Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বঙ্কিমচন্দ্র: বস্তুবাদী থেকে ভক্তিবাদী

বঙ্কিমচন্দ্র: বস্তুবাদী থেকে ভক্তিবাদী -- শিবাশীষ বসু

শিবাশীষ বসু

 



লেখক যুক্তিবাদী আন্দোলনের কর্মী

 

 

 

ঊনবিংশ শতাব্দীতে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই বঙ্গসাহিত্যে পাশ্চাত্য বিজ্ঞান আলোচনার সূত্রপাত হল। এই প্রসঙ্গে অন্যতম যুগান্তকারী সাময়িক পত্রিকাটি নিঃসন্দেহে ‘বঙ্গদর্শন’। বঙ্কিমচন্দ্র সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ বাংলা সাহিত্যে যে নবযুগ সৃষ্টি করেছিল তা আজ সর্বজনস্বীকৃত। সরস অথচ বলিষ্ঠ ভাষায় সূক্ষ্ম ও গভীর চিন্তামূলক বিজ্ঞানালোচনা পাওয়া গেল বঙ্গদর্শনে। অধিকাংশ প্রবন্ধেরই লেখক বঙ্কিমচন্দ্র স্বয়ং। পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত বঙ্কিমচন্দ্রের একটি সত্তা সম্ভবত ভারতের উন্নতির জন্য আধুনিক বিজ্ঞানের সাধনা যে অত্যাবশ্যক তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। সম্ভবত সেই কারণেই ‘বঙ্গদর্শন’-এর দ্বিতীয় সংখ্যা থেকেই (জ্যৈষ্ঠ ১২৭৯, ইংরেজি ১৮৭২) বঙ্কিমচন্দ্র বিজ্ঞান বিষয়ক আলোচনার সূত্রপাত করেন। সম্বল ছিল কিছু বিদেশি বই ও পত্রপত্রিকা। বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর ভাবশিষ্য বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাসে বঙ্কিমের অবদান সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, “উপন্যাস, প্রবন্ধ ও সমালোচনাকে কেন্দ্র করে বঙ্কিমচন্দ্র বাংলাভাষার যে সংস্কারসাধন করেছিলেন তারই পরিচয় পাওয়া গেল বঙ্গদর্শনের বিজ্ঞানালোচনাগুলোতেও।”[1] বঙ্কিমের সাহিত্য প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একই ধরণের প্রতিক্রিয়া পাই আমরা যোগেশচন্দ্র বাগল মহাশয়ের উক্তিতেও, “বিজ্ঞানের নব্যবিষ্কৃত জটিল তত্ত্বসমূহ সরল ও সরস করিয়া বিভিন্ন প্রবন্ধে ‘বঙ্গদর্শন’ মারফত পরিবেশন করিতেন।”[2] বিজ্ঞানের প্রতি বঙ্কিমচন্দ্রের আগ্রহ এবং বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলি আত্মস্থ করবার ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে লেখক হিসাবে তাঁর রসাত্মক মনোভাবও ফুটে উঠেছে, যা আমরা দেখতে পাব বঙ্কিমচন্দ্রের বিজ্ঞানরচনাগুলি পর্যালোচনার সময়ে।

বঙ্গদর্শন পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্র লিখিত বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধগুলি হল, ‘আশ্চর্য্য সৌরোৎপাত’ (জ্যৈষ্ঠ ১২৭৯), ‘আকাশে কত তারা আছে’ (অগ্রহায়ণ ১২৭৯), ‘ধূলা’ (ফাল্গুন ১২৭৯), ‘চঞ্চল জগৎ’ (ভাদ্র ১২৮০), ‘গগন পর্যটন’ (পৌষ ১২৮০), ‘জৈবনিক’ (কার্ত্তিক ১২৮০), ‘কত কাল মানুষ্য’ (ফাল্গুন ১২৮০), ‘পরিমাণ রহস্য’ (চৈত্র ১২৮০) ও ‘চন্দ্রলোক’ (আষাঢ় ১২৮১)। এই সকল প্রবন্ধ ১৮৭৫ সনে ‘বিজ্ঞানরহস্য’ নামক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের জীবিতকালে এর আরেকটি সংস্করণ মাত্র হয়েছিল ১২৯১ বঙ্গাব্দে। প্রবন্ধগুলি পড়লে বোঝা যায় যে বঙ্কিমচন্দ্র উনবিংশ শতকের কুসংস্কারগ্রস্ত বাঙালি তথা ভারতীয় সমাজকে কিভাবে কশাঘাত করেছেন। শুধু তাই নয়, প্রবন্ধগুলির বিষয় নির্বাচন নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের বিচক্ষণতা লক্ষ করবার মতো। কোনও গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে তিনি পাঠকের মন ভারাক্রান্ত করেননি, বরং আপাত সাধারণ কৌতূহলের বিষয়গুলি তিনি পছন্দ করেছেন। অত্যন্ত লঘু চালে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর প্রবন্ধগুলিতে অসংখ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য পরিবেশন করেছেন, যদিও বর্তমান প্রবন্ধে আমরা মূলত বঙ্কিমের বৈজ্ঞানিক দর্শন সম্বন্ধেই আলোচনাটি নির্দিষ্ট রাখতে চাইছি।

বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস ও প্রবন্ধগুচ্ছ সম্পর্কে আধুনিক প্রগতিশীল লেখকদের মূল অভিযোগ যে তিনি তাঁর একাধিক লেখায় প্রাচীন ভারতীয়ত্বর তথা হিন্দু সমাজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চেয়েছেন। তাঁর বিজ্ঞানভাবনা সম্বন্ধে আলোচনা প্রসঙ্গে আশীষ লাহিড়ী বলেছেন, “হিন্দুত্ববাদী বঙ্কিম বিজ্ঞানবাদী পজিটিভিজমের নিরিখে প্রাচীন হিন্দু সমাজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন।”[3] কিন্তু যেটা অবাক করে তা হল আধুনিক বিজ্ঞানের তুলনায় ভারতীয় ধর্মীয় দর্শনের অসারতা সম্পর্কে তাঁর সচেতনতা। নিজের ভাবমূর্তির সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে ‘কত কাল মনুষ্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেন, “বিজ্ঞানের প্রভাবে সর্ব্বত্রই ধর্ম্ম-পুস্তকসকল ভাসিয়া যাইতেছে।”[4] উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগেই বঙ্কিমচন্দ্র বুঝেছিলেন, যে আধুনিক বিজ্ঞান যে হারে এগুচ্ছে তাতে তার সঙ্গে তাল না মিলিয়ে চললে নিস্তার নেই। বঙ্কিমের এই মনোভাবেরই নিদর্শন পাওয়া যায় ‘চন্দ্রালোক’ প্রবন্ধে, “কিন্তু এই ঊনবিংশ শতাব্দীতে এইরূপ কেবল সাহিত্য-কুঞ্জে লীলা খেলা করিয়া, কার সাধ্য নিস্তার পায়? বিজ্ঞান-দৈত্য সকল পথ ঘেরিয়া বসিয়া আছে। আজি চন্দ্রদেবকে বিজ্ঞানে ধরিয়াছে, ছাড়াছাড়ি নাই।”[5]

