Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

তারান্তিনো, সিজন দুই — আঠেরো

প্রিয়ক মিত্র

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

পাল্প ফিকশন

আটের দশকের ঠিক মাঝামাঝি। ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একদিন সন্ধেবেলা উত্তর কলকাতার হরি ঘোষ স্ট্রিটের একটি বনেদি বাড়ির দোতলার ঘর থেকে আচমকা ভেসে আসা একটা আর্তনাদে সচকিত হয়ে উঠল পাড়ার লোকজন। ওই ঘর থেকে তারস্বরে ইংরেজি গানের শব্দ আসছে এখনও। টেপ বাজছে। যারা সামনের দোকানে চা খাচ্ছিল ও কাগজ পড়ছিল, তারা চমকে তাকাল ওপরের দিকে। পাশের আমিষ তেলেভাজার দোকানে সন্ধেবেলার দৈনন্দিন ভিড়। সেখান থেকেও বেশ কিছু চোখ আচমকা ঘুরে গেল এদিকে। সামনে একটা পার্টি অফিস আর ‘গণশক্তি’-র স্ট্যান্ড। সেখানেও বেশ কিছুটা জমায়েত ছিল। সেখান থেকেও কয়েকজোড়া চোখ ঘুরল এদিকে। সামনের সেলুনের ভেতরে রেডিওতে বাজছিল, ও শাম কুছ আজিব থি, ইয়ে শাম ভি আজিব হ্যায়! সেই সেলুন থেকে দুজন নাপিত এবং গালে অর্ধেক শেভিং ক্রিমমাখা এক ব্যক্তি একটু কৌতূহলী দৃষ্টি দিল। কেউ কেউ, নির্লিপ্ত, তাকাল না, তাকানোর দরকার বোধ করল না। কোনও একটা বাড়িতে রেওয়াজ চলছিল টানা হারমোনিয়ামের বাজনার সঙ্গে, যেন পাল্লা দিচ্ছিল ইংরেজি গান আর রেডিওতে হিন্দি গানের সঙ্গে। সেটাও থামল না।

দোতলার সেই ঘরের ভেতর তখন একটা গোল শ্বেতপাথরের টেবিল। সেই টেবিলে রাখা একটা টেপ। সেই টেপের ভেতর বাজছে এলভিস প্রেসলির ‘ডাবল ট্রাবল’ ক্যাসেটের দ্বিতীয় পিঠের দ্বিতীয় গান ‘দেয়ার ইজ সো মাচ ওয়ার্ল্ড টু সি’। টেপের পাশে একটা গ্লাসে হুইস্কি, বরফ দিয়ে, অন দ্য রকস। আধখোলা অবস্থায় রাখা আর্থার সি ক্লার্কের ‘চাইল্ডহুডস এন্ড’ বইটি। আর তার পাশে একটি ভারী রাজকীয় রিসিভার। যার কোণে এখন হালকা রক্ত লেগে। কারণ সেই রিসিভারটা দিয়ে তিনবার আঘাত করা হয়েছে ইজিচেয়ারে বসে থাকা লোকটার মাথায়। লোকটার পরনে সাদা পাঞ্জাবি ও পাজামা। যে খুন করল ইজিচেয়ারের লোকটাকে, সে রিসিভারটা টেবিলের ওপর রেখে ফোনটা তুলে একটা নম্বর ডায়াল করতে শুরু করল। ঘরে একটা জোরালো হলুদ ল্যাম্পের আলো জ্বলছে। সেই আলোতে দেখা যাচ্ছে, লোকটার গায়ে কালো একটা ওভারকোট, মাথায় কালো হ্যাট, হাতে কালো দস্তানা। চোখে কালো চশমা আছে একটা, তবে সেটার গুরুতর কোনও কারণ আছে। কারণ কালো চশমার নিচ থেকে লোকটার চোখ সম্পর্কে যেটুকু আন্দাজ পাওয়া যাচ্ছে, তাতে কালো চশমা খুলে রাখলে লোকটা ভয়ঙ্করদর্শন হত। এক ঝলক লোকটাকে দেখলে মনে হয়, স্বপনকুমারের চটি বইয়ের কভার থেকে দীপক চ্যাটার্জি উঠে এসেছে। এই বেশ পরে লোকটা রাস্তা দিয়ে এলে যে কেউ নজর করত। কিন্তু তা ঘটেনি। কোনদিক থেকে লোকটা ঢুকেছে, তা বোঝা যাচ্ছে না।

ফোন রিং হয়ে চলেছে। রেওয়াজের শব্দ আসছে— সা নি ধা পা। এলভিসের গলায় বাজছে, সো হিয়ার হাউ ইট এন্ডস, নট লাভার্স বাট ফ্রেন্ডস। অন্যদিকে রেডিওতে ইন্টারলিউড শেষ হয়ে শুরু হল, মেরা খেয়াল হ্যায় আভি, ঝুঁকি হুই নিগাহ মে…।

ওপার থেকে ফোনটা ধরল কেউ।

–রডরিগেজ স্পিকিং!

