Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

মৃত পাখিদের গান — ১২শ পর্ব

অবিন সেন

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

সতেরো

দুটো গলি আর তিনটে মোড় পার হয়ে এলে এদিকটা শান্ত কোলাহলহীন। রুবি দ্রুত পায়ে হাঁটছিল। বিকেল পেরিয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে। রাস্তার রাস্তায় ল্যাম্প পোস্টের আলো, ছোটখাটো চা-সিগারেটের দোকান থেকে যেটুকু ম্রিয়মাণ আলো এসে রাস্তায় পড়েছে তাতে দু-হাত সামনের মানুষকেও ভালো করে চেনা যায় না। এদিকে আবার মাসখানেক হল রাস্তার বাতিটি খারাপ হয়ে আছে। ফলে গুঁড়ো গুঁড়ো অন্ধকার চারপাশে থম মেরে আছে। দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে রুবি পিছনে ফিরে তাকায়, একবার নয় বারবার। তার যেন কেবলই মনে হয়ে কেউ তার পিছনে আছে, নীরবে অনুসরণ করছে তাকে। রুচিরা দিদি তাকে একবার এমনটাই বলেছিল রেখাদির ব্যাপারে। রেখাদিদিকেও এমনি কেউ অনুসরণ করত।

রুবির বেশ ভয় ভয় করে আজকাল। মাসদুয়েক সে এখানে আসছে। কিন্তু এমনটা আগে বোধ হত না। এই ভয় ভয় ভাবটা তার আগে ছিল না। কিন্তু যবে থেকে রাস্তার আলোটা খারাপ হয়েছে তবে থেকেই আর এমনটা মনে হওয়া শুরু হয়েছে। তার আবার মনে হয়, তিনটে মোড়ের তিনটে আলো কীভাবে এক সঙ্গে খারাপ হয়ে গেল! এমনটা কি হয়? আবার একটু একটু করে বিন্দু বিন্দু ভয় তার বুকের ভিতরে পুঞ্জীভূত হতে থাকে। রেখাদির খুন হবার পরে তার ভয়টা কি একটু বেশি বেড়েছে? এমনটা কি তার মনের ভুল? সে যেন আর ভেবে উঠতে পারে না। সে দ্রুত পা চালায়।

এই কাজের ঠিকানাটা তাকে হ্যামিলটন দিয়েছিল। হ্যামিলটন মাঝে মাঝে স্টুডিও পাড়ায় আসে। সে কী কাজ করে রুবি জানে না। এক নতুন ছোকরা ডিরেক্টর একটা অফিস খুলেছে স্টুডিওপাড়ায়। তার ওখানে একবার খাবার দিতে গিয়ে হ্যামিলটনের সঙ্গে তার পরিচয়। হ্যামিলটনের চেহারাটা অদ্ভুত। ভীষণ ঢ্যাঙা পাতলা ছিপছিপে চেহারা। কাঁধ পর্যন্ত লালচে চুল। মুখময় অপরিচ্ছন্ন দাড়ি গোঁফের জঙ্গল। কেমন তেলচিটে মারা ময়লা চেহারা। কম কথা বলে। গলার স্বর যেন বসে যাওয়া টেপ-রেকর্ডারের মতো। রুবির শুনলেই হাসি পায়। ছোঁড়াটাকে দেখলেই কেমন ‘গে’ বলে মনে হয় তার। কিন্তু তার চোখদুটোর দৃষ্টি যেমন তীব্র তেমনি ধারালো আর গভীর। চোখে চোখ রাখলে যেন বুকের ভিতরে একটা থমথমে ভাব খেলে যায়। মনে হয় যেন এক গভীর অন্ধকারের ভিতর থেকে তার চোখের দৃষ্টি উঠে আসছে। পরিচয়ের কয়েকদিন পরেই ছোঁড়াটা তার পিছনে ঘুরতে শুরু করে। হতচ্ছাড়াটাই একদিন তাকে এই কাজের সন্ধানটা দিয়েছে।

