকাতদের সঙ্গে। মকদ্দমার ফলে উৎপলকুমার বসু অধ্যাপনার চাকরি থেকে বরখাস্ত হন, প্রদীপ চৌধুরী রাসটিকেট হন বিশ্বভারতী থেকে, সমীর রায়চৌধুরী সরকারি চাকরি থেকে সাসপেন্ড হন, সুবিমল বসাক ও দেবী রায়কে কলকাতার বাইরে বদলি করে দেওয়া হয়, সুবো আচার্য ও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ফেরার হয়ে যান। অনেকে হাংরি আন্দোলন ভয়ে ত্যাগ করেন। লালবাজারের কনফারেন্স রুমে মলয় রায়চৌধুরী এবং সমীর রায়চৌধুরীকে জেরা করেন একটি ইনভেসটিগেটিং বোর্ড, যার সদস্যরা ছিলেন স্বরাষ্ট্র দপ্তর, পুলিশ প্রশাসন, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ, ভারতীয় সেনার প্রতিনিধিরা এবং পশ্চিমবঙ্গের আ্যাডভোকেট জেনারাল। ১২০বি ধারাটি ছিল ষড়যন্ত্রের, এবং সে কারনে প্রত্যেক হাংরি আন্দোলনকারী সম্পর্কে ডোসিয়ার খুলে ফেলেছিল কলকাতা গোয়েন্দা বিভাগ। গ্রেফতারের সময়ে প্রত্যেকের বাড়ি লণ্ড-ভণ্ড করা হয়েছিল। বইপত্র, ডায়েরি, টাইপরাইটার, ফাইল, পাণ্ডুলিপি, কবিদের চিঠির সংগ্রহ ইত্যাদি যেগুলো পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল তা আর তাঁরা ফেরত পাননি। মলয় রায়চৌধুরী অভিযোগ করেন, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, উৎপল কুমার বসু ওঁর বিরুদ্ধে এজাহার দিয়ে প্রসিকিউশনের হাত মজবুত করেছেন। শৈলেশ্বর ঘোষ পুলিশের সাক্ষী হয়ে সেই যে হাওয়া হয়ে গেলেন, পঁচিশ বছরেও আর দেখা হয়নি। এদিকে শৈলেশ্বর ঘোষ মলয় রায়চৌধুরীকে মিথ্যেবাদী বলে সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, দুমদাম মিথ্যে কথা লিখতে মলয়ের হাত খুব ভাল চলে। মলয়ের ব্যাপারে তাঁদের আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। প্রচার লালসা ওঁকে একেবারে নর্দমায় নামিয়ে দিয়েছিল। এইসমস্ত চাপানউতোরে একটা যুগের অবসান হতে দেখলাম আমরা।

