Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

ফরাসি ভাষাশিক্ষা

ভালেন্তিন গ্রিগোরিয়েভিচ রাসপুতিন

 

মূল রুশ থেকে অনুবাদ: লীলা সরকার

ভালেন্তিন গ্রিগোরিয়েভিচ রাসপুতিন [১৫ মার্চ ১৯৩৭-১৪ মার্চ ২০১৫] তাঁর জন্ম ও জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই কাটিয়েছেন পূর্ব সাইবেরিয়ায়। গ্রামীণ জীবনযাত্রার তিনি ছিলেন সমর্থক। তাঁর কথায়, “যে মুহূর্তে আমরা গ্রামের শিশুরা হাঁটতে শিখতাম, টলোমলো পায়ে ছিপ নিয়ে হাজির হতাম নদীর ধারে…… তুলে বেড়াতাম বেরি আর মাশরুম…… আরেকটু বড় হতেই বাইতাম নৌকো।”

‘ফরাসি ভাষাশিক্ষা’ গল্পটিতে তাঁর আত্মজীবনের ছায়াপাত ঘটেছে। গল্পের নায়কের মতো তিনিও প্রথম তাঁর গ্রাম থেকে বাইরে পড়াশোনা করতে যান।

জনপ্রিয় এই গল্পটিকে ১৯৭৮ সালে চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত করেন রুশ চিত্রপরিচালক ইয়েভগেনি ইভানোভিচ তাশকভ।

আশ্চর্যের কথা হল এই যে, আমরা বাবা-মার কাছে যে ব্যবহার পাই, শিক্ষক শিক্ষিকার কাছে গিয়েও কখনও কখনও সেই একই অনুভূতি হয় কেন? শুধু যে স্কুলেই এরকম হয়েছে তা নয়। পরবর্তী জীবনেও  আমার  একই অনুভূতি হয়েছে।

১৯৪৮ সালে আমি পঞ্চম শ্রেণিতে উঠলাম। আমাদের গ্রামে শুধুমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল। তাই স্কুলে পড়ার জন্য আমাকে বাড়ি থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে অন্য গ্রামে যেতে হত। সত্যি কথা বলতে গেলে, আমি পঞ্চম শ্রেণিতে যেতে পারলাম কারণ সপ্তাহ খানেক আগে মা সেখানে গিয়ে এক বান্ধবীর বাড়িতে আমার থাকার বন্দোবস্ত করে এসেছিলেন। আগস্ট মাসের শেষ তারিখে আঙ্কল ভানিয়া, আমাদের পরিচিত লরি-ড্রাইভার, বিছানাপত্র-সমেত আমাকে সেই বাড়িতে নিয়ে গেলেন, আর  পিঠ চাপড়ে খানিক উৎসাহব্যঞ্জক কথা বলে চলে গেলেন। এইভাবেই এগারো বছর বয়সে শুরু হল আমার একলা থাকার জীবন।

দুর্ভিক্ষের বছর তখনও শেষ হয়নি। আমাদের সংসারে তখন আমরা তিনজন— মা, আমি আর আমার ছোট বোন। বসন্তকালে যখন জিনিসপত্র খুবই দুর্মূল্য হয়ে উঠল, তখন আমি যেহেতু বাড়ির বড় ছেলে তাই বাড়িতে যা খাবার থাকত আমি আগে খেয়ে নিতাম। ছোট বোনকে বাধ্য করতাম ওটস্, রাইয়ের দানা আর আলুর চোখ খেতে, যাতে ওর পেট অনেকক্ষণ ভারী থাকে আর তাড়াতাড়ি খেতে না চায়। গোটা  গ্রীষ্মকাল জুড়ে আমরা আমাদের ক্ষেতে গ্রামের পাশের নদীর পরিষ্কার জল সেচ দিলাম। কিন্তু ফসল ভালো হল না। লেখাপড়া আমি ভালোই শিখছিলাম। স্কুলেও আনন্দের সঙ্গেই যেতাম। গ্রামের লোকেরা আমাকে বেশ বিদ্বান ভাবতে লাগল। বৃদ্ধদের চিঠি লিখে দিতাম আর গ্রামের সাধারণ লাইব্রেরির জন্য বই বেছে আনতাম। সন্ধ্যাবেলায় ওইসব বই থেকে ছোটদের গল্প বলতাম। নিজেও অবশ্য গল্পের মধ্যে কিছু কিছু যোগ করতাম।

যদিও আমাদের গ্রামের আর কোনও ছেলেমেয়ে পাঠশালার বেশি পড়াশোনা করেনি, আমার মা কিন্তু শত দুঃখকষ্টের মধ্যেও আমার পড়া চালিয়ে গেলেন। গ্রামে আমিই প্রথম লেখাপড়ার জন্য বাইরে গেলাম। তখন তো জানি না আমার ভাগ্যে কী আছে! নতুন জায়গায় আমার জন্য কোন্ পরীক্ষা অপেক্ষা করে আছে!

পড়াশোনা বেশ ভালোই চলছিল। যে পড়া আমাকে দেওয়া হত তা আমি ভালোভাবেই পড়ে ফেলতাম। কিন্তু একটা বিষয়ে শুধু আটকে গেলাম। স্কুলে সমস্ত বিষয়ে ভালো নম্বর পেলেও ফরাসি ভাষাতে খুব কম পেলাম। ফরাসি ভাষায় সফল হতে পারছিলাম না কেবলমাত্র উচ্চারণের গলতির জন্য। ফরাসি শব্দগুলো সহজে মুখস্থ বলতে পারতাম, খুব তাড়াতাড়ি অনুবাদ করতে পারতাম, ফরাসি হাতের লেখাও সুন্দর ছিল; কিন্তু উচ্চারণের বেলায় আমি একেবারেই অষ্টরম্ভা। আমাদের গ্রামে কেউ বিদেশি ভাষা বলত না। বিদেশি ভাষার অস্তিত্ব সম্বন্ধেও তারা সন্দিহান ছিল। গ্রামের মেয়েরা যেমন জড়িয়ে জড়িয়ে কথা বলত আমিও সেইভাবে জড়িয়ে জড়িয়ে দ্রুতগতিতে ফরাসি কথা বলতাম। অর্ধেক শব্দ অযথা গিলে ফেলতাম আর বাকি অর্ধেক তড়বড় করে জোরে জোরে বলতাম। আমার উচ্চারণ শুনে ফরাসি ভাষার দিদিমণি লিদিয়া মিখাইলোভনা ভুরু কুঁচকে চোখ বন্ধ করে ফেলতেন। বারবার তিনি দেখাতেন কীভাবে স্বরসন্ধির শব্দ উচ্চারণ করতে হয়, বারবার আমাকে বলতে অনুরোধ করতেন, কিন্তু আমি নির্বাক। আমার পক্ষেও কিছু করার ছিল না।

সবচেয়ে দুঃসময় ছিল যখন আমি স্কুল থেকে ফিরে আসতাম। যেখানে থাকতাম অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেখানে আমাকে অনেক ঘরের কাজ করতে হত। সবসময় বাচ্চারা এসে উত্ত্যক্ত করত। চাই বা না চাই তাদের সঙ্গে দৌড়ে দৌড়ে খেলতে হত। আর এরই মধ্যে পড়া তৈরি করতে হত।

কিন্তু একা হলেই বাড়ির জন্য, গ্রামের জন্য আমার খুব কষ্ট হত। আমি তো আগে কখনও বাড়ির বাইরে থাকিনি! আর অপরিচিত লোকেদের মধ্যে বাস করার জন্যও প্রস্তুত ছিলাম না। দিনগুলো খুবই দুঃখে কাটত। শুধু ইচ্ছা করত কবে বাড়ি যাব। সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে মা এসে আমাকে দেখে খুব ভয় পেয়ে গেলেন। আমি মাকে আঁকড়ে ধরে রইলাম। কোনও অভিযোগ করলাম না, কাঁদলাম না, কিন্তু মা যখন চলে যাচ্ছেন তখন আর নিজেকে সামলাতে না পেরে মায়ের গাড়ির পিছনে পিছনে দৌড়ালাম। মা গাড়ি থেকে হাত নাড়তে লাগলেন যাতে আমি থেমে যাই— মাকে আর লজ্জায় না ফেলি, কিন্তু আমি কিছুই বুঝলাম না। তখন মা গাড়ি থামিয়ে নেমে এসে বললেন— বোঝার চেষ্টা করো। তুমি যদি এরকম করো তাহলে তো তোমার পড়া বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আমার বোধোদয় হল। আমি ফিরে এলাম।

কিন্তু শুধু যে বাড়ির জন্য কষ্টেই  আমি রোগা হয়ে যাচ্ছিলাম তা ঠিক নয়। পুষ্টিহীনতাতেও  ভুগছিলাম। শরৎকালে আমার বাড়ির কাছের শস্যভাণ্ডার থেকে আঙ্কল ভানিয়া প্রায় সপ্তাহেই খাবার নিয়ে এসে যথেষ্ট পরিমাণে দিয়ে যেতেন আমায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় ওই খাবার আমার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। কারণ আঙ্কল ভানিয়া শুধু রুটি আর আলুই আনতেন। মাঝে মাঝে মা হয়তো কারও কাছ থেকে কোনও কিছুর বিনিময়ে বাড়িতে তৈরি চিজভর্তি জার এনে দিতেন। চিজ মাকে ধার করতেই হত কারণ মা তো আর গরু পুষতেন না। দেখে মনে হত মা অনেকটা চিজ পাঠিয়েছেন, কিন্তু দু’দিনের মধ্যেই সব ফুরিয়ে যেত।

 

তখনও সেপ্টেম্বর মাস চলছে, ফেদকা একদিন আমাকে বলল–  তুই চিকা খেলতে ভয় পাস না?

