বাংলা উপন্যাসের অন্দরমহল: শিবিরহীন সমালোচনা সাহিত্যের প্রস্তুতিক্ষেত্র

বাংলা উপন্যাসের অন্দরমহল: শিবিরহীন সমালোচনা সাহিত্যের প্রস্তুতিক্ষেত্র | দেবকুমার সোম

দেবকুমার সোম

 



কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক

 

 

 

পূর্ব-প্রসঙ্গ: পুঁজির অসম্পূর্ণ বিকাশ ও বাংলা প্রকাশনা

ঔপন্যাসিক আর তাঁর পাঠকের মাঝখানে সেতু রচনাকার যদি হন প্রকাশক, তাহলে সেই সেতুর সঠিক পথনির্দেশ যিনি দিতে পারেন তিনি একজন সাহিত্য সমালোচক। একজন সৎ এবং নিষ্ঠাবান সমালোচকের পক্ষেই দায়িত্বশীল গাইডের কাজ করা সম্ভব। অন্তত বাংলা উপন্যাস-সাহিত্যের বিকল্পধারার হালহদিশ দেওয়ার ক্ষেত্রে। একজন ভাল সাহিত্য সমালোচকের সবচেয়ে বড় গুণ হওয়া উচিত তাঁর পড়ুয়া মনের উৎকর্ষতা। বইয়ের ব্লার্ব পাঠ করে যাঁরা সাহিত্যের সমালোচনার দাবি করেন, আমাদের মতে তাঁরা সাহিত্যসমাজের তৃতীয়শ্রেণির মানুষ। তাঁরা স্বতঃই পরিত্যাজ্য। একজন প্রথমশ্রেণির সাহিত্য সমালোচকের কাছে সকলেরই কিছু-না-কিছু দাবি থাকে। কারণ তাঁর মতামত অগ্রাহ্য করা কোনও-কোনও সময় প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে সাহিত্যের বাজারে। ফলে সকলেই তাঁকে খাতির করে চলতে পছন্দ করেন। আমাদের কথা একজন সাহিত্য সমালোচক হিসাবে তিনি খাতির উপভোগ করতেই পারেন। কিন্তু তিনি যেন সাহিত্যের কাছে সৎ থাকেন। তিনি পণ্ডিত হন আপত্তি নেই। ‘নিন্দুক লক্ষ্মীছাড়া’ হোন তাতেও আপত্তি নেই। কিন্তু দোহাই, বাংলার দুগ্ধপোষ্য পাঠকদের দুধের বদলে যেন পিটুলিগোলা না-খাওয়ার প্রস্তাব দেন। কিংবা সত্যিকার দুধ পানে বঞ্চিত না রাখেন পাঠক সাধারণকে। কথাটা এমন ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে নাও বলা যেত। এত উপমার দরকারও সম্ভবত ছিল না। কিন্তু এই নিবন্ধটিও তো সমালোচকের হাতে গিয়ে পড়বে, সেই ভয়ে কিঞ্চিৎ মেপেঝুপে কথাটা বলা।

