Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

স্বরচিত চক্রব্যূহে মূল ধারার সংবাদমাধ্যম

প্রতীক

 

 


স্বাধীন সাংবাদিক, ব্লগার

 

 

 

প্রজাতন্ত্র দিবসের রেশ তখনও কাটেনি। ২৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় একাধিক নিউজ চ্যানেল ঘোষণা করল, দুমাস ধরে চলতে থাকা উত্তাল কৃষক আন্দোলনের অদ্যই শেষ রজনী। আগের দিন গভীর রাতে বাগপতে কৃষকদের তাঁবু ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এবার গাজিপুর সীমানায় অবস্থানকারী কৃষকদের পালা। এমনিতেই সাধারণতন্ত্র দিবসের হিংসার পরে আন্দোলনের সেই ঝাঁঝ তখন অনেকটাই কম। অবস্থানের জায়গাগুলো কার্যত ভাঙা হাট, কৃষকরা বাক্স-বিছানা বেঁধে বাড়ি ফেরার জন্য তৈরি হচ্ছেন, তার ওপর উত্তরপ্রদেশ সরকারের নোটিস— রাস্তা আটকে নাগরিকদের অসুবিধায় ফেলা চলবে না। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে পথ ছেড়ে দিতে হবে। নিজে থেকে ছাড়তে না-চাইলে বলপূর্বক সরিয়ে দেওয়ার জন্য উত্তরপ্রদেশ পুলিশের বিরাট বাহিনীও হাজির। অতএব ছন্নছাড়া কৃষক আন্দোলনের সমাপ্তি তখন কেবলই সময়ের অপেক্ষা। খবর রটে গেল, গাজিপুরের অবস্থানের প্রধান নেতা রাকেশ টিকায়ত কিছুক্ষণের মধ্যেই আত্মসমর্পণ করতে চলেছেন।

এই ভবিষ্যদ্বাণীর পরের কয়েক ঘন্টায় যা ঘটেছে, তা একদিন হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের ক্লাসে পড়ানো হবে। কিন্তু আমাদের আলোচ্য, আন্দোলন উঠে যাচ্ছে, রাকেশ টিকায়েত আত্মসমর্পণ করতে চলেছেন— এই তথ্যগুলো। বেশ কয়েকজন স্বাধীন সাংবাদিক স্রেফ হাতের মোবাইলকে ব্যবহার করে অকুস্থল থেকে কৃষক আন্দোলনের খবর সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে গত দু মাস ধরে মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। তাঁদেরই একজন সাহিল মুরলী মেঙ্ঘানি। সাহিল সন্ধে সোয়া ছটা নাগাদ টুইট করেন, টিকায়েত তাঁকে নিজে বলেছেন, তিনি আত্মসমর্পণ করছেন না। এর খানিকক্ষণ পরে টিভি ক্যামেরার সামনে টিকায়েত কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং বলেন, “আমি দরকার হলে এখানেই প্রাণ দেব, তবু এই ময়দান ছেড়ে নড়ব না।” সেই ভিডিও কিন্তু টিভি চ্যানেলগুলো বারবার দেখায়, কারণ কৃষক নেতা কাঁদছেন। অ্যাঙ্কররা ঘটনাপ্রবাহে নিজেদের উল্লাস গোপন করার বিশেষ চেষ্টা করেননি। না ক্যামেরার সামনে, না নিজেদের টুইটে। কিন্তু ফল হল উলটো। টিকায়েতের এই ভিডিও দেখে হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশ থেকে হাজার হাজার কৃষক রাত না-পোহাতেই ফের এসে পড়লেন গাজিপুর সীমান্তে। শেষ রাতে দেখা গেল আন্দোলনকারীরা যেখানে ছিলেন সেখানেই আছেন, বরং রণসাজে সজ্জিত পুলিসবাহিনীকে ব্যর্থমনোরথ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। অর্থাৎ বোঝা গেল, আন্দোলনের আজই শেষ রাত, এই ঘোষণায় তথ্যের চেয়ে অনুমান; এবং যুক্তিনির্ভর অনুমানের চেয়ে অভিলাষের মাত্রা বেশি ছিল।

