Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

যে দ্রোহ দ্রোহের অধিক

প্রতিভা সরকার

 

হুল দিবসের নিমন্ত্রণ নিয়ে পুরুলিয়ার ভালাডুংরি থেকে হুল মাহার চিঠি এল। সে চিঠির ভাষা খুব ব্যকরণশুদ্ধ না হলেও যেমন স্বতঃস্ফূর্ত, তেমনি জোরালো— “এই দিনেই ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে, তাদের নির্যাতন এবং জ্বালাতনের হাত থেকে মান, ইজ্জত ও হাসা রক্ষার জন্য ১৮৫৫ সালে ৩০শে জুন আমাদের বীর শহীদ সিদো ও কানহো মুর্মুর নেতৃত্বে ভারতের স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন…।”

হুল অর্থ বিদ্রোহ, কিন্তু হাসা কথাটি অপরিচিত। নরেন হাঁসদাকে জিজ্ঞাসা করতে সিদো কানহো মিশনের প্রধান জানালেন হাসা মানে মাটি। সাঁওতাল বিদ্রোহ ছিল ইজ্জত রক্ষার সঙ্গে জল জঙ্গল জমির লড়াই। ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে এ দেশের আদিবাসীদের প্রথম অধিকার এবং সম্মান রক্ষার লড়াই। সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রথম কৃষক বিদ্রোহ। অনেক দিক দিয়েই ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সঙ্গে তুলনীয়। তবু প্রায় বিস্মৃত এবং অনালোচিত।

মূল বিষয়ে যাবার আগে সিদো কানহো মিশন একটু ঘুরে আসি। কারণ বীর, স্বাধীনতাকামী সাঁওতালদের বর্তমান অবস্থা কেমন তার সম্যক পরিচয় পেতে হলে গ্রামগঞ্জ ঘুরে আসা ভাল। স্কুলটি নরেন হাঁসদার স্কুল বলে পুরুলিয়ায় পরিচিত। ঝুমুর গান বাঁধেন নরেন এবং সেই গান গেয়ে বেড়ান। তাতে যা টাকা আসে মিশনের খরচ মূলত তাতেই চলে। আর আছে শুভানুধ্যায়ীদের অল্পস্বল্প দান। এই ভরসাতেই চলে প্রায় পঞ্চাশটি অনাথ শিশুর শিক্ষা, ভরণপোষণ। সরকারি কোনও সাহায্য নেই। পুরুলিয়ার মতো খরাপ্রবণ এলাকায় একটিমাত্র চাপাকল নষ্ট হয়ে গেলে বাচ্চাদের নিয়ে খুব বিপদে পড়েছিলেন নরেন। এমনকি আশেপাশের আরও দু চারটি গ্রামের মানুষও এই কল থেকেই জল নিতেন। সেই প্রবল গ্রীষ্মেও জলের কোনও ব্যবস্থা হত না, যদি না পুরুলিয়ার এক সহৃদয় মানুষ অর্থসাহায্য করতেন। ভালাডুংরি পাহাড় আগুন ঝড়াচ্ছে, এইরকম এক দিনেই সিদো কানহো মিশনে অনেকক্ষণ বসে থাকি আমি আর গফফর আনসারি। চারটে ভাষা শিখছে শিশুরা— বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ও সাঁওতালি, সঙ্গে লেখ্য অলচিকি। সুরেন বা পানমতীর মতো কিছু শিক্ষিত সাঁওতাল তরুণ তরুণী বাচ্চাদের সঙ্গে থাকে ও শিক্ষা দেয়। প্রবল আত্মসম্মান এবং বিনয়ের সঙ্গে তারা আমার যৎসামান্য দান প্রত্যাখ্যান করে। নরেন হাঁসদার অনুমতি ছাড়া তারা অতি কষ্টেও কোনও দান গ্রহণ করবে না। ঝড়ে ছাদ উড়ে যেতে মোটা শুকনো লাউডগার আস্তরণ ছাদ হয়েছে উঠোনের এক উত্থিত অংশের। বাচ্চারা ওটাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্টেজ হিসেবে ব্যবহার করে। ওরাই হৈ হৈ করে একটি লাউ ঝোলায় ঘরের দাওয়ায়, বীজ সংরক্ষণের কারণে। বনস্থলীর স্বয়ং অধীত বিদ্যা। খড়পোড়া আর গোবরের মিশেলে লেপে দেওয়া লম্বা বারান্দা, একটুও ছোপ ওঠে না। সিমেন্টের মতো শক্ত। চলে আসবার সময় সবাই হাত জোড় করে বলে জোহার— নমস্কার।

