Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

প্রভঞ্জনের দোলা

সোমনাথ মুখোপাধ্যায়

 



গদ্যকার ও প্রাবন্ধিক, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক

 

 

ঘোষণা শুনছেন…

ঘোষণা করছি চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে। পূর্ববর্তী বছরের ভয়াবহ স্মৃতিকে উসকে দিতে এ বছরও প্রায় একই সময়ে আমাদের এই রাজ্যসহ পার্শ্ববর্তী রাজ্য ওড়িশা ও সংলগ্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অংশের ওপর আছড়ে পড়তে চলেছে এক প্রবল পরাক্রমী প্রভঞ্জন— ইয়াস। আমরা আশঙ্কা করছি, এই ক্রান্তীয় ঝড়টি সম্ভবত আগামী ২৬ মে, বুধবার প্রবল রভসে আছড়ে পড়বে আমাদের রাজ্যের দক্ষিণাংশে সাগরদ্বীপের কাছাকাছি অঞ্চলে। এর প্রভাবে আগামী সোমবার থেকেই ঝোড়ো হাওয়ার দাপট বাড়বে। গত শনিবার পূর্ব মধ্য বঙ্গোপসাগরে যে নিম্নচাপ ক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়েছিল, সেইটি ক্রমশই তার শক্তি বাড়িয়ে একটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে ক্রমশ উত্তর-উত্তরপশ্চিমে অগ্রসর হচ্ছে। আমরা চার নম্নর প্ল্যাটফর্ম-এর পক্ষ থেকে সকলকে এই সময়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করার অনুরোধ জানাচ্ছি।

আপনাদের প্রতি চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর পক্ষ থেকে পরামর্শ—

  1. খাবার, পানীয় জল, ওষুধপত্র সম্পর্কে সচেতন হোন।
  2. বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হতে পারে। পর্যাপ্ত সংখ্যায় মোমবাতি হাতের কাছে রাখুন। বিদ্যুতের ছেঁড়া তার সম্পর্কে সতর্ক হোন।
  3. ঝড়ের সময় যাতায়াত বন্ধ রাখুন।
  4. প্রয়োজন মনে করলে নিকটবর্তী Cyclone Rehabilitation Centre-এ আশ্রয় নিন।
  5. প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হাতের কাছে রাখুন।
  6. গুজবে কান দেবেন না। সরকারি ঘোষণার প্রতি বিশ্বস্ত থাকুন।…

সাত সকালে এমন একটা বার্তা হাতফোনের স্ক্রিনে উজ্জ্বল হয়ে উঠতেই নতুন উদ্বেগে মনটা ভারী হয়ে উঠল। একেই একটা গম্ভীর সময়ের মধ্য দিয়ে পথ চলছি সকলে। মৃত্যুর সুতীব্র স্বননে খান খান হয়ে যাচ্ছে জীবনের স্পন্দিত জয়গান, আর তারই মাঝে প্রভঞ্জনের প্রবল আগমনবার্তা। কথায় বলে, ‘বিপদ কখনও একলা আসে না।’ অতিমারির কারণে শঙ্কিত যাপন এখন বুঝিবা আরও ত্রস্ত, সঙ্কুচিত।

এমন ঘটনা যে একেবারে অভাবিতপূর্ব তা কিন্তু মোটেই নয়। বরং আবহবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে নজর দিলে বলা যায় এই সময়ে, প্রাক-মৌসুমি বায়ু আগমনপর্বের এমনটাই দস্তুর, স্বাভাবিক ঘটনা। ঝড়ের পূর্বাপর ইতিহাস ঘাঁটলে এমন ঘটনার অগণিত নজির মিলবে। পাঠকদের স্মৃতিকে উসকে দিলে মন ও মুখের আগল ঠেলে বেরিয়ে আসবে কত কত নাম— লায়লা, নীলম, ফাইলিন, হুদহুদ, মেঘ, চপলা, তিতলি, ফনি, নিসর্গ… ইত্যাদি। উত্তর ভারত মহাসাগরের দুটি উপাংশে— বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের বুকে এমনই সব ঝড়ের দাপাদাপির ঘটনা প্রায় নিয়মিত প্রত্যক্ষ করছি আমরা। এও এক রহস্য!

