এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি

এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি | প্রবুদ্ধ বাগচী

প্রবুদ্ধ বাগচী 

 

আমাদের সেই কিশোরবেলায় গান শোনা ব্যাপারটা ছিল পরনির্ভর। নিজেদের ঘরে খুশিমতো গান শোনার যন্ত্র এসেছে অনেক পরে। তার আগে তো রেডিওয় প্রচার করা গানের ওপরেই মিটত আমাদের গানের ক্ষুধা। এইভাবেই কোন এক অতীতকালের মন্থর দুপুরে কানে এসে লেগেছিল একটি গানের সুর— ‘এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি’। পুরনো রেকর্ডিঙের দৌলতে সেই গলায় তেমন কোনও ‘বাস এফেক্ট’ ছিল না, পরিবর্তে ছিল কিছুটা খোনা খোনা স্বর। একদম চেনা রবীন মজুমদার। সেকালের নায়ক-গায়ক। এই গানের কথা লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুর করেছিলেন কমল দাশগুপ্ত। ‘যোগাযোগ’ চলচ্চিত্রের সূত্রে বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল এই গান, সেটা ১৯৪৩ সালের কথা। আমরা জীবনে কত ভুলই যে করি, তার মধ্যে কিছু কিছু নিশ্চয়ই ‘মধুর’ বলে মনে করেছিলেন ওই গানের কথাকার সুকবি প্রেমেন্দ্র মিত্র।

প্রেমেন্দ্র মিত্র মশাই গত হয়েছেন ১৯৮৮ সালে, তিনি কলকাতায় যে পাড়ায় থাকতেন গত প্রায় চার দশক ধরে সেই পাড়ার পরিচয় রাজ্যের বিরোধী নেত্রী ও পরে মুখ্যমন্ত্রীর পাড়া বলে। বর্তমান রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান সদ্য একটি ‘ভুল’-এর কথা স্বীকার করায় আকস্মিক মনে পড়ে গেল সেই কবেকার শোনা গানের পঙক্তি। আর তার সঙ্গে মিলে গেল প্রেমেন্দ্র মিত্র আর তার পাড়া। এই ‘ভুল’ আসলে করব্যবস্থায় জিএসটি মেনে নেওয়ার ব্যাপারে রাজ্যের ‘ভুল’ যা সম্প্রতি জানিয়েছেন মাননীয়া তাঁর এক জনসভায়। তাঁর উপলব্ধি এই ব্যবস্থার ফলে রাজ্যের রাজস্ব প্রাপ্তিতে ভাঁটা এসেছে, নিজেদের প্রাপ্য আদায় করার ব্যাপারে বড় বেশি কেন্দ্রের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হচ্ছে। কথাটা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি। কিন্তু এটা কি ক্ষণিকের একটা উপলব্ধি? নাকি সত্যিই এক বড়সড় বিষয়ের দিকে আঙুল তোলা? অথবা ইচ্ছে করলেই কি এই ‘ভুল’ এড়ানো যেত?

এইসব প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবতে গিয়েই ঘুরেফিরে এসে পড়ে কিছু কথা। জিএসটি (জেনারেল অ্যান্ড সার্ভিস ট্যাক্স) জমানার সূত্রপাত হয়েছে জুলাই ২০১৭ সালে যখন নোটবন্দির ক্ষত আর্থিক দুনিয়ায় সেইভাবে শুকোয়নি। একথা আমরা এখন সকলেই বুঝে গেছি, দেশের প্রধানমন্ত্রী ভদ্রলোক সব কিছুতেই একটু বাড়তি চমক দিয়ে মিডিয়ার নজর কাড়তে পছন্দ করেন। আর এই ‘সোপ অপেরা’র প্রথম এপিসোড ছিল নোটবন্দির সিদ্ধান্ত— এই সিদ্ধান্তে দেশে বড়সড় একটা কিছু ঘটে যাবে এমন একটা সম্ভাবনার রোমাঞ্চ তৈরি করে এই ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’ নেওয়া হয়েছিল নাটকীয়ভাবে। তাঁর পরের এপিসোড হল জিএসটি সারা দেশে কার্যকর করা— এখানেও বলা হয়েছিল ‘এক দেশ এক ট্যাক্সব্যবস্থা’র মতো একটি ছেঁদো তত্ত্ব, যা আসলে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটার মূলে কীটনাশক ঢেলে দেওয়ার মতোই বিপজ্জনক নাশকতা। সেই পুরনো নাশকতা আজ কেন্দ্রের সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে এমন একটা ক্ষমতা যা অন্যান্য রাজ্য সরকারগুলিকে সহজেই তাঁদের ‘তাঁবেদার’ করে রাখতে পারে। কিন্তু আজকের এই বাস্তবতা অনেকগুলো ঐতিহাসিক ঘটনার ধারাবাহিক পরিণতি যেগুলোকে অস্বীকার করে এইরকম সাময়িক ‘ভুল’ বা ‘সঠিক’ নির্ণয়ের রাস্তা নেই।

