পর্নোগ্রাফির রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন

দেবকুমার সোম

 


কবি, গদ্যকার

 

 

 

প্রমিত অর্থে পর্নোগ্রাফি কদাচার ফ্যান্টাসি৷ সমাজের অবদমিত যৌনাচার বিকৃতভাবে বিক্রয় করার প্রধান মাধ্যম যা মাদকসেবনের নেশার মতো৷ আদিতে পর্নোগ্রাফি লেখা আর রেখায় বর্ণিত হলেও বিগত কয়েক দশক আর্ন্তজালের মোহমায়ায় এর প্রচার ও প্রসার বহুকৌণিক৷ পর্নোগ্রাফিকে সাহিত্য-শিল্পকলা বলা যায় কি না, এ বিষয় আমরা একটু পরে আলোচনায় আসছি৷ তার আগে এই নিবন্ধে আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্যটুকু স্পষ্ট করে নিতে চাই৷ প্রথমত এই নিবন্ধ বা নিবন্ধকারের উদ্দেশ্য নয় পর্নোগ্রাফির চর্চা৷ অথচ, এই নিবন্ধকার নীতি-পুলিশ নন৷ এখনকার সময় একমাত্র গুগল, অ্যামাজন আর পে-পল্‌ ছাড়া অন্য কোনও ওয়েবসাইটের জনপ্রিয়তা পর্নোসাইটের সমকক্ষ নয়৷ সমীক্ষায় জানা গেছে গত দুই অর্থ বছরে পর্নোহাফ নামের ওয়েবসাইটির মোট ভিউয়ারশিপ সিএনএন বা বিবিসির মতো জনপ্রিয় সাইটের চেয়েও বেশি৷ আন্তর্জালে যে-সব সাইট আছে, তার একচেটিয়া ব্যবসা Mindgeek জার্মান কর্পোরেটের৷ যাদের মোট সম্পদের পরিমাণ বিল গেটসের চাইতেও বেশি৷ পর্নোগ্রাফি মানুষের নৈতিক চরিত্রের অধঃপতন ঘটায় কি না, সেই বিতর্কে এই নিবন্ধ নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করেছে৷

ইউরোপে এনলাইটমেন্ট যুগে (১৬০১-১৮০০ খ্রিস্টাব্দ) মানুষের যৌনাচারকে যুক্তির নিরপেক্ষতায় দেখা শুরু হয়৷ সেই সময় মানুষের উপলব্ধি গির্জায় মোমবাতির চাহিদা কেবল ক্রাইস্টের সামনে আলো জ্বালানোর জন্য নয়৷ তখন পর্নোগ্রাফির উৎপত্তি বা জনপ্রিয়তার যুগ নয়৷ বরং এরোটিকা অর্থাৎ সেক্সচুয়্যাল ফ্যান্টাসি হিসাবে বিষয়টি মান্যতা পায়৷ গত তিনশো বছর ধরে এরোটিকা (বা পর্নোগ্রাফি)-কে সাহিত্য বা চিত্রকলায় সংজ্ঞায়িত করা নিয়ে বিতর্ক চলছে৷ আমরা পণ্ডিত নই, তবে প্রমিত অর্থে ‘সাহিত্য’ কাকে বলে এ ব্যাপারে কিছু আলোকপাত করতে চাই৷ সাহিত্য মূলত লেখক ও পাঠকের সংযোগ৷ সহযোগ৷ এবং সমবায়৷ যুগে-যুগে সাহিত্যের সংজ্ঞা পাল্টেছে৷ এক সময় বাইবেল ছিল সাহিত্য, কিন্তু আজকের সমাজে তা ধর্মগ্রন্থ ছাড়া কিছু নয়৷ বিপরীতে ঋকবেদ এখনও সাহিত্যে আলোচিত হলেও বেদান্ত-পুরাণ ধর্মগ্রন্থ বই কিছু নয়৷ সেদিক থেকে দেখতে গেলে ১৭৪৮ সালে প্রকাশিত মেমোরিজ অফ আ উম্যান অফ প্লেজার সংক্ষেপে ফ্যানি হিল ‘এরোটিক’ নামে নিন্দিত হয়েছিল৷ রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা জারি হয়নি, কিন্তু আদালতে এ নিয়ে বিস্তর যুক্তির আসর বসেছিল৷ ফ্যানি হিল রাষ্ট্রের চোখরাঙানি থেকে বেঁচে গেলেও এই সেদিন পর্যন্ত ক্যাথলিক চার্চ এই বইকে নিষিদ্ধের তালিকায় রেখেছিল৷