–চিকা কী? আমি বুঝতে পারলাম না।
–টাকা দিয়ে খেলতে হয়। যদি টাকা থাকে, চল্, আমরা খেলি।
–আমার কাছে টাকা নেই।
–আমারও নেই। তাহলে চল্ আমরা খেলাটা দেখি। দেখলেও ভালো লাগবে।’

ফেদিয়া আমাকে বাগানের পিছনদিকে নিয়ে গেল। পাহাড়ের ওপরে বাগানের বিছুটিগাছের মধ্যে দিয়ে আমরা চললাম,  কখনও বা আবর্জনার স্তূপের উপর দিয়ে লাফিয়ে গেলাম, তারপর একটু পরিষ্কার একটা ছোট মাঠে কয়েকজন ছেলেকে দেখলাম। ছেলেগুলো আমাদের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে। একজন বাদে বাকি সব ছেলেরাই আমার সমবয়সী। শুধু একজন লালচে কোঁকড়াচুলো, বয়সে বেশ বড়। ও তার ক্ষমতা আর শক্তি সম্বন্ধে বেশ সজাগ। আমার মনে পড়ল ও ক্লাস সেভেনে পড়ে, নাম ভালিক।

–এটাকে আবার কেন নিয়ে এলি? ফেদকাকে সে রূঢ়ভাবে জিজ্ঞেস করল।
–নিজেই এসেছে ও, নিজেই এসেছে। আমাদের সঙ্গেই থাকে। সতর্কভাবে উত্তর দিল ফেদকা।
–তুমি খেলবে? ভালিক আমাকে জিজ্ঞাসা করল।
–আমার তো টাকা নেই।
–তাহলে খেলাটা দেখো, কিন্তু আমরা যে এখানে আছি কাউকে বোলো না।
–কী ভেবেছ কী আমাকে? আমি কি বাচ্চা? অত্যন্ত অপমানিত বোধ করে বললাম।

ওরা আমার দিকে আর নজর না দেওয়াতে পাশের দিকে সরে গিয়ে খেলাটা দেখতে লাগলাম। যারা ছিল তারা সকলেই খেলছিল না। কখনও ছজন কখনও সাতজন খেলুড়ে, বাকিরা শুধু দর্শক হয়ে প্রধানত ভালিককে উৎসাহ দিতে লাগল। আমি বুঝতে পারলাম যে ভালিকই হল এখানকার নেতা।

খেলাটা বুঝতে পারা এমন কিছু ব্যাপার নয়। প্রত্যেকে এই খেলাতে বারোটা করে কোপেক দিল। কোপেকগুলোর যেদিকে ঈগলপাখি আঁকা আছে, সেই দিকটা নিচের দিকে করে একসঙ্গে বোর্ডে রাখা হল। মোটা একটা পাথরের চাকতি ছুড়ে কোপেকগুলোকে মারতে হবে। যদি তোমার কোপেক উল্টে ঈগলপাখি দেখা যায়, তখন বোর্ডের সব টাকা বিনা প্রতিবাদে তোমার হবে। তারপরে আবার খেলা শুরু হবে।

ভালিক খেলায় চালাকি করছিল। সেটা বুঝতে পারলেও কেউ প্রতিবাদ করার সাহস করল না। সত্যিই তো ও বেশ ভালোই খেলছিল।

খেলা দেখে মনে হল আমার যদি পয়সা থাকত, তাহলে আমিও জিততে পারতাম। পাথরের চাকতিটা হাতে নিয়ে এমনভাবে ছুঁড়তাম কোপেকগুলোর ওপর  যাতে আমার কোপেকটা উল্টে যায়। আর ব্যস্! দশে দশ!

কিন্তু দুঃখের বিষয় আমার কাছে তো পয়সাই নেই। মা মাসে প্রায় দুবার করে চিঠির মধ্যে পাঁচ রুবল দুধ খাওয়ার জন্য পাঠাতেন। বর্তমান সময়ে হয়তো এটা খুব বেশি নয়, তবুও কয়েকটা হাফ লিটার দুধের বোতল তো কিনতে পারতাম! রক্তহীনতার জন্য ডাক্তার আমাকে দুধ খেতে বলেছে, কারণ মাঝেমাঝেই বোধহয় রক্তহীনতার জন্য মাথা ঝিমঝিম করে আমার। তাই পাঁচটা রুবল আমার কাছে অনেকটা মূল্যবান।

কিন্তু তৃতীয়বারে মায়ের কাছ থেকে পাঁচ রুবল পেয়ে দুধ কিনলাম না। রুবলকে কোপেকে ভাঙিয়ে নিয়ে খেলার জায়গায় রওনা হলাম। ছেলেগুলো বেশ বুদ্ধিমান। তারা সকলের চোখের আড়ালে পাহাড়ঘেরা একটা আবর্জনার স্তূপের মধ্যে ফাঁকা জায়গায় খেলার স্থান নির্বাচন করেছিল। গ্রামে বড়দের সামনে এই জুয়াখেলা হলে পুলিশে ধরবে। কিন্তু এই নিরাপদ স্থানে কোনও ভয় নেই। আর জায়গাটা আমার বাড়ির কাছেই, তাই দশ মিনিটেই পৌঁছে গেলাম।

প্রথমবার নব্বই কোপেক এবং দ্বিতীয়বারে ষাট কোপেক হারিয়ে আমার খুবই কষ্ট হল। কিন্তু ভাবলাম খেলাটা যদি বারবার খেলি তাহলে জেতার কৌশলটা রপ্ত করতে পারব। সন্ধ্যাবেলায় খেলা শেষে যখন সকলে চলে যেত, আমি আবার ওখানে গিয়ে পাথরের নিচ থেকে ভালিকের লুকোনও চাকতিটা বের করে নিতাম। তারপর পকেট থেকে পয়সাগুলো নিয়ে অন্ধকার না হওয়া পর্যন্ত চাকতি ছোঁড়া প্র্যাকটিস করতাম। করতে করতে আমি এতই দক্ষ হয়ে উঠলাম যে দশবারের মধ্যে তিন-চারবার চাকতি ছুঁড়ে কোপেক উল্টে ঈগলের মুখ বের করে দিতে পারতাম।

অবশেষে সেই দিন এল যেদিন আমি জিততে পারলাম।

এখন প্রত্যেকদিন স্কুলের পরে এখানে দৌড়ে আসি আর প্রত্যেকদিনই খেলায় জিতি। তিনবার কিংবা চারবার হয়তো হারলাম, তারপর পঞ্চমবারে তিনগুণ টাকা দিতে বাড়ি ফিরতাম।

এখন আমার কাছে টাকা থাকছে। খেলাতে খুব বেশিক্ষণ আমি থাকতাম না। আমার তো শুধু রুবলের দরকার— প্রত্যেকদিন এক রুবল। যখনই রুবল জিততে পারতাম, খেলা থেকে পালিয়ে বাজারে গিয়ে দুধ কিনতাম। গোয়ালিনীরা অবশ্য আমার ময়লা পয়সাগুলোতে খুবই বিরক্ত হত, কিন্তু দুধটা দিত। খাবার খেয়ে পড়তে বসতাম। পুরোপুরি খাবার আমার কোনওদিনই জুটত না। কিন্তু দুধটা খেয়ে আমার পুষ্টিও হল আর ক্ষুণ্ণিবৃত্তিও হল। আমি বুঝতে পারলাম আমার আর আগের মত দুর্বলতায় মাথা ঘুরছে না।

প্রথম প্রথম ভালিক শান্তভাবেই আমার জিতে যাওয়াটা মেনে নিচ্ছিল। ও কোনওদিন হারেনি কিংবা ওর টাকা আমার পকেটে আসেনি। মাঝেমাঝে আমার প্রশংসাও করত। আর যারা হেরে যেত তাদের বলত, দেখ্, শেখ্, কীভাবে চাকতিটা ছুঁড়তে হয়। কিন্তু শিগগিরই ও খেয়াল করল যে আমি খুব তাড়াতাড়ি খেলা ছেড়ে চলে যাই। একদিন ও আমাকে যেতে না দিয়ে বলল, কী হে ছোকরা! টাকা জিতেই চলে যাচ্ছ? অন্য কোনও নেশা আছে নাকি? আরও খেলো!

–আমার পড়া আছে, আমি যুক্তি দেখালাম।
–যাদের পড়া তৈরি করতে হয় তারা যেন এখানে খেলতে না আসে।

এরপর আমাকে কখনও ওর আগে খেলতে দিত না। সকলের শেষে আমাকে পাথরের চাকতিটা ছুঁড়তে দিত। কিন্তু আমি তো ভালো ছুঁড়তাম। সুযোগ পেলেই আমার চাকতিটা কোপেকগুলোর ওপর যেন চুম্বকের মত উড়ে গিয়ে পড়ত। নিজের দক্ষতা দেখে নিজেরই আশ্চর্য লাগত। কিন্তু আমার এই দক্ষতায় যেন কারও নজর না পড়ে, সে বিষয়ে আমার সাবধান হওয়া উচিৎ ছিল। তা না করে আমি বোকার মতো খেলে টাকা জিততে লাগলাম। কী করে জানব যে যদি কখনও কেউ সামনের দিকে এগিয়ে যায় তাহলে অন্যরা তাকে কখনও সহ্য করবে না? এরকম ক্ষেত্রে কেউ তোমাকে সহানুভূতি দেখাবে না? কেউ তোমার সঙ্গে মধ্যস্থতা করে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করবে না? বরং যারা অকৃতকার্য হয়েছে, যারা হেরে গেছে, তারা তোমাকে ঘৃণা করবে? একদিন নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই আমার এই জ্ঞান সঞ্চয় হল।

সেদিন যে মুহূর্তে চাকতি দিয়ে কয়েনে আঘাত করে সেগুলো নিতে যাচ্ছি, দেখলাম ভালিক একটার ওপর পা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি এগিয়ে গিয়ে ভালিকের পাটা সরিয়ে দিতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু ভালিক আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। তাও আমি দেখতে পেলাম যে এটা কয়েনের উল্টোপিঠ যেখানে ঈগল আছে। তা না হলে ভালিক কখনওই পা দিয়ে ঢেকে রাখত না।

–তুমি উলটে দিয়েছ! আমি বলে উঠলাম, কয়েনটা ঈগলের দিকে ছিল আমি দেখেছি!