কর্কশ গলায় কথা ভেসে এল ওপার থেকে।

এপারের লোকটা একটু থামল। সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। আর্তনাদের শব্দ বাইরে গেছে। গানের শব্দ ছাপিয়েও শব্দটা গেছে বাইরে। এসব পাড়ায় কেউ না কেউ ঠিক খোঁজ নিতে চলে আসে। ওকে তাড়াতাড়ি অদৃশ্য হতে হবে।

মুখের কাছে হাত এনে চাপা গলায় এবার দীপক চ্যাটার্জির মতো লোকটা বলল, হান্টিং ডান!

ওপার থেকে রডরিগেজের কথা ভেসে এল।

–গুড! নাও সেন্ড দ্য সিগনাল। কুইক।

পিছনে ঘুরে একবার সিঁড়ির দিকে দেখে নিল খুনি অর্থাৎ দীপক চ্যাটার্জি। পায়ের শব্দ ক্রমে কাছে আসছে।

–অ্যান্ড হোয়াট অ্যাবাউট বিল?

রডরিগেজ যেন সামান্য সময় নিল। তারপর বলল, কিল ইট!

ফোনের কাজ শেষ। এবার রিসিভার নামিয়ে রেখে দীপক চ্যাটার্জি দ্রুত চলে গেল ঘরের এক কোণে। দরজার প্রায় কাছে চলে এসেছে শব্দ। সেদিকে একবার তাকিয়ে নিল সে।

দেওয়ালে একটা বড়সড় আঁকা ছবি। চাঁদের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিল আর্মস্ট্রং। ভিক্টরি সাইন দেখাচ্ছেন তিনি।

দেওয়ালজোড়া সেই ছবিতে নিলের হাতের ভিক্টরির মুদ্রায় চাপ দিল দীপক চ্যাটার্জি। ফট করে দেওয়ালের কিছুটা অংশ খুলে গেল।

একটা লিফটের মতো দেখা গেল। সেটায় চাপতে দেওয়াল আপনা থেকেই বন্ধ হল।

আর তক্ষুনি ঘরে কেউ ঢুকল। তার আর্তচিৎকারও অল্প একটু শোনা গেল।

লিফট নেমে এল নিচে।

একটা খুপরি ঘর। যা পুরোদস্তুর ল্যাবরেটরির মতো দেখতে। নানাবিধ উদ্ভট জিনিস রাখা। গিনিপিগের খাঁচা, বিভিন্ন বিকার। বিভিন্ন জারে রাখা লার্ভা, পশুর ভ্রূণ। লোকটা ঢুকল সেই ঘরে।

একটা চৌকির ওপর রাখা সাদাকালো টিভিতে কলকাতা দূরদর্শন চলছে। খবর পড়ছেন ছন্দা সেন।

টিভির মাথায় একটা হালকা চাপড় মারল দীপক চ্যাটার্জি। খবর বন্ধ হল। টিভির মাথা থেকে একটা অ্যান্টেনার মতো জিনিস লম্বা করল দীপক। হিজিবিজি শুরু হল স্ক্রিনে। তারপর এল একটা গোলাপি স্ক্রিন। সেই স্ক্রিনে সাদা সাদা কিছু খুদে অক্ষর ভেসে উঠল। নিচু হয়ে সেগুলোর মধ্যে টুকটাক কীসব টিপল দীপক চ্যাটার্জি। অ্যান্টেনা একটু নড়ে উঠল।

তারপর দীপক চ্যাটার্জির দৃষ্টি গিয়ে পড়ল একটা বড় গোলাকার কাচের বাক্সের ওপর। সেই বাক্সের ভেতরটা সাদা ধোঁয়ায় ঢাকা। তার ভেতর একটা ছায়ামূর্তি দেখা যাচ্ছে। সে যেন তাকিয়ে দীপক চ্যাটার্জির দিকে।

