Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

চরের মানুষ: ব্যবছিন্ন বাঙালির মনোভূমি বিশ্লেষণে এক অনিবার্য সংযোজন

সঞ্জীব নিয়োগী

 

সাতচল্লিশের ভারতভাগের ইতিকথা ভারতীয় বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যে স্থায়ীভাবে স্থান করে নিয়েছে। পাঞ্জাব আর বাংলা প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগী। দেশের ভৌগোলিক সীমা বদলে গেলে তার সুদূর প্রসারী ও গভীর ক্ষত একটি জাতির মনভূমিতে কত বহুরৈখিক প্রতিফলন রেখে যায়। বদলে দেয় বেঁচে থাকার পরিভাষা।

দেশভাগ ও তজ্জনিত দাঙ্গা, মানবগোষ্ঠীর হাহাকার ও বাস্তুহীনতা/বাস্তুবিপর্যয়/বাস্তুবদলকে কেন্দ্র করে বাংলায় বেশকিছু উল্লেখনীয় উপন্যাস ও গল্প রচিত হয়েছে। তৃষ্ণা বসাক রচিত আলোচ্য উপন্যাস “চরের মানুষ” একার্থে সেই ধারায় নবতর সংযোজন। আবার অন্যার্থে, এই উপন্যাস নিজ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এই ধারার মধ্যে আচমকা মাথা তুলে স্বতন্ত্র পরিচয়ে চিহ্নিত হতে চায়। এই স্বাতন্ত্র্যের কারণ উপন্যাসটির ডিকশন, ইন্টেনশন ও ন্যারেশন। যা রচনাটির সারবস্তুকে অন্যতর পরিভাষার আলোয় ফেলে চিনতে বাধ্য করে।

দেশভাগ ও পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অকথ্য দুর্দশা যেরকম নির্বিকার ও প্রি-ডিফাইন্ড যেকোনও পপুলার ইজমের বাইরে বেরিয়ে তথ্যভিত্তিক নিজস্ব উপলব্ধি জারিত ন্যারেটিভের আলোয় নিয়ে এসেছেন লেখিকা, তা নিরপেক্ষতা ও সাংস্কৃতিক দুঃসাহস ছাড়া সম্ভব ছিল না। সম্ভব ছিল না মুখস্থ বুলি পরিত্যাগ করার জেদ না থাকলে। … এই গ্রন্থ ব্যবছিন্ন বাঙালির চমকপ্রদ এক ডিকশন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

***

 

তাই তো কই মনা, মানুষের অঙ্গ কাইট্যা লইলে রক্ত পড়বে না? এও তো আরেকপ্রকার দ্যাশভাগ। এপারে বাপের ঘর, ওপারে শ্বশুরঘর।

…লিঙ্গ নির্বিশেষে মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক পরিকাঠামোয় দেশভাগের যে গভীরসঞ্চারি প্রভাব, তা উদ্বাস্তু মানুষ ও সমমর্মী হৃদয়ব্যতিরেক উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। “চরের মানুষ” নিজ বাসভূমি ও বদলে যাওয়া বাসস্থানের দোটানায় মানসিক আর শারীরিক— দুভাবেই “চর”-এর বাসিন্দা। এই উপন্যাসের বিন্যাস ও অভিপ্রায়ে আরও এক পরিভাষা নির্মাণের প্রয়াস পেয়েছেন লেখক; যেখানে নারীমানুষের চিরন্তন বাস্তুসঙ্কট অত্যন্ত মরমী সামাজিক সংরচনায় ও প্রেক্ষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এবং “দেশ”-এর ধারণা মানবী জীবনের নিরিখে আঁকা হয়েছে।

