‘পরীক্ষা-বাতিল’ বনাম ‘পরীক্ষা চাই’— আসলে একই মুদ্রার দুই পিঠ

অরিন্দম

 

 


পেশায় শিক্ষক, সমাজ-রাজনীতির বিষয়ে আগ্রহী

 

 

 

এবছর মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা নেই। মানে হবে না। করোনা অতিমারির কারণে এবছর প্রথমে আমাদের প্রধানসেবক ও পরে আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা করেন। প্রথমেই বলে রাখি আমি পরীক্ষা বতিল হোক চেয়েছিলাম। আমি ব্যক্তিগতভাবে গত বছর থেকেই চেয়েছিলাম স্কুল কলেজ খুলুক, আর যখন তা হল না তাহলে শিক্ষাবর্ষ নতুনভাবে নির্ধারিত হোক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে খালি এই দুটি পরীক্ষাই বাতিল করলেন তা কোনওভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। মনে রাখবেন, এই ছেলেমেয়েদের আতু অংশ (এলিট) ডাক্তারি পড়তে নিট দেবে বা ইনিজিনিয়ারিং পড়তে কেন্দ্র বা রাজ্যের জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেবে। এই পরীক্ষাগুলো কিন্তু বাতিল হয়নি। গতবারও বাতিল হয়নি। কারণ খুব পরিষ্কার। আমরা সবাই জানি এখন এই ধরনের প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলি খুবই ব্যয়বহুল। মধ্যবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত অংশের ছাত্রছাত্রীরাই এতে অংশগ্রহণ করবার ক্ষমতা রাখে। প্রকৃতপক্ষে ডাক্তারি বা কারিগরি শিক্ষার যোগ্যতামান উচ্চমাধ্যমিক হলেও তথাকথিত মেধানির্ণয় করবার জন্য ব্যয়বহুল পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে আমাদের এই রাষ্ট্র। আপনি বলতে পারেন এই পরীক্ষা তো সবাই দিতে পারে। পরীক্ষার ফিও তেমন নয়। আবার সেখানে বিভিন্নধরনের সংরক্ষণও রয়েছে। কথা সেটা নয়, আসলে এই পরীক্ষাগুলির কাঠামোটি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের, তার জন্য প্রস্তুতিও সম্পূর্ণ অন্য ধরনের, এবং শুধু তাই নয় এর বইগুলিও ভিন্ন ধরনের ও দামি। খালি এই প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলিকে কেন্দ্র করেই দেশজুড়ে কোচিং সেন্টারগুলির হাজার হাজার কোটি টাকার শিক্ষাব্যবসা চলে। তাতে নিম্নবিত্ত পরিবারের কোনও ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে সাধারণত এই প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া একপ্রকার অসম্ভব। ফলে এই প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলি মেধা যাচাইয়ের নামে আসলে প্রাথমিকভাবে নিম্নবিত্ত পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের তথাকথিত নিম্ন মেধার অজুহাতে ছাঁটাই করবার পরীক্ষা। তাই এখনও এই পরীক্ষাগুলি বাতিল হয়নি। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাতে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের তবু কিছুটা সম্ভাবনা থাকে ভালো ফল করবার। সেই ফলের তথা মেধার ভিত্তিতে যদি তারা ডাক্তারি বা কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির দাবী জানাতে থাকে তাহলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির উপর চাপ বাড়বে ফি কমানোর জন্য। সরকারি প্রতিষ্ঠানেও উচ্চবিত্তদের জায়গা কম পড়ে যাবে। ফলত মাধ্যমিক, সিবিএসই বা উচ্চমাধ্যমিকে করোনা ছড়ালেও নিট বা জয়েন্ট পরীক্ষাতে করোনা ছড়ানোর কোনও সম্ভাবনাই অতএব থাকতে পারে না। যাই হোক আমরা আমাদের আলোচনার বিষয় থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। যদিও পরে এই অর্থনৈতিক বিষয়েই ঢুকতে হবে। খালি আপাতত মনে রাখি যে, সমস্ত ধরনের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা বাতিল হলেও ডাক্তারি বা কারিগরি শিক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলি বাতিল হয়নি।