ওমান ভাষায় ‘ইয়াস’ (Yaas) শব্দের অর্থ হতাশা। যে সময়ের প্ল্যাটফর্মে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, তাতে হতাশার পাল্লা বেজায় ভারী, তবে আগে থেকে গেল গেল রব তুলে কৃতকর্তব্যগুলোকে ভুললে চলবে না। ইয়াস গুটিগুটি পায়ে এগোচ্ছে এগোক, এই অবসরে আমরা বরং আরব সাগরের বুকে ঝড় তোলা তাউতের মনকথা খানিকটা শুনে নিই।

 

প্রসঙ্গ: তাউতে ও পূর্বাভাস

তাউতে। খুব সম্প্রতি আরব সাগরের বুকে দাপিয়ে বেড়িয়ে গুজরাত রাজ্যের ওপর আছড়ে পড়েছে এই ঘূর্ণিঝড়টি। দক্ষিণ-দক্ষিণ পূর্ব আরব সাগরে একটি গভীর নিম্নচাপক্ষেত্র তৈরি হওয়ার সময় থেকেই ভারতীয় আবহাওয়া সর্বেক্ষণ বিভাগের বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে অচিরেই এই কম বায়ুচাপের ক্ষেত্রটি এক প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেবে৷ যার প্রভাবে ভারতের পশ্চিম উপকূলবর্তী রাজ্যগুলো প্রভাবিত হবে। কী পূর্বাভাস ছিল আবহ দপ্তরের এই ঘোষণায়?

গত ১৪ মে, ২০২১ একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তির কথা জানায় আবহাওয়া দফতর। গত রবিবার সন্ধে ৫-৩০ নাগাদ তাউতে গোয়ার পাঞ্জিম শহর থেকে ১৯০ কিমি উত্তর-পশ্চিমে অবস্থান করছিল, ওই অবস্থায় মুম্বই শহরের ২৭০ কিমি দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে, ভেরাবল থেকে ৫১০ কিমি দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে, দিউ থেকে ৪৭০ কিমি দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্বে এবং পাকিস্তানের করাচি বন্দর থেকে ৭০০ কিমি দক্ষিণপূর্বে ছিল ঝড়ের অবস্থান। তার পরের ২৪ ঘণ্টায় তার সামুদ্রিক অবস্থানকালে ঘূর্ণিঝড়টি আরও শক্তি সঞ্চয় করে এবং পরিণত হয় সুপার সাইক্লোনে। আবহাওয়া দপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা জানিয়েছিলেন তাউতে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের আকারে আনুমানিক ১৫০-১৭৫ কিলোমিটার বেগে মঙ্গলবার (১৮ মে) গুজরাটের ভাবনগর জেলার অন্তর্গত পোরবন্দর এবং মাহুভা অঞ্চল অতিক্রম করে আরও উত্তরের দিকে সরে যাবে। এর প্রভাবে গুজরাতের ১২টি জেলায়– কচ্ছ, সৌরাষ্ট্র, পোরবন্দর, জুনাগড়, ভাবনগর, আহমেদাবাদ, সুরাট, ভালসাদ, আম্রেলি, আনন্দ, এবং ভারুচ– প্রবল থেকে প্রবলতর বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ঝড়ের তীব্র দাপট অনুভূত হবে। প্রভাব পড়বে কেন্দ্রশাসিত দিউ-এ।

নতুন ভাবনার ইঙ্গিত

তাউতে নামের এই ঘূর্ণিঝড়টি ইতিমধ্যেই আবহবিজ্ঞানী মহলে নতুন নতুন গবেষণার সুযোগ এনে দিয়েছে। মাথায় রাখতে হবে, আর কিছু দিনের মধ্যেই ভারতীয় উপমহাদেশে মৌসুমি বায়ুর প্রবেশ করার কথা। তার ঠিক আগে তাউতের আকস্মিক আবির্ভাব আমাদের অনেকগুলো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পর্যবেক্ষণসূত্রে জানা যাচ্ছে যে ২০১৮ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে আরব সাগরের জলভাগের ওপর ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হচ্ছে। যেমন মেকানু (২০১৮) যা ওমানের ওপর আছড়ে পড়েছিল, ২০১৯ সালে ঘূর্ণিঝড় বায়ু আঘাত করেছিল গুজরাতে, ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় নিসর্গের আঘাতে ধ্বস্ত হয়েছিল মহারাষ্ট্র। সাম্প্রতিক তাউতে সেই পরম্পরার নবতম সংযোজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরা।

