Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আছমান বিবির কিসসা

আছমান বিবির কিসসা | সোমনাথ মুখোপাধ্যায়

সোমনাথ মুখোপাধ্যায়

 

এ আমার অনেকদিনের অভ্যেস। লেখার টেবিলে বসে সামনের খোলা জানালা দিয়ে বাইরের চলমান জীবনের ছবি দেখা। সেই দৃশ্যপটের ভেতরে কেবল যে মানুষী চরিত্রদেরই দেখা মেলে তেমনটা নয়, বিচিত্র না-মানুষরাও স্ব-স্ব গৌরবে ভাস্বর হয়ে ওঠে নয়নের আয়নায়। কখনও কখনও কিছুই তেমন হয়তো নজরে পড়ে না, তবে তাতে আমার নজরদারির কাজে ছেদ পড়ে— এমনটা একদমই নয়। খুব আশ্চর্য হলেও সত্যি, জানালার গা ঘেঁষে এখনও একটা আস্ত ফাঁকা জমি রয়েছে। সেই জমিতে অনাদরে বেড়ে ওঠা কিছু ঝোপঝাড়ের সমাবেশ। ঋতুচক্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঝোপের গাছগাছালিদের চরিত্র যায় বদলে। এই বদলের বিষয়টা আমায় বেশ টানে। হয়তো সেই টানেই আমার চেয়ে থাকা। বিছানা ছেড়ে ওঠার পর থেকে বেশ খানিকটা সময় এভাবেই কেটে যায়।

সেদিনও এমনই মজে ছিলুম। হঠাৎ দেওয়াল ঘেঁষে মাথা চাগিয়ে ওঠা ল্যান্টেনার ঝোপটা বেজায় নড়ে উঠতেই সম্বিত ফিরে এল। মাঝেমাঝেই যে এমনটা ঘটে না তা নয়। ঘোষপাড়ার বৈদ্যদা— বৈদ্যনাথকে ছোট করে নেওয়া— তার দুধেল গাইবাছুরদের মাঝেমধ্যেই ঘাস খাওয়ার জন্যে এখানে চরতে ছেড়ে যায়। ভাবলাম তারাই হয়তো ঝোপের আলোড়নের কারণ। কিন্তু এত সকালে তো ধবলী-সুরভিদের আসার কথা নয়! তাহলে? তাহলে কি বেজিদের হুটোপুটির জন্যই এমনভাবে নড়ে উঠল ঝোপটা? নাকি হুমদো চেহারার কুবোপাখিরা খাবারের খোঁজে ল্যান্টেনার নরম কাঁটা ভরা ডালে এসে বসেছে? সমস্ত সম্ভাবনাই নিজের মতো করে খতিয়ে দেখার চেষ্টা করি। অথচ চেয়ার ছেড়ে দু-পা এগিয়ে জানালার গরাদ ধরে অকুস্থলে নয়ন মেলে ধরলেই সমস্ত সন্দেহের নিরসন হয়। কিন্তু প্রভাতী আলস্যের আড় ভেঙে এই সামান্য কাজটুকুও করা হয়ে ওঠে না। পরিস্থিতি খানিকটা স্বাভাবিক হয়েছে মনে করে শব্দছকের ঘোরপ্যাঁচের গোলকধাঁধায় মন হারিয়ে ফেলি। টনক নড়ল এক অচেনা কণ্ঠস্বরের ডাকে…

–ও বাপ! কটা বাজে বলতে পারো?

আচমকা এমন প্রশ্নে খানিকটা হতবাক হই। ল্যান্টেনা ঝোপের আলোড়িত হওয়ার কারণ এবার মালুম। নিজেকে সামলে নিয়ে জবাব দিই—

–এখন সাতটা কুড়ি। তা আপনি এখন এখনে? এত সকালে? কী করছেন?

এমন পুলিশি প্রশ্নে বুঝিবা একটু ঘাবড়ে যান ওপারের বক্তা। তারপর পালটা প্রশ্ন ছুড়ে দেন আমার দিকে—

–কেন? আমারে তুমি চেনো না? আমি হারুনের আম্মি, মা! আছমান বিবি। এ-পাড়ায় ঢোকার মুখে যে মোল্লাপাড়া, সেখানেই থাকি।

একটু রসিকতা করার ভঙ্গিতে বলি— আসমান বিবি? তা এই জঙ্গুলে ভুঁইতে কী করছেন এই সাতসকালে?