ভালিক আমার নাকে ঘুসি মারল— তুমি কখনওই দেখোনি! আর একবার বলার চেষ্টা করেই দেখো না!

আমার ওদের কাছে নত হওয়া উচিত ছিল। ওখানে নিজের কথায় জিদ ধরে থাকা অর্থহীন। কারণ মারামারি শুরু হলে কেউ আমাকে সাহায্য করবে না। এমনকি ফেদকাও নয়।

চোখ কুঁচকে ভালিক আমার দিকে সোজা তাকিয়ে রইল। একটু বেঁকে গিয়ে আমি সবচেয়ে কাছের কয়েনকে আঘাত করে সেটাকে উল্টে দিলাম। চাকতিটা নিয়ে আবার আমি ছোড়বার জন্য তৈরি হচ্ছি, কিন্তু ছোড়া আর আমার হল না। কে যেন হঠাৎ পেছন থেকে আমার হাঁটুতে লাথি মারল। আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। সকলে হাসতে লাগল। ভয়ের চেয়েও বেশি লজ্জা আর অপমান আমাকে গ্রাস করল। এখন পৃথিবীতে আর কিছুকেই আমি ভয় পাই না। কীসের জন্য কেন ওরা আমার সঙ্গে এমন করছে? আমি ওদের কী করেছি?

–চলে এসো! দেখি কী করতে পারো! ভালিক চ্যালেঞ্জ করল।
–তুমি কোপেকটা উল্টে দিয়েছো! আমি চিৎকার করে উঠলাম— আমি দেখেছি, তুমি উল্টে দিয়েছ আমি দেখেছি!
–আর একবার বল দেখি! আমার দিকে এগিয়ে এসে ভালিক বলল।
–তুমি কোপেকটা উল্টে দিয়েছ! খুব আস্তে বললাম। যদিও ভালোভাবেই জানতাম এর পরিণতি কী হবে।

ওরা একজন একজন করে আমাকে মারল। তৃতীয়জন যদিও ছোট কিন্তু হিংসুটে, পা দিয়ে আমাকে মারল। তারপর ওরা সকলে মিলে মেরে মেরে আমার সারা শরীরে কালশিটে ফেলে দিল। শেষকালে আমাকে মাটিতে ছুড়ে ফেলে দিল।

–যদি বাঁচতে চাও এখান থেকে পালাও! ভালিক আদেশ করল, শিগগির!

আমি উঠে কাঁদতে কাঁদতে পাহাড়ের দিকে ছুটলাম।

তীব্র অপমানবোধে আমার মন ভরে গেল। কথা বলার শক্তিও হারিয়ে ফেললাম। পাহাড়ে উঠেও নিজেকে সংযত করতে পারলাম না। পাগলের মতো গলায় যত জোর আছে তত জোরে চিৎকার করে উঠলাম—

–ও কোপেকটা উল্টে দিয়েছে!

আমার পিছনে বোধহয় ফেদিয়া আসছিল, কিন্তু ভালিক তাকে থামিয়ে দিল সম্ভবত এই ভেবে যে আমার যথেষ্ট শাস্তি হয়েছে। মিনিট পাঁচেকের মতো দূর থেকে ওদের খেলা দেখলাম। তারপর পাহাড়ের অন্যদিক দিয়ে নেমে শুকনো ঘাসের উপর শুয়ে পড়ে কাঁদতে লাগলাম।

সেইদিন পৃথিবীতে আমার চাইতে দুঃখী আর কেউ ছিল না।

 

পরের দিন সকালে ভয়ে-ভয়ে আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। বাঁ চোখের নিচে কালশিটে, নাক ফুলে গেছে আর গালের ওপরে রক্তাক্ত আঁচড়ের দাগ। এই চেহারায় কী করে স্কুলে যাব ভেবে পেলাম না। কিন্তু স্কুলে তো আমাকে যেতেই হবে। কোনও কারণেই আমি স্কুলে অনুপস্থিত হতে পারি না। এটা তো ঠিক, ঠান্ডা লেগে কারও নাক আমার নাকের মত ফুলতেই পারে, আর আঁচড় এবং কালশিটে যে কোনও কারণেই হতে পারে। তার জন্য ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আমি শুধু চাইছিলাম কেউ যেন আমার মুখের এই অবস্থা লক্ষ না করে।

হাত দিয়ে বাঁ চোখটা ঢেকে অস্বস্তি ভরে ক্লাসে ঢুকলাম। মাথা নিচু করে পিছনদিকে নিজের বেঞ্চে বসলাম। দুর্ভাগ্যবশত, প্রথম পিরিয়ডটাই ছিল ফরাসি ভাষাশিক্ষার ক্লাস, যার দিদিমণি লিদিয়া মিখাইলভনা। তাঁর ক্লাস অন্য সব ক্লাসের থেকে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগত আমার। কিন্তু একটাই অসুবিধে ছিল। তাঁর নজর থেকে কোনও কিছু লুকিয়ে রাখা ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার। দিদিমণি ক্লাসে ঢুকে চিরাচরিতভাবে সকলের কুশল জানলেন। তারপর ছাত্ররা যখন বসল, তিনি সকলের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে মজার মজার কথা বলতে লাগলেন। অবশ্য যতই আমি লুকোতে চেষ্টা করি না কেন তিনি হঠাৎ আমার মুখের ক্ষতচিহ্নগুলো দেখতে পেলেন। এটা আমি বুঝতে পারলাম কারণ ক্লাসশুদ্ধ সকলে আমার দিকে ঘুরে আমাকে দেখতে লাগল।

বইটা খুলে লিদিয়া মিখাইলভনা বললেন, দেখা যাচ্ছে আমাদের মধ্যে একজন আহত ব্যক্তি আছেন।

সকলেই হাসতে শুরু করল, আর শিক্ষিকা এমনভাবে তাকালেন যেন আমাকে দেখছেন না, পাশের কাউকে দেখছেন। কিন্ত ইতিমধ্যেই তো দৃষ্টিপাতের রহস্যটা জানা হয়ে গিয়েছে আমাদের।

–কী হয়েছে? আমাকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন।
–পড়ে গিয়েছি, বোকার মত বললাম। আজ… না না… কাল সন্ধেবেলা অন্ধকারে পড়ে গিয়েছি।
–আরে পড়ে গিয়েছে না ছাই! উচ্ছ্বসিত আনন্দে ফেদিয়া চিৎকার করে উঠল, ওকে তো ক্লাস সেভেনের ভালিক মেরেছে! ওরা পয়সা নিয়ে খেলছিল আর তখনই মারামারি করেছে। আমি তো দেখেছি! আর বলে কিনা পড়ে গিয়েছে!

এইরকম বিশ্বাসঘাতকতায় আমি বিস্ময়ে একেবারে হতবাক হয়ে গেলাম। ব্যাপারটা কী ওর? ও কি এই কথাগুলো বলার তাৎপর্য বুঝতে পারছে না? নাকি ইচ্ছা করে আমাকে বিপদে ফেলছে? পয়সা দিয়ে জুয়া খেলার জন্য আমাকে তো স্কুল থেকে তাড়িয়ে দিতে পারে! কী সর্বনেশে পরিস্থিতিতে পড়লাম রে বাবা! ভয়ে আমার মাথা ঘুরতে লাগল। শেষ হয়ে গেল। আমার সব শেষ হয়ে গেল। আর এই ফেদিয়া তিশকিন সব কিছু বলে দিয়ে আমার বিপদ দেখে আনন্দ করছে!

