Site icon ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

হে বিবর্তন, হে আশ্চর্য দেবতা…

হে বিবর্তন, হে আশ্চর্য দেবতা… | মহাশ্বেতা আচার্য, অনির্বাণ ভট্টাচার্য

মহাশ্বেতা আচার্য, অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

চায়ের দোকানবিহীন এক আশ্চর্য দেশে বড় হচ্ছি মহামারি-পরবর্তী আমি। যতবার তুমি চা খেতে বেরিয়ে আসছ – বাড়ি থেকে, অফিস থেকে, সুপ্তি থেকে, সঙ্গম থেকে – ততবারই আমার জিভ পুড়ে যাচ্ছে চুমুক দেওয়ার তাড়াহুড়োয়। একটু অসাবধান হলেই টাইটানিকের পরিচালক তাঁর সমুদ্রপ্রতিম স্থবিরতায় আমার মধ্যে ভরে দেবেন অতলান্তিক বরফ। তাই আমরা সব্বার দিকে আলতো হেসে হেসে যাই, আলতো কথা বলি, ঘরে ঘরে হিটার চালাই আর অদেখা ফার্নেসের আশীর্বাদে যে যার দেশের গন্ধ খুঁজি। বড়মানুষ দোকানদারেরা বলছে, কাচের ঘরে সমুদ্র-আগাছা আর শাপলার ডাঁটির মধ্যে, হিমঘরের অক্টোপাস আর এলাচের মধ্যে, সুপারমার্কেটের তাকের ভেতর লুকিয়ে আছে আমাদের দেশগুলো। মনে পড়ছে, খাবার হল সেই ভাষা, যা আমরা রপ্ত করেছি জ্ঞান হওয়ার কত আগে! বলো অমিতাভ, কত লক্ষ বছর আগে আমাদের খিদের ইতিহাস শুরু? যেন কত হাজার বছর আগে তোমার বোধিগাছের ফল এসে পড়েছে আমার কোলে। সাদা-জামা সরকারি গরিব ইস্কুলের সাদা-কালো বিচ্ছিরি ছাপা বইতে, শিবালিক পর্বতের কোন প্রাচীন মানুষের প্রজাতির ছবি! সেই থেকে পার হয়ে – শত যোনি শত মনুষ্যজন্ম – বিবাহচিন্তায় লেপ্টে থাকে মেয়েগুলোকে হঠাৎ আজ মনে পড়ছে খুব। হে বিবর্তন, আশ্চর্য দেবতা, আমাদের মাতৃকেন্দ্রে এস!

দেশের কথা বলছিলে না? বলছিলে আশ্চর্যের কথা? তোমাকে আমার অলৌকিক চেনাব জয়িতা, চেনাব জাদু আর বাস্তবের মাঝে সমান্তরাল বিছানো ট্র্যাক, একশ মিটারে যাকে পেরোনোর কথা ছিল এক নিঃশ্বাসে। আমাদের অনিঃশেষ আদরের ভেতর সে শ্বাস আটকে গেছে সেই কবে, আমি ছাড়ি, তুমি, ধরে নিতে পারবে ঠিক সময়ে? মৃত্যু আর প্রিয় মার্জারের মাঝে কে যেন রেখে এসেছে অনন্ত কুঁয়োঘুম। চাঁদের জোলো কাঁপুনি। বুদবুদ। আমি বিপজ্জনক ঝুঁকে পড়ি। তুমি হালকা একটা চাদর টেনে বাইরে বেরোও। বলো, এখনও কেন, এখনও কেন ওভাবে দাঁড়িয়ে? আমি নেকড়ের মনুষ্যজন্মের কথা তোমাকে বলতে পারি না। মাফলার টেনে রাখি দুহাতে। গলায়, কণ্ঠায় প্রবাসের দাগ। দূরত্বের দাগ। ও দাগ দেখানো বারণ। ভেতরে আসি কীভাবে বলো? তার চেয়ে একটা গল্প বলি শোনো। সে এক শরিকিয়ানা, জয়িতা। তস্য, তস্য পিতামহী। প্রতিবার দেখতাম ঘুঁটেগুলো সরিয়ে, একসময় ফাঁকা দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। সে দেওয়ালে সৃষ্টির দাগ। আঙুল বোলাতেন। সমস্ত শরীরটা একবার কেঁপে উঠত বৃদ্ধার। ওইটুকু মনে আছে। ওই স্মৃতিদাগ, ওই তাকিয়ে থাকার আশ্চর্য মোহমুহূর্ত এই প্রথম তোমাকে দিলাম। ওটাই আমার দেশ। আমার আশ্চর্য। আমার অস্তিত্ববাদ। আমার অ্যাক্ট অফ রেবেলিয়ন। শোনো, তুমি আলতামিরা গেছ কখনও?

