নারীর একাল-সেকাল: প্রসঙ্গ এনআরসি-উত্তর অসম

সুমনা রহমান চৌধুরী

 


শিক্ষক, সমাজকর্মী

 

 

 

এক অতিমারিকাল পেরিয়ে আরেক অতিমারিকালের মধ্যবর্তী সময়ে আমরা। এনআরসি-সিএএ-লকডাউন ইত্যাদি ডামাডোলের মাঝেই পেরিয়ে গেল গণতন্ত্রের আরেক গণ-উৎসব। রাজ্যের রাশ রইল বিজেপির হাতেই। শুধু মুখ্যমন্ত্রী পদের ব্যক্তিটি বদলে গেলেন। ভোটের আগে বিজেপির বড় থেকে মাঝারি নেতারা প্রতিটা সভায় গলা ফাটিয়ে বলেছিলেন, ‘নতুন নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইন বা সিএএ-র মাধ্যমে হিন্দু বাঙালিদের নাগরিকত্ব ও সুরক্ষা প্রদানে বিজেপি সরকার প্রতিশ্রুতবদ্ধ!’ অথচ বাস্তবে অসমের এনআরসিছুট নাগরিকদের মধ্যে ধর্মে হিন্দু নাগরিকদের কাউকেই সিএএ বা নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে নাগরিকত্ব দেওয়া তো দূর, উপরন্তু অতিমারিকাল হোক বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মুসলমান এনআরসি-ছুট নাগরিকদের মতো তাঁরাও নিজেদের নামে ‘বিদেশি নোটিস’ পেয়ে চলেছেন। দু-হাজার কুড়ির ভয়াবহ বন্যায় যখন অসমের জনজীবন বিপর্যস্ত, তখনও বিদেশি নোটিস পাঠানো হয়েছে এইসব মানুষদের দুয়ারে। কোভিড-কালীন লকডাউনে যখন সমস্ত জনজীবন গৃহবন্দি, তখনও ছাড় মেলেনি। বিদেশি সনাক্তকরণ আদালতে হাজিরা দেওয়ার শমন এসে হাজির হয়েছে বাড়িতে। নির্বাচন চলাকালীন সময়েও তার হেরফের হয়নি। এনআরসিছুট অথবা সন্দেহযুক্ত ভোটার বা ডি-ভোটারদের যেমন বিদেশি নোটিস পাঠানো হচ্ছে অথবা হয়েছে, তেমনই বিদেশি ট্রাইব্যুন্যালের বিচারে ‘বিদেশি’ ঘোষিত মানুষদেরও খোঁজ করা হচ্ছে। কারণ তাঁদের ধরে ধরে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। নাহ, ভুল বললাম। ডিটেনশন ক্যাম্প নয়, রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তমতে এবার থেকে এইসব বন্দি শিবিরের বাহারি নাম ‘ট্রানজিট ক্যাম্প’। হয়তো বা প্রধানমন্ত্রীর ‘দেশের কোথাও ডিটেনশন ক্যাম্প নেই’ মন্তব্যকে মান্যতা দিতেই নতুন মুখ্যমন্ত্রীর এহেন তোড়জোড়!

তা যাই হোক। এবারে এই কুড়ি লক্ষ এনআরসিছুট সংখ্যাকে আরেকটু ভগ্নাংশে ভেঙে নেই। কেননা আমাদের এই আলোচনার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নারী। এনআরসি-সিএএ পেরিয়ে, লকডাউন আর অতিমারির জ্বালায় পিষ্ট হতে হতে কেমন আছেন অসমের নারীরা? উত্তরটা বিভীষিকাময়। এবং ব্যাখ্যার দাবিও রাখে। অসমের মোট ১৯,০৬,৬৫৭ এনআরসিছুট নাগরিকদের মধ্যে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ লিঙ্গগত পরিচয়ে নারী। আরও স্পষ্ট করে বললে প্রান্তিক নারী। অর্থনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক— সমস্ত দিক থেকেই পিছিয়ে পড়া শ্রেণির। অশিক্ষা এবং খুব কম বয়েসে বিয়ে হওয়ার ফলে জটিল লিগ্যাসি ও বংশলতিকার জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র জোগাড়ে অসমর্থ হওয়ার জন্য এনআরসি প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েছেন তাঁরা। অসমের বিভিন্ন ডিটেনশন ক্যাম্পে বিপুল সংখ্যক নারী বন্দিও আছেন অথবা ছিলেন।

