ফিফা অনূর্ধ্ব সতেরো বিশ্বকাপ: আমরা কী পেলাম, কী পেতে পারি — কিছু ভাবনা

সৌম্যদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়


০৬-১০-১৭ তারিখটা আমরা মনে রাখব। বিশ্বকাপ ফুটবলে চিরকাল সোনালি বা নীল সাদা দলকে সাপোর্ট করতে অভ্যস্ত সব গলাগুলো আজ মাঠে ভারতের খেলোয়াড়দের সাথে গলা মেলাচ্ছে পারফেক্ট স্কেলে। গ্যালারিতে জাতীয় পতাকার নাচ আর তারপর খেলা শুরু! স্কোরবোর্ডে অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপে ভারত বনাম আমেরিকা আর একদিকে কানায় কানায় ভর্তি স্টেডিয়াম। এমনকি যুবভারতী আরও যুবক হয়েছে, এখন তার পোশাক-আশাক বিশ্বমানের। বলে পায়ের প্রথম চুম্বনের সাথেই আমার মতো অনেকের কাছে স্বপ্নপূরণ। সিনিক কাকুর– আরে য্যা য্যা, খেলা হত বটে আমাদের সময়– আন্ডার সেভেনটিনও নাকি ওয়ার্ল্ড কাপ, গুগল ভাইয়ের মতে– আরে, ভারত তো ১৯৫০-এ বিশ্বকাপ খেলেই ফেলত শুধু ভারতীয়রা খালি পায়ের বদলে বুট পড়ে খেলতে চায়নি (অভ্যেস না থাকলে সরাসরি ম্যাচে বুট পড়ে নামলে কী হয় তার কৌতুকাবহ দৃশ্য ‘পান সিং তোমার’ সিনেমাটিতে আপনারা নিশ্চয় দেখেছেন) ইত্যাদি ফাউ জ্ঞান, মানে ম্যাচের আগের যাবতীয় সব ঝুটঝামেলা আপাতত অতীত। আমরা চোখ বিস্ফারিত করে দেখতে থাকি সবুজ ম্যাজিক কার্পেটের পরতে পরতে এগারো ভারতীয়ের এক মরিয়া লড়াই। শেষ পর্যন্ত তবুও হয়ে ওঠে না। রেজাল্ট ০-৩। পরের ম্যাচ কলম্বিয়া, আমরা আবার আশায় বুক বাঁধি। খেলা শুরু হবার পর থেকেই প্রায় সমানে সমানে টক্কর এমনকি ১ গোল খাবার পরেও লড়াকু ভারত, আর তখনই ঘটে গেল সেই ঘটনা যাকে বলে কিনা মাইলস্টোন। বক্সে মিডফিল্ডার জিকসন সিং-এর নিখুঁত হেডে বল জড়িয়ে গেল বিরুদ্ধের জালে। বিশ্বকাপে ভারতের হয়ে প্রথম গোলদাতা হিসেবে তাঁর নাম উঠে এল রেকর্ড বুকে। প্রত্যাশার পারদ তো এভাবেই চড়ে। এবারে কি তাহলে, প্রথম পয়েন্টও আসবে? রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করি। তীরে এসে আবার তরী ডোবে, অনভিজ্ঞতার সুযোগে প্রায় সাথে সাথে কাউন্টার অ্যাটাকে গোল করে যায় প্রতিপক্ষ। এর পরের ম্যাচ, ঘানার সাথে। দাঁড়াতেই পারলাম না আমরা। তিন ম্যাচ শূন্য পয়েন্ট নিয়ে পরের রাউন্ডে ওঠার স্বপ্ন শেষ, যে স্বপ্ন সত্যি হবে কেউই কল্পনা করিনি। কিন্তু তবুও এটুকু বোঝা গেল যে যতই আয়োজক কোটায় খেলি না কেন আমরা কিন্তু সিনে আছি। ফিফা র‍্যাঙ্কিং-এও দু’স্থান এগোনো গেল, ১০৭ থেকে ১০৫। লুইস নর্টন দি মাতোর কোচিং-এ খেলা টিম প্রশংসা পেল এমনকি প্রতিপক্ষ কোচদের থেকে, গোলকিপার ধীরাজকে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানাল ৫০ হাজার দর্শক – রয়ে গেল স্মৃতির মণিকোঠায় চির উজ্জ্বল হয়ে থাকা কিছু মুহূর্ত। আমাদের জীবৎকালে এক অনাস্বাদিত উৎসাহ দেখা গেল দেশের ফুটবল ঘিরে যা এতদিন আমরা শুধু ক্রিকেট ঘিরেই দেখেছি। প্রচুর পোস্টারও পড়ল চারিদিকে, একদিন না একদিন আমরা কাপ জিতবই এই মর্মে।

