সেই ভয়াবহ দৃশ্য আজও অবসাদগ্রস্ত করে তোলে…

তানিয়া সরকার

 


ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফার

 

 

 

বর্তমান থেকে ভবিষ্যৎ, বর্তমান, বর্তমান থেকে অতীত, বর্তমান, অতীত থেকে বর্তমান, বর্তমান— এই সামগ্রিক চরাচরের মধ্যে দিয়েই আসলে আমরা সমকালকে দেখি। চোখ খুলে যতটুকু দেখা যায়, সেই দেখার অগ্রে ও পশ্চাতে থাকে বিস্তর ‘না দেখা’-কে দেখা। ঠিক যেভাবে রবীন্দ্রোত্তর যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশ দেখেছেন তাঁর ১৯৪৬-৪৭ সালের বাংলাদেশকে। কলকাতা-নোয়াখালি-বিহারে ১৬-২০ আগস্টের মধ্যে প্রায় দশ হাজার মানুষ মারা গেলেন, মুসলমান ও হিন্দু পরিচয়ে। কবি প্রশ্ন করলেন,

মৃতরা কোথাও নেই; আছে?
সূর্য অস্ত চ’লে গেলে কেমন
সুকেশী অন্ধকার
খোঁপা বেঁধে নিতে আসে—
কিন্তু কার-হাতে?
আলুলায়িত হ’য়ে চেয়ে থাকে—
কিন্তু কার তরে?
আজকে অস্পষ্ট সব?
ব’লে যাবে কাছে এসে
ইয়াসিন আমি,
হানিফ মহম্মদ মকবুল করিম আজিজ—
আর তুমি?

 

গতবছর মার্চ মাসে আমি কলকাতায় ফিরি দীর্ঘ এক সময়ের পর। সঙ্গে নিয়ে ফিরি দিল্লি ২০২০ দাঙ্গার স্মৃতি। পশ্চিমবঙ্গবাসী হওয়ার কারণেই বোধহয় বিশেষ করে আমাদের ছেলেবেলা থেকে বর্তমান পুরোটা জুড়েই আছে দেশভাগের স্মৃতিকথা, আছে দাঙ্গার ইতিহাস-গল্প। একই সঙ্গে আমাদের বর্তমান সময়ের হিন্দুত্ববাদ যা হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থানের নামে আসলে এক উগ্র জাতীয়তাবাদ। যার সঙ্গে দেশাত্মবোধ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতায় জন্ম নেওয়া জাতীয়তাবাদের কোনও সম্পর্ক নেই। একজন স্বাধীন আলোকচিত্রী হিসেবে জীবনে এই প্রথমবার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বীভৎসরূপ প্রত্যক্ষ করি ২০২০ সালে দিল্লিতে। প্রাথমিক অভিজ্ঞতা বলতে দিল্লি পুলিশ কর্তৃক হেনস্থা। এক, মহিলা মানুষ হওয়ার কারণে; আর দ্বিতীয়ত, আমি একজন বাঙালি, যার মানেই আমি একজন বাংলাদেশি। ভারতবর্ষের নাগরিক আমি কোনওভাবেই হতে পারি না। এই বাকবিতণ্ডা কাটিয়ে যখন আমি নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরতে উদ্যোগী হচ্ছি, তখনই চোখের সামনে দিয়ে একদল মহিলা ছুটে পালাচ্ছেন। কারও কারও কোলে দুধের শিশু। ধারালো অস্ত্র ও লাঠি হাতে একদল উগ্র হিন্দু পুরুষের দল। জয় শ্রীরাম ধ্বনি ও অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে করতে মহিলাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মানুষের হাতে মানুষের এমন দুরবস্থা ইতিহাসের পাতা থেকে বাস্তবে এই প্রথম। যে দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি-ক্যামেরা-সাংবাদিকতার পাঠ সবটাই অচল হয়ে গেছিল মুহূর্তে। এই অভিজ্ঞতা আজও আমার শরীর মনকে অবসাদগ্রস্ত করে তোলে, তবুও দু দিন বিরতি নিয়ে ফিরে যাই দাঙ্গাবিধ্বস্ত এলাকাগুলোয়, মহিলাদের সঙ্গে কথা বলা ও ছবির কাজ চালিয়ে যাই।