এ তো গেল ইংল্যান্ডের কথা৷ ফ্রান্সে একই সময় (১৭৪০) মারক্যুইস দ্য সাদে লিখেছিলেন জুলিয়েট উপন্যাস৷ যা যৌনতার কারণে ১৯৬০ দশক পর্যন্ত খোদ ফ্রান্সে নিষিদ্ধ ছিল৷ উল্লেখ্য এই উপন্যাস আজকের দিনের ফিফটি শেডস্‌ অফ গ্রে-র চাইতে কম এরোটিক নয়৷ ওই একই শতাব্দীতে আরও বহু এরোটিক বইয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়, যাদের পুর্নমুদ্রণ কখনও ঘটেনি৷ মনস্তাত্ত্বিক বিদ্যায় ‘স্যাডিজম’ কথাটার প্রয়োগ মারক্যুইস দ্য সাদে-র নামানুসারে তাঁর রচনার বিশ্লেষণ৷ ডি এইচ লরেন্স ১৯২৮ সালে ইতালিতে বসে লিখেছিলেন, লেডি চ্যার্টালি’স লাভার৷ সেই উপন্যাস ১৯৬০ সাল অবধি খোদ ব্রিটেনে নিষিদ্ধ ছিল৷ ১৯৬০ দশকের পূর্ব পর্যন্ত ইউনাইটেড স্টেটস-এর অর্থোডক্স চার্চের কাছে নতিস্বীকার করে হেনরি মিলার বা অন্যান্য বিট আন্দোলনের লেখক-কবিদের বই রাষ্ট্র প্রকাশ করতে বাধা দিয়েছে৷ জঁ জেনে-র আওয়ার লেডি অফ ফ্লাওয়ার উপন্যাসের ইংরাজি অনুবাদ নিষিদ্ধ ছিল মার্কিন দেশগুলোতে৷ জেনে-কে সমকামী লেখক অভিধায় অভিযুক্ত করে ইউনাইটেড স্টেটস ভিসা দিতে অস্বীকার করে৷

