‘আই লেফট আ স্কিন দেয়ার’— লুইস গ্লিক ও একটি ব্যক্তিগত কথন

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 


ঠিক এরকম সময়ে, উৎসবের ঠিক আগে, যুদ্ধের ঠিক আগে লুইস গ্লিক আমাদের ছেড়ে চলে যান। ‘পৃথিবী ডুবে যায় চিরন্তন এক ভাগ স্থলে’। আমাদের কর্কটের দেশে জড়ো হয় ফুলের উৎসব। চাঁদ না, ফুল আলো করে দেয় আমাদের উঠোন। আমাদের উৎসব নৈঃশব্দ্যের। আমরা সেই আশ্চর্য শান্ত দেশে মেঘের ভেতর সাদা চুলের গ্লিককে হাঁটতে দেখব। বলব, আমাদের নেবেন না ম্যাম? আমাদের পাশে এসে বসবেন না? জোর করে কবিতার ক্লাসে বসাবেন না? আমাদের বাতুলতাকে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলবেন না, ‘words are hard-won’, একে নষ্ট কোরো না, এভাবে নষ্ট কোরো না

 

একটা শ্যামলা রঙের মেয়ের পায়ের পাশে একটা অসুস্থ বেড়াল। একটা ফায়ারপ্লেসের ধারে আমি অনন্ত বসে। অনন্ত অর্থে খুব বেশি দিন তা নয়। হয়তো, বড়জোর দেড়টা বছর, হয়তো সেই বছরের ভেতরেও বেশ কিছু অসাবধান, অ-মুহূর্ত। তবু, ইচ্ছেটুকু অনন্ত। আমি সেই মেয়ের কাছে বসে অল্প শীতে লুইস গ্লিক পড়ছি। পড়ে শোনাচ্ছি। লুইস গ্লিক প্রয়াত হয়েছেন। লুইস গ্লিক সামান্য আগে জেনেছিলেন তাঁর ক্যানসার। ফায়ারপ্লেসের আলোয় আমি পড়ছি ‘মক অরেঞ্জ’। ‘It is not the moon, I tell you,/ It is these flowers/ lighting the yard’। বেড়ালটা ক্রমশ অস্ফুট আদরে মাথাটা আরও নিচু করছে, আরও নিচু। ক্রমশ আসছে আরও, আরও বেড়াল। মেয়েটি আলাপ করিয়ে দিচ্ছে আমার সঙ্গে। ‘The cats are fast like their ancestors in their hills and hungry like their ancestors.’ বেড়ালগুলো প্রেত-গন্ধে দ্রুত সরে যাচ্ছে পাশে। মনে হয় কোনও শীতের পাহাড়ে, আমাদের পূর্বপুরুষের সঙ্গে দেখা হবে একদিন। তারা হো হো হেসে বলবে, কোন জন্মে তোমরা ভুল ঠিক করবে হে? এই ট্রমার ইতিহাস থেকে বেরোবে কবে? আমি নমনীয়তা ছেড়ে, ফায়ারপ্লেস ছেড়ে উঠে যাওয়ার আগে শুনতে পাব তোমার কণ্ঠস্বর— ‘অসংখ্য চিতা আর গণকবরে ঢেকে রাখে সমস্ত সোহাগ স্মৃতি। যেভাবে মানুষের হাত ছুঁয়ে ছুঁয়ে বাঁচে শব…’

