Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

খুলে দেওয়া হোক দেশের সব আড়ত!

জঁ দ্রেজ

 




লেখক রাঁচি কলেজের অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর। লেখাটি ইংরাজিতে ক্র্যাকটিভিস্ট ওয়েবজিনে প্রকাশিত।

 

 

 

করোনা ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোটা দেশের ওপর নেমে এসেছে মানবিক বিপর্যয়ের কালো মেঘ। এমনিতে, নিজেদের সেরা সময়েও যাঁরা অনাহারের ছায়ার নিচে থাকেন, সেইসব কৃষি শ্রমিকদের (এঁদের সংখ্যা ১৪ কোটির কিছু বেশি) কথা ভাবুন। এই দীর্ঘ একুশ দিন, কে জানে হয়তো আরও বেশি দিন, কাজের কোনও সুযোগ ছাড়া কীভাবে তাঁরা আহার্য যোগাবেন তাঁদের পরিবারকে? রিকশাচালক, অভিবাসী শ্রমিক এবং অন্যান্য আরও বহু খেটে-খাওয়া মানুষ এই ঝুঁকির মুখোমুখি। কেউ কেউ অনাহারের দোরগোড়ায়।

মার্চ মাসের ছাব্বিশ তারিখে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের ত্রাণ প্যাকেজে প্রধানমন্ত্রী গরীব কল্যাণ যোজনার ঘোষণা করা হল। সঠিক দিশায় একটি পদক্ষেপ। তবে এই প্যাকেজ দেখতে-শুনতে যতটা, কাজে হয়তো ততটা প্রকাণ্ড কিছু নয়। এই প্যাকেজে যে টাকার অঙ্কের সাহায্যের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে কিছু পুনরাবৃত্তির গোঁজামিল আছে। যেমন, পূর্বঘোষিত প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি প্রকল্পের ১৬ হাজার কোটি টাকার খরচ, আর মজুরিবৃদ্ধি বাবদ মহাত্মা গান্ধি ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্টের আওতায় ৫,৬০০ কোটি টাকার খরচ, যার বিজ্ঞপ্তি কী না গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রক থেকে আগেই, অর্থাৎ মার্চের ২৩ তারিখে, জারি করে দেওয়া হয়।

উদ্বৃত্ত শস্য ছাড়ার সময় তথাকথিত অর্থনৈতিক ব্যয়ের হিসাবে তার দাম ধার্য করা হয়, যখন তার সুযোগ ব্যয় বা অপরচুনিটি কস্ট অপেক্ষাকৃত কম (হিসাবরক্ষণের এ এক বহু দিনের অসঙ্গতি, যার জন্য মাননীয়া অর্থমন্ত্রীকে দায়ী করা চলে না)। এ ছাড়াও, নির্মাণকর্মীদের কল্যাণ তহবিল থেকে টাকা ব্যবহার করার কথা বলা হচ্ছে, যদিও তা কোনওমতেই কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পত্তি নয়। সুতরাং, করোনা প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় সরকার-দ্বারা ঘোষিত নতুন ত্রাণব্যবস্থার অঙ্কের দিকে তাকালে সংখ্যাটা এক লক্ষ কোটির বেশি নিকটবর্তী হবে, ১.৭ লক্ষ কোটির নয়।

ত্রাণ প্যাকেজে খাদ্য সরবরাহ ও নগদ হস্তান্তরের দিকে যে জোর দেওয়া হয়েছে, তা একেবারে সময়োচিত। বিশেষ করে খাবার-সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলি, যেমন তিন মাসের জন্য গণবণ্টন ব্যবস্থায় প্রদেয় খাদ্যশস্যের পরিমাণ দ্বিগুণ করে দেওয়া, এবং গণবণ্টন ব্যবস্থায় ডাল যোগ করা। যদিও দুশ্চিন্তার বিষয় এই, যে এখনও বহু দরিদ্র মানুষ এই ব্যবস্থার আওতায় আসেননি। ভারত সরকার জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনে গণবণ্টনের রাজ্যওয়াড়ি হিসাবের জন্য এখনও ২০১১ সালের জনসংখ্যার তথ্য ব্যবহার করছেন। ২০১১ সালের তথ্যের বদলে ২০২০ সালের অভিক্ষিপ্ত তথ্য ব্যবহার করলে রাজ্য সরকারগুলির পক্ষে আরও বেশি সংখ্যায় নতুন রেশন কার্ড দেবার সুবিধা হবে। এতদসত্ত্বেও খাদ্যশস্যের বণ্টনের সঙ্গে নগদ হস্তান্তরের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।