আবার পাশাপাশি এই পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণামাত্র এবং তার অল্প আগে থেকেই কিছু শিক্ষক সংগঠন এবং তথাকথিত বামপন্থীদের একাংশ যেভাবে পরীক্ষা নেওয়ার দাবী তুলতে থাকে তাও খুবই বিস্ময়কর। যখন কোটি কোটি পরিবারের হাতে কাজ নেই, উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলি ঝড়ে বিপর্যস্ত, তখন তারা তথাকথিত মূল্যায়নের দাবী করছে। এমনিতেই যখন নিম্নবিত্ত ছাত্রছাত্রীরা অনলাইন পদ্ধতির ফলে পড়াশুনো থেকে বিচ্ছিন্ন, তখন তাদের পরীক্ষা নেওয়ার দাবী কোন শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করবে তা নিয়েও আলোচনা জরুরি।

 

প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণাকে কি স্বাগত জানানো যায়?

এই অতিমারি পরিস্থিতি হঠাৎ করে হয়নি। গত বছরও এই পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছিল। এবার পরিস্থিতি যে আরও ভয়ঙ্কর হবে তার আঁচ আগেই ছিল। কেন্দ্র রাজ্য উভয়েই শিক্ষাক্ষেত্রে তার প্রভাব সম্পর্কে চরম উদাসীনতা দেখিয়েছে। যদিও এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এই উদাসীনতা স্বাভাবিক। প্রথম ধাক্কাতেই সরকার অনলাইন পদ্ধতিতে পড়াশুনো শুরু করে দিল। যে দেশে অর্ধেক লোকের নুন আনতে পান্তা ফুরোয় সে দেশের বেশিরভাগ ছাত্রছাত্রীরা অনলাইনে পড়াশুনো করবার বিলাসিতা দেখাবে না এটাই স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী বা তাদের দলের মন্ত্রীসান্ত্রীদের কাছে মেহনতি মানুষদের সন্তানদের এই দুরবস্থা কোনও অর্থই বহন করে না। কারণ, তাঁরা যে শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করেন সেই শ্রেণি গরীব মানুষদের জন্য গরিবি শিক্ষার একটি পদ্ধতি তৈরি করাতেই বিশ্বাসী। সবার জন্য সমমানের শিক্ষা তাদের ধারণাতেই নেই। মনে রাখতে হবে, এই অতিমারিতে স্কুলকলেজ বন্ধ হওয়াতে মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত ঘরের ছাত্রছাত্রীদের মানসিক চাপ জাতীয় রোগের কিছু প্রাদুর্ভাব ঘটলেও তারা খুব বেশি অসুবিধের সম্মুখীন হয়নি। অসুবিধেয় পড়েছে নিম্নবিত্ত কায়িক পরিশ্রমে যুক্ত মানুষগুলোর সন্তানেরা। তাদের না আছে অতিরিক্ত ফোন, না আছে প্রতিমাসে ইন্টারনেট জোগানোর মতন পয়সা। (যদিও তাদের এই অসহায়তাকে নিয়ে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট কোম্পানিগুলি ভালোই মুনাফা কামিয়েছে)। আদতে তারা পড়াশুনো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে শুধু নয়, তারা অনেকেই শিশুশ্রমিকে পরিণত হয়েছে। সারা পৃথিবীতে এই অতিমারি সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে দরিদ্রদের। গত কুড়ি বছরের মধ্যে এবার পৃথিবীতে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। খালি তথ্যগতভাবেই চুরাশি লক্ষ। ভারতে বা পশ্চিমবঙ্গে তার প্রভাব বেশি বই কম নয়। মেহনতি শ্রেণির মানুষের কাছে পড়াশুনো বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। তাদেরকে শিক্ষার পরিবেশে ফিরিয়ে আনবার কোনও প্রয়াস প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীদের মধ্যে দেখা যায়নি। যেন এই অতিমারিতে, ঝড়ে, বন্যায় তারা পড়াশুনো থেকে বিচ্ছিন্ন হবে এটাই স্বাভাবিক। পরে যখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তখন স্কুলছুটদের জন্য কোনও হাতেকলমে কাজ শেখা বা ভোকেশনাল শিক্ষার বন্দোবস্ত করলেই হবে। তাই না?