স্বাধীনতার আগে এমন একটা ভাবনা গড়ে উঠেছিল যে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় রাজ্যের হাতেই বেশি ক্ষমতা ন্যস্ত থাকবে— কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকবে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, মুদ্রা এইধরনের কিছু জরুরি বিষয়। কিন্তু আদপে যখন সংবিধান রচনা হয়ে প্রকাশ্যে এল তখন দেখা গেল প্রাদেশিক সরকারগুলির হাতে অনেক জরুরি বিষয়ই আর নেই। সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্র-রাজ্য ক্ষমতা বণ্টনের যে তালিকা তাতে রাজ্যের হাতে ক্ষমতার ভার সীমিত, বেশ কিছু বিষয় (শিক্ষা, স্বাস্থ্য ইত্যাদি) যৌথ তালিকায় থাকায় সেইসব ক্ষেত্রে কেন্দ্রের ‘সুপ্রিমেসি’ সরাসরি সংবিধান স্বীকার করে নিয়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে রাজ্যের সরকারগুলির অধিকার কেবলমাত্র বাণিজ্যকর আদায়েই মূলত সীমাবদ্ধ থাকল। সরকারের রাজস্বের প্রধান উৎস যে আয়কর বা অন্তঃশুল্ক বা কর্পোরেট কর তা আদায় করে কেন্দ্রের সরকার। এর একটা অংশ আনুপাতিক হারে রাজ্যে ফিরিয়ে দেওয়ার সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা থাকলেও সবসময়েই যে এই প্রথা মেনে চলা হয়েছে তা নয়। রাজ্যের হাতে আর যেসব কর আদায়ের রাস্তা আছে যেমন প্রমোদ কর, চুঙ্গি কর, পথ কর, পেশা কর ইত্যাদি, সেগুলোর পরিধি তেমন চওড়া কোনওদিনই ছিল না যে ওইসব করগুলি থেকে রাজ্যের সরকার তাদের খরচের বেশিটাই তুলে নিতে পারে। ফলে রাজ্যের সরকারের মূল রাজস্বের উৎস ছিল বাণিজ্য কর— এই করের হারে কম-বেশি করে সরকার তার ব্যয়বরাদ্দ তৈরি করতেন।

এই ব্যবস্থাটায় পরিবর্তন আসে যখন সারা দেশে বাণিজ্য কর তুলে দিয়ে ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স বা ভ্যাট চালু করার কথা বলা হয়। এটা বিশ্বায়ন-উত্তর অর্থনীতির অবদান। কিন্তু আমাদের মতো যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় যেখানে রাজ্যগুলির হাতে রাজস্ব আদায়ের উপায় সীমিত সেখানে বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির দেশগুলির দোহাই দিয়ে ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করা ছিল রাজ্য সরকারগুলিকে আরও বেশি কোণঠাসা করারই একটা প্রয়াস। দেশে ভ্যাট আইনগতভাবে চালু হয় ২০০৫-এ, তখন কেন্দ্রে ইউপিএ-১ সরকারের শাসনকাল, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং।