এই প্রত্যাশা থেকেই শুরু হয় দ্বিতীয় পর্যায়, যেটা ১০৫ থেকে ১ বা নিদেনপক্ষে ১০ হবার পথে যাত্রা শুরু। কিন্তু তাহলে আমাদের এই সাম্প্রতিক ম্যাচ ছেড়ে যেতে হবে একটু পিছনের দিকে, কয়েকটা অপ্রিয় প্রশ্নের মুখে। যেখানে এ আই এফ এফ বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রফুল্ল প্যাটেলের ২০২০-তে টার্ম শেষ হবার পরে কী হবে সে ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত নয়, সেখানে এই ধন্য আশা কি শুধুই কুহকিনী? দেখা যাক!

সবার প্রথমে স্বপ্নপূরনের পথে যে কাঁটা সেটা হল, সমস্ত স্পোর্টস-উন্নত দেশে যে বয়সে ছেলেমেয়েরা ফুটবল খেলা শুরু করে এবং প্রাথমিক কোচিং শুরু হয় সেটা হল ৫-৬, আমাদের এখানে যেটা ১৩-১৪ বছর। এই যে শুরুতেই ৭-৮ বছরের পার্থক্য, সেটাকে অতিক্রম করা পরে আর সম্ভব হয় না। তাই আমরা দেখতে পাই, যাকে স্পোর্টস-এর ভাষায় বলে কয়েক প্রজন্মের তফাত। ভারতের সিনিয়র টিমের প্রাক্তন কোচ স্টিভেন কনস্ট্যানটাইন ২০১৫-তে এই কথাগুলো বলেছিলেন, দুঃখের ব্যাপার এই ব্যপারটা এখনও একই রকম সত্যি। ফেডারেশন-এর তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বর্তমান টিমের পিছনে। কিন্তু এইরকমভাবে একটা ছোট গ্রুপের ওপর যত টাকাই খরচা করা হোক না কেন, তা বিফলে যাবে যদি না সেই টাকাটা ব্যবহার করা হয় প্রাথমিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে। এখন ব্যাপারটা, আমার পরীক্ষার প্রস্তুতির মতো, সারা বছর কোনও বই-এর সাথে খোঁজখবর না রেখে যদি পরীক্ষার আগে হঠাৎ সব সাবজেক্টের টিচারও নিয়ে আসা হয়, আদতে ফল খুব ভালো কিছু হবে কি?