যারা পড়াশুনোর বাইরে চলে গেল তারা তো গেল। এর মধ্যেও যারা কষ্টেসৃষ্টে টিকে থাকল সেইসব মাঝারি মানের ছাত্র, যাদের গৃহশিক্ষকও নেই, অথচ তারা মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক দেবে, সেই তারা গত চার মাস ধরে সরকারের পরীক্ষা নিয়ে টালবাহানায় চরম বিপর্যস্ত। অথচ সরকারের সামনে বহু রাস্তা খোলা ছিল এই পরিস্থিতি হতে পারে মনে রেখে কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার। গত বছর থেকেই ধীরে ধীরে স্কুল-কলেজ খুলে সিলেবাসের চাপ কমিয়ে পড়াশুনো শুরু করা যেতে পারত। অঞ্চলভিত্তিক বা পাড়াভিত্তিকভাবে বিদ্যালয় শিক্ষকদের ব্যবহার করে ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো শুরু করা যেত। কিন্তু এইসব কঠিন সামাজিক উদ্যোগের রাস্তায় তারা হাঁটতে রাজি নয়। এর ভিতরেও মন্দের ভালো হত যদি তারা এই পরীক্ষাবর্ষটিকে বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনাসম্পন্ন শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ছয়মাস থেকে আটমাস পিছিয়ে দিতেন। কিন্তু সেটাও ওঁরা করবেন না। কারণ, তাহলে কী হবে অমিতবিত্তসম্পন্ন সেইসব পরিবারের সন্তানদের যারা ইতিমধ্যেই বিদেশি বিদ্যালয়ে বা কলেজে ভর্তি হবে বলে বসে আছে! শিক্ষাব্যবসায়ী যারা ডাক্তারি, কারিগরি শিক্ষার কলেজ খুলে বসে আছেন তাদের কী হবে? ছাত্র ভর্তি না হলে তাদের মুনাফায় ঘাটতি হবে যে। তাদের হয়ে শেয়ারবাজারের জুয়াড়িরা যে পয়সা লাগিয়েছে তাদের স্বার্থ দেখতে হবে বই কি! মনে রাখবেন দেশের মানুষ যখন লকডাউনে দিশেহারা, কিশোরকিশোরীরা শিক্ষাবিচ্ছিন্ন, তরুণতরুণীরা ভবিষ্যৎহীন, কর্মহীন, তখনও শেয়ারবাজার কিন্তু রমরমিয়ে চলছে। সুতরাং এই বিত্তশালী শ্রেণিদের জন্য যেভাবে হোক একটি মূল্যায়ন জরুরি। ফলে তাঁরা সহজ রাস্তায় হাটলেন এবং পরীক্ষা বাতিল করে দিলেন। যারা পড়াশুনো থেকেই বিচ্ছিন্ন তাদের কাছে এই পরীক্ষা হওয়া বা বাতিল বা বিকল্প মূল্যায়নের আসলে কোনও মূল্যই নেই। এই পরীক্ষা বাতিল করার পরে যে মূল্যায়নই হবে তার সুযোগ বিত্তশালী শ্রেণিই গ্রহণ করবে। পরীক্ষার্থীদের সুরক্ষার দোহাই পেরে পরীক্ষা বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীরা পেটোয়া সংবাদমাধ্যমের পিঠচাপড়ানির কল্যাণে তাঁদের অপদার্থতা আপাতত ঢাকলেন বটে, কিন্তু ইতিহাস অবশ্যই বিচার করবে তাঁরা কতটা নির্মম, ঘৃণ্য।

 

