Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপ : লাথিটা ফুটবলে পড়ুক, গরীবের পেটে নয়!

সুশোভন ধর

 

আমাদের ডান পাশে ধ্বস
আমাদের বাঁয়ে গিরিখাত
আমাদের মাথায় বোমারু
পায়ে পায়ে হিমানীর বাঁধ
আমাদের পথ নেই কোনও
আমাদের ঘর গেছে উড়ে
আমাদের শিশুদের শব
ছড়ানো রয়েছে কাছে দূরে
আমরাও তবে এই ভাবে
এ-মুহূর্তে মরে যাব নাকি?
আমাদের পথ নেই আর
আয়, আরও বেঁধে বেঁধে থাকি।
–আয়, আরও বেঁধে বেঁধে থাকি, শঙ্খ ঘোষ

বাঙালি তার সাধের খেলা ফুটবলে তার স্বদেশের জার্সি পরিহিত দলকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলতে দেখতে না পারার দুঃখ বহুকাল চেপে রেখেছে। এই খেলার উৎকর্ষতার বিচারে আমাদের দেশের মান যে পংক্তিতে পড়ে তাতে অদূর ভবিষ্যতেও এই সাধ সম্ভবত মিটবে না। তবে হতাশার মাঝেও এদেশে হতে যাওয়া ফিফা অনুর্ধ-১৭ যুব বিশ্বকাপ কিছুটা খুশির হাওয়া বয়ে এনেছে। পুরোটা না হলেও দুধের স্বাদ অন্তত ঘোল খেয়ে মিটবে। আর তার চেয়েও বড় কথা ফাইনাল নিয়ে অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপের মোট ১০টি ম্যাচ আয়োজিত হবে আমাদের প্রিয় কলকাতা শহরেই।

ঘোর নিন্দুক কিংবা ছিদ্রান্বেষী বিরোধী দলের নেতারা বলতে পারবেন না যে এই উৎসবের আয়োজকদের উৎসাহে কোনও ভাটা দেখা গেছে। সাজ সাজ রব যুবভারতী চত্বর জুড়ে। এবং একই সাথে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের আশেপাশের এলাকায় বিপুল সৌন্দর্যায়ন চলছে। বিদেশী অতিথিদের কাছে শহরটাকে সুন্দর করে তুলে ধরতে হবে তো! এখানে গৃহহীন মানুষ নেই, এখানে বেকার নেই, এখানকার ফুটপাথ আর রাস্তাগুলো কী সুন্দর ঝকঝক করছে। ভেবেছিলাম এই বিশাল প্রকল্প নিয়ে কিছু কবিতা শুনব, কিংবা নিদেনপক্ষে কয়েকটি সুন্দর গল্প। হঠাত তাল কেটে গেল মেনকা মণ্ডলের কান্না শুনে। সল্টলেকের এই মহিলা এই অঞ্চলের ১৩টি ফ্ল্যাটে পরিচারিকার কাজ করে সংসার চালান। সংসারে তিনটি বাচ্চা। তাঁর স্বামী পেশায় দিনমজুর। সে কাজের খোঁজে বেলেঘাটা থেকে বাগুইআটি, কাঁকুড়গাছি থেকে কেষ্টপুর ঘুরে বেড়ায়। অবশ্য রোজই যে কাজ মিলবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।

যুব বিশ্বকাপের অজুহাতে এদের পুরো বস্তি পিটিয়ে তুলে দেওয়া হয়েছে। তারা শুয়ে আছেন খোলা আকাশের নীচে। আর বৃষ্টি পড়লে খালি বাসস্ট্যান্ডের নীচে গুটিসুটি মেরে সবাই মিলে সারা রাত বসে থাকেন। কারণ এই তথাকথিত সৌন্দর্যায়ন আর উন্নয়নের কোপ পড়েছে সল্টলেক, দমদম এবং বাইপাস-সংলগ্ন এলাকার গরীব ও খেটেখাওয়া মানুষগুলোর ওপর। গত দু-তিন সপ্তাহ ধরে নির্বিচারে হকার ও বস্তি উচ্ছেদ চলেছে এই উন্নয়নের মহাযজ্ঞ সফল করার লক্ষ্যে। বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের শেষ সম্বলগুলি। খাট-বিছানা, রান্না করা ভাত, টান মেরে ফেলে দেওয়া হয়েছে খালে। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। লাইট, জলের লাইন কেটে দিয়ে বধ্যভূমি বানানো হচ্ছে সল্টলেকের ঝুপড়ি-বস্তি অঞ্চলগুলিকে। সুপরিকল্পিতভাবে এই মানুষগুলোকে এই এলাকা থেকে উচ্ছেদ করে দেওয়ার অভিযান চলছে বিধাননগর পৌরনিগমের উদ্যোগে। কলকাতা পৌরনিগমও পিছিয়ে নেই। উন্নয়নের জোয়ার সুভাষ সরোবর ও বেলেঘাটায় এসে পড়েছে।