ধান ভানতে শিবের গীত মনে হলে হতে পারে। তবে একথার অনেক প্রমাণ আছে যে এ দেশে বনজঙ্গল কেটে কৃষিকাজ শুরু করবার হোতা হচ্ছে সাঁওতালরা। স্বাধীন, স্বয়ংসম্পূর্ণ আদিবাসী জীবন। গহন অরণ্য সাফাই করে বসতি। কোনও কারণে সে বসতি গুটিয়ে ফেলতে হলে নতুন জমি হাসিল। যেমন পরবর্তীতে মুন্ডাদের খুটকাট্টি গ্রাম। পুরনো গ্রাম কোনও কারণে বসবাসের অযোগ্য হলে গড়ে উঠত নতুন খুটকাট্টি গ্রাম। গ্রামপ্রধানের কুঠারে কোপ দেওয়া গাছের গুঁড়ির নিশানা বরাবর যাবে সেই নতুন গ্রামের সীমানা। যতদূর নতুন জমি হাসিল করা সম্ভব ততদূরই ছড়াবে নতুন গ্রাম। কোনও অনুমতির তোয়াক্কা নেই, কোনও শক্তিমানের দাক্ষিণ্য বা টাকার খেলা, ট্যাক্স, দলিলদস্তাবেজ, আদালতের চক্কর, কিছুই না। প্রবল প্রতাপী মুঘলরাও তাদের জমানায় ভূমিপুত্রদের এই সহজাত অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। অরণ্য যে সাফ করে জমি হাসিল করবে জমির মালিকানা হবে তারই। কিন্তু কৃষিভিত্তিক সমাজজীবনের এই সহজ ধারা ব্রিটিশ ভারতে প্রবল জটিলতার আবর্তে খেই হারিয়ে ফেলে।

ইংরেজদের মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতিই সবচেয়ে বড় জটিলতা। সাঁওতালরা অভ্যস্ত ছিল বিনিময়প্রথায়। বনজ সম্পদের দেওয়া নেওয়া, বড়জোর পশুপাখির হাত বদলানোতেই তাদের জাগতিক চাহিদা মিটে যেত। ইংরেজরা আমদানি করল মুদ্রা। আর সেই মুদ্রাব্যবস্থার ওপর ভর করে গজিয়ে উঠল এক বিপুল ক্ষমতাধর শ্রেণি— সুদখোর মহাজন। অত্যচারী জমিদারের প্রাণের দোসর। ইংরেজ-প্রচলিত মুদ্রার জন্য এদের কাছে হাত না পেতে উপায় ছিল না। সেই সুযোগে চড়া সুদের আড়ালে চলতে লাগল অবাধ শোষণ। একজন সাঁওতালকে তার ঋণের জন্য জমির ফসল, চাষের বলদ, নিজের ও পরিবারের স্বাধীনতা হারাতে হত প্রায়ই, কিন্তু সেই ঋণের দশগুণ পরিশোধ করলেও তার ঋণের বোঝা যেমন ছিল তেমনই থেকে যেত। ঋণের শর্ত হিসেবে দাসত্বের বন্ড লিখিয়ে নেওয়া হত আকছার।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তও অত্যাচারী জমিদারের হাতে তুলে দিয়েছিল আদিবাসীর প্রাণভোমরা। জমিদাররা মহাজনকে ইজারা দিত সাঁওতালের জমি। বিন্দুমাত্র বিরোধিতায় তাদের শস্য নষ্ট করতে জমিতে নামিয়ে দেওয়া হত গরু, গাধা, ঘোড়া, এমনকি হাতি পর্যন্ত। ১৮৫৬ সালের ক্যালকাটা রিভিউয়ের পাতার পর পাতা এইসব সাক্ষ্য দেয়। আর এই অবাধ লুণ্ঠনে যোগ্য সঙ্গত করত পুলিস, পাইক, পেয়াদা, প্রশাসন। জমিদার মহাজন নির্ভর ঔপনিবেশিক শাসনই ছিল সাঁওতালদের দুর্দশার মূল।