আর কী হবে তথাকথিত উদারবাদী পরীক্ষাকাতর সংস্কৃতিবানদের

এই পরীক্ষা বাতিলের পরপরই আমার এক সাংবাদিক বন্ধু বলেছিল “যাক বাবা, বাঁচা গেল। সাক্ষাৎকারের নামে এবার অন্তত ওই বোর্ডের পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করা ছেলেমেয়েগুলোর মুখ দিয়ে মিথ্যে কথা বলাতে হবে না। বুঝলি সদ্যতরুণ মেধাবী এই ছাত্রছাত্রীরা শুরু থেকেই কী করে মিথ্যে কথা বলে সমাজকে সন্তুষ্ট রাখতে হয় তা শিখে যায়।” মূলত বেশিরভাগ জীবনবিছিন্ন, স্কুলে প্রায় না-যাওয়া প্রাইভেট টিউশন-নির্ভর বিত্তশালী পরিবারের এই তথাকথিত ভালো ছাত্রছাত্রীরাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আসল মুখ, মূল্যায়ন পদ্ধতির আসল চেহারা। তথ্য দিয়ে প্রতিমুহূর্তে দেখিয়ে দেওয়া যায় এই চালু শিক্ষাব্যবস্থা আর তার মূল্যায়ন পদ্ধতি কতটা শ্রেণিপক্ষপাতদুষ্ট। এই শিক্ষা প্রতিমুহূর্তে মেহনতি মানুষদের পরিবারকে তাত্ত্বিক জ্ঞান-বিচ্ছিন্ন করবার চেষ্টা চালাচ্ছে। খালি একটা তথ্য দিয়ে জানাই, ২০১৮ সালে সারা দেশে দশম শ্রেণির পরীক্ষায় বসেছিল প্রায় দুই কোটি পরীক্ষার্থী আর ২০২০ সালে দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় বসে প্রায় এক কোটি তেতাল্লিশ লক্ষ। তাহলে বাকি সাতান্ন লক্ষ কোথায় হারিয়ে গেল? মনে রাখতে হবে ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে জানাচ্ছে ২০১৭-১৮ সালে দেশের ৩ কোটি ২২ লক্ষ বাচ্চা স্কুলছুট ছিল। (Out of school children likely to double in India due to Corona virus, মিন্ট, ১৬ জুন)। অর্থাৎ ২০১৮ সালে যখন ২ কোটি বাচ্চা দশম শ্রেণির পরীক্ষা দিচ্ছে তার দেড় গুণ বাচ্চা পরীক্ষাব্যবস্থার বাইরে। আর যারা পরীক্ষা দিল তাদের ২৫ শতাংশ দুই বছরের মানে ২০২০-র মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে চলে যাবে। এবং এই অতিমারির পরিস্থিতিতে এই স্কুলছুটের সংখ্যা সাড়ে ছয় কোটির কাছাকাছি দাঁড়াবে বলে ওই সমীক্ষা আশঙ্কা প্রকাশ করছে। সুতরাং যাঁরা পরীক্ষা হল না বলে বা বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে গেল বলে চিৎকার করছেন তাঁরা কাদের কোন ভবিষ্যৎ রক্ষার কথা বলছেন? যে বাচ্চারা স্কুলমুখো হল না, পয়সার অভাবে পড়াশুনো ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে, অনলাইন পদ্ধতির সুযোগ নিতে পারছে না, ইন্টারনেটের যোগাযোগই নেই তাদের জন্য কোনও কথা নেই। কিন্তু পরীক্ষা তথা মূল্যায়ন করতে হবে। অর্থাৎ বলবান একজন ব্যায়ামবীরের বিরুদ্ধে একজন অনাহারক্লিষ্ট দুর্বল মানুষকে বক্সিং রিং-এ নামিয়ে এক বীভৎস মজা দেখার চেষ্টা করছে তথাকথিত বামপন্থী, উদারবাদী বলে পরিচিত শিক্ষককুল। আসলে যাঁরা পরীক্ষা বাতিল করছেন আর যাঁরা পরীক্ষা চাইছেন তাঁরা কেউই স্কুলছুট বাচ্চাদের কথা বা শিক্ষার মূল লক্ষ্য যে জ্ঞান অর্জন তার কথা ভাবতে রাজি নন। এঁদের মধ্যে আদতে কোনও পার্থক্য নেই। পশ্চিমবঙ্গের এক বাম অধ্যাপক নেতা তো পরীক্ষা বাতিলের বিরোধিতা করতে গিয়ে ‘দুয়ারে সরকার’-এর আদলে ‘দুয়ারে পরীক্ষা’ চেয়েছেন। শুধু তাই নয় ১৩ জন উপাচার্য অধ্যক্ষ ‘এডুকেশনিস্ট ফোরামের’ পক্ষে এই দাবী করেছেন যে “ছাত্রছাত্রীরা এতদিন ধরে প্রস্তুতি নেওয়ার পরে পরীক্ষা না হলে অনেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে…” (গণশক্তি, ৯ জুন)। কাদের কোন মূল্যায়নের কথা এঁরা বলছেন! তারা, যারা এই সময়েও অনলাইন পদ্ধতিসহ সমস্ত আধুনিক সুযোগ গ্রহণ করতে পেরেছে সেই আর্থিক ক্ষমতাসম্পন্ন আতু পরিবারের (এলিট) ছাত্রছাত্রীদের মানসিক অবস্থার কথা ভাবতে চেয়েছেন। আর সেই ছয় কোটি ছাত্রছাত্রী তারা পরীক্ষা তো দূর অস্ত, স্কুলমুখোও হতে পারবে না তাদের মানসিক অবস্থার কী হবে! তারা যদি আপনাদের তথাকথিত পরীক্ষা নামক মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বসতে বাধ্য হয়, আপনারা অনায়াসে তাদের নিম্ন মেধার ছাত্রছাত্রী বলে ছাপ মেরে দেবেন।