এই প্রবন্ধের কপি তৈরি করতে করতেই খবর পাচ্ছি, কৃষকদের অবস্থানের অন্য আর এক ফ্রন্ট সিংঘু সীমানায় একদল লোক এসে আন্দোলনকারীদের উপর পাথর ছুড়ছে পুলিশের উপস্থিতিতেই, এবং অকুস্থলে থাকা স্বাধীন সাংবাদিক বা অন্যান্য স্থানীয় মানুষের পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, যারা আক্রান্ত পুলিস তাদের উপরেই সোৎসাহে লাঠিবর্ষণ করছে। টিভি চ্যানেলগুলোর কাছে অবশ্য এই ঘটনা অবিরাম লাইভ দেখানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ নয়, অথবা হয়তো এতটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, সম্পাদনা না-করে এসব ছবির রাশ দেখানোর ঝুঁকি নেওয়া যায় না। অতএব সংসদে সরকারের পেশ করা আর্থিক সমীক্ষা নিয়ে তখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চালিয়ে যাওয়া হল অধিকাংশ চ্যানেলে। অন্যত্র কেবল টিভি-র পর্দায় ফ্ল্যাশ করা হতে থাকল ‘সংঘর্ষের খবর’, আর গ্রাফিক্‌স প্লেটের পেছন থেকে শোনা যেতে লাগল প্রতিবেদকের কণ্ঠস্বর। একটি চ্যানেলের প্রতিবেদককে তো নিজের অজ্ঞাতে ফোনে কাউকে বলতেও শোনা গেল, “না না, আমি বাড়িয়ে বলছি না।”যে সংবাদমাধ্যম আগের দিন সন্ধেবেলা সোল্লাসে আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেছিল, তারা তখন আবেগশূন্য। সাধারণতন্ত্র দিবসে আহত পুলিসকর্মীদের জন্য, উলটে যাওয়া বাসটির জন্য এবং ভেঙে যাওয়া ব্যারিকেডগুলোর জন্য তখনও বিলাপ করে চলেছে। কিন্তু নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদের উপর একযোগে মুখোশধারী ভাড়াটে দুষ্কৃতি আর পুলিশের ঝাঁপিয়ে পড়াকে তারা বলছিল ‘সংঘর্ষ’, ‘আক্রমণ’ নয়!

আসলে নিরপেক্ষতার ভানটুকুও এ দেশের মূল ধারার সংবাদমাধ্যম ইদানিং সফলভাবে বিসর্জন দিয়ে উঠতে পেরেছে। গত এক দশকে প্রতিবাদী মানেই যে দেশবিরোধী সন্ত্রাসবাদী, সেকথা বারবার ঘোষণা করে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হচ্ছে মাত্র। সাধারণতন্ত্র দিবসের দিনও একই ঘটনা ঘটেছে। হিংসা একপাক্ষিক ছিল বলে অনবরত প্রচার করা হয়েছে, নিহত কৃষককে ফুটনোট করে দেওয়া হয়েছে, যে ব্যাখ্যা দিল্লি পুলিস তথা ভারত সরকার দিয়েছে তাকেই শিরোধার্য করেছে অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম। এমনকী ওই মৃত্যু নিয়ে কৃষকদের যা বক্তব্য, তা ক্যামেরার সামনে বলা তথা টুইট করার ‘অপরাধে’ ইন্ডিয়া টুডে-র বর্ষীয়ান সাংবাদিক রাজদীপ সরদেশাইয়ের মাইনে কেটে নিয়েছে এবং তাঁকে দু সপ্তাহের জন্য সাসপেন্ড করেছে চ্যানেল-কর্তৃপক্ষ। উপরন্তু, সুযোগ পাওয়া মাত্রই সোশ্যাল মিডিয়ার ভুয়ো সংবাদচক্রকে আরও একবার মান্যতা দিয়ে ‘লালকেল্লায় জাতীয় পতাকার জায়গায় খালিস্তানি পতাকা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে’ বলে প্রচার করা হয়েছে। লালকেল্লায় আদৌ জাতীয় পতাকা ছাড়া অন্য কোনও পতাকা লাগানো উচিত কিনা, তা ভিন্ন আলোচনার বিষয়। কিন্তু আন্দোলনকারীদের দেশদ্রোহী বলে প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে শিখ ধর্মের পবিত্র পতাকা ‘নিশান সাহিব’-কে খালিস্তানি অভিজ্ঞান বলে চালিয়ে দেওয়া সরকারের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য সংবাদমাধ্যমের উদগ্র বাসনাই প্রমাণ করে।