১৯৬০ দশকে এসে সংজ্ঞার পরিবর্তন ঘটল৷ ফ্রান্সে মেয়েদের ব্রেসিয়ার পোড়ানো থেকে যে বিক্ষোভ শুরু, সেই নারীবাদী আন্দোলন ততদিনে বহু পুরনো ধ্যান-ধারণার বিলুপ্তি ঘটিয়েছে। সেই দশক থেকেই এরোটিকার পাশাপাশি পর্নোগ্রাফি শব্দের ব্যবহার শুরু হয়৷ প্লেবয় পত্রিকার স্বত্ত্বাধিকারী হিউজ হফনার-এর পক্ষ নিয়ে কেউ বললেন এরোটিকা যদি সাহিত্য বা আর্ট হয়, তবে পর্নোগ্রাফিও তাই। কেবল দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। বিপরীত যুক্তি হল রেনেসাঁস-এর যুগে নগ্ন পুরুষ বা নারীর যে-সব ছবি বা ভাস্কর্য সৃষ্টি হয়েছিল, সেগুলো এরোটিকা। কারণ তা কোনও যৌন উত্তেজনা নিয়ে আসে না। বিপরীতে প্লেবয় বা প্লেমেট জাতীয় সাময়িক পত্রিকায় নগ্ন মডেলের ছবি ছাপানো হয় মুনাফার লক্ষ্যে৷ সেখানে সেক্সচুয়্যাল ফ্যান্টাসির নামে নারীশরীরকে পণ্য করা হয়। ফেলে দেওয়ার মতো যুক্তি নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে পর্নোগ্রাফি (সফট্‌পর্নো) লাভজনক ব্যবসা হয়ে দাঁড়ালে ১৯৫৩ সালে প্লেবয় আত্মপ্রকাশ করে এবং চাতুর্যের সঙ্গে এরোটিকা আর পর্নোগ্রাফির মধ্যে ব্যবধান ঘুচে যায়৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন যে-সব পত্রিকা যৌনতাকে মূলধন করে ব্যবসা করত, তারা পত্রিকার ঠিক মাঝবরাবর পত্রিকার সেরা (?) নগ্ন ছবিটা ছাপাত। বিখ্যাত কোনও মডেলের, যার যৌন আবেদন সেক্সচুয়্যাল ফ্যান্টাসি পূরণ করে৷ ছবিগুলো হত দু পাতা জুড়ে, আর তা থাকত পত্রিকার ঠিক মাঝখানে ভাঁজ করে৷ সেই থেকে চালু হল ‘সেন্টারস্পেড’ শব্দটি। মার্কিন সৈন্যরা তাদের ব্যারাকে ছবিগুলি পিন দিয়ে ঝুলিয়ে রাখত বলে নাম হল ‘পিন-আপ গার্ল’৷

পর্নোগ্রাফিতে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কীভাবে হয়, সে-সম্বন্ধে আমাদের আলোচনা শুরু করা যাক৷ এই রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন দ্বিবিধ৷ বহিরাঙ্গ ও আভ্যন্তরীণ৷ বহিরাঙ্গ অর্থাৎ বাজার অর্থনীতির সূত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। প্লেবয়-এর সূচনা সংখ্যার মডেল ছিলেন মেরিলিন মনরো৷ তখন বাজারে হাফ-টোন প্রযুক্তি এসে যাওয়ার ছবি টোনাল এফেক্ট নজরকাড়া হল। সূচনা সংখ্যা থেকেই এই সাময়িক পত্রিকা ছড়িয়ে পড়ল। ১৯৬৫ সালে লন্ডনে আত্মপ্রকাশ করল প্লেবয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী সাময়িক পত্রিকা পেন্টহাউস। জনপ্রিয়তা অর্জনে এই পত্রিকার সংযোজন পাঠকের কলম যা মূলত কাগজের সাংবাদিকদের স্বরচিত কদাচারকাহন। এবং গল্প, কবিতা, সামাজিক প্রতিবেদন৷ এক অর্থে প্রচ্ছদ থেকে প্রচ্ছদ যৌন কদাচার-সর্বস্ব কাগজ৷ ইংল্যান্ডে এই কাগজের বিক্রি যথেষ্ট হলেও ইউরোপ-আমেরিকায় প্লেবয় পত্রিকা ছিল জনপ্রিয়তম৷ কেবল মনরো নয়, তখনকার সেরা হলিউডি অভিনেত্রী গ্রেটা গার্বো, ব্রিজিত বার্দোদের অর্ধনগ্ন কামুক ছবি সেখানে সাক্ষাৎকার সহ প্রকাশিত হত। ১৯৬৯ সালে পেন্টহাউস নিউ ইয়র্কে পত্রিকা মুদ্রণের সূচনা করে। এই পত্রিকা মডেলদের সম্পূর্ণ নগ্ন (ফ্রন্টাল নুডিটি) প্রকাশ করে প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে দিল৷ ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য (মনে রাখা প্রয়োজন, পর্নোগ্রাফি পত্রিকার মুনাফার সিংহভাগ ব্যয় হয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব আর হলিউড সিনেমায়) প্লেবয় মডেলদের যৌনকেশ (পিউবিক হেয়ার) সহ নগ্ন ফটোগ্রাফ প্রকাশে কার্পণ্য করল না৷ ততদিনে রঙিন ডিটিপি ছাপা এসে গেছে। সুতরাং ফটোগ্রাফ হয় উঠল যৌন ফ্যান্টাসির খোরাক৷ ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছে গেল যখন হাসলার নামে অপেক্ষাকৃত কমদামি একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ পেল৷ এই পত্রিকার বিশেষত্ব হল বিনি-সুতোয় মডেলদের ছবি ছাপানো। তখন পর্যন্ত নারী শরীরের নিতম্ব প্রদর্শন মার্কিন দেশে ছিল সামাজিক ট্যাবু। হাসলার সেই ট্যাবু তো ভাঙলই, সঙ্গে আমদানি করল ফোন-সেক্স বা সেক্স-চ্যাটের প্রায় প্রতি পৃষ্ঠায় আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন৷ সাবেক সাময়িকগুলো কনডোম ছাড়া অন্য কোনও বিজ্ঞাপন সংগ্রহে ব্যর্থ ছিল৷ ফলে সম্পূর্ণ ছাপা-খরচ আর বিপণন ইন-হাউস খরচে চলত— পত্রিকার দামও তাই হত চড়া৷ বাজারে হাসলার এসে নিম্নবিত্ত মানুষের কাছেও পৌঁছে দিল পর্নোগ্রাফি৷ ফলত দ্রুততার সঙ্গে বাজারে অন্য প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য-সংস্কৃতির কাগজের বিক্রির পরিমাণ কমে গেল। এভাবে পর্নোগ্রাফি-অপসংস্কৃতি এসে ইউরোপ-আমেরিকার সাময়িক পত্রিকার মেরুকরণ ঘটাল৷

