Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ফেসবুকের ফ্যাসিবাদ— ফ্যাসিবাদের ফেসবুক

শঙ্খদীপ ভট্টাচার্য

 


লেখক প্রাবন্ধিক, গল্পকার, পেশায় কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার

 

 

 

 

আন্তর্জাতিক স্তরে ফেসবুক এখন অধিকাংশ মানুষের জীবনখাতা। ভারতে ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ ফেসবুকে দৈনিক লেনদেনের সাদামাটা থেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরেন। এইসব পোস্টের মধ্যে নিজেদের ফেস নিয়ে বুক বাজানো থেকে শুরু করে ঘৃণা উস্কে দেওয়া কড়া রাজনৈতিক মন্তব্য সমান তালে জায়গা করে নেয়। বিশ্বব্যাপী এইসব তথ্য ফেসবুক মুনাফা বাড়ানোর একরৈখিক উদ্দেশ্যে মোটা টাকার বিনিময়ে বেচেও দেয় বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সংস্থাকে। ইতিহাস তার সাক্ষী।

২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পকে ক্ষমতায় আনতে সাহায্য করেছিল কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা নামের একটি পলিটিকাল কনসাল্টেন্সি ফার্ম। সেই সংস্থার হাতে ছিল মার্কিন নাগরিকদের ফেসবুক থেকে পাওয়া তথ্য, সেই তথ্য ঘেঁটে তাদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করার জন্য দুঁদে মনস্তত্ত্ববিদ ও কৃত্রিম মেধায় পুষ্ট জটিল সব অ্যালগরিদম। ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অনেকেই খেয়াল করে থাকবেন যে বিশেষ কিছু ছবি বা লেখা হঠাৎ উধাও হয়ে গিয়ে সেই জায়গায় ‘Content not available’ জাতীয় কিছু কথা এসে হাজির হয়। আসলে ফেসবুকের community standard মেনে না চলা পোস্টগুলিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এই community standard-এর অন্যতম প্রধান বিষয়টি হল Hate speech। ফেসবুকের নিজস্ব বয়ানে, “We do not allow hate speech on Facebook because it creates an environment of intimidation and exclusion, and in some cases, may promote real-world violence.”। স্পষ্ট এই ঘোষণার জন্য ফেসবুককে বাহবা না দিলেই নয়। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, এই যদি ফেসবুকের গাইডলাইন হয় তাহলে সর্বজনবিদিত একজন উগ্র white supremacist কে ক্ষমতায় আনতে ফেসবুকের এত উৎসাহ দেখা দিয়েছিল কেন?

গত বছরের ঘটনা। জানা গিয়েছে যে ২০শে নভেম্বর ফেসবুকের কর্ণধার মার্ক জাকারবার্গ ও ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ডিনার সেরেছেন। সুস্বাদু খাবার মুখে বৈঠকি চালে কী কথাবার্তা চলেছে তা অবশ্য গোপনই রাখা হয়েছে। সবচেয়ে প্রভাবশালী সামাজিক মাধ্যমটিকে আসন্ন ভোটের স্বার্থে একটি আদর্শ বিজ্ঞাপনের মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করার সুযোগ ট্রাম্প হারাতে চাইবেন না এবং বিনিময়ে জাকারবার্গ পাবেন মামলা মোকদ্দমা থেকে রেহাই ও ট্রাম্প বিরোধী মার্কিন সেনেটেরদের জোয়াল থেকে নিরাপদ দূরত্বে থেকে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার ছাড়পত্র। রাজনৈতিক ও সমাজসচেতন যে কোনও মননশীল মানুষ একথা নিশ্চয়ই বুঝবেন। এই ঘটনার কিছুদিন আগে ১৭ই অক্টোবর জর্জটাউন ইউনিভার্সিটিতে জাকারবার্গ বলেন, “I don’t think it’s right for a private company to censor politicians or the news in a democracy”।