লক্ষ করে দেখা গেছে, ঘূর্ণিঝড় তাউতে খুব দ্রুততার সঙ্গে শক্তিসঞ্চয় করেছে। অন্যান্য সাবেকি ঘূর্ণিঝড়ের মতো এই ঝড়েরও সূচনা হয়েছিল দক্ষিণপূর্ব আরব সাগরের বুকে এক সাধারণ নিম্নচাপের আকারে গত ১৪ মে, ২০২১-এর সকালে। তারপর একটু একটু করে জলভাগের ওপর থেকে শক্তিসঞ্চয় করে মাত্র দুদিনের মধ্যেই অর্থাৎ ১৬ মে তারিখে সাধারণ নিম্নচাপের ক্ষেত্রটি একটি অতি প্রবল ঘূর্ণবাত্যার রূপ নেয়। তুলনামূলকভাবে তাউতের অগ্রজ ঘূর্ণিঝড়গুলো যেমন বায়ু (৩৬ ঘণ্টা), মেকানু (৯৬ ঘণ্টা), এবং নিসর্গ (১২০ ঘণ্টা) অনেক বেশি সময় নিয়েছিল পূর্ণশক্তির ঘূর্ণবাত্যায় পরিবর্তিত হতে৷ প্রাক মৌসুমি সক্রিয়তা পর্বে আরব সাগরের বুকে বিগত কয়েক বছরে নিয়মিতভাবে ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তির বিষয়টিও আবহবিজ্ঞানীদের কাছে অভিনব বলেই মনে হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই, আগামী দিনে মৌসুমি বৃষ্টিপাত বিষয়ে পূর্বানুমান করার সময় ঘূর্ণিঝড়ের নিয়মিতির বিষয়টা নিয়ে বিজ্ঞানী মহলকে নতুন করে ভাবতে হবে।

 

ঘূর্ণিঝড়ের সাতকাহন

এই মুহূর্তে ঘূর্ণিঝড় প্রসঙ্গে যে প্রশ্নটিকে ঘিরে আবহবিজ্ঞানীদের চিন্তাস্রোত আবর্তিত হচ্ছে তা হল কেন এত দ্রুততার সঙ্গে একটি সাধারণ নিম্নচাপক্ষেত্র প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিবর্তিত হচ্ছে? আবহবিজ্ঞানের বিষয়ে যাদের সামান্য ধারণা আছে তাঁরা জানেন যে ক্রান্তীয়মণ্ডলের নিম্নচাপের একটি শক্তিশালী ঘূর্ণাবর্তের পরিণত হওয়ার পেছনে নিয়মিত শক্তির জোগানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রশ্ন হল, বায়ু এই শক্তি পায় কোথা থেকে? তার উত্তরে বলা যায় যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণ জলরাশি এবং ক্রান্তীয় সমুদ্রের আর্দ্র বায়ুর নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ একটি ঘূর্ণিবায়ুকে ক্রমশই শক্তিশালী করতে থাকে। বিজ্ঞানীরা সরেজমিন সমুদ্রজলের উষ্ণতার পরিমাপ করে দেখেছেন যে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত আরবসাগরীয় জলরাশি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই উষ্ণ হয়ে রয়েছে যা সমুদ্রের ওপরের বায়ুকে আরও চঞ্চল ও অশান্ত করে তুলেছে। তাউতের অতি শক্তিশালী হয়ে ওঠার পেছনে এমনটাই কারণ।