ইদানীং বেদ-পুরাণ-রামায়ণ-মহাভারত ইত্যাদির কিছু কাল্পনিক কাহিনিকে যেভাবে বাস্তব ও বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ করবার প্রচেষ্টা চলছে ‘গগন পর্যটন’ শীর্ষক প্রবন্ধের সূচনাতেই কালদর্শী বঙ্কিমচন্দ্র সম্ভবত তাদেরই নির্মম বিদ্রূপ করে মন্তব্য করেন, “পুরাণ ইতিহাসাদিতে কথিত আছে, পূর্ব্বকালে ভারতবর্ষীয় রাজগণ আকাশ-মার্গে রথ চালাইতেন। কিন্তু আমাদের পূর্ব্বপুরুষদিগের কথা স্বতন্ত্র, তাঁহারা সচরাচর এপাড়া ওপাড়ার ন্যায়, স্বর্গলোকে বেড়াইতে যাইতেন, কথায় কথায় সমুদ্রকে গণ্ডূষ করিয়া ফেলিতেন; কেহ জগদীশ্বরকে অভিশপ্ত করিতেন, কেহ তাঁহাকে যুদ্ধে পরাস্ত করিতেন। প্রাচীন ভারতবর্ষীয়দিগের কথা স্বতন্ত্র; সামান্য মনুষ্যদিগের কথা বলা যাউক।”[6]

একই প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিজ্ঞামননস্ক সংস্কৃতির পার্থক্যনির্দেশ করতে গিয়ে ইওরোপের একটি কাহিনির অবতারণা করেন। কাহিনিটি এইরকম, “আচার্য্য চার্লস প্রথমে জলজন বায়ুপূরিত ব্যোমযানের সৃষ্টি করেন। গ্লোব নামক ব্যোমযানে উক্ত বায়ু পূর্ণ করিয়া প্রেরণ করেন; তাহাতে সাহস করিয়া কোন মনুষ্য আরোহণ করে নাই। রাজপুরুষেরাও প্রাণিহত্যার ভয়প্রযুক্ত কাহাকেও আরোহণ করিতে দেন নাই। এই ব্যোমযান কিয়দ্দূর উঠিয়া ফাটিয়া যায়, জলজন বাহির হইয়া যাওয়ায়, ব্যোমযান তৎক্ষণাৎ ভূপতিত হয়। গোনেশ নামক ক্ষুদ্র গ্রামে উহা পতিত হয়। অদৃষ্টপূর্ব্ব খেচর দেখিয়া, গ্রাম্য লোকে ভীত হইয়া, মহা কোলাহল আরম্ভ করে।

অনেকে একত্রিত হইয়া গ্রাম্য লোকেরা দেখিতে আইল যে, কিরূপ জন্তু আকাশ হইতে নামিয়াছে। দুই জন ধর্ম্মযাজক বলিলেন যে, ইহা কোন অলৌকিক জীবের দেহাবশিষ্ট চর্ম্ম। শুনিয়া গ্রামবাসিগণ তাহাতে ঢিল মারিতে আরম্ভ করিল, এবং খোঁচা দিতে লাগিল। তন্মধ্যে ভূত আছে, বিবেচনা করিয়া, গ্রাম্য লোকেরা ভূত শান্তির জন্য দলবদ্ধ হইয়া মন্ত্র পাঠপূর্ব্বক গ্রাম প্রদক্ষিণ করিতে লাগিল, পরিশেষে মন্ত্রবলে ভূত ছাড়িয়া পলায় কি না দেখিবার জন্য, আবার ধীরে ধীরে সেইখানে ফিরিয়া আসিল। ভূত তথাপি যায় না— বায়ুসংস্পর্শে নানাবিধ অঙ্গভঙ্গী করে। পরে একজন গ্রাম্য বীর, সাহস করিয়া তৎপ্রতি বন্দুক ছাড়িল। তাহাতে ব্যোমযানের আবরণ ছিদ্রবিশিষ্ট হওয়াতে, বায়ু বাহির হইয়া, রাক্ষসের শরীর আরও শীর্ণ হইল। দেখিয়া সাহস পাইয়া, আর একজন বীর গিয়া তাহাতে অস্ত্রাঘাত করিল। তখন ক্ষতমুখ দিয়া বহুল পরিমাণে জলজন নির্গত হওয়ায়, বীরগণ তাহার দুর্গন্ধে ভয় পাইয়া রণে ভঙ্গ দিয়া পলায়ন করিল। কিন্তু এ জাতীয় রাক্ষসের শোণিত ঐ বায়ু। তাহা ক্ষতমুখে নির্গত হইয়া গেলে, রাক্ষস ছিন্নমুণ্ড ছাগের ন্যায় “ধড়ফড়” করিয়া মরিয়া গেল। তখন বীরগণ প্রত্যাগত হইয়া তাহাকে অশ্বপুচ্ছে বন্ধনপূর্ব্বক লইয়া গেলেন।”[7]

এই হল কাহিনি। কিন্তু তারপরই বঙ্কিম তাঁর স্বভাবোচিত সরস ভঙ্গিতে বললেন, “এদেশে হইলে সঙ্গে সঙ্গে একটি রক্ষাকালী পূজা হইত, এবং ব্রাহ্মণেরা চণ্ডীপাঠ করিয়া কিছু লাভ করিতেন।”[8]

একইরকম সরস ভঙ্গিমায় বঙ্কিম পুনরায় ভারতীয় দর্শনকে বিদ্রূপ করেন ‘জৈবনিক’ শীর্ষক প্রবন্ধে।

