বহুবিবাহ: বিদ্যাসাগরের নতুন বিরোধী

শুভেন্দু সরকার

 


ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক

 

 

 

সহমরণ বিষয়ে প্রবর্ত্তক ও নিবর্ত্তকের দ্বিতীয় সম্বাদ (১৮১৯)-এ কুলীনদের বহুবিবাহর প্রসঙ্গ তোলেন রামমোহন।[1] পরবর্তীকালে, ১৮৪২-এ, অক্ষয়কুমার দত্তর বিদ্যাদর্শনএও তা নিয়ে লেখালিখি চলেছিল।[2] দেখার ব্যাপার, বিধবাবিবাহ চালু আর বহুবিবাহ বন্ধের পক্ষে আন্দোলন দুটির পদ্ধতিগত মিল অনেক। বাল্যবিধবাদের বিয়ে দেওয়ার পেছনে যে প্রধান সামাজিক/নৈতিক সমস্যা— ব্যভিচার আর ভ্রূণহত্যা— উল্লেখ করতেন বাঙালির আগুয়ান অংশ, বহুবিবাহর শিকার দাম্পত্যজীবন থেকে বঞ্চিত অল্পবয়েসি সধবাদের বেলায়ও সেগুলি দেখা গেল। মানবিক আবেদনের পাশাপাশি এক্ষেত্রেও শাস্ত্রের অনুমোদন খোঁজা হল; এমনকি, বহুবিবাহ নিষিদ্ধের জন্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সরকারের হস্তক্ষেপেরও দাবি উঠল। বোঝা যায়, নারী-সমস্যা নিয়ে সার্বিক চিন্তাভাবনা চলছিল উনিশ শতকের প্রথমভাগে। তাই ২৬ জুলাই ১৮৫৬-য় বিধবাবিবাহ আইন পাশের পর বহুবিবাহর বিরুদ্ধে আন্দোলন যে আরও জোরদার হবে— এ খুব স্বাভাবিক। যথারীতি সেবারও অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

১৮৫৫-র গোড়ার দিকে কৌলীন্যপ্রথা নিবারণ আইন প্রণয়নের উদ্দেশে ভারত সরকারের কাছে প্রথম আবেদন করেন ‘সমাজোন্নতিবিধায়িনী সুহৃদ সমিতি’ (১৮৫৪)-র সদস্যরা।[3] এই মর্মে বিদ্যাসাগর তাঁর প্রথম আবেদনপত্র পাঠালেন ২৭ ডিসেম্বর ১৮৫৫-য়। এক বছরের মধ্যে আরও দরখাস্ত জমা পড়ল— যেখানে অন্যদের সঙ্গে সঙ্গে দিনাজপুর, বর্ধমান, নদীয়া আর নাটোরের রাজাও সই করলেন। স্থিতাবস্থা বজায় রাখার কৌশলে অবশ্য রক্ষণশীল হিন্দুরা পিছিয়ে থাকেননি; বিধবা-বিবাহর মতো বহুবিবাহর শাস্ত্রীয়তা প্রমাণেও তাঁরা এগিয়েছিলেন রাধাকান্ত দেবের নেতৃত্বে। পাশাপাশি, সেইসময় বহুবিবাহ বন্ধের বিপক্ষে একটি নতুন সম্প্রদায় দেখা দিল। প্রথাটির নিন্দে করেও তাঁরা যুক্তি সাজালেন: চেতনার বিকাশের ফলে সেটি লোপ পাবে, তাই আইনের বাড়তি প্রয়োজন নেই।[4] সব ব্যাপারে সরকারের ওপর নির্ভরশীল থাকার বদলে বরং নিজেদের উদ্যোগে সমাজসংস্কার চাইলেন তাঁরা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠল পাশ্চাত্য ধ্যানধারণায় শিক্ষিত এই সম্প্রদায়টি। এমনকি, সংস্কারের পুরনো ধারার সঙ্গে বাধল তাঁদের সরাসরি সংঘাত। গোঁড়া হিন্দুদের পাশাপাশি এঁদের সঙ্গেও বিদ্যাসাগরকে লড়তে হল।

১৮৫৭-র সিপাহি বিদ্রোহকে নিঃসন্দেহে একটি সন্ধিক্ষণ বলা চলে। ঘটনা এই যে, নানা অসন্তোষ থাকলেও ধর্মীয় ভাবাবেগই শেষ বিচারে ঘটিয়েছিল সরকার-বিরোধী এই জাগরণ। তাই ১৮৫৮-য় ভারত সরাসরি ব্রিটিশরাজের আওতায় আসার পর নজরে এল ধর্মের ব্যাপারে শাসকের সাবধানী মনোভাব। বহুবিবাহ রদ নিয়ে আইন শুধু তখনকার মতো থমকে গেল— এমন নয়, পরবর্তীকালেও বারবার দরবারের পরও সরকারি সাহায্য জুটল না। ১ জানুয়ারি ১৮৬৬-র এক আবেদনে রাধাকান্ত দেবরা টেনে আনলেন মুসলমানদের বহুবিবাহ প্রথা; সরকারের কাছে দাবি করলেন সমমনোভাব। নতুন সম্প্রদায়ের সংস্কারকরা অবশ্য লাগাতার বলে চললেন, শাসকের সহায়তা দরকার নেই। আধুনিক শিক্ষার বিস্তার আর নিজেদের সৎ চেষ্টার ওপর ভরসাই ছিল তাঁদের প্রত্যয়ের ভিত্তি। উল্টোদিকে, আবেদনকারীরা হাঁটতে চাইলেন সংস্কারের চেনা রাস্তায়। মনে রাখতে হবে, সতীদাহ রদ আর বিধবা-বিবাহ চালুর আইন সেই পথের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