অসংখ্য বলিরেখার আঁচড় ভরা মুখে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে বলেন—

–আমাদের কি আর সময়ের বাঁধা পথে জীবন চলে রে বাপ! আমাদের জীবন হল লাইনভাঙা রেলগাড়ির মতো, আপন খেয়ালে দিগ্বিদিক জ্ঞান-শূন্য হয়ে চলে। এই দেখো না, তোমাদের ফেলে দেওয়া জিনিসগুলো কুড়িয়ে নিয়ে যাব বলে বস্তা হাতে পথে নেমেছি। এগুলো কুড়িয়ে নিয়ে ভাঙাচোরাওয়ালাদের কাছে বেচে দিই। দুটো পয়সা হয় তাতে।

হাতের বস্তাটা তুলে দেখান আছমান বিবি। ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের জলের বোতল, নানারকমের প্যাকেট, পিচবোর্ডের ছেঁড়া টুকরো… এসবেই বস্তা ভরে উঠেছে।

এতকাল এক পাড়াতেই থাকা সত্ত্বেও কোনওদিন এভাবে তাঁর কথাগুলো মন দিয়ে শোনার কথা ভাবিনি, কোনও তাগিদ মনের মধ্যে সেভাবে চাগিয়ে ওঠেনি বলে বেশ আফশোস হচ্ছিল।

–আমার অন্য প্রশ্নের জবার পেলুম না তো! আসমান বিবি এই মাটিতে কী করে?
–বাপ রে! আমি তো বেহেস্তের হুরী-পরী নই যে সারাদিন আসমান আগলে থাকব! ভাঙাচোরা কুড়োতে কুড়োতে দেখি এই জংলা ঝোপের তলে ঝাঁক বেঁধে রয়েছে আমরুলি শাক, বেশ তরতাজা। তাই খানিকটা তুলে নিলাম। বিনা খরচে একটা পদের জোগাড় হল। খেয়েছ কখনও আমরুলি শাক?

এবার আমার নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার পালা। খানিকটা কুণ্ঠিত স্বরে বলি— না, এই শাক খাইনি কোনওদিন। তবে ঠাকুমাকে কখনও কখনও রান্না করতে দেখেছি। কীভাবে রান্না করে যেন?

আমার প্রশ্ন শুনে হেসে ওঠেন আছমান বিবি, তারপরে বলেন, তোমারে বললে কি সুবিধে হবে বাপ? বৌমাকে বললে সে না হয় সহজে বুঝতে পারত।

হেঁসেলের রান্নাবাটি খেলায় আমিও যে খানিকটা পারঙ্গম, মনে কষ্ট হলেও সে কথা এ যাত্রায় বেমালুম চেপে যেতে হল বলে খানিকটা আক্ষেপ হচ্ছিল। তবে মহাজনবাক্য বলে কখনও কখনও বিস্তর বকবক করার চেয়ে চুপচাপ অন্যের কথা শোনা ভাল। এতে লাভের ঝোলা ভরে ওঠে বিচিত্র কাহিনির খোরাকে। আমার আচরণ আজ আপ্তবাক্যেরই অনুসারী। আছমান বিবি আমাকে আমরুলি শাক রান্নার পদ্ধতি শেখাতে শুরু করেন।

–শোনো বাপ, শাকগুলি এভাবে ছাড়িয়ে নিতে হবে— চলে লাইভ ডেমনস্ট্রেশন। আমি বড় বড় চোখ করে তারিয়ে তারিয়ে তা উপভোগ করি।
–এটা দুভাবে খাওয়া যায়। চাটনির মতো করে খেতে পারো, অথবা আলু-বেগুনের সঙ্গে পেঁয়াজ আর রসুনের মিশেল দিয়ে শাকভাজা করে খেতে পারো। আছমান বিবি আমার মতো নিমগ্ন, আগ্রহী শ্রোতা পেয়ে মনের খুশিতে আমরুলি শাকের রেসিপি বাতলে দিতে থাকেন। আমি শুনে যাই।
–এদিকে আর ফাঁকা জমি কোথায়? সব জমিই এখন বড় বড় বাড়ির দাপটে লোপাট হয়ে গেছে। অথচ এই জমিন থেকেই তো আমাদের মতো গরিবগুর্বোদের কিছু সংস্থান হয়। হেলেঞ্চা, থানকুনি, কচুর শাক, কচুর লতি, গিমা, ব্রাহ্মী— আরও কত কী! এসব তোমাদের মতো ভদ্দরলোকেরা চেনো না, জানো না— তাই খাওয়ার কথা ভাবতেই পারো না।

‘ভদ্দরলোক’ কথাটা এমন ব্যঙাত্মক সুরে বললেন যে আমার মনে হল কেউ যেন একটা মৃদু চড় মারলেন আমার সযত্নে লালিত সম্ভ্রমবোধে।

–আজ আসি রে বাপ! আমার কথায় কিছু মনে করলে না তো? আর মনে করেই বা করবে কী? সত্যি কথাটা পষ্ট করে বলাতে কষ্ট কীসের!