—জানো, আলতামিরার প্রতিবেশী দেশ তাকে খেয়ে ফেলতে চায়? বোমা দিয়ে, মাদক দিয়ে, সস্তা দাঁতের চিকিৎসা দিয়ে তারা জোড়াতাপ্পি দিয়ে রাখে ইতিহাস – প্রস্তরযুগ – নিজস্ব পিরামিড। খাঁড়ির ওপারে প্রথম বিশ্বের যন্ত্রণাগুলো চুপচাপ অপেক্ষা করে – হাতে তাদের সোনালি-সবুজ নোট- বর্ডার পেরিয়ে আসে ছোটো-বড়ো বড়ি আর গুঁড়ো – গুঁড়ো-উন্মাদনা, কান্না, ট্যাবলেটের স্বপ্ন, উত্তেজনা – একস্ট্যাসি একস্ট্যাসি এক্সট্যাসি! কিন্তু আমার জ্বর-কপাল আজ স্রেফ রোদ্দুর খোঁজে, হলুদ রঙের। আজ উত্তরায়ণের সপ্তাহে আলতামিরার আলো কোথা থেকে আসে ভাবতে ভাবতে আমি খুলে বসি পাঁচখানা জার্নালের ট্যাব, পরিসংখ্যান। একখানা ঝকঝকে কড়াই উলটো করে বুকে বেঁধে সটান দাঁড়িয়ে পড়ি জানলার ফাঁকফোকরে। তাপ ঠিকরানো – ঠিকরানো দুঃখ – দুখের চকমকি পাথর – তিমিরবিনাশী আলো। যে ক্যান্সার হাসপাতালে অল্প গবেষণা করেছি, তারা এই সূর্যের সাথে সমমেল রেখে সাজিয়েছিল জানলা, ছাদ আর মাইক্রোস্কোপ। আরোগ্যের সম্ভাবনাহীন রোগী খুঁজে বার করা গবেষণার ধাপ – অমিতাভ, এ হাসপাতালে সবচেয়ে সহজ কাজ কি শুধু আমারই ছিল? আমি তো দেখেছি, এক সাদা কোটের বাচ্চা মেয়েকে ওঁরা আরোগ্যের পথ ভেবে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে হঠাৎ। আমি এমন এক ঈশ্বর, আমি ভেবেছিলাম, যার কাজ ছিল স্রেফ গানের কিছু মুহূর্ত তৈরি করা। আসলে মাথার থেকে অসংখ্য বাঁধন খুলে পড়ে গেছে একটা বছর ধরে। বাঁচামরার ঈশ্বর তো স্নায়ুতন্ত্র, সংবহন। দেহকোষ আর বিগ-ফার্মার ঈশ্বর আমাদের আশীর্বাদ করুক অবিশ্রাম।

আর যখন জেগে উঠব? আশীর্বাদের মোহে ছিঁড়ে, ফালাফালা হয়ে গেলে? তখন কে টেনে তুলবে আমাদের? কোথায়, কোন নক্ষত্রের আসন্ন পতনের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে আমাদের গুড সামারিটান, আমরা জানি না জয়িতা। এটুকু জানি, গল্পটায় একটা টুইস্ট আছে। যৌথ ছাদ তৈরি করতে গেলে কয়েকটা দেওয়াল চারদিকে জুড়ে দেওয়ার মতো টুইস্ট। আমরা দেখব লেগে থাকা জানলা, দরজা দুদিক থেকে আমাদের দিকে এগোচ্ছে। আমরা শরীরে শরীরে থেঁতলে যাওয়ার সুখে, নাকি বীভৎসতায় চিৎকার করার ঠিক আগেই ওরা কিভাবে যেন পোজিশন শাফল করে আমাদের ঠিক মাঝখানে এসে থেমে যায়। দেওয়ালের দুদিকে বেবাক আমরা। ভাবব, অঘটন। ভাবব, এমন তো হয়ই আকছার। আসলে চিত্রনাট্য। খসড়া। আয়রনি। আমাদের ডেস্টিনিতে ছুরি, কাঁচি, করাত নিয়ে দেখ, সেই আমরাই দাঁড়িয়ে। তুমি আধোঘুমে চুলটা না আঁচড়েই কতদূর হল দেখতে উঠে আস। বলো, এখানটা বদলাও, এই বারান্দাটা পুব দিকে কর না। সকাল সকাল চোখে যে রোদ পড়বে আমার! আমি আলগোছে তোমাকে দেখব। কী আশ্চর্য, চিত্রনাট্যই তো, তুমি সত্যি ভেবে নিলে? তারপর ইশারা বুঝে অদ্ভুত থমকে যাবে তুমি। ফিরে আসবে গল্প। আমাদের কলঙ্কহীন মন। আমাদের চিরকালীন সূর্য। আমাদের স্মৃতিনির্মাণ, স্মৃতিবিনাশের পাপক্ষয়। যে লেখায়, হাসপাতাল ছড়িয়ে দিলে একটার পর একটা, দেখ সেখান থেকেই উঠে আসবে একজন ধূসর রঙের নার্স। একজন ঝকঝকে যুবক। মেয়েটি আমার জিভের নিচে জ্বর দেখবে বলে পারদের গভীরে নিয়ে যায়, সূক্ষ্ম এক তাচ্ছিল্যে বলে, সামান্যই জ্বর আপনার, খুব সামান্য। ছেলেটি তোমায় একহাতে জড়িয়ে ধরে অন্যহাতে সরোদ তুলে রাখতে বলে। এখন, এই দুই আশ্চর্য শীতলতার ভেতর বুড়ো হতে হতে, আমরা, দুজন দুজনকে চিনতে পারব জয়িতা?