কৃত্তিবাস আর হাংরির উগ্রতা ও যৌনধর্মী অ্যাজেন্ডায় কিছু মানুষ ততদিনে প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে উঠেছে। মৃণাল বসু চৌধুরীর ‘কবিপত্র’ তখনকার ঐতিহ্যশালী পত্রিকা। ১৯৬৫ সালেই হাংরির অবসান, আর এই সালেই শ্রুতি পত্রিকাকে কেন্দ্র করে পুষ্কর দাশগুপ্তের নেতৃত্বে গড়ে উঠল শ্রুতি আন্দোলন। মৃণাল বসু চৌধুরী ও পরেশ মণ্ডল, অনন্ত দাস, সজল বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রুতি আন্দোলনে যোগ দেন। এই পত্রিকায় লিখতেন অতীন্দ্রিয় পাঠক, গৌরাঙ্গ ভৌমিক, কালীকৃষ্ণ গুহ, রত্নেশ্বর হাজরা, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অভী সেনগুপ্ত, রথীন ভৌমিক, রবিন সুর প্রমুখ। পুষ্কর দাশগুপ্তের পরে মৃণাল বসু চৌধুরী শ্রুতি পত্রিকার সম্পাদক হন। এই আন্দোলনের মুখপত্রে লেখা ছিল, ‘ভেঙে ফেলতে হবে সমস্ত প্রকার শাসন, ছিন্ন করতে হবে সংস্কারের সমস্ত বন্ধন। শব্দকে ব্যবহৃত বাক্যবন্ধের আবর্জনা থেকে এক এক করে বেছে নিতে হবে। তৈরি করতে হবে ব্যক্তিগত এবং অনন্য, এক প্রচলমুক্ত বাক্‌রীতি কিন্তু তা হবে চিৎকার নয়, নিবিষ্ট উচ্চারণের মাধ্যমে। জৈব আর্তনাদ ও সমাজ সংস্কারের বাইরে কবিতা হবে আত্মগত, এটাই ছিল শ্রুতি আন্দোলনের প্রধান ভাবনা। এর জন্য একদিকে যেমন রচয়িতাকে নিজের অন্তর্জগত সমৃদ্ধ করতে হবে, শিক্ষিত হয়ে উঠতে হবে, অন্যদিকে প্রচলিত ভাষাপদ্ধতির জীর্ণতা ত্যাগ করে নতুন আঙ্গিক নির্মাণের ওপরেও জোর দেওয়া হয়েছিল। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত শ্রুতির ১৪টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। এদের সমধর্মী অন্যান্য পত্রিকাগুলি হল ‘শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্য’, ‘ঈগল’, ‘অব্যয়’ ও ‘কালক্রম’। অশোক চট্টোপাধ্যায় শ্রুতি আন্দোলনের শেষের দিকে এসে যোগ দেন। তিনি মূলত কংক্রিট কবিতায় উৎসাহী ছিলেন। আর মণীন্দ্র গুপ্ত ষাটের দশকের এই সমস্ত আন্দোলনের কবিদের ‘তাত্ত্বিকতাপ্রবণ’ বলেছিলেন, যেহেতু তিনি নিজেই ছিলেন এক প্রতিষ্ঠান। যাই হোক, শ্রুতি আন্দোলনে কবিতার দৃশ্যরূপের ওপর প্রচণ্ড গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। শ্রুতির প্রথম সংখ্যায় পুষ্কর দাশগুপ্তের ‘সূর্যস্তোত্র’ নামের কবিতাটি যজ্ঞবেদির আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। পরেশ মন্ডলের ইংগিত কবিতাটিতেও দৃশ্যরূপ বর্তমান। পুষ্কর দাশগুপ্তের ‘রাস্তা’ কবিতায় রাস্তার ছবি, মৃণাল বসু চৌধুরীর ‘যদি ওড়ে’র পঙক্তি বিন্যাস পতাকার মতো। শ্রুতি আন্দোলনের আরেকটি বৈশিষ্ট হল কবিতায় যতিচিহ্ন ব্যবহার না করা। কবিতার দৃশ্যরূপ, যতিচিহ্নের ব্যবহার না করা বা একটি শব্দে একটি লাইন নির্মাণ বিদেশী কবিতায় অনেকবার দেখা গেলেও বাংলা কবিতায় তার প্রয়োগ ছিল এই প্রথম। এমনকি হাংরি’র মলয় রায় চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’-এও যতিচিহ্ন অনুপস্থিত ছিল।

