ডি এন এ-র ব্যর্থতা? কথনে ব্রুস অ্যালবার্টস

তিষ্য দাশগুপ্ত

ক্লাস থ্রিয়ের ছোট্ট তিয়াস, কিংবা ফাইভের অন্তরা, একঘেয়ে পড়া ওদের ভালো লাগে না আর– এটা একটা ভালো লাগার জিনিস হল? কী আছে বিজ্ঞানে, সুদেষ্ণা আন্টি গড়গড় করে পড়িয়ে যান ক্লাসে– মুখস্থ করে নিলেই হল, বোরিং বোরিং বোরিং! বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে এম এস সি পাশ করা সুদেষ্ণার অজানা নয় জিশান কেন সাইন্স ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়ে, গত সপ্তাহের স্মৃতিটা এখনও টাটকা– বাগানে গিয়ে বাচ্চাদের প্রজাপতির গুটি দেখানোর ফল, বড়দির ঘরে তলব, গার্জিয়ানরা নাকি কমপ্লেন করেছেন ম্যাম পড়ান কম, বাচ্চাদের নিয়ে বাগানে ঘোরেন বেশি। অতএব, ব্যাক টু টেক্সটবুক, হোক না হয় “বোরিং, মুখস্থ করে নিলে অন্তত নম্বর তো আসে পরীক্ষায়!”

‘A third grade student comes home from school and tells his mother: – “now I get it, science is just like spelling; you just need to memorize it and it doesn’t make any sense.”‘

এই দুঃখের গল্প শোনাচ্ছিলেন ঊনআশি বছরের তরুণ মার্কিন প্রফেসর ব্রুস অ্যালবার্টস, গত সপ্তাহে, প্রেসিডেন্সির বেকার হলে তখন তিল ধারণের স্থানমাত্র নেই।

কে এই ভদ্রলোক? খামোখা তাঁকে নিয়ে ভাবব বা লিখতে যাবই বা কেন চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের লোকালে? সাম্প্রতিক কোনও ঘটনায়, কাগজে, টিভিতে এই নামটা শোনাও তো লাগছে না, তাই না? তবে? চলুন তবে পিছিয়ে যাই সেই বছর পঞ্চাশ ষাট আগে।

উনিশশো তিপ্পান্ন সাল, বিজ্ঞানী ওয়াটসন আর ক্রিক বানিয়ে ফেলেছেন ডি এন এ অণুর দ্বিতন্ত্রী গঠন। সমস্যা দেখা দিল অন্য জায়গায়, ডি এন এ অণুর প্রতিলিপিকরণ পদ্ধতি সম্পর্কে তখনও ধোঁয়াশা। ব্যাপারটা একটু খোলসা করে বলা যাক।

এতদিনে আমরা জেনে ফেলেছি আমাদের বংশগতির ধারক ও বাহক, জীবনের প্রবহমানতার মূল রহস্য লুকিয়ে চারখানি নাইট্রোজেন যৌগের combination-এর ওপর। অ্যাডিনিন, গুয়ানিন, থাইমিন আর সাইটোসিন, সংক্ষেপে A, T, G, C। এই চারখানি নাইট্রোজেন যৌগের সমাহারে তৈরি হয় নিউক্লিওটাইড, যা ডি এন এ-র মূল উপাদান। এই ডি এন এ-ই প্রাণীদের বংশানুক্রমিক বৈশিষ্ট্যগুলিকে বহন করে নিয়ে চলে বাপ-পিতেমো থেকে নাতিপুতিদের অন্দরমহলে। বাড়ির ছোট্ট বাচ্চাটার গালখানি টিপে আমরা বলি, “ওমা, এক্কেবারে মায়ের মুখটা বসানো”। তো এই ডি এন এ দাদু থেকে বাবা থেকে নাতি অব্দি পৌঁছতে গেলে পরিমাণে বাড়ানো দরকার। ডি এন এ কি কম পড়িয়াছে? কোই পরোয়া নেহি, হাল্লার রাজার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন প্রফেসর আর্থার কোর্নবার্গ, এনে দিলেন এনজাইম পলিমারেজ– কিন্তু সমস্যা এত সহজে মেটার নয়। দ্বিতন্ত্রী অণুর একখানি বাহুর রেপ্লিকা বানাতে পারে পলিমারেজ, কিন্তু আরেকটি? এক হাতে তো তালি বাজে না! হার্ভার্ডে আসা থেকেই এই সমস্যাটা ভাবায় ব্রুসকে। শেষমেশ পল ডোটির কাছে স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ মেলে, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরশিপ মেলে প্রিন্সটনে, নিজের সীমিত সামর্থ্যে আবিষ্কার করে ফেলেন T4 নামক ব্যাক্টেরিওফাজ, যা মূলত এক প্রকার ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার যম। এই T4 ফাজে পাওয়া গেল বেশ কিছু জিন, যার থেকে ব্রুস পেলেন T4 পলিমারেজ– খুব সহজ ভাবে বলতে গেলে দু’খানি পলিমারেজ সাথে অন্যান্য নানান ফ্যাক্টর জোট বেঁধে রেপ্লিকেট করে একখানি দ্বিতন্ত্রী ডি এন এ অণুকে, এ গল্প বিশদে অন্য একসময় করা যাবে খানিক।