এই বিষাক্ত পরিবেশ বাংলা সাময়িক পত্রিকার জগৎকেও কলুষিত করেছে৷ যেমন ১৯৮০-র দশকে পরিবর্তন সাময়িক পত্রিকার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এলাহাবাদ থেকে প্রকাশিত আলোকপাত। পত্রিকাটির ছাপার মান উত্তম, কিন্তু উদ্দেশ্য সাহিত্য-সংস্কৃতির নামে সফট্‌ পর্নো পরিবেশন৷ এর প্রভাবে বাংলা সাময়িক পত্রিকার জগতে উদয় সংকেত বা অপরাধ নামধারী ডজন খানেক পত্রিকা। সেখানে নিকৃষ্ট মানের কাগজ, আর ছবিতে সরাসরি যৌন কদাচার প্রকাশিত হতে থাকলে তখনকার অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত কাগজ প্রসাদ, উল্টোরথ, নবকল্লোল ইত্যাদি ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হল। সংকেত জাতীয় পত্রিকার কোনও কর্পোরেট কাঠামো ছিল না৷ একজনই লেখক, ফটোগ্রাফার, সম্পাদক সবকিছু। সেই সময় ফুটপাতে ফুটপাতে ছেয়ে গেল হলুদ প্রচ্ছদের পর্নোগ্রাফিক সাহিত্য। বাণিজ্যিক থিয়েটারে নাটকের নামে কদাকার নাচ। সিনেমা হলে নুন আর নাইট শোয়ে দক্ষিণভারতে তৈরি সফট্‌ পর্নো প্রদর্শন৷ এই প্রভাব এমন সর্বগ্রাসী ছিল যে ঢাকার ফুটপাত বা রাজশাহীর বুক স্টল ভরে গিয়েছিল নকল সংকেত পত্রিকায়। আর বাংলাদেশের সিনেমাগুলোয় ইচ্ছাকৃতভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া শুরু হল কুরুচিপূর্ণ নাচ তৎসহ দ্বিত্বার্থের চটুল গান৷ এইভাবে দুনিয়া জুড়ে শুরু হল রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের নবযুগ৷ সৎ সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারের পথ বন্ধ হলেও পর্নোগ্রাফি ব্যবসায় কোনও ভাঁটা পড়ল না৷ ১৯৯০ দশক থেকে আর্ন্তজাল পৃথিবীর বাজারকে উন্মুক্ত করে দিল৷ বিশ্বায়নের নামে পুঁজিবাদী অর্থনীতি গরীবের বেঁচে থাকার স্বাভাবিক অধিকারগুলো ছিনিয়ে নিতে লাগল কৌশলে৷ এই কৌশলের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠল পর্নোগ্রাফি৷ পত্রিকা গোষ্ঠী ছাপার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে শর্ট ফিল্ম বানিয়ে ছড়িয়ে দিল আন্তর্জালে৷ মোবাইল হ্যান্ডসেট এসে সামান্য যেটুকু আড়াল ছিল তাও ভেঙে দিল৷ হলিউডের অস্কারের মতো শুরু হল ‘পর্নো অস্কার’ প্রতিযোগিতা৷ পরবর্তী পর্বে অপেশাদার গৃহস্থ ঘরে তৈরি পর্নোগ্রাফি বাজারে ছাড়া শুরু হল৷ প্রায় বিনা শ্রম আর খরচের এই ব্যবসায়িক মডেল সর্বত্র গ্রাস করল৷

