অন্যের বিশ্বাসে আঘাত দিতে নেই

স্বাতী মৈত্র

 



অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক

 

 

 

সে বছর আমি সদ্য পড়াতে ঢুকেছি। অনার্সের ক্লাসে ঢোকবার আগে দাঁড়ি, কমা সহ লেকচার প্রস্তুত করে ঢুকি, পাছে ভুল হয়! পাসের ক্লাসে অনভ্যস্ত হিন্দি-ইংরেজির মিশ্রণে অল্পস্বল্প সাহিত্য, সামান্য ব্যাকরণ পড়াই। এরকমই এক পাসের ক্লাসে আমার ছাত্রীরা আসত অঙ্ক অনার্সের ব্যাচ থেকে। পুরো কোর্সে একটাই তাদের সাহিত্যের পেপার, দেখেছিলাম পড়বার জন্য মুখিয়ে থাকত তারা। কখনও বা অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খাতা’ পড়ে তাদের চোখে জল, কখনও বা মায়া আঞ্জেলুর ‘স্টিল আই রাইজ’ পড়ে তাদের মুখে হাসি, চমৎকার সময় কাটত তাদের সঙ্গে।

একদিন ক্লাসে মহাত্মা ফুলের লেখার অংশবিশেষ পড়ে ক্লাসের শেষে ছলছল চোখে এক ছাত্রী দেখা করতে এল। ১৯ শতকে আরও অনেক সমাজ সংস্কারকের মতন জ্যোতিবা ফুলেও আর্য এবং অনার্যদের মিথাশ্রিত ‘ইতিহাস’ প্রসঙ্গে লেখালিখি করেছিলেন। ডরোথি এম ফিগুয়েরা তাঁর ‘এরিয়ান্স, জ্যুস, ব্রাহ্মিন্স: থিওরাইজিং অথরিটি থ্রু মিথস অফ আইডেন্টিটি’ (২০০২) গ্রন্থে এই প্রসঙ্গে বলেন যে সে সময়ের ভারতে দয়ানন্দ সরস্বতী, বাল গঙ্গাধর তিলকদের হাতে যে আর্য মিথ গড়ে উঠেছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয়দের জাতীয়তাবাদী সত্তাকে জাগিয়ে তোলা ও পরাজিত ভারতবাসীর জাত্যাভিমান বাড়ানো। কিন্তু আরেকদিক দিয়ে এ কথা খুব পরিষ্কার ছিল যে এই প্রকার মিথ-মেকিং দ্বারা মূলত উচ্চবর্ণ তথা ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ আরও শক্তিশালী হয়। অতএব ফুলে— এবং তাঁর পরবর্তীতে আম্বেদকার— এই আর্য স্বর্ণযুগের মিথের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন তাঁর ‘গুলামগিরি’ গ্রন্থে। আর্য এবং অনার্যদের তথাকথিত লড়াই তাঁর লেখায় হয়ে দাঁড়ায় জাতিভেদ প্রথার ভিত্তি। বালি রাজাকে কেন্দ্র করে তিনি তৈরি করেন একটি সমান্তরাল অনার্য স্বর্ণযুগের মিথ। ‘সিকিং বেগমপুরা’ (২০০৮) গ্রন্থে সদ্য-প্রয়াত সমাজবিদ গেইল ওমভেডের ভাষায়,

সে সময় উচ্চ সমাজের ও সাধারণ সমাজের প্রতিনিধিরা সকলেই জাতিভেদের ‘আর্য’ তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন, প্রাচীন যুগে জাতিভিত্তিক লড়াই ও আর্যদের সাফল্যের কথা বলতেন, তবে তাঁদের দর্শন এ ক্ষেত্রে বেশ আলাদা ছিল। উচ্চ সমাজের প্রতিনিধিরা নিজেদের ইউরোপীয় সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজে পেয়ে আপ্লুত হতেন, বৈদিক সমাজে নিজেদের স্বর্ণযুগ চিহ্নিত করতেন, এবং আদিবাসী সমাজের মধ্যে কেবল অধঃপতনই খুঁজে পেতেন। ফুলের তত্ত্বে প্রাক-বৈদিক যুগ হয়ে দাঁড়ায় স্বর্ণযুগ, যার ভিত্তি আদিবাসী অনার্য সমাজ, ও যার পতনের কারণ আর্য আগ্রাসন।