এবার দীপক চ্যাটার্জির পকেট থেকে বেরোল একটা পিস্তল, যা দেখতে সাধারণ নয়। পিস্তলটার নলের ওপর আরও একটা নল লাগানো। সেই নল থেকে লাল আলোর মত একটা লেজার বেরিয়ে গেল।

দু সেকেন্ড চুপচাপ। কাচের বাক্স ভেঙে চুরমার হল তারপর, সশব্দে। ভেতরের ধোঁয়া মিলিয়ে গেল।

কাউকে দেখা গেল না সেখানে।

পিস্তল কোমরে গুঁজে ওই ল্যাবরেটরির অন্য একটা দরজা খুলে বেরিয়ে গেল দীপক চ্যাটার্জি, সে কোথায় গেল, বোঝা গেল না।

 

–কুইনাইন টারান্টুলা?
–ভাটাস না। লোকটার নাম কুইনটাইন ট্যারান্টিনো।
–সেই শালা টারান্টুলার মতোই শুনতে লাগছে!
–ধুর বাল!

কিছুটা বিরক্ত হয়েই হাল ছেড়ে দিল বাপ্পা নামের সদ্য-যুবকটি। এইট্টিজের হরি ঘোষ স্ট্রিটের ওই ঘটনার বাইশ বছর পর কাশী মিত্র ঘাটের এক শান্ত বিকেলে দুই যুবক বসে কথা বলছিল। তার মধ্যে বাপ্পা একজন। অনেকক্ষণ ধরে সে তার বন্ধুকে বোঝাতে চেষ্টা করছিল, তার সদ্য দেখা কুইনটাইন ট্যারান্টিনো-র ছবিগুলো তার দেখা সেরা ছবি। কিন্তু তার বন্ধু এমনিতেই গাঁজার নেশায় টাল। দু-দুটো জয়েন্ট টেনে সে ইতিমধ্যেই ঝিমোচ্ছে। তাকে কিছু বোঝাতে যাওয়া বাতুলতা।

–এসব ছাড় ভাই! এসব ট্যারান্টুলা-ফুলার সিনেমা দেখব না। যতই অ্যাকশন থাকুক। অ্যানাকোন্ডা অবধি চলে। ওসব মাকড়সা-ফাকড়সা আমার পোষায় না ভাই!
–আরে বলছি এটা মাকড়সা নিয়ে সিনেমা নয়!
–সে তুই কিং কং নিয়েও বলেছিলি ভাই! হলে টেনে নিয়ে গিয়ে দেখিয়েছিলি। সেখানেও দেখি স্ক্রিনজুড়ে বড় বড় মাকড়সা!
–সে তো বাল একটা সিনে!
–ধুর ওসব আমার চলে না ভাই! বারবার বলেছি তোকে! স্কুলে পড়তে জোর করে স্পাইডারম্যান দেখিয়েছিলি তোর কম্পিউটারে, একটা ডিভিডি আমাকে দিয়ে কিনিয়েওছিলিস জোর করে! তখনও বলেছিলাম, মাকড়সা আমার পোষায় না।
–আরে বোকাচোদা, বলছি না মাকড়সা নিয়ে সিনেমা এটা নয়!
–এখন আর আমরা স্কুলে পড়ি না ভাই! স্পাইডারম্যান দেখার বয়স পেরিয়ে গেছে! ওসব সিডি আমি নেব না। তুই বরং আমাকে একটা ছাব্বিশ দে!

