Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আমরা কিন্তু নীরব… নির্লিপ্ত

পীযূষ দত্ত

 



গদ্যকার, বাংলা সাহিত্যের ছাত্র

 

 

 

 

২০১৩-র ৮-ই জানুয়ারি, ‘স্পেশাল ২৬’ নামে একটি হিন্দি ছবি মুক্তি‌ পায় ভারতে। নিরাজ পান্ডে পরিচালিত এই ছবির একটি দৃশ্যে দেখানো হয় যে একদল লোক নকল সিবিআই অফিসার সেজে এক নেতার বাড়িতে রেইড করে। সে নেতার বাড়ির বিভিন্ন জায়গা থেকে তারা থোক থোক নোটের বান্ডিল উদ্ধার করে। আলমারি থেকে, ঠাকুরের আসনের তলা থেকে।‌ তবে, সেই সব টাকা মিলিয়েও হয়ত ৫০ কোটি হবে না।‌

হিন্দি ছবি সবকিছু ‘অতিরঞ্জিত’ করে দেখানোর জন্য বিখ্যাত। এমনটাই আমজনতার বিশ্বাস ছিল। তবে সেই ছবির এই দৃশ্য যে এমন বাস্তবরূপ নিয়ে ফেলবে তা কেই বা আন্দাজ করেছিল?

সম্প্রতি এমনি এক দৃশ্য হতবাক করে দিল সমগ্র ভারতবাসীকে। যখন রাজ্যের প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গিনীর একাধিক ফ্ল্যাট রেইড করে সেখান‌ থেকে থোক থোক নোটের বান্ডিল উদ্ধার করল ইডি। যা সব মিলিয়ে দাঁড়ায় ৫০ কোটি টাকা। সঙ্গে ৫ কেজি সোনা।

ঘটনায় হতভম্ব বাঙালি তাঁদের রসবোধে শান দিয়ে নেমে পড়লেন মিম যুদ্ধে। একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া পেজ থেকে ঝরে পড়তে থাকল শয়ে শয়ে মিম।‌ বুদ্ধিদীপ্ত মিম। মশকরা শুরু হল প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বান্ধবীপ্রীতি নিয়েও। তবে যা ফের আরেকবার আড়ালে চলে গেল তা হল এসএসসি চাকরিপ্রার্থীদের প্রায় ৫০০ দিন ছাপিয়ে যাওয়া আন্দোলন। কোথাও কোথাও আওয়াজ উঠলেও সামগ্রিক জনতার মধ্যে এই বিষয় নিয়ে বিশেষ‌ হেলদোল লক্ষ করা গেল না। বিরোধীরা স্বর চড়ালেও এই এসএসসি চাকরিপ্রার্থীদের লড়াই বাংলার রাজনৈতিক স্থিতাবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে সক্ষম হল না।

এসএসসি স্ক্যাম বিষয়টি দেখা যাক। জানা যাচ্ছে, ২০১৪ সালে রাজ্যের স্কুলগুলিতে ‘এসএলএসটি’ মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ করা হবে বলে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তারপর ২০১৬ সাল নাগাদ এই নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হয় বলে জানা যায়। তবে এর কিছুদিনের মধ্যেই এই নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে একাধিক প্রশ্ন আসা শুরু করে। কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক অভিযোগপত্র জমা পড়তে থাকে একথা দাবি করে যে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় আপাদমস্তক দুর্নীতি হয়েছে। দাবি করা হয়, যাদের নাম মেধা তালিকাতেই ছিল না, তাদের নাম মেধা তালিকায় উঠে গেছে। যে সমস্ত পরীক্ষার্থীরা কম নম্বর পেয়েছিল, মেধা তালিকায় দেখা যায় তাদের নম্বর বেড়ে গেছে। এমনকি তাদের মধ্যে বেশ কিছুজনের কাছে অ্যাপয়নমেন্ট লেটার-ও পৌঁছে গেছে বলে অভিযোগ।