বছর দশেকের সাময়িক নীরবতার পর, ১ ফেব্রুয়ারি ১৮৬৬-তে বহুবিবাহ রদ আইন তৈরির জন্যে দ্বিতীয়বার ঝাঁপালেন বিদ্যাসাগর। প্রায় একুশ হাজার সই জুটিয়ে ১৯ মার্চ চব্বিশজনের প্রতিনিধি দল ছোটলাট সিসিল বিডন-এর সঙ্গে দেখা করল; তাঁর কাছে সুরাহার আশ্বাসও মিলল। কিন্তু দেখা গেল, বিল আনার ব্যাপারে বাধ সাধল ভারত সরকার। এমনকি, প্রাদেশিক সরকার বহুবিবাহ সংক্রান্ত সাতজনের যে-কমিটি গঠন করল (সেটির অন্যতম সদস্য ছিলেন স্বয়ং বিদ্যাসাগর) তার বেশিরভাগ সদস্যও আইন তৈরির বিরুদ্ধে মত দিলেন; শিক্ষার প্রসারের ওপরই তাঁরা নির্ভর করতে চাইলেন। মজার ব্যাপার, কমিটির বাকি বাঙালি সদস্যরা (সত্যশরণ ঘোষাল, দিগম্বর মিত্র, রমানাথ ঠাকুর আর জয়কৃষ্ণ মুখোপ্যাধ্যায়) এর আগে পর্যন্ত বহুবিবাহ রদ আন্দোলনে সর্বদা বিদ্যাসাগরের পাশে থেকেছেন; সরকারের কাছে বিভিন্ন সময় আবেদনপত্রও দাখিল করেছেন। স্বাভাবিক, তাঁদের এমন আচরণে রীতিমতো অসন্তুষ্ট হন বিদ্যাসাগর। রাজা-জমিদারদের দলাদলি আর দ্বিচারিতার জন্যে এরপর তিনি আর কখনওই তাঁদের চৌকাঠ মাড়াননি। নিজের মত বিদ্যাসাগর অবশ্য পাল্টালেন না; সাফ জানালেন, বহুবিবাহ আটকাতে পারে শুধুমাত্র আইন।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিদ্যাসাগরের অপেক্ষা ছাড়া গতি রইল না। চার বছর পর, ১৮৭০-এ, অবশ্য কৃষ্ণমণি নামে কুলীন মহিলার খোরপোষ আদায়ের একটি মামলার খেই ধরে বহুবিবাহ নিয়ে শোরগোল শুরু হল আবার। আর সেই সুযোগে বিদ্যাসাগর পেলেন আর-এক দফা লড়াইয়ের সুযোগ। নিজের কাজ হাসিলের ব্যাপারে তিনি ছিলেন সর্বদা নাছোড়। ‘সনাতন ধর্মরক্ষিণী সভা’-র উদ্যোগে তখন পুরনো প্রক্রিয়া ফিরে এসেছে— বহুবিবাহ বন্ধর জন্যে শাস্ত্রীয় সমর্থন খোঁজা আর সরকারের সাহায্য চাওয়া নিয়ে ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে।

১৮৬৬-তেই বহুবিবাহর বিরুদ্ধে শাস্ত্রীয় ভিত্তি জুগিয়ে একটি বই লেখার কাজে হাত দিয়েছিলেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু আইনের জন্যে সরকারি অনুমোদন না-পাওয়ায় সে-কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এবার সেটি নিয়ে তিনি বসলেন। ১০ আগস্ট ১৮৭১-এ বেরোল ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার’।[5] কিন্তু যে ‘সনাতন ধর্মরক্ষিণী সভা’-র সদস্যদের উদ্যোগ দেখে উৎসাহী বিদ্যাসাগর বই শেষ করলেন, তাঁরা অল্পদিনের মধ্যে আইন তৈরির ব্যাপারে পিছিয়ে গেলেন। তারানাথ তর্কবাচস্পতিরও পুরনো অবস্থান তখন পাল্টাল। বহুবিবাহর পক্ষে তিনি খুঁজে পেলেন শাস্ত্রীয় সমর্থন; যদিও ভঙ্গকুলীন ব্রাহ্মণদের আচরণ নিয়ে তারানাথ আপত্তি জানাতে ভোলেননি। তাঁরও মনে হল, বহুবিবাহর সংখ্যা ক্রমশ কমছে; তাই আইনের দরকার ফুরিয়েছে।

দুই

পড়লেই বোঝা যায়, স্রেফ বিরোধী মত খণ্ডনের উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছে ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার’। গোঁড়া হিন্দু থেকে আধুনিক তরুণ— একে-একে সেখানে সকলের বক্তব্যর জবাব দিয়েছেন বিদ্যাসাগর। সাতটি প্রধান আপত্তির মধ্যে মোট চারটি (প্রথম, চতুর্থ, ষষ্ঠ ও সপ্তম) এই আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।