আসলে এই দুই পক্ষই যেভাবে হোক একটা মূল্যায়ন করতে চান। মানে উচ্চমেধা আর নিম্নমেধার এই বিভাজন করতে চান। যারা পরীক্ষা চান তারা আসলে আরও বৈধতার সঙ্গে বিত্তশালী পরিবারের বাচ্চাদের জন্য ‘উচ্চমেধার’ ছাপ চান। যেন তথাকথিত বিকল্প মূল্যায়নের নামে স্কুলছুট বাচ্চারা ভালো নম্বর না পেয়ে যায়। তাহলে তো মেধানির্ণয় গুলিয়ে যাবে।

 

প্রতিটা সঙ্কট আমাদের শিক্ষিত করে তোলে

এই অতিমারি আমাদের অনেক কিছু শেখাল। যেমন এই চরম বৈষম্যযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থার ঘোমটাটা ছিঁড়ে ফেলে দিল। অনলাইন শিক্ষা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এই সমাজ একরকম কৃত্রিম মেধার চাষ পরিকল্পনামাফিক করে চলেছে। যে অনলাইন শিক্ষা সমাজের একটি বড় অংশকে স্কুলছুট করে তুলছে অথচ সরকারি নির্দেশিকা জারি করবার চেষ্টা চলছে উচ্চশিক্ষায় চল্লিশ শতাংশ অনলাইন করবার। সুতরাং ‘পরীক্ষা’ বা ‘পরীক্ষা নয়’ এই বিতর্কে আসলে শিক্ষাব্যবস্থার দীন ব্যবসায়ী চেহারাটাই আড়াল হচ্ছে। যারা পরীক্ষা বাতিল করছে তারা অন্যান্য প্রবেশিকা পরীক্ষা বাতিল করেনি। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় নতুন নিয়ম করে ভর্তির মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করছে যাতে বিত্তশালীদের ‘উচ্চমেধা’র ছাপের বৈধতা থাকে। আর যারা পরীক্ষা চাইছে তারা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার চালু মূল্যায়নকে ডাক্তারি বা কারিগরি শিক্ষার প্রবেশিকার পরীক্ষার মূল্যায়ন বলে মানতে রাজি নয়। দুপক্ষই আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে কী করে উচ্চশিক্ষা থেকে নিম্নবিত্ত পরিবারের একটি বড় অংশকে ছেঁটে ফেলা যায়। অথচ দাবী হওয়া উচিত ছিল ‘সবার জন্য সমমানের জ্ঞান-অর্জন পদ্ধতি। শিক্ষাবর্ষ বাতিল অথবা পিছিয়ে দিয়ে স্কুল-কলেজ বিমুখ হওয়া শিশু-কিশোর-সদ্য তরুণদের শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা। পরীক্ষার বা মূল্যায়নের নামে ছাঁটাই ব্যবস্থা নয়। জ্ঞানার্জনের মূল্যায়ন হোক।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...