Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

‘এক সমুদ্দুর বই’– বই পড়ার বই

সোমা রায়

 

“বই লেখে, ক্লাস নেয়, নানান জিনিস কল্পনা করে’’- নিজের সম্পর্কে এই কথাই বলেন পর্তুগীজ লেখক রুই জিঙ্ক। ২০১০-এ বেরোয় তাঁর ‘আনিবালেইতর’। বাংলা অনুবাদে ‘এক সমুদ্দুর বই’। নামটা দিয়েছেন লেখক আর অনুবাদক ঋতা রায় একসাথে।

আনিবালেইতর এক কিশোরের গল্প। লোকের প্রাণ ওষ্ঠাগত করা, রকমারি বাঁদরামি, বন্দর শহরে দল পাকিয়ে চুরি, চোরাই মাল বিক্রি… গুণের ঘাটতি নেই তার। সেপাইদের তাড়া খেয়ে একদিন এক জাহাজে উঠে পড়েই জীবনটা গোল পাকিয়ে গেল তার।

প্রথম হল জাহাজের মাস্তুলের উপর ‘কাকের বাসা’য় সারাদিন একা একা কাটানোর শিক্ষা। একা একা সময় কাটাতে কাটাতে, এটা-সেটা দেখা আর ভাবনা আর কল্পনা। তারপর হঠাৎই আলুর বস্তা আনতে গিয়ে দেখল- জাহাজের খোলে বস্তা বস্তা বই !!! সে’সব নাকি ‘অদ্ভুত আর হিংস্র’ দানব আনিবালেইতরের জন্য টোপ !!! তার খোঁজেই নাকি এই অভিযান !!! অথচ “এখন তো প্রায় কেউই বই পড়েনা, মানুষও না; এখন তো খালি টেলিভিশন ইন্টারনেট…… আর সেখানে পৃথিবীর কোন্‌ কোণে এক হারিয়ে যাওয়া দ্বীপে এক নাম-না-জানা জানোয়ার বই পড়ে”। অবাক কাণ্ড!!! তাকে বইয়ের টোপ দিয়ে, তারপর কিউরারি দিয়ে কাবু ক’রে বন্দী করা হবে- এই হল প্ল্যান – ক্লোরোফর্ম এখনও আবিষ্কার হয়নি কিনা। কী বলছেন? ইন্টারনেট আছে আর ক্লোরোফর্ম নেই? অজানা দ্বীপে না-জানি-কি আছে আবার টেলিভিশনও আছে? ওরকম চুলচেরা স্থান-কাল-পাত্র নিয়ে ধ’রে ব’সে থাকলে কিন্তু চলবে না।

এরপর তো বুঝতেই পারছেন সকলে- একটা অবধারিত জাহাজডুবি আর আনিবালেইতরের আস্তানায় বন্দী কিশোর। চারিদিকে হাড়গোড় আর বই-এর সমুদ্র। বুঝুন ব্যাপার! আনিবালেইতর- মানে ওই ‘বসে থাকা অবস্থায় তিনতলা বাড়ির মতন উঁচু’ গোরিলার মতন দেখতে জীবটা… খুব বই পড়ে। কারণ? কথা বলতে তো পার্টনার লাগে। কিন্তু বই পড়া হল – “অনেক বেশি স্বাধীন ব্যাপার। অন্যের মেজাজমর্জির উপর নির্ভর করতে হয় না। টেনেসি উইলিয়ামস যা বলেছিলেন আর কি।” কিন্তু আমাদের এই পনেরো বছরের কিশোর নায়ক মুখের মতন জবাব দেয়- “আজকাল প্রায় কেউই পড়ে না”। তাহলে লোকে করে কী? “টিভিতে প্রচুর খেলা হয়। তারপর বেশ কিছু কম্পিটিশন। তারপর সিরিয়াল আছে… ব্যাপারটা বেশ আরামের… কারণ ভাবনাচিন্তার করার কোনও দরকার হয় না”। ব্যপারটা বুঝে ফেলে খেপে ওঠে দানব। “বই আমাদের দেখা করতে যেতে বলে, বেড়াতে যেতে বলে। আর টিভি আমাদের বুদ্ধুর মত বাধ্য করে থেমে থাকতে”। পাঠকও এইসব অপমানজনক কথাবার্তায় নিশ্চয়ই খেপে উঠতে পারেন। কিন্তু মুশকিল হল- অজানা দ্বীপের ‘বসে থাকা অবস্থায় তিনতলা বাড়ির মতন উঁচু’ দানব বা একজন হারিয়ে যাওয়া বুদ্ধু কিশোরের উপর… রাগ… তাও আবার দানবটা তেরো চোদ্দটা ভাষা গড়গড়িয়ে বলতে পারে, পড়তে পারে, কথায় কথায় পর্তুগীজ কবি নাট্যকারদের লেখার উদ্ধৃতি দেয়, সে’সবের ভালোমন্দ বিচার করে। এক কথায় বেশ পণ্ডিত আর কি!