এখানে একটা বিশেষ প্রসঙ্গের অবতারণা না করলেই নয়। স্বাধীনতার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের শাসনভার তিন দশক ন্যস্ত ছিল মূলত কংগ্রেস দলের হাতে। যেহেতু কেন্দ্রেও বেশিটা সময় জুড়ে ওই একই দলের শাসন ফলে কেন্দ্র-রাজ্যের ক্ষমতার তুল্যমূল্য বিচার সেইভাবে কেউ করতে চাননি। সাতাত্তর সালে রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার আসার পরেই কেন্দ্র ও রাজ্যের ক্ষমতার বৈষম্য ও তার ফলে রাজ্যের ক্ষমতা খর্ব ও সঙ্কুচিত হওয়ার প্রশ্নটা সামনে আসে। এই মৌলিক প্রশ্নটি নিয়ে বামফ্রন্ট ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে সৃষ্টি হয় দ্বৈরথ, রাজ্যের পাবলিক ডোমেনে চলে আসে এই কেন্দ্র-রাজ্য বিরোধের চর্চা। তাত্ত্বিকভাবে এই বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন প্রথম দুটি বাম সরকারের অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র। সেই সময়ের সংবাদপত্রে এই নিয়ে অনেক কৌতুকনাট্য রচিত হলেও— যেমন, কেন্দ্র মেঘ পাঠাচ্ছে না বলে রাজ্যে বৃষ্টি হচ্ছে না বা সবই কেন্দ্রের দোষ— আদপে যে ব্যাপারটা যে অত লঘু নয় তা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখে গেছেন, তথ্য জুগিয়ে গেছেন অশোক মিত্র। খুব সিরিয়াসভাবে সেগুলো পড়লে বোঝা যায় যে আসলে করব্যবস্থা নিয়ে সত্যিই আমাদের সংবিধান নিতান্তই একচোখা। আর বহুক্ষেত্রেই কেন্দ্রের রাজস্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজ্যের সাংবিধানিক দাবির বাইরেও এসে দাঁড়ায় রাজ্যের শাসক দলের রংবিচার। আশির দশকে এই ঘটনা বারবার ঘটেছে। রাজ্যের চাপে কেন্দ্র সারকারিয়া কমিশন গঠন করলেও তার সুপারিশগুলি তাঁরা হিমঘরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। ফলে করব্যবস্থার সংস্কার যদি এমন হয় যে তাতে রাজ্যের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় সেখানে বামপন্থীদের প্রতিবাদী উপস্থিতিই যেন ছিল কাঙ্ক্ষিত।

কিন্তু আমরা ঘটতে দেখেছিলাম তার বিপরীতটাই। ভ্যাটব্যবস্থাটায় রাজ্যের একমাত্র রাজস্বের উৎস বাণিজ্য করের ওপর রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে যাওয়ার প্রবণতা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। কিন্তু সারা দেশে ভ্যাট চালু করার আগে সমস্ত রাজ্যের অর্থমন্ত্রীদের নিয়ে যে বিশেষ এমপাওয়ারমেন্ট কমিটি গঠিত হয়েছিল, তার চেয়ারম্যান ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের বাম সরকারের অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত। যে বাম সরকারের অধিনায়কত্বে একদিন কেন্দ্র-রাজ্য আর্থিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস নিয়ে সারা ভারতে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, যে শিবির থেকে বারবার উত্থাপিত হয়েছিল রাজ্যের হাতে বেশি ক্ষমতা দেওয়ার দাবি, এমনকি এরই সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দূরদর্শনের দ্বিতীয় চ্যানেল রাজ্য সরকারের পরিচালনায় রাখারও প্রস্তাব পর্যন্ত তোলা হয়েছিল কেন্দ্রের সরকারের কাছে— সেই বাম সরকারের অর্থমন্ত্রীই ভ্যাট প্রবর্তনার সঙ্গে জড়িয়ে গেলেন আষ্টেপৃষ্ঠে! বাণিজ্য করব্যবস্থার সোনার হাঁসটিকে গলা টিপে মেরে নিজেদের হাত নিজেই বেঁধে ফেললেন তাঁরাই? মনে পড়ছে, এই একটা সময় অশোক মিত্র বারবার লিখেছেন ভ্যাটব্যবস্থার মাধ্যমে রাজ্যের সরকার আসলে নিজে যে ডালে বসে আছেন সেই ডালটিকেই কেটে ফেলার বন্দোবস্ত করলেন।