প্রথম দিন সে হ্যামিলটনের সঙ্গেই এসেছিল এখানে। এই জায়গাটা কেমন যেন অদ্ভুত। কালীঘাটের বেশ্যাপল্লিটা তার পুরো চষা। অথচ এদিকে সে কখনও আসেনি। আশেপাশের ছোট ছোট বাড়ি, কেমন যেন একটা অন্ধকার চাদরে মোড়া বলে মনে হয়। অথচ সে এখানে রাতেই আসে। আবার ভোরবেলা চলে যায়। ফলে অন্ধকারটা যেন বিশেষভাবে প্রকট তার কাছে। তবে চারপাশে তাকালে কেমন ধারা মনে হয় তার, দিনের বেলাতেও এদিকে আলোর এমনি অপ্রাচুর্য।

প্রথম দিনই রুবি বলেছিল,

জায়গাটা যেন কেমন কেমন?

হ্যামিলটন কিছু বলেনি। শুধু হেসেছিল।

রুবি ভেবেছিল হ্যামিলটনকে বুঝি তার শরীর দিতে হবে। কিন্তু ছোঁড়াটা অদ্ভুত। রুবিকে নগ্ন করে হাত পা বেঁধে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে সে তার পাশে বসেছিল। রুবির তো বেশ ভয় ভয় লাগছিল। ‘কী করবে রে বাবা’। কিন্তু হ্যামিলটন কিচ্ছুটি করেনি, এমনি করে ঠায় বসেছিল। শুয়ে থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল রুবির তা খেয়াল ছিল না। ভোরবেলা হ্যামিলটন তাকে ঠেলে জাগিয়ে দিয়েছিল। জেগে উঠে আধো অন্ধকারে দেখেছিল হ্যামিলটনের চোখদুটো যেন আশ্চর্যভাবে জ্বলজ্বল করছে।

রুবিকে এখানে সপ্তাহে দু দিন আসতে হয়। একাই। একটা একতলা সাদা বাড়ি। দুটো ছোট ছোট ঘর। বাথরুম একটা। রান্নার ঘরটা খুব ছোট। কিন্তু ঘরগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। কে পরিষ্কার করে রুবি জানে না। এই ঘরে আর কেউ থাকে কিনা সেটাও সে জানে না। সে আর কাউকে এখানে দ্যাখেনি। রুবির কাছে চাবি থাকে। ঘর খুলে পরিপাটি হয়ে টিপিক্যাল বাঙালি গৃহবধূর মতো লাল পাড় সাদা শাড়ি পরে তেলচুকচুকে চুলে এলো খোঁপা বেঁধে বসে থাকতে হয়। কপালে থাকে সিঁদুরের লাল টিপ, সিঁথিতে সিঁদুর, হাতে শাঁখা পলা। তাকে গৃহবধূর রোল প্লে করতে হয়। প্রতিদিন একজন ক্লায়েন্ট আসে রাত ঠিক আটটা নাগাদ। তারা অবাঙালি অথবা বিদেশি। রুবিকে তাদের স্যাটিসফাই করতে হয়। যাবার সময় তারা একটা করে প্যাকেট দিয়ে যায় তাকে। সিল করা ছোট কিন্তু ভারি। কোনও কোনও দিন ভালো বখশিশ পায় সে। সেই প্যাকেটটা কোনওভাবে লুকিয়ে স্টুডিওপাড়ায় হ্যামিলটনকে দিয়ে দিতে হয়। হ্যামিলটন তাকে মোটা টাকা দেয়। রুবি বুঝতে পারে, ভিতরে ভিতরে গর্হিত কিছু পাচারের কাজ চলছে। কিন্তু জিনিসটা যে কী তা রুবি জানে না। সে জানতেও চায় না। তার টাকার দরকার।