কোনও কোনও সংবাদমাধ্যম, আরও নির্দিষ্ট করে বললে, কোনও কোনও সাংবাদিক, গত এক দশকে সাধারণ মানুষের চোখে ‘ভগবান’ হয়ে বসেছেন। তাঁরা যা দেখান, যা বলেন, তা-ই বেদবাক্য। তাঁরা যে কোনও ছবি, অডিও বা ভিডিও ক্লিপের সাহায্যে যে কোনও লোককে খুনি বা সন্ত্রাসবাদী বা ড্রাগ পাচারকারী বলে ঘোষণা করে দিতে পারেন, দর্শকরা আইন-আদালতের তোয়াক্কা করবেন না। সেই সত্য, যা রচিবে অ্যাঙ্কর। বেশ কিছু দর্শকের বিশ্বাস এমন জায়গায় পৌঁছেছে, এই সাংবাদিকদের দিনরাত দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে রণহুঙ্কার তাঁদের এমন বধির করে দিয়েছে যে, তাঁদের শোনানোর জন্য কোনও বিস্ফোরণই যথেষ্ট নয়। এই সাংবাদিকদের কারও মধ্যে দেশদ্রোহের লক্ষণ দেখা গেলেও ভক্তি টলে না, নিঃসংশয়ে বলেন, ওসব ষড়যন্ত্র!

একদিকে একটি বিশেষ ঘটনা সম্বন্ধে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত জানানোর দায়ে রাজদীপ-সহ ছ’জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দুটো রাজ্য সরকার রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে এফআইআর করেছে, অন্যদিকে তথাকথিত দেশপ্রেমিক অ্যাঙ্করদের শিরোমণি অর্ণব গোস্বামীর কয়েক হাজার পাতার হোয়াটস্যাপ চ্যাট সামনে এসেছে। মুম্বাই পুলিসের সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিটের অঙ্গ এই চ্যাট যদি সত্যিই অর্ণবের হয়, তাহলে টিআরপি রেটিং-এ বৃত সংস্থা বার্ক (BARC)-এর ভূতপূর্ব সিইও পার্থ দাশগুপ্তকে অর্ণব দেশের সেনা-অভিযান সংক্রান্ত গোপন তথ্য তো সরবরাহ করেছেন বটেই, পুলওয়ামা বিস্ফোরণে সৈনিকদের মৃত্যুতে উচ্ছ্বসিতও হয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর শো-তে দিবারাত্র তিনি যে অভিযোগগুলো কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়াই বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য, বুদ্ধিজীবী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে করেন, ঠিক সেই কাজগুলোই নিজে করেছেন। এমন হতেই পারে যে ওই চ্যাট অর্ণবের নয়, কিন্তু এমন গুরুতর অভিযোগ উঠে আসার পরে কোথাও কোনও রাষ্ট্রদ্রোহ বা রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার মামলা দায়ের হয়নি, কোনও তদন্ত হচ্ছে না। অর্ণব নিজেও গগনবিদারী চিৎকারে বলছেন না যে, আমার বিরুদ্ধে তদন্ত হোক, কেবল প্রাক্তনী সহকর্মী, টাইমস নাও-এর আর এক দেশপ্রেমী সাংবাদিক নাভিকা কুমারের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে আইনি নোটিস দিয়েছেন বটে, কিন্তু তা পার্থ দাশগুপ্তকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগের কথা লেখা হয়েছে বলে। ওই চ্যাটের কথা প্রকাশ করার জন্য নয়। এ ভারী আশ্চর্য!

