Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ডেটলাইন দিল্লি — তৃতীয় বর্ষ, একাদশতম যাত্রা

স্টেশন মাস্টার

 

মানুষের হাতে তৈরি যেখানে যা যতটুকু পোড়ে,
ততদূর মৃত্যু মানুষের

দিল্লির সাম্প্রতিক হিংসার ঘটনা প্রত্যাশিতই ছিল বলিলে কম বলা হইবে। বলা উচিত, অবশ্যম্ভাবী ছিল। অবশ্যম্ভাবী ছিল কথাটির অর্থ কেবল ইহাই নহে যে, যমুনাপারের তিনদিবসব্যাপী খাণ্ডবদহন রীতিমত অঙ্ক কষিয়া, একটি বিশেষ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করিতে, একটি বিশেষ গোষ্ঠীর দ্বারা রচিত ও সংঘটিত হইয়াছিল। এই হিংসা অবশ্যম্ভাবী ছিল, কারণ, বিগত এতগুলি বৎসর ধরিয়া ধর্মীয় বিভাজন ও অপরায়নের যে তীব্র হলাহল সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে প্রবিষ্ট করানো হইতেছিল, আজ না হউক কাল, কাল না হউক পরশু, তাহার এই বিস্ফোরণ একপ্রকার অবধারিত ছিল। এই ঘটনা যে দিল্লির ভোটের অব্যবহিত পরে, তুমুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা-সহযোগে ক্ষমতায় ফিরিয়া আসা আপ-সরকারের শপথগ্রহণের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘটিবে, তাহা হয়তো অনেকেই আঁচ করিতে পারেন নাই। কিন্তু যদি রাজধানীর ভোট-পূর্ববর্তী প্রেক্ষাপটটি স্মরণে রাখা যায়, মনে হইতে পারে যেন বা ইহাই সেই সঠিক সময়– উৎসব ও আপাত-শান্তির অন্তরালে ইহাই সেই ইতিহাসকথিত সঙ্কটকাল– যখন অন্তঃস্থিত সব গরল, সমস্ত প্ররোচনা কোনও এক আপতিক কারণকে আশ্রয় করিয়া সহসা তীব্র আন্দোলনে মথিত হইয়া বাহিরে উৎক্ষিপ্ত হইয়া আসে– ঘৃণা ও তৎপ্রসূত জিঘাংসার প্রবল স্রোত সব ভাসাইয়া উড়াইয়া পুড়াইয়া ছারখার করিয়া লইয়া যায়।

যদি পুনর্বার মনে করা যায়, ভোট-পূর্ববর্তী দুই মাসাধিক কাল ধরিয়া নির্বাচনী প্রচারের নামে কীভাবে ক্রমান্বয়ে এই হিংসা ও বিদ্বেষের প্রেক্ষাপট রচনা করিয়াছে বিজেপি, ঘটনার কার্য-কারণ বুঝিতে অসুবিধা হইবার কথা নহে। মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর ও তাঁহার অনুগামীবৃন্দ প্রকাশ্য জনসভায় দেশের বিশ্বাসঘাতকদিগকে গুলি করিয়া মারিবার নিদান দিয়াছেন, উত্তরপ্রদেশ হইতে উজাইয়া আসিয়া মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ মুখের ভাষায় কাজ না-হইলে বন্দুকের ভাষায় তাহা সংসাধনের বিধান শুনাইয়া গিয়াছেন, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শ্রী অমিত শাহ বলিয়াছেন ভোটের যন্ত্রে এত জোরে আঙুল চাপিতে যাহাতে তাহার ‘শক’ শাহিনবাগের জমায়েতে গিয়া লাগে, সর্বোপরি দেশের প্রধানমন্ত্রী একেবারে স্পষ্ট ভাষায় পোশাক দিয়া একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে অব্যর্থ চিনিয়া লইবার ‘সময়োচিত সুপরামর্শ’ দিয়াছেন। সেই জামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌপ্তিক পর্ব হইতে যে প্রকাশ্য ও পরিকল্পিত গুণ্ডামির সূচনা, দিল্লির ভোট আগাইয়া আসিবার সহিত ক্রমান্বয়ে তাহার মাত্রা চড়িয়াছে; এবং বিজেপি-র তরফে প্রতিটি ঘটনার মধ্য দিয়া একটিই সুনির্দিষ্ট বার্তা সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছাইয়া দিবার চেষ্টা করা হইয়াছে।