এক হাতে তো তালি বাজে না! চাই দুটি পলিমারেজ।

বায়োফিজিক্সে পি এইচ ডি ফেল ছাত্র ব্রুসকে নতুনভাবে চিনল দুনিয়া। নিজের ব্যর্থতা থেকে নতুন শিক্ষা নিলেন তিনি, শিখলেন প্রশ্ন করতে…আর দুনিয়া দেখল এক হার না মানা নাছোড় বৈজ্ঞানিককে– পরবর্তীকালে নানা সম্মানীয় পদ অতিক্রম করে যিনি হবেন বিখ্যাত জার্নাল “সায়েন্স”-এর এডিটর-ইন-চিফ, সাফল্যের সঙ্গে সামলাবেন National Academy of Science-এর প্রেসিডেন্টের গুরুদায়িত্ব।

“Molecular Biology of THE CELL. 5 th Edition”…. একরাশ রঙিন স্বপ্ন ছিল পি এইচ ডি করার, কিন্তু ভগবানের মার! আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে গেছে স্কুলের এই চাকরি, তবু মাঝে মধ্যে হাত চলে যায় লালরঙা বইটার দিকে। তামাম দুনিয়াকে সেল বায়োলজি শেখানো “THE CELL” এর লেখক ব্রুস অ্যালবার্টস আসছেন প্রেসিডেন্সিতে, লেকচার দিতে! শুনে অব্দি দিন গুনতে থাকে সুদেষ্ণা– বায়োলজি পড়তে শেখালেন যিনি, ভালোবাসতে শেখালেন যিনি, এহেন মানুষকে সামনে থেকে দেখতে পাবে, এই রোমাঞ্চেই রোমকূপ খাড়া হয়ে যায় ওর। সায়েন্স কলেজের জিনিয়া ম্যামের ল্যাবে দিঠি, তপতী, সৌনকদেরও একই অবস্থা– নিশ্চয়ই নতুন কিছু জানা যাবে ওঁর থেকে, টিস্যু কালচার নিয়ে কাজ করে ওরা, এরকম সুযোগ বারবার আসে না।

দুনিয়াকে বায়োলজি শেখালে যে বই!

নির্দিষ্ট দিনে একটু আগেই পৌঁছে যায় সুদেষ্ণা প্রেসিডেন্সিতে, প্রায় অর্ধেক কলকাতা উঠে এসেছে যেন আজ। ভিড়ভাট্টা গণ্ডগোলের মাঝে কোনওভাবে ডিরোজিও হলের একটা চেয়ার দখল করে নেয় ও, ঘড়িতে প্রায় পৌনে এগারো ছুঁই ছুঁই।

কাঁটায় কাঁটায় এগারোটায় হলে প্রবেশ করলেন সৌম্যদর্শন পক্ককেশ মানুষটি, সামান্য সৌজন্য বিনিময় ও পরিচিতির পর পোডিয়ামে উঠলেন ব্রুস অ্যালবার্টস, বক্তব্যের বিষয় “learning from failure: Life as an education”, বাইরে তখন অসংখ্য মানুষের ভীড়, বিবিধ বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্রছাত্রী, গবেষক, শিক্ষক….প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ হলে জায়ান্ট স্ক্রিনে অডিওর ব্যবস্থা করে উঠতে পারেনি প্রেসিডেন্সি “ইউনিভার্সিটি”, একটু পর ব্রুস শেখাবেন সামান্য সদিচ্ছা ও সচেতনতা থাকলে সীমিত পরিকাঠামো নিয়েও বিজ্ঞান ও কারিগরিচর্চার চরম উৎকর্ষতায় পৌঁছানো যায়, তফাত শুধু মানসিকতায়।