এক অদ্ভুত প্যারাডক্স বর্তমানকালের খবরের কাগজে দেখতে পাওয়া যায়। যে খবরের কাগজের পাঠকসংখ্যা যত বেশি, তার সাহিত্য সমালোচনার জন্য বরাদ্দের পৃষ্ঠাও তত কম। এক পৃষ্ঠার এক-চতুর্থাংশ অংশ বরাদ্দ করা হয় ঠেসেঠুসে সাহিত্যের সমালোচনার জন্য। তার মধ্যেও আবার গেরো। বাংলা খবরের কাগজে বাংলা অপেক্ষা ইংরাজি সাহিত্যের সমালোচনার প্রতি ঝোঁক বেশি। অবশ্য আমরা যাকে সমালোচনা বলতে চাইছি সেরকম কিছু খবরের কাগজের সাহিত্য সমালোচনার পৃষ্ঠায় দেখা মেলা আর সাহারা মরুভূমির আকাশে চেরাপুঞ্জির বাদল মেঘ দেখতে পাওয়া একই ব্যাপার। খবরের কাগজে সাহিত্য সমালোচনার নামে যেটা ঘটে সেটা একরকম প্রাপ্তিস্বীকার। পরোক্ষে বললে বিনা পয়সায় বিজ্ঞাপন। অর্থাৎ খবরের কাগজে বিবিধ সংবাদের মধ্যে খানিকটা জায়গা বাঁচিয়ে ‘সাহিত্য–টাহিত্য’। ওটুকু না করলে কি খবরের কাগজের কাটতি কমে যায়? মোটেও নয়। তেমন হলে এমন প্যারাডক্স কেন? সাহিত্যের খবর না ছাপালেও খবরের কাগজ দিব্যি চলে যায়। তবে ওই একটা ধর্মীয় রিচুয়ালের মতো, যা না থাকলে কাগজটা কেমন যেন বেমানান হয়ে পড়ে। যেমন নিত্যদিনের রাশিফল। ‘আপনার আজকের দিনটা কেমন যাবে?’ এমত কলামের গ্রহণযোগ্যতা চিন্তাশীল মানুষের কাছে যতটা, সাহিত্য সমালোচনার পৃষ্ঠা তার থেকে অধিক কিছু নয়। সেখানে যাঁরা কলামনিস্ট, তাঁরা সত্যিই দুর্ভাগা। খবরের কাগজের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় কোন বইটার, ঠিক কত শব্দের মধ্যে পাঠপ্রতিক্রিয়া (লক্ষ করে দেখুন ‘সমালোচনা সাহিত্য’ শব্দটাকে আড়ালে পাঠিয়ে কেমন একটা আবছা ধারণা দেওয়া হল; ‘পাঠ প্রতিক্রিয়া’) জানাতে হবে। এর মধ্যে খবরের কাগজের নিজস্ব ছক‌্‌বাজিও প্রকটভাবে থাকে। তার ফলে ওটাকে ‘বিজ্ঞাপন’ হিসাবে মেনে নিয়ে লেখক আর তাঁর প্রকাশক নিজস্ব বৃত্তে সেই খুশির খবরটা ছড়িয়ে দিতে পারেন এই পর্যন্ত। ফলে খবরের কাগজে উপন্যাসের ব্লার্ব পড়ে কিংবা কোনও পত্রিকার মাত্র সূচিপত্র পাঠ করেই অনেক খ্যাতমান সাহিত্যপণ্ডিত তাঁর কর্তব্য সাধন করেন। এর দরুন বিভ্রান্তি যেমন থেকে যায়, তেমনই উলটো বুঝলি রামও হয়ে যায়। অতি সম্প্রতি একটি আলোচনার কাগজ বিশেষ শঙ্খ ঘোষ সংখ্যা করেছিল। সেখানে একটি নিবন্ধের শিরনাম ছিল ছন্দের বারান্দা: পাঠ্যপুস্তক পুনঃপাঠ। নিবন্ধকার তাঁর লেখায় সাব্যস্ত করতে চেয়েছিলেন তাঁর কাছে ছন্দের বারান্দা পাঠ্যপুস্তকের মতো অতি প্রয়োজনীয় এক বই। একটি জনপ্রিয় দৈনিকে ততোধিক জনপ্রিয় একজন মান্য পণ্ডিত সাহিত্য সমালোচক বিষয়টা না পাঠ করেই লিখে দিলেন ‘শঙ্খ ঘোষকে নিয়ে লেখা আরও প্রবন্ধের মধ্যে পাঠ্যপুস্তকও আলোচিত হয়েছে।’ আমাদের বক্তব্য নিজের সুনামের প্রতি যথাযোগ্য দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হয়। ফলে প্রবীণ ও বিদগ্ধ সমালোচকের এমন ফাঁকিবাজি তাঁর সুনামকে যেমন মর্যাদা দেয় না, তেমন কোথাও যেন যাঁর লিখিত নিবন্ধকে, এমনকি তাঁকেও খাটো করা হয়। সমালোচনা সাহিত্য বলি কিংবা পাঠ প্রতিক্রিয়া, সজনীকান্ত দাসের মডেল কিন্তু বেশিদিন চলে না।