বিদ্যাসাগর ভালোভাবে জানতেন, বহুবিবাহ বন্ধের জন্যে পণ্ডিত সমাজের আক্রমণ রোখা আর সেইসঙ্গে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন কতখানি জরুরি। তাই বিধবাবিবাহ আন্দোলনের মতো এবারও তিনি শাস্ত্রীয় সমর্থন হাজির করলেন। বিধবাবিবাহর প্রস্তাবে বিদ্যাসাগরের ঢাল ছিল কলিযুগের শাস্ত্র—পরাশর-সংহিতা। সত্যযুগের শাস্ত্র বলে মনু-সংহিতা সেক্ষেত্রে সরাসরি বাতিল হয়েছিল। অথচ দেখা গেল, বহুবিবাহ আটকাতে মনুর শরণ নিলেন তিনি— সেখানেই পাওয়া গেল বিবাহর তিন বিধি; কাম্য বিবাহের বেলায় অনুলোমক্রম (অসবর্ণাবিবাহ) পালনের নিদান। বিদ্যাসাগর অবশ্য একইসঙ্গে পাঠককে মনে করালেন, যেহেতু কলিযুগে অসর্বণাবিবাহ নিষিদ্ধ সেইহেতু কোনওভাবেই বহুবিবাহ আর শাস্ত্রসম্মত নয়। স্পষ্ট বোঝা যায়, পণ্ডিতদের মুখ বন্ধের কৌশল ছাড়া শাস্ত্রকে বাড়তি গুরুত্ব দিতেন না বিদ্যাসাগর।

যাঁরা বলছিলেন, বহুবিবাহর সংখ্যা দিন-দিন কমছে, তাঁদের উদ্দেশ্যে পাঁচ বছর আগে তৈরি হুগলি জেলার একটি সাধারণ নমুনা-তালিকার পাশাপাশি বিদ্যাসাগর পেশ করলেন জনাইয়ের কুলীনদের বহুবিবাহের হালহকিকত। পরিষ্কার হল, বহুবিবাহ প্রথায় বিশেষ হেরফের হয়নি; আগের মতোই তা বহাল আছে। বিদ্যাসাগর লিখলেন:

কলিকাতাবাসী নব্যসম্প্রদায়ের অধিকাংশ লোক পল্লীগ্রামের কোনও সংবাদ রাখেন না; সুতরাং, তত্রত্য যাবতীয় বিষয়ে তাঁহারা সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ; কিন্তু, তৎসংক্রান্ত কোনও বিষয়ে অভিপ্রায় প্রকাশের প্রয়োজন হইলে সম্পূর্ণ অভিজ্ঞের ন্যায়, অসংকুচিত চিত্তে তাহা করিয়া থাকেন। তাঁহারা, কলিকাতার ভাবভঙ্গী দেখিয়া, তদনুসারে পল্লীগ্রামের অবস্থা অনুমান করিয়া লয়েন। ঐ সকল মহোদয়েরা বলেন, এ দেশে বিদ্যার সবিশেষ চর্চা হওয়াতে, বহুবিবাহাদি কুপ্রথা প্রায় নিবৃত্তি হইয়াছে।[6]

শহরের মতো গ্রামে যখন আধুনিক ধ্যানধারণার বিস্তার ঘটবে তখনই সার্বিকভাবে কুসংস্কার ও কুপ্রথার অবসান সম্ভব। চারপাশের হাল দেখে বাস্তববাদী বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন, আপনা থেকে সেরকম বৈপ্লবিক সামাজিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা দূর অস্ত।

অভিজ্ঞতা দিয়ে বিদ্যাসাগরের মনে হয়েছিল, সমাজে আগুয়ান মানুষ নিতান্তই কম। তাই আইন ছাড়া বহুবিবাহের মতো সামাজিক সমস্যার চটজলদি ও স্থায়ী সমাধান অসম্ভব। সমাজ সম্বন্ধে সঠিক ধারণা না-থাকায় অনেকেই শিক্ষার প্রভাবে তরুণ বয়েসে শুধু নিজেদের উদ্যোগে সমাজসংস্কারের স্বপ্ন দেখেন। বাস্তব পরিস্থিতি যে একেবারেই অন্যরকম— তা খেয়াল রাখেন না। তাঁর নতুন বিরোধীদের তাই বিদ্যাসাগর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন:

এ দেশের হিন্দুসমাজ ইদৃশ দোষপরম্পরায় পরিপূর্ণ। পূর্বোক্ত নব্য প্রামাণিকদিগকে জিজ্ঞাসা করি, এপর্যন্ত, তাঁহারা তন্মধ্যে কোন কোন দোষের সংশোধনে কত দিন কিরূপ যত্ন ও চেষ্টা করিয়াছেন; এবং তাঁহাদের যত্নে ও চেষ্টায় কোন কোন দোষের সংশোধন হইয়াছে; এক্ষণেই বা তাঁহারা কোন কোন দোষের সংশোধনের চেষ্টা ও যত্ন করিতেছেন।[7]

তা ছাড়া, এও মনে রাখা দরকার, আপনা থেকে বহুবিবাহ বন্ধের জন্যে অপেক্ষাকালীন সময় বহু নারীর সর্বনাশ ঘটবে; ব্যভিচার আর ভ্রূণহত্যাও সমানে চলবে। যুক্তি ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি— কোনওদিক দিয়েই পরিবর্তনের স্বার্থে আইন বাদ দিয়ে স্রেফ দেশের মানুষের ভরসায় বসে থাকা যায় না।

রাধাকান্ত দেবরা সরকারকে জানিয়েছিলেন, মুসলমানদের মধ্যেও বহুবিবাহ চালু আছে; তাই শুধু হিন্দুদের বহুবিবাহ প্রথা রদ অনুচিত। বিদ্যাসাগরের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য, আবেদনকারীদের অভীষ্ট বাংলার হিন্দুসমাজের সংস্কার, অন্যদের নিয়ে তাঁরা ভাবতে অনাগ্রহী।