ভৌগোলিক সীমায় আবদ্ধ রাজনৈতিক গন্ডিবদ্ধ “দেশ” যেমন একটি মানবগোষ্ঠীর মনোজগতকে আচ্ছন্ন করে রাখে, সেখানে নারী-পুরুষের জীবন যেভাবে ব্যখা ও বিবেচনা পায়, একজন নারীমানুষের জীবনে “দেশ” শব্দের আরও কিছু অন্যতর মানে থেকে যায়। তাকে অবশ্যম্ভাবী ভাবে জন্মভিটা থেকে উৎখাত হতে হয় বিবাহের পর। সে আজীবন উদ্বাস্তু হয়ে থাকে। লেখক নারীর এই যন্ত্রণার সঙ্গে দেশভাগের যন্ত্রণাকে একই সঙ্গে মিলিয়ে দেন ও তুলনামূলক পরিসরে নিয়ে যান। নারী চিরজীবন “চরের মানুষ” হয়ে দিন কাটানোর ভবিতব্য নিয়ে বাঁচে।

***

 

উপন্যাসটি পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রেক্ষাপটে লেখা। প্রায় সম্পূর্ণ রচনাটি ‘টুনু’ নামের এক কিশোরীর চোখ দিয়ে দেশভাগ পরবর্তী সামাজিক পুনর্বিন্যাসকে বিবেচনা করতে চেয়েছে। আসলে টুনু তার প্রাক-কৈশোর/বালিকা বয়স থেকে যেমন যেমন ‘বড়’ হয়ে উঠছে, উপন্যাসের গতিপ্রকৃতি, কাহিনি ও ন্যারেটিভ তেমন তেমন আবর্তিত ও বিবর্তিত হতে থাকে।

টুনুর জন্ম সাত মাসে। তাকে অন্য বাচ্চাদের তুলনায় ‘হাবাগোব’ ভাবা হয়। সাতমাসে জন্মানো টুনু যেন আচমকা জন্ম নেওয়া পূর্ব পাকিস্তানের বিবেক। তার চারিদিকের হিন্দু মানুষ যখন একে একে ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছে, টুনুর মন কিন্তু নিদারুণ বিরূপ ইন্ডিয়ার প্রতি। ভাতের প্রতি অসম্ভব দুর্বল টুনু জানে, ইন্ডিয়ায় রাত্রে রুটি খেতে হয়, অনাহারে থাকতে হয়, বড় অনটন সেই দেশে। তার জন্মভূমিকে শরীর-মনের সমস্ত অণু পরমাণু দিয়ে ভালোবাসে টুনু।

উপন্যাসটি মানবতার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে। কিন্তু পড়তে পড়তে ও পাঠশেষে বিশেষ ভাবে একথা উপলব্ধি করতে হয় যে, আমাদের এযাবৎকালের সমস্ত স্কুলিং-এর বাইরে গিয়ে আখ্যানটি পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু সম্প্রদায়ের মন ও চোখ দিয়ে লিখিত। সাহিত্যের বাস্তবতায়, বহুবার এমন দেখা গেছে যে লেখক এক চাপিয়ে দেওয়া আদর্শের ভারে এত গভীরভাবে আক্রান্ত যে নবীন বিষয়কেও গতানুগতিক ন্যারেটিভের জাঁতাকলে ফেলে নিরাপদ থাকতে চান। তৃষ্ণা বসাক তাঁর আলোচ্য উপন্যাসে সেই অবস্থান থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে এসেছেন। এই বিষয়টি আমি বিশেষভাবে চিহ্নিত করতে চাই এই কারণে যে, লেখককে যদি সত্যদ্রষ্টা বলতে হয়, তাহলে তার প্রধান শর্ত, তাকে “পোলারাইজড নিরপেক্ষতা”র বাইরে বেরোতে হবে। দশক-শতকের রাজনৈতিক বুলিকে নিজের বিচারের নিরিখে যাচাই করতে হবে। আর এই কাজ অত্যন্ত মুন্সিয়ানা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে তৃষ্ণা করেছেন।

***

এই উপন্যাসে স্বাভাবিকভাবেই ছোট-বড় প্রচুর চরিত্রের সমাবেশ। লেখক চেষ্টা করেছেন সব চরিত্রের প্রতি তাদের গুরুত্ব অনুসারে ন্যায় করার। সামান্য কয়েকটি আঁচড়ে স্পষ্ট করে তুলেছেন একেকটি অপ্রধান চরিত্রের মৌলিক অভিপ্রায়।