আছমান বিবি কোঁচড়ে ভরা আমরুলি শাক আর বস্তাভর্তি ফেলে দেওয়া জিনিসের মেঠো পসরা নিয়ে একসময় আমার নজরসীমার বাইরে চলে যান। আমি আমার কাজে মন দিই।

 

আজকাল মেঘের নকশা বদল হতেই মাঠের গাছগাছালিদের সমাবেশের চালচিত্রটাই অনেক বদলে যায়। অসময়ের অঝোর বর্ষণে এবার মাটিতে রসের জোগান ছিল বাড়তি বেস কয়েকটা দিনের জন্য। বৃষ্টির দাপট কমে আসতেই জমির সতেজ সবুজতাও কমে আসতে থাকে। কমে আসে আছমান বিবির আসাযাওয়া, কেননা রুখু মাটিতে শুষনি, আমরুলি, থানকুনির বেঁচে থাকার লড়াইটাই কঠিন হয়ে পড়ে। শীতার্ত গাছগাছালিদের মধ্যে শীতঘুমের তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। গায়ে একটা হালকা পশমি আবরণ চাপিয়ে এই বদলটা বেশ উপভোগ করি। বাইরে নতুন সময়ের কলি ফেরানোর কাজ জোরকদমে চললেও, আমার প্রভাতী রুটিনের তেমন কোনও রদবদল হয় না— বাতায়নপথে ভেসে আসা দৃশ্যপট আমার গৃহবন্দি দিনযাপনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হয়ে টিঁকে থাকে।

সেদিনও বেলা গড়িয়ে গেছে খানিকটা। একরকম আনমনেই চেয়ে থাকি বাহিরপানে। হঠাৎ গরাদের ওপারে মাঠের মাঝে আছমান বিবির মুখ ভেসে ওঠে। উৎসুক কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করি— কি গো, কেমন আছ? বেশ কিছুদিন এই চত্বরে তোমার পা পড়েনি। কোথায় গিয়েছিলে?

একগাল হাসিতে মুখ ভরিয়ে আছমান বিবি উত্তর দেয়— কোথায় আর যাব? ছিলুম এখানেই। শীতকাল আসছে তাই একটু ব্যবসার মতলব ভাঁজছিলুম। কণ্ঠস্বরে রহস্যের আভাস।

–ব্যবসা? কিসের ব্যবসা?
–আরে তেমন কিছু নয়— হাঁস-মুরগির ডিম। তোমরা খাও না?

শীতকালে হাঁসের ডিমের কথা শুনেই মনটা কেমন যেন নেচে উঠল। এক লহমায় ফিরে গেলাম আমার ছেলেবেলায়। বাড়িতে মুরগির ডিম আনার চল ছিল না, তাই হাঁসের ডিমের ডালনা পাতে পড়লেই মন নেচে উঠত এক অপার্থিব আনন্দে। তবে পাশাপাশি আক্ষেপও যে ছিল না তা নয়। আমাদের পাতে গোটা ডিমের বদলে আধখানা করে ডিম বরাদ্দ ছিল। ডিম সিদ্ধ করে তার খোসাগুলো ছাড়িয়ে নেওয়ার পর রান্নাঘরের মিটসেফের কোনায় ঝুলিয়ে রাখা সুতো দিয়ে নিপুণ দক্ষতায় মা সেগুলোকে মাঝবরাবর কেটে নিতেই যেন খিলখিল করে হেসে উঠত লালাভ কুসুম। কার ভাগে কোনটি যাবে তা নিয়ে রান্নাঘরে মায়ের চারপাশে ভিড় করে থাকা আমরা ভাইবোনেরা বুলি চড়াতাম— এইটা আমার, ওইটা আমার। কোন যুক্তিতে বেলাপিছু অমন আধখানা ডিম আমাদের দেওয়া হত, তার উত্তর আজও অজানা রয়ে গেছে। আজ আছমান বিবি কি আমাকে সেই হারানো দিন ফিরিয়ে দিতে এল?

