Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বেশি বিচলিত হবেন না

প্রবুদ্ধ বাগচী

 


লেখক প্রাবন্ধিক, গদ্যকার, সমাজভাবুক

 

 

 

 

যাদের বয়স এখন পঞ্চাশ পেরিয়েছে, ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বরের সেই কালো রবিবার সম্ভবত আমরা কেউই ভুলিনি। তখন টিভি চ্যানেল বলতে একমাত্র সরকারি দূরদর্শন, প্রযুক্তি তেমন পাকাপোক্ত নয় যে ওই দানবীয় কাজের টিআরপি পেতে ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। তবু দূরদর্শনে দেখা গিয়েছিল কীভাবে মসজিদের চুড়োয় উঠে প্রচণ্ড আস্ফালনে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে পাঁচশো বছরের সৌধ। অবশ্য তার আগেই দেশজোড়া রথযাত্রা সাজিয়ে লৌহপুরুষ আদবানি সারা দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর কাজটা করেই রেখেছিলেন। রামশিলা ও করসেবা নামের দুটি শব্দ বেশ চালু হয়েছিল বাজারে। এলাকায় এলাকায় দিব্যি রামভক্ত গজিয়ে উঠেছিল এবং তারা রামশিলা নিয়ে পুজোআচ্চা চালু করে দিয়েছিল পুরোদমে। জনশ্রুতি এই যে সেই সময়ের হঠাৎ ‘রামভক্ত’দের মধ্যে কিছু বাম-ও ছিল অন্তত যারা এই বাংলায় উদ্বাস্তু হয়ে এসে বামদের হাত ধরেছিল নিজেদের জীবন ও জীবিকার স্বার্থে। আদবানির দল, তাদের দেশ ছাড়ার পুরনো ব্যথাটার সঙ্গে একটা সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় মশলা জুড়ে দিয়ে খানিকটা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের মতো তাদের উস্কে দিতে পেরেছিল। খেয়াল করতে হবে সেই সোমনাথ মন্দির থেকে ‘দাঙ্গারথ’ নিয়ে বেরিয়ে উত্তেজনা ছড়াতে ছড়াতে তা পৌঁছেছিল কলকাতায় এবং নিরাপদে পশ্চিমবঙ্গ পেরিয়ে যাওয়ার পরে বিহারে লালুপ্রসাদ যাদব সেই রথের গতি আটকান এবং রথের সওয়ারিকে আটক করেন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল, সেই মামলায় এমন কিছু রায় আসেনি যাতে লৌহপুরুষের রাজনৈতিক কেরিয়ারে কোনও মরচের দাগ পড়ে।

তাই আজ, বাবরি মসজিদ ভাঙার দুষ্কৃতী ও তাদের পান্ডাদের বেকসুর খালাস পাওয়া নিয়ে যাঁরা বিচলিত বোধ করছেন তাদের জন্য কয়েকটা কথা বলার দরকার মনে করছি। আইনের ছাত্র না হয়েও যেটুকু ভারতীয় বিচারব্যবস্থাকে বুঝেছি তাতে এটা মনে হয়েছে, অন্তত নিম্ন আদালতে বিচার হয় সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আইনের ছোট পরিধির মধ্যে— তার কাছে কোনও ঘটনার সামাজিক রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রনৈতিক মাত্রা বিচার্য হয়ে ওঠে না। কখনও কখনও উচ্চ আদালত অনেক সময় বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিত দেখে তাদের রায় দেন কিন্তু নীচের আদালতে তার কোনও জায়গা নেই। বাবরি মসজিদ পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে দেওয়া দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার নিরিখে এক কলঙ্কের কথা, সন্দেহ নেই। কিন্তু আইন এইসব কলঙ্ক বা তার বৃহত্তর তাৎপর্য বোঝে না, তার কাছে এটা একটা ফৌজদারি মামলা। সেই মামলায় বিচার্য, মসজিদ যারা ভেঙেছে বলে বা ভাঙার প্ররোচনা দিয়েছে বলে অভিযুক্ত, তারা সত্যিই দোষী কি না। একটা পাতি খুনের মামলা বা সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের মামলার সঙ্গে তার তেমন মূলগত প্রভেদ নেই।

