Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

বাঙালির বেশ কয়েকটি প্রজন্মকে কমিকস পড়তে শিখিয়েছেন তিনি

নারায়ণ দেবনাথ | চিত্র-সাহিত্যিক

অর্ক পৈতণ্ডী

 



লেখক, শিল্পী, গ্রাফিক-আর্টিস্ট

 

 

 

 

২০০২ সাল। তখন আমি দেব সাহিত্য কুটিরে ইলাস্ট্রেটর হিসেবে কাজ শুরু করেছি। বয়স ষোলো। ‘ছেলেমানুষ’ বলে নবকল্লোল গল্পে আঁকতে দেওয়া হত না। ওটা ‘বড়’দের বই। যাই হোক দিব্যি কাটছিল দিনগুলো। সকালের ট্রেন ধরে বোলপুর থেকে কলকাতায় আসতাম। আঁকা জমা দিয়ে, নতুন গল্পের পাণ্ডুলিপি নিয়ে ফিরতাম আঁকার জন্য।

দেব সাহিত্য কুটিরের অফিসটা ছিল স্বপ্নপুরীর মতো। বিখ্যাত সব লোকেদের আনাগোনা সেখানে। প্রিয় লেখকদের পাণ্ডুলিপির দেখা মিলত এ-টেবিলে ও-টেবিলে। তেমনই একবার হাতে নিয়ে দেখার সুযোগ হয়েছিল নারায়ণ দেবনাথ-এর হাতে আঁকা ‘বাটুল দি গ্রেট’-এর দুটো পাতা। পাতা দুটো হাতে পেয়ে রীতিমতো লাফিয়ে উঠেছিলাম। উনি কি আজই এসেছিলেন পাতাগুলো জমা দিতে? হয়তো আর কিছুক্ষণ আগে এলেই বাংলা কমিক্সে‌র ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত সামনাসামনি। তখন শুকতারা-নবকল্লোলের সম্পাদনার কাজ সামলাতেন শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়।

তাঁকে একদিন জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, নারায়ণ দেবনাথ আঁকা জমা দিতে কবে আসেন?”

শান্তিবাবু বললেন, “উনি আসেন না। আমাদের লোক গিয়ে ওঁর বাড়ি থেকে আঁকা নিয়ে আসে।”

আমি হতাশ। আমার মুখ দেখে শান্তিবাবু বললেন, “কেন? কী ব্যাপার?”

আমি বললাম, “না… মানে… ওঁর সঙ্গে একটু কথা বলতাম। আমি ছোট থেকেই ওঁর ভক্ত।”

শান্তিবাবু বললেন, “কথা বলবি তো ফোনে কথা বল না। নারায়ণবাবুর ফোন নম্বর কি আছে তোর কাছে?”

আমি দুদিকে ঘাড় নাড়লাম। শান্তিবাবু তাঁর লাল রঙের লম্বাটে টেলিফোন খাতাটা বের করে বললেন, “লিখে নে।”

শান্তিবাবুর টেবিলে চিরকুট থাকত। তারই একটা টেনে নিয়ে নম্বরটা লিখে ফেললাম। কিন্তু এবার অন্য চিন্তা।

শান্তিবাবু বললেন, “কী হল আবার?”

আমি একটু ইতস্তত জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা… উনি কি খুব রাগী মানুষ? মানে ফোন করলে যদি আবার…”

শান্তিবাবু বললেন, “আরে না না। উনি খুব ভালো মানুষ। তুই নির্দ্বিধায় ফোন করতে পারিস।”

ঠিক তার পরদিনই ফোন করলাম। এখনও মনে আছে ফোনটা উনি নিজেই ধরেছিলেন। কিন্তু শুরুতেই ধাক্কা। আমি যেই না বলেছি শুকতারায় ছবি আঁকি, অমনি জিজ্ঞেস করে বসলেন, “কোন সংখ্যায় বেরিয়েছে তোমার আঁকা?” আমি কিঞ্চিত দমে গেলাম। শুকতারায় গল্প মনোনীত হওয়ার পর প্রকাশিত হতে দেরি হত। গল্প প্রকাশিত হবে তবে না তার সঙ্গে ইলাস্ট্রেশন যাবে! সুতরাং ততদিনে বেশ কয়েকটা ইলাস্ট্রেশন জমা দিয়ে রাখলেও তা প্রকাশিত হয়নি। শুকনো গলায় সে-কথা তাঁকে জানালাম। শুনে উনি বললেন, অত চিন্তার কিছু নেই। একটু দেরি হতে পারে। তবে ঠিক প্রকাশিত হবে।

সেদিন আরও অনেক কথা হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আপনার তৈরি এতগুলো চরিত্র, তার মধ্যে আপনার প্রিয় কোনটা?”

উনি বললেন, “বাঁটুল।” তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “আর তোমার?”

আমি বিন্দুমাত্র না ভেবে উত্তর দিলাম, “কেল্টুদা।”

উনি ঘবড়ে গিয়ে বললেন, “অ্যাঁ! সে কী! তুমি কেল্টুর ভক্ত? তুমি তো সাংঘাতিক ছেলে হে!”