“ক্ষিতি, অপ্, তেজঃ, মরুৎ এবং আকাশ, বহুকাল হইতে ভারতবর্ষে ভৌতিক সিংহাসন অধিকার করিয়াছিলেন। তাঁহারাই পঞ্চভূত— আর কেহ ভূত নহে। এক্ষণে ইউরোপ হইতে নূতন বিজ্ঞানশাস্ত্র আসিয়া তাঁহাদিগকে সিংহাসন-চ্যুত করিয়াছেন। ভূত বলিয়া আর কেহ তাঁহাদিগকে বড় মানে না। নূতন বিজ্ঞান-শাস্ত্র বলেন, আমি বিলাত হইতে নূতন ভূত আনিয়াছি, তোমরা আবার কে? যদি ক্ষিত্যাদি জড়সড় হইয়া বলেন যে, আমরা প্রাচীন ভূত, কণাদকপিলাদির দ্বারা ভৌতিক রাজ্যে অভিষিক্ত হইয়া জীব-শরীরে বাস করিতেছি, বিলাতী বিজ্ঞান বলেন, তোমরা আদৌ ভূত নও। আমার “Elementary Substances” দেখ— তাহারাই ভূত; তাহার মধ্যে তোমরা কই! তুমি, আকাশ, তুমি কেহই নও— সম্বন্ধবাচক শব্দ মাত্র। তুমি তেজঃ, তুমি কেবল একটি ক্রিয়া— গতিবিশেষ মাত্র। আর, ক্ষিতি, অপ, মরুৎ, তোমরা এক একজন দুই তিন বা ততোধিক ভূতে নির্ম্মিত। তোমরা আবার কিসের ভূত? যদি ভারতবর্ষ এমন সহজে ভূতছাড়া হইত, তবে ক্ষতি ছিল না। কিন্তু এখনও অনেকে পঞ্চভূতের প্রতি ভক্তিবিশিষ্ট।”[9]

এই প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র দেখালেন প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের সাথে আধুনিক বিজ্ঞানের তফাৎটি কোথায়। “প্রাচীন দর্শনশাস্ত্রে এবং আধুনিক বিজ্ঞানে এই প্রকার বিবাদ। ভারতবর্ষবাসীরা মধ্যস্থ। মধ্যস্থেরা তিন শ্রেণীভুক্ত। এক শ্রেণীর মধ্যস্থেরা বলেন যে, ‘প্রাচীন দর্শন, আমাদের দেশীয়। যাহা আমাদের দেশীয়, তাহাই ভাল, তাহাই মান্য এবং যথার্থ। আধুনিক বিজ্ঞান বিদেশী, যাহারা খ্রীষ্টান হইয়াছে, সন্ধ্যা আহ্নিক করে না, উহারাই তাহাকে মানে। আমাদের দর্শন সিদ্ধ ঋষি-প্রণীত, তাঁহাদিগের মনুষ্যাতীত জ্ঞান ছিল, দিব্য চক্ষে সকল দেখিতে পাইতেন; কেন না, তাঁহারা প্রাচীন এবং এদেশীয়। আধুনিক বিজ্ঞান যাঁহাদিগের প্রণীত, তাঁহারা সামান্য মনুষ্য। সুতরাং প্রাচীন মতই মানিব’। আর এক শ্রেণীর মধ্যস্থ আছেন, তাঁহারা বলেন, ‘কোন্‌টি মানিতে হইবে, তাহা জানি না। দর্শনে কি আছে, তাহা জানি না, বিজ্ঞানে কি আছে তাহাও জানি না। কালেজে তোতা পাখীর মত কিছু বিজ্ঞান শিখিয়াছিলাম বটে, কিন্তু যদি জিজ্ঞাসা কর, কেন সে সব মানি, তবে আমার কোন উত্তর নাই। যদি দুই মানিলে চলে, তবে দুই মানি। তবে যদি নিতান্ত পীড়াপীড়ি কর, তবে বিজ্ঞানই মানি; কেন না, তাহা না মানিলে, লোকে আজি কালি মূর্খ বলে। বিজ্ঞান মানিলে লোকে বলিবে, এ ইংরেজি জানে, সে গৌরব ছাড়িতে পারি না। আর বিজ্ঞান মানিলে বিনা কষ্টে হিন্দুয়ানির বাঁধাবাঁধি হইতে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়। সে অল্প সুখ নহে। সুতরাং বিজ্ঞানই মানিব’।”[10] পাঠক, আজকের ভারতীয়দের মনোবৃত্তির সাথে খুব তফাত পেলেন কি?

যাইহোক, এই দুই শ্রেণির ‘মধ্যস্থ’কে নির্মম বিদ্রূপ করবার পর বঙ্কিম তৃতীয় শ্রেণি সম্পর্কে লিখলেন, “সর্ব্বজ্ঞ বা ‘সিদ্ধ’ মানি না ; আধুনিক মনুষ্যাপেক্ষা প্রাচীন ঋষিদিগের কোন প্রকার বিশেষ জ্ঞানের উপায় ছিল, তাহা মানি না-কেন না, যাহা অনৈসর্গিক, তাহা মানিব না। বরং ইহাই বলি যে, প্রাচীনাপেক্ষা আধুনিকদিগের অধিক জ্ঞানবত্তার সম্ভাবনা।”[11]

এই যে, প্রমাণ ব্যাতীত কিছু না মানবার বৈজ্ঞানিক প্রবণতা, এর একাধিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধগুলিতে। ‘কত কাল মানুষ্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি একইভাবে বলেন, “সৃষ্টি অনাদি, এ জগৎ নিত্য; ও সকল কথায় বুঝায় যে, সৃষ্টির আরম্ভ নাই। কিন্তু সৃষ্টি একটি ক্রিয়া-ক্রিয়া মাত্র, কোন বিশেষ সময়ে কৃত হইয়াছে; অতএব সৃষ্টি কোন কালবিশেষে হইয়া থাকিবে। অতএব সৃষ্টি অনাদি বলিলে, অর্থ হয় না। যাঁহারা বলেন, সৃষ্টি হইতেছে, যাইতেছে, আবার হইতেছে, এইরূপ অনাদি কাল হইতে হইতেছে, তাঁহারা প্রমাণশূন্য বিষয়ে বিশ্বাস করেন। এ কথার নৈসর্গিক প্রমাণ নাই।”[12]