আমরা এতক্ষণ পর্নোগ্রাফির রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে আলোচনা করলাম৷ বোঝার চেষ্টা করলাম বাজার অর্থনীতিতে কীভাবে কাজ করছে অপসংস্কৃতির এই মডেল৷ এবার আমরা আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিয়ে কিছু আলোচনা করতে চাই৷

একটা সময় পর্যন্ত পর্নোগ্রাফির ভোক্তা হিসাবে পুরুষরাই ছিল মুখ্য৷ নারীবাদ অন্দোলন যতই মনে করুক নারী আর পুরুষের সমান অধিকার বাঞ্ছনীয়, তবুও পুরুষসমাজ বিশ্বাস করে মহাভারতের সভাপর্বে ভীষ্মের যুধিষ্ঠিরের প্রতি নারী সংক্রান্ত উপদেশ৷ ধর্মাচারীরা মনে করে নারী নরকের দ্বার৷ গৃহীরা তাদের মনে করে যৌনদাসী৷ পুরুষের এই সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন পর্নোগ্রাফির মূলসূত্র৷ কারণ হিসাবে ঘোষণা করা হয় নারীর ছলনা বা তার শারীরিক যৌন আবেদন পুরুষকে যৌন অত্যাচারী হতে বাধ্য করে৷ এইভাবেই সমাজের গরিষ্ঠ অংশের দৃঢ়মূল সিদ্ধান্ত একজন বেশ্যাকে ধর্ষণ করা কোনও অপরাধ নয়। যে নারী সংক্ষিপ্ত ও উগ্র পোশাক পরে তাদের শাস্তি দিতে যৌন নিগ্রহ একমাত্র পথ৷ অতি সম্প্রতি ইউনাইটেড স্টেটস-এর একটি সংগঠন সমীক্ষা করে প্রমাণ করেছে, পর্নোগ্রাফির জনপ্রিয়তার কারণে বর্তমান সময়ে গৃহস্থ নারী নিগ্রহ বা ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলো কমে এসেছে৷ অথচ, আমাদের দেশে বাস্তবিক ঘটনা ঠিক তার উল্টো৷ গ্রামদেশে খোলা জায়গায় নারী শৌচ করতে গেলে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন৷ ইঁটভাঁটায় কিংবা শ্রমিক বস্তিতে স্বাস্থ্যবতী কোনও তরুণীকে ঝুপড়িতে রাখা তাঁর অভিভাবকদের পক্ষে বিপজ্জনক৷ পুরুষের প্রেম নিবেদন ফিরিয়ে দিলে নারীকে ‘অ্যাসিড মারা’ বা ধর্ষণ করে খুন করা আজকের রেওয়াজ৷ পুরুষের এই ক্ষমতায়নের প্রধান কারণ পর্নোগ্রাফির নেশা৷