বায়ুপুঞ্জকে অশান্ত করার পেছনে জলীয় বাষ্পের ভূমিকা অপরিমেয়। বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতির পরিমাণ খুবই নগণ্য, এবং একথাও বলা যেতে পারে যে জলীয় বাষ্প ঠিক কতটা পরিমাণে থাকবে তা পরিবর্তনীয়। জলীয় বাষ্পের পরিমাণ নির্ধারণ করে উষ্ণতা। উষ্ণতা বাড়লে বাষ্পীভবনের পরিমাণ বাড়ে, বাড়ে জলীয় বাষ্পের উপস্থিতির পরিমাণ। সাধারণভাবে জলীয় বাষ্প হল জলের গ্যাসীয় অবস্থা। তরল থেকে গ্যাসীয় অবস্থায় রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন হয় তাপের। পদার্থবিদ্যায় এই সংযোজিত তাপকে বলা হয় ‘বাষ্পীভবনের লীনতাপ’। এই জলীয় বাষ্প হালকা বলে তরতরিয়ে ওপরে উঠে যায়। কিন্তু বায়ুমণ্ডলের উচ্চতর অংশের বায়বীয় পরিবেশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে স্বতন্ত্র। তাই উচ্চতর অংশের শীতলতর পরিবেশে জলীয় বাষ্প সংযোজিত তাপকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়৷ লক্ষ-লক্ষ, কোটি কোটি জলীয় বাষ্প তাদের শরীরে জমা থাকা লীনতাপ, যা ঘনীভবনের লীনতাপ নামে পরিচিত, বায়ুকে সংক্ষুব্ধ করে, ফলে তা অচিরেই অশান্ত হয়ে উঠে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেয়। এভাবে দেখলে মনে হয় ক্রান্তীয়মণ্ডলের ঘূর্ণিঝড়েরা হল লীনতাপের আশ্চর্য লীলাখেলার ফসল। যত বেশি পরিমাণে এই ঘনীভবনের লীনতাপ সংযোজিত হবে একটি নিম্নচাপের দ্রুত ঘূর্ণিঝড়ে পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে। তাউতের ক্ষেত্রে হয়তো এমনটাই হয়েছে খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে।

প্রাক মৌসুমি কালে উত্তর ভারত মহাসাগরেরর দুই উপাংশে অর্থাৎ বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে এমন ঘূর্ণিঝড় খুব স্বাভাবিক। ফিরতি মৌসুমি পর্বেও স্থলভাগ ও জলভাগের মধ্যে তাপীয় পরিবেশের অসমতার কারণে এমনটা ঘটা অস্বাভাবিক নয়। তবে যতটা দ্রুততার সঙ্গে একটি নিম্নচাপ ঘূর্ণিঝড়ের রূপ পাচ্ছে তা অবশ্যই আবহবিজ্ঞানীদের কপালে নতুন চিন্তার ভাঁজ ফেলছে। আর শঙ্কাটা ঠিক এই কারণেই।

তাউতে: এক বর্ধমান উদ্বেগ?

আরব সাগরের বুকে এমন বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ের উৎপত্তির বিষয়টি উপমহাদেশের আবহবিদ্যার চর্চার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটাতে চলেছে। ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশের পাশাপাশি প্রতিবেশী বাংলাদেশের মানুষের কাছে ঘূর্ণিঝড় ও তার ধ্বংসলীলা খুব অচেনা বিষয় নয়। মৌসুমি বায়ুকে আপ্যায়ন করে ভারতবর্ষের বুকে টেনে আনার পেছনে এই ঘূর্ণবাত্যাগুলো খুব বড় ভূমিকা নিয়ে থাকে।

গড়পডতা পাঁচটি ঘূর্ণিঝড় এই টেনে আনার কাজটি করছে স্বাভাবিক নিয়মে, যার মধ্যে চারটি ঘটে বঙ্গোপসাগরের বুকে৷ পর্যবেক্ষণসূত্রে দেখা গেছে যে বঙ্গোপসাগরের জলপৃষ্ঠের উচ্চতা আরব সাগরের জলপৃষ্ঠের তুলনায় উষ্ণতর, ফলে এই অঞ্চলের মানুষকে অনেক বেশিসংখ্যক ঝড়ের দাপট সইতে হয়৷ এতকাল আরব সাগর এ জাতীয় ঘনঘটার প্রকোপ থেকে অনেকটাই বিযুক্ত ছিল। কিন্তু ইদানিং আরব সাগরের জলও উষ্ণতর হয়ে ওঠার সুবাদে আরব সাগরের বুকে ঘূর্ণিঝড়ের দাপট বাড়ছে। এমন পরিস্থিতির পেছনে বিশ্ব উষ্ণায়নের ঘটনাকেই দায়ী করছেন তথ্যাভিজ্ঞ বিজ্ঞানীমহল।

