Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

এই আন্দোলন চাক্ষুষ করতে পেরে গর্ব হচ্ছে

সীমন্তিনী ঘোষ

 




অধ্যাপক, অশোকা ইউনিভার্সিটি

 

 

 

প্রতিদিন সকালে কোলাহলে ঘুম ভাঙে। হাইওয়ে থেকে হাজার হাজার কণ্ঠে আওয়াজ ভেসে আসে, “ইনকিলাব, জিন্দাবাদ”। হাইওয়েতে ওঠার সব রাস্তা বন্ধ, হেঁটে যেতে গেলেও বড় মোড় থেকে পুলিশ ফিরিয়ে দেয়। দিনের কয়েক ঘন্টা হাইওয়েতে ইউনিভার্সিটির সামনের কয়েকশো মিটার অব্ধি খুলে দেয়, যাতে দোকান বাজার করতে হাইওয়ে পেরোনো যায়। তখন বেরোলে হাজার হাজার মানুষের স্লোগান দেওয়ার আওয়াজটা আরও কাছে আসে। একটু কায়দা করে পুলিশের চোখ এড়িয়ে উল্টোদিকে হাঁটলেই শুরু হয় মানুষের ঢল। আশপাশের গ্রাম থেকে সমানে মানুষ এসে মিশে যাচ্ছেন সেই জনস্রোতে। বাড়ির মেয়েরা রান্না করা সবজি, চাটনি নিয়ে আসছেন। আধবেলা রাস্তায় নামছেন। তার পরে আবার ক্ষেতের কাজে ফিরে যাচ্ছেন। কৃষিকাজ আটকে থাকে না। গ্রামের মধ্যের রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাতে গেলে দিগন্তজোড়া ক্ষেতে বোনা বিবিধ রকমের ফসলের সবুজ গালিচা দেখা যায়। শীতকালের তাজা সর্ষে শাক উঠছে, তার একাংশ বানিয়ে মকাই রুটির সঙ্গে বেঁধে নিয়ে আবার তাঁরা ফিরে আসছেন হাইওয়েতে। পুলিশের নজর এড়িয়ে, গ্রামগঞ্জের মধ্যের কাঁচারাস্তা, এগলি-ওগলি দিয়ে। কথাবার্তাতেই হদিশ দিয়ে দিচ্ছেন, এই শর্টকাট খোলা আছে, ওই গলি দিয়ে ঘুরে যান, ওখানে পুলিশ নেই।

আজকে সকালে আবারো মিশে গেলাম জনস্রোতে। হরিয়ানভি বুঝতে পারলেও বলতে পারি না, পাঞ্জাবি বুঝতে বা বলতে কোনওটাই পারি না। কিন্তু কথা বলতে খুব আসুবিধে হল না। লোকারণ্য। সিঙ্ঘু বর্ডারের ৯ কিলোমিটার আগে থেকে একটি হাইওয়ের লেন খোলা রয়েছে যাতে স্থানীয় লোকেদের গাড়ি বা কৃষকদের নিজেদের গাড়ি বা ট্র্যাক্টর যাতায়াত করতে পারে। গাড়ি বাইক আসছে যাচ্ছে, অনেক গাড়িতে নিজস্ব কৃষক ইউনিয়নের পতাকা ছাড়াও রয়েছে বড় বড় হরফে লেখা স্টিকার, “উই আর ফারমারস, নট টেররিস্টস”, “উই আর ফারমারস নট ইডিয়টস”, “উই আর ফারমারস, নো গ্রেন উইথাউট আস”। বর্ডারের ১ কিলোমিটার আগে থেকে রাস্তা বন্ধ। সেখান থেকে জনসমাগম, লঙ্গর। একদম বর্ডার বরাবর দুটি স্টেজ, যেখানে ভাষণ, আন্দোলনের নেতাদের মিটিং ইত্যাদি হয়। ন্যাশনাল মিডিয়ার টিভি চ্যানেল আটকে থাকে সেখানে। যত ভিতরে ঢুকে আসবেন, তত দেখবেন আস্ত একটা গঞ্জ বসে গেছে। এখানে ইউটিউবাররা আসছেন, কিন্তু মিডিয়াকে নিয়ে মানুষ বেশ সন্দিহান।