পরেশ মণ্ডলের ‘ইংগিত’ কবিতাটি এখানে দিলাম-

হাংরি ছিল যতটাই ধ্বংসাত্মক, শ্রুতি ছিল ততটাই আত্মগত। অথচ উভয়েরই উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত সাহিত্য ধারা থেকে বেরিয়ে আসা। কিন্তু  ঐতিহ্যশালী শ্রুতি ও হাংরির বাইরে অন্য কিছু একটা করে দেখাবার তাড়না থেকেই গেছিল এই ষাটের দশকে, যা বামপন্থী স্লোগান সর্বস্বতার বাইরে, যা কিনা সমাজ, সংস্কার, উগ্র আধুনিকতার বাইরের বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দেবে। ১৯৬৮ সালে পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আর এক দল যুবক শুরু করলেন ধ্বংসকালীন আন্দোলন। ‘সাম্প্রতিক’ পত্রটি হল এর মুখপত্র। আর ‘কবিপত্র’ তার সহযোগী। মণীন্দ্র গুপ্তর তাগাদায় পবিত্র মুখোপাধ্যায় লিখলেন ‘ইবলিশের আত্মদর্শন’। ইসলামের বিরোধী চরিত্র ইবলিশ ছিল এর নায়ক। বিপুল সাড়া পড়ে যায় এটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে। এক বছর চলেছিল ধ্বংসকালীন আন্দোলন।  এছাড়াও ছিল প্রকল্পনা আন্দোলন। এই প্রতিষ্ঠিত আন্দোলনগুলির বাইরেও ছিল, ‘সলিড কবিতা’, ‘কবিতাবিহীন কবিতা’, ‘বিশুদ্ধ কবিতা’, ইত্যাদি। ‘সাম্প্রতিক’ পত্রিকার সম্পাদক কানন কুমার ভৌমিকের নেতৃত্বে ধ্বংসকালীন আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৬৭ সালের সাম্প্রতিকের অষ্টম সংখ্যা থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। মূলত কংক্রিট কবিতাই ছিল এই আন্দোলনের লক্ষ্য। যাঁরা শ্রুতি আন্দোলনের ফর্ম ভাঙার খেলায় নিজেদের মেলাতে পারেননি, তাঁরাই এই আন্দোলনে যুক্ত হলেন। পবিত্র মুখোপাধ্যায়ের ইবলিশের আত্মদর্শনের প্রথমাংশের শিরোনামই ছিল ধ্বংসকালীন কবিতা। কানন কুমার ভৌমিক ছাড়া এই আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন প্রভাত চৌধুরী, অনন্ত দাশ, সুকোমল রায়চৌধুরী, দীপেন রায়, রবিন সুর, সত্য গুহ, শিবেন চট্টোপাধ্যায়, অঞ্জন কর, প্রমুখ। এঁদের অনেকেই দীর্ঘ কবিতা লিখেছিলেন, যার মধ্যে প্রায়শই শয়তান, পাপী, বিদ্রোহী বা শাপগ্রস্ত অর্থাৎ ঈশ্বরের বিপরীত চরিত্র থাকত। ১৯৬৮ তেই প্রভাত চৌধুরীর সম্পাদনায় দুই পৃষ্ঠার কবিতা পাক্ষিক প্রকাশিত হয় এই আন্দোলনের হাত ধরেই। শ্রুতির আত্মগত ভাবের বিপরীত ছিল এই ধ্বংসকালীন আন্দোলন, যেখানে সমাজের অচলায়তনকে ধ্বংস করার হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরেছিলেন সামাজিক ভাষার কবিতার অস্ত্র। এই আন্দোলনের মুখপত্রের মূল বক্তব্য ছিল, প্রকৃতির মতো উদার আর অকৃত্রিম হবে কবিতা, ভাল হবে, মন্দ হবে, প্রচলিত কোন আদর্শই কবিতার বাধা হতে পারে না। আমরা যা তাই আমাদের কবিতা। আমরা যা নই, তা আমাদের কবিতায় নেই। কবিপত্র এবং সাম্প্রতিক ছাড়া এই আন্দোলনে যুক্ত ছিল বত্তার, অধুনা সাহিত্য এবং দৃশ্যপট।

১৯৬৯ সালে কবিসেনা ও স্বতোৎসার পত্রিকাকে কেন্দ্র করে প্রকল্পনা সর্বাঙ্গীন কবিতা আন্দোলন শুরু হয়। প্রকল্পনা শব্দটির ব্যাখ্যা করেন ভট্টাচার্য চন্দন (যিনি এভাবেই নিজের নাম লিখতেন)।