ভারতীয় দর্শনকে তীব্র আক্রমণ করে বঙ্কিম বললেন, “দার্শনিকেরা কেবল অনুমানের উপর নির্ভর করিয়া বলেন, ক হইতে খ হইয়াছে, গর মধ্যে ঘ আছে ইত্যাদি। তাঁহারা তাহার কোন প্রমাণ নির্দ্দেশ করেন না; কোন প্রমাণের অনুসন্ধান করিয়াছেন, এমত কথা বলেন না, সন্ধান করিলেও কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। যদি কখন প্রমাণ নির্দ্দেশ করেন, সে প্রমাণও আনুমানিক বা কাল্পনিক, তাহার আবার প্রমাণের প্রয়োজন; তাহাও পাওয়া যায় না। অতএব আজন্ম মূর্খ হইয়া থাকিতে হয়, সেও ভাল, তথাপি দর্শন মানিব না। এ দিকে বিজ্ঞান আমাদিগকে বলিতেছেন, ‘আমি তোমাকে সহসা বিশ্বাস করিতে বলি না, যে সহসা বিশ্বাস করে, আমি তাহার প্রতি অনুগ্রহ করি না; সে যেন আমার কাছে আইসে না। আমি যাহা তোমার কাছে প্রমাণের দ্বারা প্রতিপন্ন করিব, তুমি তাহাই বিশ্বাস করিও, তাহার তিলার্দ্ধ অধিক বিশ্বাস করিলে তুমি আমার ত্যাজ্য। আমি যে প্রমাণ দিব, তাহা প্রত্যক্ষ। একজনে সকল কাণ্ড প্রত্যক্ষ করিতে পারে না, এজন্য কতকগুলি তোমাকে অন্যের প্রত্যক্ষের কথা শুনিয়া বিশ্বাস করিতে হইবে। কিন্তু যেটিতে তোমার সন্দেহ হইবে, সেইটি তুমি স্বয়ং প্রত্যক্ষ করিও। সর্ব্বদা আমার প্রতি সন্দেহ করিও। দর্শনের প্রতি সন্দেহ করিলেই, সে ভস্ম হইয়া যায়, কিন্তু সন্দেহেই আমার পুষ্টি।”[13]

প্রাচীন ভারতবর্ষে আর্যভট্ট, কণাদ, চরক, সুশ্রুত, ব্রহ্মগুপ্ত, ভাস্করাচার্য, বরাহমিহির ইত্যাদির মতো প্রতিভাবান বিজ্ঞানীর জন্ম হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয়দের মধ্যে এমন একটি বাতাবরণ কেন তৈরি করা গেল না যা মানুষকে বিজ্ঞান অনুসন্ধিৎসু করে তুলতে পারে— এই নিয়ে আক্ষেপ করেছেন উনবিংশ শতকের বিদ্যাসাগর থেকে বিংশ শতকের মেঘনাদ সাহা পর্যন্ত অনেকেই। প্রাচীন ভারতীয়দের চিন্তার মধ্যে কী সেই ঘাটতি ছিল যার ফলে বৈজ্ঞানিক বিপ্লবটি ভারতে না ঘটে, ঘটল ইউরোপে তা নিয়ে আলোচনা করবার চেষ্টা করেছেন অনেকেই। সংশয়বাদী আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে স্থবির প্রাচীন ভারতীয় অধিবিদ্যার পার্থক্যটা ঠিক কেমন, সে সম্পর্কে স্পষ্ট উপলব্ধি করেছিলেন বঙ্কিম, তা দেখা যায় ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে লিখিত তাঁর ‘The study of Hindu Philosophy’ প্রবন্ধে।

“The relation of Hindu Philosophy to true Science: – It must be borne in mind that Philosophy in India had never the restricted signification attached to it in modern Europe, but was co-extensive in meaning with the knowledge of Nature. Philosophy therefore included Science. The Hindu laboured under the disadvantage of an erroneous method. An intense theological spirit rarely leads to anything but the deductive method, and the Hindu method was almost solely and purely deductive. Observation and Experiment were considered beneath the dignity of Philosophy and Science. Nor is even deduction as a rule pushed on its legitimate consequences. First principles are assumed on no grounds, and with the most perfect weapons of deductive logic at his command, the Hindu thinker contents himself with the most fanciful inferences. Mighty glimpses of truth reveal themselves to men of almost inspired intellect, but the Hindu sage will not follow them out to their legitimate consequences.

When the gardeners of Florence found that the column of water in the water-pump will not rise to any greater height than thirty two feet, the idea of the atmosphere exerting a pressure upon the water outside flashed upon Torricelli like an inspiration. But Torricelli did not stop at the inspired thought. ‘If the pressure of the atmosphere sustained a column of air,’ he reasoned, ‘it ought to sustain a column of mercury also.’ He experimented with a glass tube filled with mercury, which verified his conclusion-Here was a splendid triumph, but European energy of thought would not stop here. Pascal argued, that if the atmosphere supports the mercurial column, the higher we ascend the lower ought the column to sink. Pascal took a barometric column to the Puy de Dome and the column sank.

A Hindu philosopher in Torricelli’s place would have contented himself with simply announcing in an aphoristic sutra that the air had weight. No measure of the quantity of its pressure would have been given; no experiment would have been made with the mercury; no Hindu Pascal would have ascended the Himalayas with a barometric column in hand. To take a parrllel case, the diurnal rotation of the earth is shadowed forth in the Aitareya Brahmana. Arya Bhatta distinctly affirms it. ‘The starry firmament is fixed,’ says he, ‘it is the earth which, continually revolving, produces the rising and the setting of the constellations and the planets.’ In addition to this, the apparent annual motion of the sun and the periodical motion of the planets were well known. The only legitimate deduction from the combination of these three facts, viz., the diurnal rotation of the earth, the fixity of the heavenly bodies, and the apparent annual motion of the sun, was the heliocentric theory. But the heliocentric theory was never positively put forward—never sought to be proved—never accepted and never followed out to the establishment of the further laws of the universe. In modern Europe, the announcement of the Copernican theory rendered certain the future discovery of the laws of Kepler and of the great law of Universal Gravitation. In India Arya Bhatta’s remarkable announcement rendered certain that nothing further would come of it.”[14]

অসাধারণ বঙ্কিমী গদ্যে প্রবন্ধটির বঙ্গানুবাদ করেছেন শ্রীযুক্ত আশীষ লাহিড়ী। এবার অনুবাদটি পড়া যাক।