হ্যাঁ, ডেস্টিনি – ‘নসিব নসিব’ করে আকাশের দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকতো এক বৃদ্ধ ফলওয়ালা। বাসের জানালা দিয়ে দাম জানতে চায় বাচ্চা মেয়ের মুখ। মা বলেছে পেয়ারায় আয়রন হবে। আমাদের আদরের মেয়ের লোভ ওই সঙ্গের ঝালনুনটুকুতেই। মাঝারি এক জোড়াই ১৫টাকা – ব্যাগের ভেতরে পয়সা হাতড়ানো থেমে যায়। ফল ব্যাপারটা আসলে একচেটিয়া, মেয়েশরীরেই তো ফল ধরে – এইটুকুই … বাসে বড়ো ভিড় – ভিড়ের মধ্যে উত্থিত প্রেম তার দিকে মাঝে মাঝে এগিয়ে আসে, মাঝে মাঝে ধাক্কা দেয়। ইরানের যে মেয়েটি আমার সঙ্গে সারাদিন শহর ঘুরল, তাকেও না-চাইতেই ছুঁয়ে দিচ্ছে কলকাতার বাবুরা। বাচ্চা মেয়েরা সরে যাওয়ার জায়গা পায় না – বাংলা-বাজারের ভিড় – “মাঝে মাঝে কার কাছে যাব?”

কী হবে বলো আর, সারা পুরুষ-দেশ শুধুই ক্ষুধিত, সারা নারী-দেশ শুধুই চাষজমি! বিবর্তন আমাকে করে তুলেছে ফালতু-স্নেহময়ী! অমিতাভ, তুমি তেমনভাবে বীজ বুনতে চাইলে আমি নিশ্চয়ই এগিয়ে দেব আমার তিন-ফসলা মাটি, যার বন্ধ্যাত্ব নিয়েএখনও কোনও তথ্যই নেই আমাদের হাতে। মদিগ্লিয়ানি আঁকছেন সন্তান কোলে জিপসি নারী – জন্মের স্রোত – “নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ?”

আসলে ফলওয়ালা জানে, “কপাল কপাল” বলতে বলতে আমরা কেউই কপালের দিকে তাকাই না। যেন আকাশেই বসে আছে, দেশের জরায়ু ভেঙে-ভেঙে রাখা, অলিখিত এক ভবিতব্যের রাজা – সব দোষতাপ তার। অমিতাভ, কত হাজার পূর্বাব্দে যেন আমরা এভাবেই শিখেছিলাম ওপরে তাকিয়ে দোষ দিতে। তারপর কত ‘চরণে সেবা লাগে’, কত ওলাইয়ের থান – গাছের গুঁড়ি নদীর পাড় – ঈগলের ঘূর্ণি – যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা। হে মহাসাহিত্য, এ আমাদের কোথায় এনে ফেলেছ!

এই তো ঘেঁটে যাওয়া ইদিপাস রাজা— মাতৃকামনা মাতৃউপাসনা— মারি ও মড়ক—
কার যেন পুণ্যফল ধরে আছে আমাদের চণ্ডীজন্মের আকাশবাণীর দিন?