Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

নিট-জেইই ২০২০ প্রসঙ্গে

শুভার্থ মুখার্জ্জী

 


লেখক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র, ছাত্র আন্দোলনের কর্মী

 

 

 

যখন ২০১৭ সালে নিট পরীক্ষায় বসছি, মনে হয়েছিল এই তো বেশ ভালো, রাজ্য-জয়েন্টগুলো উঠে গেল, আর কোনওদিন দুর্নীতি হবে না। বেশ একটা ‘এক দেশ এক পরীক্ষা’ গোছের আপাত গর্ববোধ। সেবছর পরীক্ষা হল আটটা ভাষায়। পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে দেখছি যারা বাংলা ভাষায় পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের আলাদা প্রশ্নপত্র— তারা পরীক্ষা দিয়েছে সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্নে। ইংরেজি প্রশ্নপত্রের সঙ্গে কোনও প্রশ্নেরই মিল নেই। বাংলা ভাষায় পরীক্ষার্থীদের এই দৃষ্টিকটু বৈষম্য নিয়ে রাজ্যে প্রতিবাদ হল সেবছর।

কলেজে ভর্তি হওয়ার পর দেখছি বৈষম্যের আরেক রূপ। এতদিন শুনে আসতাম গরীব, পিছিয়ে থাকা, গ্রামে থাকা, গ্রামের ইস্কুলে পড়া অনেক ছেলে ডাক্তারি পড়তে আসে ভবিষ্যতে নিজের গ্রামের লোককে ‘সেবা’ করার স্বপ্ন নিয়ে। কলেজে এসে দেখছি এই সেকশনটা বেমালুম ভ্যানিশ। যারা পড়তে এসেছে তারা মূলত শহরকেন্দ্রিক, আর তারা এবং বাদবাকি প্রত্যেকেই কোনও না কোনও ‘স্পেশাল ট্রেনিং’ নিয়েছে বলেই নিটে চান্স পেতে সক্ষম হয়েছে। আকাশ, পাথফাইন্ডার, অ্যালেন বা ন্যূনতম নিজের শহরে ভালো বেশ কিছু নামীদামী শিক্ষকদের কাছে টিউশন না নিয়ে কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছে নিটের মাধ্যমে— এরকম একজনও ছাত্রছাত্রী নেই আমাদের ও তার পরবর্তী ব্যাচগুলোতে।

পুরনো সিনিয়রদের মুখে গল্প শুনি বছর দশেক আগেও সুন্দরবনের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ছেলে পড়তে আসত কলকাতা মেডিকেল কলেজে— বাড়ি যেতে একবার বাস, দুইবার অটো, দুটো নৌকা করে যেতে হত, সময় লাগত বারো ঘন্টা। এখন দশ বছর বাদে এই প্রত্যন্ত গ্রামের ছাত্রছাত্রীরা, যাদের নামীদামী কোচিংয়ে দুই-তিন লক্ষ টাকা খরচ করার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই, তাদের ডাক্তারি পড়তে আসার রাস্তা কার্যত বন্ধ। একটা খুবই ছোট্ট অংশ আসে, যারা কোনও ব্যবসায়িক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ‘সান্নিধ্যলাভ’ করেনি, কিন্তু রামকৃষ্ণ মিশন বা আল আমীন মিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পেয়েছে। তারা সংখ্যায় খুবই অল্প। লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে মেডিকেল কলেজগুলোয় শহুরে এলিটদের সংখ্যা।

আর এই যাবতীয় তিক্ত বাস্তবের মূল রূপকার এই ‘নিট’ (ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট) পরীক্ষা। প্রথমবার সারা ভারত জুড়ে নিট পরীক্ষা হয়েছিল ২০১৩ সালে। তার আগে ডাক্তারি পড়ার জন্য সর্বভারতীয় স্তরের পরীক্ষা ছিল কেবল এইমস, জিপমার, সিএমসি ভেলোর, মনিপালের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক এবং এআইপিএমটি পরীক্ষা, যা সব রাজ্যের মেডিকেল কলেজগুলোর রাজ্য কোটা বাদ দিয়ে বাকি আসনগুলোয় ভর্তির জন্য নেওয়া হত। প্রথমবার নিট পরীক্ষা হওয়ার পর সুপ্রিমকোর্ট এই পরীক্ষা নেওয়া বন্ধ করে দেয়। প্রধান বিচারপতি আলতামাস কবির বলেছিলেন এই পরীক্ষায় সুবিধা পায় ‘মেট্রো সিটির প্রিভিলেজড’ ছাত্রছাত্রীরা। গ্রামের পড়ুয়ারা পিছিয়ে থাকে তুলনায় অনেক।