দ্বিতীয় সমস্যা কর্পোরেট পরিভাষায় কোনও লং টার্ম প্ল্যান না থাকা। অর্থাৎ দূরে দেখতে না চাওয়া। যেখানে এখনও আমরা পরের বছর আই লিগ হবে কিনা সে ব্যাপারে জানি না, সেখানে জাপানে এই মুহূর্তে পরবর্তী ১০০ বছরের ফুটবল লিগ এবং সেই সংক্রান্ত প্ল্যানিং আঁকা হয়ে গেছে। লুইস অনূর্ধ্ব সতেরোকে পরের দু’বছর কোচিং করিয়ে অনূর্ধ্ব উনিশ টুর্নামেন্ট-এর প্রস্তুতি নেবেন, ফেডারেশনও বিপুল ইনভেস্টমেন্টের জন্য তৈরি, কিন্তু তাতে আদতে ফল কী হবে তা এখনও পরিষ্কার নয়। কোন কোন প্লেয়ার কন্ট্রাক্ট নেবেন সেটার ছবিও ঝাপসা। এর সাথে যে অন্যান্য খরচা যেমন বিদেশে টুর্নামেন্ট খেলতে যাওয়া ইত্যাদির ব্যবস্থা কীভাবে হবে তা নিয়ে এখনও কোনও পরিকল্পনা নেই। এবারে এখানে এত খরচা করা যদি হয়ও, অন্য জায়গায় ইনভেস্ট করার জন্য কিছু পড়ে থাকবে কিনা সে প্রশ্নও উঠে আসছে, বিশেষত যেখানে গত চার বছরে ভারতীয় মহিলা ফুটবল দল একটিও আন্তর্জাতিক ফ্রেন্ডলি খেলেনি।

এ আই এফ এফ-এর হেড অফ প্লেয়ার ডেভেলপমেন্ট রিচার্ড হুড সম্প্রতি বেবি লিগ চালু করার কথা ভেবেছেন। কিন্তু, সারা ভারতে যতক্ষণ না এইরকম প্রোগ্রাম বানানো হচ্ছে, এর যৌক্তিকতা নিয়ে রিচার্ড নিজেই সন্দিহান। কারণ সারা ভারতে ৬-১০ বছরে যে বিপুল শিশু সংখ্যা আছে, তাদের মধ্যে প্রকৃত স্পটিং (খেলোয়াড় খুঁজে বের করা) এবং বাকি পরিকাঠামো যেমন স্পোর্টস মেডিসিন, খাবার, আধুনিক যন্ত্রপাতি দেবার মতো ব্যবস্থা এখনও আমরা বানাতে পারিনি। সুতরাং এটাও কদ্দূর হবে, কীভাবে হবে তার ব্লু-প্রিন্ট এখনও সম্পূ্র্ণ নয়।

পরিশেষে ভারতে এখনও ফুটবল মূলত নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত ঘরের খেলা। সেখানে চাকরির এবং একটা ন্যূনতম আর্থিক সঙ্গতি নিশ্চিত করার ক্ষমতা ভারতীয় ফুটবলের কতটা আছে, সেটাও দেখতে হবে। নইলে আবার আমাদের কাগজে পড়তে হবে যে প্রতিভাবান খেলোয়াড়কে দিন গুজরান করার জন্য অন্য পেশার সাহায্য নিতে হচ্ছে। সেই পেশাদারি পরিকাঠামো গড়ে তোলা আশু প্রয়োজন যদি আমাদেরকে অন্তত এশিয়াতেও একটি শক্তিশালী দল হিসেবে পরিচিত হতে হয়।

সেপ ব্লাটার ভারতের ফুটবল সম্বন্ধে নাকি ঘুমন্ত দৈত্য এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন। সেই দৈত্য এখনও ঘুমোচ্ছেই বলা চলে, খেলার মাঠে ভরা সমর্থক আর এরকম দু’চারটে আন্তর্জাতিক ম্যাচ এই ঘুম ভাঙ্গানোর জন্য যথেষ্ট নয়। আমাদের মতো দেশে যেখানে খেলাধুলোয় বাজেট আঙ্গুলে গোনা যায়, সেখানে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন কতটা সফল হবে তা কিন্তু লুকিয়ে আছে এরকম বহু প্রশ্নের ভিড়ে। তবুও তৃতীয় বিশ্বের মানুষ আশাবাদী, নীল জার্সির জন্য ভরা ফুটবল মাঠে আবার আমরা ভারতীয় ঢেউ তুলতে প্রস্তুত। শুভেচ্ছা ভারতীয় ফুটবল।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4066 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...