প্রকল্পনা = প্রবন্ধের ‘প্র’ + কবিতা ও সংস্কৃতির ‘ক’ + গল্প ও শিল্পের ‘ল্প’ + নাটক, উপন্যাস, গান, সিনেমা, সর্বাঙ্গীন ও চেতনাভ্যাস ‘না’। আন্দোলনের মুখপত্র হিসেবে স্বতোৎসার পত্রিকায় বলা হয়েছিল, স্বতোৎসার অর্থ অনারোপিত রচনার শিল্পসম্মত রূপ। এই পত্রিকাকে অ্যান্টিপত্রিকা ঘোষণা করে বলা হয়েছিল, স্বতোৎসার আকৃতিতে কুঠার ফলকের প্রতীকে গতানুগতিকতার মূলে আঘাত হানে, প্রকৃতিতে ফর্মের দিকে সাহিত্যের নবতম প্রকল্পনা এবং তত্ত্বের দিক থেকে নবতম তত্ত্ব চেতনাভ্যাসবাদের আবিষ্কারের দ্বারা প্রচলিত পত্রিকার গতানুগতিক ধারণার বাস্তুভিটেয় ঘুঘু চড়ায় আমাদের বর্ণপরিচয় ও দৃষ্টিপরিচয়ঃ ?

উত্তর বসু’র ‘যে জানে শরীর’ কবিতাটি এখানে দিলাম-

‘চেতনাভ্যাসবাদ’, ‘স্বচ্ছন্দ’, ‘সর্বাংগীন’—এই রকম শব্দগুলি এই আন্দোলন প্রণেতাদের লেখায় বারবার এসেছে। স্বতস্ফূর্ততা ও ক্রিয়াশীল অভ্যাসের সমন্বয় সাধনেই চেতনাভ্যাস গড়ে ওঠে—এই ছিল তাঁদের স্বসৃষ্ট দর্শন। ১৯৬৯ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর ভট্টাচার্য চন্দন, দিলীপ গুপ্ত ও শুক্লা মজুমদার স্বতোৎসার পত্রিকায় প্রথম ইশতেহারে ‘অটোমেটিক রাইটারদের স্বতোৎসারিত প্রকল্পনা’য় ঘোষণা করেন—সমস্ত গতানুগতিকতার বাইরে থেকে শৃঙ্খল মুক্ত ভাবে মিজেদের অনুভব ও চৈতন্যপ্রবাহের অটোমেটিক রেকর্ড করাই এই প্রকল্পনার উদ্দেশ্য। প্রকল্পনা আজও সক্রিয়। এদের প্রচলিত লিপিপদ্ধতিতে এখনও লিখে চলেছেন ভট্টাচার্য চন্দন, দিলীপ গুপ্ত, শুক্লা মজুমদার, উত্তর বসু, তপন ঘোষ, বাবুল রায়চৌধুরী। প্রকল্পনা আন্দোলনে কিছু মহিলাদের নাম দেখতে পাওয়া যায়। তার কারণ সম্ভবত এই প্রকল্পের শিল্পভাবনায় বিশুদ্ধ কাব্যের প্রভাবই বেশি ছিল। যথেচ্ছ যৌনতা মূলক লেখা বা রাতের নেশাগ্রস্ততাকে এড়িয়ে থাকা যেত এই প্রকল্পে। অথবা এমনও হতে পারে, হাংরি, শ্রুতি, ধ্বংসাত্মক আন্দোলন পেরিয়ে এসে মেয়েরা অভিনবত্বকে নিতে পারার মানসিকতা অর্জন করেছিল।

