Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

“উত্তরসূরিদের ভবিষ্যতের জন্য” — জলবায়ু ধর্মঘট দিবসের আহ্বান

প্রদীপ দাস ও অনিমেষ দত্ত

 



লেখকদ্বয় বিজ্ঞান ও পরিবেশকর্মী। প্রদীপবাবু হাওড়া বিজ্ঞান চেতনা সমন্বয়ের সভাপতি

 

 

 

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সুইডেনের ১৭ বছর বয়সী গ্রেটা থুনবার্গ ও তার বন্ধুরা মিলে প্রতি শুক্রবার স্কুল বন্ধ করে সুইডিশ পার্লামেন্টের বাইরে প্ল্যাকার্ড নিয়ে বসে যে আন্দোলনের সূচনা করেছিল সেই আন্দোলন আজ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। পরবর্তীকালে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন নিঃসরণ, জীবাশ্ম জ্বালানির মাত্রারিক্ত ব্যবহারের বিরূদ্ধে জোরালো স্লোগান সহ রাষ্ট্রনেতাদের জলবায়ু সঙ্কট নিয়ে কোনও হেলদোল না থাকার ফলে গ্রেটারা দৃপ্তকণ্ঠে তাদের উদ্দেশ্যে বলেছে—

কোন সাহসে আপনারা ভান করছেন যে স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চালিয়ে গেলেই আর কিছু প্রযুক্তিগত সমাধান করলেই এই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? আজকে যে হারে নির্গমন হচ্ছে, তাতে বাকি থাকা কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের চরম সীমা সামনের সাড়ে আট বছরের মধ্যেই অতিক্রান্ত হয়ে যাবে।

এরপর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের (বিশেষত ছাত্রছাত্রীরা) মানুষ এই বাচ্চা মেয়েটির লড়াইকে নিজের লড়াই মনে করে বারবার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে রাস্তায় নেমেছেন। আর সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গড়ে উঠেছে গোটা বিশ্বব্যাপী “ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার” আন্দোলনের নেটওয়ার্ক। যে আন্দোলনের মুখ গ্রেটা থুনবার্গ।

ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার আন্দোলনের ডাকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে ডাক দেওয়া হচ্ছে বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘটের। আর গত দু বছর সেই ডাকেই সাড়া দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন জলবায়ু সুবিচারের দাবীতে। এবছর নভেম্বর মাসে গ্লাসগো শহরে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে COP-26। যেখানে জলবায়ু সঙ্কট নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা আলোচনায় বসবেন। আর সেই COP-26-এ রাষ্ট্রনেতাদের উপর চাপ সৃষ্টি করতেই গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী আয়োজিত হয়ে গেল জলবায়ু ধর্মঘট বা গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইক।

চলমান ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলার ডাক দিয়ে বার্লিনে জলবায়ু আন্দোলনের মুখ গ্রেটা থুনবার্গের উপস্থিতিতেই ছয় লক্ষ মানুষের জমায়েত হয়েছে গত ২৪ তারিখ। বার্লিন বাদেও ক্যালিফোর্নিয়া, রিও ডি জেনেরিও, নিউ ইয়র্ক, অ্যামস্টারডাম, মেলবোর্ন, টোকিও, মস্কো, মিলান, প্যারিস সহ বিশ্বের বিভিন্ন সেন্টার শহরে কোথাও পঞ্চাশ হাজার, কোথাও বা এক লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন জলবায়ু সুবিচারের দাবীতে। #UprootTheSystem এই হ্যাশট্যাগ সেদিন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটারে ট্রেন্ডিং-এ শীর্ষে থেকেছে। বার্লিন, মস্কো, ক্যালিফোর্নিয়া, ওয়াশিংটন, ম্যানচেস্টার, মিলান, মাদ্রিদ, মেলবোর্ন, রিও ডি জেনেরিও, ঢাকা হয়ে আমাদের দেশের দিল্লি, কলকাতা, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোর; বিশ্বের বিভিন্ন বড় শহরে পথে নেমেছেন সাধারণ মানুষ।