ফুলের এরকমই একটি লেখা পড়ে আমার সেই ছাত্রী সেইদিন আর নিজেকে সংবরণ করতে পারেনি। ব্যাকুল হয়ে জানতে চেয়েছিল, “আমরা এতদিন যা শিখেছি, তাহলে সেগুলো সব ভুল?”

সত্যি কথাই বলছি আপনাদের, ভালো করে উত্তর দিতে পারিনি সেদিন। ১৯ শতকের আর্য-কেন্দ্রিক মিথ-মেকিং ও কাউন্টার মিথ-মেকিং তথা মহারাষ্ট্রে নন-ব্রাহ্মিন মুভমেন্টের উত্থান কেমন করে প্রথম বর্ষের ছাত্রীকে বুঝিয়ে বলব, এর উত্তর আমার কয়েক মাসের শিক্ষাজীবনে ছিল না। আজকে হলে হয়তো চোখের জলে বিচলিত না হয়ে বুঝিয়ে বলতে পারতাম! কিন্তু মনে আছে সেইদিন উপলব্ধি করেছিলাম, একটা নেহাতই অকিঞ্চিৎকর ক্লাসরুমের ক্ষমতাও ঠিক কতখানি।

সেই অঙ্কের ছাত্রীদের সঙ্গে একই কোর্সে আমি প্রথমবার বামার ‘কারুক্কু’র অংশবিশেষ পাঠ করি। ঠিক সেই সময়েই আবার দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট স্টিফেন্স-ইম্পিরিয়াল কলেজ অফ লন্ডন-খ্যাত ভাইস চ্যান্সেলর অম্লানবদনে ইতিহাসের সিলেবাস থেকে এ কে রামানুজনের ‘থ্রি হান্ড্রেড রামায়ানাস’ বাদ দিতে রাজি হয়েছেন, কারণ কিছু বিশেষ গোষ্ঠীর মতে তা নাকি ‘হিন্দু সংস্কৃতির’ বিরুদ্ধে। ক্লাস থেকে বেরিয়ে আর্টস ফ্যাকাল্টির গেটে প্রতিবাদসভা (সে যুগ থেকেই দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ নাস্তি, বিশাল পুলিশবাহিনি বড় বড় বন্দুক নিয়ে হাজির সর্বদা), ও রামানুজনের লেখার পিডিএফ বিতরণ। তার ঠিক এক দশক পরে আজ বামাও বাদ পড়লেন। ‘কারুক্কুর’ পরবর্তী গ্রন্থ ‘সঙ্গতি’র কিছু অংশ নতুন পাঠ্যক্রমে ইংরেজি বিভাগ সংযোজন করেছিল, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ওভারসাইট কমিটি’ বাদ দেওয়াই সঙ্গত মনে করেছেন। নতুন পাঠ্যক্রম তৈরির পিছনে ছিল বহু শিক্ষাকর্মীর প্রায় দু বছরের পরিশ্রম। বাদ দিতে অবশ্য ঘণ্টা দুয়েক লেগেছে। সেখানে বামার সঙ্গে রয়েছেন আরও দুই নারী, মহাশ্বেতা দেবী ও সুকির্থারানি। এখন ভাবি, এ তো হওয়ারই ছিল।

 

