Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

জলজ গুল্মের আলিঙ্গন থেকে শস্যখেতের বিশাল মুক্তির দিকে এক অভিযাত্রা

প্রতিভা সরকার

 



প্রাবন্ধিক, গল্পকার, অধ্যাপক

 

 

 

 

আমার অতীত নেই, ভবিষ্যৎও নেই কোনওখানে…

সখেদে কবি জানালেন ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’-র প্রথম কবিতায়।

অমনি পাঠকের মনে হল, ভবিষ্যতের কথা না-হয় ঠিক আছে, অনিশ্চিত অন্ধকারের ছায়া মাখানো সেই ভাবীকাল, বিরাট পিচ্ছিল জরায়ুতে কী সে লুকিয়ে রেখেছে, মৃত্যু, মারি না সুখ-মাখা দীর্ঘ জীবনের আশিস, তা কে জানে! কিন্তু অতীত? অতীত ছাড়া তো বর্তমান নেই, বর্তমান ব্যতীত ভবিষ্যৎ! তা হলে অতীত নেই কেন, কখনওই ছিল না কি, এখন না-থেকে থাকলে সে-ই বা কীরকম কথা! আর কবি যেহেতু ব্যবহার করেছেন ‘আমার’ এ-ই সর্বনামটি, এটি ব্যষ্টির ওপর প্রযোজ্য নয়, ব্যক্তি-কবির বুকের অনেক গভীর থেকে উঠে আসা এক দীর্ঘশ্বাস, এক অমাময় অনুভূতি, এইরকম মনে হওয়াই স্বাভাবিক।

ছবিটা যেন অনেকটা এইরকম— রক্তলাল জল থেকে অন্ধকার ভাঙা নৌকার গলুইতে দু হাতে শরীরের ভার রেখে এক সিক্ত দীর্ঘদেহী (পাঠকের কল্পনার কল্পলতা হামেশাই আঁকড়ে ধরে বাস্তবকে, কবিকে অনবরত মিশিয়ে ফেলে কবিতায়)। সে প্রাণপণ উঠে আসতে চাইছে গলুইয়ের ওপর, কিন্তু বাদ সাধছে সারা শরীরে সংলগ্ন জলজ গুল্মের ভার। সে এক ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থা। অতীত ভবিষ্যৎ-বিহীন এক সর্বনেশে বর্তমান, যার সমাপ্তি যে রক্তের প্রবাহ থেকে সে উঠে এসেছিল, তাতেই অবধারিত তলিয়ে যাওয়ায়।

সময়ের এই সর্বনাশ-বিন্দুতে দাঁড়িয়ে পাঠকের মনে পড়ে রবীন্দ্রনাথকে, বেঁচে থাকলে আজ যাঁর বিড়ম্বনা হত দেখবার মতো। তিনিই তো বলেছিলেন, মানুষের মতো যে মানুষ, তার জন্মস্থান একটি নয়, অন্তত তিনটে। প্রথমটি হতে পারে পৃথিবীর যে কোনও স্থান যেখানে সে নবজাতক হিসেবে জন্মেছে। দ্বিতীয়বার তার নবজন্ম হয় স্মৃতিতে। বর্তমান পৃথিবীর ঘটনাবহুলতার সঙ্গে সমস্ত অতীত ন্যস্ত থাকে তার স্মৃতিতে। তাকে অনবরত আলোড়িত করে স্মৃতিভার, যা আমাদের ছায়ার মতোই আমৃত্যু অনুসরণে একগুঁয়ে। আর শেষ জন্ম আত্মলোকে, যেখানে মানুষ বিহার করে বিশ্বসাথে যোগে, সংক্ষেপে বললে বিশ্বযোগে। এইখানেই লব্ধ হয় আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়াবার শিক্ষা।

শেষ পর্যায়ের এই ভিতর বাহিরের দ্বন্দ্ব অমোঘ। সৃষ্টিশীলতার একেবারে কোরকে তার বাস। সে দ্বন্দ্বের নিরসনে কার কত পটুত্ব, তাই দিয়ে বুঝি কে কত বড় কবি।