রুবি আবার পিছনে ফিরে তাকায়। একটা ছায়া কি ঝট করে গলির পাশে ঢুকে পড়ল। নাকি তার দৃষ্টিবিভ্রম? রুবি আর কিছু বুঝতে চায় না, জানতে চায় না। সে দ্রুত পায়ে সামনের ছোট গলিপথ টুকু পেরিয়ে যেতে চায়। কিন্তু এইটুকু পথই যেন তার একশো মাইল লাগছে। একশো মাইল এমনি পথ, যে পথে কোনও আলো নেই, বাতাস নেই। শুধু এক শ্বাসরোধী ছায়া ক্রমাগত তার পাশে পাশে এসে দাড়ায়, তাকে ঘিরে ধরতে চায়! একটা ছায়ার হাত কি তার কাঁধে হাত রাখল? রুবি চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকায়। তার বুকের ভিতরে হৃদপিণ্ডটার ধুক পুক যেন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পিছন ফিরে তাকাতে কি সে স্বস্তি পায়? ছায়াটা কি তার চেনা?

রুবি চিনতে পারে, দুটো জ্বলজ্বলে চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। আর হ্যামিলটনের লম্বা হাতখানা তার কাঁধে। হ্যামিলটনকে সে এখানে আশা করেনি। সেই প্রথম দিন হ্যামিলটন এখানে এসেছিল। আর কখনও সে আসেনি।

হ্যামিলটন কোনও কথা না বলে এইটুকু পথ পেরিয়ে দ্রুত বাড়িটার সামনে পৌঁছে গেল। ঘরে ঢুকে রুবি প্রথম কথা বলল,

যা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তুমি আমাকে এমন ভয় পাইয়ে দাও না!

হ্যামিলটন মৃদু ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল,

আমি তো তোমাকে সাহস দিতে এলাম।
তাই?

রুবি চোখের কোণে কোণে হাসে।

হ্যাঁ। শুনলাম অন্ধকারে আসতে তুমি ভয় পেয়েছ।
কার কাছে শুনলে? কী করে জানলে?

রুবি যেন অবাক হয়ে যায়। সে কাউকে তার এই ভয় পাবার কথা বলেছে কিনা মনে করতে পারে না। সে বুঝতে পারছে না, হ্যামিলটন কী করে এমনটা জানল!

হ্যামিলটন তার কথার কোনও উত্তর দিল না। সে গিয়ে একটা চেয়ারে বসল।

রুবি বলল,

তুমি কি আজ থাকবে?

হ্যামিলটন ঘাড় নাড়ল।

রুবি যেন তার ঘাড় নাড়াটা ভালো বুঝতে পারেনি। সে আবার বলল,

আজ কেউ আসবে না?

হ্যামিলটন তার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকায়। তার চোখ দুটো যেন ম্রিয়মাণ হয়ে গিয়েছে বলে রুবির ভ্রম হয়। কাঙালের মতো গলায় বলে,

আজ কি আমায় ভালোবাসবে রুবি?

হ্যামিলটনের এমন গলার স্বর যেন সে কখনও শোনেনি। এমন কাঙালপনা। রুবির যেন কেমন সব গোলমাল হয়ে যায়। সে ঠিক করে রেখেছে কখনও কারও কাছে সে দুর্বল হবে না।

সে আবার বলল,

রুবি, আমায় একটু ভালোবাসো?

সেই গলায় কী এক হাহাকার! যেন এক গভীর অন্ধকারের ভিতর থেকে উঠে এসে বাতাসে অনুরণিত হচ্ছে ক্রমাগত।

রুবির মাথার ভিতরটা কেমন হয়ে যাচ্ছে। তাকে যেন ভূতে পেয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। সে তবু শক্ত করতে চেষ্টা করে নিজেক। নিরাসক্ত গলায় বলে,

আজ কোন সাজে সাজতে হবে?
কোনও সাজ নয় রুবি। শুধু তুমি। তুমি এসে দাঁড়াও। আমি বড় ক্লান্ত।