বাঁচার জন্যই এইবার কিশোরকে বই পড়তে হয়, পড়তেই হয়। সকালে প’ড়ে, আর সন্ধ্যেয় আলোচনা ক’রে- আরব্যরজনীর শেহরাজাদের মতন রোজ বেঁচে উঠতে হয়। প্রথম প্রথম বই-এর ‘গল্প’ই পড়ে, তাতেই মজে থাকে, ভালোলাগার নেশা ধরে। তারপরই শুরু হয় আসল ঝামেলা। হাজার কিন্তু, অথবা, অথচ… সব ভিড় করতে থাকে। বইটার মধ্যে কি একাত্ম হ’তে হবে? নাকি সমর্পণ না ক’রে নিজেকে আলাদা রাখাই দরকার? বই যদি শুধুই মনোরঞ্জনের জন্য হয়? নিমেষে আনন্দ দেয় আর উবেও যায়? আনিবালেইতর বলবে- “সাবধান, দাঁতের ব্যবহার ভুলে যাবি”। কবিতার মানেটা কী- বুঝতে না পারলে কী হবে? ভুলে যেতে হবে? নাকি শিকারী পাখির মত ছোঁ মেরে গাঁথতে হবে তাকে? আবার ভালো লাগছে- কিন্তু মাথায় ঢুকছে না বই, মাথায় ঢুকছে খুবই- কিন্তু ভালো লাগছে না বই- কত সব বিপদ!!! “সব বই-ই ভালো লাগাটা নিশ্চয়ই খুব বোরিং ব্যাপার”। এইবারে বুঝতে হবে কোন্‌ বই তোমার ভালো লাগে, আর কোন্‌গুলো মোটেই লাগে না- আর কেনই বা হয় এইসব? বই-এর যেমন স্টাইল থাকে, তেমনি পাঠকেরও নাকি একটা স্টাইল থাকে। সেটাও নাকি বই-এর মতনই আবিষ্কার করতে হয়… তো এমন একটা রোমাঞ্চকর বইপড়ার অভিযান যে অচিরেই শেষ হবে- সে তো বলাই বাহুল্য। আর হয়ও তাই।

শেষ অবধি ওই বই-এর ফাঁদেই ধরা পড়ল বিকট দানব। বই আর কিউরারির বিষে বন্দী হল সে। আর তারপর? পাঠক কিংকং-এর গল্পটা মনে করুন। শহরে সাজিয়ে রাখা হল- বন্দী আর বই পড়া এই অদ্ভুত জন্তুকে। (ব্যাপারটা বেশ চেনা চেনা লাগছে না?) একদিন আবার স্বাধীনতা ফিরে চাইল বলেই নিজেকে মুক্তও করল দানব। তবে শাস্তি হল কিশোরের। লেখার শাস্তি। “হাবিজাবি লিখে যেতেই হয়, লিখে যেতেই হয়- তার উপর আবার গল্পগুলো কেউ পড়ে না। ব্যাপারটা খুবই হতাশাজনক”। তবে কিনা- ভরসার কথা হল- আশেপাশে আনিবালেইতরের ছোট সংস্করণ দেখা যায় প্রায়ই।

বই পড়া যে এমন একটা জীবনযাপনের মত উত্থান পতনের জটিল গল্প- ভালো ক’রে জানতাম নাকি? এই বইটা প’ড়ে সব রীতিমতো স্পষ্ট হ’য়ে উঠল। আর হ্যাঁ- অনুবাদটা দিব্যি- তরতর ক’রে প’ড়ে ফেলা যায়।