আমাদের আলোচনার মধ্যে যখন শ্রদ্ধেয় সজনীকান্ত দাস ঢুকেই পড়লেন, তখন তাঁর শনিবারের চিঠি নিয়ে খুব সামান্য কিছু আলোচনা করে নিলে সম্ভবত আমাদের অবস্থান খানিক স্পষ্ট করতে পারব। সজনীকান্তবাবু ও তাঁর পরিকরবৃন্দের যেমন স্বাভাবিক ঝোঁক ছিল বাংলা সাহিত্যের রথী-মহারথীদের ব্যঙ্গ করা, তেমন সাহিত্যের নতুন ভাষা পড়তে অসমর্থ হয়ে তীব্র গালাগাল করাও ছিল তাঁদের স্বভাবদোষ। সেই তীব্রতা অনেক সময় সামাজিক শ্লীলতার সীমা লঙ্ঘন করেছে। আর এমন শ্লীলতার ঘটনা যতই ঘটেছে পরোক্ষে বাংলা সাহিত্যে নতুন গতি ততই হয় রুদ্ধ হয়েছে, কিংবা শ্লথ হয়েছে। সজনীকান্তবাবুর বিশেষ প্রীতি ছিল রবীন্দ্রনাথের ওপর। কারণটা সহজেই অনুমেয়। তাই কবির জন্য যে পরিহাস বা হাস্যমুখর সমালোচনা করা হয়েছে তা মেপেঝুপে। যেমন শনিবারের চিঠি-তেই রবীন্দ্রনাথের একটি কার্টুন ছাপা হয়, যেখানে দেখা যায় কবি ছিপ হাতে নদীর ধারে মাছ ধরার জন্যে বসে আছেন, আর কার্টুনের নিচে লেখা আছে, ‘কূলে একা বসে আছি নাহি ভরসা।’ স্বচ্ছ, হাস্যোজ্জ্বল এক কার্টুন। কিন্তু কাজি নজরুলকে ‘হাঁড়িচাচা’ বলার মধ্যে কতটা শালীনতা থাকে? প্রসঙ্গসূত্র হিসাবে আমাদের আজকের পাঠকদের কাছে সেদিনের শনিবারের চিঠি-র সামান্য নমুনা রাখা যেতে পারে:

বাঙলার জনসাধারণ খবর রাখেন কিনা বলিতে পারি না, সম্প্রতি কিছুকাল হইতে ‘পূর্ববঙ্গ–সাহিত্য’ নামক এক নূতন সুবৃহৎ এবং সম্পূর্ণ সাহিত্য গড়িয়া উঠিয়াছে। এই সাহিত্যের ‘চসার’ হইতেছেন ভাওয়ালের কবি গবিন্দ দাস; ‘ব্রাউন— কালীপ্রসন্ন ঘোষ, বিদ্যাসাগর এবং হুইটম্যান— শ্রী জীবনানন্দ দাশগুপ্ত; ইহার ম্যাথু আনর্ল্ড ও ওয়াল্টার পেটার যথাক্রমে শ্রীমান‌্‌ বুদ্ধদেব বসু ও শ্রীমান‌্‌ অজিতকুমার দত্ত। এই সাহিত্য যে রূপ দ্রুতগতিতে উন্নতির পথে চলিয়াছে তাহাতে আশা হয় যে অদূর ভবিষ্যতে বঙ্গদেশে এতকাল-প্রচলিত বঙ্কিম-মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথের বাঙলা সাহিত্যে বহু পিছনে পড়িবে। এই সাহিত্যের মোদ্দা কথা হইতেছে তিনটী— সিগ্রেট, সিনেমা ও সেল্ফ-অ্যাবিউজ।[1]

এই সমালোচনা পড়লে আজকের দিনের টিআরপি-লোভী মিডিয়াকূলও লজ্জা পাবে। ঠোঁটকাটা সাহিত্য সমালোচক মানহানি মামলায় জেরবার হবেন। শনিবারের চিঠি-র এই পর্যবেক্ষণ একদেশদর্শী কেবল নয়, রুচির নিম্নগমন। এই সমালোচনার উদ্দেশ্য পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ বাঙাল (তদনীন্তন পূর্ববাংলার হিন্দু সম্প্রদায়) কবি-সাহিত্যিকদের জাত তুলে গাল পাড়া। যার সঙ্গে সাহিত্যের ন্যূনতম সংস্রব নেই। সবটাই পরশ্রীকাতরতা আর নতুন সাহিত্যকে চিনতে না পারার অক্ষমতা।