ফলে বৃটিশ সাম্রাজ্যের সবচেয়ে শান্ত প্রদেশ সাঁওতাল পরগণায় বিদ্রোহের আগুন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল ১৮৫৫ সালের গোড়ার দিকেই।

সাঁওতাল বিদ্রোহে সাঁওতাল একা ছিল না। বীরভূম, মুর্শিদাবাদ ও অন্যান্য জেলা থেকে এবং বিহারের ভাগলপুর ও ছোটনাগপুর এলাকা থেকে গরীব শ্রমজীবী মানুষের সক্রিয় সমর্থন পেয়েছিল এই বিদ্রোহ। সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে জাতধর্ম নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের এই অভূতপূর্ব জোট এই বিদ্রোহের একটি মাইলস্টোন। বিদ্রোহী সাঁওতালদের কলকাতা অভিযান নিয়ে ১৮৫৫ সালের ২৮শে জুলাই ভাগলপুরের কমিশনার ওপরওয়ালাকে পরিষ্কার লেখেন, গোয়ালা তেলি ও এই ধরনের শ্রেণিগুলি সাঁওতালদের উস্কাচ্ছে, সন্ত্রাসমূলক কাজে উৎসাহ দিচ্ছে, প্রয়োজন হলে ড্রাম বাজিয়ে তাদের সাবধান করে দিচ্ছে। কর্মকার ও লোহাররা তীরের ফলা ও তরবারি তৈরি করে দিচ্ছে।

এই কারণেই সাঁওতাল বিদ্রোহের শ্রেণিচরিত্র ভারতের সমস্ত বিদ্রোহের থেকে আলাদা, যেখানে খেটে খাওয়া মানুষ একযোগে শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামে সামিল হয়েছিল অন্য সুবিধাভোগী শ্রেণির সহানুভূতি বা যোগদানের কোনও তোয়াক্কা না রেখেই। এমনকি ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহেও শ্রেণিসংগ্রাম এত নিবিড় হয়ে দেখা দেয়নি। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি, এমনকি কৃষকের সহজাত শত্রু সামন্ততান্ত্রিক শক্তিগুলোও নিজেদের স্বার্থে বিদ্রোহে যোগ দেয় এবং সুকৌশলে নেতৃত্ব হাতিয়ে নেয়। এইভাবে গণবিদ্রোহের আঘাত থেকে সেসময় সামন্ততন্ত্র নিজেদের রক্ষা করতে সমর্থ হয়। কিন্তু কর্মকার, তেলি, চামার, ডোম, মোমিন এবং গরীব মুসলমানের সঙ্গে সাঁওতালের একযোগে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যই ছিল বৈদেশিক শাসন ও দেশীয় সামন্ততন্ত্রের শোষণের মূলোৎপাটন।

বিদ্রোহের আর একটি চালিকাশক্তি হচ্ছে সাঁওতালদের গভীর স্বাধীনতাস্পৃহা। যে সুদূর অতীতে দৃষ্টিসীমার মধ্যেকার সমস্ত বনভূমির একচ্ছত্র সম্রাট ছিল তারা, মাথার ওপর ছিল না তাদের আত্মগরিমাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবার মতো কোনও উৎপীড়ক, সেই অতীতে ফেরার জন্য উন্মুখ সাঁওতাল জোট বাঁধল সিদো, কানহো, চাঁদ ও ভৈরবের নেতৃত্বে। গ্রামে গ্রামে নতুন শালশাখা হাতে ছড়িয়ে পড়ল বিদ্রোহের কৃষ্ণদূতেরা, থেকে থেকে পর্বতে কন্দরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল মাদল ধামসার রহস্যময় বোল। হুল আসন্ন। প্রত্যেক সাঁওতালের অংশগ্রহণ অবধারিত এবং দৈবনির্ধারিত।