রুবি বুঝতে পারছে। তার সব অর্গল ভেঙে যাচ্ছে ক্রমশ।

 

আঠারো

বান্টি নামে একটা ছেলেকে থানায় ডাকিয়ে এনেছিল প্রবীর। বান্টি ছোটখাটো অপরাধী। এটা তার সেকেন্ডারি পেশা। তার আসল ব্যবসা মাগীর দালালি কালীঘাট এলাকায়। রবীন্দ্র সরোবরের ভবানী সিনেমার পিছনে একটা জুয়ার ঠেকেও তাকে পাওয়া যায়। প্রবীরের লোক তাকে সেখান থেকেই তুলে নিয়ে এসেছে। কালীঘাট রেড-লাইট এলাকার খুঁটিনাটি তার নখদর্পণে।

কাচের গ্লাসে চায়ের কাপটা এগিয়ে দিয়ে প্রবীর বলল,

তা তোমার কাজকারবার সব ঠিকঠাক?

বান্টি চায়ে চুমুক দিয়ে বলল,

কোথায় আর স্যার? আপনারা এত হুজ্জত করছেন আজকাল, কিছুই ঠিকঠাক চলছে না।

প্রবীর আর এইসবের মধ্যে গেল না, সে সরাসরি প্রসঙ্গে চলে গেল,

বছর দেড়েক আগে কালীঘাটের বেশ্যাপাড়ায় একটা ব্রুটালি মার্ডার হয়। অরুণ কর! মনে আছে?

বান্টি একটু ভাবল। চায়ে পর পর চুমুক দিয়ে চা-টা শেষ করল। বলল,

তা আর মনে নেই! কী যে শালা বাজে ব্যাপার। আমার ব্যবসার ক্ষতি হয়েছিল খুব। অরুণদা ভালো পেমেন্ট করত। কিন্তু সে কেস তো স্যার অনেক দিনের পুরানো। কবেই সব চুকেবুকে গেছে। এখন আবার এটা নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করছেন!
কিছুই কেস মেটেনি। জানো তো, খুনি এখনও ধরা পড়েনি। সেই সঙ্গে অরুণ করের বউ মানে অঞ্জলিরও কোনও পাত্তা পাওয়া যায়নি আজও। তুমি এর কতটুকু জানো বলো তো? সেই সময়ে তো তোমাকে জেরা করা হয়েছিল, কিন্তু তোমার পেট থেকে কোনও কথা বের হয়নি। এবার একটু ঝেড়ে কাশো তো দেখি!

বান্টি মাথা নিচু করে হাত ঘষছিল। কিছুক্ষণ এমনি ঘষতে থাকল। তারপরে বলল,

সত্যি, এব্যাপারে কিছু জানি না স্যার। অরুণদার সঙ্গে তো আমাদের দোস্তি ছিল। তার খুনি ধরা পড়ুক আমরাও চাইছিলাম। কিন্তু স্যার বিশ্বাস করুন এই ব্যাপারে আমরা একেবারে অন্ধকারে।
কিন্তু আর তো অন্ধকারে থাকলে হবে না। এবার খবরাখবর দিতে হবে। খবর যদি তোমার কাছে না থাকে তা হলে খবর নিয়ে দিতে হবে।

প্রবীরের গলাটা দারুণ গম্ভীর শোনাল।

কিন্তু আমি স্যার আর কোথায় খবর পাব?

প্রবীর টেবিলের সামনের দিকে ঝুঁকে বান্টির চোখে চোখ রেখে তাকাল। কঠোর গলায় বলল,

দ্যাখো বান্টি, খবর আমার চাই। যেখান থেকে পারো, পাতালে ঢুকে হলেও খবর জোগাড় করো। আর আমাকে নিশ্চয়ই তুমি চেনো, আমার সঙ্গে চুতিয়াপনা করলে কী হতে পারে সেটাও তুমি ভালো করে বুঝতে পারছ।

প্রবীর একটু থামল। তার পরে সে আবার শুরু করে,

অরুণ কর খুন হবার আগে মেয়ে পাচারের কোনও বড় ডিল হয়েছিল?