ফলে পরবর্তী দুবছর আগের মতই চলে ডাক্তারিতে ভর্তির রাজ্য জয়েন্ট পরীক্ষা। পাশাপাশি সর্বভারতীয় পরীক্ষাগুলোয় বসার সুযোগও ছিল। ২০১৬ সালে কোর্ট আগের নির্দেশ প্রত্যাহার করে। সেই বছর রাজ্য জয়েন্টের পাশাপাশি সর্বভারতীয় এআইপিএমটির পরের ধাপে নিট পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। তার পরের বছর থেকে রাজ্য জয়েন্ট পাকাপাকিভাবে তুলে দিয়ে পুরোটাই কেন্দ্রীভূত সিবিএসই বোর্ডের আওতায় নিয়ে আসা হয়। গত বছর থেকে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি এই পরীক্ষার দায়িত্বে আছে।

নিট ২০২০ এবছর হওয়ার কথা ছিল ৫ মে। তখন করোনা অতিমারি সারা দেশে ফেটে পড়ছে ধীরে ধীরে। চিকিৎসাব্যবস্থা নিতান্তই অপর্যাপ্ত, ফলে জনমানসে আতঙ্কও প্রচণ্ড। এই অবস্থায় এমসিআইয়ের নির্দেশে পরীক্ষা পিছিয়ে স্থির হয় জুলাই মাসের ২৬ তারিখ। তখন করোনা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ছাত্রছাত্রীরা দাবী করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর পরীক্ষা নেওয়ার জন্য। পরীক্ষা আরও পিছিয়ে স্থির হয় সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখ। এই সময়ে ভারতবর্ষে দৈনিক ৭৫-৮০ হাজার মানুষ করোনা-আক্রান্ত ধরা পড়ছেন। প্রসঙ্গত, মোট করোনা-আক্রান্তের আশি শতাংশ মানুষ কোনওপ্রকার লক্ষণবিহীন, কিন্তু করোনাভাইরাস ছড়াতে সক্ষম! ওই ধরা পড়া আশি হাজার জনতা মোট আক্রান্তের কুড়ি শতাংশেরও কম।

সুতরাং এই পরিস্থিতিতে এত বড় সর্বভারতীয় পরীক্ষা আয়োজিত করায় ছাত্রছাত্রীদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর। একটু পরিসংখ্যানগুলোর দিকে দেখা যাক।

২০১৭ সালে প্রথমবার যখন নিট আয়োজিত হয়েছিল, মোট পরীক্ষার্থী ছিল এগারো লক্ষ। এবছর সারা ভারতে মোট নিট পরিক্ষার্থী সতেরো লক্ষ। এনটিএ প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গ থেকে সাতাত্তর হাজার ছাত্রছাত্রী এইবছর নিট পরীক্ষায় বসছেন। এই বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রীর জন্য পরীক্ষার সেন্টার পড়েছে মাত্র নয়টি জায়গায়— উত্তর চব্বিশ পরগনা, আসানসোল, বর্ধমান, দুর্গাপুর, হাওড়া, হুগলি, কলকাতা, খড়গপুর এবং শিলিগুড়ি শহরে। সারা দেশে ১৫৪টি পরীক্ষাকেন্দ্রের প্রায় সবকটিই বড় মেট্রো সিটিতে। গোটা উত্তরবঙ্গে পরীক্ষার কেন্দ্র শুধুমাত্র শিলিগুড়িতে!