শনিবারের চিঠি সাময়িক হিসাবে সেসময় বেশ মুখরোচক ছিল সন্দেহ নেই। কারণ সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব বিশেষত নতুন ধারার বা বিকল্প ধারার সাহিত্যকারদের মর্যাদা হানি করাই ছিল এর অন্যতম আমোদ। বলা বাহুল্য জীবনানন্দকে আক্রমণের সময় সজনীকান্ত দাস, নীরদচন্দ্র চৌধুরিরা সভ্য সমাজের সব শালীনতার সীমারেখা ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। বিভিন্ন ছুতোনাতায় তাঁদের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন জীবনানন্দ। কারণ তাঁকে পাঠ করা দুষ্কর ছিল সেদিনের বাংলা সাহিত্যের দিগগজ পণ্ডিত সমালোচকদের। জীবনানন্দের লেখা ছাপানোর যে হীনম্মন্যতা তাঁর সমগ্র জীবন জুড়ে বহমান ছিল তার অন্যতম কারণ শনিবারের চিঠি-র এই ধারাবাহিক অশালীন বিদ্রূপ। না হলে মানুষটা সারাজীবনে যা লিখলেন তার এক দশমাংশও কেন তাঁর জীবিতকালে প্রকাশ পেল না? তিনি তো ফ্রানজ‌্‌ কাফকার মতো কোনও শর্তাবলি রেখে যাননি? বরং এমনও দেখা গেছে কবিতা পত্রিকায় প্রকাশের সময় বনলতা সেন বা মহাপৃথিবী-র বহু কবিতা বুদ্ধদেব বসু স্ব–ইচ্ছায় সম্পাদনা করে নিয়েছেন। জীবনানন্দ তার কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাননি। আসলে নতুন পথের দিশারি সৃষ্টিশীল মানুষ সব সময় দ্বিধা-দ্বন্দ্বে বিভক্ত থাকেন। নিজের সৃষ্টি নিয়ে উৎকণ্ঠায় থাকা তাঁর জীবনের ভবিতব্য। কারণ তাঁর চোখের সামনে কোনও স্বীকৃত মডেল থাকে না। এখানেই একজন প্রকৃত সাহিত্য সমালোচকের ভূমিকা। তাঁকে যেমন নিজের বিচারপদ্ধতির প্রতি সৎ থাকতে হবে, তেমনই তাঁকে সংবেদনশীল হতে হবে। সংবেদনশীলতা এবং ঔদার্য একজন বিচক্ষণ সাহিত্য সমালোচকের বড় লক্ষণ।

গত শতকের শেষ কয়েক দশক বাংলায় সমালোচনা সাহিত্যের ভাঁটা পরেছিল। অনুমিত কারণ এই, যে তখনও মার্কসবাদী সাহিত্যবীক্ষা থেকে বের হতে পারেনি বাংলা সাহিত্যের মূলধারা। ১৯৯০ দশকে বাখতিনচর্চার মধ্যে দিয়ে বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে এক নতুন স্রোত আসে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে বিদেশের (পড়ুন পশ্চিমের) সাহিত্যতত্ত্ব বিদেশে যখন বাতিল হয়ে যায়, তখন তাকে বরণডালায় সাজিয়ে আমরা বাংলা সাহিত্যে নিয়ে আসি। বাখতিনচর্চার মধ্যে দিয়ে বেশ কয়েক দশকের ভাঁটা কাটিয়ে বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে এল তেমন জোয়ার। সেই জোয়ার আমাদের ঠেলে পৌঁছে দিল নতুন শতকে। আমরা ফুকো, দেরিদা, উত্তর-আধুনিকতা, বিনির্মাণ তত্ত্ব আঁকড়ে ধরলাম। এর সঙ্গে এল গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, হোর্হে লুইস বোহের্স, হুকিও কোর্তাসার মতো লাতিন আমেরিকার ঔপ্যনাসিকদের লেখার নন্দনতত্ত্ব। তার সঙ্গে যোগ হল মিলান কুন্দেরার উপন্যাস ও তাঁর দ্য আর্ট অফ দ্য নভেল, পর্তুগিজ অথর হোসে সারামাগো আর তাঁর অলৌকিক গল্প বলার স্টাইল। ইংরাজি ভাষায় লেখা ভারতীয় ঔপ্যনাসিকদের জয়যাত্রা শুরু হল ওই ১৯৯০ দশককে কেন্দ্র করে। একদিকে অরুন্ধতী রায় ম্যান বুকার পেলেন। অন্যদিকে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ত্রিনিদাদজাত বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপলের নতুন শতকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি। সলমন রুশদির পথে ঝুম্পা লাহিড়ি, উপমন্যু চট্টোপাধ্যায়, অমিতাভ ঘোষেদের মতো ডায়াস্পোরিক লেখকদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সব মিলিয়ে বাংলায় সমালোচনা সাহিত্যের একটা নতুন চল নিয়ে এল। তালিকা দেখে ভ্রম হওয়ার নয় যে, পশ্চিম-স্বীকৃত সাহিত্য দর্শনকে সামনে রেখে বাংলা সাহিত্যকে পড়ে নেওয়ার চেষ্টা থেকেই এর সূচনা। ফলে বহু সাহিত্যের ছোট কাগজ শুধু সমালোচনা সাহিত্যকে সামনে রেখে যেমন তাদের রাস্তা খুঁজে নিল, তেমনই বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত সাহিত্যের জন্য এসে গেলে সম্পূর্ণ সাহিত্য আলোচনার ত্রৈমাসিক পত্রিকা। এর সুফল হল বহুবিধ।