বামা। বামা ফাউস্টিনা সুসাইরাজ। লেখিকা, শিক্ষিকা ও দলিত নারীবাদী কর্মী। তাঁর জন্ম তামিল পারায়ার সম্প্রদায়ে। উচ্চবর্ণ সমাজের চোখে তাঁরা ‘নিচু’। ১৯৯২ সালে রচিত ‘কারুক্কু’, তাঁর সম্প্রদায়ের কথ্য তামিলে লেখা। এ রকম ‘অশুদ্ধ’ ভাষা ব্যবহার করবার জন্য উচ্চবর্ণের অনেকের কাছেই তিনি সমালোচনা শুনেছিলেন। জাতিভেদ প্রথার দৈনন্দিন রূপ নিয়ে লেখা ‘কারুক্কু’ তাঁকে এক সময় নিজের গ্রামেই বিরোধিতার সামনে ফেলেছিল, গ্রামে ঢোকা মানা হয়েছিল তাঁর প্রায় সাত মাস। কিন্তু বামা তাতে আটকে থাকেননি। নাইকার সম্প্রদায়ের ঢালাও জোতদারি, পারায়ার, পাল্লারদের মতন দলিতদের গ্রামের এক প্রান্তে থাকা, দাসত্ববন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নাইকারদের জমিতে ক্ষেতমজুরি করা, দেশলাই কারখানায় শিশুশ্রম, ক্যাথলিক চার্চে জাতিভেদের প্রভাব ও দলিত ক্যাথলিকদের অবস্থান— এ সমস্ত বিষয়ে অকপট বামা। তিনি লিখছেন,

এবার আমরা যারা এখনও ঘুমিয়ে আছি তাদের জেগে উঠে চোখ খুলে আশপাশের জগৎটা দেখতে হবে। আমাদের দাসত্বের অন্যায়টাকে স্রেফ ভবিতব্য হিসেবে মেনে নিলে হবে না, যেন আমাদের সত্যিকারের কোনও মতামত নেই। আমাদের পরিবর্তনের জন্য উঠে দাঁড়িয়ে লড়াই করতে হবে। যে সমস্ত সংস্থান জাতকে ব্যবহার করে আমাদের পদদলিত করে রাখে, তাদেরকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। আমাদের দেখাতে হবে যে মানুষের মধ্যে উচ্চ অথবা নিম্ন বলে কিছু হয় না। যারা আমাদের শোষণ করে ভালো আছে, তারা অবশ্য সহজে যাবে না। আমাদেরকেই তাদের নিজেদের জায়গা দেখাতে হবে, এবং এমন একটি পরিবর্তিত সমাজ তৈরি করতে হবে যেখানে সবাই সমান।

ভারতবর্ষে দলিত সাহিত্যে আত্মকথনের ঘরানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘরানা। ‘কারুক্কু’র পরে ‘সঙ্গতি’ও (১৯৯৪) একই ঘরানার লেখা। তবে ‘কারুক্কু’ যদি শুধুই একজন ব্যক্তির কাহিনি হয়, তাহলে ‘সঙ্গতি’ আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটি উপন্যাস। ‘সঙ্গতি’ অথবা ‘ঘটনাবলি’র মাধ্যমে বামা যেন একটি গোটা সম্প্রদায়ের নারীর কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠবার প্রচেষ্টা করছেন। ভেল্লাইআম্মা, পেচ্চিআম্মা, মারিয়াম্মা থেকে ছোট্ট মাক্কিআন্নি, এদের সকলের জীবনের খণ্ডচিত্র দিয়ে গাঁথা ‘সঙ্গতি’র পঁয়ত্রিশটি অধ্যায়। শিশুশ্রম থেকে উচ্চবর্ণের জোতদারের হাতে যৌন অত্যাচার, পরিবারে দারিদ্র্য, গঞ্জনা, কখনও বা মাতাল স্বামীর হাতে মার— এ সমস্ত কিছু নিয়েই ‘সঙ্গতি’র দলিত মেয়েদের বেঁচে থাকা। এর মধ্যেই রয়েছে উৎসব, বিবাহ, ভালোবাসা, হাসি ও কান্না। বামা লিখছেন,