পর্নোগ্রাফির ভোক্তা শুধু পুরুষ নয়৷ নারী, সমকামী কিংবা তৃতীয়লিঙ্গও। ১৯৮০-র দশক পর্যন্ত এরা সংখ্যায় ছিল ক্ষুদ্র৷ বর্তমানে তারা পিছিয়ে নেই, বরং ভারতের মতো দেশে সেই সংখ্যা আশ্চর্যজনকভাবে বেশি (প্রায় ৩৬ শতাংশ)৷ আদিম সময় থেকে মানুষের যৌনাচার এবং যৌনকাজ বিচিত্রগামী৷ স্বমেহন পুরুষ বা নারীর অতি সাধারণ এক শারীরিক অভ্যাস৷ এছাড়া বহুগামিতা, সমকামিতা, বিষমকামিতা কিংবা তৃতীয়লিঙ্গের সঙ্গে যৌনক্রিয়ার বৈচিত্র্যে কোনও অভাব নেই৷ এহঃ বাহ্য৷ গৃহপালিত কুকুর, বিড়াল বা ঘোড়া, বলদ তারাও সেই আদি যুগ থেকে মানুষের যৌনতার সেই বহুগামিতার উপকরণ৷

প্লেজার-এর বাংলা প্রতিশব্দ যদি শারীরিক সুখানুভূতি হয়, তাহলে বলতে হয় প্লেজার হল নিজের শরীরকে খানিক বেশি ভালোবাসা বা প্রশয় দেওয়া৷ কিন্তু এই ‘প্লেজার’ শব্দটি পর্নোগ্রাফিতে সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ বহন করে৷ আমরা সাদে-র জুলিয়েট-এর কথা আলোচনা করতে গিয়ে স্যাডিসম শব্দের উৎপত্তির ইতিহাস বলেছি৷ উপন্যাসের নায়িকা জুলিয়েটের প্লেজার ছিল প্যারিসের বনেদি ঘরের বউ-ঝি এমনকি নাইট বা উচ্চপদের পুরুষ রাজকর্মচারীদের তার যৌন শিকার বানানো৷ মনস্তাত্ত্বিক বিদ্যায় এই ব্যবহারের নাম ধর্ষকামিতা এবং মর্ষকামিতা৷ পর্নোগ্রাফির ইন্টার-রেসিয়্যাল বিভাগটি দানবাকৃতির কৃষদ্ধাঙ্গ পুরুষ দ্বারা সাদা চামড়ার যৌনক্ষুধাতুর নায়িকার ধর্ষণ৷ আমাদের মনে পড়ে যায় মার্কিন দেশে দাসপ্রথার যুগে সাদা চামড়ার মানুষ কালো দাসী পুষত যৌন কারণে। তেমনই অনেক ক্ষেত্রে লেডি চ্যাটার্লিজ-এর মতো বিপরীত ঘটনা ঘটত৷ বাংলাদেশে একসময় গৃহস্থবাড়িতে দাসী রাখা হত রক্ষিতা হিসাবে৷ সাদা-কালোর এই দুর্লঙ্ঘ্য সামাজিক দূরত্বকে রাজনৈতিক ক্ষমতায় মাপকাঠিতেই বর্ণন করা পর্নোগ্রাফির উদ্দেশ্য৷ সেখানে সাদা চামড়ার নারী যেমন মর্ষকামী, তেমন কালো মেয়েদের সাদা চামড়ার পুরুষের ধর্ষণ ধর্ষকামী৷