অভিযোগকারীরা একথাও বলেন যে এমন অনেককে চাকরি দেওয়া হয় যারা টেটের পরীক্ষা পর্যন্ত উত্তীর্ণ হতে পারেননি।

সম্প্রতি কয়েকমাস আগে এই এসএসসি বিষয়ক আরেকটি তথ্য সামনে আসে। যখন ববিতা সরকার নামে এক এসএসসি চাকরিপ্রার্থী কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেন যে মন্ত্রী পরেশ অধিকারীর কন্যা পরীক্ষায় তাঁর থেকে কম নম্বর পাওয়া সত্ত্বেও তাঁর জায়গায় চাকরি পেয়ে যায়। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে কলকাতা হাইকোর্ট রায় দেয় যে মন্ত্রীকন্যা অঙ্কিতা অধিকারীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হবে এবং তার বদলে ববিতা সরকারকে সেই জায়গায় চাকরি দিতে হবে। হাইকোর্ট আরও বলে যে অঙ্কিতা অধিকারীকে তাঁর মাইনের সমস্ত টাকা ফেরাতে হবে এবং সেই টাকা ববিতা সরকারের প্রাপ্য।

আর এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ইডি হানা দিল পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর বান্ধবীর বাড়িতে। অস্বস্তি বাড়ল তৃণমূলের অন্দরে।

পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের এই ঘটনা সামনে আসার পর স্বভাবতই লজ্জায় পড়ে তৃণমূলের একাংশ, মূলত যারা ‘পুরনো’ অংশ বলেই পরিচিত। এই ঘটনার পর তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু চাকরিপ্রার্থীদের সাথে দেখা করতে উদ্যোগী হন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী এই সাক্ষাতের লক্ষ্য একটাই, তা হল এই সমস্যার সমাধানে পৌঁছানো।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় চাকরিপ্রার্থীদের আশ্বাস দেন যে তাঁদের বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে তাঁরা দেখবেন।

এই আশ্বাসের পর একাংশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও, সঙ্গীতা শর্মাদের মতো চাকরিপ্রার্থীরা এখনও সরকারকে ভরসা করতে পারছেন না বলেই তাঁরা জানাচ্ছেন। তাঁদের মতে এমন আশ্বাস আগে একাধিকবার দেওয়া হয়েছে তবে বাস্তবে কোনও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি। তাই এখনও তাঁরা পথ ছাড়তে রাজি নন।

চাকরিপ্রার্থীদের মঞ্চের যে ছবি সামনে আসে তা অসহনীয়। কোলে বাচ্চা নিয়ে দিনের পর দিন ধর্নায় বসে রয়েছেন তাঁরা। শহরের বুকে এককামরা ঘর ভাড়া নিয়ে ঠেসেঠুসে তাতে রয়েছেন ১৫-১৬ জন।‌ ঝড়-জল-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঠায় বসে রয়েছেন‌ তাঁরা। এই ছবি এক বা দুইদিনের নয়। এই ছবি ৫০০ দিন ছাপিয়ে গেছে।

এই ছবির পাশাপাশি যা দুশ্চিন্তার তা হল আমাদের নীরবতা।‌ এতকিছুর পরেও আমরা নির্লিপ্ত। মন্ত্রীর বান্ধবীর ঘরে কোটি কোটি টাকার বান্ডিল আমাদের পথে নামাতে পারছে না। চাকরিপ্রার্থীদের চোয়াল-শক্ত লড়াই আমাদের টলাতে পারছে না। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উপর তৃণমূলের নৃশংস আক্রমণ আমাদের আশঙ্কিত করতে পারছে না। ৩ সপ্তাহ কেটে গেছে তাই মিম যুদ্ধ-ও থেমে গেছে। তবে যা রয়ে গেছে তা ওই চাকরিপ্রার্থীদের হার-না=মানা লড়াই।