৩০শে জুন, ১৮৫৫। সিদো কানহোর গ্রাম ভাগনাদিহিতে চারশ গ্রাম থেকে প্রায় দশহাজার সাঁওতাল হাজির। স্বয়ং ঈশ্বরের (ঠাকুর) বরপুত্র সিদো সবিস্তারে সভায় তাঁর স্বপ্নাদেশ ব্যাখ্যা করেন। ঔপনিবেশিক শাসকের প্রতিভূ ভাগলপুরের কমিশনার, বীরভূমের কালেক্টর, ম্যাজিস্ট্রেট, দিঘী ও টিকরি থানার অত্যাচারী দারোগা এবং কয়েকজন জমিদারের কাছে এই সমাবেশ থেকে বিস্তারিত দাবীসনদ পাঠানো হয় এবং পনেরদিনের মধ্যে উত্তর দাবী করা হয়। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার তার এনালস অব রুরাল বেঙ্গলে জানাচ্ছেন এই সমাবেশ থেকেই কলকাতা অভিযান শুরু হয়। কাতারে কাতারে সাঁওতাল সামিল হয় পায়ে হাঁটা মিছিলে, যাত্রা শুরু করে অত্যাচারীদের ঘাঁটি কলকাতা অভিমুখে। যাত্রাপথে পাঁচ কুখ্যাত বাঙালি মহাজনকে হত্যার ঘটনায় অত্যাচারীদের কাছে চরম বার্তা যায়। বিদ্রোহে  যোগদানকারীদের সংখ্যা প্রত্যেকদিন স্ফীততর হয়ে উঠতে থাকে। এই মিছিলই ছিল স্বাধীনতার দাবী নিয়ে ভারতবর্ষের প্রথম গণ পদযাত্রা।

বিদ্রোহ দ্রুত দমন করবার আয়োজনে কোনও ত্রুটি ছিল না। মেজর বারোজের অধিনায়কত্বে ঘোড়া এবং হাতিতে সুসজ্জিত এক বিশাল সৈন্যবাহিনী ভাগলপুরের কাছে পীরপাঁইতির ময়দানে সাঁওতালদের মুখোমুখি হয়। পাঁচ ঘণ্টা যুদ্ধের পর ইংরেজ বাহিনী পরাজিত হয়। চূড়ান্ত বিপর্যয়ের আগেই বারোজের কাছে খবর পৌঁছে যায় যে কৃষক-শোষণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র পাকুর রাজবাড়ি এবং অম্বর পরগণার জমিদারের কাছারিবাড়ি বিদ্রোহীরা লুঠ করেছে। এইভাবে সাঁওতাল বিদ্রোহের আঘাতে বিহারের একটি অংশে এবং বীরভূম, বাঁকুড়া ও মুর্শিদাবাদের অনেক জায়গায় ইংরেজ শাসন অচল হয়ে পড়ে। আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে ভারতের ইংরেজ শাসক ও তার ধামাধরা মহাজন ও জমিদার শোষকগোষ্ঠী সমস্ত ধনবল এবং জনবল একত্রিত করে সর্বাত্মক আক্রমণ শানায়। হান্টার সাহেব সাক্ষ্য দিয়েছেন যে নীলকর সাহেবরা প্রচুর অর্থ দিলে, জমিদার ও মহাজনেরা দিয়েছে অস্ত্র, রসদ, ব্যবস্থা করেছে বাহিনীর রাত্রিবাস ও বিশ্রামের। অন্য মারণাস্ত্রের সঙ্গে এবার যুক্ত হল প্রচুর কামান। বারোজ সাঁওতাল পরগণার প্রচুর গ্রাম মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিলে বহু নিরপরাধ সাঁওতাল নারী ও শিশু নিহত হয়। বহু কুটির আগুনের খাদ্য হয়। শুরুতে কামানের মুখে এঁটে উঠতে না পেরে বিদ্রোহীরা জঙ্গলে পালিয়ে যায়। কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয়ে যায় গেরিলা কায়দায় চোরাগোপ্তা আক্রমণ, গ্রাম শহর লুণ্ঠন এবং রাজকর্মচারী খতম। ডাক চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শিগগিরই ভয়ঙ্কর ত্রাসের সৃষ্টি হয় এবং  বীরভূমের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিদ্রোহীরা অধিকার করে নেয়। এর মধ্যেও সাঁওতালরা, হান্টার সাহেব লেখেন, বীরধর্মের পরিচয় দিতে ভোলেনি। কোনও শহর বা গ্রাম লুঠ করার আগে তারা অধিবাসীদের সতর্কবার্তা দিত। অন্তত প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে তারা যেন স্থানত্যাগ করে। অকারণ নরহত্যায় বিদ্রোহীদের আগ্রহ ছিল না। ১৮৫৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এইরকম সতর্কবার্তায় জেলাসদর সিউড়ি শহরেও দারুণ আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল।