কিন্তু তার চেয়েও আশ্চর্যের কথা, দেশপ্রেমিক অ্যাঙ্করের দেশপ্রেম সম্বন্ধে এত বড় প্রশ্ন উঠে যাওয়ার পরেও তাঁর জনপ্রিয়তায় বিশেষ ভাটা পড়েনি। তাঁর সপক্ষে হাজার হাজার টুইট আর ফেসবুক পোস্ট তার প্রমাণ। সর্বদাই সরকারের পক্ষে থাকেন বলে সরকার তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিল না, আজকের ভারতে এমনটা মেনে নিতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু দর্শকমনে তাঁর সিংহাসন অটুট থাকার রহস্য কী? একটু তলিয়ে দেখা যাক।

একটা কারণ যে কেউ বিনা আয়াসেই বুঝতে পারেন। দর্শকের এই বিশ্বাস আসলে অর্ণব গোস্বামীর প্রতি বিশ্বাস নয়। সরকার বা প্রধানমন্ত্রী যাঁকে বিশ্বাস করেন, তাঁর প্রতি বিশ্বাস। কিন্তু সেটুকুই কি সব? রিপাবলিক টিভি কি কেবল নিতান্ত নির্বোধ, অশিক্ষিত মানুষজন দেখেন? শিক্ষিত, বুদ্ধিমান মানুষদের মনে হচ্ছে না, এই লোকটা শুধু যে ভণ্ড তা-ই নয়, দেশের পক্ষে বিপজ্জনক? গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযান, যার কথা সরকার আর সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ স্তরের দু-একজন ছাড়া অন্য কারও জানার কথা নয়, তার খবর এই লোকটা আগে থেকেই জানতে পারছে, এটা দেশের জন্য সুখবর নয়। কারও মনে হচ্ছে না এ কথা? সাধারণ দর্শকের প্রতিক্রিয়া থেকে দিব্য টের পাওয়া যাচ্ছে, হচ্ছে না। না হওয়ার জন্য, বলা বাহুল্য, জরুরি অবস্থা-উত্তর ভারতীয় সাংবাদিকতার পটপরিবর্তন অনেকটা দায়ী।

১৯৭৫ থেকে ৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধি-আরোপিত জরুরি অবস্থার সময় যে সাংবাদিকরা মেরুদণ্ড সোজা রাখার জন্যে নন্দিত, তাঁদের মধ্যে একজন, এম জে আকবর, পরবর্তীকালে ইন্দিরাপুত্র এবং প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধির বিশেষ ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। সম্পাদক হিসেবে কাউকে ছেড়ে কথা না-বলা এবং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার মতো  যেসব গুণাবলি তাঁকে প্রবাদপ্রতিম করেছিল, সেইসব গুণ ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে থাকে। পরবর্তীকালে তিনি সর্বদাই ক্ষমতার আশেপাশে থেকেছেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কালে প্রবল বিজেপি-বিরোধী আকবর অনতিঅতীতে কেবল বিজেপিতে যোগ দেননি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন। তিনি উদাহরণমাত্র। তাঁর  প্রজন্মের অনেক সাংবাদিকই জন্ম দিয়েছেন এমন এক সাংবাদিকতার, যাকে ইংরেজিতে বলে ‘অ্যাক্সেস জার্নালিজম’। অর্থাৎ সাংবাদিক কতটা জানেন সেটা বড় কথা নয়, কতজনের তিনি ঘনিষ্ঠ সেটাই বড় কথা। বাংলায় বোধ করি একে ‘দাদা-দিদি সাংবাদিকতা’ বলা উচিত হবে। অর্থাৎ আসলে কী ঘটছে, প্রতিবেদক তা জানেন কিনা তার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তিনি অমুক নেতার বা তমুক নেত্রীর কাছের লোক কিনা বা কতটা কাছের লোক। নেতাদের সঙ্গে গা ঘষাঘষির ক্ষমতাই তাঁর যোগ্যতার প্রমাণ।