দীর্ঘদিন সাহিত্য সমালোচনা কেঠো কাজ হিসাবেই আমাদের সাহিত্যসমাজে দেখা হত। তার কারণও ছিল বহুবিধ। একে তো যাঁরা সমালোচক ছিলেন তাঁরা কমবেশি কলেজ অধ্যাপক। তাঁরা তাঁদের শ্রেণিচরিত্র বজায় রেখে ‘ইহাকে সাহিত্য বলে’, ‘ইহা সাহিত্য হয় নাই’ এমন সব রায় দিতেন। তার সঙ্গে মিশেছিল তাঁদের পাণ্ডিত্যের আস্ফালন। বাংলা সাহিত্যের কোনও একটি উপন্যাসের আলোচনা করতে দিয়ে নিবন্ধকার যদি পশ্চিমের সাহিত্যতত্ত্বের বিচারে তাকে ভাবতে যান তা একরকম বিপর্যয়ই বটে (প্রসঙ্গত সেই ট্র্যাডিশন এখনও সমান বহমান)। ফলে বহু দশক ধরে সমালোচনা সাহিত্যকে সৃজনশীলতার আয়ত্ত থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। নতুন শতকে এসে আলোচনা সাহিত্যের (তখন শব্দটা আর ‘সমালোচনা’ রইল না, হয়ে গেল ‘আলোচনা’। এও পশ্চিমের ছোঁয়া) নতুন দিক উন্মোচিত হল। অধ্যাপকশ্রেণির পাশাপাশি যাঁরা নিজেরাই সৃজনশীল সাহিত্যের সঙ্গে জুড়ে আছেন, তাঁরাও সুযোগ পেলেন সাহিত্যপাঠ এবং তার প্রতিক্রিয়া নিয়ে নিবন্ধ রচনায়। ফলে সৃজনশীলতার একটা ঝোঁক এল বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে। দুটো ভিন্ন ধারার সহাবস্থান দেখা দিল বাংলা সমকালীন সাহিত্য আলোচনায়। বিদগ্ধ পণ্ডিত অধ্যাপকের দল এর ফলে অনুভব করলেন কেবল তত্ত্ব আর তথ্য দিয়ে সাহিত্য সমালোচনার দিন শেষ। তাঁরাও খানিক নিজেদের বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে নিয়ে এলেন। বাংলা সাহিত্যের একটা নতুন চিন্তাসূত্র তৈরি হল। তবে সেই নতুনত্ব খুব বেশি ফলদায়ক হয়ে ওঠেনি তার কারণ শিবির বিভাজন।

সাহিত্যে শিবিরকেন্দ্রিকতা নতুন কোনও ব্যবস্থা নয়। চিরকালই বাংলা সাহিত্যে এক বা একাধিক নায়ক, মহানায়ক এসেছেন। তাঁরা রাজপাট করেছেন। ফলে তার সঙ্গে জুটেছে পাত্রমিত্র, সান্ত্রী, সেপাই, মন্ত্রী এবং বিদূষকের দল। এঁরা তাঁদের নায়কদের জীবিতকালে বন্দনা করেছেন মূলত খ্যাতির লোভে। পুরস্কার পাওয়ার লোভে। বড় প্রকাশকের কাছ থেকে বই ছাপানোর লোভে। নামীদামী পত্রিকায় লেখা ছাপানোর লোভে। এর জন্য তাঁরা অনেকে কাঞ্চনমূল্য দিয়েছেন। অধুনা অকালপ্রয়াত একজন ঔপন্যাসিক জীবনের দ্বিতীয় পর্বে যে সংবাদপত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, সেই সংবাদপত্রের পুজো সংখ্যায় অনামীদের উপন্যাস কিংবা গল্প ছাপানোর জন্য সরাসরি টাকা নিতেন। তাঁর রেট ছিল উপন্যাসের জন্য দশ হাজার টাকা। বড় গল্পের জন্য সাত হাজার টাকা। ছোট গল্পের জন্য পাঁচ হাজার টাকা। তিনি যে দুহাত ভরে বিভিন্ন ছুতোয় অনামী লেখকদের কাছ থেকে টাকা নিতেন আর তাঁদের লেখা পুজো সংখ্যায় ছাপাতেন, সেটা তাঁর জীবনের শেষের দিকে মালিকপক্ষের গোচরে এলে তাঁকে পুজো সংখ্যার দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেওয়া হয়। এইসব শিবিরে কর্তার কাছের লোক হওয়ার জন্য নিকৃষ্ট প্রকাশকেরা তো বটেই, নামী প্রকাশকেরাও কামিনী আর কাঞ্চন নিয়ে লাইন দেন (স্মর্তব্য: পিওন থেকে প্রকাশক। বাদল বসু)। অনেকের অযোগ্য লেখা নামী পত্রিকায় ছাপানো কিংবা নামী প্রকাশকের ঘর থেকে বই প্রকাশের শর্ত চিরকাল এক। কামিনী আর কাঞ্চন। খ্যাতির লোভ বড় লোভ। অমরত্ব দেবতা কিংবা দানব সকলেরই শাশ্বত দাবি। এর থেকে দেবীরা বাদ যাবেন কীভাবে? ফলে ওই ছোটনাগপুরের আদিবাসী রমণীদের যোনির কাঙাল বাংলা সাহিত্যের শিবিরের নায়কেরা সারস্বত সমাজের অযোগ্য দেবীদের নিয়ে আজকাল হপ্তান্তে ছুটি কাটাতে চলে যান শান্তিনিকেতন। বেশ এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে শরীরের আদানপ্রদানের মধ্যে দিয়ে নামী কাগজে ধারাবাহিক উপন্যাস থেকে, পুজো সংখ্যার উপন্যাস লেখকের প্যানেলে নাম তুলে দেওয়া  কিংবা পুরস্কার পাওয়ার নীল নকশা রচিত হয়।