নায়ক-নায়িকা বলে যদি কিছু থাকে এই উপন্যাসে তবে তা অমর ও টুনু। মন ও শরীর দুদিক দিয়েই দুজনে ভিন্ন মেরুর। অমর দরিদ্র পরিবারের স্বপ্ন-দেখা মেধাবী পুত্র। যে তার মাতার জেদে পরবর্তীকালে ডাক্তার হয়। টুনু সম্ভ্রান্ত ও সমৃদ্ধ পরিবারের মেয়ে, যে সাতমাসে ভূমিষ্ঠ হয়েছে ও লোকে তাকে হাবা ভাবে। টুনু সারাক্ষণ খেতে ভালোবাসে। ইন্ডিয়াকে একরকম ঘৃণাই করে। হিন্দু মুসলমান সম্পর্কে সে নিজস্ব কোনও সোচ্চার ধারণা পোষণ না করলেও, তার মনে বিদ্বেষ নেই। এদিকে অমর মনে করে এই দেশ আর হিন্দুদের নেই। দেশভাগের সময় হয় হিন্দুদের উপর অকথ্য অত্যাচার করে এবং অধিকাংশ হিন্দুকে ইন্ডিয়া তাড়িয়ে দিয়ে এই দেশের মুসলমানরা এখন যখন পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে নিজেরাই অত্যাচারিত হচ্ছে তখন পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যাওয়া হিন্দুদের নিয়ে “সোনার বাংলা”র স্বপ্ন দেখতে চায়। কাজ হাসিল হয়ে গেলে আবার হিন্দুদের ওপর অত্যাচার শুরু হবে।

…অমরের বাস্তবতার ধারণা তার নিজস্ব। সে শারীরিকভাবেও আলাদা আকাঙ্খা পোষণ করে। ডাক্তার অমরের যৌনতা চিরজাগরিত। সেখানে কোনও পাপ-পুণ্যের বালাই নেই। লেখকের মুন্সিয়ানা ও জীবনবোধের তারিফ করতে হয়, অমর চরিত্রটি অন্য অনেক লেখকের হাতে পড়লে তাকে একটি নেগেটিভ চরিত্র হিসেবে পাঠকের সামনে হাজির হতে হত। কিন্তু একাধিক নারীর সংসর্গে লিপ্ত অমরকে পাঠকের খুব স্বাভাবিক একজন সুস্থ মানুষ বলে নেমে হয়। টুনু নারীপুরুষ যৌনতায় চিরাচরিত ভাবনার বাইরে বেরোতে পারে না। যেটা খুব স্বাভাবিক ও টুনুর চরিত্রের সঙ্গে একেবারেই মানানসই। টুনু বিছানায় সম্ভবত ‘সক্রিয়’ও নয়। সেকালের সামাজিক নিয়মে বাড়ির পছন্দে অমর তাকে বিয়ে করেছে ঠিকই কিন্তু তার পছন্দের যৌনসঙ্গীর অন্বেষণ চলতে থাকে। …অনেক জল গড়ায় তাদের জীবনে। খান সেনার সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন ও অত্যাচার বিশেষভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের জীবন নরকে পরিণত করে। …ইন্ডিয়া পালিয়ে প্রাণ বাঁচায় অমর। এবং সেখান থেকে যখন নিজের শ্বশুরমশাইকে চিঠি লেখে যে তার পুত্র ও স্ত্রীকে অবিলম্বে তার কাছে না পাঠালে সে টুনুকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য হবে, তখন যেন অমরকে অনেক পরিণত, প্রেমিক ও সর্বহারা একাকী বলে মনে হয়।
ইন্ডিয়া যাওয়ার প্রসঙ্গে যে টুনু “ধরে নিয়েছিল অমর গেলে যাবে, সে তখন বাবার বাড়ি চলে আসবে ময়মনসিংহে। অমর বছরে একবার-দুবার আসবে নিশ্চয়। সে-ও যাবে কখনও। কিন্তু, কোনওদিন ইন্ডিয়ায় থাকবে না।” সেই টুনু কালের গতিতে “বড়” হয়। বাস্তবের কাছে অসহায়, নির্বাক হয়ে থাকে। …দেশভাগ ও উদ্বাস্তু জীবন নারীর কাছে নতুন কিছু নয়। এ তার ভবিতব্য। এক টুনু, একা টুনু, একলা টুনু যা বদলাতে পারে না।