অবশ্য ‘এবার বিশ্ববাংলায় বিশ্বকাপ’-এর পোস্টার এয়ারপোর্ট থেকে শুরু করে সারা কলকাতায় যেভাবে ছেয়ে গেছে তা দেখার মতো। সারাবছর রাস্তার খানাখন্দ নিয়ে আমরা যাই গালমন্দ করি না কেন বাইপাসের রাস্তা টারম্যাকের চেয়েও মসৃণ। দেখলে হবে? বাবা, খরচা আছে। শুধুমাত্র যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনের জৌলুস ফেরাতে খরচা হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। কত আলো, কত রঙের মেলা। ধুর এরকম জমকালো পরিবেশে এলাকার হকার, রিকশাওয়ালা, কাজের মাসি, মলিনবসনা ঝুপড়িবাসি, হাড় জিরজিরে বাচ্চা, বৃষ্টির জল চুঁইয়ে পড়া প্লাস্টিক দিয়ে ছাওয়া ঘর মানায় নাকি? এই বোকাগুলোর সব হারানোর মড়াকান্না শুনে সল্টলেকের বাসিন্দা, বিধাননগর গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র অনুপম বোস ফোঁস করে বলে উঠল “শালা! বড় বড় কথা! কতগুলো জবরদখলকারী ভেবেছে কী? দিনের পর দিন সরকারি জমি দখল করে বসে থাকবে। আর কেউ ওদের কিছু বলতে পারবে না! বেশ হয়েছে!” হক কথা, অনুপম তো মিথ্যা কিছুই বলেনি। ছাত্র হিসাবে অবশ্য অনুপম মাঝারি মানেরই ছিল। পরে অবশ্য লোন-টোন নিয়ে কোনও এক বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করে এক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় বেশ বড়সড় চাকরি করছে। মাস গেলে লাখখানেকের ওপর রোজগার করে। বছরে একবার স্ত্রীপুত্র সমেত বিদেশে ছুটি কাটানো তো বাঁধা। নিউ টাউনে নাকি সে দারুণ ফ্ল্যাট কিনেছে। এই ছোটলোকগুলো জানে তাকে মাসে মাসে কত টাকার ইন্সটলমেন্ট ভরতে হয়? চাল নেই চুলো নেই যেখানে সেখানে বসে পড়লেই হল। বিধাননগর পৌরনিগমের কর্তাদের ধক আছে বটে। সামান্য কিছু ভোটের আশায় তারা এইসব ইতর সম্প্রদায়কে রেয়াত করেনি। অবশ্য সরকারি স্কুলে উন্নতমানের শিক্ষা বিনা পয়সায় নিতে না পারলে সে জীবনে এতদূর এগোতে পারত কিনা তা নিয়ে তার নিজেরই সংশয় আছে।