যদি অতিমারির এই ‘পিক’ পর্যায়ে আমরা আক্রান্ত হওয়ার ভয়কে সম্পূর্ণ ছেড়েও (!) দিই, তাহলে আরেক জ্বলন্ত প্রশ্ন এসে উপস্থিত হয়। গোটা পশ্চিমবঙ্গে মাত্র নয়টি জায়গায় সেন্টার! বেশিরভাগেরই পরীক্ষার সিট পড়ছে একশো-দুশো কিলোমিটার দূরে। দূরবর্তী জেলার, প্রত্যন্ত গ্রামের ছেলেমেয়েরা পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাবে কীভাবে? কলকাতার বাইরের জেলাগুলোয় গণপরিবহনের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। সংক্রমণের ভয় যদি ছেড়েও দিই, তাও জেলার কেন্দ্র শহরে পৌঁছাবার মতো পর্যাপ্ত বাস-অটো নেই।

তাহলে উপায়? যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি আছে, তারা নিজের নিজের গাড়িতে আসবে। যাদের গাড়ি নেই, কিন্তু আর্থিক সঙ্গতি আছে, তারা আট-দশ হাজার টাকা দিয়ে গাড়ি ভাড়া করে আসবে।

আর যাদের আর্থিক সঙ্গতি নেই কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর? তাদের কথা সরকার ভাবে না।

তাহলে মানেটা কী দাঁড়াল? নিটের সিলেবাস পুরোপুরি সিবিএসই-ভিত্তিক। পরীক্ষায় প্রশ্নের ধাঁচও সিবিএসই বোর্ডের প্রশ্নের অনুরূপ। নিটে সেই বোর্ডের এনসিইআরটি বই থেকে হুবহু ‘লাইন তুলে’ প্রশ্ন আসে। ফলে যারা উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ঐ বইগুলি পাঠ্যবই হিসাবে পড়ে, তারা নিঃসন্দেহে অনেক অনেক বেশি প্রিভিলেজড। রাজ্য বোর্ডের অধীন, বিশেষত বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলি, যেখানে পশ্চিমবাংলার অধিকাংশ মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত ছাত্রছাত্রীরা পড়েন, নিট পরীক্ষার সিবিএসই বা এনটিএ যেই হোক, তার কাছে সেই স্কুল বা রাজ্য বোর্ডগুলি দুয়োরানি। রাজ্যের অধীনে উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বোর্ডের অধীন স্কুলগুলি, তাদের সিলেবাসকে কার্যত ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে, পথে বসিয়েই চালু হয়েছে এই নিট পরীক্ষা। এতে সুবিধা পাবে তারাই, যারা সিবিএসই বোর্ডের অধীন বেসরকারি হিন্দি-ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলিতে পড়ছে। নবোদয়-কেভির মতো কিছু অবৈতনিক স্কুল আছে বৈকি, যেখানের ছাত্ররা এই সুবিধা পায়, তবে সেই পরিক্ষার্থীরা অত্যন্ত অল্পসংখ্যক।

ঠিক ততটাই অল্পসংখ্যক, যতটা রাজ্য বোর্ডের স্কুলে বাংলা মাধ্যমে পড়া ছেলেমেয়েরা। সেই অতিক্ষুদ্র অংশটি— যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে বিশেষ কোচিংয়ের পিছনে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করার।

এতদিন নিট চালু করে এইভাবে বৃহত্তর ছাত্রসমাজের ডাক্তারি পড়ার সুযোগকে ছিনিয়ে তো নেওয়া হচ্ছিলই, অন্তত পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগটুকু ছিল (তাতেও পরীক্ষার ফি খুব একটা কম কিছু না। অসংরক্ষিত ছাত্রছাত্রীদের ১৪০০ টাকা, সংরক্ষিত ক্যাটেগরির ৭৫০ টাকা)।

এবার যাদের পকেটে প্রচুর টাকা নেই তারা পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতেও পারবে না!

একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা না বলে পারছি না। আমার পরিচিত এক পরীক্ষার্থীর বাড়ি পূর্ব বর্ধমানে। তার নিট পরীক্ষার সিট পড়েছে বাড়ি থেকে ২১০ কিলোমিটার দূরে। কোনও বাস-অটো কিচ্ছু নেই অতদূর অব্দি যাওয়ার জন্য। মেয়েটির বাড়ি আর্থিকভাবে সচ্ছল, তাই গাড়ি ভাড়া করার জন্য খোঁজ নিতে থাকে। বিস্ময়ের ব্যপার, দশ হাজার টাকা অব্দি অফার করেও কেউ নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে অতদূর যেতে চাইছে না এই প্যানডেমিক পরিস্থিতিতে!