–হ্যাঁ রে বাপ, রা করিস নে যে! আমার বাপু আজ বেজায় তাড়া রয়েছে। ডিম আনতে সেই বাপের ঘর যেতে হবে আমায়। হারুনের বাপটারে একা ফেলে যেতেও ভরসা হয় না। শরীরগতিক তো মোটেই ভালো নয়। সারাদিন পাঁজরসার ক্ষয়াটে বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। কোনদিন যে সব ছেড়ে চলে যাবে তা জানি নে।

উদ্বেগ আর আশঙ্কার মিশেলে এক দলা দীর্ঘশ্বাস আছমান বিবির বুক ঠেলে বেরিয়ে আসে।

আমার মন তখনও ডুবে রয়েছে মায়ের হাতে তৈরি পেঁয়াজ ছাড়া ডিমের ঝোলের মৌতাতে। হুঁশ ফেরে অর্ধাঙ্গিনী মহোদয়ার বিরক্তিমাখা তপ্ত শব্দবন্ধে—

–থাকো কোথায়? একটা মানুষ তারস্বরে ডাকছে, কানে শুনতে পাও না?

আমার জবাবি ভাষণের জন্য সামান্যতম অপেক্ষা না-করেই তিনি গলার স্বর এক আশ্চর্য চাতুর্যে যথাসম্ভব মোলায়েম কর উত্তর দেন— কোথা থেকে ডিম আনবে গো মাসি? বাড়িতে হাঁস পুষেছ বুঝি? বেশ বড় বড় ডিম? বড় হলে আমাকে এক ডজন ডিম নাহয় এনে দিও। এই শীতকালেই তো হাঁসের ডিম খাওয়া।

আমার মতো বেরসিক মানুষের সঙ্গে কথা কইতে হচ্ছে না দেখে আছমান বিবিও মনে মনে বোধহয় বেজায় খুশি হন। বৈষয়িক মন বিষয়ী ভাবনায় রসের খোরাক জুটিয়ে নেবে এমনটাই যে চিরকেলে দস্তুর।

পরেরদিনই ডিমভর্তি ঝুড়ি কাঁখে আছমান বিবি এসে হাজির। এবার আর আড়পথে নয়। সদরপথে সটান ঢুকে পড়ে হাঁক পাড়েন—

–বৌমা, কোথায় গেলে? একটা পাত্তর নে এসো দিকিন। এই পেত্থম তোমার দোরে এলাম। তুমি আগে বেছেবুছে নাও। এ পাড়াতেই বেশ কয়েক বাড়ি আজ ডিম দিতে হবে। একটু তাড়ায় আছি গো বৌমা…

বৌমার এগিয়ে দেওয়া পাত্রে বেছে বেছে ডিম তুলে দেন আছমান বিবি। আমি ব্যস্ত হয়ে উঠি ডিমের দাম মেটানোর কাজে।

শীতকালটা রসিয়ে রসিয়ে নানান চেহারায় ডিম খাওয়া হল আছমান বিবির সৌজন্যে। এমনই এক নতুন সম্পর্কের বাঁধনে বাঁধা পড়ে ক্রেতা-বিক্রেতা সকলেই বেশ খুশি। খানিকটা সময় হাতে নিয়েই ‘ডিমমাসি’ চলে আসেন। আমডাঙা থেকে ডিম নিয়ে আসতে হয়, সেই সূত্রে আমডাঙার বিখ্যাত কালীবাড়ির গপ্পো শোনান তিনি। এখনও যাইনি শুনে খানিকটা আক্ষেপ করেন—

–এ আর এমন কী দূর?  বারাসাত বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে ৮৩ নম্বর বাসে উঠবে। কন্টাকটারকে বলবে কালীবাড়ি নামব। নামিয়ে দেবে। বাসে উঠলেই অনেক মানুষ মিলে যাবে। মা বড় জাগ্রত। একবার ঘুরে এসো। এখন তো আর করোনার তেমন জোরালো দাপট নেই। চলে যাও একদিন।

এসব কথায় ভেতরে ভেতরে বেশ তেতে ওঠেন আমার গিন্নি। আমার নিরাসক্তি তাঁকে হয়তো যাওয়ার ব্যাপারে মরিয়া করে তোলে। আমি সেই অর্থে ভাল সঙ্গতকার নই। তাই আবেদন-নিবেদনের পর্বেই দমে যায় তাঁর একান্ত ইচ্ছেগুলো।

আরও বেশ কয়েকটা মাস কেটে যায়। আছমান বিবির সঙ্গে তেমন আর দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। এখন পেনশনের টাকায় সংসার চালাতে হয়, তাই ভেতরে ভেতরে অনেকটাই যেন হিসেবি হয়ে উঠেছি। আছমান বিবির অনুপস্থিতির শূন্যতা প্রকৃতির নিয়মেই যেন ভরাট করতে এগিয়ে আসে করুণা-শওকত-শঙ্করঈ-সুধীরদার মতো মানুষরা। নতুন সখ্যতা জমে উঠতে খুব একটা সময় লাগে না। এরই মাঝে কানাঘুষোয় খবর আসে আছমান বিবির ঘোর বিপদ। এই পর্যন্তই। বাড়ি থেকে সামান্য দূরেই সেই মোল্লাপাড়া, অথচ কুঁড়েমি আর সঙ্কোচের আড় ভেঙে আর খোঁজ নেওয়া হয়ে ওঠে না।