–তিশকিন, আমি তোমাকে অন্য কথা বলতে চাইছি, একটুও আশ্চর্য না হয়ে প্রশান্তভাবে নীরস স্বরে লিদিয়া মিখাইলভনা ফেদিয়াকে থামিয়ে দিলেন। যাও, ব্ল্যাকবোর্ড-এর কাছে যাও। তুমি হয়তো আগে একবার বলেছ, তবু আর একবার পড়াটা লেখো।

একটু হতবুদ্ধি আর খানিকটা দুঃখিত হয়ে ফেদিয়া যখন বোর্ডের দিকে যাচ্ছে, দিদিমণি আস্তে করে আমাকে বললেন, সব ক্লাস শেষ হয়ে গেলে আমার জন্য অপেক্ষা করবে।

আমি আরও ভয় পেয়ে গেলাম। দিদিমণি হয়তো আমাকে প্রধানশিক্ষকের কাছে নিয়ে যাবেন। তার মানে প্রধানশিক্ষক মহাশয় আমাকে আগামীকাল সমস্ত ছাত্র-শিক্ষকদের সামনে বলতে বলবেন, কেন আমি এই জঘন্য খেলা খেলেছি। যদি কোনও ছাত্র জানলার কাচ ভাঙে, মারামারি করে অথবা বাথরুমে ধূমপান করে এবং সেই অপরাধের বিচারের জন্য যখন ছাত্রটিকে প্রধানশিক্ষকের সামনে আনা হয়, তখন তিনি নিজেই যেন কাজটা করেছেন এমন অপরাধীভাবে ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করতেন, কেন তুমি এই জঘন্য কাজটা করলে? সব ছাত্র-শিক্ষকদের সামনে পায়চারি করতে করতে তিনি ছাত্রটিকে বলতেন, কেন তুমি অন্যায় কাজটা করলে উত্তর দাও। উত্তর দাও। দেখো, সমস্ত স্কুল অপেক্ষা করছে তোমার উত্তরের জন্য। ছাত্রটি তখন তার কাজের স্বপক্ষে কিছু যুক্তি বিড়বিড় করে বলতে শুরু করলেই প্রধানশিক্ষক তাকে বাধা দিয়ে বলতেন, তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। প্রশ্নটা কী করা হয়েছে? কী কারণে তুমি এই কাজটা করতে অনুপ্রাণিত হলে? এখন সত্যি করে বলো, কীসে তুমি অনুপ্রাণিত হলে। আমরা সকলে শুনব।’

ছোট ছেলেদের ক্ষেত্রে সাধারণত চোখের জলেই বিচারের সমাপ্তি ঘটত। প্রধানশিক্ষক মহাশয়ও শান্ত হয়ে যেতেন আর আমরাও যে যার ক্লাসে চলে যেতাম। বড় ছেলেদের নিয়েই সমস্যা হত, কারণ তারা কাঁদতও না, আর তাঁর প্রশ্নের কোনও উত্তরও দিত না।

কিন্তু আমি আমার কাজের স্বপক্ষে কী বলব? আমাকে বরং স্কুল থেকে তাড়িয়েই দিক। তাহলে আমি গ্রামে ফিরে যেতে পারব। কিন্তু না না! এরকম লজ্জা আর অপমান নিয়ে আমি বাড়ি ফিরতে পারব না! তার চাইতে বরং নিজেই স্কুল ছেড়ে গ্রামে চলে যাই। তাহলে বরং সকলে আমাকে বিশ্বাসের অযোগ্য আর অপদার্থ ভাববে। সেটাই বরং ভালো!…… না না! যত খারাপই হোক আমার পক্ষে গ্রামে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। তার চাইতে লজ্জা অপমান সহ্য করে এখানেই থাকব, এতেই অভ্যস্ত হয়ে যাব।

সব ক্লাস শেষ হয়ে গেল। আমি ভয়ে মৃতপ্রায় হয়ে লিদিয়া মিখাইলভনার জন্য বারান্দায় অপেক্ষা করছিলাম। স্টাফরুম থেকে বেরিয়ে আমাকে দেখে তিনি আমাকে ক্লাসে নিয়ে গেলেন। টেবিলের পাশে চেয়ারে বসলেন। আমি শেষ বেঞ্চের দিকে বসতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তিনি আমাকে প্রথম বেঞ্চে বসতে বললেন।

–এটা কি সত্যি যে তুমি পয়সা দিয়ে জুয়া খেলো? হঠাৎ তিনি বলতে শুরু করলেন।

তিনি এত জোরে কথাগুলো বললেন যে আমি ভয় পেয়ে গেলাম। বাইরে থেকে সকলে শুনতে পাবে যে! কিন্তু আমার তো অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই। ফেদিয়া তো সবকিছুই প্রকাশ করে দিয়েছে।

মিনমিন করে বললাম, হ্যাঁ, সত্যি।

–খেলে কি জেতো, না হেরে যাও?

আমি একটু ইতস্তত করলাম, কী উত্তর দেব ঠিক করতে পারলাম না।

–এসো, আমরা একটু আলোচনা করি। হেরে যাও, তাই না?
–না না, আমি জিতি।
–বেশ, ভালো কথা। তুমি জেতো। জেতা পয়সা দিয়ে কী করো? চকলেট কেনো না বই কেনো? না জমিয়ে রাখো? তাহলে তো তোমার এখন বেশ অনেক টাকা জমেছে, তাই না?
–না না, বেশি জমেনি। আমি তো শুধু এক রুবল করে জিতি।
–এক রুবল জেতার পরে আর খেলো না?
–না।
–কেন? এক রুবল কেন? এক রুবল দিয়ে কী করো?
–দুধ কিনি।
–দুধ!

দিদিমণি আমার সামনে বসে আছেন। তাঁর দিকে সোজাসুজি না তাকিয়েও আমি অস্পষ্টভাবে অনুভব করলাম তিনি যে শুধু বুদ্ধিমতী তাই নয়, অপূর্ব সুন্দরী। অঙ্ক বা ইতিহাসের শিক্ষিকা নন, তিনি হলেন প্রহেলিকাময় ফরাসি ভাষার শিক্ষয়িত্রী। কিন্তু তিনি যে কোনও ছাত্র, যেমন আমার মতো সাধারণ এক ছাত্রের জন্য অসাধারণ সহৃদয় মনোভাব প্রকাশ করলেন। আমি তাঁর দিকে চোখ তুলতে সাহস পেলাম না, যদিও তাঁকে আমি মিথ্যা কথা বলিনি। আর কেনই বা অযথা তাঁকে মিথ্যা কথা বলতে যাব?

চুপ করে বসে তিনি আমাকে একমনে দেখতে লাগলেন। সেই একাগ্র দৃষ্টির সামনে আমার দুর্ভাগ্য ও অস্বস্তিকর অবস্থাটা যেন প্রকাশ হয়ে গেল। তিনি দেখলেন, তাঁর সামনে একটি রোগা লাজুক ছেলে, বাবার নোংরা প্যান্টালুন আর পুরনো জিন্সের জ্যাকেট পরে অসহায়ভাবে একাকী বেঞ্চের কোণে বসে আছে। কারণ মা তো তার পাশে নেই এখন তাকে সাহায্য করার জন্য! আমি আরও দেখলাম কীভাবে আমার ছেঁড়া জুতোকে তিনি পর্যবেক্ষণ করছেন। সত্যিই তো, সারা ক্লাসের মধ্যে আমার পোশাকই শুধু এরকম ছিল। অবশ্য পরের শরৎকালে মা আমাকে একজোড়া সস্তার বুট জুতো কিনে দিয়েছিলেন।

–তবুও খেলে টাকা জোগাড় করার দরকার নেই, চিন্তিতভাবে দিদিমণি বললেন, খেলা তোমাকে ছাড়তে হবে। পারবে না?

এত সহজে যে নিষ্কৃতি পাব ভাবতেই পারিনি। তাই মৃদুকণ্ঠে প্রতিজ্ঞা করলাম, অবশ্যই চেষ্টা করব।

আমি আন্তরিকভাবেই প্রতিজ্ঞা করলাম। কিন্তু এই আন্তরিকতা বজায় রাখতে হলে কী করতে হবে বুঝতে পারলাম না।

পরের দিন লিদিয়া মিখাইলভনা ইচ্ছে করেই আমাকে ব্ল্যাকবোর্ডে ডাকলেন এবং ফরাসি ভাষার পাঠ্যবই রিডিং পড়তে বললেন। পড়তে আরম্ভ করার সঙ্গে সঙ্গেই লিদিয়া মিখাইলোভনা ভীষণ ভয় পেয়ে আমার সামনে হাত নাড়তে লাগলেন—

–কী ভয়ঙ্কর কী ভয়ঙ্কর! ব্যাপারটা কী? তোমার ফরাসি উচ্চারণ এইরকম ভয়ঙ্কর কেন? নাঃ, তোমাকে তো আলাদা করে পড়াতে হবে দেখছি! তাছাড়া তোমার উন্নতির আর কোনও আশা নেই!

এইভাবে আমার যন্ত্রণাদায়ক আর কঠিন দিনযাপন শুরু হল। ভোর থেকে ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করতাম কখন আমাকে লিদিয়া মিখাইলভনার কাছে একা একা পড়তে হবে। শাস্তিস্বরূপ জিভ গোল করে দুরূহ উচ্চারণের ফরাসি শব্দগুলি তাঁর সঙ্গে বারবার বলতে হত আমাকে। আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য তিনটি স্বরবর্ণ মিলিয়ে একটা ভারি শব্দ বেশ টেনে টেনে বলতে বলতেন। কখনও নাক দিয়ে জোরে আর্তনাদের মতো নাসিক্য ধ্বনিগুলি উচ্চারণ করতে হত। কেন এত কষ্ট করা? কষ্টের একটা যুক্তিসঙ্গত সীমা থাকা উচিত! আচ্ছা ক্লাসে তো আরও অনেকে আছে যারা ফরাসি ভাষা ভালো বলতে পারে না। তবে আমাকেই বা শুধুশুধু এত কষ্ট সহ্য করতে হবে কেন?