ইদানীং চারদিকে কান পাতলেই বেশ ‘আত্মনির্ভর নারী’, ‘কন্যা সন্তান বোঝা নয়’, ‘নারী-পুরুষের সমতা’ ইত্যাদি গুচ্ছের শব্দ শোনা যায়। টিভি খুললেই প্রধানমন্ত্রীর মাতৃ-সম্মান থেকে ‘মেরে দেশ কি বেটিয়া’ উদযাপন চোখে পড়ে। এই যে সমতা বলতে যে ককটেল মিডিয়া এবং রাষ্ট্রের উদ্যোগে আমাদের গেলানো হচ্ছে, তা কি শুধুই নারী-পুরুষের সমতা, নাকি নারীর নিজের লিঙ্গের মাঝেও শ্রেণিসমতা? কারণ এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় শুধু নারী-পুরুষের মাঝেই অসাম্য বিরাজ করে না, নারীতে-নারীতেও চূড়ান্ত অসমতা বহাল থাকে। যেমন একজন মানুষ বোরখা হিজাব পরলেই আর নারী হিসেবে গণ্য হন না, তার পরিচয় হয়ে ওঠে যৌনদাসী, পর্দার ভেতরে থাকা বিরিয়ানি ও বাচ্চা তৈরির মেশিন। অথবা শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত নারীর মাঝে যে শ্রেণিগত বিভাজন, শহুরে এবং গ্রামীণ নারীর মাঝে যে শ্রেণিগত বিভাজন, ধনী এবং গরিব নারীর মাঝে যে শ্রেণিগত বিভাজন, সেটাও তো অসাম্য-ই! ভারতবর্ষের সংবিধানে সামাজিক, রাজনৈতিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক সকল ক্ষেত্রে প্রত্যেকজন মানুষের সম অধিকার স্বীকৃত আছে। কর্মক্ষেত্রেও সম অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভারত ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু বাস্তবতা?

বাস্তবতা হল, এদেশে ৮০ শতাংশ নারী দারিদ্রসীমার নীচে বসবাস করে। এবং সংগঠিত এবং অসংগঠিত কাজ করার প্রবণতাও এই দারিদ্রসীমারেখার নীচে বসবাসকারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। ভারতে বিভিন্ন কলকারখানা, নির্মাণকাজ, কৃষিক্ষেত্র, গৃহপরিচারিকা, বিড়ি বাঁধা, ভিক্ষাবৃত্তি ইত্যাদি পেশায় প্রায় ৮০ শতাংশ নারী নিয়োজিত আছেন। যদি কৃষিক্ষেত্রের কথাই ধরা যায়, সেখানে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৯৭.৮ শতাংশ নারীই বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন। শিল্পক্ষেত্র থেকে নির্মাণকাজ— সব জায়গাতেই নারী পুরুষের চেয়ে মজুরি কম পায়। অসমের করিমগঞ্জ জেলারই একটা উদাহরণ ধরা যাক। গ্রাম করিমগঞ্জে সুপারির খোসা ছাড়ানোর কাজে বহু সংখ্যক নারী নিয়োজিত আছেন। এই কাজে সময় লাগে বেশি এবং একটানা অনেকক্ষণ বসে কাজ করতে হয়। ১০০০ সুপারির খোসা ছাড়িয়ে নারী শ্রমিকেরা সারাদিনে রোজগার করেন ৫০ থেকে ৬০ টাকা, সেই জায়াগায় একজন পুরুষ দিনমজুরের দৈনিক রোজগার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। এ তো গেল নিম্নবিত্ত নারীর কথা। অসমে সরকারি চাকুরি থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেক্টরে নারীদের নিয়োগ পুরুষদের থেকে কম। প্রায় তিনভাগ পুরুষের বিপরীতে নিয়োজিত একভাগ নারী। ক্ষেতমজুর হিসেবেও অসংখ্য মহিলা মাঠে কাজ করেন। তাঁদের নিজের নামে কোনও জমি নেই। একইভাবে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলা শ্রমিক, যেমন নির্মাণ শ্রমিক, ঠিকে ঝি তথা অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে কাজ করা মহিলারা স্বল্প মাইনেতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এবারে কোভিডকালীন লকডাউনে এইসমস্ত বহুল সংখ্যক শ্রমজীবী মহিলাদের অবস্থান হয়ে দাঁড়িয়েছে ভয়াবহ। কাজকর্ম হারিয়ে, সামাজিক বিধিনিষেধের বেড়াজালে জড়িয়ে খেয়ে-না খেয়ে কোনওমতে বেঁচে আছেন তাঁরা। শিকার হচ্ছেন গৃহহিংসার। বিভিন্ন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সমীক্ষা রিপোর্টে ইতিমধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে লকডাউনে সারা দেশে গৃহহিংসার ঘটনা প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। গৃহহিংসার পাশাপাশি য‍ৌনসন্ত্রাস বা যৌনহিংসাও। এবছরেরই লকডাউন শুরুর সময়ে অসমে এক মহিলা কোভিড রোগী হাসপাতাল থেকে ফেরার মুখে ধর্ষণের শিকার হন। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য বলছে সারা দেশে মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধের ঘটনায় শীর্ষস্থানের রাজ্যগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে রয়েছে অসম।