অবশেষে এই মাত্র দুইদিন আগে জানাল ওরা পনেরো হাজার টাকা(!) দিয়ে গাড়ি ভাড়া করতে পেরেছে সেদিন পরীক্ষা দিতে যাওয়া আসার জন্যে।

যাদের যাওয়া-আসার জন্য ব্যক্তিগত পরিবহন নেই, বা ওদের মতো একদিনে পনেরো হাজার টাকা দিয়ে গাড়ি ভাড়া করার সামর্থ্য রাখে না তাদের অবস্থা অকল্পনীয়।

সব মিলিয়ে নিট ২০২০ হতে চলেছে চূড়ান্ত আর্থসামাজিক বৈষম্যের দর্পণ। হয়তো সবটা সরকারি রিপোর্টে দেখাবে না, মিডিয়াও বলবে না। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা আর তথ্য সেটাই বলছে।

কমবেশি একই ছবি দেখা গেছে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সর্বভারতীয় প্রবেশিকা জয়েন্ট এন্ট্রান্স এগজামিনেশন (মেইন) পরীক্ষায়। গত ১-৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই পরীক্ষায় পশ্চিমবাংলার মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় ৭৫ শতাংশ পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতেই পারেনি। সারা রাজ্যে মাত্র আটটি জায়গায় পরীক্ষার সেন্টার হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রীর মতে পশ্চিমবাংলার ৪৬৫২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ১১৬৭ জন বাস্তবে পরীক্ষায় বসতে পেরেছে‌। অর্ধেক পরীক্ষার্থী বাইরের রাজ্যের পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে পেরেছে। কেউ প্রাইভেট লাক্সারি বাস ভাড়া করে, কেউ পঁচিশ হাজার টাকার এসইউভি ভাড়া করে এসেছে কলকাতার কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে। এরপরের জেইই অ্যাডভান্সড (আইআইটি প্রবেশিকা)-এও এরা একইভাবে আসবে। এরা সবাইই আর্থিকভাবে অত্যন্ত সচ্ছল, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আর যারা তা নয়, তারা হয় ঘটি-বাটি বেচে পরীক্ষা দিতে আসবে, নয়তো পরীক্ষা দেবে না এই বছরটা! বা হয়তো আর কোনওদিনই পরীক্ষা দেবে না। কারণ, পরের বছরগুলোতে হয়তো আরও অপ্রত্যাশিত খেল দেখাবে সরকার।

নয়া জাতীয় শিক্ষানীতি এসেছে সম্প্রতি। খুঁটিয়ে পড়লেই বোঝা যায় গোটা নীতিটি আসলে মিছরির ছুরি। মিষ্টি মিষ্টি কিছু কথার আড়ালে শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রীকরণ, গৈরিকীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের রূপরেখা স্পষ্ট। এখানে বিশদে আলোচনা করার পরিসর নেই সে বিষয়ে। তবে কেন্দ্রীকরণের নীতিটি নিট-জেইইর ক্ষেত্রে ভীষণভাবে পরিস্ফুট। আগে যে প্রবেশিকাগুলি ছিল রাজ্য জয়েন্ট বোর্ডের আওতায়, সেই সমস্ত পরীক্ষাগুলিকে আনা হবে একটিই কেন্দ্রীভূত ‘ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি’র আওতায়। অর্থাৎ পরীক্ষা ও তার পরবর্তী উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে রাজ্যগুলির কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আর থাকল না, এবিষয়ে তাদের কোনও মতামতও গ্রাহ্য হবে না। কেন্দ্র সরকার নিজের ইচ্ছেমতো ছাত্রস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত ঘোষণা ও লাগু করতে পারবে। এমনকি বেশ কিছু স্বনামধন্য ডাক্তারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অন্যান্য বছর নিজস্ব প্রবেশিকা পরীক্ষা নিত— যেমন এইমস, জিপমার, সিএমসি ভেলোর। এইসব পরীক্ষাগুলোকে তুলে দিয়ে এবছর থেকে সব নিট পরীক্ষার মাধ্যমে ভর্তি নেওয়া হবে। ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল সহ বাকি সমস্ত স্ট্রিমেই উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের ক্ষেত্রে সাধারণ প্রবেশিকার রাস্তায় হাঁটবে নয়া শিক্ষানীতি। প্রসঙ্গত, এই এনটিএ কোনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সংস্থা নয়। শাসকদলের ‘ইয়েস ম্যান’দের নিয়ে তৈরি এই সংস্থা ভবিষ্যতে শিক্ষার সামগ্রিক বেসরকারীকরণের ব্লুপ্রিন্টকেই কার্যকরী করবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