 

নগদ হইতে সাবধান

নগদ হস্তান্তরের জন্য প্রধানমন্ত্রী গরীব কল্যাণ যোজনার কাঠামোকে একেবারে নিখুঁত বলা চলে না। প্রথমত, বয়স্ক, বিধবা ও অন্তরায়গ্রস্তদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা ভাতার ভাগ্যে আবারও জুটেছে দায়সারা আচরণ। বহু আবেদন-নিবেদনের পরেও ২০০৬ সাল থেকে সামাজিক সুরক্ষা ভাতায় সরকারের অবদান মাসে মাত্র ২০০ টাকা। এই অঙ্ককে পাকাপাকিভাবে অন্তত মাসিক ১,০০০ টাকা করা উচিত ছিল। তার বদলে ভাতাভোগীরা পাচ্ছেন এককালীন ১,০০০ টাকা, যার মোট খরচ মাত্র ৩,০০০ কোটি টাকা।

দ্বিতীয়ত, মহিলাদের আপৎকালীন নগদ হস্তান্তরের (মোট ৩১,০০০ কোটি টাকা) ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনার অ্যাকাউন্টকে প্রধান গন্তব্য হিসাবে স্থির করার উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার নয়। মহাত্মা গান্ধি ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্টের অধীনে যে জব কার্ড দেওয়া হয়েছিল, এই কাজের জন্য হয়তো তা আরেকটু উপযুক্ত হতে পারত। জন ধন যোজনার তালিকায় যেমন অনেক মধ্যবিত্তের নাম আছে, তেমনই অনেক দরিদ্রের নাম সেই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

প্রচণ্ড তাড়াহুড়োর মধ্যে এই জন ধন অ্যাকাউন্টগুলি খোলা হয়েছিল। বহু অ্যাকাউন্টে এখন লেনদেন বন্ধ, বহু ভুল আধার নম্বরের সঙ্গে যুক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক অ্যাকাউন্টের খবর তার মালিকের কাছেই নেই, আবার অনেক অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে কালো টাকা। জন ধনের তুলনায় জব কার্ডের তালিকা বরং অনেক বেশি স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য, পরীক্ষিত এবং সদর্থে গরীবের জন্য। সামাজিক সুরক্ষা ভাতার বরং স্বাভাবিক অনুপূরক এই জব কার্ড, যেহেতু ভাতাভোগীদের অধিকাংশ কর্মক্ষেত্রের বাইরে। এর একমাত্র সীমাবদ্ধতা হল– এই তালিকা মূলত গ্রামের মানুষের। এই তালিকা যদি ব্যবহার করা হয়, তবে শহরের মানুষের জন্য জন ধনের তালিকা ব্যবহার করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, এই নগদ হস্তান্তরে অর্থের পরিমাণ অল্প। জন ধন অ্যাকাউন্টে পাঠাবার জন্য গরীব কল্যাণ যোজনার ৩১,০০০ কোটি টাকায় ২০ কোটি মানুষের প্রতি জন প্রতি মাসে পাবেন মাত্র ৫০০ টাকা করে। সাধারণ পরিবারে মাসে মাত্র ৫০০ টাকায় দিন গুজরান অসম্ভব।