এখন এটা প্রমাণ করতে গেলে যারা ভেঙেছেন তাদের ভাঙার সাক্ষী জোগাড় করতে হয়, যারা উত্তেজক কথা বলে ভাঙার প্ররোচনা দিলেন তাদের বক্তব্যের প্রামাণ্য নথি জোগাড় করতে হয়। প্রামাণ্য নথি কথাটা খেয়াল করা দরকার। বাবরি মামলার অনেক বছর পরে প্রযুক্তির তাক লাগানো বাড়বাড়ন্তের মধ্যেও এই রাজ্যের নারদা মামলায় যে ভিডিও ফুটেজগুলো আদালতে প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছিল তা আজও প্রামাণ্য বলে বিবেচিত হয়নি। তাহলে বাবরি ভাঙার মামলায় ওই সব নথির কোনওটাই কি পাওয়া সম্ভব? লক্ষাধিক করসেবক জড়ো হয়েছিলেন সেদিন অযোধ্যায়, তাদের ব্যক্তিগত পরিচয় কোথাও লিপিবদ্ধ নেই। তাদের মধ্যে কারা মসজিদের চূড়ায় উঠে গাইতি শাবল চালাচ্ছিলেন তাদের নাম ধাম কোথাও লেখা ছিল না। তারা যখন ওই কুকর্ম করছিলেন কেউ তাদের চিনে রাখবে, পরিস্থিতি এমন ছিল না মোটেও। যারা উঁচুগ্রামে বক্তৃতা দিয়ে উত্তেজনা ছড়াচ্ছিলেন তাদের ভিডিও বা অডিও ক্লিপিং কোথাও প্রামাণ্যভাবে সংগ্রহ করে রাখা হয়নি। খেয়াল রাখতে হবে, ওই ১৯৯২ সালে উত্তরপ্রদেশে বিজেপি পরিচালিত সরকার ছিল যারা এই অপকর্মের সমর্থক, ফলে পুলিশ প্রশাসন কোথাও কোনও সক্রিয় ভূমিকায় ছিল না। তাহলে কীভাবে প্রমাণ হতে পারে ওই মানবেতররা সেদিন দাঁড়িয়ে থেকে মসজিদ ভাঙিয়েছিলেন? দলবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে আসলে এটাই অ্যাডভান্টেজ। একজন বা দুজন ব্যক্তিকে কোনওভাবেই চিহ্নিত করা যায় না। ফলে কে অপরাধী সেটা আড়াল হয়ে যায়। যেমন হয় গণপিটুনিতে হত্যা বা গণধর্ষণের ক্ষেত্রে— এক্ষেত্রে নিশ্চয়ই অভিযুক্তরা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতাকে এরকমই নৃশংসতা উপহার দিয়েছিলেন— কিন্তু হলে হবে কী? কেউ তো তাদের আলাদা করে চিনে রাখেনি। সুতরাং যা হওয়ার তাই হয়েছে। আদালতকে দোষ দিয়ে খুব একটা লাভ নেই। আদালত তার আইনের পরিধির মধ্যে সংশয়াতীতভাবে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে না পারলে তাকে শাস্তি দেবে কী করে?