আমাদিগের এই পোড়া দেশের অধিকাংশ ‘সরলমতি’ ক্যাডারগণের প্রধান সমস্যা হইল, তাঁহারা তাঁহাদিগের পছন্দের রাজনৈতিক দলের নেতৃবর্গের মুখের বাণীকেই সত্যের চূড়ান্ততম প্রকাশ বলিয়া জ্ঞান করেন, তাহার অন্তরালে কী প্রণোদনা আছে তাহা তলাইয়া বুঝিবার ক্ষমতা রাখেন না। নেতৃবর্গ বিলক্ষণ জানিতেন, দেশজোড়া অর্থনৈতিক সঙ্কট, ক্রমবর্ধমান বেকারি, সামাজিক উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে লজ্জাজনক অধঃপতনের দিক হইতে নজর ঘুরাইবার জন্য এই পুঞ্জীভূত ঘৃণার টোটকা অতীব কার্যকরী। পরন্তু রামমন্দির ও কাশ্মিরে ৩৭০ ধারার অবলোপের পর ধর্মীয় বিভাজন ছাড়া বস্তুত তাঁহাদিগের হস্তে অন্যতর কোনও তাস অবশিষ্ট ছিল না। দিল্লির ভোটে বলিবার মতো কোনও ইস্যু না-থাকায়, অতএব তাঁহারা সেই ‘রঙের ফোঁটা’ খেলিলেন, এবং ফল যাহা হইবার তাহাই হইল। অনুরাগের ‘গোলি মারো’ স্লোগানকেই ইতিকর্তব্য ধরিয়া কপিল মিশ্র, প্রবেশ বর্মা ও তাঁহাদিগের অনুগামীবর্গ বন্দুকে বারুদ ঠাসিবার প্রক্রিয়া সুসম্পন্ন করিলেন। কেজরিওয়াল ইত্যবসরে উন্নয়নের লেজ ধরিয়া ভোট-বৈতরণী নির্বিঘ্নেই পার হইলেন বটে, কিন্তু বিজেপি-র তরফে যে বিষ সমাজে ক্রমপ্রবিষ্ট করাইয়া দেওয়া হইয়াছিল, অচিরাৎ বিস্ফোটকরূপে তাহার প্রকাশ ঘটিল– না-ঘটিয়া উপায় ছিল না বলিয়াই। নিয়তির কী পরিহাস– আমদাবাদের ঝুপড়ি যাহাতে অতিথিদেবতার দৃষ্টিপথে পড়িয়া দেশের লজ্জাবৃদ্ধি না-ঘটায় তাহা নিশ্চিত করিতে গুজরাট-সরকার পাঁচিল তুলিয়াছিল; কিন্তু খাস রাজধানী শহরে শেষরক্ষা হইল না– প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশকর্তাকে পাশে লইয়া বিজেপি-র কপিল মিশ্রর হুঙ্কার ও তৎপরবর্তী ঘটনাক্রম সেই লজ্জাবস্ত্র একটানে খুলিয়া ফেলিল। বিদেশি অতিথির চক্ষের সম্মুখেই ফোঁড়া ফাটিয়া পুঁজ-রক্ত বাহির না-হইলেই হয়তো বা ভাল দেখাইত, অন্তত বিশ্বের সমস্ত উৎসুক সংবাদমাধ্যমের চোখ যখন মার্কিন রাষ্ট্রপতির ভারতসফরের দিকে, তখন এমন ঘটনা না-হইলে প্রধানমন্ত্রী হয়তো ‘ব্যাড প্রেস’-এর লজ্জা হইতে বাঁচিতেন। কিংবা, কে বলিতে পারে, হয়তো বা এই ‘ব্যাড প্রেস’-ই প্রকারান্তরে তাঁহাকে আম্রিগা-ইজরাইলের সহিত অক্ষনির্মাণের কক্ষপথে পুনরায় স্থাপন করিবার বন্দোবস্ত করিয়া দিল।

কিন্তু অধিকতর উদ্বেগের বিষয় অন্যত্র। গত কয়দিবসে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে যমুনাপারের একের পর এক মুসলমান-প্রধান মহল্লায় যে পরিকল্পিত গণহত্যা ও সম্পত্তিনাশের ঘটনা ঘটিল– বা বলা ভাল পুলিশ-প্রশাসনকে নিষ্ক্রিয় করিয়া রাখিয়া ঘটিতে দেওয়া হইল, তাহাতে বিষের নির্গমন ঘটিল কি? না, ঘটিল না। কারণ, হিংসা এমন এক দুরারোগ্য ব্যাধি যাহাতে রোগের নির্গমনে তাহার প্রশমন ও শান্তায়ন ঘটে না, বরং ব্যাধিটি সমাজদেহে আরও সমূলে প্রোথিত হয়। এ কথা মনে করিবার অত্যন্ত সঙ্গত কারণ রহিয়াছে যে, মাত্র ছেচল্লিশটি প্রাণের বিনিময়েই এই সন্ত্রাস ফুরাইবে না, আরও ভয়ানক চেহারায় আরও ভয়াবহ মাত্রায় তাহা অচিরাৎ আত্মপ্রকাশ করিবে। আরও স্পষ্ট করিয়া বলা যাউক, এই ঘটনার রচয়িতাগণ তাহা করিবার আপ্রাণ চেষ্টা করিবেন। কারণ, ইহাই সেই একমেটে ভারতবর্ষর চেহারা যাহাতে তাঁহারা বিশ্বাস করেন, এবং দেশ ও বিশ্ববাসীকে তাহা দেখাইতে চাহেন।