কবি হিসেবে শঙ্খ ঘোষের যাত্রা এই পূর্বাপর তিন অবস্থার মধ্য দিয়েই। খুবই সফল যাত্রা নিশ্চয়ই, কারণ শেষ পর্যায়ে সবার মাঝে যে বিশ্বলোকের সাড়া, তাকে আত্মস্থ করবার অপূর্ব হাতিয়ার হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতা। মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ কি তাঁতে আত্মহারা এই ভবিষ্যৎ-দীক্ষিতকে দেখে নিয়েছিলেন অনেক আগেই কোনও মন্ত্রবলে, আর সেই দেখাই বিধৃত হয়েছে তাঁর নানা সাহিত্য আলোচনায়? আমরা বুঝি, আসলে আমাদের কবির অতীত আছে, ভবিষ্যৎও। অমাময় মুহূর্তটি কেটে গেলে, আক্ষেপ প্রশমিত হলে, দীর্ঘশ্বাস সংবরণ করে অনেক কষ্টে কবি আবার উঠে আসবেন চ্যাটালো গলুইয়ের ওপর। হয়তো মেরুদণ্ডের ওপর ছড়ানো ক্লান্ত শরীরটিকে দু দণ্ড আকাশমুখো রেখে তিনি টেনে নেবেন গভীর শ্বাস। তারপর আবার যাত্রা শুরু। ঋজু উপবেশন আর সক্ষম হাতের দাঁড় বাওয়া তাঁকে নিয়ে এল মৃত্যুর পরপারে, তিনি এবার বলতে পারলেন…

এই উষ্ণ ধানখেতে শরীর প্রাসাদ হয়ে যায়
প্রতিটি মুহূর্ত যেন লেগে থাকে প্রাচীন স্ফটিক
সীমান্ত পেরিয়ে যেই পার হই প্রথম খিলান
ঘর থেকে ঘর আর হাজার দুয়ার যায় খুলে।

জলজ গুল্মের প্রাণান্তকর আলিঙ্গন থেকে শস্যখেতের এই বিশাল মুক্তিতে যে জন্য ফিরে আসা যায়, সেই সংগ্রামের প্রবণতা তাঁর অতীত থেকে নেওয়া। রাতারাতি জন্মাবার জিনিস এ নয়। সেই সংগ্রামী চেতনার জন্যই বর্তমানে জীবনের উষ্ণতা ফিরে এসেছে, এসেছে স্ফটিক উজ্জ্বলতাও। সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া যেই, ভেঙে ফেলা প্রথম খিলানের নিষেধ— অমনি এক হল বহু, হাজার জীবনের অভিজ্ঞতা ভিড় করে এল কবির আনন্দলেখে।

রবীন্দ্রকথিত অস্তিত্বের ত্রিস্তরীয় অধ্যায় নিজের জীবনে পেরিয়েছেন আমাদের কবি। অবলীলায় নয়, বরং তাঁর পথে পথে ছড়ানো পাথরের আধিক্য কিছু বেশিই ছিল। দেশভাগের পর ছিন্নমূল কিশোরটি পদ্মাপাড় থেকে এসে পড়ল কলকাতার কংক্রিটের কঠিনে। সারল্য আর জটিলতায় লাগল দড়ি টানাটানি, কিন্তু পেছনে ফেলে আসা সুপুরি গাছের সারির সেই সবুজ ঋজুতা চিরকালের মতো বাসা বাঁধল স্মৃতিতে। বার বার এরা হানা দিয়েছে কৈশোরের স্নিগ্ধতা আর দেশ হারাবার বেদনার প্রতীক হয়ে…

যা ছিল তা নেই আর, যা হবে তা হবার মতো না
যা আছে তা ধরে আছে গহনে ফলসারঙা মেঘ… যাও চলে যাও, যতদূরে যেতে পারো যাও
সুপুরিবনের সারি যে দিকে চলেছে অবেলায়”

(কেউ কারো মতো নয়)