বিশ্ব জলবায়ু ধর্মঘটের অংশ হিসেবেই পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা সহ অন্যান্য জেলাতেও অনুষ্ঠিত হয়েছে জলবায়ু ধর্মঘট। আমাদের রাজ্যে এই ধর্মঘটের আহ্বায়ক ছিলেন বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যন্ড টেকনোলজিক্যাল মিউজিয়ামের প্রাক্তন ডিরেক্টর শ্রী সমর বাগচি। এই হরতাল পালিত হয় মূলত ছাত্রছাত্রীদের ডাকে।

জমায়েত হয়েছিল দুটি জায়গায়। কলকাতায় শহিদ মিনারে, এবং হাওড়ার ডুমুরজলা স্টেডিয়ামে।

আনুষ্ঠানিকভাবে যে আহ্বান জানানো হয়েছিল–

প্রকৃতিপ্রেমী সবাই সাংগঠনিকভাবে নিজের নিজের ব্যানার সহ বা ব্যক্তিগতভাবে আসুন। সাইকেল নিয়ে আসলে ভালো হয়। পারলে একটা পোস্টার করে আনুন।

কিছুটা সময় ব্যয় করে যান আপনার উত্তরসূরিদের ভবিষ্যতের জন্য।

হাওড়া বিজ্ঞান‌ চেতনা সমন্বয়ের উদ্যোগে ২৪ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা হাওড়া ডুমুরজলা স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণের উত্তর-পশ্চিম কোণে এক প্রতিবাদসভা ও মিছিলে উপস্থিত হয়েছিল। নানা ধরনের কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে অনুষ্ঠানটিকে সফল করে তোলার চেষ্টা করেছে ছাত্রছাত্রীরা। যে সমস্ত কর্মসূচিগুলির মধ্যে দিয়ে তারা জনগণের তথা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছে সেগুলি হল—

বিভিন্ন ট্যাবলো: হাওড়ার বিভিন্ন রাস্তায় জল জমে আছে আজও। রাস্তায় একটি নৌকায় আশ্রয় নিয়েছে পৃথিবী। যদি বিশ্ব উষ্ণায়ন না আটকানো যায় তাহলে একদিন শুধু হাওড়া শহর নয় কলকাতাও জলমগ্ন হবে, শুধু বর্ষা্য় নয় সারা বছর।

কর্মসূচির মধ্যে সবচেয়ে দৃষ্টি-আকর্ষণীয় ছিল গণ-ট্যাবলো। ছাত্র-ছাত্রীরা সবাই সঙ্গে এনেছিল একটা কালো ছাতা আর কালো ছাতাগুলিতে লেখা ছিল save earth। ছাতার নিচে একটি করে গ্লোব রেখে তারা প্রতীকীভাবে পৃথিবীকে আড়াল করে দেখাতে চেয়েছিল উষ্ণ হওয়া থেকে আমাদের পৃথিবীকে রক্ষা করা কতটা জরুরি।

এছাড়া বিভিন্ন পোস্টার ও ব্যানার সহযোগে পদযাত্রা, গান ও স্লোগান, এবং সভায় উপস্থিত বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ছাত্রছাত্রীরা পরিবেশ সচেতনতা সম্পর্কে রাখা বক্তব্যের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করেছিলেন। গান, আবৃত্তি ছাড়াও ছিল নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

অনুষ্ঠানে হাওড়া শহরের কিছু পরিবেশ বিষয়ক সমস্যার ওপর আলোকপাত করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা হয়।

সমস্যাগুলি হল:

হাওড়া শহরের এই স্থানীয় সমস্যাগুলির সমাধান এবং মানুষকে সচেতন করা এবং তার পাশাপাশি সমগ্র বিশ্ব-পরিবেশ রক্ষার দাবি ছিল সেদিনের জমায়েতের মূল লক্ষ্য।

এই অনুষ্ঠানে হাওড়া বিজ্ঞান‌ চেতনা সমন্বয়ের প্রায় শতাধিক সদস্য ছাড়াও অংশ নিয়েছিলেন এলাকার মানুষরা, ডুমুরজলা স্টেডিয়ামে প্রাতঃভ্রমণকারীরা ও নানান পথচলতি মানুয়।