‘এক দেশ এক পরীক্ষা’, ‘এক দেশ এক রাষ্ট্রভাষা’ ইত্যাকার যাবতীয় নীতি আরএসএসের অ্যাজেন্ডা। যা ভবিষ্যতে শিক্ষাব্যবস্থায় নয়াউদারনৈতিক নীতি কার্যকর করার পথ মসৃণ করছে।

ভারতবর্ষের সামগ্রিক ন্যারেটিভ কিন্তু মোটেও এমনটা নয়! নানাবিধ ভিন্ন জনজাতি, তাদের ভিন্ন ভিন্ন মত, ভিন্ন স্বার্থ, নানাবিধ দর্শনের সংঘাত ও মিলন— এ-ই ভারতবর্ষের ঐতিহ্য। নানা রাজ্য, তাদের আলাদা জাতিসত্তাভিত্তিক দাবীদাওয়া, ভাষাগত ও শিক্ষাগত দৃষ্টিভঙ্গিকে পাত্তা না দিয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা সবকিছুর প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভবনের নীতির প্রয়োগ শুধু ভারতের জাতীয় ঐক্যের পক্ষে ক্ষতিকর তাইই নয়, ছাত্রছাত্রীসহ সমস্ত স্তরের মানুষের স্বার্থবিরোধী।

কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার কুফল বোঝা গেল নিট-জেইই ২০২০তেই। পরীক্ষার সময়, যাবতীয় ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কোনও রাজ্য সরকারের মতামতই গ্রাহ্য হল না। এমনকি সুপ্রিম কোর্ট, যাকে আপামর জনতা ন্যায়বিচারের সর্বোচ্চ ভরসার জায়গা বলে ভাবত, সেখানেও পরীক্ষাসংক্রান্ত যাবতীয় ন্যায্য দাবীদাওয়া খারিজ করে দেওয়া হল। কেন্দ্রের নির্ধারিত সময়েই জেইই পরীক্ষা হল, তার বিষময় ফল ভুগল ছাত্রসমাজ, আর্থসামাজিক বৈষম্য আরেকবার প্রকট হয়ে উঠল শিক্ষাক্ষেত্রে। এনটিএ তার নিজের নির্ধারিত সময়েই নিট পরীক্ষা আয়োজিত করবে। বলাই বাহুল্য, একই খাঁড়া ঝুলছে ছাত্রছাত্রীদের মাথায়।

অন্যদিকে জেনারেল স্ট্রিমের ফাইনাল পরীক্ষার একরোখা ঘোষণাও ছাত্রছাত্রীসমাজে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। প্রাথমিকভাবে সোশাল মিডিয়ায় এই যাবতীয় ক্ষোভ একটু একটু করে প্রকাশ পাচ্ছে, ‘মন কি বাত’-এ ডিসলাইক কয়েক মিলিয়ন ছুঁয়ে যাচ্ছে। চলতি আর্থিক সঙ্কটের বোঝা সরকার চাপাবে সাধারণ মানুষ, ছাত্রছাত্রীদের ঘাড়ে। পড়াশুনোর খরচ, জীবনধারণের খরচ আগামীদিনে আরও বাড়তে চলেছে। নিট-জেইই সহ এই যাবতীয় ঘটনাই জনমানসে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

এই ক্ষোভ বেশিদিন সোশাল মিডিয়ায় আটকে থাকবে না। রাস্তায় আছড়ে পড়তে বাধ্য। এই ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ শিক্ষাব্যবস্থা মুখ বুজে মেনে নেওয়ার দিন শেষ হতে চলেছে।