মরিয়া শাসক এইবার সামরিক আইন প্রয়োগ করে। মানবাধিকারের লেশমাত্র বর্জিত এই আইনের বলে বলীয়ান  শাসক জানিয়ে দেয় যে উপদ্রুত অঞ্চলে যার হাতে অস্ত্র দেখা যাবে তাকেই গ্রেপ্তার করে সামরিক আইনে তার বিচার হবে এবং অতি দ্রুত তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। এই আইন জারি হওয়ামাত্র পনের হাজারের বেশি সৈন্য বন্যাস্রোতের মতো বীরভূম ও সাঁওতাল পরগণার সাধারণ মানুষের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার ও তাণ্ডব শুরু করে। বিদ্রোহীদের পিছু না হটে কোনও উপায় ছিল না। তবু বীরনেতা সিদোর নির্দেশে তারা ছোট ছোট দলে উন্মত্ত সৈন্যবাহিনীর মোকাবিলা করছিল, কিন্তু এক বিশ্বাসঘাতক তাঁর গোপন ডেরার খবর ইংরেজের কানে পৌঁছে দিলে সিদোকে ধরামাত্র গুলি করে হত্যা করা হয়। চাঁদ ও ভৈরব আগেই শহিদ হয়েছিলেন, এবার একদল সশস্ত্র পুলিশ বীরভূমের ওপারবাঁধের ওপর কানহোকে গুলি করে মারে। নেতাদের বিহনে সাঁওতালরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং বিদ্রোহের আগুন নিভে আসে।

হাজার হাজার সাঁওতালকে হত্যা করা হয়। তারা মৃত্যুকে অধীনতার চেয়ে বরণীয় জানত। ৬০,০০০ বিদ্রোহীর মধ্যে ১৫,০০০ বা তারও বেশি মানুষ খুন হয়। হান্টার সাহেব বহু সৈনিকের সাক্ষ্য একত্রিত করে এই গণহত্যার একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে গেছেন। তা থেকে জানতে পারা যায় সাঁওতালরা বিষতীর ব্যবহার করেছে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। সাঁওতাল বিষমাখা তীর ছোঁড়ে হিংস্র পশুকে, মানুষকে নয়। এমনকি সে মানুষ শত্রু হলেও নয়। বরং অন্যায় একপেশে যুদ্ধে শত্রুর গোলাগুলির সামনেও পালিয়ে যাবার চিন্তা তারা করেনি। যতক্ষণ ধামসা মাদল বেজেছে ততক্ষণ তীর বা কুঠার ছুঁড়েছে। আওয়াজ থেমে গেলে কিছুদূর গিয়ে অপেক্ষা করেছে। আবার রণবাদ্যের প্রথম বোলের সঙ্গে সঙ্গেই শত্রুর দিকে এগিয়ে আসতে গিয়ে গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়েছে। নির্ভীক অথচ অসহায় এই মৃত্যু অনেক শত্রুসৈন্যকেও বিচলিত করেছিল।