আমরা সামাজিক বহুপরিচিতিতে ছন্নছাড়া, মিস গ্লিক। আপনি ২০১২-র এক সাক্ষাৎকারে বলছেন— ‘to be praised for things that you deplore is quite punishing … that kind that pats you on head and moves on to the more interesting things and all of it just cycles through – you can feel the pins moving on the board and then all of a sudden there you are target practice for people and you have to just live through all of it – all of it – and not be destroyed…’ আমরা এইসব টার্গেট প্র্যাকটিস ছেড়ে বেরিয়ে যাই। আমাদের হাতে উঠে আসে ওই সাদা বেড়ালের মতো পশম, আমরা এর ওর হাতে হাত দিয়ে দুজনের অন্তর্বর্তী একটা সুটকেসে রেখে দিই গাদাগুচ্ছের জামাকাপড়, ভাঁজ করি না, ভাঁজ করি না কিছুই। কখন লাগবে, কখন পরব কোথায় কে জানে! তুমি কান্নার মতো কিছু একটা মুখ চাপা দাও। আমি বলি, ওই দেখো দরজা। ‘At the end of my suffering there was a door.’ অন্ধকার মাটির নিচে চাপা দেওয়া আছে আমাদের জেগে থাকাগুলো। এভাবে বাঁচা যায়! কোনওদিন জাগিবে না আর। জাগিবার গাঢ় বেদনার, অবিরাম ভার। আমি মাতৃচেতনায় ভয় পাই। এই আচমকা উৎসবের সঙ্গে নিজেকে রিলেট করতে পারি না। দেবীর সঙ্গে রিলেট করতে পারি না। লুইস একটা নার্ভোসা অ্যানোরেক্সিয়ায় কিশোরীবেলা হারান। মাকে ভয় পেতে শুরু করেন। সাইকোঅ্যানালিস্টের সোফায় লুইসের আরোগ্য। সম্পর্ক, বিচ্ছেদ, অল্প একটু ওয়াইন, কবিতা। আমি শেষ করতে পারি না সেইসমস্ত স্বর, তুমি করো—

I became a criminal when I fell in love.
Before that I was a waitress.

I didn’t want to go to Chicago with you.
I wanted to marry you, I wanted
Your wife to suffer.

I wanted her life to be like a play
In which all the parts are sad parts.

Does a good person
Think this way? I deserve

Credit for my courage…

একটা রাশিয়ান আর হাঙ্গেরীয় জিউয়িশ ইমিগ্রেশনের ট্রমা। তোমাদের মার্কিন দেশ। ‘উজাড় গ্রামগুলো আমি ছেড়ে এই এসে বসেছি পশ্চিমে’। ফায়ারপ্লেসের আগুনে কুমিল্লার গন্ধ। ‘আমাদের গ্রামগুলি এখনও নদী থেকে অনেক পিছনে’। একটা দেশ থেকে আরেকটা দেশ। তারপর আবার। ‘What has brought us here will lead us away; our ship sways in the tinted harbour water’। আমি উঠে গিয়েই আবার সেই মেয়ের পাশে এসে বসি। তার মাথায় হাত রাখি। এক এক করে খুলে রাখা ‘হাউজ অফ মার্সল্যান্ড’, ‘ডিসেন্ডিং ফিগার’, ‘আরারাত’। অনন্ত শীতের রাতে ভিটেমাটির স্মৃতি। ‘চাইল্ড ক্রায়িং আউট’— ‘I’ll never understand/the claim of a mother/on a child’s soul.’ মনে হল, আমি যেন তোমাকে সঙ্গ দিতে এসেছি। তোমাকে অতিক্রম করতে নয়। সে সাধ্য নেই। আমার পরিচিত মাটি এদেশের সীমানায় নঞর্থক এক নব্বই তৈরি করে শেষ হয়ে গেছে। তার থেকে বেরোতে গেলে আমার হাঁফ লাগছে। কথা মিশে যাচ্ছে কথার ভেতর। পুনরাবৃত্তি, পুনরাবৃত্তি। অথচ আমার ওপর কৃতজ্ঞতার গুরুভার। আমার অবিশ্বাস। আমি পড়ছি ১৯৯৮ সালের ‘থ্রি পেনি রিভিউ’-এর একটি সংখ্যায় গ্লিকের সেই শব্দব্রহ্ম— ‘You saved me, you should remember me…’