কার্যত জিএসটি-ব্যবস্থা ছিল ওই ভ্যাট-প্রবর্তনার পরের ধাপ। ব্যবস্থাটি অত্যন্ত জটিল, কম্পিউটার-নির্ভর এবং সাধারণ ব্যবসায়ীদের পক্ষে একেবারেই অনুকূল নয়। যদিও তত্ত্বগতভাবে বলা হয়েছিল, এর ফলে মানুষের কাছে ‘ডবল ট্যাক্সেশন’ প্রথার নাকি অবলুপ্তি ঘটবে, যা বলা হয়েছিল ভ্যাটের বেলাতেও। কিন্তু এই ‘সুবিধা’ চালু হওয়ার যে অন্য একটা দিক ছিল সেদিকটা তেমনভাবে কেউ নজরে আনেননি। আমাদের সাংবিধানিক ব্যবস্থা একেবারে তালিকা করে কোনটা রাজ্যের বিষয় কোনটা কেন্দ্রের বিষয় বা কোনগুলো যৌথ তালিকার বিষয় তা স্থির করে দিয়েছে। সেই হিসেবে বাণিজ্যকর ঠিক করা ও তা আদায়ের দায় রাজ্যের হাতেই ছিল, ভ্যাটব্যবস্থা তাকে সঙ্কুচিত করে। কিন্তু জিএসটি সেই সাংবিধানিক ব্যবস্থাটাকেই অস্বীকার করে সবটাই নিয়ে আসতে চায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে, কার্যত বিশেষ কোনও রাজ্যের হাতে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে দরকার মতো করব্যবস্থার সংস্কারের অধিকার সম্পূর্ণ বিলোপ পেয়ে যায় জিএসটি-র ক্ষেত্রে। কোন পণ্যের ওপর কী হারে জিএসটি বসবে তার অধিকার চলে যায় জিএসটি কাউন্সিলের ওপর— এই কাউন্সিল কি সাংবিধানিক? এমন কি কোনও প্রতিষ্ঠান তৈরি হতে পারে, যা সাংবিধানিক বৈধতাকে লঙ্ঘন করতে পারে? কার্যত জিএসটি-ব্যবস্থা চালু করা মানে ওই সাংবিধানিক কাঠামোটাকেই অস্বীকার করা। তাহলে তো দরকার ছিল সংবিধান সংশোধন করে কেন্দ্র-রাজ্য কর-কাঠামোর রীতিনীতিকে বদল করার— কই? তা কি করা হল?

আসলে এইখানেই সেই ‘মধুর’ ভুলের প্রসঙ্গ আবার ফিরে আসে। জিএসটি-ব্যবস্থা চালু হলে যে প্রাথমিকভাবে রাজ্যগুলির রাজস্বের ভাগ কমবে, এটা বহু বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিকই হিসেব করে দেখিয়েছিলেন। করকাঠামো ও কর আদায়ের ক্ষেত্রে আরও বহুগুণ সঙ্কুচিত হবে রাজ্যের স্বার্থ, কেন্দ্রের মুখাপেক্ষী হওয়ার প্রবণতা বাড়বে আরও অনেকগুণ। প্রথম থেকেই জিএসটি কাউন্সিলের সদস্যরা এনিয়ে নানা আলোচনা করেছেন— কিন্তু কেন্দ্রের সরকারের পক্ষে যেহেতু ‘এক দেশ এক কর’ ছিল আসলে একটি রাজনৈতিক স্লোগান— ফলে তারা স্তোকবাক্য শুনিয়ে গেছে, প্রথমদিকে রাজ্যের যা আর্থিক ক্ষতি হবে তা কেন্দ্রীয় সরকার পুষিয়ে দেবে। বিস্ময়ের কথা হল, ভ্যাট চালুর সময় যেমন এমপাওয়ার্ড কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন বাম সরকারের অর্থমন্ত্রী, ঠিক তেমনই জিএসটি-র ক্ষেত্রে এই বিষয়ে এক বড় দায়িত্ব ছিল রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রের ওপর। অর্থনীতির শিবিরের দিক থেকে তিনি উদারবাদী অর্থনীতির ঘোর সমর্থক, ফলে জিএসটি-র নামে যে সংবিধান লঙ্ঘন করা হচ্ছে, কৌশলে রাজ্যের ক্ষমতায় লাগাম পরানো হচ্ছে এটি হয় তিনি বোঝেননি, নয়তো বুঝেই নীরব থেকেছেন। দুটোর যেটাই হোক দায়িত্ব তাঁর— তিনি শুধু রাজ্যের সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেননি, করেছেন এই রাজ্যের মানুষের। এবং তাঁর মুখ্যমন্ত্রীরও।