উপরোক্ত সব আন্দোলনগুলির মূল বক্তব্য ছিল প্রচলিত সাহিত্যরীতিকে প্রবলভাবে আক্রমণ করা। হাংরি বিশৃঙ্খলা তৈরি করে ছক ভাঙতে চেয়েছিল, শ্রুতি চেয়েছিল আত্মস্থ ও অনুভূতিঋদ্ধ হয়ে। ধ্বংসকালীনের ইশতেহারে লেখা ছিল, ধ্বংসকালীন সেই অর্থে সৃষ্টিকালীন। হাংরি, শ্রুতি, শাস্ত্রবিরোধী, ধ্বংসকালীন বা প্রকল্পনা সব আন্দোলনগুলোরই মূল উদ্দেশ্য ছিল বিকল্পের অনুসন্ধান। এই দশকের কেউই সেই অর্থে ‘Art’s for Art’s sake’-এ বিশ্বাসী ছিল না। শ্রুতি সামাজিক প্রতিক্রিয়াকে অস্বীকার করলেও অনুভূতির গভীরতা ও শিক্ষিত হওয়াকে গুরুত্ব দিয়েছে। অর্থাৎ সমাজ ভাবনা না থাকলেও জীবন বোধ ছিল। আবার আংগিক সর্বস্ব প্রকল্পনা জীবন সম্বন্ধে নির্মোহ দৃষ্টির কথা বলেছে। যদিও নির্মোহ দৃষ্টিও জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। ‘জীবন’ নামক এক বিশেষ বোধ বা চেতনার বিরুদ্ধে এরা প্রত্যেকেই সরব হয়ে উঠেছিল। যার কারণ হিসেবে বিশ্বের ও ভারতীয় রাজনীতি, অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থাকেই দায়ী করা যায়।

এই আন্দোলনগুলির বাইরেও কিন্তু বিকল্প সাহিত্যধারার অভাব ছিল না। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘কৌরব’। একদম শুরুতে ১৯৬৮-৬৯ এ কৌরব নাট্যগোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে জামশেদপুরে, কমল চক্রবর্তী, বারীন ঘোষাল, সুভাষ ভট্টাচার্য, অরুণ আইন ও শক্তিপদ হালদারের হাত ধরে। এ’ছাড়াও নিয়মিত কবিতা গদ্যের পাঠচক্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ’ভাবেই কৌরবে ভেড়ে স্বদেশ সেন-এর নৌকো। ২০০৪ এর কৌরব ১০০ সংখ্যা পর্যন্ত টানা সম্পাদনার দায়িত্বে কমল চক্রবর্তী। ১৯৯৮-এর শরতে আমেরিকা থেকে আর্যনীল মুখোপাধ্যায় আন্তর্জালে তোলেন কৌরবকে। কৌরব অনলাইনে প্রথম প্রথম ছাপা হয় প্রিন্ট পত্রিকার নির্বাচিত লেখা। ১৯৯৯ থেকে তাতে তোলা হতে থাকে ই-মেল-এ আসা পৃথিবীর নানাপ্রান্তের বাংলা কবিতাও। এ’ছাড়াও অনলাইনে যোগ হতে থাকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কবিতা আন্দোলনের সাতপাঁচ এবং কবিতা। কৌরবের পাতায় লেখেন লরেন্স ফের্লিংঘেটি, জন অ্যাশবেরি, পিটার গিজ্জি, ক্রিস স্ট্রফোলিনো, চার্লস বার্নস্টাইন, রন সিলিম্যান প্রমূখ। ২০০৪-এ আনুষ্ঠানিক ভাবে কৌরব বন্ধ হয়ে গেলে নতুন করে তাকে বাঁচিয়ে তোলা ও পরিচালনা শুরু করেন আর্যনীল মুখোপাধ্যায়, সঙ্গে সুদেষ্ণা মজুমদার, অভিজিৎ মৈত্র ও সব্যসাচী সান্যাল।