National Sample Survey Office (NSSO)-র এক সমীক্ষা অনুযায়ী দেশের ৬৮.৮ শতাংশ লোক এখনও গ্রামীণ এলাকায় বাস করেন। এদের মধ্যে ৬০ শতাংশ সরাসরি কৃষির সাথে যুক্ত যার বেশিরভাগই ক্ষুদ্র বা ভূমিহীন কৃষক। চাষে মন্দা, প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে কৃষিতে আরও বেশি বেশি করে কম শ্রম নিয়োজনের ফলে এদের বিপুল অংশ শহরে পাড়ি দেয় ছোটখাট কাজের সন্ধানে। হ্যাঁ, এরা কৃষিক্ষেত্রের ছাঁটাই শ্রমিক। এদেরই কেউ কেউ সকালে আমাদের রাস্তাগুলো পরিষ্কার করে, কেউ বাড়িতে ঘর মোছে, বাসন মাজে, কাপড় কাচে; কেউ এসে ময়লা নিয়ে যায়, কেউ বাজারে সবজি নিয়ে বসে, রাস্তায় চা নিয়ে বসে, রিকশা বা ভ্যান চালায়, ইত্যাদি। এদেরই বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয় হল শহরের রাস্তার ধারে, খালের পাড়ে, কালো বা নিল আধ-ছেঁড়া ত্রিপলের তলে। এরা উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা, মেদিনীপুরের বিভিন্ন গ্রাম থেকে শহরে আসে বাঁচার তাগিদে। এখান থেকে সম্ভবত এদের আর কোথাও ফেরার জায়গা নেই।

নাসিম আখতার সল্টলেকের করুণাময়ীর সামনে চায়ের দোকান চালাতেন। চা-বিস্কুট ঘুগনি-পাউরুটির জন্য বেসরকারি বাসের ড্রাইভার-কনডাক্টার, ফেরিওয়ালা, কুরিয়ার কোম্পানির ডেলিভারি ম্যান, এই অফিস থেকে ঐ অফিসে চিঠি নিয়ে যাওয়া পিওনদের ভিড় জমত তার দোকানে। দোকান চালিয়ে তার আয় হত মাস গেলে হাজার পনেরো টাকা। তাই দিয়ে ৬ জনের সংসার চালাতেন তিনি। মেজ ছেলেটা ভালো ফুটবল খেলত। সাধ্যমতো বুট, মোজা, জার্সি, প্যান্ট কিনে উৎসাহ দিতেন ছেলেকে। ছেলের খুব ইচ্ছা ছিল সামনে থেকে যুব বিশ্বকাপের খেলা দেখবেন। কিন্তু গত ২২ তারিখ বুলডোজারের ধাক্কায় সব তছনছ হওয়ার শোক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি। জানালেন “গোটা সল্টলেক জুড়ে মোট আড়াই-তিন হাজার হকার উচ্ছেদ হয়েছে। পুলিশ বলছে আবার বসার চেষ্টা করলে ভারি ভারি কেস দিয়ে ভেতরে চালান করে দেব।” গ্রামে যে ফিরে যাবেন তার কোনও উপায় নেই। মালদার পঞ্চানন্দপুর অঞ্চলে তার সামান্য যে কয়েক বিঘা চাষের জমি ছিল ১৯৯৮ সালে টানা ১৬ দিনের বৃষ্টিতে তার ভিটেমাটিসহ তা গঙ্গা গর্ভে বিলীন হয়েছে।

অথচ এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। বিশ্বকাপ মানে তো আমোদ-উৎসব-হইহল্লা করার কথা ভেবেছিলাম আমরা। কেন পুজোর আগে থেকেই চোখের জল ফেলতে ফেলতে নাকানি চোবানি খেতে হবে জীবিকাচ্যুত হকার ও অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষকে? বা অস্থায়ী ঘর বানিয়ে ছেলেপুলে-বাচ্চা কাচ্চা সামলে, ৮-১০ বাড়িতে কাজ করে সংসার চালানো মা-বোনেদের? ফুটবলের আন্তর্জাতিক নিয়ামক সংস্থা ফিফা তার ওয়েবসাইটে মানবাধিকার নীতিসংক্রান্ত দলিলে স্পষ্ট লিখেছে যে তারা সমস্ত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের সমর্থক এবং তাদের কোনও প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে যেকোনও ধরণের বেআইনি উচ্ছেদের বিরোধী। তাহলে বিশ্বকাপের অছিলায় এই তাণ্ডবলীলা কেন চলবে? নাকি এই গরীব লোকজনকে জীবন-জীবিকা থেকে উচ্ছেদ করার পেছনে অন্য কোনও স্বার্থ আছে?