আর কোনওদিন কোনওকিছুই আগের মতো হবে না, এ-কথা জেনেও দূরাগত ঢাকের আওয়াজে ভেসে আসে ছিন্নমূল, দেশহারা হওয়ার বেদনা…

জলের ওপর ভাসে আমার ছেড়ে আসা
সারিবাঁধা বদর বদর ডাক

বেজে উঠল অনেকদিনের ঢাক।

ঘুমের মধ্যে হাত বাড়িয়ে রাখে কেবল দূরের
মাটি, আমার বিলীয়মান মাটি—

বেজে উঠল হাজার কাঠির ঢাক।

(বেজে উঠল ঢাক)

ব্যবহৃত অন্য শব্দগুলোর তুলনায় ওই আপাত খাপছাড়া তৎসম ঘেঁষা ‘বিলীয়মান’ শব্দটিতেই ধরা আছে দেশহারার দীর্ঘশ্বাসের প্রলম্বন আর অন্তরের টান। স্নেহের আঙুলে জড়ানো আঙুল সজোরে খুলে নেওয়ার প্রক্ষেপ— স্বর্গাদপি গরিয়সী এক বিরাট ছায়াময় স্মৃতি হয়ে থেকে গেল মনের কোন কন্দরে। শুধু…

সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন
দুঃখী ওঠে জেগে।
চোখের সামনে দুলতে থাকে আকাশ
নীচে শহর দুলতে থাকে, ঘর
তারার মতো মিলিয়ে যেতে থাকে—

(মুখোশ মালা)

এই যে বিষাদবৃক্ষের শেকড় ছড়ানো বুকের গভীরে, তার বৃদ্ধি অপ্রতিরোধ্য, কিন্তু গোপন। কালে কালে সে মহীরুহ হবে, কিন্তু গুপ্ত থাকবে দীর্ঘ বিচ্ছেদের ছায়ায়। তাকে আপন করে নিয়েই, কবির পথচলার প্রথম পর্যায় সমাপ্ত। এবার শুরু প্রাথমিক বিরূপতা নিয়েও এ শহরের বুকের ভেতর যে আর একটি শহর লুকিয়ে আছে তার খোঁজ।

সে খোঁজও খুব সহজ ছিল না। তার কৈশোর, প্রথম যৌবন কেটেছে উদ্বাস্তু পরিচয়ে আর পুনর্বাসনের চিন্তায়, গোত্রকুল নিয়ে নানা প্রশ্ন ছুটে এসেছে ঠারেঠোরে, কখনও সোজাসুজি। ‘কী আমার পরিচয় মা’ এই আর্তচিৎকার কবিকে খানখান করলেও, অন্ধকার বনচ্ছায়ে বসে যারা মর্ষকাম তৃপ্তিতে ঠোঁট চেটেছে তারা নাকি ‘সকলেই ঋদ্ধপরিচয়’!

প্রবল দম্ভ আর উন্নাসিকতার এই শহরে বাধ্য হয়ে সইয়ে নিলেন কবি, শিক্ষা আর মুষ্টিমেয় সাহচর্যের খাতিরে হেঁটে পার হলেন অনেকটা পথ। মেধা আর বোধের হাত ধরাধরিতে একদিন তাঁর কবিতাই হয়ে উঠল বাংলা ভাষায় নাগরিক কবিতার সেরা নিদর্শনের অন্যতম, যেখানে শহুরে ক্লিষ্ট মানুষের মুখাবয়ব স্পষ্ট হল, তাদের আগুন, বিচলন, প্রেম এল, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এল। একদিন অভিমানে নিজেকে সাজিয়েছিলেন যে অভিধায়, সেই ‘নির্জন রাখাল’-এ সংলগ্ন হয়ে থাকা গেল না আর। শহর তার সব কলরোল, ট্রামের ঘরঘর, মিছিলের উচ্চকিত স্বর নিয়ে ঢুকে পড়ল কবিতায়। নির্জন রাখাল নয়, কবি হয়ে উঠলেন চারণকবি ত্রুবাদুর, যার কাজই হল বীণাটিকে বক্ষলগ্ন করে দূর দূরান্তের সফরে মানুষের জমায়েতকে গান আর গাথা শুনিয়ে উজ্জীবিত করা।