কোভিড-কালীন লকডাউনের সামগ্রিক অবস্থান যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে ‘Gaon Connection‘ নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সারা দেশের তেইশটি রাজ্যে সমীক্ষা চালায়। তার মধ্যে অসমও ছিল। উত্তর-পূর্ব ভারতের আরও বেশ কয়েকটি রাজ্যও ছিল। সেই সমীক্ষা রিপোর্টে উঠে আসে অসমের আশি শতাংশ গ্রামীণ নাগরিক কোভিডকালীন লকডাউনে MGNREGA প্রকল্পের অধীনে কোনও কাজ পাননি। ৮৭ শতাংশ অসমের গ্রামীণ পরিবার কোনও রকমের চিকিৎসা সুবিধে পায়নি লকডাউন চলাকালীন। গ্রাম অসমের ৩৪ শতাংশ মানুষের দিনে একবেলা আহারও জোটেনি। রেশন-কার্ডধারী অর্ধেকেরও কম মানুষের লকডাউনে সরকার থেকে চাল/আটা জুটেছে। বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে সাধারণ চিকিৎসা পরিষেবা ব্যহত হওয়ার ফলস্বরূপ ৪৫ শতাংশ গর্ভবতী মহিলা প্রাক-প্রসবকালীন চেকআপ সহ ভ্যাক্সিনেশনের কোনও সুযোগসুবিধা পাননি। ৮৭ শতাংশ প্রান্তিক মানুষ (প্রতি দশ জনে ন জন) কোনওরকমের কোনও চিকিৎসা-সুবিধা পাননি। ৩১ শতাংশ মানুষ পরিবার চালানোর জন্য চড়া সুদে লোন নিয়েছেন, ১৬ শতাংশ মানুষ জমি, জমানো গয়না বিক্রি করেছেন, ১১ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্জিত পুরস্কার বিক্রি করেছেন।

২৬ মার্চ, ২০২০-তে কেন্দ্র সরকার থেকে ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করা হয়েছিল পরিবারের একজন নারী সদস্যের নামে ‘জন-ধন অ্যাকাউন্টে’ সরকার থেকে ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে। কিন্তু বহু মহিলা জানিয়েছেন তাঁদের অ্যাকাউন্টে কোনও টাকা আসেইনি। এমনই একজন শিবসাগরের যামিনী দাস। Gaon Connection-কে তিনি জানিয়েছেন, তিনি কোনও টাকা পাননি। টাকা তো দূর এই স্কিম সম্পর্কেই তিনি জানেন না।

এ তো গেল কোভিডকালীন সময়ে আর্থিক এবং সমস্ত রকমের সাধারণ পরিষেবা থেকে নারীর বঞ্চিত হওয়ার তথ্য।

