Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

প্রয়াণ লেখ: প্রবীর গঙ্গোপাধ্যায় (১৯৫০-২০২১)

প্রবীর গঙ্গোপাধ্যায় | লেখক, সম্পাদক, অনুবাদক

কণিষ্ক চৌধুরী

 


প্রাবন্ধিক, শিক্ষক

 

 

 

২৮ জুন ২০২১, সকাল এগারোটা নাগাদ সিদ্ধার্থদা (সিদ্ধার্থ দত্ত)-র ফোন পেলাম। প্রবীরদা আর নেই। সকাল ১০-৩০-এ চলে গেছেন না-ফেরার দেশে। আর যাওয়ার আগে রেখে গেছেন তাঁর সৃষ্টি। রেখে গেছেন জীবন-অভিজ্ঞতার লিপিবদ্ধ রূপ।

তাঁর জীবন বিচিত্র পথে এগিয়েছে। শৈশবের প্রথম ভাগ কেটেছে উদ্বাস্তু শিবিরে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ঐ বিদ্যালয় পর্যন্ত। টেকনিক্যাল কলেজে ভর্তি হলেও তা সম্পূর্ণ করেননি। তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী হওয়ায় সহজেই শিক্ষকদের ভালোবাসা আর সম্ভ্রম আদায় করতে পেরেছিলেন। স্কলারশিপের টাকা চলে যেত সংসার খরচের খাতে। ষোল-সতের বছর বয়সেই জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। অবশ্যই কমিউনিস্ট রাজনীতিতে। প্রথমদিকে সিপিএমের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হলেও, অবশেষে তাঁর মোহভঙ্গ হয়, নকশালবাড়ির ডাক শুনতে পান। হয়ে ওঠেন প্রকৃত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন ‘অনুতাপহীন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী’ (দার্শনিক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের ভাষায়)।

তাঁর ‘খোশগপপো’-র পাঠকেরা জানেন যে সংশোধনবাদ ও হঠকারী মতবাদের বিরুদ্ধে তাঁর কলম কতটা তীক্ষ্ণ ও সাহসী।

এই ‘খোশগপপো’গুলিতে ধরা পড়েছে তাঁর জীবনের নানা মুহূর্ত, যা নানা মাত্রাবিশিষ্ট। তাঁর দেখার মধ্যে অভিনবত্ব আছে। অভিনবত্ব সমালোচনায়, আত্ম-সমালোচনায়। বাক্যের সহজতা, ঋজুতা পাঠককে সরাসরি সমস্যার কেন্দ্রে পৌঁছে দেবে। এমন লেখনী এই প্রতারক সময়ে বড় দুর্লভ। তাই তাঁর রচনা পাঠ একটি দুর্লভ অভিজ্ঞতা বললেও কম বলা হয় না।

 

২.

অসামান্য প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি নানা দিক থেকে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। নজর দেওয়া যাক তাঁর সৃষ্টিকর্মের ওপরে—

১. Samsad English-Bengali Dictionary (সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য)
২. দর্পণে রেখেছি মুখ
৩. জনসংখ্যার রাজনীতি
৪. ডা. হৈমবতী সেন-এর জীবনকথা
৫. রামমোহন ও বিদ্যাসাগর
৬. চার্লস ডারউইন ও অ্যালবার্ট আইনস্টাইন (অনুবাদ)
৭. কুমেরু অভিযান (অনুবাদ; আশীষ লাহিড়ীর সঙ্গে যুগ্মভাবে)
৮. দেখা-শোনা (আত্মজৈবনিক স্মৃতিচারণা)

তাঁর শেষ বইটি (দেখা-শোনা) প্রকাশিত হয়েছিল জানুয়ারি ২০২০-তে। প্রবীর গঙ্গোপাধ্যায় এই বইটিকে আত্মচরিত বা ইতিহাস বলতে চাননি। সে-কথা তিনি লিখেছেন বইটির ‘গোড়ার কথা’য়। তাত্ত্বিক কচকচিকে বাদ দিয়ে সাদামাটা ভাষায় তিনি তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরেছেন। যে টুকরো টুকরো ঘটনাগুলি লিপিবদ্ধ হয়েছে এখানে— সেগুলিকে প্রবীর গঙ্গোপাধ্যায় ইতিহাস বলতে রাজি নন। কিন্তু এটাও তো ইতিহাস— ব্যক্তিগত ইতিহাস। বইটির মধ্যে রয়েছে ২২টি স্বর্ণখণ্ড। পাঠককে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেবে, বাধ্য করবে আত্মসমীক্ষায়। এখানে যে ঘটনাগুলির উল্লেখ রয়েছে, সেগুলির প্রেক্ষিত একটি বিশেষ সময়ে বিশেষ মানুষের ভাবনা ও অনুভব। কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যাবে এগুলির মধ্যে বিশেষতাকে অতিক্রম করে একটি সর্বজনিনতার দিকও রয়েছে। বইটির শেষ লাইনে লিখেছেন: “শুক্লা যদি নেই হয়ে যায়, তাহলে জানি না।” (পৃঃ ২১৮)। এ-কথা কেবল প্রবীর গঙ্গোপাধ্যায়ের নয়, আরও অনেকেরই। শুধু নামটি বদলে যেতে পারে।

৩.

দু-চারটি ব্যক্তিগত কথা বলি। সাধারণভাবে পাণ্ডিত্যের একটা ঝাঁঝ থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখেছি বিদ্যা মোটেই বিনয় দান করে না। প্রবীরদার ক্ষেত্রটি অন্যরকম। প্রকৃত অর্থে পণ্ডিত হওয়ায় তাঁর মধ্যে আশ্চর্য রকমের একটা নমনীয়তা ছিল। আমাদের মতো অকিঞ্চিৎকর মানুষকেও যেভাবে সম্মান দিয়ে কথা বলতেন তা প্রাতিষ্ঠানিক নাকউঁচুদের মধ্যে একান্তভাবেই অনুপস্থিত। এঁদের বিশ্ববিদ্যালয় আর প্রবীরদার বিশ্ববিদ্যালয় যে এক ছিল না— তা বলাই বাহুল্য। তাঁর শিক্ষালয় কারখানা, শ্রমিক বস্তি, মিছিল। সংগ্রামের আঁকাবাঁকা পথে যত শিখেছেন, ততই তাঁর লেখাগুলি শিক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। ভালো ছাত্র হওয়ার সুবাদেই শিক্ষকের মর্যাদা পেয়েছেন অনেকের কাছে।

২০১৯-এ গিয়েছিলাম প্রবীরদার হাওড়ার বাড়িতে, সঙ্গে ছিলেন সিদ্ধার্থদা ও পৌলমী। দীর্ঘসময় ধরে নানা আলোচনার অন্তে বাড়ি ফিরেছি এক বুক আশা-ভরসা নিয়ে৷ আজীবন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী প্রবীরদার কথায় বুঝেছি, শৃঙ্খলমুক্তির স্বপ্ন বৃথা হয় না। ২৮ জুন যখন তাঁর চলে যাওয়ার খবরটা পেলাম, তখন মনে মনে বলেছি, কমরেড প্রবীরদা লাল সেলাম।