***

 

হিন্দুর জীবন ও দেশভাগ… তারপর ভাষার প্রসঙ্গ এসে পড়ে পূর্ব পাকিস্তানে। শাসক চায় বাংলা ভাষার সর্বনাশ করতে। শোভনা নার্সের সঙ্গে যৌনভাবে জড়িয়ে পড়া অমর যখন তাকে নিয়ে ইন্ডিয়া পালিয়ে যাওয়ার কথা বলে তখন শোভনা ডাক্তার অমরকে বলে “কে কইসে এটা মুসলমানের দ্যাশ। যারা বাংলাভাষায় কথা কয় তাদের দ্যাশ। মায়ের বিপদে মারে ফেলায়ে পালাইতে চান কেমন পুরুষমানুষ আপনে?”

…এই ভাষা-আবেগী শোভনাকে তুলে নিয়ে যায় খান সেনা। তার হদিশ পাওয়া যায় না।

অমর জানে, বোঝে, এ দেশ আর হিন্দুদের নেই। তার বাস্তববাদী মন তাকে পলায়নের জন্য মানসিকভাবে সদা প্রস্তুত রাখে। …”কিন্তু শোভনা বা শোভনাদের মতো কিছু ঘাড়বেঁকা লোক সত্যি কথাটা কিছুতেই স্বীকার করে না কেন? হিন্দুদের তাড়িয়ে তাদের সম্পত্তি দখল করে এ দেশের মুসলমানগুলো ভেবেছিল খুব সুখে থাকবে। পারল? এক তো মুসলমানেরাই তোদের আছোলা বাঁশ দিচ্ছে।”

মাতৃভাষা উচ্চারণের তাগিদ আবার এক রক্তক্ষয়ী দিনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তানকে। ধর্ম ভাষার কাছে খাটো হয়ে আসে।

***

 

উপন্যাসের অন্তর্বয়নে বাপের বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ির মনোজাগতিক ও ভৌগোলিক বিভাজনে চিরবিদীর্ণ নারীমানুষের অস্তিত্ব, রাজনৈতিক সীমা ও সেই সীমারেখায় পুনর্বিন্যস্ত পরিভাষায় ব্যাখ্যাত মানবজীবনের অসামান্য মেলবন্ধন দেখতে পাওয়া যায়। নারীর জীবনে “দেশভাগ” এক অনিবার্য সত্য। শুধু তা-ই নয়, নিজভূমি বলতে নারীর যে কোনও অধিকারের ক্ষেত্রেই আদপে নেই, সে কথা লেখক বারবার নানা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন।

একথা আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, যখন টুনুর বন্ধু পপির বাবা পুত্রসন্তানের আশায় দ্বিতীয় বিবাহ করার ফলে পপির মা নুসরত খালা তার কন্যাদের নিয়ে এতদিনের সংসার থেকে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যান। টুনু ভাবে, পপিরা তো মুসলমান, তাহলে তাদেরও উৎখাত হতে হয় কেন! …পুরুষের দখলে থাকা সমাজে যে আসলে নারী চির সংখ্যালঘু, অত্যাচারিত, উদ্বাস্তু!

এবং নারী শুধু ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষের কাছে অসুরক্ষিত নয়, তার ঘরের আত্মীয়স্বজন পুরুষও তার কাছে বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। টুনুর জামাইবাবু সিনেমা হলে যেদিন তার বুকে হাত দেয় সেদিন টুনু “শুধু ভাবছিল মা-র কথা। মা তাদের রিকশা করে পাঠিয়েছিল আবরু রক্ষার জন্য। হিন্দু মেয়ের আবরু কি শুধু অনাত্মীয় মুসলমানর হাতে হারায়? ঘরের মধ্যে একই ঘটনা ঘটলে কী বলে তাকে?”