রাষ্ট্রীয় নাগরিকপঞ্জি, নিয়ম-বহির্ভূত উচ্ছেদ এবং ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতে যেসব সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়ার কথা সেগুলো থেকেও বঞ্চিত করে রাখা হয় নারীদের। এর প্রত্যক্ষ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায় কুলসুমা বেগমের ঘটনা। হোজাই জেলার নাখুটিতে বলপূর্বক উচ্ছেদ করতে গিয়ে পুলিশ লাঠি দিয়ে মারধোর করায় প্রাণ হারান আটমাসের অন্তঃসত্তা কুলসুমা বেগম। বলপূর্বক, নিয়ম-বহির্ভূত উচ্ছেদ, প্রশাসনের উৎপীড়নের শিকার হাজার হাজার নামের পাশে কুলসুমাও একটি উদাহরণ মাত্রই। অসমের সদ্যোসমাপ্ত নাগরিকপঞ্জিতে যে বিপুল সংখ্যক নারী এনআরসি তালিকার বাইরে রয়ে গেছেন, সে তথ্য শুরুতেই দেওয়া হয়েছে।

দশ বছর আগেই বিদেশি মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল ঢালিগাঁওয়ের পালপাড়ার বাসিন্দা শান্তি সাহার নামে। তাঁকে বিদেশি সংশয় করে মামলা করেছিল চিরাং জেলা পুলিশ। মাঝখানে কেটে গেছে দশ বছর। অনেক কঠিন প্রক্রিয়ায় উতরে গিয়ে শান্তি সাহার নাম উঠেছে এনআরসির ফাইনাল তালিকায়। কিন্তু দশ বছর আগের সেই বিদেশি মামলায় এই কোভিডকালীন লকডাউনের সময়েই চিরাং বিদেশি ট্রাইব্যুনাল থেকে নোটিস আসে শান্তি সাহার নামে।

অমলা দাস। বন্দি ছিলেন গোয়ালপাড়া ডিটেনশন ক্যাম্পে। স্বামী গোপেশ দাস অনেক চেষ্টা করেও তাঁকে মুক্ত করাতে পারেননি। মূলত এই শোকেই গত ১৬ ডিসেম্বর ২০২০-তে মারা যান গোপেশ দাস। স্ত্রী যে স্বামীর শেষবারের মতো মুখ দেখবেন এরও সুযোগ মেলেনি। শাখা-পলা ভাঙা কিংবা সিঁদুর মোছার মতো হিন্দু ধর্মীয় রীতিনীতিও তিনি পালন করতে পারেননি। কী করেই বা পারবেন! তিনি তো ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি। পুলিশ তাঁকে সেই সুযোগটুকুও দেয়নি।

৭০ বছর বয়সী পার্বতী দাস। কোকড়াঝাড় ডিটেনশন ক্যাম্পে রয়েছেন ২ বছর ৮ মাস ধরে। তিনি তার বাবার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক প্রমাণ করতে পারেননি। তাঁকে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ঘোষণা করে দেওয়া হয়। আসাম হাইকোর্টে তাঁর বেলের জন্য আপিল করা হলেও কোনও লাভ হয়নি। ডিটেনশন ক্যাম্পে প্রবল অসুস্থতা নিয়েই দিন কাটাচ্ছেন। তাঁর টোটো-চালক সন্তান এখন অবধি উকিল বাবদ খরচ করেছে ৭০,০০০ টাকা। গৌহাটি হাইকোর্ট ও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করতে আরও প্রায় ১ লক্ষ টাকা তার যাতায়াত বাবদ খরচ হয়৷

লকডাউন চলাকালীন সবকিছুই বন্ধ ছিল। শুধু বন্ধ ছিল না ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বিদেশি নোটিস পাঠানোর প্রক্রিয়া। যার ফাঁদে পড়েন কাছাড় জেলার বড়খলা অঞ্চলের ভোলানাথপুর এলাকার ৮১ বছর বয়সী মহিলা ভাণ্ডারি দাস। ভাণ্ডারি দাসের নাম ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকায় রয়েছে, তারপরও তাঁকে বিদেশি নোটিস পাঠিয়ে আদালতে হাজিরা দিতে আদেশ করা হয় অতিমারির সময়েই।