বান্টি চট করে উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ সে ভাবল। বলল,

খুব বড় নয় তবে একটা বাইরের মানে বিদেশি পার্টির সঙ্গে কথা চলছিল একটা মেয়ের ব্যাপারে। কিন্তু ডিলটা হয়নি। মেয়েটা তার আগেই মরে গেল।
কীভাবে? এই মেয়েটির বিষয়ে পুলিশে কোনও রেকর্ড নেই।
লাশটা ওরা রাতারাতি কোথাও পাচার করে দিয়েছিল। তার আগে দুটো মেয়েকে ওরা বিহারে পাচার করেছিল। ভালো মাল্লু কামিয়েছিল।
যে মেয়েটা মরে গেল তার ডিটেল আমার চাই।
আমাকে স্যার দুদিন সময় দিন, আশা করি জোগাড় করতে পারব।
আচ্ছা। কিন্তু মনে রেখো দু-দিন মানে দু-দিন, তার বেশি নয়।
ওই বিদেশে পাচারের এখানকার লিঙ্কম্যান কে ছিল?
সেটা আমি ঠিক জানি না! আমার পরিচিতদের মধ্যে কেউ না!
আবার মিথ্যা বলছ!

প্রবীর এবার রেগে গেল।

থাবড়ে তোমার বদন বিগড়ে দেব। ইয়ার্কি হচ্ছে!
সত্যি জানি না স্যার। এ সব তো গোপনে হয়। বেশি লোক জানলে পার্সেন্টেজ কম হয়ে যায়। ফলে বাইরের পার্টি হলে সবাই লোকাল পার্টিদের ফাঁকি দেয়। তবে আমি যতটা জানি তাতে আমাদের এখানকার কেউ জড়িত ছিল না।
তোমাদের এখানকার কেউ কিছু জানল না অথচ এত বড় একটা ডিল ফাইনাল হয়ে গেল, এটা আমাকে বিশ্বাস করতে বলো?
সত্যি স্যার। সে আমাদের এখানকার কেউ না। তবে নামটা কি যেন…

বান্টি কথা থামিয়ে কিছু ভাবতে থাকল। একবার ঘাড় নাড়ল নিজের মনে বিড়বিড় করতে করতে। প্রবীর তাকে সময় দিল। বেশ কয়েক মিনিট পরে বান্টি বলল,

হ্যামলিন… না কী যেন এই ধরনের একটা নাম।

প্রবীরের দারুণ রাগ হচ্ছিল, সেটা সামলে সে বলল,

‘কী যেন’ বললে হবে না। সঠিক ভেবে বলো।

বান্টি বলল,

স্যার একটা ফোন করব?
করো।

বান্টি এক পাশে সরে গেল। নিচু গলায় সে কিছুক্ষণ কথা বলল ফোনে। ফিরে এসে কাঠের টুলটায় বসতে বসতে বলল,

স্যার, নামটা পেয়েছি। তার নাম হ্যামিলটন।

প্রবীর মনে মনে নামটা উচ্চারণ করল কয়েকবার। কোথাও কি নামটা শুনেছে সে? যেন মনে করতে পারছে না। মনে হচ্ছে কোথাও যেন শুনেছে সে।

প্রবীরকে চুপ করে থাকতে দেখে বান্টি আবার বলল,

স্যার, হ্যামিলটনকে আবার এই এলাকায় দেখা গিয়েছে কয়েকদিন আগে।

প্রবীর যেন নড়েচড়ে বসল। বলল,

এ খবর তোমাকে কে দিল?