যথার্থ বিজ্ঞানের সহিত হিন্দু দর্শনের সম্বন্ধ:- এ কথা স্মরণে রাখিতে হইবে যে আধুনিক ইউরোপে philosophy শব্দটি যে সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহৃত হয়, প্রাচীন ভারতে দর্শন শব্দটি সেই সীমিত অর্থে ব্যবহৃত হইত না, তাহা প্রকৃতি বিষয়ক জ্ঞান অর্থেও ব্যবহৃত হইত। সুতরাং বিজ্ঞান দর্শনেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। হিন্দুদের স্কন্ধে এক ভ্রান্ত পদ্ধতিতন্ত্রের বোঝা চাপিয়াছিল। সুতীব্র ধর্মতাত্ত্বিক মনোভাব থাকিলে তাহা হইতে অবরোহী পদ্ধতি ব্যতীত আর কিছুই সচরাচর নির্গত হয় না। হিন্দু পদ্ধতি প্রায় সম্পুর্ণতই বিশুদ্ধ অবরোহী প্রণালীর ছিল। পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষাবিধান, দর্শন ও বিজ্ঞান চর্চার পক্ষে হীন কর্ম বলিয়া গণ্য হইত। শুধু তাহাই নহে, এমনকি এই অবরোহী প্রণালীকেও যুক্তিসম্মত পরিণতির অভিমুখে যাইতে দেওয়া হইত না। প্রারম্ভিক সূত্রগুলিকে কোনোরূপ বনিয়াদ ব্যতীতই গ্রহণ করা হইত। ফলত অবরোহী প্রণালীর শ্রেষ্ঠতম আয়ুধে সজ্জিত হইয়াও হিন্দু চিন্তাবীদগণ নিতান্ত কল্পনাত্বক সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়া সন্তুষ্ট থাকিতেন। প্রায় অলৌকিক মেধাসম্পন্ন ব্যক্তিগণের সম্মুখে সত্যের অতি শক্তিশালী ক্ষণপ্রভা ঝলসাইয়া উঠিত, কিন্তু হিন্দু ঋষিগণ তাহার আলোয় পথ অনুসরণ করিয়া তাহা হইতে যুক্তিসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হইবার প্রয়াস পাইতেন না।

ফ্লোরেন্সের উদ্যানকারগণ যখন লক্ষ্য করিলেন যে জল পাম্প করিবার কালে জলস্তম্ভ বত্রিশ ফুট উচ্চতার উর্ধ্বে উঠে না, তখন বিদ্যুঝলকের মত তরিচেল্লির মনে এই ভাব ঝলসিয়া উঠিল যে, ইহার অর্থ, বায়ুমণ্ডল বাহিরের জলের উপর চাপ প্রয়োগ করিতেছে। কিন্তু তরিচেল্লি সেই অনুপ্রেরিত ভাবনার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখিলেন না। তিনি যুক্তি প্রয়োগ করিলেন যে, ‘বায়ুমণ্ডলের চাপ যদি বায়ুর একটি স্তম্ভকে ধরিয়া রাখিতে সক্ষম হয়, তাহা হইলে উহা নিশ্চয় পারদের একটি স্তম্ভকেও ধরিয়া রাখিতে সক্ষম হইবে।’ তখন তিনি পারদে পরিপূর্ণ একটি কাচনলকে লইয়া পরীক্ষা করিয়া দেখিলেন যে তাঁহার সিদ্ধান্ত নির্ভুল। এ এক মহতী বিজয়। কিন্তু ইউরোপের চিন্তাশক্তি ইহাতেই ক্ষান্ত হইল না। পাস্কাল এই যুক্তি দিলেন যে বায়ুমণ্ডলের চাপ যদি পারদস্তম্ভকে ধরিয়া রাখিতে সক্ষম হয়, তবে তো আমরা যত উচ্চে আরোহণ করিব, ততই সে স্তম্ভের উচ্চতা কমিতে থাকিবে। অতঃপর পাস্কাল একটি ব্যারোমিটার লইয়া Puy de Dome এর উপরে উঠিলেন এবং পারদস্তম্ভের উচ্চতা সত্যিই কমিল।

তরিচেল্লি না হইয়া কোনো হিন্দু দার্শনিক হইলে কেবল একটি কূট সুত্রে এই কথা ঘোষণা করিয়া ক্ষান্ত হইতেন যে বায়ুর ওজন আছে। তাহার চাপের মাত্রা কত তাহা পরিমাপ করিতেন না ; পারদ লইয়া কোনো পরীক্ষানিরীক্ষাও করিতেন না ; কোনো হিন্দু পাস্কাল কখনও ব্যারোমিটারের নল লইয়া হিমালয়ের উপরে উঠিতেন না। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে পৃথিবীর আহ্নিক ঘূর্ণনের কথা আভাসিত হইয়াছিল। আর্যভট্ট সুনিশ্চিতভাবে তাহা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘তারকাময় আকাশ স্থির রহিয়াছে। পৃথিবীই ক্রমাগত তাহাকে প্রদক্ষিণ করিয়া চলিয়াছে। এইভাবে ক্রমাগত প্রদক্ষিণ করিবার ফলেই তাহা তারকামণ্ডলীর এবং গ্রহসমূহের উদয় ও অস্ত ঘটায়।’ ইহা ব্যাতিরেকে সূর্যের বার্ষিক আপাত চলন এবং গ্রহাদির পর্যায়ক্রমিক গতির কথাও সুবিদিত ছিল। পৃথিবীর আহ্নিক ঘূর্ণন, জ্যোতিষ্কসমূহের নির্দিষ্ট অবস্থান এবং সূর্যের বার্ষিক আপাত চলন, এই ত্রিবিধ সত্যের সমাহার হইতে একমাত্র যে যুক্তিসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া তাহা হইল সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্ব। অথচ এই সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্বের কথাটি কখনও স্পষ্ট করিয়া বলাই হইল না— কখনো প্রমাণ করিবার চেষ্টা করা হইল না— কখনো গৃহীত হইল না এবং তাহার অনুসরণে ব্রহ্মাণ্ডের অপরাপর নিয়ম প্রতিষ্ঠা করা হইল না। আধুনিক ইউরোপে কিন্তু কোপার্নিকাসের তত্ত্বের ঘোষনা ভবিষ্যতে কেপলার-এর সূত্রাবলীর এবং সার্বজনীন অভিকর্ষ তত্ত্বের মহতী আবিষ্কারকে সুনিশ্চিত করিয়া তোলে। আর ভারতবর্ষে আর্যভট্টের অতি উল্লেখযোগ্য ঘোষণা ভবিষ্যতে নুতন কোনো বিকাশ যাহাতে না ঘটে তাহাই সুনিশ্চিত করিয়া তুলিয়াছিল।[15]