কেন লিখতেন গ্লিক? লেখা মানে প্রতিশোধ। ‘revenge against circumstances – bad luck, loss, pain, if you make something out of it then you’ve no longer been bested by these events.’ একটা নোবেল লেকচারের ভেতর ডিকিনসন, ব্লেক। পিতামহীর ঘরের ভেতর তৈরি হওয়া একটা কাল্পনিক স্টেজ-শোয়ে শ্রেষ্ঠ কবিতার ডায়াসে উঠে যাচ্ছেন ব্লেক। গ্লিক ব্লেককে দেখছেন— দেখছেন একটি কালো ছেলে, ‘দ্য লিটল ব্ল্যাক বয়’— ‘and these black bodies and this sunburnt face/ is but a cloud, and like a shady grove.’ তুমি তখন তোমার প্রেমিকের কথা বলবে। বলবে মেঘে ঢেকে যাওয়া মৃত্যুকথন, নিরুদ্দেশ যাত্রার ধারাবিবরণী। আমি দেখব, প্রতিটা শ্যামলা মেয়ের গালে একটা কালো তিল থাকে। সেখানে ছুঁলে সে অল্প হাসে। সেও কি হারিয়ে যাবে কোনওদিন? হারিয়ে কোথায় যাবে? অস্তিত্বহীন? তুমি আসলে আমারই মতো? মিস ডিকিনসনের প্রেত। ‘আর ইউ নো-বডি টু?’ গ্লিকের নোবেল লেকচারে সেই ডিকিনসন, সেই ব্লেক, সেই বার্ড অফ অ্যাভন, সেইসব আশ্চর্য সনেট। আমি তোমার দেশের শীত শেষের অপেক্ষা করি। গ্লিক প্রয়াত হওয়ার পাঁচ মাস পর তোমাদের দেশে শীত কমবে। একটা রোদ তোমার মেঝেতে শোওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যেসের ভেতর গায়ে এসে পড়বে। রুক্ষ চুলে বাঁধবে অলৌকিক ক্লিপ। তখন আমি কী করব? ‘Shall I compare thee to a summer’s day?’

ঠিক এরকম সময়ে, উৎসবের ঠিক আগে, যুদ্ধের ঠিক আগে লুইস গ্লিক আমাদের ছেড়ে চলে যান। ‘পৃথিবী ডুবে যায় চিরন্তন এক ভাগ স্থলে’। আমাদের কর্কটের দেশে জড়ো হয় ফুলের উৎসব। চাঁদ না, ফুল আলো করে দেয় আমাদের উঠোন। আমাদের উৎসব নৈঃশব্দ্যের। আমরা সেই আশ্চর্য শান্ত দেশে মেঘের ভেতর সাদা চুলের গ্লিককে হাঁটতে দেখব। বলব, আমাদের নেবেন না ম্যাম? আমাদের পাশে এসে বসবেন না? জোর করে কবিতার ক্লাসে বসাবেন না? আমাদের বাতুলতাকে হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলবেন না, ‘words are hard-won’, একে নষ্ট কোরো না, এভাবে নষ্ট কোরো না। কপালে বারবার নেমে আসা সেইসমস্ত চুল সরিয়ে বলবেন না— ‘Right now you are a child holding hands with a fortune-teller. All the rest is hypothesis and dream.’? আসলে আমি তো ফায়ারপ্লেস থেকে আর নড়তে পারব না এই জীবনে। আমাদের এলিজিতে, জীবন-মরণের ভেতর মিস গ্লিক আপনি স্রেফ এক প্রয়াত বন্ধু। কোনও নাম নেই, নাম নেই। নম্বর মাত্র। আমরা বন্ধু-মৃত্যুকে পরমপ্রাপ্তি করে নেব। মৃত্যু নয়, মৃত্যু নয়। আসলে জন্মসময় অনেক বড়সড় ক্ষতি। ‘Birth, not death, is the hard loss. I know. I also left a skin there.’

যন্ত্রণার শেষে একটা দরজা আছে। আমাদের অনভ্যাসে শোওয়ার সময় সে দরজা বন্ধ করে আসতে ভুলে যাই। অক্টোবর আসে, অক্টোবর পেরোয়— ‘Death cannot harm me/ more than you have harmed me,/ my beloved life.’

 

 

(ঋণস্বীকার – মহাশ্বেতা আচার্য, রোশনারা মিশ্র)

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4673 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...