ময়নাতদন্ত: তাউতেকে নিয়ে

‘ইয়াস’-এর আসা ও ‘তাউত’-এর যাওয়া— এই দুই ঝড়ের মধ্যবর্তী সময়টা যাকে আমরা ‘অন্তর্বর্তী ঘূর্ণিঝড় পর্ব’ বলে চিহ্নিত করতে পারি, তা মূলত ঘূর্ণিঝড় নিয়ে বিজ্ঞানীদের কাটাছেঁড়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। সাধারণ প্রবণতা অনুসারে সমুদ্রের জলভাগের ওপর অবস্থানকালে ঘূর্ণিঝড় মাত্রেই তীব্র গতিতে অগ্রসর হয়। কেননা জলভাগের ওপর ঘর্ষণ বলের প্রভাব কম থাকে। কিন্তু স্থলভাগের ওপর আছড়ে পড়ার পর এই সুতীব্র গতিবেগ অনেকটাই মন্দীভূত হয়৷ ২০১৯ সালের ফনি বা গত বছরের আমফানের ক্ষেত্রেও এমন মন্দন আমাদের নজর এড়ায়নি৷ অথচ তাউতের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেনি বলেই বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন। এমনিতেই বিগত ২৩ বছরের পর গুজরাতের মানুষ এমন প্রবল ঝড়ের সম্মুখীন হলেন, তারপরেও অন্তিম পর্বের ঝড়ের সুতীব্র গতিবেগ (ঘণ্টায় ৭০/৮০ কিমি) ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছে। কেন এমন হল?

আসলে এর পেছনেও রয়েছে দুই বিপরীতমুখী বায়ুর সংঘাত। আরব সাগরের বুকে নিম্নচাপ কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে মধ্য অক্ষাংশীয় পশ্চিমী ঝঞ্ঝা সক্রিয় হয়ে উত্তর-উত্তরপশ্চিম দিক থেকে দক্ষিণে অগ্রসর হয়। এই বায়ুর সঙ্গে ঘূর্ণিঝড়ের উত্তরমুখী বায়ুর সংঘাতের ফলেই স্থলভাগে আছড়ে পড়ার পরও বায়ুর গতিবেগ অনেকটাই বেশি ছিল। পশ্চিমি ঝঞ্ঝার প্রভাবগ্রস্ত হওয়ার পরেও সংলগ্ন উপকূল অঞ্চল থেকে নিরবচ্ছিন্ন জলীয় বাষ্পের সংযোজন ঝড়কে যথেষ্ট সক্রিয় রেখেছে স্থলভাগের ওপরেও।

অন্ত্যকথা

তাউতের ঘূর্ণিপুচ্ছের দাপট প্রশমিত হতেই ‘ইয়াস’ এসে আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে৷ এই মুহূর্তে সাজ সাজ রব প্রশাসনের সর্বস্তরে। এখনও সমুদ্রের বুকে থেকে নিজের শক্তি বাড়াচ্ছে ইয়াস। এই ঝড়কে ঘিরে মশগুল বিভিন্ন চ্যানেল, বিশেষত আবহবিদরা নানান মতামতের আখ্যানে ঝড় তুলেছেন চায়ের পেয়ালায়। ঝড় মোকাবিলার জন্য সর্বতোমুখী প্র‍য়াস করতে হবে৷ বিগত বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে, এগিয়ে যেতে হবে আমাদের। উত্তর ভারত মহাসাগরের এই ঘূর্ণিঝড়ের হাত ধরেই দক্ষিণপশ্চিম মৌসুমি বায়ুর বিপুল জলদ সম্ভার ঢুকে পড়বে ভারতীয় উপমহাদেশে। বৃষ্টির পরিমাণ বাড়বে৷ পর্যাপ্ত, সুবণ্টিত বর্ষণ পরিপুষ্ট করবে আমাদের চিরায়ত কৃষিযাপন সংস্কৃতিকে৷ অতিমারি পরিস্থিতির কারণে একনিতেই আমরা মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত। ইয়াস যেন ‘যশ’ হয়ে আমাদের বেঁচে থাকার লড়াইকে গরিমান্বিত করে৷ মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে আসা চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর পরামর্শগুলো আমরা যেন বিস্মৃত না হই।