দেখা গেল যে আমার ভাগ্যে আরও অনেক শাস্তি আছে। লিদিয়া মিখাইলভনা হঠাৎ স্থির করলেন, স্কুলে এক পিরিয়ড সময় ভাষাশিক্ষার পক্ষে যথেষ্ট নয়। সেই জন্য তিনি আমাকে সন্ধ্যাবেলায় তাঁর ফ্ল্যাটে পড়তে যেতে বললেন। স্কুলের কাছেই শিক্ষকদের আবাসনে তাঁর ফ্ল্যাট। আর প্রধানশিক্ষকের ফ্ল্যাট ঠিক তার পাশেই।

আমার মনে হল যেন শাস্তিভোগ করতেই দিদিমণির ফ্ল্যাটে যাচ্ছি। ভিতু আর লাজুক একটা ছেলে আমি, দিদিমণির সুন্দর আরামপ্রদ ঘরে ঢুকে প্রকৃতই বিস্ময়ে নিথর হয়ে গেলাম,  নিঃশ্বাস ফেলতেও ভয় লাগছিল। এখানে আমার ধোপদুরস্ত পোশাক পরে আসা উচিৎ ছিল, যা আমার নেই। আমি জড়বৎ হয়ে গেলাম। মুখ দিয়ে কথা সরছিল না। যার জন্য ভাষাশিক্ষাতেও তেমন উন্নতি হল না। অদ্ভুত ব্যাপার, এখানে আমরা স্কুলের চাইতেও কম সময় পড়াশোনা করতাম। লিদিয়া মিখাইলভনা কোনও কিছু কাজ করতে করতে সারা ঘরে চঞ্চল পায়ে ঘুরে বেড়াতেন। কখনও আমার বাড়ি সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করতেন। আবার কখনও বা নিজের বিষয়ে গল্প বলতেন। আমার সন্দেহ হত নিজের বিষয়ে যে গল্পগুলি তিনি বলতেন, সেগুলি আমাকে শিক্ষা দেওয়ার জন্যই। যেমন তিনি বলেছিলেন স্কুলে তাঁর ফরাসি ভাষা খুব কঠিন লাগত, কিন্তু তবুও তিনি ফরাসি ভাষা শিখেছিলেন এটা প্রমাণ করতে যে তিনি এই ভাষাশিক্ষায় অন্যদের চেয়ে কোনও অংশে কম নন।

ঘরের কোণে বসে দিদিমণির কথা শুনতাম আর অপেক্ষা করতাম কখন বাড়ি যাওয়ার অনুমতি পাব। ঘরে অনেক বই, আর ছিল বিছানার পাশে রেডিও আর রেকর্ড প্লেয়ার, যা কিনা সেই সময়কার অতি দুর্লভ বস্তু। আমার কাছে তো তারা অত্যাশ্চর্য! দিদিমণি একটা রেকর্ড বাজালেন আর একটি গম্ভীর পুরুষকণ্ঠ ফরাসি ভাষা শেখাতে লাগল। আমাকে শিখতেই হবে, কোনওমতেই অন্য কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। নরম ফেল্টের জুতো পড়ে লিদিয়া মিখাইলভনা গোটা ঘরে ঘুরে বেড়াতেন। যখন তিনি আমার দিকে এগিয়ে আসতেন, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গলা শুকিয়ে আমার কথা বন্ধ হয়ে যেত। বিশ্বাস করতে পারতাম না যে আমি তাঁর বাসায় বসে রয়েছি। এখানে সবকিছুই আমার পক্ষে অপ্রত্যাশিত ও অসাধারণ। এমনকি ঘরের বাতাসেও অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ মিশে থাকত। নিজের অজান্তেই মনে হত আমি যেন এই ঘরটার বাইরে থেকে দিদিমণির এই মনোরম জীবনযাপন দেখছি, আর নিজের পুরনো বিশ্রী জ্যাকেটটার জন্য লজ্জায় আর অস্বস্তিতে মরে যাচ্ছি।

লিদিয়া মিখাইলভনার বয়স তখন খুব সম্ভবত পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর। আমার খুব ভালো মনে আছে যে বয়স অনুযায়ী তাঁর মুখটা অত প্রাণোচ্ছ্বল ছিল না। তবে চাপা হাসি কখনও-সখনও মুখটিকে সুন্দর করে তুলত। আর সেই মুখটি ঘিরে ছিল ছোট করে ছাঁটা কালো চুল। মুখে কিন্তু কোনও কঠোরতার চিহ্ন ছিল না। পরে লক্ষ করে দেখেছি তাঁর বয়সী দিদিমণিদের মুখে সাধারণত খুবই কঠোর ভাব থাকে।

লিদিয়া মিখাইলভনার স্বভাবই ছিল খুব কোমল প্রকৃতির। কিন্তু তাঁর মুখে ছিল সর্তকতা ও চতুরতা, অথচ একটু বিভ্রান্তি– আমি এখানে কীভাবে এলাম আর কীইবা করছি! এখন আমি চিন্তা করে বুঝতে পারি তিনি সেই সময়ে বিবাহিত ছিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ও চলাফেরায় কোমলতার সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু দৃঢ় চরিত্র ও স্বাধীন ভাব প্রকাশ পেত। তাঁর সমস্ত কাজকর্মে সাহসিকতা ও প্রজ্ঞার নিদর্শন ছিল। এছাড়া আমার মত হল, যে মেয়েরা ফরাসি বা স্প্যানিশ ভাষার ছাত্রী, তারা তাদের সমবয়সী রুশ বা জার্মান ভাষার ছাত্রীদের চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি পরিণত মহিলা হয়ে ওঠে।

এখন ভাবলে খুব লজ্জা পাই, পড়া শেষে লিদিয়া মিখাইলভনা যখন রাতের খাবার খেয়ে যেতে বলতেন তখন আমি কেমন ভয় পেয়ে ঘাবড়ে যেতাম। সেই মুহূর্তে আমি তো খুবই ক্ষুধার্ত, কিন্তু দিদিমণির প্রস্তাব শুনলে আমার খাওয়ার ইচ্ছা উবে যেত। দিদিমণির সঙ্গে একই খাওয়ার টেবিলে বসব! না না! তার চেয়ে বরং আগামীকাল সমস্ত পড়াটা মুখস্থ করে ফেলব, তাহলে আর এখানে আসতে হবে না। সত্যি কথা বলতে গেলে ওঁর সঙ্গে খেতে হলে রুটির টুকরো আমার গলায় আটকে যেত। তখনও আমার কোনও সন্দেহ হয়নি যে লিদিয়া মিখাইলভনা ইচ্ছে করে আমাদের মতো অতি সাধারণ খাবার খাওয়ার চেষ্টা করছেন যাতে তিনি অভ্যস্ত নন। কোনও মহামূল্যবান খাদ্য তিনি আমাকে দেবেন না। অন্যদের চেয়ে আমি যেন একটু ভিন্ন প্রকৃতির অসাধারণ ছেলে, এইভাবেই তিনি আমার সঙ্গে ব্যবহার করতেন।

লাফিয়ে উঠে বিড়বিড় করে বললাম যে আমার পেট ভরা, খাবার ইচ্ছে নেই। এই কথা বলেই দেয়াল ঘেঁষে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। লিদিয়া মিখাইলভনা একটু আশ্চর্য হয়ে এবং ক্ষুব্ধভাবে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, কিন্তু আমাকে আটকানোর চেষ্টা একটুও করলেন না। আমি পালিয়ে গেলাম। এইরকম কয়েক দিন চলল। তারপর লিদিয়া মিখাইলভনা হতাশ হয়ে আমাকে আর খাওয়ার কথা বলতেন না। আমিও স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম।

একদিন আমি শুনলাম একজন লোক স্কুলে আমার জন্য একটা পার্সেল দিয়ে গেছে যেটা স্কুলের ক্লোকরুমে রাখা আছে। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! কে এই লোক! আমাদের ড্রাইভার আঙ্কল ভানিয়া কি? তিনি হয়তো বাড়ি বন্ধ দেখে স্কুলে পার্সেলটা রেখে গেছেন। ক্লাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত অনেক কষ্টে অপেক্ষা করলাম, তারপর দৌড়ে নিচে গেলাম। স্কুলের ঝাড়ুদারনিরা আমাকে সাদা রঙের একটা ছোট প্লাইউডের বাক্স দেখাল। এইরকম বাক্স সাধারণত পোস্ট অফিসের পার্সেলের হয়। আমি একটু আশ্চর্য হলাম। বাক্স কেন? মা তো সাধারণত বস্তায় করে আমার খাবার পাঠান। হয়তো এটা আমার জন্য নয়। না তো! বাক্সের ওপর তো আমার ক্লাস আর নাম লেখা আছে! হয়তো আঙ্কল ভানিয়া আমার নামটা লিখেছেন যাতে পার্সেলটা কার সেটা বুঝতে অসুবিধা না হয়। মা কি আমার খাবার জিনিস আঙ্কেলের লরিতে করে নিয়ে এসেছেন? দেখো মা কীরকম বুদ্ধিমতী হয়ে উঠেছেন!

পার্সেলের ভিতরে কী আছে না জেনে তো বাড়ি নিয়ে যেতে পারব না! ধৈর্য তো বাঁধ মানছে না! এটা পরিষ্কার যে পার্সেলে আলু নেই। আর রুটির জন্য পার্সেল! সেটাও অসম্ভব। তাহলে কী আছে? মনে পড়ল স্কুলের সিঁড়ির নিচে একটা কুড়ুল; দৌড়ে গিয়ে কুড়ুলটা দিয়ে পার্সেলের প্লাইউডের বাক্সটা ভেঙে ফেললাম।

ভিতরে তাকিয়ে হতবাক হয়ে গেলাম! পরিষ্কার সাদা কাগজে পরিপাটিভাবে ঢাকা সারি সারি ম্যাকারন।[1] এ যে পরমাশ্চর্য! অপূর্ব সুন্দর সোনালি রঙের ম্যাকারন— একটার পর একটা সমান সারিতে সাজানো! পৃথিবীর পরম ঐশ্বর্য যেন হঠাৎ আমার সামনে উপস্থিত হইয়েছে। এই ঐশ্বর্যের চেয়ে প্রিয় আমার কাছে আর কিছু নেই। এখন বুঝতে পারছি কেন মা পার্সেল পাঠিয়েছেন, যাতে ম্যাকারনগুলো ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো না হয়ে আমার কাছে ভালোভাবে এসে পৌঁছয়। যাতে ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিতে পারি। সন্তর্পণে একটা বার করে তাকিয়ে দেখে ওটাতে ফুঁ দিলাম। তারপর নিজেকে সংযত করতে না পেরে লোভীর মত কুড়মুড় করে খেতে লাগলাম। এরপরে দুটো… তিনটে বার করে খেলাম। তারপর চিন্তা করতে লাগলাম কোথায় আমার এই অমূল্য সম্পদ লুকিয়ে রাখব। বাড়িওয়ালির ভাঁড়ারঘরে অতিরিক্ত লোভী ইঁদুরের হাত থেকে একে কিছুতেই রক্ষা করা যাবে না। এটা তো সামান্য আলু নয়।

হঠাৎ আমার যেন দমবন্ধ হয়ে গেল। ম্যাকারন… সত্যি, মা কোথা থেকে ম্যাকারন পাবে! এ তো আমাদের গ্রামে পাওয়াই যায় না! আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে তাড়াতাড়ি ম্যাকারনগুলোকে সরিয়ে বাক্সের ভিতরে দেখলাম কয়েক টুকরো চিনি আর হিমাটোজেনের[2] দুটো টুকরো। হিমাটোজেন দেখেই বুঝলাম মা এটা কখনওই পাঠাননি। তাহলে কে পাঠাল? বাক্সের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আমার ক্লাস আমার নাম। তার মানে আমাকেই তো পাঠাচ্ছে! ভারি আশ্চর্য ঘটনা!