***

 

দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে চলে না আসা সংখ্যালঘু হিন্দুদের বেঁচে থাকার কাহিনি, পরবর্তীতে মাতৃভাষার প্রশ্নে ক্রমশ উত্তাল হতে থাকা রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত এই উপন্যাসের প্রাথমিক উপজীব্য হলেও, একটি চোরাস্রোত, একভাবে প্রধান ও সমান্তরাল প্রতিপাদ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে এই লেখায়, তা, নারীমানুষের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান। এই অনুষঙ্গে, মূল দৃশ্যমান বিষয়বস্তুর একাধারে প্রতিদ্বন্দ্বী ও পরিপূরক অবস্থান থেকে আলোচ্য অখ্যান জীবনের একাধিক প্রশ্ন সামনে তুলে ধরে।

১. পুরুষের সামাজিক-রাজনৈতিক শাসন-বিন্যাসে নারীপক্ষ উন্মোচন। তাই পপিদের মা নুসরত খালাকে মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও নিজের মেয়েদের নিয়ে বাস্তুচ্যুত হতে হয় পুত্রবাঞ্ছায় স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহের সূত্রে। নারীর যেন দেশ বলে কিছু নেই, তার অবিসংবাদিত কোনও ‘ঘাট’ নেই।

২. সংখ্যালঘুর “মন”-এর কথা সংখ্যালঘুর মনের সপক্ষে উচ্চারণ। …কলোনিয়াল স্কুলিং শাসিত আখ্যানের প্রচলিত ন্যারেটিভ বড্ড সতর্ক ও পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের বেড়ি পরিয়ে রাখে আমাদের সাহিত্যে। ভারতীয় উপমহাদেশের শতক-লালিত নানাবিধ টানাপোড়েন ও সমাজবাস্তবতা লেখকের বাস্তববুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রিত করে এবং ফলস্বরূপ অনেক ক্ষেত্রেই পোলারাইজড নিরপেক্ষতা ও সত্যগোপনকারী সর্বজনগ্রাহ্যতার নিরাপদ সাহিত্য সৃষ্টি চলতে থাকে। শিখিয়ে দেওয়া মূল্যবোধের বুলির বাইরে তাই কোনও ডিকশন বা ন্যারেশন সহজে তৈরি হয় না। …আলোচ্য লেখক সেই জড়তা কাটিয়ে বেরিয়ে এসেছেন সফলভাবে। উপন্যাসটি যেন প্রথমাবধি খুব পরিকল্পিত ইন্টেনশন নিয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যার বাইরে বেরোতে চেয়েছে। তাই উচ্চারণে কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই।

***

 

উপন্যাসটি পাঠের গোড়া থেকেই লেখকের একটি প্রযুক্তি আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে, সেটা হচ্ছে ভাষায় অনায়াসে, অনুচ্চকিতভাবে এমন সব শব্দ ব্যবহার করা, যার সাহায্যে পাঠক নিজের অজ্ঞাতসারেই লেখকের নির্মীয়মান ভূ-পরিবেশের রূপ রস গন্ধের ভেতর একাত্ম হয়ে পড়েন। আঞ্চলিক শব্দগুলি চরিত্রদের মুখে তো একভাবে আসছেই, সেটাই স্বাভাবিক, উল্লেখযোগ্য হচ্ছে লেখকের নিজস্ব বিবৃতিতে যখন সেগুলি সুপ্রযুক্ত হয় (জ্বলজ্বলা, তুখাড়, পুরা, অবিয়ত, মচমচা, রাত্র, কুনোদিন, রিটার, আগাগুড়া ইত্যাদি অজস্র শব্দ)। এই লিখন-প্রযুক্তি লেখাটির মুড গঠনে অন্যতম ভূমিকা পালন করেছে।

বিভক্ত ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পুনর্বিন্যস্ত বাঙালি সমাজের হৃদয়বিদারক জীবনের নবতর চিত্রাঙ্কন ও তার তাৎপর্যময় ভাষ্য ধরা থাকল এই সাহসী উপন্যাসে।