এরপরও চলল বিশেষত তারানাথ তর্কবাচস্পতির বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগরের তর্কমূলক লেখা— প্রথমে একটি ক্রোড়পত্র (প্রথম প্রস্তাবের দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৮৭২), পরে ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার— দ্বিতীয় পুস্তক’ (১৮৭৩), যেখানে তিনি দিলেন তারানাথের বহুবিবাহের পক্ষে নতুন-নতুন শাস্ত্রীয় প্রমাণের যোগ্য জবাব।[8] পাশাপাশি অব্যাহত থাকল বিদ্যাসাগরের তরুণ বিরোধীদের লেখাজোকা— যেখানে যুক্তি-বুদ্ধি পেরিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ পর্যন্ত জায়গা পেল।

তিন

দেখার ব্যাপার, বহুবিবাহ প্রসঙ্গে বিদ্যাসাগরের নব্য বিরোধীরা কেউই কিন্তু নতুন কথা বলেননি। ১৮৭১-এ সাপ্তাহিক ‘সোমপ্রকাশ’এ দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ আর তারানাথ তর্কবাচস্পতির বক্তব্যের পালটা বিদ্যাসাগরের উত্তর (সে-পত্রিকায় চিঠি আর বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের ক্রোড়পত্র) নিয়ে হইচই শুরুর পর ভূদেব মুখোপাধ্যায় মুখ খুললেন। সময়ের সঙ্গে তারানাথের মত যে বদলাতেই পারে— তা তিনি নিজের পত্রিকায় (এডুকেশন গেজেট) বোঝালেন; এমনকি, পরোক্ষে বহুবিবাহ রদ আইনের বিপক্ষে মতও দিলেন। ন্যাশনাল পেপার-এর সম্পাদক নবগোপাল মিত্রও সাফ জানালেন, যখন ১৮৬৬-তে কমিটির মাধ্যমে বহুবিবাহ নিয়ে ফয়সালা হয়েই গেছে তখন আবার আইনের জন্যে সরকারের কাছে দরবার নিরর্থক। শুধু তা-ই নয়, বহুবিবাহর সংখ্যা দিন-দিন কমছে— এ কথা বলার পর বিদ্যাসাগরের তালিকা নিয়েও নবগোপাল নানা প্রশ্ন তুললেন।[9] কমিটির রিপোর্ট পাওয়ার পর যখন সরকার বহুবিবাহ আইন নিয়ে অনুৎসাহ দেখাল তখন, ১৮৬৭-তে, নবগোপাল উপদেশ দিয়েছিলেন: আন্দোলন ছেড়ে বিদ্যাসাগর যেন মৌলিক সাহিত্যচর্চা শুরু করেন।[10]

তবে বিদ্যাসাগরের বিরোধিতায় সকলকে ছাপিয়ে গেলেন বঙ্কিমচন্দ্র। ‘বঙ্গদর্শন’এর দ্বিতীয় বর্ষ (১৮৭৩)-এর তৃতীয় সংখ্যায় বেরোল ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার— দ্বিতীয় পুস্তক’ নিয়ে বঙ্কিমের সমালোচনা। মনে রাখা ভালো, এখানে বঙ্কিম স্রেফ তারানাথ ও অন্যান্য পণ্ডিতদের বইগুলির উত্তরে বিদ্যাসাগরের দ্বিতীয় পুস্তক নিয়ে আলোচনা করলেন না, বহুবিবাহ নিয়ে বরং সার্বিকভাবে নিজের মতামত দিলেন। একইসঙ্গে সে-লেখায় ফুটে উঠল বিদ্যাসাগর সম্পর্কে বঙ্কিমের ব্যক্তিগত ধারণা। আগেই বলেছি, প্রথম প্রস্তাবে বহুবিবাহ নিয়ে নানা কিসিমের আলাদা-আলাদা আপত্তির জবাব দিয়েছেন বিদ্যাসাগর। পণ্ডিতদের মুখ বন্ধর জন্যে যেমন তিনি শাস্ত্রীয় নমুনা খুঁজেছেন তেমনি শিক্ষিত নব্য সম্প্রাদায়কে যুক্তি দিয়ে বুঝিয়েছেন আইনের প্রয়োজনীতা। অথচ বিদ্যাসাগরের প্রথম প্রস্তাবকে বঙ্কিম দেখলেন একটি সামগ্রিক তর্ক হিসেবে। তাই শাস্ত্র আলোচনার সঙ্গে রাজবিধি প্রণয়নের সম্পর্ক তিনি খুঁজে পেলেন না।

গোড়াতেই নিজেকে “ধর্মশাস্ত্রে সম্পূর্ণ অজ্ঞ” ঘোষণা করে বঙ্কিম বললেন, “এ বিচারে বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রতিবাদীদিগের মত খণ্ডন করিয়া জয়ী হয়েছেন কিনা, তাহা আমরা জানি না।”[11] এরপর ‘অশাস্ত্রজ্ঞ’ বঙ্কিম সিদ্ধান্ত করলেন, “দেশের মধ্যে সুশিক্ষা প্রচার, বা ইউরোপীয় নীতির প্রচার, বা সাধারণ উন্নতির ফল”— যে-কারণেই হোক, বহুবিবাহের সংখ্যা অনেক কমে গেছে, তাই “বহুবিবাহরূপ রাক্ষস বধের জন্য বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ন্যায় মহারথীর ধৃতাস্ত্র দেখিয়া, অনেকেরই ডন্‌কুইক্সোটকে মনে পড়িবে।”[12] এরপরও বিদ্যাসাগরের সমস্ত প্রচেষ্টাকে ক্রমাগত খাটো করে চললেন বঙ্কিম:

কিন্তু সে রাক্ষস বধ্য, তাহাতে সন্দেহ নাই। মুমূর্ষু হইলেও বধ্য। আমরা দেখিয়াছি এক এক জন বীরপুরুষ, মৃত সর্প বা মৃত কুক্কুর দেখিলেই, তাহার উপর দুই এক ঘা লাঠি মারিয়া যান, কি জানি যদি ভাল করিয়া না মরিয়া থাকে। আমাদিগের বিবেচনায় ইঁহারা বড় সাবধান এবং পরোপকারী। যিনি এই মুমূর্ষু রাক্ষসের মৃত্যুকালে দুই এক ঘা লাঠি মারিয়া যাইতে পারিবেন, তিনি ইহলোকে পূজ্য এবং পরলোকে সদ্গতি প্রাপ্ত হইবেন সন্দেহ নাই।[13]

শুধু তা-ই নয়, বহুবিবাহের অশাস্ত্রীয়তা প্রমাণ যে পণ্ডশ্রম, সমাজে যে শাস্ত্রর চেয়ে লোকাচারের মূল্য ঢের বেশি— তাও বলতে ছাড়লেন না বঙ্কিম।

কাম্য বিবাহর বেলায় অনুলোমক্রম (অসবর্ণা বিবাহ) পালনের নির্দেশ দিয়েছেন মনু। তার ভিত্তিতে বিদ্যাসাগর কুলীনদের জঘন্য প্রথার বিরুদ্ধে লড়েন প্রথম প্রস্তাবে। একইভাবে, নৈমিত্তিক বিবাহর জন্যে মনুর দুটি শ্লোক (৯/৮১-৮২) একাধিক বিবাহের শর্ত বলে বিদ্যাসাগর কাজে লাগিয়েছিলেন। কিন্তু একথাও ঠিক যে, কলিযুগে অসবর্ণা বিবাহ নিষিদ্ধ— এই শাস্ত্রমত মনে করিয়ে শেষে বহুবিবাহের যাবতীয় সম্ভাবনা বাতিল করেছিলেন বিদ্যাসাগর। অথচ সে-কথা বঙ্কিম একবারও উল্লেখ করলেন না; উল্টে সমগ্র বিষয়টি নিয়ে কুতর্ক জুড়লেন:

আপনি কতকগুলিন বচন উদ্ধৃত করিয়া বলিতেছেন, এই ২ বচনানুসারে তোমরা যদ্ধৃচ্ছাক্রমে বহুবিবাহ করিতে পারিবে না। ভাল, আমরা তাহা করিব না। কিন্তু সেই সেই বিধিতে যে ২ অবস্থায় অধিবেদনের অনুমতি আছে, আমরা এই দুই কোটি হিন্দু সকলেই সেই ২ বিধানানুসারে প্রয়োজনমত অধিবেদনে প্রবৃত্ত হইব— কেন না সকলেরই শাস্ত্রানুমত আচরণ করা কর্ত্তব্য। আমরা যত ব্রাহ্মণ আছি— রাঢ়ীয়, বৈদিক, বারেন্দ্র, কান্যকুব্জ প্রভৃতি— সকলেই অগ্রে সবর্ণা বিবাহ করিয়া কামতঃ ক্ষত্রিয়কন্যা, বৈশ্যকন্যা, এবং শূদ্রকন্যা বিবাহ করিব। আমাদিগের মধ্যে যখনই কাহারও স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে বচসা করিয়া বাপের বাড়ী যাইবে, আমরা তখনই বিবাহের উদ্দেশ্য অসিদ্ধ বলিয়া, ছোট জাতির মেয়ে খুঁজিব। গৃহিনী যখন ঝগড়া করিয়াছেন, তখন রাগের মাথায় সম্মতি দিবেন সন্দেহ নাই।[14]

প্রথম প্রস্তাবে মুসলমানদের বহুবিবাহ সম্বন্ধে নিজের বক্তব্য পরিষ্কার করেন বিদ্যাসাগর। তবু বঙ্কিম সে-প্রসঙ্গ আনলেন বঙ্গদর্শনএর সমালোচনায়। তাঁর যুক্তি: যেহেতু হিন্দু-মুসলমানের সংখ্যা সমান সেইহেতু বহুবিবাহ রদ আইন দুই সম্প্রদায়ের জন্যেই চালু হওয়া উচিত; মুসলমান প্রজাকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে শুধু হিন্দুদের কথা ভাবতে পারে না সরকার।

বঙ্কিম অবশ্য এখানেই থামেননি। বিদ্যাসাগরের লেখায় বিরোধীদের উদ্দেশে অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ আর তাঁর হামবড়া ভাব নিয়েও শ্লেষাত্মক মন্তব্য করেছেন তিনি। এর জন্যে অবশ্য বঙ্কিম কৈফিয়ৎ দিতেও ভোলেননি। সার্বিকভাবে বিদ্যাসাগরের নানা গুণ স্বীকার আর তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে বঙ্কিম জানান: ‘বঙ্গীয় সাহিত্য হইতে অসভ্যতা কলঙ্ক দূর করিবার প্রয়োজনানুরোধে’ আর ‘কর্ত্তব্যানুরোধেই’ তিনি বহুবিবাহ বিচারে নেমেছেন।