কাজলবালা দেব, ২০১৯ সালে শিলচর ডিটেনশন ক্যাম্প (পড়ুন শিলচর সেন্ট্রাল জেল) থেকে মুক্তি পেয়েছেন৷ ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল তাকে বিদেশি ঘোষণা করে ক্যাম্পে পুরে দিয়েছিল৷ কাজলবালার ছেলে দিনমজুর বাপন দেব হাইকোর্টে আপিল করে তারপর অনেক দৌড়ঝাঁপ শেষে মাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেন। কিন্তু ভারতে জন্মানোর পরও কেন তাকে বিদেশি বলা হচ্ছে, কেন ডিটেনশন ক্যাম্প নামের জেলে দিন কাটাতে হচ্ছে, ওই সব ভাবতে ভাবতে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন কাজলবালা! মুক্তির সময় জেল কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয়, তাঁকে শিলচর মেডিক্যাল কলেজের মানসিক চিকিৎসা বিভাগে দেখানো হয়েছে৷ চিকিৎসা চলছে৷ তা যেন তাঁরা অব্যাহত রাখেন৷ দিনমজুর বাপন তারপর থেকে মায়ের চিকিৎসা করিয়ে যাচ্ছেন। কাজলবালা ছেলেকেও চিনতে পারেন না এখন আর। অস্পষ্ট ঘোলাটে চোখে দিনরাত কী যেন খুঁজে চলেন। সম্ভবত নিজের দেশের সাকিন।

নির্বাচনের সময়েও সেই একই বিষয় ঘটে গেছে। অমিত শাহ বলেছিলেন নির্বাচনের সময় এনআরসিছুটদের হয়রানি করা হবে না। তিনি আরও বলেছিলেন, “এনআরসি প্রক্রিয়া চলাকালীন কোনও নাগরিককে ডি-ভোটার তকমা সেঁটে দেওয়া হবে না। কারও হাতে নথি না থাকলে তার জন্যে কোনও ধরনের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।” প্রধানমন্ত্রীও এবারে বরাক উপত্যকায় নির্বাচনী প্রচারে এসে বলে গেছিলেন সমস্ত বাঙালি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। ২০১৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে শিলচরে এসেও মোদি বলেছিলেন, “ক্ষমতায় এলে ডিটেনশন ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেব।” কিন্তু সেসব আশ্বাস যে ভোট উতরানোর কূটনীতি ছাড়া আর কিছুই নয় তার প্রমাণ সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের সময়েই বাছা বাছা হিন্দু বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় ডি-ভোটার বা সন্দেহযুক্ত ভোটারের নোটিস দেওয়া। লাইটপোস্ট বা দেওয়ালে টাঙিয়ে দিয়ে আসা হয়েছে বিদেশি নোটিস। ওদালগুড়ি, বঙ্গাইগাঁও, বিজনি, কাছাড়, করিমগঞ্জ সর্বত্রই একই চিত্র। কাছাড় জেলার কালাইন এলাকায় শিলচরের চার নম্বর ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে দুটি নোটিস কালাইন গ্রাম পঞ্চায়েত কার্যালয়ের নোটিস বোর্ডে লাগিয়ে দিয়ে যায় বর্ডার পুলিশ গত ১৭ মার্চ। নোটিসে লেখা ছিল আগামী ৩০ মার্চ ২০২১ উল্লেখিত ব্যক্তিদের ভারতবাসী হওয়ার সাক্ষ্যপ্রমাণের নথিপত্র সহ শিলচরের চার নম্বর বিদেশি সনাক্তকরণ আদালতে উপস্থিত থাকতে হবে। সারা দেশে তখন কোভিড-কালীন লকডাউন। মানুষের যাবতীয় রুজি-রোজগার বন্ধ।