আমাদের শক্ত হতে হবে। আমাদের সুদৃঢ় জীবনযাপন দ্বারা দেখিয়ে দিতে হবে যে আমরা আমাদের স্বাধীনতায় মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি। আমি নিজেকে বলতাম যে আমরা যেন কক্ষনও এ কথা বিশ্বাস না করি যে এ আমাদের ভবিতব্য, এ কথা নিজেকে বিশ্বাস করিয়ে যেন কক্ষনও আমাদের মনকে ক্লান্ত করে ভেঙ্গে না ফেলি। আমাদের শরীরে যতক্ষণ শক্তি আছে, ততক্ষণ আমরা কাজ করতে পারি। ঠিক সেইভাবে বাঁচবার জন্য আমাদের হৃদয়, আমাদের মনকে সুরক্ষিত করতে হবে।

‘সঙ্গতি’ গ্রন্থের দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ অধ্যায় পাঠ করলে ইংরেজি অনার্সের ছাত্রছাত্রীদের ঠিক কতটা ক্ষতি হয়ে যাবে যে তড়িঘড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় কর্তারা ‘ওভারসাইটে’ বসে একেবারে বাদই দিয়ে ফেললেন? ঘটনাটির পরে একটি বক্তব্যে বামা নিজেই বলেন,

আমরা যদি ক্লাসরুমে জাতপাত এবং শোষণ নিয়ে আলোচনা না করতে পারি, তাহলে কি আমাদের ছাত্রদের বলতে হবে যে জতিভেদপ্রথা বলে কিছু নেই? এটাই কি প্রত্যাশিত? আমরা কি ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে বাস্তব থেকে তুলে আনা কাহিনি ও সামাজিক সত্য নিয়ে আলোচনা করব, না কেবলমাত্র স্যানিটাইজ করা কিছু গল্প শোনাব যার সঙ্গে বাস্তবের কোনও যোগাযোগ নেই?

 

একটি চামড়ার টুকরো
তার ঝুড়ির নীচে সেলাই করে লাগানো
সে রওনা দিল।
হাতে তার লোহার পাত, কোণগুলো একটু ভোঁতা,
ছাইয়ে ভর্তি,
ভারী।
একটি ঠেসে ভর্তি বাড়ির পিছনে
সে যায়— থামে সেখানে।
তার চোখ পড়ে একটি চৌকো
লোহার পাতে,
একটা পেরেক থেকে ঝুলছে সেটা।
এক হাতে সেটা তুলে
সেই ছুড়ে মারে এক মুঠো ছাই
ভিতরে।
আর তারপর,
সেই গর্তের ধারালো কোণে নিজের হাতে খোঁচা খেতে খেতে সে
ঝাঁট দেয় আর তোলে, ঝাঁট দেয় আর তোলে, বাম দিক থেকে ডান দিক,
ঝুড়িতে ঢেলে দেয়
কাত করে।
আর তারপর যখন ঝুড়িটা ভর্তি হয়ে যায়,
ভারি হয়ে যায় তার মাথার উপরে,
তখন সে হাতের পিছন দিয়ে
কপাল বেয়ে গড়িয়ে পরা হলদেটে জল
মুছে ফেলে।