প্রায় এক বছর ধরে চলা সাঁওতাল বিদ্রোহ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রদূত, এইরকমই দাবী অধিকাংশ ঐতিহাসিকের। ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তিমূলকে কাঁপিয়ে দেওয়া এই ‘হুল মাহা’ ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পথ প্রশস্ত করেছিল। জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকের বিদ্রোহ অপরিচিত নয়, কিন্তু জমিদারের কুকীর্তির অংশীদার অত্যাচারী মহাজনদের ওপর কৃষকের প্রচণ্ড আঘাত এই বিদ্রোহেই প্রথম দেখা যায়। এ কথা ঠিক যে হাজার হাজার মানুষের এই আত্মবলিদান সেদিন রক্তের স্রোতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এতদিন পরেও পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকায় বিদ্রোহীরা যেন অমরত্ব লাভ করে ঐতিহাসিক চর্চায় ফিরে আসবার দাবী জানাচ্ছেন। আজও কৃষকের জমির দাবী, মহাজন এবং কর্পোরেটের ঋণ মকুবের এবং উৎপীড়ন থেকে বাঁচবার দাবী কিছুই পূর্ণ হয়নি। অরণ্যবাসীর অরণ্যের ওপর অধিকারকে সঙ্কুচিত করবার যে প্রচেষ্টা চলছে তা কার্যকর হলে কত মানুষের জীবন যে তছনছ হয়ে যাবে তার সঠিক হিসেব নেই। এইসব দাবী এখন সাঁওতাল বিদ্রোহের গণ্ডি ছাড়িয়ে সর্বজনীনতা লাভ করেছে। এগুলো এখন ভারতের যে কোনও উপজাতীয় কৃষকের এবং সমস্ত কৃষক সমাজের সাধারণ দাবী। তাই কিছুদিন আগে আয়োজিত দীর্ঘ কৃষক পদযাত্রাকে সাঁওতাল বিদ্রোহের ঐতিহ্যবাহী বললে ভুল হবে না।

কিন্তু প্রশ্ন তো থেকেই যায়। সাঁওতাল বিদ্রোহ যে আগ্রাসন যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, স্বাধীন ভারতে সেই আগ্রাসনের কোনও সুরাহা এতদিন পরেও করা গেল না কেন! আদিবাসী ভূমিপুত্রের প্রতিবাদকে আমরা অনায়াসে ভুলে থেকেছি আর তাদের সংগ্রামকে জাতীয় ইতিহাসে একধরনের কাগুজে মর্যাদা দিয়েছি মাত্র। ব্রিটিশরাজের প্রথম ১২৫ বছরের মধ্যে হওয়া যে কোনও সশস্ত্র সংগ্রামকে শুধুমাত্র মূল ধারার স্বাধীনতা সংগ্রামের পূর্বসূরি হিসেবে দেখানো এক ধরনের দ্বিচারিতা বলে মনে হতে পারে। কারণ আত্মশাসনের অধিকারের প্রশ্নে কী হল সে কথা আর কেউ তোলে না, শুধু বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পথ তৈরির কারণে এক ধরনের আলগা পিঠ চাপড়ানিই যেন এদের ন্যায্য পাওনা, এই আত্মসন্তুষ্টিতে ডুবে থাকে আমাদের পরবর্তী ইতিহাসচর্চা। আর বিশাল দেশে নির্বিবাদে চলতে থাকে বেআইনি মানুষ পাচার, বেঠবেগারি প্রথা, বান্ধুয়া শ্রমিক ও শিশুশ্রমের লজ্জাকর কাহিনী। অরণ্য ধ্বংস করে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদ উন্নয়নের রূপকথার প্রধান চালিকাশক্তি।

সিদো কানহোর মূর্তি স্থাপন করে রাজনৈতিক বক্তৃতাবাজিই শেষ কথা নয়। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের চমৎকার বীরত্বপূর্ণ কাহিনীগুলির একটি হয়ে থাকাই ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের ভবিতব্য নয়। বরং যে কারণের জন্য সিদো কানহোর লড়াই সেগুলোকে মনে করিয়ে দেওয়া এবং এখনও কেন সেই ন্যায্য অর্জন অধরা রয়ে গেল তার চুলচেরা বিশ্লেষণ এখন সময়ের দাবী।