মনে রাখার, বিদ্যাসাগর নীরব থাকলেও (যদিও দ্বিতীয় পুস্তকএর পরবর্তী সংস্করণে তিনি একটি আপত্তিকর শব্দ পাল্‌টে দেন) বঙ্কিমের সমালোচনা নিয়ে অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। বিদ্যাসাগরের মৃত্যুর এক বছর পর, ১৮৯২-এ ‘বিবিধ প্রবন্ধ’ (দ্বিতীয় খণ্ড) যখন বেরোয় তখন ‘বহুবিবাহ’-এ ব্যক্তিগত আক্রমণের অংশগুলি বাদ যায়। প্রবন্ধটির গোড়ায় বঙ্কিম একটি ছোট ভূমিকায় অতীত ও বর্তমানে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন:

বিদ্যাসাগর মহাশয়প্রণীত বহুবিবাহ সম্বন্ধীয় দ্বিতীয় পুস্তকের কিছু তীব্র সমালোচনায় আমি কর্ত্তব্যানুরোধে বাধ্য হইয়াছিলাম। তাহাতে তিনি কিছু বিরক্তও হইয়াছিলেন। তাই আমি এ প্রবন্ধ আর পুনর্মুদ্রিত করি নাই। এই আন্দোলন ভ্রান্তিজনিত, ইহাই প্রতিপন্ন করা আমার উদ্দেশ্য ছিল, সে উদ্দেশ্য সফল হইয়াছিল। অতএব বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জীবদ্দশায় ইহা পুনর্মুদ্রিত করিয়া দ্বিতীয় বার তাঁহার বিরক্তি উৎপাদন করিতে আমি ইচ্ছা করি নাই। এক্ষণে তিনি অনুরক্তি বিরক্তির অতীত। তথাপি দেশস্থ সকল লোকেই তাঁহাকে শ্রদ্ধা করে, এবং আমিও তাঁহাকে আন্তরিক শ্রদ্ধা করি, এজন্য ইহা এক্ষণে পুনর্মুদ্রিত করার ঔচিত্য বিষয়ে অনেক বিচার করিয়াছি। বিচার করিয়া যে অংশে সেই তীব্র সমালোচনা ছিল, তাহা উঠাইয়া দিয়াছি।[15]

চার

আগেই বলেছি ১৮৫৭-র বিদ্রোহ ছিল এক সন্ধিক্ষণ। বলা চলে, সেটির নিরিখে আগুয়ান বাঙালি দুটি পরস্পরবিরোধী দলে ভাগ হয়ে যায়। বিদ্যাসাগর ও তাঁর বেশ কিছু সমসাময়িকের চোখে সিপাহি বিদ্রোহ ছিল এক অনভিপ্রেত ঘটনা। ১৮৫৬-য় বিধবাবিবাহ চালুর পর, বহুবিবাহ রদ আইন যে বলবৎ হল না, তার জন্যে প্রথম পুস্তকের বিজ্ঞাপন-এ সিপাহি বিদ্রোহকেই দায়ী করেন বিদ্যাসাগর:

ব্যবস্থাপক সমাজ বহুবিবাহনিবারণী ব্যবস্থা বিধিবদ্ধ করিবেন, সে বিষয়ে সম্পূর্ণ আশ্বাস জন্মিয়াছিল। কিন্তু, এই হতভাগ্য দেশের দুর্ভাগ্যক্রমে, সেই সময়ে রাজবিদ্রোহ উপস্থিত হইল। রাজপুরুষেরা, বিদ্রোহনিবারণবিষয়ে সম্পূর্ণ ব্যাপৃত হইলেন; বহুবিবাহনিবারণবিষয়ে আর তাঁহাদের মনোযোগ দিবার অবকাশ রহিল না।[16]

বিদ্যাসাগর বুঝেছিলেন, সরকারের সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া তাঁর ঈপ্সিত সমাজসংস্কার প্রকল্পের বাস্তবায়ন অসম্ভব; হিন্দুসমাজের অচলাবস্থা কাটানোর অন্য কোনও উপায় নেই। প্রখর রাজনৈতিকবোধ সত্ত্বেও সরাসরি ব্রিটিশ-বিরোধিতা ছিল রামমোহন-বিদ্যাসাগরের কাছে অবান্তর। ব্রিটিশরা এখানে আসার ফলেই আধুনিক বস্তুবাদী চিন্তাভাবনা মারফত এক নতুন দুনিয়ার হদিশ পাওয়া গেছিল। সে-বিশ্ববীক্ষার ভিত্তিতে তাঁরা নিজেদের চারপাশ বদলাতে চেয়েছিলেন; সরকারের সাহায্য প্রার্থনা এক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিক। তাঁদের স্বাদেশিকতার ধারণা ছিল এরকম।

কিন্তু ১৮৫৭-র বিদ্রোহের এক দশকের মধ্যে ব্রিটিশ শাসন সম্বন্ধে ভিন্ন ধারণা গড়ে উঠল। সিপাহিদের থেকে নতুন প্রজন্মের শিক্ষিত বাঙালি প্রেরণা পেল; জাতীয়তাবাদের যুগ শুরু হল। পাশ্চাত্য চেতনার ভিত্তিতে হিন্দুসমাজের প্রতিক্রিয়াশীল দিকগুলি চিহ্নিত করার পাশাপাশি দেখা গেল প্রাচীন ভারত আর সেইসঙ্গে হিন্দু ধর্মকে নানাভাবে তুলে ধরার প্রবণতা। জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিস্তারের জন্যে এর চেয়ে ভালো কৌশল আর ছিল না। তাই শিক্ষিত ভারতীয়দের বিভিন্ন চাহিদা অর্জনের জন্যে যেমন একে-একে নানা সংগঠন গড়ে উঠল তেমনই জনগণকে জাতীয়তাবাদের আওতায় আনতে শুরু হল ‘হিন্দু মেলা’ (১৮৬৭)। মনে রাখার ব্যাপার, নবগোপাল মিত্র (যাঁকে ‘ন্যাশনাল নবগোপাল মিত্র’ ডাকা হত) হিন্দু মেলার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন।[17]