কলকাতার শহিদ মিনারে হয়েছে কেন্দ্রীয় জমায়েত। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ জড়ো হয়েছিলেন সেদিন কেন্দ্রীয় জমায়েতে। “গ্লোবাল ক্লাইমেট স্ট্রাইক অরগানাইজিং কমিটি (কলকাতা)” নেটওয়ার্ক-এর পক্ষ থেকে আয়োজিত এই জমায়েতে সদস্যরা পরিবেশ বিপর্যয় এবং তার জন্য দায়ী পুঁজিবাদী ব্যবস্থা উপড়ে ফেলার ডাক দিয়েছেন। ছাত্রছাত্রী সংগঠনগুলির মধ্যে পিডিএসএফ, আইএসইউ, আইসা; এছাড়াও ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার ওয়েস্টবেঙ্গল, টিচারস ফর ফিউচার-এর সদস্যরা, এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বিজ্ঞান সংগঠন, পরিবেশ সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন পার্ক সার্কাসের সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের প্রতিনিধিরা।  বজবজের চড়িয়াল খাল বাঁচানোর আন্দোলন, যশোর রোডের গাছ বাঁচাও আন্দোলন, ধূলাগড়ের অম্বুজা সিমেন্ট কোম্পানির দূষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন, পুরুলিয়ার অযোধ্যায় ঠুর্গা পাম্প স্টোরেজ-এর বিরুদ্ধে আন্দোলনরত প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখলেন। সুদূর বীরভূম জেলার দেওচা পাঁচামী থেকে এদিন হাজির ছিলেন আন্দোলনরত শ্রমজীবী মানুষেরাও। তাদের বক্তব্যে উঠে এল কীভাবে ‘উন্নয়নের’ নামে দেওচা পাঁচামিতে সরকার প্রাণ-পরিবেশ-প্রকৃতি বিরোধী খোলামুখ কয়লাখনি তৈরি করার পরিকল্পনা করেছে এবং তার ফলে সেই অঞ্চলের মানুষ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এছাড়াও নদী বাঁচাও আন্দোলন, জলাভূমি বাঁচানোর আন্দোলনগুলি থেকেও প্রতিনিধিত্ব করলেন সংশ্লিষ্ট আন্দোলনগুলির প্রতিনিধিরা। ফেসবুকের জনপ্রিয় গ্রুপ ‘আঁকিয়েদের আড্ডা’র তরফ থেকে জল-জঙ্গল-জমির অধিকার বিষয়ে প্রদর্শনীর আয়োজন করা হল, শিল্পের মাধ্যমে ফুঁটিয়ে তোলা হল জলবায়ু সঙ্কটকে৷ সুন্দরবন এই মুহূর্তে বিশ্বের পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম হটস্পট। সেই সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার লড়াই করার জন্য সদ্য তৈরি সংগঠন ‘সুন্দরবন শ্রমজীবী অধিকার রক্ষা সমিতি’র প্রতিনিধিরাও নিজেদের বক্তব্যে তুলে ধরলেন আজকের সুন্দরবনের মূল সমস্যাগুলি।

কলকাতা এবং হাওড়া ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের মালবাজারে ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার মালবাজার’ সংগঠনের উদ্যোগে জলবায়ু ধর্মঘট পালিত হয়। সেখানে কচিকাঁচাদের গলায় উঠে এসেছে কৃষক আন্দোলনের সমর্থনে গান। দুর্গাপুরে ‘দুর্গাপুর রেসপন্স অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ সংগঠনের পক্ষ থেকে ধর্মঘটের সমর্থনে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়।

এছাড়াও ক্লাইমেট স্ট্রাইকের অংশ হিসেবে ২৬ সেপ্টেম্বর উত্তর ২৪ পরগণা জেলার নৈহাটিতে বিভিন্ন সংগঠন, পরিবেশপ্রেমী মানুষের উদ্যোগে ধর্মঘট পালিত হয়।