এইসব শিবিরের এজেন্ট হিসাবে ব্যবহৃত হন সাহিত্য সমালোচকেরা। যারা আজ আর ‘নিন্দুক লক্ষ্মীছাড়া’ নন। তাঁরা তাঁদের দাদা, ভাই, প্রেয়সীদের জন্য দুহাত খুলে পাঠপ্রতিক্রিয়া লেখেন। সাহিত্যসমাজে তাঁদেরও তো বেঁচে থাকতে হয়। তাঁদেরও তো ইচ্ছে জাগে তাঁদের ‘বস’-এর মতো মাঝেমাঝে শান্তিনিকেন, মন্দারমণি, নিদেনপক্ষে ডায়মন্ডহারবারে ছুটি কাটাতে যেতে। তাঁদেরও তো সাধ হয় দামী স্কচে চুমুক দিয়ে দামী আবাসনের ততোধিক দামী ফ্ল্যাটে যৌন নাচ দেখতে? আর তার জন্য শিবিরের লোকেদের পিঠ চুলকে দিলে কিছু ক্ষতি তো হয় না।

এর অর্থ এমন নয় অসূয়াজাত হয়ে আমরা এমন মন্তব্য করছি। আমাদের প্রতিটা বাক্যের পেছনে রয়েছে এক একটি মর্মান্তিক সত্য ঘটনা। বাংলা উপন্যাসের অন্দরমহলের সেসব কুৎসিত ছকবাজি সাহিত্যজগতের নামী এবং বদনামী উভয় পক্ষেরই জানা। যাঁরা এই শিবির বিভাজনে রয়েছেন, তাঁরা ফূর্তি আর নামের নেশায় এমন মশগুল হয়ে যান যে কখন একটা ছোট্ট ঝড়ে তাঁদের তাঁবু উড়ে যেতে পারে সে খেয়াল থাকে না। গত পাঁচ-ছ বছরে বাংলা সাহিত্যের প্রায় সংখ্যাগুরু শিবিরকর্তা কিংবা মহানায়কদের জীবনাবসান ঘটেছে। তাই ইদানিং দেখা যায় প্রায় বিস্মৃত অশীতিপর ঔপন্যাসিকেরা বিভিন্ন মান্য পুরস্কার পাচ্ছেন। সেটা এমন সময়, যে তাতে তাঁদের কোনও ইতরবিশেষ গর্বিত হওয়ার কিছু থাকে। কারণ বহু বছর আগেই শিবিরপতিদের দক্ষিণ্যে তাঁদের পুত্রবৎ লেখকেরা এমন সব পুরস্কার লাভ করে সমাজে বিশিষ্ট হয়ে গেছেন। আসলে এঁরা প্রত্যেকেই যশের কাঙাল। নামের কাঙাল। ফলে শিবিরের প্রতি অভিমান থেকে তাঁরাও কোথাও কোথাও বিকল্প শিবির তৈরি করে ফেলেন। তারই অনুদান জীবনের পড়ন্তবেলায় উপঢৌকনের মতো পুরস্কারপ্রাপ্তি।