১৯৯০/৯১ সালে জলপাইগুড়িতে এরকা পত্রিকাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল সংহত কবিতা আন্দোলন। এরকা পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন শুভ্র চট্টোপাধ্যায়। পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শৌভিক দে সরকার, নীলাদ্রি বাগচি, অতনু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখরা। এঁরা ছাড়াও নিয়মিত এই পত্রিকায় লেখালেখি করেছেন দেবাশীষ কুন্ডু, সুবীর সরকার, অনিন্দ্য রায়, সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়, সব্যসাচী দত্ত, সৌমেন বসু। প্রবীর রায়, শ্যামল সিংহ, সজল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সিনিয়ররা ছিলেন মেন্টর। ‘এরকা’ পত্রিকার ইশতেহারে বলা ছিল-সংহত কবিতা মানে সংক্ষিপ্ত কবিতা নয়, দীর্ঘ কবিতা নয়, ভাবের চাহিদা মতো অমোঘ শব্দ ব্যবহার সংহত কবিতা। প্রতিটি শব্দ ব্যবহারে সচেতনতা এমনকি আঙ্গিকেও। কবিতা কখনোই অটোমেটিক্যালি হয়ে ওঠেনা, তার সঠিক নির্মাণ ও সচেতন মস্তিষ্ক ব্যবহার প্রয়োজন। ছন্দহীনতা কিম্বা ছন্দবদ্ধতা কোনোটিই কবিতার আলোচনাযোগ্য দিক নয়, কবিতার প্রাণ হল তার রহস্যময়তা যা তাকে গদ্য সাহিত্য থেকে আলাদা করে রাখে স্থানীয় এই আন্দোলনটি বছর পাঁচেকের মধ্যে নিভে আসে। পত্রিকাও বন্ধ হয়ে যায়।

এর কিছুদিন বাদে (২০০২ সালে)বারীন ঘোষালের হাত ধরে চিরাচরিত কবিতার ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে ম্যানিফেস্টোবিহীন ‘নতুন কবিতা’ আত্মপ্রকাশ করে। এই পত্রিকায় স্বপন রায় আর রঞ্জন মৈত্র ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সক্রিয় থেকেছেন অভিজিৎ মিত্র, ইন্দ্রনীল ঘোষ, অরূপরতন ঘোষ এবং এখন রয়েছেন তপোন দাশ এবং সব্যসাচী হাজরা! কিন্তু কবি সৌমিত্র সেনগুপ্ত আর অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত শুভাকাঙ্খী না থাকলে “নতুন কবিতা”কে চোদ্দ বছর ধরে চালানো যেত না! পত্রিকার  প্রথম সংখ্যা থেকেই চেষ্টা করা হয়েছিল কবিতা’র তত্ত্ব নয়, কবিতা’র ভাবনাই হবে “নতুন কবিতা”র বিচরণক্ষেত্র! প্রথম সংখ্যাটি ছিল “সম্ভাবনার কবিতা” এই ভাবনাকে কেন্দ্র করে! “স্থা”র পক্ষে থাকা জীবনানন্দীয় ধারা, বামপন্থী সামাজিক বাস্তবতার ধারা, পঞ্চাশ দশকীয় ছন্দে লিখতে থাকা পদ্যধর্মী ধারা ইত্যাদিতে জড়িয়ে থাকা বাংলা কবিতা লিখিয়েদের ৯০ শতাংশ কবি,কবিতার কাগজ, খবরের কাগজ, রাজনৈতিক দলের কাগজ ইত্যাদি সকলের কাছেই এঁরা ব্রাত্য হয়ে গেলেন, এখনো তাই আছেন! কাউকে আক্রমণ না ক’রে, কারো প্রতি বিদ্বেষ বা অসূয়া প্রকাশ না ক’রে এঁরা লেখার চেষ্টা করছিলেন বাংলা কবিতায় যা লেখা হয়নি সেরকম কবিতা, এঁদের নিজেদের ভাষায়! “নতুন কবিতা”র একটি সংখ্যা করা হল “শুন্য দশকের” শুরুতে লেখালিখি করা তরুণতম কবিদের নিয়ে! ”পা রাখো জুতোর বাইরে” এটাই ছিল ভাবনাসূত্র ওই সংখ্যার! ভাবনাকে চলিষ্ণু রাখার তাগিদেই করা হল “কবির দরজা”,”কবিতা ও সিনেমা”,”টাইম মেশিন” ইত্যাদি সংখ্যা!