‘ছাব্বিশ’ শব্দটা এই এলাকার কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীদের মধ্যে বেশ চালু। স্কুলের শেষবেলায় আর কলেজের শুরুর দিকে অল্প টাকা জমিয়ে সিডি-ডিভিডি কেনার চলটা চার-পাঁচ বছর হল তুঙ্গে। সকলের বাড়িতে কম্পিউটার বা ডিভিডি প্লেয়ার নেই। তাতেও অসুবিধে নেই। ডিভিডি প্লেয়ার ভাড়া করা যায় সিডি লাইব্রেরি থেকে, ভিসিডি বা ডিভিডি-ও। কয়েকজন সিনেমা ডাউনলোড করতে পারে টরেন্ট থেকে। কিন্তু তার জন্য জোরালো ইন্টারনেট লাগে। ব্রডব্যান্ডে সেসব সুবিধে কোথায়? তাই বেশিরভাগ ছেলেমেয়ে সিনেমা দেখে সিডি বা ডিভিডিতে। অরিজিনাল ভিসিডি বা ডিভিডির দাম ব্যাপক। আর মিউজিক ওয়ার্ল্ড বা সিমফনির মতো কোনও দোকান এই তল্লাটে নেই। তাই পাইরেটেড ভরসা। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ের ফুটপাথে লাইন দিয়ে পাইরেটেড সিডি-ডিভিডির দোকান। তার মধ্যে কোনও কোনও দোকানের জাঁক একটু বেশি। ভিড়ও বেশি সেখানে। সদ্য রিলিজ হওয়া বাংলা ছবি তেমন পাওয়া যায় না। খুব হিট করলে দু-একটা হলপ্রিন্ট হয়তো মিলবে। হিন্দি সিনেমা হলে পড়তে না পড়তেই মার্কেটে চলে আসে। সেগুলোও হলপ্রিন্ট। ‘ডন’, ‘লাগে রহো মুন্নাভাই’ আরেকটা কী বেশ একটা সিনেমার ডিভিডি প্রথম কিনেছিল বাপ্পা। ওর বেশ মনে পড়ে। তখনও সিনেমাগুলোর অরিজিনাল ডিভিডি বেরোয়নি। হলিউডের ছবিরও হলপ্রিন্ট আসে, তবে কিছুদিন অপেক্ষা করলে, বাজারে অরিজিনাল ডিভিডি বেরোলে তখন ভালো প্রিন্টের পাইরেটেডও পাওয়া যায়। ডিভিডি হলে সুবিধে। ছটা সিনেমাও একসঙ্গে পাওয়া যায়। ভিসিডিতে দুটো সিডি মিলিয়ে একটাই সিনেমা। আর রয়েছে এমপিথ্রি। ঘ্যামা জিনিস! একসঙ্গে আড়াইশো, তিনশো, চারশো গান এক প্যাকেজে। হিন্দি, বাংলা, ইংরেজি, ভোজপুরি, তামিল— নানা ধরনের গান।

আর এই পাইরেটেড সিডির মার্কেটে ‘ছাব্বিশ’ একটা নিষিদ্ধ ব্যাপার। সব দোকানে সে জিনিস পাওয়াও যায় না। ব্যাপারটা আর কিছুই নয়, পর্নোগ্রাফি। এলাকায় চলতি নাম এমনিতে ব্লু ফিল্ম, বা‌ সংক্ষেপে বিএফ। কিন্তু নেহাত মূর্খ আর নির্বোধ না হলে কেউ সোজাসুজি সিডির দোকানে গিয়ে বলবে না, ব্লু ফিল্ম দিন! অনেকগুলো ঘাঁতঘোঁত আছে। সেগুলো জানা প্রয়োজন। যেমন চশমা-গলির (ওই গলিতে সার দিয়ে চশমার দোকান) কাছে যে বড়সড় দোকানটা, যেটা এখানকার মিউজিক ওয়ার্ল্ড বা সিমফনির সমান, সেখানে ছাব্বিশ পাওয়া যাবে না ভাবলে ভুল হবে। ওর পাশে আরেকটা ছোট্ট দোকান আছে। বড়টাতে সার দিয়ে ফিল্মের সিডি-ডিভিডি, পাশেরটায় এমপিথ্রি আর মিউজিক ভিডিওর সিডি। সেই দোকানে চেনা লোক গিয়ে ফিসফিস করে ছাব্বিশ বললেই দোকানের ডেস্কের দরজা খুলে দেবে ওপারের লোক‌। ভেতরে ঢুকে নিচু হয়ে বেছে নিতে হবে। যে খুশি গিয়ে বললে হবে না। অন্তত একজন চেনা লোককে সঙ্গে আনতে হবে। এই সিস্টেম। ফুটপাথের দোকানে যে কেউ গিয়ে ছাব্বিশ বললেই হয়। ভেতর থেকে একগুচ্ছ সিডি বের করে দেবে। কভার নেই, বা থাকলেও অন্য সিডির কভার। ওপরে সিডি মার্কার দিয়ে লেখা নাম। দু-একটা দোকানে কোডটা হল ‘সোনা’। এসবের কী মানে, তা সকলে জানে না। কিন্তু এগুলোই চালু কোড।

যাই হোক, বাপ্পার বন্ধু শুভদীপ ওরফে জিদান একটু জোরে বলে ফেলল ‘ছাব্বিশ’ কথাটা। কাশী মিত্র ঘাটের পাশের ফাঁড়িতে ওরা বসে। পাশে পুলিশের একজন বসে ঢুলছে। বুঝুক না বুঝুক, যদি ছাব্বিশ নিয়ে সন্দেহ করে? বাপ্পা খানিকটা ধমক দিয়েই বলল, আস্তে!