খাদ্য হোক বা নগদ টাকা, অভাবগ্রস্তের হাতে পৌঁছে দেওয়াটাই বড় প্রশ্ন। যথেষ্ট সঙ্গতি থাকলে এই ত্রয়ী– অর্থাৎ গণবণ্টন ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা ভাতা আর নগদ টাকা– একটা সুরক্ষার মণ্ডল তৈরি করতে পারে। তবে কিছু অভাবী মানুষ এই মণ্ডলের বাইরেই থেকে যেতে পারে। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাকে প্রতিহত করতে ত্রাণব্যবস্থার প্রয়োজন একটা চতুর্থ স্তম্ভের। তা হল এক আপৎকালীন ব্যবস্থা, যা দেশের প্রতি কোণে ছড়িয়ে থাকা গরীব দুঃখী অনাহারক্লিষ্ট মানুষ যে কোনও সময় অনায়াসে ব্যবহার করার সুফল পেতে পারে।

এই আপৎকালীন ব্যবস্থার কিছু নিদর্শন আমাদের মধ্যেই আছে। ওড়িশার ‘কেবিকে’ জেলাগুলিতে, অর্থাৎ কালাহান্ডি, বোলাঙ্গির ও কোরাপুটে, সর্বস্বান্ত মানুষের জন্য ছিল খাদ্যকেন্দ্র, ২০১৫ সালে ভারত সরকার তা বন্ধ করে দেবার আগ পর্যন্ত। ঝাড়খণ্ডের গ্রাম পঞ্চায়েতগুলিতে বুভুক্ষু মানুষকে সাহায্য করার জন্য ১০,০০০ টাকার আপৎকালীন তহবিল থাকে। রাজস্থানে, গ্রাম পঞ্চায়েতে এই উপলক্ষে রাখা থাকত দুই বস্তা খাদ্যশস্য। স্বল্পমূল্যে সামাজিক রান্নাঘরে সাদামাটা, পুষ্টিকর খাবার দেবার চল অনেক রাজ্যেই আছে।

যে ব্যবস্থাগুলোর কথা উল্লেখ করলাম, তা বর্তমান প্রয়োজনের একটা ক্ষুদ্র অংশ হলেও একটা পথের কথা বলে। এই ধরনের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা যেতে পারে একটি কার্যকরী আপৎকালীন ব্যবস্থা। এই কাজের দায়িত্ব সবথেকে ভালো নিতে পারে রাজ্য সরকারগুলি (কিছু রাজ্য এখনই এমন কাজ করছে)। কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্ব হতে পারে সংস্থান সরবরাহের, যেমন খাদ্যশস্য– বিশেষ করে দেশের আড়তগুলিতে যখন শস্য উদ্বৃত্ত। অর্থমন্ত্রীর ত্রাণ প্যাকেজে এই আপৎকালীন ব্যবস্থার সহায়ক হতে পারে এমন কোনও ঘোষণা বা প্রকল্প অনুপস্থিত।

 

এই মুহূর্তের কাজ

আর কালক্ষয় না করে সারা দেশে তৈরি করতে হবে এই আপৎকালীন ব্যবস্থা– কিছু সপ্তাহ নয়, কিছুদিনের মধ্যেই। ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়ে পড়া অভিবাসী শ্রমিক ও অন্যান্য আরও নানান জায়গা থেকে ভেসে উঠছে অনাহারী মানুষের ভয়ঙ্কর ছবি। রেশন কার্ড বা আধার কার্ড চাইবার সময় এ নয়। এঁদের আশু প্রয়োজন নিঃশর্ত সরকারি সাহায্যের।

এ সবই মূলত আয়ের সহায়তার কথা। বলাই বাহুল্য, কার্যকরী স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং শিশুদের পুষ্টির জন্য প্রকল্প (আঙ্গনওয়াড়ি আরে স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়াতে যার অনেকটাই আজ নেই)। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে মহাত্মা গান্ধি ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্টের গুরুত্ব বাড়বে– একদিকে তাৎক্ষণিক ত্রাণের জন্য, অন্যদিকে অর্থনৈতিক পুনর্নির্মাণের জন্য। সরকারের পরিকল্পনাকে এই ত্রাণ প্যাকেজের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে যত শীঘ্র সম্ভব ব্যাপকতর অর্থে প্রযোজ্য হতে হবে।