এবার ভারতের দিকে চোখ ফেরানো যাক। কেন্দ্রীয় সরকারের ঘনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ টি রাজা সিং সাম্প্রতিক কালে ফেসবুকে পোস্ট করে বলেছেন যে রোহিঙ্গা মুসলিম অভিবাসীদের গুলি করে মারা উচিত, মুসলিমরা জঙ্গি। মসজিদ ধ্বংস করার হুমকিও নাকি তিনি দিয়েছেন। ফেসবুকের অ্যালগরিদম অনুযায়ী এই পোস্টটি community standard লঙ্ঘন করেছে তা প্রকাশ্যে আনা হয় এই বছরের মার্চ মাসের শেষে। শুধু তাই নয় ফেসবুকের পক্ষ থেকে বলা হয় যে বর্তমান ভারতের সাম্প্রদায়িক হিংসা ও ধর্মীয় চাপানউতোর যে বীভৎস আকার নিয়েছে তাতে এই প্ররোচনাদায়ক বাগাড়ম্বর বাস্তবে মারাত্মক হিংসা ডেকে আনতে পারে। সে কারনেই টি রাজা সিংকে ফেসবুক থেকে আন্তর্জাতিক স্তরে খারিজ করার কথাও বলা হয়। আগাগোড়াই মানবিক ও যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত বটে। কিন্তু চমকে দেওয়ার মতো বিষয় হল টি রাজা সিং বহাল তবিয়তে তার লাখো ফলোয়ারদের নিয়ে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে নির্ঝঞ্ঝাট রাজত্ব করছেন এখনও। তার পক্ষ নিয়ে ফেসবুকের অন্যতম প্রধান public policy executive এবং  কেন্দ্রীয় সরকারের তাবেদার আঁখি দাস বলেছেন যে টি রাজা সিং-এর hate speech-এর ওপর কোনওরকম প্রতিবন্ধকতা আরোপ করা উচিত হবে না। যেহেতু ফেসবুক ব্যবহারকারীদের সংখ্যার নিরিখে ভারত এই সময়ে  সবার আগে তাই আঁখি দাসের যুক্তিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা মানে ভারতীয় বাজারে ফেসবুকের লাগাম আলগা হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। সাদা আধিপত্যবাদী মার্কিন রাষ্ট্র ও কট্টর হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় রাষ্ট্রের বিরাগভাজন না হয়ে বর্তমান পুঁজিবাদী কাঠামোয় বাজারদর বজায় রাখা ফেসবুকের কাছে এই মুহূর্তে রীতিমতো এক চ্যালেঞ্জ। তর্কসাপেক্ষভাবে ধরে নেওয়া যেতে পারে কর্পোরেট জগতের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষটির নাম মার্ক জাকারবার্গ ও রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করা সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানুষটি হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, খুব কাছেই আছেন নরেন্দ্র মোদি। এই তিন মানুষের সাম্প্রতিক মেলবন্ধনের জায়গাটিকে বর্তমান পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার নিরিখে করপোরেট ও রাষ্ট্রের মধ্যের দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে আরও একটু গভীরে গিয়ে বুঝে নেওয়া যাক এবং তা বুঝতে সবার আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে আশির দশকে। Global value chain-এর হাত ধরে বিশ্বায়নের শুরুর সময় তখন।