তারপর কেমন সহজেই সে হেঁটে চলে যায়।

তার জন্য আমি কেবল একবার পায়খানা নাও করলে পারি।

সুকির্থারানির ‘ডেট’, অথবা ‘ঋণ’। তার কেন্দ্রে একজন দলিত নারী যাকে সরকারি ভাষায় বলে হয় ‘ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জার’, এবং জাতিবাদী ভাষায় বলা হয় ‘মেথরানি’। সে নারী উচ্চবর্ণের চোখে অপবিত্র, কারণ তাঁর কাজটাই অপবিত্র। শহুরে ভারতীয় উচ্চবর্ণরা আজ খাটা পায়খানা থেকে কমোডে উত্তীর্ণ হলেও সেই কমোড পরিষ্কার করবার জন্য দলিত সম্প্রদায়ের কোনও নারী বা পুরুষের আজও বড্ড প্রয়োজন পর। তাঁদের বাসস্থান হয় শহরেরই কোনও ‘সেবক’, ‘হরিজন’ বা ‘আম্বেদকার’ পল্লীতে। তাঁদের ‘হাইজিনের’ কারণে সার্ভিস লিফট ব্যবহার করতে হয়, জলের বা খাবারের আলাদা বাটি থাকে (যদি আদৌ থাকে)। তাঁদেরই সম্প্রদায়ের কেউ কেউ খালি গায়ে ম্যানহোল পরিষ্কার করতে নেমে বিষাক্ত গ্যাসে হাঁসফাঁস করতে করতে মারা যান প্রতি বছর। উচ্চবর্ণদের বর্জ্য পরিষ্কার করবার কাজে তাঁদের ১০০ শতাংশ রিজার্ভেশন থাকাই দস্তুর আজও। লড়াকু তামিল কবি সুকির্থারানি, দলিত নারীর দেহকে তাঁর কবিতার কেন্দ্রে এনে যেন প্রশ্ন করেন, মলমূত্র সাফ করতে না পারলে তা ত্যাগ করাই বা কেন? খাটা পায়খানার দুর্গন্ধ, সাফাইকর্মীর কপাল বেয়ে গড়িয়ে পরা হলদেটে জল ‘ভদ্র’ উচ্চবর্ণের পাঠকের নাকসিটকানিকে অগ্রাহ্য করে মনে করিয়ে দেয়, বহু বহু যুগের ঋণ জমে আছে সমাজে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রতি।

সুকির্থারানির এই কবিতাটা ‘ওভারসাইটের’ বড়বাবুরা পছন্দ করেননি। সরস্বতীর আরাধনার ক্ষেত্রে হাগুমুতুর গন্ধ এলে কারই বা ভালো লাগে বলুন, বিশেষ করে যদি সেই হাগুমুতু উচ্চবর্ণের হয়? আবার রেজিস্ট্রার বার্তা দিয়ে বলেছেন, “The University subscribes to the idea that the literary content forming part of the text in a language course of study should contain materials which do not hurt the sentiments of any individual and is inclusive in nature to portray a true picture of our society, both past and present. Such an inclusive approach is important for young minds who imbibe the content of teaching-learning emanating from the syllabus in letter and spirit.” অর্থাৎ কী না সাহিত্যের ক্লাসরুমে এরকমই সাহিত্যবস্তু থাকবে যাতে ‘কারও’ (পড়ুন: বিশ্ববিদ্যালয়ের  বড়বাবুদের, এবং বড়বাবুদেরও বড়বাবুদের) বিশ্বাসে আঘাত না লাগে। জাতির ভিত্তিতে শোষণ, নির্যাতন অথবা ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগেও বার বার ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জারের মৃত্যুতে কেন তাঁদের বিশ্বাসে আঘাত লাগে না, এর উত্তর অবশ্য পাওয়া যায় না। ‘ইনক্লুসিভ’ কথাটার অর্থ প্রতিবাদী নারী কণ্ঠস্বর বাদ দেওয়া কেন, এরও উত্তর পাওয়া যায় না।  

সুকির্থারানির কবিতার কেন্দ্রে দলিত নারীদেহ, তার চাহিদা, তার ভালোবাসা, তার ওপর হওয়া অত্যাচার, সবই। বহু সময় তাঁকে শুনতে হয়েছে, তাঁর কবিতা বড় ‘ভালগার’, যৌনতার কথা বলে। ‘মাই বডি’ বা ‘আমার শরীর’ নামের একটি কবিতাও তাই পত্রপাঠ বাদ চলে গেছে পাঠ্যক্রম থেকে। ২০১৭ সালের একটি সাক্ষাৎকারে সুকির্থারানি বলেন প্রিয়াঙ্কার কথা। প্রিয়াঙ্কা ভোটমাঙ্গে। ২০০৬ সালের খয়রলাঞ্জি গণহত্যা কাণ্ডে তাঁকে ও তাঁর মাকে নগ্ন করে ঘোরানো হয়েছিল। সুকির্থারানি বলেন,