এরপর বহুবার ফোনে কথা হয়েছে। ২০১১ সালে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে আসার পর আলাপ হল শান্তনু ঘোষের সঙ্গে। সে তখন সম্পাদনা করছে নারায়ণ দেবনাথ কমিকস সমগ্র। তার বাইকে চড়ে মাঝে-মাঝেই চলে যেতাম নারায়ণজেঠুর বাড়ি। অনেক গল্প হত। কিন্তু সেই প্রথম দিন বলা ‘তুমি তো সাংঘাতিক ছেলে হে!’ কথাটা আজও স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।

নারায়ণ দেবনাথ-এর জন্ম ১৯২৫ সালে হাওড়া-র শিবপুরে। ছোট থেকেই তিনি ছিলেন মুখচোরা, লাজুক স্বভাবের। পড়াশোনা করতে তেমন ভালো লাগত না, ঝোঁক ছিল ছবি আঁকার প্রতি। অবসরে বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে সাঁতরে গঙ্গা পার হতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে প্রশিক্ষণ নেন। সেটা গত শতাব্দীর চল্লিশের দশক। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি। আর্ট কলেজ থেকে বেরিয়ে তিনি ছোটখাটো আঁকার কাজ পেতে শুরু করলেন— পাউডার, আলতা ও সিঁদুর-এর বাক্সের লোগো, লেবেল ও ডিজাইন করা— এইসব।

নারায়ণ দেবনাথ কমিকস করতে শুরু করলেন এর অনেক পরে, ১৯৬১ সালে। সাহিত্যিক বিমল ঘোষ (মৌমাছি)-এর সঙ্গে জুটি বেঁধে সাপ্তাহিক আনন্দমেলা-র জন্য তৈরি করলেন ‘রবি-ছবি’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলেবেলা নিয়ে কমিকস। পরে এটি প্রকাশ করে সর্বোদয় সাহিত্য প্রকাশন ১৯৬২ সালে। সেই হিসেবে বলা যায় এটিই নারায়ণ দেবনাথ-এর প্রথম প্রকাশিত কমিকসের বই।

ইলাস্ট্রেটর ও কমিকস শিল্পী হিসেবে শুরুর দিনগুলোতে নারায়ণ দেবনাথের অনুপ্রেরণা ছিলেন তখনকার দিনের বিখ্যাত শিল্পী প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়। গত শতাব্দীর পাঁচের দশকে হাঁদা আর ভোঁদা নামের দুই চরিত্রকে নিয়ে বেশ কিছু ছবিতে গল্প প্রকাশিত হয়েছিল দেব সাহিত্য কুটিরের বিভিন্ন বইয়ে। সেই কমিকসগুলিতে শিল্পী বা গল্পকার হিসেবে আলাদা করে কারও নাম থাকত না, সে জায়গায় কখনও কখনও থাকত একটি বোলতা-র ছবি। জানা যায়, এই ‘বোলতা’ আর কেউ নন, স্বয়ং প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়।

১৯৬২ সালে নারায়ণ দেবনাথ-এর উপর দায়িত্ব পড়ল এই চরিত্রদুটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। সেইমতো ১৩৬৯-এর আষাঢ় সংখ্যা শুকতারায় নবরূপে আত্মপ্রকাশ করল হাঁদা-ভোঁদা। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। শুঁটকি-মুটকি (১৯৬৪), বাঁটুল দি গ্রেট (১৯৬৫), পটলচাঁদ দ্য ম্যাজিশিয়ান (১৯৬৯), নন্টে-ফন্টে (১৯৬৯), বাহাদুর বেড়াল (১৯৮২), ডানপিটে খাঁদু আর তার কেমিক্যাল দাদু (১৯৮৩), পেটুকমাস্টার বটুকলাল (১৯৮৪)— নারায়ণ দেবনাথ তৈরি করে গেছেন একের পর এক মজাদার সব কমিক-চরিত্র।

একইসঙ্গে সিরিয়াস কমিকসও করেছেন পাল্লা দিয়ে। ১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসে দিলীপ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা গল্পে ও নারায়ণ দেবনাথ-এর ছবিতে গোয়েন্দা ইন্দ্রজিৎ রায়-এর আত্মপ্রকাশ ঘটল। কমিক্সে‌র নাম ‘রহস্যময় সেই বাড়িটা’। ১৯৭৫ সালে শুকতারার প্রচ্ছদে আবির্ভাব ঘটল গোয়েন্দা কৌশিক রায়-এর। কমিক্স— ‘সর্পরাজের দ্বীপে’।

তাঁর তৈরি বিভিন্ন চরিত্রগুলিকে নকল করে একসময় কমিকসের বই প্রকাশিত হয়েছে। সে-সব বইয়ে স্রষ্টার নামের জায়গায় লেখা থাকত ‘এন দেবনাথ’। বাংলায় আর কোনও কমিকস-নির্মাতার সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে কি না সন্দেহ। সুতরাং সহজেই অনুমান করা যায় স্রষ্টা ও তাঁর সৃষ্টি স্রষ্টার জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিল।

সেই ১৯৬১ সালে শুরু তারপর প্রায় ষাট বছর ধরে অক্লান্তভাবে কাজ করে গেছেন কমিকস, অলঙ্করণ ও প্রচ্ছদ‌শিল্পী হিসেবে। বাঙালির বেশ কয়েকটি প্রজন্মকে কমিকস পড়তে শিখিয়েছেন তিনি, শিখিয়েছেন কমিকস তৈরি করতে। নব্বই বছর পেরিয়েও সচল ছিল তাঁর তুলি। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই শেষ হল বাংলা কমিকসে‌র এক উজ্জ্বল অধ্যায়।


তথ্যঋণ- শান্তনু ঘোষ