২০০৯ সালে আন্তর্জালে এল অনুপম মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বাক’। শুধুমাত্র ব্লগ নির্ভর বাংলার প্রথম পত্রিকা। এখানেও নতুনকে, নতুন ভাষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে ও হয়। অনুপম মুখোপাধ্যায় নিজে ‘পুনরাধুনিক কবিতা’ লেখেন। এই পুনরাধুনিক সম্বন্ধে তিনি বলেছেন, পুনরাধুনিক কোনো তত্ত্ব নয়। এটা ভাবনা। যাপন আর সমাজের মধ্যে এর ঘোরাফেরা। মূল ব্যাপারটা হল একজন কবি বা শিল্পীর হাঁফিয়ে ওঠা। একজন পুনরাধুনিক কবি কোনো প্রতিষ্ঠানের মুখাপেক্ষী হবেন না। তিনি আত্মপ্রতিষ্ঠ হবেন। নিজের কবিতাকে জনসাধারণের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার দায় তিনি নিজেই নেবেন। সেই চর্যাপদ থেকে আজ অবধি বাংলা কবিতার যাবতীয় গুণ তিনি আত্মসাৎ করবেন। কী লিখবেন না, এ নিয়ে তাঁর ভাবনা যাবে ফুরিয়ে। তিনি শুধু সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি কী লিখবেন। এক পৃথিবী লেখার আছে তাঁর। কবিতার কোনও লক্ষণ ও কোনও উপাদানই তাঁর চোখে অপাংক্তেয় নয়, দিব্যাস্ত্র অথবা হাতুড়ি- তাঁর প্রয়োজনমতো হাতে তুলে নেবেন। আবহমান কবিতার ধারায় একজন পুনরাধুনিক নিজেকে সনাক্ত করবেন। তাঁর লেখার ঘর, তাঁর কাজের ঘর, তাঁর সাধনকক্ষ।

এরই মধ্যে নিঃশব্দে বাঁকুড়া জেলায় অঙ্ক-কবিতা লেখা হয়েছে খ্রীষ্টীয় অষ্টাদশ শতকে। লিখেছেন শুভঙ্কর রায় । ‘শুভঙ্করী আর্যা’ তাঁরই রচনা। বিনয় মজুমদার, প্রভাত চৌধুরী, ভট্টাচার্য চন্দন, অসিত বসু, রতন দাস, পিনাকী রঞ্জন সামন্ত বাংলা ভাষায় অঙ্ক কবিতা লিখেছেন। যদিও এই অঙ্ক-কবিতাকে কোন আন্দোলন বলা যাবে না, তবু এই ধারাটি নিয়ে সম্প্রতি কার্ল কেম্পটনের সূত্র অনুযায়ী চর্চা করে চলেছেন অনিন্দ্য রায়। যে তত্ত্বের ওপর ওঁরা নির্ভর করছেন, তা এই রকম – গণিত যদি বিষয় হিসেবে, রূপক হিসেবে, অভিব্যক্তির মাধ্যম হিসেবে, যেকোনো রূপে, যে কোনো ভাবে কবিতায় ব্যবহৃত হয়, তাকেই এঁরা গাণিতিক কবিতা বলেন।

গণিত যেমন কয়েকটি শাখায় বিভক্ত, গাণিতিক কবিতাও যে শাখা রচিত সেইভাবে বিভিন্ন রকমের হতে পারে
• পাটিগাণিতিক কবিতা (arithmetical poetry)
• বীজগাণিতিক কবিতা (algebraic poetry )
• জ্যামিতিক কবিতা (geometrical poetry)
• ক্যালকুলাস কবিতা (calculus poetry)
• পরিমিতিক কবিতা প্রভৃতি
এবং মিশ্র গাণিতিক কবিতা (mixed mathematical poetry), যেখানে একটি কবিতায় গণিতের একাধিক শাখার ধারণা একই সাথে ব্যবহার করা হয়।
এর মধ্যে বাংলা ভাষায় এখনো পর্যন্ত জ্যামিতিক কবিতা ও সম্ভাবনা কবিতা (probability poetry) বেশি লেখা হয়েছে।