সাধারণত নারীদেহকে অশ্রদ্ধা করা হয় আমাদের সমাজে। কিন্তু একটি দলিত নারীদেহকে যেন ঘৃণা করা হয়। যখন ২০০৬ সালের খয়রলাঞ্জি গণহত্যাকান্ডে প্রিয়াঙ্কাকে নগ্ন করে ঘুরিয়ে তারপর খুন করা হয়, তাঁর ছবি নেটজগতে সর্বত্র পাওয়া যেত। আমি এক সপ্তাহ রাতে ঘুমোতে পারিনি। ভীষণ ভয় করত। মনে হত, এটা তো আমার সঙ্গেও হতে পারে। সে ভয়ের সঙ্গে যুঝতে গিয়ে আমি লেখা শুরু করি।

প্রিয়াঙ্কা ভোটমাঙ্গে। মহাশ্বেতা দেবীর দোপদী মেঝেন, কাহিনীতে যার ‘ব্যবস্থা’ করবার দায় নেন এক বাঙালি মিলিটারি অফিসার। যার নগ্ন শরীর ও প্রতিস্পর্ধা দেখে খুব, খুব ভয় পেয়ে যান সেনানায়ক। ‘ওভারসাইটের’ বাবুদের পড়ে মনে হয়েছিল, এইভাবে ধর্ষণের চিত্রাঙ্কন উচিত নয়, এসব গল্পকথা পড়ে ছাত্রছাত্রীরা যদি মিলিটারিকে ঘৃণা করতে শিখে ফেলে? অতএব বাদ সুকির্থারানী। অতএব বাদ মহাশ্বেতা।

 

এক দশক পরে আবার সেই ছাত্রীর কথা খুব মনে পরে আমার। “আমরা এতদিন যা শিখেছি, তাহলে সেগুলো সব ভুল?”, জানতে চেয়েছিল সে। বহুদিনের বিশ্বাস নড়ে যাওয়ার বেদনা নিয়ে সরল মনে সে আমার কাছে এসেছিল, হয়তো ভেবেছিল আমার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর আছে। নিজের অনভিজ্ঞতায় তার প্রশ্নের উত্তর ঠিক করে দিতে না পারলেও এটুকু ভরসা আছে যে সে নিজের মত করে ঠিক প্রশ্নগুলো করতে শিখেছে, উপলব্ধি করতে শিখেছে। শিক্ষকের কাছে সব প্রশ্নের উত্তর থাকবে, এটাই বা কেমন কথা?

আমি ভাবি, আজকের দিনে সেই ছাত্রী কি আমাকে এত সরল মনে প্রশ্ন করতে পারত, নাকি সোজা রিপোর্ট চলে যেত ‘ওভারসাইট কমিটি’তে? কিছুদিন পরেই যখন নিজের অনলাইন ক্লাসে দোপদী মেঝেনের কথা বলব, তখন কতটা রেকর্ড করব, আর কতটা করব না? কোন কথা বললে কার বিশ্বাসে আঘাত লাগবে, দরকারই বা কী? দূরে কোথাও যেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর্তনাদ করে ওঠেন,

অন্যের বিশ্বাসে আঘাত দিতে নেই, অন্যের বিশ্বাসে আঘাত দিতে নেই
চতুর্দিকে এত বিশ্বাস, দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে কত রকম বিশ্বাস।

এখন ভাবি, এ তো হওয়ারই ছিল।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3501 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...