–যাই হোক, তুই ভাই ওইসব ট্যারান্টুলা দিস না। আমি দেখব না। হয় ছাব্বিশ দে, নয়তো ভালো কিছু সিনেমা।
–আবার জোরে বলছিস!
–সেটা ভাই তুই জয়েন্ট টেনেছিস বলে মনে হচ্ছে। আমি আস্তেই বলছি।

এতক্ষণ পুলিশটা এদিকে নজর দেয়নি। ‘জয়েন্ট টানা’ কথাটা সজোরে কানে গিয়ে লাগতেই এবার সোজা তাকাল ওদের দিকে। বাপ্পা বিপদ বুঝে জিদানকে একরকম টেনে তুলে হিড়হিড় করে বের করে আনল ফাঁড়ি থেকে। ওরা যদিও গাঁজা টেনেছে ভূতনাথ ঘাটে, এই ফাঁড়িতে বসে নয়, কিন্তু প্যাকেট, রিফার এসব এখনও বাপ্পার পকেটে। যে কোনও মুহূর্তে কেস খেত।

এবার দাঁত খিঁচিয়ে বাপ্পা বলল, বারবার বারণ করছিলাম জোরে কথা বলতে। এরপর ফাঁড়িতে বসা চাপ হয়ে যাবে! বাড়ি চ!

–বাড়ি যাব। কিন্তু ট্যারান্টুলা দিলে যাব না।
–ভাই, শেষবারের মতো বলছি, ওটা ট্যারান্টিনো!
–অথবা তারান্তিনো। সম্ভবত তারান্তিনোই ঠিক উচ্চারণ।

বাপ্পা আর জিদানকে প্রায় চমকে দিয়ে কথাটা যিনি বললেন, তার বয়স অন্তত সত্তর। এই ফাঁড়িতেই লোকটাকে বসে থাকতে দেখা যায়। ছেঁড়া ফতুয়া। একটা লুঙ্গি। একমনে বিড়ি খান। গায়ে একটা গামছা জড়ানো থাকে। একটা আশ্চর্য স্নিগ্ধ গন্ধ লোকটার গা থেকে বেরোয়। কারও সঙ্গে লোকটাকে কথা বলতে দেখা যায়নি। শুধু সামনের দোকানের লালুদা মাঝেমধ্যে চা এনে দেয় লোকটাকে। সেটাও চুপচাপ খায়। কাছেই ডোমবস্তিতে একটা ঝুপড়িতে না কি লোকটা থাকে।

সেই লোকটা ট্যারান্টিনো বা তারান্তিনোর নাম জানে? আশ্চর্য হয়ে গেল বাপ্পা, জিদান দুজনেই।

লোকটা এবার হাসল। ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত আরও ক্ষয়ে যাচ্ছে পানমশলা-গুটখার সংমিশ্রণে। লোকটা বাপ্পার কাছে এসে বলল, তুমি একটা লম্বা সিগারেট খাচ্ছিলে। একটু দেবে? অনেকদিন সিগারেট খাই না।

বাপ্পা যেন কিছুটা মোহিত হয়েই লোকটাকে অনেক কষ্টে কেনা লম্বা সিগারেট দিল। আগুন ধরিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি তারান্তিনোর সিনেমা কোথায় দেখেছেন?

লোকটা সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে চোখটা বন্ধ করল। নাক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল খানিকটা। তারপর বলল, আমাকে একজন সিডি এনে দেয়।

কিছুটা স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই বাপ্পা জিজ্ঞেস করল, কে? সিডির ব্যবসা করে সে?

লোকটা বলল, না। ওর লাইব্রেরি আছে। নাম ডাকু। কাছেই থাকে।

ডাকু! বাপ্পা চেনে ডাকুকে। বাপ্পারই বয়সি। বা একটু বড়। জেরক্সের দোকান ওর। কলেজের কাছে। ওই দোকানের ভেতরের ঘরেই ওর সিডি লাইব্রেরি। সিডি আর ডিভিডি প্লেয়ার ভাড়া দেয় ডাকু। জম্পেশ ছেলে। পুরনো ভিসিআরও আছে ওর কাছে একটা। ও আর ওর ভাই বনি সিডি ভাড়া নেয় ডাকুর থেকেই।

আগ্রহী হয়ে লোকটাকে জিজ্ঞেস করল বাপ্পা, আপনার নাম কী?