পর্নোগ্রাফিতে প্লেজারের আর এক নামে ব্যভিচার৷ ধরা যাক পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্রতম সম্পর্কটির কথা৷ ইংরাজিতে পর্নোগ্রাফি শব্দটির উৎপত্তি গ্রিক শব্দ থেকে, যার অর্থ বেশ্যার সঙ্গে যৌনতা৷ তাই গ্রিক মিথলজি বা সাহিত্যের প্রভাব দেখা যায় এই মাধ্যমটিতে৷ যেমন ‘ইদিপাস কমপ্লেক্স’৷ ফ্রয়েড এই শব্দটি নিয়েছিলেন সফোক্লিস-এর নাটক ইদিপাস রেক্স থেকে৷ যেখানে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে নাটকের নায়ক ইদিপাস তার জন্মদাতাকে খুন করে আর জন্মদাত্রীকে স্ত্রী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়৷ সফোক্লিস তাঁর নাটকে মানুষ কীভাবে তার আপন অহঙ্কারে নিজের পতন ডেকে আনে তাই দেখিয়েছেন৷ ফ্রয়েড এই নাটকের নায়ক-নায়িকার পারস্পরিক সম্পর্ককে যৌনতার মাপকাঠিতে বিচার করেছিলেন৷ যা আজকের দিনে অনেকটাই বাতিল৷ পর্নোগ্রাফি মানবের এই পবিত্র সম্পর্ককে বিকৃতির মধ্যে দিয়ে ফ্যান্টাসাইস করে৷ পুরুষের বয়ঃসন্ধির নারীশারীর সম্পর্কিত স্বাভাবিক কৌতূহলকে পর্নোগ্রাফি জন্মদাত্রী ছাড়াও সৎমা কিংবা মায়ের বয়সী কোনও নারীশরীরকে উপভোগ্য করতে ছাড়েনি৷ ফলে MILF (Mother I Like to Fuck) নামে তৈরি হয়েছে একটি পৃথক পর্ব৷ এও পুরুষের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি বিকৃত রূপ৷

সমকামিতা আজকের দিনে স্বীকৃত সামাজিক সম্পর্ক৷ কিন্তু এখনও এই সম্পর্ককে যৌন কদাচার হিসাবে দেখা হয়৷ ধারণটি তৃতীয়লিঙ্গের ক্ষেত্রে বেশি ভয়াবহ৷ এই সম্পর্ক যেন এক রহস্যময় জগৎ, যে জগৎ সম্পর্কে সংখ্যাগুরু ভোক্তার কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই। সম্পর্কের সামাজিক অবমূল্যায়ন ঘটানোই এর উদ্দেশ্য।

আমরা মহাকাব্য কিংবা মিথলজির দিন বহুকাল হল পেরিয়ে এসেছি। তবু আজও দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধ, ভ্রাতৃহত্যা কিংবা যৌন অনাচার (অজাচার সহ) নিয়ে মুনাফাখোরের রমরমা ব্যবসা৷ এককালে যা ছিল সামাজিক স্বাভাবিকতা, সেই সমাজব্যবস্থা আজ অচল হলেও সেই আড়াই বা তিন হাজার বছর আগের নির্দশনগুলো এই তথাকথিত সভ্য সমাজ ছাড়েনি৷ তার কারণ? মুনাফা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা৷ আজকের রাজনৈতিক ক্ষমতার নিরঙ্কুশ ভোগ একজন মুনাফাখোর পুঁজিবাদীর পক্ষেই সম্ভব৷ ফলে যেনতেনপ্রকারেণ যৌন কদাচারকেও মুনাফার হাতিয়ার করতে হয়৷

আমরা আমাদের নিবন্ধের ইতি টানছি মার্কসিস্ট অর্থনীতিবিদ সামির আমিন-এর একটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে, যা আমদের বক্তব্যের সমর্থন জানাবে:

Generalized, globalized and financialized monopoly capitalism now has nothing to offer the world, other than the sad prospect of humanity’s self-destruction, and further deployment of capital accumulation is inexorably heading in this direction. Capitalism has outlived its usefulness, producing conditions that suggest a necessary transition towards a higher stage of civilization.

(The Imlosion of Comtemporary Capitalism)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...