ছবি তুলতে গেলে তাঁরা প্রথমেই জিজ্ঞেস করছেন মিডিয়া কিনা। যখন শুনছেন আমরা মিডিয়া নই, বলছেন, কথা বলুন, ছবি তুলুন, ভিডিও তুলুন, ফেসবুকে ইউটিউবে দিন। ২০০ মিটার অন্তর অন্তর বসেছে লঙ্গর। রান্না করা খাদ্যদ্রব্য ছাড়াও লস্যি, ফলের রস, চা, কফি, ড্রাই ফ্রুট। বিলি হচ্ছে অকাতরে। কেউ ফল-মূল নিয়ে আসছেন ছোট ট্রাকে করে, নিজেদের খাওয়ার সংস্থান তো বটেই, যারা আসছেন, তাদেরকেও অকুণ্ঠ বিতরণ করে চলেছেন গরম হাতরুটি, ডাল, কিনু, আদা-চা। ট্র্যাক্টরের ট্রেলারের ওপরে ত্রিপলের ছাউনি খাটিয়ে হয়েছে অস্থায়ী আস্তানা, ভিতরে লেপ কম্বল তোষক বালিশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে শোওয়ার ব্যবস্থা। ওপরে কাঠের পাটাতন পেতে বানানো হয়েছে মালপত্রের তাক। মেয়েদের জন্যে বেশিরভাগ জায়গাতে শোওয়ার জন্যে ৫-৬টি ট্রেলার এক জায়গায় একত্রিত করা। বাইরে কাপড় দিয়ে ঘেরাও করে আলাদা ছাউনি বানানো। সেখানে পাহারা দিচ্ছেন গ্রামের পুরুষেরা, পালা করে রাত জেগে। মেয়েদের ব্যবহার করার জন্যে আলাদা করে পোর্টেবল টয়লেট বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। হাইওয়ের ওপরে অগণিত মল— বড় দোকানবাজারের সমস্ত টয়লেট দোকানের মালিকরা খুলে দিয়েছেন কৃষকদের ব্যবহারের জন্যে। সারি সারি অস্থায়ী গিজার বসানো রয়েছে। দেশি গিজারের বন্দোবস্ত করা হয়েছে ছাউনি বানিয়ে, এক দিক থেকে ঠান্ডা জল ঢাললে অন্য দিক দিয়ে তখুনি বেরিয়ে আসছে স্নান করার মত গরম জল। ওষুধ অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। সঙ্গে রইল কিছু ছবি। অ্যাম্বুলেন্স আটকানো হচ্ছে না। ভিডিওতে তোলা রইল সেই মুহূর্ত।

সঙ্গের ইউটিউবের ভিডিও লিঙ্কগুলি দেখলে সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যাবে, চিত্রটা কেমন। এবারে কিছু এমন বিষয়, যা ভিডিও বা ছবিতে ধরা যায় না।

শাসকদলের পক্ষের মিডিয়া এই প্রাচুর্য্যকে কটাক্ষ করে বলছেন এত বিলাসিতার নাম আন্দোলন? আসলে আমাদের জনমানসের মধ্যে হতদরিদ্র কৃষকদের ছবিটা এমনভাবে বসে গেছে, যে কৃচ্ছ্রসাধন ছাড়াও যে আন্দোলন হয়, তা বোধহয় বিশ্বাস করা কঠিন হয়। হরিয়াণা পাঞ্জাবের কৃষকেরা মূলত সম্পন্ন কৃষক। এখানে সারি সারি দামী গাড়ি, এখানে ব্র্যান্ডেড জামাকাপড় পরা বহু অল্পবয়েসী কৃষক, এখানে বহু বয়স্থ কৃষক রোদে সতরঞ্চি বিছিয়ে তাস হুঁকোর আসর জমিয়েছেন, সবই ধরা পড়ছে ছবিতে। কিন্তু আন্দোলন যে উৎসব নয়, এ কোথায় লেখা আছে? যে আন্দোলনে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের শ্রম থেকে নিজেদের ক্ষেতের ফসল দান করে দিচ্ছেন, তা কি করেই বা উৎসব না হয়ে থাকে?