এই হল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতন্ত্র। ধাপে ধাপে যুক্তিজাল বিস্তারে কি চমৎকার তার গতি, কি পোক্ত তার বনেদ। এর থেকে স্পষ্ট করে বোধহয় আর কেউ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য— দুই জগতের বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির পার্থক্যটি তুলে ধরতে পারেননি।

এইখানেই বিবেকানন্দের বিজ্ঞানচিন্তার সাথে বঙ্কিমচন্দ্রের বিজ্ঞানচিন্তার পার্থক্য। বঙ্কিম যখন বিজ্ঞানের আলোচনাটা করেছেন সেখানে বিবেকানন্দের মতো ছলনার আশ্রয় নেননি। অহেতুক ভারতীয়ত্বের গুণগান না গেয়ে বিজ্ঞান আলোচনাটি বিজ্ঞানমনস্কের মতোই করবার চেষ্টা করেছেন। বিজ্ঞানরহস্যের প্রবন্ধগুলির মধ্যে কয়েকবার যদিও তথাকথিত ঈশ্বরের অস্তিত্বের কথা বঙ্কিম স্বীকার করেছেন কিন্তু তা ছিল সাধারণ আস্তিক মানুষের মতোই। যেমন, ‘জৈবনিক’ প্রবন্ধের শেষাংশে, “স্মরণ রাখিলেই হইল, ভূতের উপর সর্ব্বভূতময় এক জন আছেন। তাঁহা হইতে ভূতের এ খেলা।”[16]

কিন্তু বয়সকালে বঙ্কিমচন্দ্রের যুক্তিবাদী এবং বিজ্ঞানসম্মত চিন্তাধারা কীরূপে প্রবল ভাববাদী ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়ে উঠল তা এক রহস্য। মাত্র কয়েকবছর আগেই ‘জৈবনিক’ প্রবন্ধে যিনি দৃপ্তকণ্ঠে বলেছেন, “যাহা অনৈসর্গিক তাহা মানিব না”, যাঁর সম্পর্কে তাঁর অতি কাছের মানুষ ও অধীনস্থ কর্মচারী কালিনাথ দত্ত গভীর বেদনার সহিত স্মৃতিচারণ করেছেন, “বঙ্কিমবাবুর এতগুলি সদগুণ সত্ত্বেও তাঁহার জীবনে ঈশ্বর বিশ্বাসের অভাবে আমার বড় কষ্ট হইত,”[17] সেই বঙ্কিমই পরিণত বয়সে তাঁর আর এক অত্যন্ত কাছের মানুষ শ্রীশচন্দ্রকে উপদেশ দেন, “তাহাদের (ভূতের ওঝা) ঝাড়া ঝোড়া ও mesmerism, জলপড়া mesmerized water এই সকল উপায়ে তোমার স্ত্রীর চিকিৎসা করাও। যদি কাহাকেও না বল, একটি পরামর্শ দিই। তারকেশ্বরের মানত করিও। তাহাতেও উপকার হয়।”[18] শ্রীশচন্দ্রের কাছে স্মৃতিচারণ করতে করতে বঙ্কিমবাবু নিজের বিশ্বাস সম্পর্কে বলেন, “আগে আমি নাস্তিক ছিলাম। তাহা হইতে হিন্দু ধর্মে আমার মতিগতি আশ্চর্য্য রকমের।”[19] এমনকি শ্রীশচন্দ্র মজুমদার তাঁর বঙ্কিম স্মৃতিকথায় তাঁর মানসিক পরিবর্তন নিয়ে লিখেছেন, “জন স্টুয়ার্ট মিলের কথা উঠিল। বঙ্কিমবাবু বলিলেন, ‘এক সময়ে মিলের আমার উপর বড় প্রভাব ছিল, এখন সে সব গিয়াছে’।”[20] বঙ্কিমের এই চিন্তাজগতের বিবর্তনের বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করেন হীরেন্দ্রনাথ দত্ত পরিচয় পত্রিকার আষাঢ়, ১৩৪৫ সংখ্যা থেকে ‘দার্শনিক বঙ্কিমচন্দ্র’ শীর্ষক প্রবন্ধে।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, প্রথম জীবনে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে সনাতন ধর্মবিরোধী কট্টর বিজ্ঞানবাদী বঙ্কিম মিল-এর বস্তুবাদী দর্শন, কোঁৎ-এর প্রত্যক্ষবাদী দর্শন এবং রুশোর সাম্যবাদী দর্শনে প্রভাবিত হন। একসময় বঙ্কিমচন্দ্র ‘সাম্য’ প্রবন্ধে গৌতম বুদ্ধ ও যীশুখৃস্টের সমান স্তরে ফরাসি দার্শনিক রুশোকে স্থান দিয়েছিলেন। সাম্য প্রবন্ধে তিনি রুশোর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Le Contrat Social’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলেন। সনাতন ধর্মের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বঙ্কিম বলেন, “জগতের সকল পদার্থেই বৈষম্য। মনুষ্যে মনুষ্যে প্রকৃত বৈষম্য আছে। যেমন প্রকৃত বৈষম্য আছে— প্রকৃত বৈষম্য অর্থাৎ যে বৈষম্য প্রাকৃতিক নিয়মানুরুদ্ধ— তেমনি অপ্রকৃত বৈষম্য আছে। ব্রাহ্মণ শুদ্রে অপ্রাকৃত বৈষম্য। ব্রাহ্মণবধে গুরু পাপ— শূদ্রবধে লঘু পাপ; ইহা প্রাকৃতিক নিয়মানুকৃত নহে। ব্রাহ্মণ অবধ্য— শূদ্র বধ্য কেন?”[21] তিনিই আবার পরবর্তীকালে সাম্য প্রবন্ধে বিবৃত অভিমতগুলি প্রায় সম্পুর্ণ বর্জন করে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি বিপরীত অবস্থানে পৌঁছে যান। নিজের লিখিত প্রবন্ধের কথা উঠলে তিনি ঘনিষ্ঠ শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের কাছে স্বীকার করেন, “সাম্য-টা সব ভুল, খুব বিক্রয় হয় বটে কিন্তু আর ছাপাবো না।”[22]