আশির দশকের শেষের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর সাহায্য নেওয়া হয় মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি www.com-এর। এই প্রযুক্তিকে সামনে এনে সারা বিশ্বে outsourcing-এর নতুন আবহাওয়া তৈরি হয়। বড় বড় শিল্প কারখানাগুলিকে ভাগ করে দেওয়া হয় ছোট ছোট শিল্পকেন্দ্রে। পণ্যকে পৃথিবীর সেই সমস্ত স্থানে সরবরাহ করা হয় যেখানে অনেক বেশি দামে সেই পণ্যকে বিক্রি করা যাবে। পুঁজির এক নতুন কাঠামো তৈরি হয়। বিশ্বগ্রাহ্য অর্থ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় ডলার। এই ডলারের সঙ্গে সোনার তখন আর কোনও সম্পর্ক নেই। ডলার স্বাধীন, বন্ধনমুক্ত। ডলারকে শক্তিশালী করতে নানারকম পন্থার সাহায্য নেয় মার্কিন ট্রেজারি ও ফেডারেল রিজার্ভ। এই সবই শুনতে বেশ গালভরা মনে হলেও বস্তুত অর্থনীতির গোঁজামিল ছাড়া এগুলো আর কিছুই নয় আর গোঁজামিল অর্থনীতি মানেই সঙ্কটের আনাগোনা। মার্কিন কূটবুদ্ধির কৌশলী চালে এই অর্থনৈতিক সঙ্কট রপ্তানি করা হয় সারা বিশ্বে। সস্তা শ্রম ও প্রকৃতিকে নির্বিচারে শোষণের জন্য উন্নত দেশ থেকে বড় বড় শিল্পকে outsource করা হয়েছিল অনুন্নত দেশে। বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলিতে উৎপাদন ঘটবে ও উন্নত দেশগুলি হবে সেইসব উৎপাদিত পণ্যের বাজার। এইভাবে global long value chain-এর জন্ম দেওয়া হয়েছিল ও ডলারকে ঘিরে গড়ে উঠছিল এক নতুন সাম্রাজ্যবাদ। অনেক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মনেই তখন প্রশ্ন উঁকি মেরেছিল, ষাটের দশকে ১ ডলার ছিল ২ টাকার সমান কিন্তু এখন তা কীভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৫ টাকায়? শেষে আর ঠ্যালা সামলাতে না পেরে ডলার সাম্রাজ্যে ধ্বস নামল ২০০৮ সালে। ফলত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা মুদ্রাব্যবস্থার বদলে ভরসা বাড়তে থাকে ‘Network state’-এর অধীনে থাকা মুদ্রাব্যবস্থার উপর। এই নতুন মুদ্রাব্যবস্থার নাম হল ব্লকচেইন। পুঁজির সঙ্কট কাটাতে সমস্ত শক্তি নিয়ে ব্লকচেইন অর্থনৈতিক ময়দানে নামতে সমস্যায় পড়ে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের অধীনে থাকা সমস্ত ব্যাঙ্ক এতদিন নজরদারি চালিয়ে লেনদেনের যাবতীয় ডেটা কাটাছেঁড়া করে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করত। ব্লকচেইন রাষ্ট্র ব্যাঙ্ক কাউকেই তোয়াক্কা করে না। বলা বাহুল্য, আমেরিকা থেকে ভারত, বর্তমানে রাষ্ট্র মানেই জাতীয়তাবাদকে ঘিরে দৌড়ঝাঁপ, জাতীয়তাবাদী নানারকম policy সফল করার নিরন্তর প্রচেষ্টা। কিন্তু উল্টোদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা ছাড়া বিশ্ববাণিজ্য কোনওভাবেই সম্ভব নয়। বস্তুত সরকার ট্যাক্স পায় কেনাবেচার লেনদেন থেকে কিন্তু সমস্ত লেনদেনই যদি কর্পোরেটরা ব্লকচেনের মাধ্যমে চালাতে থাকে তাহলে ট্যাক্স আসবে কোথা থেকে? এই বিরোধের সমাধান হতে পারে তখনই যদি রাষ্ট্রের লাগাম চলে যায় সেই দেশের পুঁজিপতিদের হাতে। রাষ্ট্র তখন পুলিশ মিলিটারি পকেটে রাখা হিন্দুত্ববাদী বা সাদা আধিপত্যবাদী নেতার কর্পোরেট-প্রেম নয়, তখন নিজেই সে হয়ে উঠবে আপাদমস্তক এক কর্পোরেট সংগঠন। এইরকম পরিস্থিতিতে আবার আন্তর্জাতিক বাজারে ইউরোপীয় মুদ্রা ইউরো ও চিনা মুদ্রা ইউয়ানের উঠে আসার সম্ভাবনাও ক্রমশ বাড়ছে। ফলত ট্রাম্প ও তার দোসররা চাইছে, মার্কিন তাবেদার দেশগুলিকে নিয়ে একজোটে short value chain ব্যবস্থায় মনোযোগ দিতে। ভারতের এখানে এক মস্ত বড় ভূমিকা রয়েছে। জল জঙ্গল জমি ও প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য নিয়ে ভারত সবসময়ের জন্যই এক উর্বর ক্ষেত্র। একদিকে ভারতবর্ষের নগরগুলোতে আধুনিক পণ্য-বাজার বিকাশের প্রবল সম্ভাবনা ও অন্যদিকে  পিছিয়ে থাকা দলিত ও আদিবাসীদের সস্তা শ্রমশক্তি। ভারতের বৃহৎ শিল্পগুলিকে টুকরো করে একদিকে দলিত ও আদিবাসী এলাকায় outsource করা হবে, পাশাপাশি উন্নত শহরগুলিতে এই শ্রমজাত দ্রব্যগুলিকে নিয়ে এসে assemble করা হবে উন্নত আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে। এই বিষয়ে অর্থ, জ্ঞান ও প্রযুক্তিগুলি সরবরাহ করবে দেশি বিদেশি পুঁজিপতিরা। ফেসবুক ইতিমধ্যে Jio platform-এ ৪৩,৫৭৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এছাড়াও সদ্যোজাত নয়া শিক্ষানীতির (NEP) আওতায় পিছিয়ে পড়া এলাকায় যে বিদ্যালয়গুলি খোলা হবে তার লাগাম থাকবে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির হাতে এবং পরিকল্পনামাফিক কায়িক শ্রমের জগতে ঠেলে দেওয়া হবে দরিদ্র দলিত, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু শিশুদের। প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করে উৎপাদন ও মুনাফা বাড়ানোর দেদার কাজ চালাতে শ্রম আইন সংশোধন করে কায়িক শ্রমের জগতে চূড়ান্ত শোষণের বন্দোবস্ত করা হচ্ছে। বস্তুত বিচিত্র সব ordinance ও policy সুকৌশলে সামনে এনে short value chain-এর মাধ্যমে মধুর মিলন ঘটছে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গে কর্পোরেট স্বার্থের।

করোনাকালে মুখ থুবড়ে পড়া পুঁজিবাদী কাঠামোকে ঠেলে তুলতে ফেসবুকের সঙ্গে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের আঁতাত অনেক গভীর জলের খেলা যেখানে ফেসবুকের community standard নিবিড় পরিকল্পনায় গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। ফ্যাসিবাদ ও পুঁজিবাদকে দুধেভাতে রাখতে সামাজিক মাধ্যমে পুষে রাখা হয় অসামাজিক hate speech।

 

ছবি ও তথ্যসূত্র:

  1. https://m.facebook.com/communitystandards/hate_speech
  2. https://nytimes.com/2020/06/21/business/media/facebook-donald-trump-mark-zuckerberg.amp.html
  3. https://wsj.com/amp/articles/facebook-hate-speech-india-politics-muslim-hindu-modi-zuckerberg-11597423346
  4. https://indiatoday.in/amp/technology/features/story/facebook-invests-5-7-billion-in-jio-takes-10-percent-share-5-key-points-to-know-1669633-2020-04-22