বান্টি একটু ইতস্তত করল। বলল,

ছাড়ান দিন না স্যার। আমার পার্সোনাল কানেকশান।
না, বান্টি এখন আর ছাড়ান দেবার অবস্থায় নেই কেসটা। নাও ওঠো, তার কাছে নিয়ে চলো। এখনি কুইক।

বান্টি বার বার সনির্বন্ধ অনুরোধ জানায়। বলে,

স্যার, আমি খুব ফলস পজিশনে পাড়ে যাব। আমার পক্ষে রিস্ক হয়ে যাবে।

প্রবীর তার কোনও কথা শুনল না। সে কোনও সূত্র হাতছাড়া করতে চায় না।

প্রবীর সঙ্গে একজন এএসআই আর দু-জন কনস্টেবল নিয়ে নেয়। বান্টিকে তো বিশ্বাস করা যায় না।

কয়েকটা অন্ধকার অলিগলি পেরিয়ে তারা একটা বস্তির চালাঘরের সামনে এসে দাঁড়ায়। সামনে একটা ভাঙাচোরা গ্যারাজ। গ্যারাজটা পরিত্যক্ত। সেটাকে বাঁ হাতে রেখে তারা চালাঘরের টিনের দরজার সামনে দাঁড়ায়। তারা সবাই সাদা পোশাকে এসেছে। এবং সবাই সশস্ত্র।

বান্টি টিনের দরজার সামনে দাড়িয়ে ডাক দিল,

পাসোয়ান, হেই পাসোয়ান।

ভিতর থেকে কেউ সাড়া দিল না।

বান্টি নিজের মনে বলল, পাসোয়ান ঘরেই ছিল। আমাকে তো তেমটাই বলল সে।

সে আর একবার আরও জোরে ডাক দিল, সেই সঙ্গে দরজায় ধাক্কা। পাশের সরু রাস্তাটায় দু-একজন ল্যাংটা বাচ্চা খেলা করছিল। তারা খেলা থামিয়ে জুলজুল চোখে তাদের দিকে তাকায়। পাশের একটা চালা ঘর থেকে এক মহিলা উকি দেয়। পাসোয়ানের ঘরের সামনে এতগুলো লোক দেখে সে আবার দ্রুত ঘরে ঢুকে পড়ে।

বান্টির যেন সন্দেহ হয়। বাইরে কোথাও যায়নি সেটা বোঝা যাচ্ছে। তাহলে দরজায় তালা থাকত। তবে কি এই ভর দুপুরবেলা নেশা করে বসে আছে!

সে দরজায় আলতো ধাক্কা দেয়। দরজাটা খুলে যায়। ঘরের ভিতরটা অন্ধকার। একটাই জানালা, সেটা বন্ধ। ঘরের ভিতরে একটা দমবন্ধ করা বাতাস জানালাটা খুলতেই যেন ফরফর করে পাখা মেলে উড়ে বেরিয়ে গেল। ঘরের ভিতরে একটা গন্ধ। এমন গন্ধটা যেন প্রবীরের চেনা। রক্তের গন্ধ। গোঁ গোঁ করে একটা টেবিল পাখা ঘুরে মরছে। খোলা দরজার আলোতে তারা দেখতে পায় বিছানার উপরে পাসোয়ান পড়ে আছে। মেঝেয় তাজা রক্ত তখনও গড়াচ্ছে। জানালাটা একজন খুলে দেয়। আধবুড়ো পাসোয়ানের গলাটা দু-ফাঁক হয়ে হাঁ হয়ে আছে। প্রবীর একটু ঝুঁকে দেখে। পাসোয়ানের চোখদুটো উল্টে আছে, সাদা মণি শূন্যে চেয়ে চেয়ে শান্ত হয়ে গিয়েছে।

বান্টির সারা গায়ে ঘাম দিয়ে ওঠে। ভয়ে তার পেটের ভিতরটা কেমন গুলিয়ে ওঠে। বমি পায়। সে এক ছুটে বাইরে বেরিয়ে আসে। তাজা হাওয়ায় শ্বাস নেয়।

 

এরপর আগামী সংখ্যায়