লোকটা একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, আমার নাম, হেঁ হেঁ, কিছুটা বোকা হেসে বলল, আমার নাম জেনে কী হবে?

অন্যমনস্ক হয়ে লোকটা চলে গেল সিগারেট টানতে টানতে। লোকটা চলে যেতে লালুদা বলল, এ কিন্তু ঘ্যামা লোক!

–তাই তো মনে হল, বাপ্পা বলল। দুটো চা দিও তো লালুদা।

লালুদার দোকানের ভেত‍র জায়গা পেল না বাপ্পা আর জিদান। ছোট টিভি চলছে দোকানের ভেতর। অনেকেই দেখছে। নন্দীগ্রাম বলে একটা জায়গায় গুলি চলে চোদ্দোজন মারা গেছে। তাই নিয়ে চাপানউতোর চলছে কিছু।

লালুদা চা ঢালতে ঢালতে বলল, জমিদারবাড়ির ছেলে এ। শোভাবাজারে ওদের একটা বাড়ি ছিল, আর একটা বাড়ি বোধহয় ঠনঠনিয়া কালীবাড়ির ওদিকে। কী মঙ্গলপুর না মঙ্গলগঞ্জের জমিদার ছিল!

–তোমাকে কে বলল? বাপ্পা জানতে চাইল।
–ওইই একদিন বলছিল। একটু পাগলাটে। একমনে কী বিড়বিড় করে।
–জমিদারবাড়ির ছেলের এই দশা? বাপ্পা বলল।

চা দুটো দিয়ে একটু নিচু গলায় লালুদা বলল, নকশাল করত না কি! এটা অবশ্য আমাকে বলল সুবলদা। সুবলদা তো ওইসময় কনস্টেবল ছিল। সুবলদা বলল, মনে হয় এককালে নকশাল করত।

বাপ্পা একটু অন্যমনস্ক হতে হতে সামলে নিল। বলল, দুটো সিগারেট দাও না।

 

সন্ধে নামছে। কুমোরটুলির কাছে একটা ঠাকুর বানানোর ফাঁকা স্টুডিওর বাইরে এসে দাঁড়াল একটা লোক। হালকা শিস দিল। স্টুডিওর তেরপলের ঢাকনা সরিয়ে একজন দেখল ওকে। তারপর ডেকে নিল ভেতরে।

লোকটা ঢুকতেই আরেকটা গুন্ডা টাইপের লোক এসে ঘাড় ধরে নিয়ে গেল লোকটাকে একটা চেয়ারের সামনে। তারপর একরকম ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। লোকটা হুমড়ি খেয়ে পড়ল।

লোকটা রক্তচক্ষু দিয়ে গুন্ডাটার দিকে তাকিয়ে বলল, কী হচ্ছে এটা?

এবার চেয়ারে বসে থাকা দশাসই লোকটা মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়া লোকটার চুলের মুঠি ধরে ওর মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেল। চেয়ারে বসা লোকটার চোখের দৃষ্টি রক্ত জল করে দেওয়া। বলল, কী খবর মালটার? এতদিনেও কনফার্ম হল না। এর মানে কী দাঁড়ায় জানিস? তুই ভুয়া খবর দিয়েছিস।

–আমি মাইরি বলছি স্যর, লোকটার কাছে মালটা আছেই।
–তাহলে সেটা পাক্কা খবর হচ্ছে না কেন এতদিনে? পেছন থেকে একজন কর্কশ গলায় বলল।
–আজকে লোকটার পিছু নিয়েছিলিস?

চেয়ারে বসা লোকটা জানতে চাইল।

–আজ স্যর সিচুয়েশন টেন্স। নন্দীগ্রাম না কোথায় একটা বাওয়াল হয়েছে। পার্টি অফিসে একবার যেতেই হত। এই গভমেন্ট না কি থাকবে না। আমাদের পার্টি রুলিং পার্টি হতে পারে এরপর…

কথার মাঝে তার গালে একটা বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় পড়ল। থাপ্পড়টা মারল চেয়ারে বসা লোকটাই। বলল, পার্টি চোদাবি না বাঞ্চোৎ। শোন, পরশুর মধ্যে আমার পাক্কা খবর চাই। না হলে অন্য কেউ খবর দেবে। কিন্তু তোকে এ তল্লাট থেকে পুরোপুরি পাত্তাড়ি গোটাতে হবে। মনে রাখবি, বেগুনিবাবু বলছে কথাটা।

 

[এরপর আগামী সংখ্যায়]