সেদিন সন্ধেবেলা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে টিভির খবর দেখছি। হঠাৎ সদরের গেট খোলার শব্দ কানে আসে। তারপরেই কানে আসে সেই চেনা, হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর— বৌমা, বৌমা! আমার পাশে বসা গিন্নি কাপ নামিয়ে দ্রুত উঠে যান।

–মাসি! তুমি! এই সন্ধেবেলায়? এতদিন কোথায় ছিলে? একটা খবর দাওনি! আমরা তো তোমার কথা রোজই বলাবলি করি। এতদিন আসোনি কেন?
–কেন? তোমরা কিছু শোনোনি? কণ্ঠস্বরে যেন উদাসী সুর।
–কী শুনব? আমার স্বরে আত্মসংরক্ষণের ব্যগ্রতা।
–হারুনের বাপটা চলে গেল। এই মাস দেড়েক হল। অনেকদিন ধরেই তো ভুগছিল। আর ঠেকনা দিয়ে ধরে রাখতে পারলাম না। ওই পাড়ার লোকজনই বেবাক সমস্যা সামলাল। হারুনটা তো আমার নুলো ছেলে। ওকে সামলাতেই তো জেরবার হয়ে যাই।
–এখন তাহলে কীভাবে চলবে তোমার মাসি?
–ও নিয়ে ভেবো না। তোমরা তো আছ। আমাদের আবদার তো এই পোড়া পেটের। ও সামলে নেব ঠিক। এই দেখো, কথায় কথায় আসল কাজটাই তো ভুলতে বসেছি। এই নাও বৌমা। কাল তো আমাদের বড় পরব— ঈদ। কী আর করি? একটু ফিরনি বানিয়েছি। ভাবলাম তোমাদের দিয়ে আসি। এই নাও…

হাত বাড়িয়ে থার্মোকলের বাটিটা ধরি। ব্যস্ত হাতে পকেট হাতড়ে কয়েকটা নোট আছমান বিবির হাতে তুলে দিতে চাই। সসঙ্কোচে বলেন—

–না রে বাপ! টাকাপয়সা লাগবে না। আমার তো আর তেমন ক্ষেমতা নেই যে তোমাদের দাওয়াত দে আমার ওখানে ডেকে নে যাব।
–কাল পরবের দিন। পাড়ার নাতি-নাতনিদের মধ্যে একটু মিঠাই বেটে দিও। ওরাও খুশি হবে আর তোমারও মন ভাল হবে। তাই না?

এই কথাতে কাজ হয়। টাকা কটা আঁচলে বাঁধতে বাঁধতে একগাল হেসে বলেন—

–নাতি-নাতনিগুলো তো সমানে বায়না করে মারছে— ও দাদি! আমাদের পরবের পাব্বনি দেবে না? এতকাল দিয়ে এসেছি, এবার দেব না? একথা ভেবেই আকুল হচ্ছিলাম। খোদা মেহেরবান! তোমার হাত দিয়েই আছমান বিবির জন্য সওগাত পাঠিয়ে দিল।

কপালে হাত ঠেকিয়ে কৃতজ্ঞতা জানান আছমান বিবি। তারপর গুটি গুটি পায়ে দরজার দিকে পা বাড়িয়েও ফিরে আসেন কী একটা মনে করে।

–কী গো মাসি, ফিরে এলে? কিছু বলবে? আমার গিন্নি প্রশ্ন করেন।

–শোনো বৌমা। তোমারেই বলি। কাত্তিক, ওই যে গো এ-পাড়ার মাতব্বর, এসেছিল আমাদের ঘরে। কীসব কাগজে আঙুলছাপ নিয়ে গেল। বলল, চাচি কোনও চিন্তা নেই। আমরা তো আছি। কাত্তিক বলল, ওরা সরকারের তরফে বেধবা ভাতার ব্যবস্থা করে দেবে। ওতেই মা-বেটার দিব্যি চলে যাবে রে বাপ, দিব্যি চলে যাবে।

এবার সত্যিসত্যিই বিদায় নেন আছমান বিবি। বাইরের মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ভেদ করে কি ঈদের চাঁদ উঁকি মারল? জানি না…