তিনটি অংশে বিভক্ত প্রেজেন্টেশনের প্রথম পর্যায়ে তখন সদ্য প্রিন্সটনে চাকরি পেয়েছেন ব্রুস, পয়সাকড়ি নেই, মায় থাকার নির্দিষ্ট জায়গাটাও নেই, স্ত্রী বেটি এবং এক বছরের শিশুকে নিয়ে হোটেলে উঠেছেন প্রফেসর। গবেষণা করার পর্যাপ্ত টাকা নেই, তার উপরে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ল্যাবরেটরিতে তাঁর একমাত্র সহকারী বিশেষ দড় নয়, সহযোগী নির্বাচনে ভুল, আবার ব্যর্থতা জীবনে। কোলকাতা শহর অবাক চোখে দেখে এক লৌহমানবকে– নিজের ব্যর্থতা থেকে যিনি নিলেন জীবনের পাঠ, বুঝলেন যে কোনও কাজের আগে চাই সঠিক পরিকল্পনা, সে গবেষণাই হোক কিংবা চিত্রকলা, আর দরকার পড়াশোনা, অগাধ পড়াশোনা। মনের ভেতরে কোথাও যেন কাঁটা বেঁধে সুদেষ্ণার, এত সহজে হাল ছেড়ে দিল সে? শেষবারের মতো একবার আবার নেট পরীক্ষাটা দিয়ে দেখবে নাকি?

পি এইচ ডি ফেল, এই তব বিদ্যে ছি!

মঞ্চে রূপকথার জাদুকর তখন শোনাচ্ছেন তার আশ্চর্য জীবনকাহিনী! কী অবলীলাক্রমে অকপটে বলতে পারেন তিনি, হ্যাঁ আমি জীবনে ব্যর্থ হয়েছি অনেকবার, আর শিখেছি আরও অনেক বেশি। দেখতে দেখতে আত্মপ্রকাশ ঘটে সেই পৃথিবীবিখ্যাত বই “THE CELL”-এর, আলোড়ন পড়ে যায় সর্বত্র, এত সহজ, এত সাবলীল, জীববিদ্যার আনাচে-কানাচে এত স্বচ্ছন্দ বিচরণ!

সাফল্যের সোপানে উঠতে উঠতে একসময় তিনি সরকারের একজন সায়েন্স পলিসি মেকার, নতুন কমিটি গঠিত হল– হঠাৎ অভাবিত প্রস্তাব, “National Science Academy-র প্রেসিডেন্ট পদে আপনার চেয়ে যোগ্যতম কেউ নেই প্রফেসর।” “সায়েন্স” ম্যাগাজিনের সাথে সাথে একাডেমির কাজ, বিজ্ঞানী হলেন শিক্ষাবিদ, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রশাসন হাতে হাত ধরে চলতে লাগল নতুন উদ্যমে। ব্যর্থতা পিছু ছাড়ে না সহজে, একাডেমিকে ঢেলে সাজালেন তিনি– কিন্তু কর্মসংস্কৃতি বদলানো গেল না, উপায়ান্তর না দেখে এগিয়ে এলেন বন্ধুরা, ব্রুস শিখলেন জীবন থেকে– তোমায় হতে হবে অকুতোভয় এক অধিনায়ক, যে ঝুঁকি নিতে পিছপা হয় না, নেতৃত্ব দিতে হবে সামনে থেকে, লক্ষ্য যার অবিচল, দুই পাশে যোগ্য অনুচর– জীবনের যেকোনও ক্ষেত্রে যে শিক্ষা সমানভাবে প্রযোজ্য।

সবার জন্য বিজ্ঞান!

বিমুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে সুদেষ্ণা, বিজ্ঞানী এখন বহু পথ পেরিয়ে প্রশাসক, দেশে দেশে শিক্ষার দূত হয়ে ঘুরে বেড়ান তিনি– তবু এখনও কী তাঁর রসবোধ, তীব্র স্যাটায়ারে বিদ্ধ করেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। আসলে বিজ্ঞানের কোনও সীমানা হয় না, বিজ্ঞানীকে দেশের গণ্ডিতে আবদ্ধ করা যায় না। ব্রুস বলতে থাকেন আসলে প্রয়োজন বিজ্ঞানমনস্কতার। বিজ্ঞানমনস্ক দেশ কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তির হাত ধরে এগিয়ে যেতে পারে বহুদূর, নিজের তাগিদে, ইচ্ছায়। আদর্শ ক্লাসরুম হবে মুক্ত, একঘেয়ে বোরিং লেকচারের বদলে গল্পচ্ছলে আলোচনার মধ্যে দিয়ে সমস্যার সমাধান করবে ছাত্রছাত্রীরা, ছোটবেলা থেকেই নীরস পুঁথির বাইরে বেড়িয়ে হাতেকলমে বিজ্ঞান শেখাবে স্কুল, অজান্তেই যেন লজ্জায় মাথাটা হেঁট হয়ে আসে সুদেষ্ণার। বৃদ্ধ বিজ্ঞানী বলে চলেন ভারতবর্ষের গ্রামের কথা, কৃষির সাথে বিজ্ঞানের মেলবন্ধন এনেছে বিপ্লব। স্বনির্ভর হচ্ছেন মহিলারা, ব্যাঙ্ক ছোট ছোট কিস্তিতে ধার দিচ্ছে অল্প সুদে। উন্নত দেশের স্বাভাবিক কর্তব্যবোধের তাগিদে দক্ষিণ ভারতের গ্রাম থেকে ইন্দোনেশিয়ার প্রান্তর চষে বেড়ান আশি বছরের তরুণ ব্রুস, হাতে সান্তাক্লজের ঝুলি আর একঝাঁক দামাল স্বপ্ন নিয়ে। তৈরি করতে হবে এক মেধাভিত্তিক সমাজ, পরিমাণ নয়, গুণই যেখানে শেষ কথা… বিজ্ঞান নিয়োজিত হবে কাল সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে মানবকল্যাণে, উঁচু নিচু ছোট বড় সীমানা পেরিয়ে….

চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসে যেন সুদেষ্ণার– প্রেসিডেন্সির চরম অব্যবস্থা, উপাচার্যের সীমাহীন ঔদ্ধত্য, সমস্ত রাগ ক্ষোভ যেন ব্লটিং পেপারের মতো শুষে নেন ভিনদেশী এক মহাজীবন, আহা সত্যিই তো, কী সরল সোজা কথাগুলো, শুধু বদল দরকার ভাবনার, একটুখানি ইচ্ছে আর একবুক বিশ্বাসের– হ্যাঁ, আমরাও পারি। আবার এসো ব্রুস, শিখব আমরা আরও, শুনব তোমার গল্প গোল হয়ে ঘিরে বসে… ধীরে ধীরে শান্ত পদে এগিয়ে আসেন সৌম্যকান্তি মানুষটি, মঞ্চে তখন ভেসে উঠছে লুই পাস্তুরের সেই বিখ্যাত বাণীটি,

“Science knows no country, knowledge belongs to humanity. It’s the torch that illuminates the world.”

একবার থমকে, শান্ত অথচ দৃপ্ত পদক্ষেপে বেরিয়ে যান ব্রুস অ্যালবার্টস, নিস্তব্ধ চোখে তাকিয়ে দেখে কলকাতা!

এ ছবি স্পষ্ট নয়, কেঁপে যাওয়া… হয়ত ম্যাগাজিনের পাতায় দেবার উপযুক্ত নয়, তবু তিনি তো অন্যরকম
ভাবতে শেখান! সেদিন, প্রেসিডেন্সিতে… মানুষের মাঝে…

১৩ ই অক্টোবর, ২০১৭ প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর ব্রুস অ্যালবার্টস এর “learning from failure: Life as an education” শীর্ষক সম্পূর্ণ সম্পূর্ণ বক্তৃতা

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4066 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

4 Comments

  1. অনেক চেনা মানুষের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তোমার প্রবন্ধে। খুব ভালো লাগলো। তোমার কলম চলতে থাকুক….. পরের সৃষ্টির অপেক্ষায় রইলাম….

আপনার মতামত...