প্রশ্ন একাধিক। কিন্তু প্রধান প্রশ্নটি হইল, এই পরিস্থিতিতে, দেশের সাধারণ মানুষ কোন পথ বাছিয়া লইবেন? সহজ পথটি রক্তস্নাত হিংসার– তুমি তোমার মহল্লায় আমার একটি চোখ উপড়াইয়া লইলে প্রত্যুত্তরে আমি আমার মহল্লায় তোমার একটি চোখ উপড়াইয়া লইব। পরিতাপজনক বাস্তব হইল, এ পথে হাঁটিবার প্ররোচনা অধুনা আসিতেছে দেশের সংখ্যাগুরু জনসাধারণের এক প্রবল অংশ এবং দেশের পরাক্রান্ত শাসকদল তথা তাহার মস্তিষ্ক বলিয়া কথিত সংঘপরিবারের পক্ষ হইতে। কিন্তু কেহ যদি বিকল্প পথটি খুঁজিতে চান– যে পথ গিয়াছে বহুত্ববাদী ভারতের নানারঙের উঠান পার হইয়া?

নৈমিষারণ্যের সেই পুরাণকথিত সরোবরের তীরে দণ্ডায়মান যুধিষ্ঠিরকে ধর্ম প্রশ্ন করিয়াছিলেন, পথ কী? সেই একই প্রশ্ন, আরও অনেক জটিল চেহারায় আজ আমাদিগের সামনে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। গৈরিক ধ্বজার সর্বব্যাপী উন্মাদনার সম্মুখে দাঁড়াইয়া বিভ্রান্ত ভারত, মনস্বী ভারত, অনুভবী ভারত আজ তাহার উত্তর খুঁজিতেছে।

সাম্প্রতিক দিল্লি-দাঙ্গার (স্বতস্ফূর্ত দাঙ্গা নহে, কার্যত ইহা সুপরিকল্পিত মুসলমান-নিধন– অনেক বেশি পাকা মাথার কাজ) প্রেক্ষিতে বহুস্তর এই প্রশ্নমালার উত্তর অন্বেষণই এই মুহূর্তে আমাদিগের নিকট সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ কৃত্য বলিয়া মনে হইয়াছে। শুধু এই প্রশ্নটিই নহে, সংলগ্ন আরও অনেকগুলি উপপ্রশ্নও ইহার সহিত যুক্ত হইয়াছে। চারনম্বর প্ল্যাটফর্মের সম্পাদকমণ্ডলীর বিশ্বাস, অস্বস্তিকর প্রতিটি প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াইবার সাহস ও মনুষ্যত্বের অন্তর্নিহিত আলোকে অন্ধকারময় ভবিষ্যতের নিহিতার্থ নিরূপণের স্পর্ধাই আপাতত শিরোধার্য। সেই কর্তব্য মাথায় লইয়াই এই সংখ্যার ‘রিজার্ভড বগি’-র অভিমুখ নির্মাণ। ‘ডেটলাইন দিল্লি’ বিষয়-শিরোনামে দিল্লির ঘটনাক্রমকে নানা দৃষ্টিকোণ হইতে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করিয়া সম্মুখপথটি নির্ধারণের চেষ্টা করিয়াছেন আশীষ লাহিড়ী, সৌমিত্র দস্তিদার, প্রশান্ত ভট্টাচার্য, গৌতম সরকার, স্যমন্তক ঘোষ, শুভেন্দু দেবনাথ, শতাব্দী দাশ এবং অর্ক দেব। প্রাসঙ্গিকবিধায় শশী তারুর ও হর্ষ মন্দরের দুইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ আমরা এই সংখ্যার ‘বিশেষ নিবন্ধ’ বিভাগে প্রকাশ করিলাম।

এতদ্ব্যতীত গল্প, অণুগল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, মুক্তগদ্য ও অপরাপর সমস্ত নিয়মিত বিভাগ এবং ধারাবাহিকসমূহ যথাযথ রহিল। লেখাগুলি বিষয়ে আমরা আপনাদিগের সুচিন্তিত মতামতের প্রত্যাশী রহিলাম। কথায় বলে, একটি রচনাকে সম্পূর্ণ করেন লেখক ও পাঠক– উভয়ে মিলিয়াই। আশা করি, শুধু পাঠ নহে, পাঠান্তে মতামত প্রদান করিয়া আপনারা রচনাগুলিকে হইয়া উঠিতে সহায়তা করিবেন।

শুভেচ্ছা ও প্রণাম…