এর থেকে একটাই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, পরবর্তীকালে ভারতীয়ত্বের পূজারী এবং ক্রমেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী হয়ে ওঠা বঙ্কিমচন্দ্র ‘মেলাবেন তিনি মেলাবেন’ পথের অনুসারী হয়ে পড়েন। যে বঙ্কিম ‘জৈবনিক’ প্রবন্ধে দৃঢ়ভাবে বলেন, “যিনি প্রমাণ দেখাইবেন, তাঁর কথায় বিশ্বাস করিব। যিনি কেবল আনুমানিক কথা বলিবেন, তাহার কোন প্রমাণ দেখাইবেন না, তিনি পিতৃপিতামহ হইলেও তাঁহার কথায় অশ্রদ্ধা করিব।”[23] সেই বঙ্কিমই ‘ত্রিদেব সম্বন্ধে বিজ্ঞানশাস্ত্র কি বলে’ প্রবন্ধে অনায়াসে বলে ফেললেন, “ত্রিদেবের অস্তিত্বের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নাই, ইহা যথার্থ, কিন্তু ইহা স্বীকার করিতে হইবে যে, মহাবিজ্ঞানকুশলী ইউরোপীয় জাতি অবলম্বিত খ্রীষ্টধর্মাপেক্ষা, হিন্দুদিগের এই ত্রিদেবোপাসনা বিজ্ঞানসঙ্গত ও নৈসর্গিক। ত্রিদেবোপাসনা বিজ্ঞানমূলক না হউক, বিজ্ঞানবিরুদ্ধ নহে। কিন্তু খ্রীষ্টিয় সর্ব্বশক্তিমান, সর্ব্বজ্ঞ এবং দয়াময় ঈশ্বরে বিশ্বাস যে বিজ্ঞানবিরুদ্ধ, তাহা উপরেকথিত মিল-কৃত বিচারে সপ্রমাণ হইয়াছে। হিন্দুদিগের মত কর্ম্মফল মানিলে বা হিন্দুদিগের মায়াবাদে তাহা বিজ্ঞানসম্মত হয়।”[24] কী অদ্ভুত পরস্পরবিরোধী বক্তব্য! বন্ধুদের কি ডঃ মণি ভৌমিকের কথা মনে পড়ছে? অথচ বঙ্কিম বেশ ভালোই বুঝতেন মানুষের জীবনে বিজ্ঞানমনস্কতার প্রভাব কতটা। সে কথা তিনি আলোচনাও করেছিলেন ‘বঙ্গদেশে কৃষক’ প্রবন্ধে যেখানে কথাপ্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, “যে বাবু দূরবীণ কষিয়া বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহগণের গ্রহণ পর্য্যবেক্ষণ করিতেছে, পঞ্চাশ বৎসর পূর্ব্বে জন্মিলে উনি এত দিন চাল কলা ধূপ দিয়া বৃহস্পতির পূজা করিতেন। আর আমি যে হতভাগ্য, চেয়ারে বসিয়া ফুলিস্কেপ্ কাগজে বঙ্গদর্শনের জন্য সমাজতত্ত্ব লিখিতে বসিলাম, এক শত বৎসর পূর্ব্বে হইলে, আমি এতক্ষণ ধরাসনে পশুবিশেষের মত বসিয়া ছেঁড়া তুলট্ নাকের কাছে ধরিয়া নবমীতে লাউ খাইতে আছে কি না, সেই কচ্‌কচিতে মাথা ধরাইতাম।”[25] এই বক্তব্যের পরে তাঁকে জ্ঞানপাপী ছাড়া কী আর বলা যায়?

এই বঙ্কিম তাঁর স্ববিরোধিতা কাটিয়ে ক্রমেই হয়ে ওঠেন রক্ষণশীল, পশ্চাৎমুখী, হিন্দুত্ববাদী (আধুনিক রাজনৈতিক অর্থে নয়)। নবরূপে বঙ্কিম হিন্দু ধর্মকেই জগতে সম্পূর্ণ ধর্ম বলে মনে করতেন। যদিও তাঁর ধর্মতত্ত্ব ছিল শশধর তর্কচুড়ামণি জাতীয় প্রচলিত হিন্দু গোঁড়ামির থেকে আলাদা। অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত ‘নবজীবন’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা অর্থাৎ ১২‍৯১ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ সংখ্যা হতে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ধর্ম্মতত্ত্ব অনুশীলন’ প্রবন্ধসমূহ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হতে থাকে। প্রবন্ধগুলিতে বঙ্কিম গুরুশিষ্যের কথোপকথনচ্ছলে ধর্মতত্ত্ব আলোচনা করেছেন। এই বিষয়ে সুস্পষ্ট মনোভাব তুলে ধরেছেন তিনি এই প্রবন্ধাবলীর অন্তর্গত ‘অনুশীলন’ প্রবন্ধে, “ধর্ম্ম যদি যথার্থ সুখের উপায় হয়, তবে মনুষ্যজীবনের সর্ব্বাংশই ধর্ম্ম কর্ত্তৃক শাসিত হওয়া উচিত। ইহাই হিন্দুধর্ম্মের প্রকৃত মর্ম্ম। অন্য ধর্ম্মে তাহা হয় না, এজন্য এছাড়া অন্য ধর্ম্ম অসম্পূর্ণ; কেবল হিন্দুধর্ম্ম সম্পূর্ণ ধর্ম্ম। অন্য জাতির বিশ্বাস যে, কেবল ঈশ্বর ও পরকাল লইয়া ধর্ম্ম। হিন্দুর কাছে, ইহকাল, ঈশ্বর, মনুষ্য, সমস্ত জীব, সমস্ত জগৎ-সকল লইয়া ধর্ম্ম। এমন সর্ব্বব্যাপী সর্ব্বসুখময়, পবিত্র ধর্ম্ম কি আর আছে?”[26]