পার্সেলের বাক্সের পেরেকগুলো আবার ঠিক জায়গায় আটকে বাক্সটা জানলার তাকে রাখলাম। তারপর দোতলায় উঠে স্টাফরুমের দরজায় ধাক্কা দিলাম। লিদিয়া মিখাইলভনা ইতিমধ্যেই বাড়ি চলে গিয়েছেন। তাতে কী হয়েছে, আমি তো ওনার বাড়ি চিনিই। এখন আমার কাছে সবকিছু স্পষ্ট হয়েছে। ওঁর সঙ্গে একসঙ্গে খেতে চাইনি, তাই উনি বাড়িতে খাবার পাঠিয়েছেন। উনি ছাড়া কেউ নন, কারণ মা যদি পাঠাতেন তাহলে অবশ্যই প্যাকেটের ভেতর একটা চিরকুট থাকত। তাতে জানাতে ভুলতেন না কোথা থেকে এই অমূল্য সম্পদ সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু দিদিমণির এই কৌশল তো চলবে না!

আমি যখন পার্সেলটা নিয়ে ওনার বাসায় ঢুকলাম, লিদিয়া মিখাইলভনা এমন ভান করলেন যেন কিছুই জানেন না। যখন তাঁর সামনে মেঝের ওপর বাক্সটা রাখলাম, উনি খুব আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,

–এটা কী? এটা তুমি এখানে নিয়ে এসেছ কেন?
–আপনিই তো এটা পাঠিয়েছেন, কাঁপতে কাঁপতে কম্পিত কণ্ঠস্বরে বললাম।
–আমি কী করেছি? কী বলছ তুমি?

লক্ষ করলাম  লিদিয়া মিখাইলভনা একটু লাল হয়ে অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। জীবনে এই একমাত্র সময়ে তাঁর চোখের দিকে সোজা তাকাতে আমার একটুও ভয় করল না। আমার দৃঢ় ধারণা হল যে উনি আমার কোনও দূর সম্পর্কের আত্মীয়া সেজে এই মূল্যবান সম্পত্তি পাঠিয়েছেন। এই কথাগুলি আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম একটুও না থেমে, তাও আবার রুশ ভাষায়, ফরাসি ভাষায় নয়।

–তুমি কেন ভাবলে যে আমিই এই খাবার পাঠিয়েছি?
–কারণ আমাদের গ্রামে ম্যাকারন পাওয়া যায় না আর হিমাটোজেন তো একেবারেই নয়।
–কী! একেবারেই পাওয়া যায় না!’ তিনি এত বিস্মিত হয়ে প্রশ্নটা করলেন যে প্রকাশ হয়ে গেল তিনিই পাঠিয়েছেন।
–একেবারেই না। আপনার জানা উচিত ছিল।

লিদিয়া মিখাইলভনা হঠাৎ খুব হাসতে শুরু করলেন আর আমাকে জড়িয়ে ধরতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু আমি ওঁর কাছ থেকে সরে দাঁড়ালাম।

–সত্যিই তো, আমার জানা উচিত ছিল। কিন্তু জানব কী করে? একটু চিন্তা করে বললেন, এটা অনুমান করা আমার পক্ষে কঠিন ছিল। সত্যি বলছি। আমি তো শহরের লোক। গ্রামের বিষয়ে কী করে জানব? কিন্তু ঠিক বলছ তোমাদের গ্রামে ম্যাকারন পাওয়া যায় না?  তাহলে কী পাওয়া যায়?

–বাদাম… মুলো…
–বাদাম মুলো… কিন্তু আমাদের কুবানে তো আপেল হয়! ওঃ এখন কত আপেল সেখানে! আমি তো কুবানে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে এখানেই পাঠানো হল কোনও কারণে। লিদিয়া মিখাইলভনা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে আমাকে বললেন, রাগ কোরো না। আমি তোমার ভালোই চেয়েছি। কে জানত ফরাসি ম্যাকারনের জন্য তুমি আমাকে ধরে ফেলবে? ঠিক আছে, এখন থেকে আমি আরও সতর্ক হব। এগুলো তুমি নিয়ে যাও।
–আমি নেব না, তাঁর কথায় বাধা দিয়ে বললাম।
–আচ্ছা, তুমি এরকম কেন? আমি খুব ভালোভাবেই জানি তুমি পেট ভরে খাও না। আর আমি তো একা থাকি, টাকা-পয়সারও অভাব নেই। ইচ্ছেমতো সব কিছুই কিনতে পারি। কিন্তু সামান্যই খাই মোটা হওয়ার ভয়ে।
–আমি তো পেট ভরেই খাই।
–আমার সঙ্গে তর্ক কোরো না, আমি সব জানি। তোমার বাড়িওয়ালির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তুমি এগুলো নিলে কী ক্ষতি হবে? এগুলো দিয়ে তোমার রাতের খাওয়াটা খুব সুন্দর হবে। কেন আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারব না? প্রতিজ্ঞা করছি আর কখনও তোমাকে কোনও পার্সেল পাঠাব না। স্কুলে কত ধনী ছেলে আছে কিন্তু তারা এতই বাজে যে স্কুল তাদের গণ্য করে না এবং কোনওদিন মান্যতাও দেবে না। কিন্তু তুমি একজন প্রতিভাশালী ছাত্র। ভালো করে পড়তে হবে তোমাকে। না খেলে পড়বে কী করে? তোমাকে স্কুলের বড় প্রয়োজন।

তাঁর কণ্ঠস্বরে আমার মন দুর্বল হয়ে গেল। আমার ভয় হল, দিদিমণি সুন্দর সুন্দর কথায় ভুলিয়ে আমাকে বাধ্য করবেন জিনিসটা নিতে।

যদিও আমি তাঁর কথার সত্যতা উপলব্ধি করলাম, তবুও  মানতে পারলাম না। মাথা নেড়ে কিছু একটা বিড়বিড় করে বলে দৌড়ে চলে এলাম।

 

আমাদের পড়াশোনা কিন্তু বন্ধ হল না। লিদিয়া মিখাইলভনার কাছে আমি যেতেই থাকলাম। এখন তিনি আমার পুরোপুরি দায়িত্ব নিয়ে নিলেন। মনে হল, তিনি যেন ঠিক করলেন ফরাসি ভাষাই হোক, সেটাই তিনি আমাকে ভালো করে শেখাবেন। সত্যি কথা বলতে কি তাঁর এই প্রচেষ্টার এখন আর কোনও দরকার ছিল না। কারণ ফরাসি শব্দগুলো এখন আমি মোটামুটি ভালোভাবেই উচ্চারণ করতে পারতাম। ভারি লাগত না।

–বেশ ভালো হয়েছে, সাপ্তাহিক পরীক্ষার ফল দেখে লিদিয়া মিখাইলভনা আমাকে উৎসাহ দিলেন, এই বৃহস্পতিবারে পাঁচে পাঁচ পেলে না, পরের সপ্তাহে কিন্তু অবশ্যই পেতে হবে।

পার্সেলের কথা আমরা কেউ তুলতাম না। খুব সতর্কও থাকতাম। অবশ্য ইতিমধ্যে লিদিয়া মিখাইলভনা আর তাঁর ফ্ল্যাটের সঙ্গে যদিও বেশ অভ্যস্ত হয়ে গেছি‌ তবুও আড়ষ্ট হয়ে ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কিন্তু একটু উন্নতি হয়েছে বৈকি। আগের মত সঙ্কুচিত ভাব আমার নেই, বিষণ্ণও বোধ করি না, এমনকি সাহস করে তাঁকে প্রশ্ন করি, তর্কেও নেমে পড়ি। নিজের অজ্ঞাতসারেই ফরাসি ভাষার প্রতি বেশ আকৃষ্ট হয়ে পড়লাম। অবসর সময়ে নিজে নিজেই অভিধান দেখে নতুন নতুন শব্দের মানে খুঁজতাম। পাঠ্যবইয়ের শেষে যে অতিরিক্ত গল্পগুলো থাকত সেগুলো পড়তাম। আনন্দে পরিণত হল শাস্তিটা। নিজের প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। নম্বর পেলে ভালো, না পেলেও ভালো। আমার অন্য কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। লিদিয়া মিখাইলভনার কাছে এখন আমার যাওয়ার আর কোনও প্রয়োজন নেই, তবু আমি নিজে নিজেই যেতাম।

পার্সেলের ঘটনার প্রায় দু সপ্তাহ পরে একদিন লিদিয়া মিখাইলভনা হাসতে হাসতে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,

–কী! পয়সা দিয়ে তুমি আর খেলো না! নাকি খেলে হেরে যাও?
–এখন কী করে খেলা হবে! দিদিমণির প্রশ্ন শুনে আশ্চর্য হয়ে জানলার বাইরে তুষারপাতের দিকে দেখালাম।
–খেলাটা কীরকম? কী দিয়ে খেলা হত?