মিনারা বেগমকে বিয়ের বারো বছর পর সন্দেহভাজন নাগরিক দেগে দিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি করা হয়। মিনারা বেগমের সন্তান সংখ্যা ছয়। ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর সবচেয়ে ছোট সন্তান শাহনারার বয়স দেড় মাস। দেড়মাসের শিশুসন্তান সহ-ই মিনারা বেগমের স্থান হয় গোয়ালপাড়া ডিটেনশন ক্যাম্পে। ক্যাম্পের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাহিল হয়ে পড়া মিনারা ও তাঁর সন্তানকে ছ-মাস পর পাঠানো হয় কোকড়াঝাড় জেলে। জেলেই বড় হয় মিনারার সন্তান। ছ-বছর বয়েসে ভর্তি হয় জেলেরই স্কুলে। কোকড়াঝাড় জেলে থাকাকালীনই মিনারা বেগম খবরের কাগজ মারফত শোনেন ডিটেনশন ক্যাম্পের বন্দিরা ইচ্ছে করলে সরকারের কাছে আবেদন করে বাড়ির কাছের জেলে ট্রান্সফার নিতে পারেন। অবশেষে বহু অনুরোধ মিনতিতে প্রায় দশ বছর পর কোকড়াঝাড় জেল থেকে ২০২০ সালের জুন মাসে শিলচর সেন্ট্রাল জেলে শিফ্ট হয়ে আসেন মিনারা বেগম। জেলে থেকেই মিনারা বেগম বড় দুই মেয়ের বিয়ের খবর পান। একমাত্র ছেলের বড় হয়ে যাওয়ার খবরও এভাবেই আসে তাঁর কাছে। এর মাঝেই কোভিড-কালীন সময়কে মাথায় রেখে গৌহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী আমন ওয়াদুদের দায়ের করা মামলার রায়ে কোর্ট সিদ্ধান্ত জানায় যে কোভিড-কালীন পরিস্থিতি বিচার করে ডিটেনশন ক্যাম্পে যেসব বন্দিদের সময়সীমা দুবছর অতিক্রান্ত হয়েছে তাঁদের সবাইকে জামিনে মুক্তি দিতে হবে। এই রায় অনুযায়ী মিনারা বেগমেরও জামিন হয়। ছোট কন্যাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে মিনারা বেগম বুঝতে পারেন রাষ্ট্র তাঁকে দেশহীন করার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারহীনও করে দিয়েছে অনেকবছর আগেই। দ্বিতীয় স্ত্রী আর নতুন সংসারের ছোট ছোট বাচ্চাদের মাঝে মিনারা বেগমের কোনও স্থান-ই আজ আর নেই।

পাঁচ মেয়ে এক ছেলের মা দীপালি দাস গত ২ মে ছাড়া পেয়েছেন শিলচর সেন্ট্রাল জেল ওরফে ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে। কোভিড-কালীন পরিস্থিতির বিচারে কোর্টের রায়ের আওতাতেই জেলে দু-বছর কাটানোর নিরিখে জামিন হয় তাঁর। ২০১৯ সালে ৫ ফেব্রুয়ারি শিলচর ফরেনার্স ট্রাইবুন্যাল থেকে ইস্যু করা অর্ডারে দীপালি দাসকে বিদেশি ঘোষণা করা হয়েছিল। কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তাঁর ভোটার কার্ডও। শিলচর সেন্ট্রাল জেলে সাজাপ্রাপ্ত খুনের আসামি ও অন্যান্য সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি সহ দুজন মানসিক ভারসাম্যহীন মহিলার সঙ্গে দীপালি দাস এবং আরও বারোজন সন্দেহযুক্ত ভোটারকে একই সেলে রাখা হয়। জামিনে মুক্ত হয়ে ফেরার পর দিপালীর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তাঁর ভ্যাকসিন নেওয়া হয়েছে কিনা। উত্তরে দিপালী জানিয়েছিলেন, “ভোটার কার্ডটাই তো কেড়ে নেওয়া হয়েছে! ভ্যাকসিনের জন্য নাম লেখাব কী করে!” সত্যি তো, সন্দেহযুক্ত নাগরিকদের স্বাস্থ্যের দায় তো আর রাষ্ট্রের নেই! বরং এদের মারি-মৃত্যুতেই রাষ্ট্রের ঝামেলা ঝঞ্ঝাট চোকে!

দিপালীর কাছে আরেকটা উত্তরও জানতে চেয়েছিলেন তাঁর ইন্টারভিউ নিতে যাওয়া সদস্যরা। ‘জেলে এমন কিছু এই দু বছরে হয়েছে যা ভাবতে ভালো লাগে?’ উত্তরে দিপালী জানিয়েছিলেন তাঁর মুখে মুখে গান বাঁধা শেখার কথা। শুনিয়েওছিলেন নিজের বাঁধা গান—

বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও
বল বারবার
বেটির মা-রে আনিয়া রাখলায়
কংসের কারাগার
ও মোদি ভাই কেন এত শাস্তি দিলায়…
শুইলে না আসে নিদ্রা উঠি চমকিয়া
অন্তরে সেই অনল জ্বলে দাইয়াদাইয়া
ভুট দিয়া ডি-ভুটার ভারতে থাকিয়া
ও মোদি ভাই …।


তথ্যঋণ:

১) “ডি-ভোটারের স্বদেশ” — মেঘমালা দে মহন্ত।
২) Key survey findings of Gaon Connection: Survey from the Northeast — Shivani Gupta

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3501 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...