শুধু তাই নয়, একদা মিল-কোঁৎ আলোচনা করা বঙ্কিম, রুশোর সাম্যবাদের জয়গান গাওয়া বঙ্কিম ক্রমেই পরিবর্তিত হলেন সঙ্কীর্ণ ব্রাহ্মণ্যবাদীতে। যে বঙ্কিম সাম্য প্রবন্ধে ঘোষণা করেছেন, “পৃথিবীতে যত প্রকার সামাজিক বৈষম্যের উৎপত্তি হইয়াছে, ভারতবর্ষের পূর্ব্বকারিক বর্ণবৈষম্যের ন্যায় গুরুতর বৈষম্য কখন কোন সমাজে প্রচলিত হয় নাই।”[27] সেই বঙ্কিম উপরোক্ত প্রবন্ধসমূহের অন্তর্গত ‘মনুষ্যে ভক্তি’ শীর্ষক প্রবন্ধে ব্রাহ্মণজাতির পক্ষে ওকালতি করতে গিয়ে গুরুরূপ ধারণ করে বলেন, “হিন্দুধর্ম্মে ব্রাহ্মণগণ সকলের পূজ্য। তাঁহারা যে বর্ণশ্রেষ্ঠ এবং আপামর সাধারণের বিশেষ ভক্তির পাত্র, তাহার কারণ এই যে, ব্রাহ্মণেরাই ভারতবর্ষে সামাজিক শিক্ষক ছিলেন। তাঁহারা ধর্ম্মবেত্তা, তাঁহারাই নীতিবেত্তা, তাঁহারাই বিজ্ঞানবেত্তা, তাঁহারাই পুরাণবেত্তা, তাঁহারাই দার্শনিক, তাঁহারাই সাহিত্যপ্রণেতা, তাঁহারাই কবি। তাই অনন্তজ্ঞানী হিন্দুধর্ম্মের উপদেশগণ তাঁহাদিগকে লোকের অশেষ ভক্তির পাত্র বলিয়া নির্দ্দিষ্ট করিয়াছেন। সমাজ ব্রাহ্মণকে এত ভক্তি করিত বলিয়াই, ভারতবর্ষ অল্পকালে এত উন্নত হইয়াছিল।”[28]

একই প্রবন্ধে পরবর্তী অনুচ্ছেদে বঙ্কিম সরাসরি দাবী করেন, “পৃথিবীতে যত জাতি উৎপন্ন হইয়াছে, প্রাচীন ভারতের ব্রাহ্মণদিগের মত প্রতিভাশালী, ক্ষমতাশালী, জ্ঞানী ও ধার্ম্মিক কোন জাতিই নহে। প্রাচীন এথেন্স বা রোম, মধ্যকালের ইতালি, আধুনিক জার্ম্মানি বা ইংলণ্ডবাসী-কেহই তেমন প্রতিভাশালী বা ক্ষমতাশালী ছিলেন না; রোমক ধর্ম্মযাজক, বৌদ্ধ ভিক্ষু বা অপর কোন সম্প্রদায়ের লোক তেমন জ্ঞানী বা ধার্ম্মিক ছিল না।”[29] এইখানে প্রশ্ন জাগে, এই পর্যায়ে সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে ধর্মীয় নেতা বিবেকানন্দের বক্তব্যের আদৌ কি কোনও পার্থক্য মেলে?

এখানেই আমরা একটা সঙ্কটের সম্মুখীন হই। প্রশ্ন জাগে, যে মানুষটি বিজ্ঞান প্রচারে ও প্রসারে এত পরিশ্রম করলেন, তিনি কেন ব্যক্তিজীবনে অপবিজ্ঞান দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রইলেন? উত্তরটা আশীষ লাহিড়ী দিয়েছেন, “বঙ্কিমচন্দ্রের মতো বিজ্ঞান-স্নাত মানুষের এই বিজ্ঞানবিরোধী অবস্থানে চলে আসার ঘটনাটি থেকে একটা জিনিস খুব সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়: শঙ্কর-আশ্রিত বেদান্ত-ভিত্তিক ভাবধারা থেকে সরে আসতে না পারলে বাঙালিদের পক্ষে কিছুতেই আধুনিক বিশ্বজনীন বিজ্ঞানের মূল স্রোতে ভাসা সম্ভব নয়।”[30]


[1] পৃষ্ঠা ১২০, বঙ্গসাহিত্যে বিজ্ঞান, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ
[2] পৃষ্ঠা ১৶৹, বঙ্কিম রচনাবলী দ্বিতীয় খণ্ড, যোগেশচন্দ্র বাগল সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ
[3] পৃষ্ঠা ৬৩, অন্য কোনো সাধনার ফল, আশীষ লাহিড়ী, পাভলভ ইনস্টিটিউট
[4] পৃষ্ঠা ১৪৪, বঙ্কিম রচনাবলী দ্বিতীয় খণ্ড, যোগেশচন্দ্র বাগল সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ
[5] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৫৬
[6] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৩৬
[7] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৩৬
[8] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৩৭
[9] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৪৮
[10] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৪৯
[11] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৪৯
[12] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৪৪
[13] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৫০
[14] পৃষ্ঠা ১৪৬-১৪৭, বঙ্কিম রচনাবলী তৃতীয় খণ্ড, যোগেশচন্দ্র বাগল সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ
[15] পৃষ্ঠা ১১১-১১৩, বিজ্ঞান ও মতাদর্শ, আশীষ লাহিড়ী, অবভাস
[16] পৃষ্ঠা ১৫২, বঙ্কিম রচনাবলী দ্বিতীয় খণ্ড, যোগেশচন্দ্র বাগল সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ
[17] পৃষ্ঠা ৪৯, কাছের মানুষ বঙ্কিমচন্দ্র, সোমেন্দ্রনাথ বসু সংকলিত, বুকল্যান্ড প্রাইভেট লিমিটেড
[18] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৮
[19] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৩
[20] পৃষ্ঠা ১৯৮, বঙ্কিম প্রসঙ্গ, সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সংকলিত, মুখার্জী বোস কোং
[21] পৃষ্ঠা ৩৮২, বঙ্কিম রচনাবলী দ্বিতীয় খণ্ড, যোগেশচন্দ্র বাগল সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ
[22] পৃষ্ঠা ১৬, কাছের মানুষ বঙ্কিমচন্দ্র, সোমেন্দ্রনাথ বসু সংকলিত, বুকল্যান্ড প্রাইভেট লিমিটেড
[23] পৃষ্ঠা ১৫০, বঙ্কিম রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড, যোগেশচন্দ্র বাগল সম্পাদিত, সাহিত্য সংসদ
[24] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৭৮
[25] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৮৮
[26] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৫৯৬
[27] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৩৮২
[28] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬১৭
[29] প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ৬১৮
[30] পৃষ্ঠা ৬৬, অন্য কোনো সাধনার ফল, আশীষ লাহিড়ী, পাভলভ ইনস্টিটিউট