আমি সন্দিহান হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

–কেন জানতে চাইছেন?
–একটা খুব মজার কথা মনে পড়ল। আমরাও ছেলেবেলায় এইরকম পয়সার খেলা খেলতাম। তাই আমি জানতে চাইছি তোমাদের খেলাটা কি সেইরকম, না অন্যরকম? আমাকে বুঝিয়ে বলো। তোমার কোনও ভয় নেই।
–ভয় পাওয়ার কী আছে?

ভালিক আর ফেদিয়ার কথাটা গোপন করে খেলাটা সবিস্তারে বুঝিয়ে বললাম।

–নাঃ! লিদিয়া মিখাইলভনা মাথা নেড়ে বললেন, আমরা অন্য একটা মজার খেলা খেলতাম। দেখবে, সেটা কী রকমের! এইরকম, তাকিয়ে দেখো।

টেবিলের পাশ থেকে লাফিয়ে উঠে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা কোপেক বার করলেন আর দেয়ালের দিক থেকে চেয়ারটা সরিয়ে নিলেন।

–এদিকে এসো। দেখো আমি দেয়ালের দিকে কয়েনটা ছুঁড়ছি, লিদিয়া মিখাইলভনা আস্তে করে দেয়ালের দিকে কোপেকটা ছুঁড়লেন। সেটা শব্দ করে মেঝের ওপর একটা বক্ররেখা তৈরি করে থেমে গেল। এইবার লিদিয়া মিখাইলভনা দ্বিতীয় কয়েনটা আমার হাতে গুঁজে দিলেন—
–মারো তুমি! কিন্তু খেয়াল রাখবে এমনভাবে মারতে হবে যাতে তোমারটা আমার কয়েনের খুব কাছে গিয়ে পড়ে এবং এক মুঠোয় দুটো কয়েন একসঙ্গে তোলা যায়। তুমি যদি সেরকম করতে পারো তাহলে তুমি জিতে যাবে। এবারে চেষ্টা করো।

আমি মারলাম। আমার কয়েনটা ওনার কয়েনের ধার ঘেঁষে গড়িয়ে একেবারে ঘরের কোনায় গিয়ে পড়ল।

–ওহো! লিদিয়া মিখাইলভনা হতাশভাবে বললেন, ‘অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ঠিক আছে আবার আরম্ভ করো। মনে রেখো যদি আমার কয়েন তোমার কয়েনকে সামান্য একটুও স্পর্শ করে, তবে আমি দুটো কয়েনই জিতে যাব। বুঝতে পেরেছ?
–এতে না বোঝার কী আছে?
–তাহলে খেলা শুরু করি?

আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

–আপনার সঙ্গে খেলব!
–কেন, এতে অসুবিধা কী!
–আপনি তো একজন দিদিমণি।
–তাতে কী হয়েছে? দিদিমণি তো নিজেও একজন মানুষ, তাই না? নিজেকে কেবলমাত্র  দিদিমণি মনে করলে, মাঝে মাঝে বড় ক্লান্তি বোধ হয়। পড়াও! পড়াও! পড়ানোর আর শেষ নেই! এ চলতে পারে না!

লিদিয়া মিখাইলভনা ভ্রূ কুঞ্চিত করে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন।

–মাঝে মাঝে ভুলে যাওয়া দরকার যে আমি একজন দিদিমণি। না হলে আমি খুব বাজে মানুষে পরিণত হব। আর তোমাদের মত সবুজ ছেলেমেয়েদের কাছে বিরক্তিকর হয়ে উঠব। শিক্ষকদের আসলে জীবনের সব কিছুকেই খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে দেখা উচিত নয়। তাদেরও বুঝতে হবে যে তারা সম্ভবত ছাত্রছাত্রীদের জীবনের পাঠ খুব সামান্যই শেখাতে পারেন।

লিদিয়া মিখাইলভনা হঠাৎ উৎফুল্ল হয়ে বলতে লাগলেন,

–জানো তো, ছেলেবেলায় আমি খুব ডানপিটে ছিলাম। আমার জন্য মা-বাবাকে অনেক কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। এখনও মাঝে মাঝে আমার লাফাতে ইচ্ছে করে, কোথাও দৌড়োতে ইচ্ছে করে, বেনিয়মের কিছু করতে ইচ্ছে করে। মনে হয় নিজের ইচ্ছেমতো চলব। আমার তো এখনি লাফাতে ইচ্ছে করছে! মানুষ বার্ধক্যে উপনীত হলেই সে কেবল বুড়ো হয় তা তো নয়, তার মন যখন শৈশবের সজীবতা হারিয়ে ফেলে, প্রকৃতপক্ষে তখনই সে বুড়ো হয়। আমি যে কী খুশি হতাম না, যদি আমি প্রতিদিন লাফাতে পারতাম! কিন্তু তা তো হওয়ার নয়! আমার ঘরের দেওয়ালের পিছনেই থাকেন ভাসিলি আন্দ্রিয়েভিচ, আমাদের প্রধানশিক্ষক। তিনি তো খুব গুরুগম্ভীর মানুষ। খুব সাবধান! আমরা যে এই খেলাটা খেলছি তিনি যেন কখনও জানতে না পারেন!
–আমরা তো এই খেলাটা খেলছি না। আপনি তো শুধু আমায় দেখিয়ে দিলেন কী করে খেলতে হয়।
–আমরা কিন্তু বাচ্চাদের মতো খেলাটা খেলতেই পারি। অবশ্য তুমি নিশ্চয়ই আমাকে ভাসিলি আন্দ্রিয়েভিচ-এর কাছে ধরিয়ে দেবে না!

হায় ভগবান! পৃথিবী নিশ্চয়ই ধ্বংসের মুখে! যে আমি কিছুদিন আগেই ভাবছিলাম যে লিদিয়া মিখাইলভনা পয়সা নিয়ে জুয়ো খেলার জন্য আমাকে প্রধানশিক্ষকের কাছে ধরিয়ে দেবেন, সেই আমি কিনা তাঁকে ধরিয়ে দেব! পৃথিবীর ধ্বংস অনিবার্য, এছাড়া আর কিছু হতে পারে না!

–কী! চেষ্টা করবে! নাকি তোমার ভালো লাগছে না? ছেড়ে দেব?
–ঠিক আছে, অনিশ্চিতভাবে রাজি হলাম।
–তাহলে শুরু করো!

কয়েন দিয়ে খেলতে শুরু করলাম। দেখা গেল লিদিয়া মিখাইলভনা সত্যিই এই খেলায় দক্ষ। আর আমি তো সবে খেলাটা শিখছি। এখনও আমার কাছে স্পষ্ট নয় দেয়ালের দিকে কীভাবে কয়েনটা ছুঁড়ব— দেয়ালের কিনারা ঘেঁষে অথবা নিচের দিকে; কতটা উচ্চতায় আর কতটা জোরে ছুঁড়লে ভালো হয়। কয়েনটা যেমন তেমন করে ছুঁড়লাম। এই খেলায় কোনও শঠতা ছিল না, তাই আমরা যদি ভেবেচিন্তে খেলতাম, তাহলে প্রথমবারেই আমি অনেক হেরে যেতাম। কারণ আমি মানসিকভাবে খুব অস্বস্তি ও বিড়ম্বনা বোধ করছিলাম। আমি তো লিদিয়া মিখাইলভনার সঙ্গে খেলতে অভ্যস্ত ছিলাম না। স্বপ্নেও কখনও এরকম ঘটনা ভাবতে পারতাম না। যাই হোক, মনকে ঠিক করে নিয়ে অবশেষে খেলায় যখন মন দিলাম, লিদিয়া মিখাইলভনা হঠাৎ কয়েনগুলো তুলে নিয়ে খেলা থামিয়ে দিলেন।

–নাঃ খেলায় মজা পাচ্ছি না, সোজা হয়ে বসে চোখের উপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিদিমণি আমাকে বললেন, আমরা তো আর তিন বছরের শিশুর মতো খেলব না।
–কিন্তু তাহলে তো পয়সা নিয়ে খেলতে হবে, দ্বিধান্বিতভাবে মনে করিয়ে দিলাম।
–অবশ্যই! না হলে খেলার সময় হাতে কী নেব? কোপেকের বদলে তো আর অন্য কিছু নেওয়া যায় না! ছোট ছোট বাজি রাখলেও খেলায় মজা হবে।

কী যে করব আর কী যে বলব বুঝতে না পেরে চুপ করে রইলাম।

–সত্যিই কি খুব ভয় পেয়েছ? তিনি আমাকে উৎসাহ দিয়ে বললেন।
–না না আমি ভয় পাচ্ছি না।

আমার কাছে কিছু খুচরো কয়েন ছিল। লিদিয়া মিখাইলভনার কয়েন ফেরত দিয়ে পকেট থেকে নিজের কয়েন বার করলাম। আমার দিদিমণি যদি চান, আমি খেলাটা ঠিকমতোই খেলব। এই প্রথম তো আর এইরকম পয়সার খেলা খেলছি না! ভালিকও তো প্রথমে আমাকে গ্রাহ্য করেনি। তারপরে আমার খেলার দক্ষতা দেখে মেরে তাড়িয়ে দিল। ওখানে শিখেছি, এখানেও শিখব। এ তো আর ফরাসি ভাষা নয়! আর ফরাসি কথা আমি শিগগিরই গরগর করে বলতে পারব।