বারংবার যে কথা উত্তর-পূর্ব দিল্লির মানুষের মুখে শোনা যায় তা হল প্রশাসনের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা। জানতে পারি কীভাবে পুলিশের সামনেই হিন্দু সন্ত্রাসীরা অবাধে প্রবেশ করে মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষজনের ঘরে, জিনিসপত্র লুটপাটের পাশাপাশি মহিলাদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকে— “আসলি আজাদি হামারে হাতও মে, আও হাম আজাদি দেতে হে তুমহে।” অনেক মহিলা শারীরিক অত্যাচার থেকে বাঁচতে বোরখা খুলে রেখে পালাতে বাধ্য হন, যাতে মুসলমান হিসেবে তাদের কেউ চিহ্নিত না করতে পারে। পাশাপাশি যাঁরা বছরের বছরের পর ধর্ম পরিচয় ভুলে প্রতিবেশী হিসেবে জীবন কাটিয়েছেন, অভিবাসী শ্রমিক স্বামীদের অনুপস্থিতিতে একে অন্যের সঙ্গে অবসর যাপন করেছেন নিপাট বন্ধু হিসেবে, ৪৮ ঘণ্টার সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তাঁদের মধ্যে সন্দেহের বীজ গেঁথে দিল মুহূর্তে। আমি খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছি সেই যন্ত্রণা, ভয়, ও অসহায়তা।

 

আমরা যারা ছেলেবেলা থেকেই আমাদের মা-ঠাকুমা-দিদিমাদের মুখে ’৪৬-এর দিনগুলোর কথা শুনেছি, দাঙ্গা নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে জেনেছি গান্ধিজির অহিংসা নীতি নোয়াখালিতে কি চরম অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়ছে এবং তিনি মহিলাদের, মূলত হিন্দু মহিলাদের আত্মরক্ষার কারণে হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বা বিচিত্র এই দেশে সহাবস্থানের ইতিহাসকে ওপরে রাখতে চেয়েছি সর্বদা, অত্যাচার-ধর্মান্তরকরণ নামে যে অপপ্রচার চলেছে যুগ যুগ ধরে এবং ‘হিন্দুর দেশ ভারতবর্ষ’ এই থিওরি নস্যাৎ করে রাস্তায় নামি আজও, তাদের এক বড় অংশই নিজেদের কাজের মধ্যে দিয়ে মানুষের মানসিকতায় গেঁথে দেওয়া ঘেন্নার বীজ উপড়ে ফেলতে চেয়েছি। রাজনীতির নোংরা খেলায় ধর্মকে মোড়ক বানিয়ে মহিলাদের টার্গেট যে পুরুষতন্ত্রের জঘন্য রূপ তা আর আলাদা করে বলে দেওয়ার অবকাশ রাখে না। এই শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক দীর্ঘ পালাবদলের পরেও সাম্প্রদায়িক হিংসা-ঘেন্না-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পায়নি বাংলা। এ তো নেহেরু-গান্ধির সাধের ভারতবর্ষ যা নাকি কায়েদে আজমের পাকিস্তানের থেকে চরিত্রে ও দর্শনে আলাদা। ফ্যাক্ট ও ফিকশানের মধ্যে থাকা সাবধানতার এক লাইনের উপর দাঁড়িয়ে জন্ম নেয় আমার এক-একটি ছবি। যার মধ্যে দিয়ে প্রকট হয়ে ওঠে ’৪৬-এর ১৭ আগস্টের মধ্যরাতের ঘটনা। আমার বাড়ি সংলগ্ন রাজাবাজার এলাকার ভিক্টোরিয়া কলেজের মহিলা হস্টেলের দোতলায় কে বা কারা যেন চারজন মহিলাকে খুন করে ঝুলিয়ে রেখেছে। ৭৫ বছরের স্বাধীন দেশে আজও একইভাবে রাজনৈতিক দলাদলির মাঝে শিকার হয় হিন্দু-মুসলমান সন্তানেরা। শেষ নৈহাটি লোকালে আজও মাথা কেটে নেওয়া হয় খেটেখাওয়া মানুষের, শুধুমাত্র ধর্ম পরিচয়ে। উত্তর ২৪ পরগনার এক জুটমিল কোয়ার্টারে বসে তার মা আজও কান্নায় ভেঙে পড়েন, হঠাৎ করে বলে ওঠেন, “যদি মারতেই হত, মেরে হাত-পা ভেঙে দিতে পারত। অমনভাবে মাথা… শরীর থেকে মাথা বাদ দিয়ে দিল কেন?”

 

জীবনানন্দের বাংলা ও আমার বাংলার রূপ আজও এক। তা সে সম্প্রীতির হোক বা ঘৃণার। যে বাংলায় লালন-রামপ্রসাদ-আমি আর তুমি সুদিনের আশায় কেবল প্রশ্ন করে যাই—

আজ এই পৃথিবীতে এমন
মহানুভব ব্যাপ্ত অন্ধকার
নেই আর?
সুবাতাস গভীরতা
পবিত্রতা নেই?

 

আর সেই প্রশ্নের দর্পণ হয়ে কেবলই হাজার হাজার নারীমুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে….


*সমস্ত ছবি লেখকের তোলা

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3501 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...