কিন্তু, যে আন্তরিকতার সঙ্গে কৃষকরা খাদ্যদ্রব্য সঙ্গে ওষুধপত্র, কম্বল, গরম জামাকাপড় ইত্যাদি বিলিয়ে চলেছেন তা ছবিতে বা ভিডিও ক্লিপে অধরা থেকে যায়। তাঁরা দেখছেন না, কে কোথা থেকে আসছে, পুলিশের লোকজনকেও তাঁরা পারলে লঙ্গরে বসিয়ে দেন। র‍্যাফের লোকজন লজ্জা লজ্জা মুখে গরম জিলিপির সঙ্গে গরম আদা চা খাচ্ছেন একটু দূরে দাঁড়িয়ে। বহু আধিকারিক রিজাইন করেছেন, করছেন, তাঁরাও যোগ দিচ্ছেন এই আন্দোলনে রোজ। খবরে কমই আসছে।

লুধিয়ানার জল্লনপুর খুর্দ গ্রাম থেকে এসেছেন মনজিৎ সিং। নিজে থেকে এগিয়ে এসে কথা বললেন আমার সঙ্গে। এঁরা নিজেদের কথা বলতে চান। মনজিৎ আমার মত আদ্যন্ত শহুরে মানুষকে সরল ভাষায় বললেন তাঁর গ্রামের কথা, তাঁর আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি। বাহান্ন বছরের প্রৌঢ় মনজিতের কথায় তাঁরা গ্রাম থেকে প্রত্যেকেই চার থেকে ছ মাসের মত র‍্যাশন নিয়ে এসেছেন, তাঁরা জানতেন এই আন্দোলন খুব সহজ হবে না। তাঁরা দিল্লির মধ্যে ঢুকতে চান না। তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের উপরে আস্থা রাখছেন না এই সময়ে। মনজিৎ জানালেন, পাঞ্জাব থেকে যত এগিয়েছেন তাঁরা পথে তত লোকে যোগ দিয়েছে তাঁদের সঙ্গে। এখন ৬০ শতাংশ পাঞ্জাবের কৃষকদের সঙ্গে মিলে গেছেন ৪০ শতাংশ হরিয়ানার কৃষক। যারা যোগ দেননি, তারাও দান করেছেন, শস্য, ফলমূল, তেল, গ্যাসের সিলিন্ডার, সবজি। এখনও তাঁদের গ্রাম থেকে আনা জিনিসে হাত পড়েনি। মনজিৎ জানালেন, তাঁরা হিংসা ছড়াতে আসেননি। কিন্তু নিজেদের দাবী না মিটলে তাঁরা সরবেন না। তাঁদের ক্ষেতের কাজ কে দেখছেন? কৃষিকাজ তো আটকে থাকে না। মনজিৎ বললেন, বেশিরভাগ কৃষকের পরিবারের এক দুজন করে আসছেন যাচ্ছেন। প্রথমে তাঁর ভাই এসেছিলেন, ট্রাক্টরের মিছিলে, সঙ্গে ভাইপো এসেছিলেন গাড়ি নিয়ে। আটদিন পরে তিনি গাড়ি নিয়ে ফিরে গেছেন, তাঁর জায়গায় মনজিৎ এসেছেন গাড়ি নিয়ে। তিনি দিন দুয়েক আরও কাটিয়ে ফিরবেন, আবার তাঁর ভাই আসবেন।