এই ধরনের সাংবাদিকতা ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক করে দেয় ঘটনাকে, ঘটনার অনুসন্ধানকে। অপ্রিয় প্রশ্ন, যা সাংবাদিকতার প্রাণ, তা হয়ে দাঁড়ায় নিষিদ্ধ। কারণ, অমুকদার সঙ্গে সাংবাদিকের দারুণ সম্পর্ক। বাড়িতে আসাযাওয়া, একসঙ্গে খানাপিনা করা। সামান্য একটা প্রশ্নের জন্য কি আর সেই সম্পর্কটা নষ্ট করা যায়? জ্যেষ্ঠরা এই ধারা চালু করেছেন, কনিষ্ঠরা দেখে দেখে শিখেছেন। কাগজের কাছে, চ্যানেলের কাছে, বিষয়ের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, অনুসন্ধিৎসু, খুঁতখুঁতে সাংবাদিকের দাম কমেছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, জরুরি অবস্থার পরের ৪৪ বছরে ক্রমশ এমনটা ঘটেছে ভারতীয় সাংবাদিকতায়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেল্‌ফি তোলার জন্য সাংবাদিকদের হুড়োহুড়ির সংস্কৃতি একদিনে তৈরি হয়নি। সাংবাদিকরা ক্ষমতাবানদের সঙ্গে, বিখ্যাতদের সঙ্গে তাঁদের গলাগলির কথা খবরের অছিলায় লিখেছেন। ক্রীড়া সাংবাদিক পর্যন্ত অবলীলায় লিখেছেন, “তাঁর নতুন কেনা মার্সিডিজে যেতে যেতে ইমরান খান আমাকে বললেন…” ইত্যাকার বাক্যবন্ধ। যেন ইমরান খান কী বলেছেন সেটুকু লেখা যথেষ্ট নয়, তিনি যে ইমরানের নতুন কেনা গাড়িতে তাঁর সঙ্গেই যাত্রা করতে পারেন, সে তথ্যটাও পাঠককে জানানো অতি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সাধারণ পাঠক, দর্শকও দেখেশুনে একথাই বুঝেছেন যে, অমুক বড় সাংবাদিক, কারণ দিদি ওঁর বাড়িতে গিয়ে চা খান। তমুক বড় সাংবাদিক কারণ অমুকদার মেয়ের বিয়েতে ওঁর নেমন্তন্ন ছিল। স্বভাবতই আজ যখন দর্শক জানতে পারেন বালাকোটে আক্রমণের কথা অর্ণব গোস্বামী তিনদিন আগেই জানতেন, তখন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে যায়। রাহুল গান্ধি যখন অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রীই অর্ণবকে খবর দিয়েছেন, তখন দর্শক ভাবেন “কত বড় সাংবাদিক! প্রধানমন্ত্রী নিজে খবর দেন!”

দাদা-দিদি সাংবাদিকতার দোষে কেবল দক্ষিণপন্থী গলাবাজ সাংবাদিকরাই দুষ্ট ভাবলে ভুল হবে। অরুণ জেটলির মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিচারণে রাজনৈতিক কাজকর্ম নিয়ে কোনও সাংবাদিকই বিশেষ কথাবার্তা বলেননি, ব্যক্তিগত স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেছিলেন। রাজদীপ সরদেশাই যেমন টুইট করেছিলেন, কোন এক বিদেশ সফরে গিয়ে জেটলি তাঁকে বলে দিয়েছিলেন কোন রেস্তোরাঁয় সেরা বাটার চিকেন পাওয়া যায়।

এই ধরনের সাংবাদিকতা বছরের পর বছর চলতে থাকলে যা পরিণতি হয়, ভারতে আজ তা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। গত চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরে ব্রিটেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় গণতন্ত্রে সাংবাদিকতা যে পথে হেঁটেছে, তার ঠিক উলটো পথে হেঁটেছে এ দেশে। ওই দেশগুলোর কাগজ বা টিভি চ্যানেলের ওয়েবসাইটে সাক্ষাৎকারের স্বল্পতা আর আমাদের দেশের মূল ধারার সংবাদমাধ্যমে তার বাহুল্য দেখলেই তা পরিষ্কার হয়। বিখ্যাত মানুষ, ক্ষমতাবান মানুষ অমৃতবাণী বিতরণ করবেন আর স্টেনোগ্রাফারের একনিষ্ঠতায় সাংবাদিক তা লিখে দেবেন বা রেকর্ড করে নেবেন— এ জিনিস বাকি পৃথিবীতে ক্রমশ বাতিল হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমাদের দেশের কাগজের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত ভরে থাকছে “তিনি বলেন”, “তিনি আরও বলেন”— গোছের বয়ানে। টিভি খুললেই দেখা যাচ্ছে, “অমুক স্পিকস টু তমুক”। দু-একটা লোকদেখানো শক্ত প্রশ্ন থাকলেও, ব্যাপারটা যিনি সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন তাঁর পক্ষে কত আরামদায়ক তা বোঝার জন্য এটুকু তথ্যই যথেষ্ট, যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত সাত বছরে একাধিক সাক্ষাৎকার দিয়ে থাকলেও একটাও সাংবাদিক সম্মেলন করেননি। সেল্‌ফি-লালায়িত সাংবাদিকদের সঙ্গেও নয়। ২০১৯ নির্বাচনের ক’দিন আগে একবার মিট দ্য প্রেস-এ পায়ের ধুলো দিয়েছিলেন, কিন্তু সাংবাদিকদের যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন পাশে বসা অমিত শাহ।