তবে আশার কথা ঠিক এই সময় গুটিকয়েক সাহিত্য আলোচনার কাগজ নিজেদের সীমিত ক্ষমতার মধ্যে থেকে নিরলস চেষ্টা করছে এইসব যাবতীয় ছকবাজিকে উলটে দিতে। তারা কতটা সফল হবে তা নির্ভর করছে প্রতিপক্ষ কতটা সংঘবদ্ধ তার ওপর। আর নির্ভর করছে পাঠক কতটা সংবেদনশীল তার ওপর।

প্রবীণ অধ্যাপকের দৃষ্টিতে দেখলে অনেক নবীন ঔপ্যনাসিকের সৃজনশীলতা পাশ মার্ক পাবে না। কারণ অধ্যাপকদের লেখায় প্রচ্ছন্ন থাকে নিজেদের পাণ্ডিত্য। তাঁদের লেখা তাই সমালোচনা কিংবা আলোচনা না হয়ে প্রায়শ হয়ে ওঠে আলোচিত উপন্যাসের ক্যারেকটার সার্টিফিকেট। কিংবা হলমার্ক। তাঁদের লেখায় অনুচ্চারে এটাই পাঠকের কাছে বার্তা হিসাবে যায় যে তাঁরাই ঠিক করে দিচ্ছেন আলোচিত উপন্যাসটি পাঠযোগ্য কি না? এ কেবল কৃপণতার কথা নয়। এ একরকম উন্নাসিকতা। পাণ্ডিত্য প্রর্দশন। এমন আলোচনা সাহিত্যের কোনও কাজে লাগে না। একজন পণ্ডিত মানুষকে সমাজ এই অধিকার দিয়েছে যে তিনি কোনও উপন্যাসকে সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর, পাঠকের মনোজগৎ সম্পর্কে ক্ষতিকর এমনটা আগাম জানিয়ে দেওয়া। কিন্তু সেই অধিকার কতকটা একাঘ্নী বাণের মতো। পাশুপাতের মতো। ক্রমব্যবহারে এই অধিকার লক্ষ্যচ্যূত হয়। তাঁর নিজের জাত্যাভিমানে আলোচিত উপন্যাস ও তার লেখক দুজনের ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিতে কখনও কখনও পণ্ডিত অধ্যাপকদের হাত কাঁপে না।

আর যাঁরা শিবিরনিবাসী সমালোচক, তাঁদের চোখে আলোচিত উপন্যাসটির কোনও খামতি থাকার কথা নয়। তাঁদের আলোচিত উপন্যাসটাকে বিশেষণে-বিশেষণে ভূষিত করতে চেয়ে কণ্টকিত করে ফেললেও তাঁদের আত্মার শান্তি হয় না। তাঁরা জোর গলায়, দরকারে টেবিল বাজিয়ে পাঁচটা দুরূহ পশ্চিমি সাহিত্যের তত্ত্ব সাজিয়ে প্রমাণ করে দেবেন ঔপন্যাসিক ও তাঁর সেই আলোচিত লেখাটি এতটাই বিশিষ্ট যে ঔপন্যাসিক অমরতা পেয়ে গেলেন। আর সেই অমরতার সার্টিফিকেট দিলেন শিবিরনিবাসী সমালোচক স্বয়ং। অর্থাৎ সার্টিফিকেট দেওয়াটাই যেন সাহিত্য সমালোচকের মূল কর্তব্য।

আমরা বিকল্পধারার যে উপন্যাসের কথা আগের অধ্যায়গুলিতে বলে এলাম, সময়াসময় তার কিছু নমুনা রাখার চেষ্টা করলাম, সেগুলির নির্মাণ এমন নয়, যে সামান্য একবার পাঠে (প্রায়শ অমনযোগী পাঠে) তাদের বর্জন বা গ্রহণ করা যায়। ফরমাইশি লেখা, পুজো বা ঈদ সংখ্যার জন্য লেখার যে গভীরতা সেই গভীরতা থেকে একজন ঔপন্যাসিকের চার-পাঁচ বছরের পরিশ্রমে লিখিত উপন্যাসকে পাঠ করা অন্যায়। সাহিত্যের দুবৃত্তায়ন। আমাদের বলার কথা আলোচনা কাগজের সম্পাদক কিংবা সম্পাদকমণ্ডলী তেমন উপন্যাসের আলোচনার কথা ভাবুন, যাকে তাৎক্ষণিক গ্রহণ কিংবা বর্জনের সার্টিফিকেট দেওয়া যায় না (সৎ লেখার ক্ষেত্রে সেটা সম্ভবও নয়)। বরং সেই উপন্যাস নিয়ে আলোচক ডিসকোর্স তৈরি করতে পারেন। সমকালীন সাহিত্যের কোন জায়গায় লেখাটি বিশিষ্ট। লেখাটি পাঠ করতে কেন পাঠক আগ্রহী হবেন। পাঠকের আগ্রহের বিষয়ের সঙ্গে জুড়ে দিতে হবে। কিংবা পাঠককে নতুন কোনও বিষয়ে আগ্রহী করে তুলতে হবে।