নির্জনতা তাঁর স্বভাবজাত, প্রতিকূল পরিবেশজাত। কিন্তু দুর্লঙ্ঘ নয়, মানুষে মানুষে সংযোগের কালে তো নয়ই। পাড়ার ভেতরে শাবল হাতে দাঁড়িয়ে থাকে অচেনা হন্তারক, কিন্তু ওই অলিগলি থেকে বেরিয়ে এসেই কিছু ছেলে কবিকে আগুন-খেলায় ডাক দিয়ে যায়, বলে, “এই-যে,/ আগুন জ্বালব, নেমে আসুন পথে।” আর পথে নামলেই প্রত্যয় ঘিরে ফেলে, বোঝা যায় “এ-শহরে আমারও বাঁচার মানে আছে।”

বুঝতে পারি এ-শহরে সমস্ত ধুলোরই মানে আছে
দীর্ঘ দীর্ঘ সূর্যরেখা ছিটকে গেলে ভাঙা টুকরো কাচে
যে আশ্চর্য মনে হয় প্রাণের সোনালি সরু সুতো –
মনে হয় সে আনন্দে আমি কিছু নই অনাহুত।
আঁকিবুঁকি গলি, পথ, দোকান-পসার, ছোট সিঁড়ি
অন্ধকার ভিজে ঘর, কুঁকড়ে থাকে মলিন ভিখিরি
তারই মাঝখানে যদি আনন্দের আশার আবেগে
চমকে ওঠে হাওয়া— তবে তারই বুকে হাত রেখে
রেখে
জানতে পারি জীবনের অমেয় প্রেমের অভিমান
গান শুনে প্রাণ পায় কান্নার ক্ষুধায় ভরা কান!”

(সকাল দুপুর সন্ধ্যা)

তা হলে যে শহরের সুষুম্না, মনে হয়েছিল, হাশিশ আর মারিজুয়ানায় ভর্তি, সেখানেও কী আশ্চর্য, জেগে উঠছে গান, প্রাণ, প্রেম— জীবনের সব অক্ষয় সম্পদ। কবি তার সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে ছেনে নিচ্ছেন এইসব অভিজ্ঞতা। অতীত পেছনে ফেলে এই জেগে ওঠা চেতনার অন্য স্তরে, এ কোনও পূর্ণচ্ছেদের দ্যোতক নয়। এ-ও যেমন সত্য, তেমন সত্য ফেলে আসা পথের সঞ্চয়…

যে দূর দূরত্ব নয় তার কোরকের থেকে দেখি
আমাদের স্নেহগুলি সঞ্চিত অধীর অন্ধকারে
বীজ হয়ে বেঁচে থাকে উৎসবে ব্যসনে দুঃখে শোকে
এ যদি না সত্য তবে কাকে আর সত্য বলে লোকে”

(বিচ্ছেদ)