ব্রিটিশ শাসনে ভারতে জাতীয়তাবাদী চেতনার ব্যাপ্তি ঘটেছে— এ কথা মেনে নিয়েও ঔপনিবেশিক কালের নানা ত্রুটি তুলে ধরেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়। ভারতীয় ঐতিহ্য আর হিন্দু শাস্ত্রের ওপর তিনি বিপুল আস্থা রাখতেন। ভূদেবের মতে, ব্রিটিশরা স্বার্থান্বেষী; শেকল দিয়ে তারা ভারতকে বেঁধেছে আষ্টেপৃষ্ঠে। উল্টোদিকে, হিন্দুদের তিনি মনে করতেন পরোপকারী। তাই ব্রিটিশদের অনুকরণের বদলে ভারতীয়েরা ফিরে পাক তাদের হৃত গৌরব— এমনটাই ছিল তাঁর সাধ। হিন্দু শাস্ত্র ও জাতীয়তাবোধ অনেকসময় ভূদেবের কাছে হয়ে উঠেছে সমার্থক। সেইজন্যে বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ আন্দোলনকে তিনি ভালো চোখে দেখেননি; এমনকি, বিদ্যাসাগর ছাত্রপাঠ্য বইয়ে যে শুধু বিদেশিদের জীবনকথা লিখেছেন— এব্যাপারেও ভূদেবের ছিল বিস্তর আপত্তি।[18]

মনে রাখার ব্যাপার, যে-কমিটি বহুবিবাহ রদ আইন প্রণয়নের বিরুদ্ধে রায় দেয়, বিদ্যাসাগর বাদে সেটির বাকি সব ভারতীয় সদস্য ছিলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (১৮৫১)-এর সঙ্গে যুক্ত। বোঝা যায়, ১৮৫৭-র পর এঁদের সকলের জাতীয়তাবোধ বেড়েছিল। বঙ্কিম এই সংগঠনের সদস্য হন ১৮৬৩-তে।[19] হিন্দু মেলা শুরুর পর ভারতের ঐতিহ্য নিয়ে বঙ্কিম বাড়তি উৎসাহ পেলেন; নিজের লেখায় নানাভাবে হিন্দুদের অতীতের গৌরব উদ্ধার করলেন। বঙ্গদর্শন-এর প্রথম সংখ্যায়, ‘ভারত-কলঙ্ক’-এ, তিনি প্রাচীনকালের হিন্দুদের রণনৈপুণ্য আবিষ্কার করলেন; পাশাপাশি পরবর্তীকালে পরাধীনতার জন্যে ভারতীয়দের স্বাতন্ত্রপ্রিয়তার অভাব খুঁজে পেলেন।[20] সেইসঙ্গে বঙ্কিম এও জানাতে ভুললেন না, ব্রিটিশদের কাছেই জাতীয়তাবোধের শিক্ষা পেয়েছি আমরা— তাই “‘ভারতবর্ষের পরমোপকারী ইংরাজের ধার ভারতবর্ষ কখন শোধিতে পারিবে না।”[21] লক্ষ করার ব্যাপার, বঙ্গদর্শন-এর প্রথম বর্ষ অষ্টম সংখ্যায়, ‘ইংরাজস্তোত্র’-য়, বঙ্কিম বাঙালির ইংরেজ-বন্দনাকে তীব্র ব্যঙ্গ করলেন।[22] বোঝা যায়, ঐতিহাসিকভাবে ভারতে ব্রিটিশদের প্রগতিশীল ভূমিকা স্বীকার করলেও জাতীয়তাবাদের এক নতুন যুগের সূচনা হোক— এমনটাই চাইছিলেন বঙ্কিম। এই নিরিখেই বুঝতে হবে বিদ্যাসাগর সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন। যেখানে বিদ্যাসাগরের স্বাদেশিকতার অভিমুখ ছিল সমাজসংস্কার আর সেইজন্যে তিনি বরাবর ভরসা রেখেছেন সরকারের ওপর, সেখানে বঙ্কিমের সম্বল জাতীয়াতাবাদী চেতনা আর আত্মনির্ভরতা। এর স্বাভাবিক পরিণাম: দুজনের বিবাদ। তবে বঙ্কিমের বিরুদ্ধে বিদ্যাসাগর মুখ না খুললেও বিদ্যাসাগরকে বিদ্ধ করার কোনও সুযোগ বঙ্কিম ছাড়েননি। বঙ্গদর্শন-এর প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায় ভবভূতির ‘উত্তরচরিত’-এর সমালোচনা প্রসঙ্গে বিদ্যাসাগরের কাব্যজ্ঞান নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুললেন; দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যায় ‘তুলনায় সমালোচন’-এ (সেটি বঙ্কিমের নির্দেশে লেখেন অক্ষয়চন্দ্র সরকার) লেখক-প্রকাশক বিদ্যাসাগরকে সরাসরি আক্রমণ করা হলো।[23] আবার ‘ইংরাজস্তোত্র’-য় পাওয়া গেল এমনই এক অনুচ্ছেদ:

আমি বিধবার বিবাহ দিব; কুলীনের জাতি মারিব, জাতিভেদ উঠাইয়া দিব— কেন না, তাহা হইলে তুমি আমার সুখ্যাতি করিবে। অতএব হে ইংরাজ! তুমি আমার প্রতি প্রসন্ন হও।[24]

এছাড়া রয়েছে ‘গর্দভ’, যা বেরয় বঙ্গদর্শন-এর দ্বিতীয় বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা (জুলাই ১৮৭৩)— অর্থাৎ বহুবিবাহ-সমালোচনার পরের মাসে। নাম না-করে এখানে ব্যক্তি বিদ্যাসাগরকে বিঁধলেন বঙ্কিম।[25] প্রসঙ্গত মনে রাখা ভালো, বিদ্যাসাগর ও ব্রিটিশ শাসন নিয়ে এতখানি বিরুদ্ধভাব সত্ত্বেও ভূদেব ও বঙ্কিম— দুজনেই কিন্তু সরকারি চাকুরে ছিলেন; এমনকি, পেয়েছেন সরকারি উপাধি ও খেতাব। বিদ্যাসাগরের মতো তাঁদের অবস্থানকেও দেখা উচিত দ্বান্দ্বিকতার নিরিখে।

কিন্তু মোটের ওপর বলা চলে, নবগোপাল, ভূদেব আর বিশেষত বঙ্কিম যেভাবে বহুবিবাহ ও অন্যান্য বিষয়ে বিদ্যাসাগরের বিরোধিতা করেছিলেন, তা থেকে স্পষ্ট, ১৮৫৭ পরবর্তীকালে স্বাদেশিকতার যুগ পেরিয়ে জাতীয়তাবাদের বিস্তার ঘটছিল, নিজেদের আর ব্রিটিশ শাসন সম্বন্ধে নতুন প্রজন্মর আগুয়ান বাঙালির দৃষ্টিভঙ্গি দ্রুত পাল্টাচ্ছিল।


[1] রামমোহন রায়, রামমোহন রচনাবলী, হরফ প্রকাশনী, ১৯৭৩, পৃঃ ২০২
[2] বিনয় ঘোষ, বিদ্যাসাগর ও বাঙালী সমাজ, ওরিয়েন্ট লংম্যান, ১৯৯৯, পৃঃ ২৮০-৮১
[3] বহুবিবাহ আন্দোলন নিয়ে যাবতীয় খবরাখবরের জন্যে— বিনয় ঘোষ [টীকা ২], পৃঃ ২৭৯-২৯৬; ইন্দ্রমিত্র, করুণাসাগর বিদ্যাসাগর, আনন্দ, ২০১৬, পৃঃ ৩০৩-৩৩০; স্বপন বসু, সমকালে বিদ্যাসসাগর, পুস্তক বিপণি, ১৯৫৯, পৃঃ ৫৫-৯৬; Subal Chandra Mitra, Isvar Chandra Vidyasagar: A Story of His Life and Work (1902), Rupa, 2008, p. 441-454
[4] স্বপন বসু [টীকা ৩], পৃঃ ৫৮
[5] ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বিদ্যাসাগর রচনা সংগ্রহ, দ্বিতীয় খণ্ড, সাক্ষরতা প্রকাশন, ১৯৭৪, পৃঃ ১৫৭-২২৯
[6] পূর্বোক্ত: পৃঃ ১৯৫-৯৬
[7] পূর্বোক্ত: পৃঃ ২০২
[8] পূর্বোক্ত: পৃঃ ২৩১-৩৯২
[9] স্বপন বসু [টীকা ৩], পৃঃ ৭২-৭৩
[10] পূর্বোক্ত: পৃঃ ৬৩-৬৪
[11] ইন্দ্র মিত্র [টীকা ৩], পৃঃ ৩১৫
[12] পূর্বোক্ত: পৃঃ ৩১৬
[13] পূর্বোক্ত: পৃঃ ৩১৬
[14] পূর্বোক্ত: পৃঃ ৩১৭
[15] বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বঙ্কিম রচনাবলী, পাত্র’জ পাবলিকেশন, ১৯৮৩, পৃঃ ২৮৯
[16] ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর [টীকা ৫], পৃঃ ১৫৭
[17] Sumit Sarkar, The Swadeshi Movement in Bengal: 1903-1908, New Delhi: People’s Publishing House, 1994, p. 411
[18] ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের চিন্তাভাবনা নিয়ে সামগ্রিক আলোচনার জন্যে Tapan Raychaudhuri, Europe Reconsidered: Perceptions of the West in Nineteenth-Century Bengal, New Delhi: OUP, 1988, p. 27-104
[19] অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য, বঙ্কিমচন্দ্রজীবনী, আনন্দ, ২০১৫, ৬৬-৬৭
[20] পূর্বোক্ত: পৃঃ ১২৭-২৯
[21] পূর্বোক্ত: ১২৯। বইয়ে জায়গা পাওয়ার সময় প্রবন্ধটি থেকে এই বাক্য বাদ যায়।
[22] বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় [টীকা ১৫], পৃঃ ৮-১০
[23] অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য [টীকা ১৯], পৃঃ ২১১
[24] বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় [টীকা ১৫], পৃঃ ১০
[25] অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য [টীকা ১৯], পৃঃ ২৩৭-৩৮

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...