বিষয়টা আসলে খুব নতুন কিছু নয়। বিশ্বসুদ্ধু মানুষ জানেন, ২০০২-এর ফেব্রুয়ারিতে গুজরাতে গণহত্যা সংগঠিত হয় প্রত্যক্ষভাবে সেই রাজ্যের বিজেপি সরকারের প্রশ্রয়ে এবং সেদিনের গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী তথা আজকের ভারতের প্রধানমন্ত্রীর অধিনায়কত্বে। পরিস্থিতি এতদূর পর্যায়ে পৌঁছেছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি ফোনে তাকে নির্দেশ দেন প্রশাসনকে সক্রিয় করতে। কারণ, অবস্থা মোকাবিলায় সেনা ডাকা হলেও তাদের বিমানবন্দরে বসিয়ে রেখে দলপুষ্ট হিন্দুবাদী গুন্ডাদের সংখ্যালঘু নিধনে কোনও বাধা দেওয়া হয়নি। তারপরে সারা দেশে এই নিয়ে আলোড়ন উঠেছিল, অনেক অনেক মামলা হয়েছিল। একটা মামলাতেও প্রমাণ করা যায়নি প্রশাসনের সব থেকে উঁচু মাথারাই আসলে এই নিধনযজ্ঞের নাটের গুরু। একমাত্র ইশরাত জাহান মামলায় দেশের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কিছুদিন হাজতবাস হয়েছিল, তারপরে সব মিটমাট হয়ে গেছে— কিচ্ছু প্রমাণিত হয়নি। ঘাতকরা ক্লিন চিট পেয়ে ক্ষমতার আরও উঁচু ধাপে উঠে গেছেন। চুরাশির দিল্লিতে শিখনিধন যজ্ঞের ক্ষেত্রেও অবস্থাটা প্রায় একইরকম। এইচকেএল ভগত, জগদীশ টাইটলার প্রমুখ স্বনামধন্যরা আইনের তোয়াক্কা না করলেও আইন তাদের ছুঁতে পারেনি। তার একমাত্র কারণ সমস্ত কাজটাই হয়েছিল দলবদ্ধভাবে সারা দিল্লি জুড়ে— কোথায় কে কী করছেন তার অনুপুঙ্খ নথি পুলিসের পক্ষে রাখা সম্ভব ছিল না, যাতে আলাদা করে কাউকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা যায়।

একটু খেয়াল রাখতে বলি, আরও আগে, সত্তরের দশকে পশ্চিমবাংলায় রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কথা কে না জানেন— কিন্তু অনেক কমিশন আইন আদালত করেও কিছুই প্রমাণ করা যায়নি। একটা পুলিশ অফিসারকেও শাস্তি দেওয়া যায়নি, উল্টে বরং কেউ কেউ পরের দিকে প্রোমোশন পেয়ে গেছেন। বরানগর কাশীপুরে যে পরিকল্পিত গণহত্যা হয়েছিল সেই ঘটনা আজও সেখানকার প্রবীণ মানুষের মুখে মুখে ফেরে, সেই কুকাজের পেছনে কারা কীভাবে ছিলেন তার তথ্য পরে অন্য নানা সূত্রে প্রকাশ হয়েছে— কিন্তু যারা দোষী তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করা যায়নি। জরুরি অবস্থার সময়েও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে নানাভাবে আঘাত করা হয়েছে, ঘটে গেছে প্রচুর ‘একসেস’— কিছুমাত্র কি প্রমাণ করা গিয়েছিল? মনে পড়ে নন্দীগ্রাম আন্দোলনের কথা। আইন আদালত সিবিআই করেও কাউকে এক আনা দোষী বলে প্রমাণ করা গিয়েছিল কি? অথচ চোদ্দ জন মানুষ যে মারা গিয়েছিল সেটা তো সত্যি! তার আগে ৯৩-এর একুশে জুলাইয়ের কথা— সেখানেও তো এতবার তদন্ত করেও কাউকে দোষী প্রমাণ করা যায়নি! এমনকি রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পরেও তৈরি হয়েছিল একটি তদন্ত কমিশন— কিছু কী নতুন আলো পড়েছে সেই ঘটনায়? অথচ অতগুলো মানুষ যে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গিয়েছিলেন সেটা তো প্রত্যক্ষ ঘটনা! আবার ধরা যাক, রিজওয়ানুর রহমানের মৃত্যুর পেছনে যে কিছু পুলিশ আধিকারিক ও অশোক তোদির হাত ছিল সবাই জানত, কিন্তু সিবিআই হাজার চেষ্টা করেও ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা’ প্রমাণ করতে পারেনি— আদালতে কিছুই টেকেনি। রিজওয়ানুরের মারা যাওয়ার যতদিন পরে সিবিআই তদন্ত ভার নিয়েছিল ততদিনে আর প্রমাণ করার মতো কিছু অবশিষ্ট ছিল না। তাই, আইনের নিরিখে এইসব প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠল। তাই বলছিলাম, ব্যাপারগুলো এইরকমই। বেশি বিচলিত হবেন না।