নতুন করে খেলা শুরু হল। শোবার ঘর থেকে কাঠের পার্টিশন-দিয়ে-পৃথক-করা বাইরের ঘরে এলাম, কারণ বাইরের ঘরটা বেশ বড়। কখনও হাঁটু গেড়ে বসে আবার কখনও পরস্পরকে ধাক্কা মেরে মেঝেতে হামাগুড়ি দিয়ে খেললাম। খেলার শেষে লিদিয়া মিখাইলভনা উঠে দাঁড়িয়ে খেলার ফলাফল ঘোষণা করলেন।  খেলার সময় উনি বেশ শব্দ করছিলেন। কখনও চিৎকার করছিলেন, কখনও হাততালি দিচ্ছিলেন, কখনও আমার পেছনে লাগছিলেন— এমন ব্যবহার করছিলেন যেন তিনি শিক্ষিকা নন, একটি ছোট্ট মেয়ে। আর আমারও তখন ইচ্ছা করছিল আমিও চিৎকার করি… কিন্তু এসব সত্ত্বেও উনি কম পয়সা জিতলেন না! আমি হারছিলাম। ভেবে পাচ্ছিলাম না কীভাবে আশি কোপেক হেরে গেলাম! অনেক কষ্টে হারটাকে তিরিশ কোপেকে নামিয়ে আনলাম, কিন্তু পরমুহূর্তেই লিদিয়া মিখাইলভনার কয়েন সোজা আমার কয়েনের ওপর গিয়ে পড়ল আর আমার হার পঞ্চাশ কোপেকে গিয়ে দাঁড়াল। এবার তো রীতিমত দুশ্চিন্তা হতে লাগল! আমরা অবশ্য চুক্তি করেছিলাম যে একেবারে খেলার শেষেই লেনদেন হবে। আমার ভীষণ দুশ্চিন্তা হল, এই হারে আমি যদি হারতে থাকি তাহলে আমাকে এক রুবলেরও বেশি দিতে হবে। কিন্তু আমার কাছে তো অত টাকা নেই! তার মানে সারাজীবন লজ্জা আর অপমান বহন করে যেতে হবে।

ঠিক সেইসময় লক্ষ করলাম লিদিয়া মিখাইলভনা আমাকে যেন ইচ্ছে করে জিতিয়ে দিচ্ছেন। এতে আমি অপমানিত বোধ করে উঠে দাঁড়ালাম।

–না না! আমি বলে উঠলাম, এইভাবে আমি খেলব না! আপনি আমার সঙ্গে বাচ্চাদের মতো খেলছেন কেন?
–আমি সত্যিই কয়েনটা ভালোভাবে ছুঁড়তে পারছি না। আমার হাতটা যেন অসাড় হয়ে আসছে।
–চেষ্টা করুন।
–ঠিক আছে ঠিক আছে, আমি চেষ্টা করছি ঠিকমতো খেলতে।

এইসব দিনে আমাদের ফরাসি পাঠ চলত পনেরো-কুড়ি মিনিটের মতো। ক্রমশ সময়টা আরও কমে এল, কারণ তখন আমাদের মূল আকর্ষণ তো খেলার দিকে! লিদিয়া মিখাইলভনা পাঠ্যবই থেকে একটা অংশ আমাকে পড়তে দিতেন, ভুলগুলো সংশোধন করে দিতেন, তারপর আবার পড়তে বলতেন। এরপরই সময় নষ্ট না করে আমরা খেলায় মত্ত হয়ে উঠতাম।

দু-তিনবার ছোট ছোট হেরে যাওয়ার পর আমি জিততে আরম্ভ করলাম‌। আবার আমার কয়েন জমতে শুরু করল। আবার আমি বাজারে গিয়ে দুধ কিনে খেতে শুরু করলাম। দেহে-মনে অপার আনন্দ অনুভব করলাম আর সুখে আমার চোখ বুজে এল।

এইভাবে মোটামুটি বেঁচে থাকব আর অদূর ভবিষ্যতে যেন যুদ্ধের ক্ষত সারিয়ে আবার সুখের মুখ দেখব।

অবশ্যই লিদিয়া মিখাইলভনার হাত থেকে জেতার পয়সা নেবার সময় সবসময় অস্বস্তিবোধ করতাম। তারপরে নিজেকে আশ্বস্ত করতাম এই বলে যে এটা তো আমার ন্যায্য পাওনা। আমি তো ওঁকে খেলার জন্য অনুনয়-বিনয় করিনি। উনি নিজেই আমাকে খেলার প্রস্তাব দিয়েছেন। ওঁর প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করার সাহস আমার হয়নি। তাছাড়া আমি তো দেখলাম এই খেলাতে উনিও কীরকম আনন্দ উপভোগ করছেন! প্রাণ খুলে হাসছেন!

…… তখন যদি জানতাম কীভাবে এই খেলার পরিসমাপ্তি ঘটবে!

একদিন আমরা মুখোমুখি হাঁটু গেড়ে বসে খেলার ফল নিয়ে বেশ জোরে জোরে তর্ক করছিলাম। তার আগেও অন্য একটা কিছু নিয়ে তর্ক করেছিলাম।

–মাথামোটা কোথাকার! কী করে তুই টাকাটা পাবি! লিদিয়া মিখাইলভনা আমার দিকে হামাগুড়ি দিয়ে আসতে আসতে হাত নেড়ে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে থাকলেন, আমি কেন তোমাকে ঠকাবো? আমিই তো খেলার  ফলাফল বিচার করি, তুমি তো নও! আমি তোমার চাইতে অনেক ভালো খেলতে পারি!

আমরা পরস্পরকে বাধা দিয়ে একইসঙ্গে সমানে চিৎকার করে যাচ্ছিলাম। ঠিক সেই সময়ে বজ্রগম্ভীর কিন্তু বিস্মিত একটা কণ্ঠস্বর আমাদের কানে ভেসে এল:

লিদিয়া মিখাইলভনা!

স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন প্রধানশিক্ষক ভাসিলি আন্দ্রেইভিচ!

–লিদিয়া মিখাইলভনা, আপনার কী হয়েছে? এখানে কী চলছে?

ধীরে ধীরে, খুব ধীরে ধীরে লিদিয়া মিখাইলভনা আরক্তিম হয়ে বলে উঠলেন।

–আমি তো আশা করেছিলাম, ভাসিলি আন্দ্রেইভিচ, ঘরে ঢোকার আগে আপনি দরজায় ধাক্কা দেবেন।
–আমি তো দরজায় ধাক্কা দিয়েছি! কিন্তু আপনি তো সাড়া দেননি! এখানে কী চলছে অনুগ্রহ করে পরিষ্কার করে বলবেন? প্রধানশিক্ষক হিসেবে আমার জানার অধিকার আছে।
–খেলছি, শান্তভাবে লিদিয়া মিখাইলভনা উত্তর দিলেন।
–এই ছেলেটির সঙ্গে আপনি পয়সা দিয়ে জুয়া খেলছেন? আঙুল দিয়ে আমাকে দেখিয়ে ভাসিলি আন্দ্রেইভিচ  জিজ্ঞাসা করলেন।

ভয়ে আমি পার্টিশনের পিছনে সরে গিয়ে ঘরের ভেতর লুকোতে চাইছিলাম।

–এই ছেলেটির সঙ্গে আপনি খেলছেন! আমি কি আপনাকে ঠিক চিনি!
–ঠিকই চেনেন।
–কিন্তু জানেন তো, বিস্ময়াভিভূত হয়ে কষ্টে নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আপনার এই কাজকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব জানি না। এ তো অন্যায়! কলুষিত! বিপথে চালনা করা! বিশ বছর ধরে আমি এই স্কুল পরিচালনা করছি, কিন্তু এরকম ঘটনা কখনও চোখে পড়েনি!

হতাশায় হাতদুটো উপরে ছুড়লেন তিনি।

তিনদিন পর লিদিয়া মিখাইলভনা স্কুল ছেড়ে চলে গেলেন। যাবার দিন স্কুল শেষের পরে আমার সঙ্গে বাড়ি পর্যন্ত এলেন।

–কুবানে চলে যাচ্ছি, বিদায় জানিয়ে তিনি বললেন, তুমি ভালোভাবে পড়াশুনা চালিয়ে যাও। এই চূড়ান্ত নির্বোধ কাজটার জন্য তোমাকে কেউ কোনও দোষারোপ করবে না। দোষী তো আমিই। ভালো করে পড়াশোনা কোরো।

কাঁপা কাঁপা হাতে আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে উনি চলে গেলেন।

এরপর আর কখনও তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।

জানুয়ারির ছুটির পর শীতকালে স্কুলে আমার কাছে পোস্টে আর একটা পার্সেল এল। আগের মতোই সিঁড়ির নিচে গিয়ে কুড়ুল দিয়ে পার্সেলটা খুললাম। সুন্দরভাবে সাজানো ম্যাকারন, আর তার নিচেই মোটা কাপড়ের আস্তরণে— তিনটে লাল টুকটুকে আপেল!

এই হলেন আমার ফরাসি ভাষার দিদিমণি।


[1] ম্যাকারন: একধরনের ফরাসি কেক বা মিষ্টি, যা রাশিয়ার প্রত্যন্ত গরিব গ্রামে পাওয়া ছিল একান্তই অসম্ভব।
[2] হিমাটোজেন: ছোটদের প্রিয় একধরনের নিউট্রিশন বার ভিটামিন সি ও আয়রনে ভরপুর।