সব মিলিয়েই কবির এই হয়ে ওঠা, নতুন জন্ম— যে জন্মে তাঁর মুখ ফেরানো আছে বুকের ভেতরে নয়, বাইরের দিকে, বহির্বিশ্ব আর বিচিত্র মানুষের সঙ্গে এক হবার কঠিন সাধনায় তিনি ব্রতী। তিনি একাত্ম বোধ করছেন সেইসব ছন্নছাড়াদের সঙ্গে, যারা দিন বদলানোর অসম্ভব স্বপ্নকে সাকার করতে নিজের জীবন বাজি রেখেছে। অধ্যাপনার সূত্রে নিত্য এদের কারও কারও সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ। ময়দানে বৃন্তচ্যুত রক্তলাল কৃষ্ণচূড়ার কী সাদৃশ্য হঠাৎ করে হারিয়ে যাওয়া তাদের কারও ছিন্নশিরের! তাদের স্বপ্নকে অর্বাচীন বলতে পারেন না তিনি, কারণ খুব গভীরে ভেবে দেখলে কোথায় যেন তাদের পথ আর কবির পথ মিলেমিশে গেছে। কারণ দুই পথেরই শেষ অভীষ্ট মানুষ, যে মানুষের ‘ভাসন্ত শবের মুখে বসেছিল দক্ষিণের পাখি’ আর ‘সূর্যের অন্তিম হাত মুছে দিয়েছিল দুঃখরেখা’। প্রকৃতির কুহক নয়, এই দুঃখছাপ মুছে দেবে হারিয়ে ফেলা পুত্রসম তিমিরের মতোই আরও অজস্র তরুণ, এই বিশ্বাস তাঁকে মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে যায়। আছে, আছে, আশা আছে, এখনও পলিতে পলিতে দেশ ছেয়ে যাওয়ার ঢের বাকি, এই প্রত্যয় নিয়ে দুঃস্বপ্নের শেষে জেগে ওঠেন তিনি। ভোরের সেই ভয়ার্ত স্বপ্নে শেষমেশ খুলে যায় নামহারা গহবর, দৃশ্যমান হয় মৃতদেহগুলি, ‘অবসন্ন ফিরে দেখি ঘাসের উপরে শুয়ে আছে/ পুরনো বন্ধুর দল/ শিশির মাখানো শান্ত প্রসারিত হাতগুলি বাঁকা।’ কিন্তু সেখানেও কবির ‘শরীর যেন আকাশের মূর্ধা ছুঁয়ে আছে’। তাঁর পাঁজর-ভাঙা তালে ‘গ্রহনক্ষত্রের দল ঝমঝম শব্দে বেজে ওঠে/ স্তূপ হয়ে অন্ধকারে সোনারঙা সুর ওই ওঠে আর উঠে ঝরে পড়ে।’

ঋজু কবির মাথা ছুঁয়েছে আকাশ, তার সুরে সোনার রং, এই কবি দেশান্তরী হওয়ার, সস্তা শহুরে চতুরালিকে রোজ প্রত্যক্ষ করবার কষ্টকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়ে একেবারে অন্য মানুষ। অন্য জন্মের জাতক তিনি এইবারে। যেন তাঁর মধ্যেই রূপ পরিগ্রহ করেছে গীতবিতানের প্রথম পাতার ভূমিকা-র ‘নবসৃষ্টির কবি/ নবজাগরণ যুগ প্রভাতের রবি’। আলো-আঁধারের গভীর মন্থনে লব্ধ হয় যে “আনন্দবিপ্লব”, এই দারুণ উপপ্লব, অতিমারি আর মড়কের দিনে তিনিই তাঁর প্রধান হোতা— ‘যে জাগায় চোখে নূতন দেখার দেখা…/ বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা’।

আবার বিরোধাভাস। নতুন দেখার দেখা না-হয় বোঝা গেল, বহু জনতার হয়েও কবি অপূর্ব একা থেকে গেলেন কোন মন্ত্রবলে, পাঠককে তা ভাবায়। মনে হয়, তবে কি শুরু থেকেই গোপনচারী এক অভিন্ন সত্তা বিনি সুতোর মালার মতো বেঁধে রেখেছে স্তর থেকে স্তরান্তরে তাঁর তিন জন্মের যাত্রাকে? একই বোধিসত্ত্ব তিনি, শুধু কি পালটে যায় জাতকের আখ্যানগুলি? কবিতার বাইরে পড়ে রয়েছে অসাধারণ স্বাদু গদ্যের এক ভাণ্ডার যেখানে স্পষ্ট করা আছে অনেক বিমূর্ত ধারণা। আছে আত্মজীবন ছোঁয়া অনেক রচনা। উত্তর খুঁজে নিতে হবে এইসব সৃষ্টির ভেতরেই, কারণ তাঁর কলম আজ ছুটি পেয়েছে আর সেই সত্তার সবচেয়ে নৈকট্যের উত্তরাধিকার বহন করছিলেন যিনি, সেই প্রতিমা ঘোষও বিদায় নিলেন। কবির সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদের আয়ু মাত্র আটদিন।

পাঠকের সঙ্গে বিচ্ছেদ যেন এক অনুপলের জন্যও না হয়!