গত শতকের নয়ের দশকে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পরে সংবাদমাধ্যমের মালিকদেরও ব্যবসা সম্বন্ধে চিন্তাভাবনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। তাঁদের পুঁজি এমন ফুলেফেঁপে উঠেছে যে, আগের মতো কাগজের (অধুনা চ্যানেলেরও) ব্যবসাটাকে অন্য ব্যবসার চেয়ে আলাদা করে ভাবার আর ইচ্ছা নেই। যেন তেন প্রকারেণ লাভের কড়ি বাড়ানো শুধু নয়, সংবাদমাধ্যমের মালিক হওয়ার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতাবানদের থেকে ব্যবসায়িক সুবিধে হাসিল করাই মূল উদ্দেশ্য। সে উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতেও দাদা-দিদি সাংবাদিকতার জুড়ি নেই। অতএব সূর্য পূর্ব দিকে উঠলেও, যদি দাদা বা দিদি বলেন পশ্চিমে উঠেছে, তাহলে ক্যামেরা উল্টোদিকে বসিয়ে পশ্চিমকে পূর্ব করে নেওয়া হয়।

আশ্চর্য নয় যে, এই ছকে যে সাংবাদিকরা পড়তে রাজি নন, তাঁরা যতই পরিশ্রমী বা প্রতিভাবান হন, মূল ধারার সংবাদমাধ্যমে তাঁদের জায়গা হবে না; সাধারণ দর্শক বা পাঠকও তাঁদের দেশদ্রোহী ভাববেন, ‘প্রেস্টিটিউট’ বলবেন। খুব বেশি পরিশ্রম করলে অবশ্য সরকারের তরফ থেকে গ্রেফতারির পুরস্কার পাওয়া যাবে; যেমন সিদ্দিক কাপ্পান, প্রশান্ত কানোজিয়ারা পেয়েছেন। কিন্তু মুশকিল হল, যে স্বরচিত চক্রব্যূহে ভারতীয় সাংবাদিকতা প্রবেশ করেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার পথ ক্রমশ সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে। অর্ণব গোস্বামী, সুধীর চৌধুরী, রুবিকা লিয়াকত, দীপক চৌরাসিয়া, নাভিকা কুমারেরা যে ব্র্যান্ডের সাংবাদিকতা করেন, বা বেশিরভাগ সংবাদপত্র করে, তার জন্য বিপদসঙ্কেত চলতি কৃষক আন্দোলনের গত কয়েক দিন। কারণ পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ থেকে যে কৃষকরা বিপুল উদ্যমে দিল্লির সীমানায় ফিরে এসে কৃষক আন্দোলনের ঝিমিয়ে পড়া খাতে নতুন জোয়ার আনলেন তাঁরা অধিকাংশই ‘লিবারাল’, ‘কমিউনিস্ট’ বা ‘আরবান নকশাল’ নন। ফলে তাঁরা ওঁদের চ্যানেলই দেখে এসেছেন এতদিন। ইংরেজি-বলা দর্শকদের এই কৃষকবিরোধী প্রচার পছন্দ হলেও হতে পারে, হিন্দি চ্যানেলের এই দর্শকরা অতটা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি নেবেন কিনা, যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

 

তথ্যসূত্র

  1. https://twitter.com/saahilmenghani/status/1354772468217483267
  2. https://twitter.com/zoo_bear/status/1355112559947382784?s=20
  3. https://www.thequint.com/explainers/arnab-goswami-leaked-whatsapp-chats-partho-dasgupta-explainer
  4. https://www.newslaundry.com/2021/01/28/navika-kumar-is-jealous-republic-tv-files-defamation-case-against-times-now-anchor
  5. https://www.barandbench.com/news/republic-tv-legal-notice-indian-express-arnab-goswami-trp-scam