বারনালা জেলার মাহাল কালাণ গ্রাম থেকে এসেছেন জ্যোতি, গুরমীত, পরমীত, শীতল, সুন্দর কৌরের মত মহিলা কৃষকরা। প্রথমে কথা বলতে ইতস্তত করছিলেন। তারপরে ধীরে ধীরে একটু বয়স্কা গুরমীত আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি কোন চ্যানেল থেকে এসেছি। আমি মিডিয়া থেকে আসিনি শুনেও বললেন, “মিডীয়া সাডা কী করেগা।” গুড় দেওয়া আদা-চার ভাঁড় এগিয়ে দিয়ে বলেন, দু দণ্ড বসে যান। আমাকে বিশেষ কিছু জিজ্ঞাসা করতে হয় না। মেয়েদের মধ্যে বসে তাঁদের পরস্পরের কথা শুনলে বোঝা যায়, কৃষিকাজ কতখানি তাঁদেরও। ফসলের বীজ বোনা থেকে শস্য ঝাড়াই করে, তাকে পরিষ্কার করে তোলা, শাক-সব্জির ফলন দেখা, তার মধ্যেই ঘরের কাজ, গরু-বাছুরের খেয়াল রাখা, বাচ্চা সামলানো, সব কিছুই মেয়েদের কাজ। এখানে পুরুষ কৃষকদের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে এসেছেন তাঁরা, বললেন, সেবা করতে আজকে তাদের গ্রামের দশজন মহিলা কৃষক যোগ দিয়েছেন লঙ্গরের রান্নায়। বাড়িতে ছেলেমেয়ে গরুবাছুর কে দেখছেন? কারও জা, কারও শাশুড়ি, কারও ননদ, কারও বউদি, কারও ছেলের বউ। বাড়ির ছেলেদের ওপরে দায়িত্ব দিয়ে এসেছেন কেউ? হাসির হররা শুনে বোঝা গেল মহিলারা মহিলাদের ওপরেই দায়িত্ব রেখে আসতে আশ্বস্ত বোধ করেন। এখানে তাঁরা সুরক্ষিত বোধ করছেন? তাঁরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে জিজ্ঞেস করেন, ভয়টা কোথায়? প্রথমে ছবি তোলার সময়ে ঘোমটায় মুখ ঢেকে ছিলেন, কিন্তু তারপরে নিজেরাই আমাকে বললেন “লে লিও পিকচার। সব আ গায়ে না?” ওপরে রইল ছবি।

কৃষকদের আন্দোলন চলাকালীন কোনও হিংসাত্মক ঘটনা নেই কোথাও। কিন্তু এঁদের অর্থবল, এবং লোকবল, কোনওটারই খামতি নেই। কেন্দ্রের সঙ্গে কথা বলতে তাঁদের আপত্তি নেই, কিন্তু নিজেদের দাবী থেকে তাঁরা চ্যুত হবেন না। এই আকার ধারণ করবে এই মুভমেন্ট এটা ভাবিনি। কিন্তু দেখতে ভালো লাগছে। পুলিশে ছয়লাপ চতুর্দিক, কিন্তু এই জনসমুদ্রের রোষ যদি কোনওরকমে জাগে, সংখ্যার দিক থেকে কৃষকদের সঙ্গে পুলিশের  কোনও তুলনাই হয় না। পুলিশও সেটা জানে বোঝে— দেখলাম। ভয় পাচ্ছে। ভয় পেয়ে আছে।

এই দেশের ভবিষ্যৎ কী, জানি না, এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে একের পর এক গনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, এবং গণতন্ত্রের কাঠামোর সার্বিক ক্ষয় দেখতে দেখতে নিরাশায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকি। এই কদিনে একটা অনুভূতি হল, যে আর কিছু না হোক এত বড় একটা আন্দোলনের চাক্ষুষ সাক্ষী হয়ে থাকতে পারলাম, তা সে যত অল্প সময়ের জন্যেই হোক না কেন।


*হেডার, লেখার সঙ্গের সমস্ত ছবি ও ভিডিও লেখকের