সাহিত্য আন্দোলনের যে ধারাগুলি আলোচনা করলাম, সেগুলি সবই কবিতাভিত্তিক। এর বাইরে ছিল ‘শাস্ত্রবিরোধী গল্প আন্দোলন’ (প্রধান পরিকল্পনায় রমানাথ রায়, ‘এই দশক’ পত্রিকা), সত্তরের দশকে ছিল ‘নিম সাহিত্য আন্দোলন’ (সুধাংশু সেন, রবীন্দ্র গুহ, বিমান চট্টোপাধ্যায়, মৃণাল বণিক, ‘নিম সাহিত্য পত্রিকা’), ‘গল্পতন্ত্র ও চাকর সাহিত্য বিরোধী আন্দোলন (সুব্রত সেনগুপ্ত/অব্যয়, ‘গল্পতন্ত্র…’), ‘ঘটনা প্রধান গদ্য আন্দোলন’ (অচিন্ত্য কুমার সাঁতরা/এবং নৈকট্য), ‘নতুন নিয়ম’ (তাপস চৌধুরী, আশিস মুখোপাধ্যায়…/’নতুন নিয়ম’), ‘সমন্বয়ধর্মী গল্প আন্দোলন’ (অজিত দেব ও সুধীর দাশ/সমন্বয়ধর্মী গল্প পত্রিকা’)। সত্তরের দশকে কবিতা আন্দোলনর মধ্যে ছিল আজকালের কবিতা আন্দোলন। এর প্রধান প্রবক্তা ও লেখকগোষ্ঠীর মধ্যে ছিলেন বাপী সমাদ্দার, অলোক সোম ও বৈদ্যনাথ চক্রবর্তী। বর্তমানে এই পত্রিকাটি ‘আজকাল টাইটোনিডি’ নামে প্রকাশিত হয়। ‘টাইরেসিয়াস’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় ‘নিওলিট মুভমেন্ট’। আশির দশকে পবিত্র মুখোপাধ্যায় ও শৈবাল মিত্রের সম্পাদনায় পূর্বের ‘কবিপত্র’ নতুন ভাবে ‘কবিপত্র প্রকাশ’ নামে প্রকাশিত হয়। এখানেই ‘থার্ড লিটারেচারঃ প্রয়োগবাদী কবিতা আন্দোলন’এর জন্ম।

উপরোক্ত সমস্ত আন্দোলনগুলিই কিন্তু পত্রিকানির্ভর এবং যৌবনের উপাসক। ষাটের দশকে দ্যাখা গেছে, স্বাধীন ভারতে ছাপাখানার উন্নতি হওয়ায় কিছু তরুণরা নিজেদের হাতখরচের পয়সা বাঁচিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করতে পেরেছে। সেই পত্রিকাগুলি আয়তনে হয়ত খুবই ছোট, আন্দোলনের জন্যই পত্রিকাগুলি প্রকাশিত হয়েছিল, উদাহরণ হিসেবে বলা যায় হাংরির ‘জেব্রা’, ‘জিরাফ’, ‘গেরিলা’, ইত্যাদি বুলেটিনগুলোর কথা। নবীনদের উদ্যম আর পত্রিকা প্রকাশের সুযোগ এই দুইয়ের সমন্বয়ে ষাটের দশকের আন্দোলনগুলি জোরদার হতে পেরেছিল। পরবর্তীকালের চিত্রটিও প্রায় একই। এমনকি এখনকার ওয়েব নির্ভর পত্রিকাগুলি আরও কম খরচে পত্রিকা প্রকাশ করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও সে অর্থে সাহিত্য আন্দোলন বলতে এখন আর কিছুরই অস্তিত্ব নেই। রয়েছে তৈরি হয়ে যাওয়া গোষ্ঠীগুলির টিমটিম করে নিজেদের বৃত্তে বেঁচে থাকার লড়াই। নিছক কবিতার জন্যই কবিতা, কবির জন্যই কবিতা –এমনটাই এখনকার পরিস্থিতি।