এখন কথা হল, সংবিধান লঙ্ঘনের প্রশ্নটায় যিনি রা-কাড়েননি, যাঁর প্রতিনিধি জিএসটি কাউন্সিলে রাজ্য সরকারগুলির কোণঠাসা অবস্থার আশঙ্কা ক্ষণিকের জন্যও প্রকাশ করেননি— আজ যদি বাস্তবতার চাপে বলা হয় এগুলো ‘ভুল’ তাহলে কিন্তু আর সেগুলো সংশোধনের কোনও পরিসর থাকে না। তাছাড়া, কথায় কথা বাড়ে। ২০০৬ সালে জিএসটি-র প্রস্তাবনা করার সময় বলা হয়েছিল ২০১০-১১ আর্থিক বছর থেকে জিএসটি কার্যকর করা হবে— সেই সময় রাজ্যে বিরোধী শক্তি হিসেবে বর্তমান শাসকদলের মনে হয়েছিল, এতে বোধহয় রাজ্যের তৎকালীন শাসক বেকায়দায় পড়বেন— তাই তারা এই বিষয়ে উচ্চবাচ্য করেনি। ২০০৪-এর লোকসভায় একমাত্র টিএমসি সাংসদ ছিলেন আজকের মুখ্যমন্ত্রী— তিনি কি জিএসটি-র আনুষ্ঠানিক বিরোধিতাও করেছিলেন? তাহলে?

অথচ এই ব্যবস্থা যে রাজ্যের পক্ষে সর্বনাশা, এই আশঙ্কা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বারবার উচ্চারণ করে গেছেন অশোক মিত্র। অশীতিপর অর্থনীতিক তাঁর সহজাত প্রজ্ঞায় বুঝতে পেরেছিলেন প্রথম অবস্থায় রাজ্যের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার কথা বলা হলেও তারপরে যেভাবে করব্যবস্থা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে তা যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পক্ষে বিপজ্জনক। একেবারে শেষ জীবনে তিনি চাইছিলেন জিএসটি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চে মামলা দায়ের করা হোক— দিল্লিতে তাঁর কন্যাসমা অর্থনীতিবিদ শ্রীমতী জয়তী ঘোষকে তিনি দায়িত্ব দিয়েছিলেন এই কাজের। অবশ্য সেই কাজটি শেষ অবধি আর করা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু অন্য কেউ যদি মনে করতেন এতে রাজ্যের স্বার্থ বিঘ্নিত হবে— তিনি বা তাঁরা এমন মামলা করতেই পারতেন। এই রাজ্যে মামলা লড়ার জন্য অন্তত সরকারি খরচে কখনও রাশ টানা হয়েছে বলে তো জানা নেই। তাহলে?

আসলে এই ‘ভুল’ বলে যা চকিত অনুভবে বলা হচ্ছে বাস্তব সেটা নয়। করব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সময়কালে সোচ্চার না হয়ে বা স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলির মাধ্যমে বিরোধিতায় প্রয়াসী না-হয়ে এইসব উচ্চারণ আসলে অরণ্যে রোদন। ১ জুলাই ২০১৭-র গভীর রাতে জিএসটি জমানার সূচনা করে আদপে হরণ করে নেওয়া হয়েছে রাজ্যগুলির স্বতন্ত্র ক্ষমতার চাবিকাঠি। কেন্দ্রের প্রবল প্রতাপ ‘জমিদার’ রাজ্যের হাতে যা যেটুকু দেবে অথবা দেবে না সেটুকু নিয়েই এখন তাঁদের করেকম্মে খেতে হবে— এখন এটা একটা চেপে বসা ফাঁদ— ‘ভুল’-এর দোহাই দিয়ে এর থেকে পরিত্রাণের আর কোনও উপায়ই নেই। এমনকি তা ‘মধুর’ ভুল হলেও!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4557 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...