ভারতের লোকসভা ২০১৪ সালে হকার সুরক্ষায় একটি আইন করেছে যাতে হকাররা নিরাপদে ব্যবসা করতে পারে। এই আইনে পরিষ্কার বলা আছে যে সকল হকারকে বসতে দিতে হবে কোথাও না কোথাও। বিধাননগরে এই আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অসহায় হকারদের চোখের সামনে বুলডোজারে তাদের জীবন জীবিকা ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের মাথায় রাখতে হবে শুধুমাত্র কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা এই পেশার সাথে যুক্ত তাই নয়, যতই ঝাঁ চকচকে নান্দনিক মার্কেট, মল বা শপিং কমপ্লেক্স তৈরি করা হোক না কেন ফুটপাতে হকারের কাছে এক বড় অংশের লোক যাবেই। বেশিরভাগ সাধারণ ক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক হচ্ছে হকারদের। কেন্দ্রীয় আইন অনুযায়ী টাউন ভেন্ডিং কমিটি গঠন করতে হবে যারা সমীক্ষা চালাবে। সমীক্ষা চালাবার আগে এবং হকারি পরিচয়পত্র প্রদানের আগে কোনও হকারকে তার স্থান থেকে অন্যত্র সরানো বা উচ্ছেদ করা যাবে না। অর্থাৎ, কোনও অবস্থাতেই বলপূর্বক হকার উচ্ছেদ চলবে না।

গরীব ঝুপড়িবাসীকে উচ্ছেদের সপক্ষে কর্তৃপক্ষের সাফ যুক্তি যে যারা সরকারি জমি জবরদখল করে আছে তাদের যখন তখন বিনা নোটিশে তুলে দেওয়া যেতে পারে। তাদের চাল-ডাল খালে ফেলে দেওয়া যাবে, বাচ্চা, বয়স্ক, মহিলাদের ধরে বেধড়ক পেটানো যাবে। জল সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া যাবে, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যাবে। কারণ এরা নাকি বেআইনি জবরদখলকারী। কাজ নেই, খাওয়া-দাওয়া নেই, বাচ্চারাও অভুক্ত। বৃষ্টির মধ্যে ভিজে দিন কাটাচ্ছেন। প্লাস্টিক, জিনিসপত্র সব নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সনদ যেমন নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ কনভেনশন (Committee on the Elimination of all forms of discrimination against Women – CEDAW), জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন বিষয়ক সংস্থা (ECOSEC) বা বসবাসের অধিকার নিয়ে ইস্তানবুল কনভেনশন– সর্বক্ষেত্রে পরিষ্কার বলা আছে যে কোনওরকম বলপূর্বক উচ্ছেদ করা তো যাবেই না, রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে যাতে প্রতিটি মানুষের মাথায় ঠিকঠাক ছাদ থাকে। আমাদের দেশের সংবিধানের ২১ নম্বর ধারাও সেকথা বলে।

কোনও অবস্থাতেই উচ্ছেদ করা যাবে না এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে যারা সরকারে এসেছিলেন, তাদের এই হীন কাজ অত্যন্ত বিপজ্জনক ও নিন্দাজনক। বিকল্প জীবিকা বা বাসস্থানের ব্যবস্থা না করে এই জুলুমবাজির বিচার কে করবে? রাষ্ট্রের উচিত এই অমানবিক উচ্ছেদ বন্ধ করে প্রত্যেককে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। বিশ্বকাপ হওয়া খুব ভালো কিন্তু গরীব মানুষের পেটে লাথি মেরে কখনওই নয়। এর বিরুদ্ধে কথা না বললে রাষ্ট্রশক্তির গরীব মানুষের বিরুদ্ধে এই আস্ফালন শুধু সেখানেই থেমে থাকবে না। এই আক্রমণ আমাদের সবাইকে গ্রাস করবে বিভিন্ন ভাবে। শিকেয় তুলবে আমাদেরও জীবন-জীবিকা।

রাষ্ট্রের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা আর তাদের তাঁবেদারি করা কেষ্টবিষ্টুদের অনেক গুণের মধ্যে একটা ভাল গুণ হল তারা ভুলে যান যে আজ হাজার হাজার লোককে তারা উচ্ছেদ করছেন বটে কিন্তু কাল কোটি কোটি লোক তাদের উচ্ছেদ করবে। আমরা তাদেরই উচ্ছেদ হওয়ার আশায় থাকব।