বিন্দুবিসর্গের পাঠকদের দুইভাগে ভাগ করা যায়— যাঁরা আগে কলিম খানের লেখা এবং তত্ত্ববিশ্বের সঙ্গে পরিচিত এবং যাঁরা তা নন। যাঁরা প্রথমবার কলিম খানের তত্ত্বের সঙ্গে পরিচিত হবেন তাঁদেরকে তা চমকিত করবেই তার অনন্যতার সূত্রে। এখন যাদের বিন্দুবিসর্গ উপন্যাসের পাঠের মাধ্যমে সেই প্রথম পরিচয় ঘটবে তাঁদের সেই মুগ্ধতা উপন্যাসটির উপরই কেন্দ্রীভূত হবে এবং সেটাই স্বাভাবিক। কারণ থ্রিলারধর্মী হলেও এই উপন্যাসের মূল উপজীব্যই হল কলিম খানের তত্ত্বর এক বৈপ্লবিক এবং রাজনৈতিক ভাষ্য। উপন্যাসটির মূল জোরের জায়গা এটি।[2]

এরই পরের পৃষ্ঠায় আলোচক সন্দীপন মজুমদার দেবতোষ দাশ রচিত বিন্দুবিসর্গ উপন্যাসটির ত্রুটি তুলে পাঠককে জানাচ্ছেন:

তবু কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। ইতিহাসের মেধাবী ছাত্র নীলকণ্ঠ হিসাবে উগ্র ঘাতক হয়ে উঠল তার কোনও প্রেক্ষিত না থাকায় চরিত্রটি যেন রক্তমাংসের পূর্ণতা পায় না… অথচ এইটি উপন্যাসের অন্যতম আকর্ষণীয় চরিত্র যার কিঞ্চিদধিক বিনির্মাণ প্রত্যাশী ছিলাম আমরা। প্লটে কিছু কিছু দুর্বল জায়গাও আছে। যেমন    শুধু অনুমানের উপর ভিত্তি করে নীলকন্ঠ কবির খানের সন্ধানে লালগোলা চলে যায়।[3]

উপন্যাসের দুটো দিক আলোচক তুলে ধরেছেন। এর ফলে পাঠকের পক্ষে এই উপন্যাস সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হবে। আলোচক যদি বিচারক না হয়ে উঠতে চান, যদি রায়দান তাঁর অভীষ্ট না হয়, তবে তা সামগ্রিকভাবে বাংলার সাম্প্রতিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে উৎসাহব্যঞ্জক। মনে রাখতে হবে যেকোনও সৃষ্টির মতো উপন্যাসেও বহু ছিদ্র থাকে। বহু ত্রুটি থাকে। স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা যেখানে নিখুঁত হতে বারবার ব্যর্থ হন, সেখানে একজন ঔপন্যাসিকের পক্ষে অতি স্বাভাবিক বহু ত্রুটিযুক্ত উপন্যাস রচনা। সেখানেই উপন্যাসের জিত। সেখানেই সাহিত্যের জয়।

একজন সৎ ও সংবেদনশীল আলোচকের কাজ শিবিরবাসী না হয়ে সাহিত্যের প্রতি অনুগত থেকে একজন মেধাবী পড়ুয়ার মতো তাঁর পাঠ-অনুভূতি পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। যেখানে সেতুর অন্য পারে দাঁড়িয়ে আছেন পাঠক একটি সৎ ও উদ্যমী উপন্যাসের পাঠপ্রতীক্ষায়।

 

[আবার আগামী সংখ্যায়]


[1] শনিবারের চিঠি। আশ্বিন ১৩৩৬ বঙ্গাব্দ। সংবাদ–সাহিত্য বিভাগ।
[2] মজুমদার, সন্দীপন। ‘বিন্দুবিসর্গ: বর্ণযুদ্ধের মহড়া এবং কিছু নান্দনিক প্রশ্ন’। ছাপাখানার গলি: উপন্যাস আলোচনা সংখ্যা। জুলাই ২০১৭। সম্পাদক: সাহা, দেবশিস। পৃষ্ঠা ৮৯।
[3] পূর্বোক্ত।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...